আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৫
সাবিলা সাবি
হায়াস ম্যানশন-এর বিশাল অট্টালিকাটি তখন গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। বাইরের আকাশ ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, লন্ডনের অন্ধকার রাতটা বোধহম আজ কোনো এক বিষণ্ণতার চাদরে ঢেকে গেছে। লিওন তখন তার ব্যক্তিগত কক্ষের ভেতরে আরামকেদারায় অলস ভঙ্গিতে বসে ছিল। রুমের ভেতরটা নিকষ কালো অন্ধকার। বেডসাইড টেবিলের ল্যাম্প থেকে চুঁইয়ে পড়া ম্লান আলোয় লিওনের কফির কাপ থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠছে। আর তার কফি-রঙা চোখের গভীরে জমে আছে কোনো এক অজানা সংঘাত। বাইরের ঝুম বৃষ্টির একটানা শব্দ ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছে, আর সেই একঘেয়েমি তার অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ।
হঠাৎ বারান্দার দিক থেকে ভেসে এল ডানার ঝাপটানির শব্দ। লিওনের কান খাড়া হয়ে উঠল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল, বৃষ্টির তোড়ে হয়তো কোনো গাছের ডাল জানালার কাঁচে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে এক অস্বস্তিকর স্থিরতা তাকে ঘিরে ধরল। সে উঠে দাঁড়াল এবং ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার পাল্লা খুলতেই রুমের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল হিমশীতল বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটা, যা তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
বারান্দার মার্বেল মেঝেতে কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখে লিওন নিচু হয়ে সেটি তুলল। ভাঁজ করা কাগজটা হাতের মুঠোয় নিতেই তার সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল। সে চারপাশে চোখ বোলাল, কিন্তু কোথাও কারো চিহ্ন নেই, ডানার শব্দও মিলিয়ে গেছে। শ্যাডো ততক্ষণে লন্ডনের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে ফেলেছে।
লিওন ধীরস্থিরভাবে চিরকুটটি খুলল। নীল রঙের কালিতে ঝকঝকে বাংলা অক্ষরে লেখা:
“এই যে মিস্টার বাজপাখি, গু*লি করার জায়গা পাওনি? আরেকটু হলেই তো বুলেট সোজাসুজি গিয়ে লাগত আমার হার্টে। আর জানো তো, সেখানে কিন্তু তোমারই অস্তিত্বের বিচরণ। নিজের অস্তিত্বকে কেউ কি ধ্বংস করে, দিলবার?”
লেখাটা পড়ার সাথে সাথে লিওনের কফির কাপ ধরা হাতটা পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। তীব্র ঘৃণায় তার চোখের মণি সরু হয়ে এল। ভাইপারের মুখটা সে দেখেনি, তবুও প্রতিটি অক্ষরের ভাঁজে ভাইপারের সেই অদেখা বিষাক্ত বাঁকা হাসিটিই ফুটে উঠছিল। ভাইপার যে তার এত কাছে চলে এসেছিল অথচ সে টের পায়নি—এই অপমান লিওন মেনে নিতে পারছিল না। আর তার চেয়েও বড় কথা, ভাইপারের এই প্রেম-প্রেম খেলার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধূর্ততা তাকে ভেতর থেকে অস্থির করে তুলছিল।
হাতের চাপে চিরকুটটা দলা পাকিয়ে গেল। বারান্দার এক কোণায় থাকা ময়লার ঝুড়িতে আক্রোশে দলা পাকানো চিরকুটটা ছুড়ে মারল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা তীব্র ঘৃণায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। লিওন কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“দিস গার্ল… জাস্ট টু মাচ! আমার ডেরায় ঢুকে আমাকেই প্রেমপত্র দেয়া? একজন সিআইডি অফিসারের সাথে ফাজলামো? ঠিক আছে ভাইপার, খেলা যখন শুরু করেছো তুমি, শেষটা তবে আমিই করব।”
সে দ্রুত ডেস্কে গিয়ে তার ল্যাপটপটা খুলল। স্ক্রিনের নীল আলোয় তার মুখটা আরও বেশি কঠোর আর নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। সে নোভাকে ভিডিও কনফারেন্স কলে ডাকল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো উত্তাপের রেশ ছিল না, তবে জমাট বাঁধা বরফের মতোই শীতল শোনাল সেটা। “নোভা, পুরো টিমকে নিয়ে আধঘন্টার মধ্যে কনফারেন্স কলে আসো।”
নোভা ওপাশ থেকে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই সে কল কেটে দিল। লিওন জানালার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা দেখল। ভাইপার তাকে নিয়ে যে খেলাটা খেলছে, তা এখন আর কেবল পেশাগত সীমানায় আটকে নেই এটি এখন ব্যক্তিগত। ভাইপার তাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করছে, তাকে প্রেমের ঘোরে বাঁধতে চাইছে—কিন্তু লিওন তাকে এমন এক নরকে পাঠাবে, যেখানে প্রেম নয়, কেবল বিভীষিকাই থাকবে।
লিওন দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠল “আমাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করার এতো শখ তোমার? আজকের পর থেকে আমার নামটা মনে পড়লেও তোমার রক্ত জমে হিম হয়ে যাবে। আমি নামক এমন গোলকধাঁধায় তুমি নিজেকে বন্দি করতে চাইছো যেখান থেকে বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। এই খেলার শেষটা আমি নিজেই লিখব। খুব দ্রুতই।”
লিওন ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখল, মায়াময় আবহে সোফায় কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে মায়া। তার কোলে ছোট্ট একটা তুলতুলে খরগোশ। লিওনের গম্ভীর পদশব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। লিওন ভ্রু কুঁচকে খরগোশটার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “ছি, মায়া! এই নোংরা প্রানীটাকে ঘরে নিয়ে এলি? কোথা থেকে এল এটা?”
মায়া একটু হকচকিয়ে গিয়ে খরগোশটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। অভিমানী গলায় বলল, “মামা এনে দিয়েছে। তোমাকে কতবার বলেছি, লিও ভাইয়া! একটা খরগোশ আমার জন্য আনো। তোমার তো সময়ই হয় না। পরিবারের কারো জন্যই তোমার সময় নেই—শুধু কাজ আর কাজ!”
লিওন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কন্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতা কিছুটা কমে এল, কিন্তু গাম্ভীর্য রয়ে গেল। সে ধীরস্থিরভাবে বলল, “আমি এমন একটা প্রফেশনে আছি, যেখানে কাজ ছাড়া কিছুই নেই। তবে ধৈর্য ধর, খুব দ্রুত আমি বাড়ির সবাইকে খুশি করব। সবাইকে নিয়ে লং ট্যুরে যাব।”
মায়া যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। সে বড় বড় চোখে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি বলছো, লিও ভাইয়া?” লিওন এক চিলতে ম্লান হাসি হেসে বলল, “হ্যাঁ, সত্যি।”
মায়ার কণ্ঠে হঠাৎ করেই অভিমানের সুর স্পষ্ট হয়ে উঠল, সে ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু তুমি এই কিউট প্রাণীটাকে নোংরা কেনো বললে?” লিওন ভ্রু কুঁচকে খরগোশটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরদোর সব নোংরা করবে, খামচি খাবি আর তাছাড়া এই ধরনের দুর্বল প্রাণী পুষে কী লাভ?”
মায়া খরগোশটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদ করে উঠল, “তাহলে কী আমি বাঘ পুষব নাকি?”
লিওন স্মিত হেসে বলল, “দরকার হলে তাই পালবি।”
মায়া সাথে সাথে পাল্টা জবাব দিল, “তোমার মতো আস্ত একটা বাঘ তো এই বাড়িতে আগে থেকেই আছে, আরেকটা বাঘের আর কী দরকার?”
লিওনের চোখ জোড়া মুহূর্তের মধ্যে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে চোখ পাকিয়ে বলল, “মায়া, তুই দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস! ভার্সিটি কি বন্ধ?”
মায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিচু স্বরে বলল, “হ্যাঁ, দুদিন পরেই খুলবে।” লিওন আর কোনো কথা না বলে গম্ভীর মুখে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তার মনের ভেতর তখন শিকার ধরার সেই শীতল পরিকল্পনাগুলো আবার দানা বাঁধছে।
লন্ডনের ‘মেফেয়ার’ এলাকা মানেই অভিজাতত্বের অহংকার, তবে এই অহংকারের ছায়াতেই লালিত হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সব ষড়যন্ত্র। দিনের বেলা এখানে জাঁকজমক আর পর্যটকদের ভিড় থাকলেও, রাত গভীর হতেই পুরো এলাকা নিঝুম নিস্তব্ধতায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ঘড়িতে তখন রাত ৩টা বেজে ২৩ মিনিট। ঝিরঝিরে বৃষ্টির ছাঁটে লন্ডনের পিচঢালা রাস্তাগুলো কালচে কাঁচের মতো চকচক করছে, সোডিয়াম ল্যাম্পপোস্ট থেকে চুইয়ে আসা হলদেটে আলো কুয়াশার ভেতর থমকে আছে; দানিয়েলের
টাউনহাউসটি রাস্তার শেষ প্রান্তে এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেখানে কোনো পুলিশি টহল বা সাধারণ মানুষের আনাগোনা নেই। বাইরে থেকে যে বাড়িটি আভিজাত্যের প্রতীক বলে মনে হয়, ভেতরে তার প্রতিটি ইঞ্চিতে লেগে আছে নিষ্ঠুরতার ছাপ।
টাউনহাউসের মিটিং রুমের ভেতরটা বাইরের পৃথিবী থেকে একরকম নির্বাসিত। দেওয়ালের গায়ে বসানো কালো মার্বেল পাথরগুলো ঘরের সবটুকু আলো শুষে নিয়ে চারপাশকে এক গুমোট অন্ধকারের চাদরে মুড়ে রেখেছে, ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা বিশাল ওক কাঠের টেবিলটা আজ এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। টেবিলের ওপর লন্ডনের মানচিত্রটা খোলা, পাশে মার্কের ল্যাপটপ। টেবিলের ওপর রাখা ‘দ্য স্যাভয়’ হোটেলের নকশাটার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কালকের পরিকল্পনাটা কতটা নিখুঁত। হোটেলটাই এখন তাদের শিকারের প্রধান ক্ষেত্র।য়ফাইলগুলোর ওপর রাখা আন্তর্জাতিক ড্রাগ ডিলার ভিক্টরের কিছু ছবি।ছবিগুলোতে তাকে বেশ দাপুটে আর নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে। আর তার ঠিক পাশেই রাখা ইভলিনের ফাইলটা। ভেতরে তার আইডি কার্ড, পাসপোর্টের কপি আর সারাদিন সে কোথায় কখন যায়—তার সব হিসেব নিখুঁতভাবে লেখা। পরিকল্পনা পরিষ্কার—কাল ভোরে ইভলিনকে হোটেল থেকে তুলে আনা হবে, আর সন্ধ্যার সেই গুরুত্বপূর্ণ ডিলের সময় তার ছদ্মবেশে সেখানে ঢুকবে ভাইপার আর তার হাতের সদস্যরা।
হোটেলের সেই গোপন স্যুইটের চাবি আর ইভলিনের হয়ে ওঠার যাবতীয় ব্লু-প্রিন্ট এখন ভাইপারের হাতের মুঠোয়—যা কাল সন্ধ্যার সেই ডিলটিকে কেন্দ্র করে লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার সমীকরণ চিরতরে বদলে দেবে।
ঘরের ঠিক মাথায় রাখা উঁচু, কারুকার্যময় চামড়ার চেয়ারটায় বসে আছে দানিয়েল। এই ওয়ারউলফ গ্রুপের সম্রাট সে, যার হুকুমেই চলে পুরো সাম্রাজ্য তার শীতল দৃষ্টিজোড়া ডিলার ভিক্টরের ছবির ওপর নিবদ্ধ। টেবিলের চারপাশে থাকা দামি চামড়ার সোফায় বসে আছে ইভানা, মার্ক এবং আরও কয়েকজন বিশ্বস্ত সদস্য। কারো হাতে ওয়াইনের গ্লাস, কারো ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া—সবার দৃষ্টি আটকে আছে ভাইপারের ওপর। দানিয়েলের ঠিক পাশেই সোফায় আয়েশ করে গা এলিয়ে বসে আছে ভাইপার—আলফা উম্যান যার প্রতিটি ভঙ্গি যেমন রাজকীয়, তেমনই ভয়ংকর। তার পরনে কালো সিল্কের শার্ট, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। কবজিতে দামি ঘড়ি আর আঙুলের ফাঁকে রয়েছে জ্বলছে দামী এক চুরুট। অন্য হাতে ধরা ক্রিস্টালের গ্লাসে ওয়াইন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী তার মুখটাকে কিছুটা অস্পষ্ট করে রাখলেও, তার চোখের ধারালো চাহনি বলে দিচ্ছে—কালকের দিনটা লন্ডনের অন্ধকার জগতের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে চলেছে।
পরের দিন ভোরবেলা। লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় মার্ক আর তার দলবল খুব নিখুঁতভাবে ইভলিনকে তুলে আনল। এই ছোটখাটো কাজের জন্য ভাইপারের যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সে তার শক্তি আর বুদ্ধির সঞ্চয় করছিল সন্ধ্যার জন্য। কারণ, আসল খেলা তো বাকি—সন্ধ্যাবেলায় ওই ড্রাগ ডিলারের মুখোমুখি হয়ে ডিলটা সম্পন্ন করার দায়িত্ব একমাত্র ভাইপারের।
বিকেলবেলা সিআইডি অফিসের পরিবেশটা আজ বেশ অন্যরকম। বাইরের ব্যস্ততা আর দাপ্তরিক কাজের চাপে সময়টা থমকে দাঁড়িয়েছে। অফিসের ফাইলে ঘেরা টেবিলে টেবিলে তখন কাজের খসখস আওয়াজ, আর তারই মাঝে শোনা যাচ্ছে হালকা গুঞ্জন। সেই গম্ভীর ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ করে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল—আজ তাদের সহকর্মী অফিসার আরিয়ানের জন্মদিন। টেবিলটা ঘিরে তখন সহকর্মীদের খুশির আড্ডা আর শুভেচ্ছা জানানোর তোড়জোড়। সুযোগ বুঝে অফিসার রওশন হাত-পা নেড়ে আরিয়ানের কাছে ট্রিটের আবদার জুড়ে দিল। রওশনের বায়না দেখে মনে হচ্ছে, আজ ট্রিট না নিয়ে সে ছাড়বে না। অথচ লিওন—যার কাছে এসব পার্টি বা আড্ডা মানেই সময়ের অপচয়—সে উদাসীনভাবেই ফাইল থেকে মুখ না তুলেই বলে উঠল, “তোমরা যাও, আমার কিছু কাজ এখনো বাকি আছে।”
কিন্তু রওশন, নোভা আর খোদ আরিয়ান—কেউই যেন নাছোড়বান্দা। তাদের ক্রমাগত পিড়াপিড়িতে শেষপর্যন্ত লিওন কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ল। এসব কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালানো বা অহেতুক হৈ-হুল্লোড়ে তার ঘোর আপত্তি; তার কাছে এই সময়টুকু মানেই কাজের অপচয়। তবুও সহকর্মীদের অদম্য আগ্রহ আর টিমের খাতিরে শেষমেশ সে হার মানল। মুখটা কিছুটা ভার করেই এক প্রকার অনিচ্ছায় রাজি হলো সে। শেষমেশ সবাই মিলে ঠিক করল, আজকের এই বিশেষ মুহূর্তটা উদযাপন করা হবে শহরের অন্যতম অভিজাত হোটেল ‘দ্য স্যাভয়’-এ। সেখানেই হবে জন্মদিন পালন আর রাতের খাওয়া-দাওয়া।
সন্ধ্যা নেমেছে লন্ডনের আকাশে। তবে আজকের দৃশ্যপট একেবারে ভিন্ন। ভাইপার আজ অভ্যস্ত পোশাকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সাধারণত যে মানুষটা কালো হুডি, শার্ট বা টি-শার্টের আড়ালে নিজের অস্তিত্ব ঢেকে রাখে, সেই ভাইপার আজ নিজেকে উপস্থাপন করেছে এক ভিন্ন রূপে। শরীরের বাঁক স্পষ্ট করা একটি বোল্ড বডিকন ড্রেস—পুরোটা জমকালো সিকোয়েন্সের কাজ করা। আলোর নিচে তার প্রতিটি নড়াচড়ায় পোশাকটি থেকে ঠিকরে পড়ছে ঝিলিক। এই অভাবনীয় রূপান্তর শুধু ছদ্মবেশ নয়, বরং ওই ডিলারকে ধোঁকা দেওয়ার এক সুনিপুণ চাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এই অচেনা প্রতিফলন দেখে ভাইপারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। আজ সে শিকারি নয়, বরং এমন এক মোহিনী, যার ফাঁদে পা দেওয়া মানেই নিশ্চিত ধ্বংস।
সাধারণত যে ভাইপারকে মানুষ দেখেছে রুক্ষ আর অন্ধকার পোশাকে, তাকে আজ চেনা দায়। ইভানা তার অগোছালো ‘উলফ কাট’ চুলের ওপর নিখুঁতভাবে লম্বা ফেইক চুল বা উইগ বসিয়ে দিয়েছে, যা তার কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠের দিকে নেমে এসেছে। ভাইপার তার ভ্রুর সেই চেনা পিয়ার্সিংয়ের রিংটি খুলে ফেলেছে, আর সেই ছোট্ট ছিদ্রটুকুও আজ মেকআপের ভারী স্তরে পুরোপুরি অদৃশ্য। তার চেহারার সবচেয়ে ভয়ংকর চিহ্ন—চোখের নিচের সেই কাটা দাগ, যা তার অতীতের কোনো এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী, তা-ও ইভানার দক্ষ হাতের নিখুঁত মেকআপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। একই কায়দায় কড়া কনসিলারের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে তার হাতের থাকা সেই সাপের ট্যাটুটিও।
ভাইপার সাজগোজের ধার ধারেনি কোনোদিন, তার হাত অভ্যস্ত ছিল ট্রিগারে, মেকআপ ব্রাশে নয়। কিন্তু আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইভানা। একজন তুখোড় মেকআপ আর্টিস্টের মতোই ইভানা অত্যন্ত নিপুণ হাতে ভাইপারের সাধারণ মুখাবয়বে ফুটিয়ে তুলছে এক মায়াবী কিন্তু বিপজ্জনক রূপ। গাঢ় লাল লিপস্টিকের ছোঁয়ায় তার ঠোঁটজোড়া রক্তের মতো টকটকে হয়ে উঠল, ইভানার শেষ টাচআপের পর ভাইপার যখন আয়নার দিকে তাকাল, নিজেকে তার নিজেরই অচেনা লাগল। সে এখন কেবল এক আলফা উম্যান নয়, বরং এক রহস্যময়ী মরীচিকা, যে কোনো পুরুষকে মুহূর্তেই বশ করতে সক্ষম। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ভাইপার মৃদু হাসল, এই নতুন রূপ তার আজকের মিশনের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।
ইতিমধ্যে লিওন, নোভা, রওশন এবং আরিয়ানসহ টিমের বাকি সদস্যরা ‘দ্য স্যাভয়’-এর বিলাসবহুল ডাইনিং হলে পৌঁছে গেছে। জন্মদিনের সংক্ষিপ্ত কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবাই খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিলে আসন নিয়েছে। বিশাল হলরুমটি তখন জৌলুসে পরিপূর্ণ। ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়া উষ্ণ আলো দামি মার্বেল ফ্লোরে পড়ে তৈরি করছে এক মোহময় আভা। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু স্বরে বাজছে জ্যাজ মিউজিক, যার ছন্দে মিশে আছে অভিজাত আভিজাত্যের স্পর্শ। হঠাৎ রওশন মেনু কার্ড থেকে চোখ সরিয়ে ওয়েটারকে ডেকে ড্রিংকস অর্ডার করে বসল। লিওন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল, মৃদু স্বরে বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করল। কিন্তু রওশন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে লিওনকে থামিয়ে দিল। রওশন খুব ভালো করেই জানে, এখন আর তারা অফিশিয়াল ডিউটিতে নেই; সুতরাং এই মুহূর্তে কে কী করবে, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। লিওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে গেল, তবে তার তীক্ষ্ণ নজর চারপাশটা জরিপ করতে ছাড়ল না।
হঠাৎ রওশন মেনু কার্ডটা লিওনের সামনে মেলে ধরে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “স্যার, জন্মদিন তো আজ আরিয়ানের, কিন্তু পার্টি তো আমাদের সবার! আপনি কোনটা নেবেন—স্কচ, ওয়াইন, ব্ল্যাক ড্যানিয়েল নাকি ভদকা?”
লিওন এক মুহূর্ত দেরি না করে শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল, “সরি রওশন, আমি ড্রিংকস করি না। তোমরা নাও।”
রওশন যেন অবাক হওয়ার ভান করে চেঁচিয়ে উঠল, “কীহ্! করেন না মানে? আজ একটা স্পেশাল দিন, এইটুকু তো করা যায়!”
লিওন এবার একটু গম্ভীর হয়ে তাকাল। ধীর স্থির গলায় বলল, “দেখো, এসব অ্যালকোহল মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ করে দেয়। একজন সিআইডি অফিসারের ব্রেইন ড্যামেজ হলে সে আর তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।”
রওশনও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বললো, “আরে স্যার, আমরা কি আর রোজ করছি? বিশেষ ওকেশন ছাড়া তো আমরাও ছুঁই না।”
লিওন সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কোনো ওকেশন বা অজুহাতেই এসব করি না। আমার কাছে শৃঙ্খলাটাই আসল।”
পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হতে দেখে রওশন খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, “তাহলে কি আপনার জন্য এক গ্লাস পুস্টিকর দুধ অর্ডার করব, স্যার?” লিওন তক্ষুণি চোখ পাকিয়ে রওশনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা টের পেয়ে নোভা তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বলে উঠল, “আরে রওশন স্যার, আপনি লিওন স্যারকে কী বিরক্ত করছেন! স্যার তো রেগে গেলে এখান থেকেই চলে যাবেন। আচ্ছা স্যার, আপনি বরং ফলের জুস নিন, কোনটা নিবেন?”
লিওন একটু শান্ত হয়ে মেনুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওয়াটারমেলন জুস।”
আরিয়ান মুচকি হেসে বললো, “স্যার, আপনি তো দেখি অফিসে থাকলেও সবসময়ই এই জুসটাই অর্ডার করেন! এটা কি আপনার অল-টাইম ফেভারিট?”
লিওন হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “ধরে নাও তাই।”
হোটেলের বাইরে তখন বিলাসবহুল গাড়িগুলোর সারি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি চকচকে দামি গাড়ি এসে থামল ‘দ্য স্যাভয়’-এর মূল ফটকের সামনে। ড্রাইভারের আসন থেকে একজন সদস্য এবং পাশের সিট থেকে আর একজন গার্ড সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করল। এরপর পেছনের দরজা খুলতেই একে একে নেমে এল ভাইপার, ইভানা আর মার্ক। তাদের আজকের এই বেশভূষার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধারালো বিপদের আভাস। ভাইপার সেজেছে ‘ইভলিন’ নামের সেই ডিলার মোহময়ী নারী হিসেবে। তার শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা সিকোয়েন্সের সেই বোল্ড বডিকন ড্রেসটি হোটেলের মৃদু আলোয় হিরের মতো জ্বলছে।আর পাশেই ইভানা, যে এখন ভাইপারের ব্যক্তিগত ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে সেজেছে আর গম্ভীর মুখে পাশে দাঁড়িয়ে আছে মার্ক, তার পরনে ইতালিয়ান স্যুট—সে এখন ভাইপারের পার্সোনাল বডিগার্ড হিসেবে সেজেছে। তাদের লক্ষ্য ডাইনিং হলের এক কোণে থাকা সেই বিশেষ সোফা। সেখানে আগে থেকেই আয়েশ ভঙ্গিতে বসে আছে সেই কুখ্যাত ডিলার ভিক্টর আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
হলের ভেতরে প্রবেশ করতেই ভাইপারের চোখে মুখে ছিল সেই চিরচেনা খু,ননি সুলভ শীতল কাঠিন্য—যেখানে কোনো দয়া বা মায়ার স্থান নেই। কিন্তু এক মুহূর্তের ব্যবধানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। তার নজর পড়ল হলের এক কোণে বসে থাকা লিওনের ওপর। মুহূর্তের জন্য ভাইপারের চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি থমকে গেল। সেই কঠোরতার আড়ালে তখন এক নিমেষে তার চোখজোড়ায় ভর করলো বাঁধভাঙা ভালোবাসা আর আসক্তি। লিওনকে দেখার সাথে সাথেই তার শরীরের স্নায়ুগুলো মৃদু কাঁপতে শুরু করল, বুকের ভেতরে হার্টবিট অস্বাভাবিক গতিতে ধকধক করে উঠল। সে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি যে, আজ এই মিশনের মাঝে তার বাজপাখি লিওনকে এখানে দেখতে পাবে। তার সুনিপুণ ছদ্মবেশের আড়ালে থাকা সেই দৃঢ়তা এক পলকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল, লিওনের সান্নিধ্য তার সমস্ত শৃঙ্খলকে এক ঝটকায় এলোমেলো করে দিল।
ইভানার ফিসফিসানি কণ্ঠে ভাইপারের ঘোর কাটল। সে বুঝতে পারল, এখন আবেগ নয়, মিশনের সিরিয়াসনেস বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি। ইভানা ইশারা করতেই ভাইপার নিজেকে সামলে নিল। তারা যে বিশেষ সোফার দিকে এগিয়ে গেল, সেটি মূলত আয়নার কাঁচ দিয়ে ঘেরা এক ছোট কক্ষের মতো। এমন এক স্থাপত্য যে, ভেতর থেকে পুরো হলরুমের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু বাইরের কারো পক্ষে ভেতরের কথোপকথন শোনা বা দেখা সম্ভব নয়। ভাইপার সেই কাঁচের দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ভিক্টর এতক্ষণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ইভলিনকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই সে উঠে দাঁড়াল। ভিক্টর ডার্ক ওয়েব বা ভার্চুয়াল জগতের আড়ালে ইভলিনের সাথে অনেক চ্যাটিং করলেও, আজই প্রথম সে সামনাসামনি দেখল তাকে। সে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেক করার জন্য। ভাইপার খুব সতর্কতার সাথে তার হাত ধরল, তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে তখন ইভলিনের সেই রহস্যময়ী সত্তাটা উপস্থিত। কিন্তু ভাইপারের মনের ভেতর তখন লিওনকে দেখার সেই অস্থিরতা, যা সে প্রাণপণে চেপে রাখল।
ভাইপার অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে ইভানা এবং মার্ককে ভিক্টরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। এরপর সবাই সেই আয়নার কাঁচ ঘেরা বিশেষ সোফায় গিয়ে বসল। ডিল বা ব্যবসার আলোচনা শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ভাইপারের দৃষ্টি হলের অন্য প্রান্তে আটকে গেল। সে দেখল, লিওনের ঠিক পাশেই বসে এক তরুণী খুব হেসে হেসে লিওনের সাথে কথা বলছে। ভাইপার তার হাতের দামি ওয়াইনের গ্লাসটি শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে আসছে, কিন্তু তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত দৃষ্টি লিওনের টেবিল বরাবর স্থির। ওই অচেনা মেয়েটি লিওনের খুব কাছাকাছি বসেছে, তার হাসি আর লিওনের সাথে কথা বলাটা ভাইপারের সহ্যশক্তির সব বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। মেয়েটি সবার সাথেই হাসছে ঠিকই, কিন্তু লিওনের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটা ভাইপারের কাছে কেন যেন অন্যরকম মনে হচ্ছে—একদমই ব্যক্তিগত।হয়ত তার জেলাসির কারনেই এটা মনে হচ্ছে।
ভাইপারের ভেতরে এখন ঈর্ষার এক দাবানল জ্বলছে। সে চাইলেই উঠে গিয়ে ওই মেয়েটিকে লিওনের পাশ থেকে সরিয়ে দিতে পারে, কিংবা লিওনের কলার চেপে ধরে বলতে পারে—‘ইউ আর অনলি মাইন!’ অথচ পরিস্থিতির চাপে সে এখন ভিক্টরের সামনে ‘ইভলিন’ হিসেবে বসে আছে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে, তবে সেটা ভয়ের জন্য নয়, বরং ভেতরে জমে থাকা তীব্র পজেসিভনেসের কারণে।
হঠাৎ, এক প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভাইপারের হাতের কাঁচের গ্লাসটি মড়মড় শব্দ করে উঠল। তার আঙুলের চাপে গ্লাসটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। গ্লাসের ভেতরে থাকা রক্তবর্ণের ওয়াইনগুলো তার দামী পোশাকের ওপর ছলকে পড়ল,
সবাই চমকে উঠল। ভিক্টর সে ভাইপারের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “ইভলিন? আর ইউ ওকে?”
ভাইপার নিজের কাঁপা হাতটা টেবিলের নিচে নামিয়ে আনল। তার চোখের সেই খু/নি শীতলতা এখন আর নেই, সেখানে দাউদাউ করে জ্বলছে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ। সে কোনোমতে নিজের কন্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করে বলল, “আই এম ফাইন, মিস্টার ভিক্টর। জাস্ট… গ্লাসটা একটু পিচ্ছিল ছিল।”
কিন্তু তার চোয়াল তখনো শক্ত হয়ে আছে। পাশের টেবিলের সেই মেয়েটির প্রতিটা মুভমেন্ট তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে, সে নিজেকে প্রাণপণে সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তার অবচেতন মন এখন কেবলই ওই টেবিলটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার নীল নকশা কষছে।
নিজের ভেতরে জমতে থাকা আগ্নেয়গিরিকে আর বেশিক্ষণ চেপে রাখা সম্ভব হলো না ভাইপারের পক্ষে। ভিক্টরের সামনে বসে থাকাটা এখন তার কাছে শ্বাসরোধকারী মনে হচ্ছে। ঠোঁটে এক কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে সে উঠে দাঁড়াল, শান্ত স্বরে বলল, “একটু রেস্টরুম থেকে আসছি।” কিন্তু সোফা ছেড়ে বের হওয়ার পরই তার হাঁটার ভঙ্গি পাল্টে গেল। পেশাদারী শৃঙ্খলার বাঁধন ছিঁড়ে সে এখন এক উন্মত্ত শিকারি। সে ওয়াশরুমের দিকে না গিয়ে সোজা এগিয়ে গেল সার্ভিং কাউন্টারের দিকে। সেখানে দায়িত্বরত এক ওয়েটারকে নিজের হাতের ইশারায় কাছে ডাকল ভাইপার। তার কণ্ঠস্বর যেন বরফের মতো শীতল, অথচ তাতে মিশে আছে এক চাপা আগ্নেয়গিরির উত্তাপ। ওয়েটার কাছে আসতেই ভাইপার লিওনের টেবিলের দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে নিল, তারপর নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “ওই টেবিলে—যেখানে একটা মেয়ে আর কয়েকজন ছেলে বসে আছে—ওরা কী কী অর্ডার করেছে?”
ওয়েটারের গলার আওয়াজ একটু কেঁপে উঠল ভাইপারের সেই ভয়াবহ চাহনি দেখে। সে ইতস্তত করে বলল, “ম্যাম, ওরা খাবার আর ওয়াইনের পাশাপাশি ওয়াটারমেলন জুস অর্ডার করেছে।”
মেশিনের মতো কাজ করছে। মেয়েটির হাসি আর লিওনের মনোযোগের দৃশ্যটি তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে, যা তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে নিশ্চিত, ওই ওয়াটারমেলন জুসটা মেয়েটির জন্যই—ব্যাগ থেকে অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে ক্ষুদ্র একটা প্যাকেট বের করল ভাইপার। তার হাতের আঙুলগুলো পাথরের মতো অচল, সেখানে কোনো কম্পন নেই—বরং রয়েছে এক প্রকার ভয়ানক প্রশান্তি। প্যাকেটটি ওয়েটারের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে সে নিচু স্বরে বলল, “জুসটায় এটা মিশিয়ে দেবে। কেউ যেন টেরই না পায় আর যদি এক ফোঁটা এদিক-ওদিক হয়েছে তবে জায়গায় খালাস করে ফেলবো।”
ভাইপারের চোখের দিকে তাকাতেই ওয়েটার হিমশীতল এক ভয় অনুভব করল। সে বুঝতে পারল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারী কোনো সাধারণ কাস্টমার নয়; তার চোখের ওই গভীর, নির্লিপ্ত চাহনি সাক্ষাৎ মৃ*ত্যুপরোয়ানা।
ওয়েটারের কণ্ঠে আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ। সে দুপা পিছিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “না ম্যাম, এটা সম্ভব না! ওনারা সিআইডির লোক। সামান্যতম ভুল কিছু হলে আমাকে সোজা জেলে পচতে হবে!”
ভাইপার কোনো কথা বলল না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের হাসি। ব্যাগ থেকে একগাদা নোটের বান্ডিল বের করে সে সশব্দে কাউন্টারের ওপর আছড়ে ফেলল। টাকার সেই ঝনঝনানি আর ভাইপারের চোখের সেই শিকারি চাহনি মুহূর্তেই ওয়েটারের সমস্ত প্রতিবাদ থামিয়ে দিল। সে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল—টাকার স্তূপ নাকি ভাইপারের নিষ্ঠুর চাহনি, ঠিক কী তাকে বেশি আতঙ্কিত করছে, তা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারল না।
ভাইপার ঝুঁকে এল ওয়েটারের আরও কাছে। তার ফিসফিসানি বিষাক্ত বাতাসের মতোই ওয়েটারের কানে প্রতিধ্বনিত হলো, “আমি তোকে আরও টাকা দিচ্ছি। কাজটা শেষ কর, তারপর এই শহর ছেড়ে চিরতরে উধাও হয়ে যাবি। পারবি না?”
ওয়েটারের কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে শীতল ঘাম। সে দ্রুত দুচোখ বুলিয়ে নিল আশেপাশে—কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না। সবাই সবার জগতে মগ্ন। ওয়েটার কোনো উপায়ান্তর না দেখে, প্রায় কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল, “পারব… ম্যাম, পারব। আসলে এখানে আমার কোনো বৈধ আইডি বা এগ্রিমেন্ট নেই, অবৈধভাবে কাজ করছি। পুলিশের ঝামেলায় জড়ালে এমনিতেই আমার সর্বনাশ হবে। ঠিক আছে, আমি করছি!”
ভাইপার তৃপ্তির এক কুটিল হাসিতে ঠোঁট বাঁকাল। শিকার তার ফাঁদে পা দিতে শুরু করেছে।
ওয়েটার তখনও ভয়ে কুঁকড়ে আছে। সে নিচু স্বরে কাঁপা গলায় বলল, “কিন্তু ম্যাম, সিসিটিভি ফুটেজে তো সবকিছু ধরা পড়ে যাবে।” ভাইপারের চোখেমুখে তখন এক অভেদ্য আত্মবিশ্বাস। সে অবজ্ঞার হাসি হেসে ওয়েটারের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, “সিসিটিভি নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি এখানে অনেক বড় একটা মিশনে এসেছি, এটা শেষ হলেই আজকের পুরো হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। আর তোকে যে টাকা দিচ্ছি, তা দিয়ে তুই অনায়াসেই অন্য কোনো শহরে গিয়ে রাজার হালে জীবন কাটাতে পারবি। এখন তোর সিদ্ধান্ত—মৃ/তু নাকি নতুন এক জীবন?”
ভাইপারের এই শীতল গলার স্বরে ওয়েটারের ঘোর লেগে গেল। সে বুঝতে পারল, এই নারীর হাতের মুঠোয় কেবল টাকাই নয়, পুরো হোটেলটির নিয়ন্ত্রণও যেন আজ বন্দী। তার আর কোনো পথ খোলা নেই। সে বাধ্য হয়েই কাঁপা হাতে প্যাকেটটা তুলে নিল।
ভাইপার তড়িঘড়ি করে ইভানা আর মার্ককে একটি মেসেজ পাঠিয়ে দিল—”আমি একটা জরুরি কাজে আটকা পড়েছি। ভিক্টরকে বলবে ইভলিন হঠাৎ অসুস্থ
হয়ে পড়ায় বাসায় চলে গেছেন । আজকের ডিলটা তোমরা নিজেরাই সামলাও।”
মেসেজ পাঠানোর পর তার সবটুকু মনোযোগ লিওনের টেবিলের দিকে। ওয়েটার ড্রাগস মেশানো জুসটা নিয়ে সেই টেবিলে পৌঁছাল। কিন্তু ভাইপারের বুকটা এক মুহূর্তে কেঁপে গ উঠলো—সে দেখল, ওই মেয়েটা বা অন্য কে নয়, বরং সেই জুসের গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়েছে স্বয়ং লিওন!
ভাইপারের মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। ড্রাগস মেশানো জুসটা লিওন পান করে ফেলেছে! প্রচন্ড আতঙ্কে ভাইপারের শরীর হিম হয়ে এল। সে কি এখন লিওনের কাছে ছুটে যাবে? নাকি ড্রাগসের প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তাকে থামানোর কোনো উপায় বের করবে? তার মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু কোনো কিছুই ঠিকঠাক কাজ করছে না।
ভাইপারের চোখের সামনে মুহূর্তেই সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল। তার পায়ের নিচে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। মুহূর্তের ব্যবধানে লিওনের সেই চেনা শান্ত মুখাবয়বে ফুটে ওঠা অসংলগ্ন পরিবর্তন দেখে তার নিজেরই অস্তিত্ব কেঁপে উঠল। যে মানুষটি আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা অ্যালকোহল বা সিগারেট স্পর্শ করেনি, তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল; চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল আর কাঁপাকাঁপা হাত দু’টি অসংলগ্নভাবে গ্লাসের ওপর থরথর করে কাঁপতে লাগল।
ভাইপারের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে উঠল; সে তো চেয়েছিল কেবল ওই মেয়েটিকে ড্রাগস দিয়ে একটি শিক্ষা দিতে, অথচ আজ নিজেরই ভুলের চোরাবালিতে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে প্রিয় মানুষটিকে।
অস্বস্তিতে কলারটা টেনে লিওন দ্রুত শ্বাস নিতে শুরু করল; শরীরের তাপমাত্রা যেন হু হু করে বাড়ছে। টেবিলের অন্যদের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে সে বলল, “আমি একটু… একটু রেস্টরুম যাচ্ছি।” টলমল পায়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে।
রওশন লিওনের টলমল অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে হাসাহাসি করে বলল, “স্যার এভাবে হাঁটছেন কেন? উনি তো দেখছি ড্রিংকস না করেও পুরো ড্রাংক হয়ে গেলেন!” তার কথা শুনে বাকিরাও খিলখিল করে হেসে উঠল। আসলে তারা সবাই ততক্ষণে মদের নেশায় বেশ চুর হয়ে আছে; তাই লিওনের এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে তারা বড় কোনো বিপদের লক্ষণ বলে সন্দেহ করার পরিবর্তে নিছক অন্যকিছু ভেবে উড়িয়ে দিল।
লিওনের এই অবস্থা দেখে ভাইপারের ভেতরটা তোলপাড় শুরু হলো, ‘ওকে এখনই সামলাতে হবে আমার, কিন্তু এই জটলা গুলোকে নিয়ে কী করব?’ তার মস্তিষ্কে তখন আরেকটা ছক কষার কৌশল এলো। সে দ্রুত ওয়েটারকে ডেকে নিজের ক্রেডিট কার্ডটি বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে কঠোর নির্দেশ দিল, “এদের সবাইকে আরও এক রাউন্ড ওয়াইন সার্ভ কর। সাথে এই ঘুমের ওষুধটুকু মিশিয়ে দিবি, পান করার সাথে সাথেই যেনো ওরা এখানেই টেবিলের ওপর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।।”
এদিকে লিওন ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিনে ঝুকে চোখেমুখে পানি দিল, কিন্তু তার গলার ভেতর থেকে সব উগলে আসার উপক্রম হলো; শরীর ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তেই সে জ্ঞান হারাবে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বের হওয়ার জন্য যেই ঘুরতে গেল, অমনি তার ভারসাম্য হারিয়ে গেল। মেঝেতে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তেই একজোড়া হাত তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো , শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সামলে নিল তাকে। লিওনের বিশালদেহী ভার ভাইপারের ওপর এসে পড়ল; ভাইপার যদি শারীরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী না হতো, তবে কোনোভাবেই সে লিওনের মতো এমন সুঠাম দেহের ভার ধরে রাখতে পারত না।
ভাইপারের পিঠ গিয়ে ঠেকেছে ওয়াশরুমের দেয়ালে। পরিস্থিতি ভয়াবহ জটিল হলেও, আজকের এই সময়টা তার কাছে এক ঘোরলাগা স্বপ্নের মতোই। লিওন প্রথমবারের মতো তার বাহুবন্দি। লিওনের শরীর থেকে ভেসে আসা সেই বুনো পুরুষালী ঘ্রাণ আর দামী পারফিউমের মাদকতাময় মিশ্রণ হিয়ার প্রতিটি স্নায়ুকে এমনভাবে কাঁপিয়ে দিল যে, তার সমস্ত অস্তিত্ব যেন এক তীব্র আসক্তিতে নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠল। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল; গভীর এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে সে লিওনের ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে সেই ঘ্রাণটুকু এমনভাবে টেনে নিল, মনে হলো ওই সুবাসের মাঝেই সে হারিয়ে যেতে চাইছে চিরতরে।”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৪
ঘোর কাটিয়ে সে এক তার হাতে ফোনটা বের করে দ্রুত ইভলিনের সিমটি ব্যবহার করে হোটেলের ম্যানেজারকে কল করল। গম্ভীর স্বরে নির্দেশ দিল, “আমার একটা স্পেশাল রুম চাই রাইট নাও।”
