আমার আলাদিন পর্ব ৫১
জাবিন ফোরকান
তিতলির গায়ে ভীষণ জ্বর। তাকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। সেই ভোর ভোর গিয়েই অনুরাগ ফার্মেসি থেকে ওষুধ আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে এসেছে। সকালটা দেখা হবে, অন্যথায় ডাক্তার আনা হবে।
বিছানায় বসে ফিডার দিয়ে ইযানকে খাওয়াচ্ছে ইরাম। পাম্প করে রেখেছিল আগে। অন্য হাতে ছেলের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে স্বামীকে দেখছে সে। সাইবান বাথরুম থেকে পোশাক বদলে বেরিয়েছে। পুকুর থেকে বাড়ি আসার পথেই দুজন তিতলির অবস্থা দেখেছে বিধায় মনটা বিগড়ে গেছে। সাইবানের অভিব্যক্তি কেমন যেন শীতল। সবসময়কার সেই প্রফুল্লতা আর নেই। তাতে শুধু গভীর চিন্তনের ছাপ। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ময়েশ্চারাইজারের টিউব নিয়ে খানিকটা মুখে মেখে সাইবান শান্ত গলায় বলল,
“পোটলার সঙ্গে নিজেও একটু ঘুমিয়ে নিন। নাস্তা তৈরি হলে আমি ডেকে দেব।”
“তিতলিকে দেখতে যাচ্ছ?”
ইরাম উত্তরটা জানে। তবুও প্রশ্ন করল। সাইবানের মাঝে বিশেষ ভাবান্তর হলোনা।
“হুম।”
বলল সে। ইযানের খাওয়া শেষ হয়েছে। ইরাম ফিডার নাইটস্ট্যান্ডে রেখে ছেলের মুখ মোছাতে গিয়ে খেয়াল করল ঘুমে কাদা হয়ে গেছে বাচ্চাটা। দুধ খাওয়ার পরে এমনিতেও বেশ আরামদায়ক মুডে থাকে সন্তান তার। চোখেমুখে এমন তৃপ্তি যেন তাকে স্বর্গের অমৃত খাওয়ানো হয়েছে। ইরাম ক্ষীণ হাসল। ইযানকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে নিজেও পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। সত্যিই ক্লান্ত লাগছে তার। গতকাল থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও দুই চোখের পাতা এক করার সুযোগ হয়নি। চোখ বুঁজেছে কি বুঁজেনি এমন সময় নিজের কপালে ঠোঁটের ছোঁয়া টের পেল সে। সঙ্গে স্নেহময় কন্ঠস্বর,
“সুইট ড্রিমস মাই প্রেশিয়াস।”
ইরাম চোখ খুললনা। তার ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি লেগে রইল।
বিছানায় শুয়ে আছে তিতলি। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। কম্বল দিয়ে ঢাকা তার শরীর। সুগন্ধা মাথার কাছে বসে কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে অনুরাগ এসে জোর করে স্যুপ আর ওষুধ খাইয়ে গিয়েছে। চোখজোড়া জ্বলছে। তিতলি তাই ঘোলাটে দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে বারংবার পলক ঝাঁপটাচ্ছে। সুগন্ধা মেয়েটা দারুণ কাজের। মনে মনে যাই থাকুক না কেন, সবার সেবা যত্নে সে একশো পায়ে খাড়া।
“একটুখানি ঘুমানির চেষ্টা করেন।”
নরম গলায় বলল সুগন্ধা। তিতলি তা গায়ে মাখলনা। চুপ করে পড়ে রইল যেমনটা ছিল। তার রুমের চাপানো দরজাটা ধীরে খুলল, নিঃশব্দে। ভেতরে ঢুকল সাইবান। না তাকিয়েও তিতলি স্পষ্ট অনুভব করল। ওই অস্তিত্বের সুবাস তার অতীব পরিচিত। সাইবান হেঁটে এসে সুগন্ধার কাঁধে হাত রেখে হালকা কন্ঠে বলল,
“যা। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে নাস্তা রেডি কর। আমি আছি এখানে।”
সুগন্ধা দ্বিমত করলনা। আজকে তার কাজের কমতি নেই। তাই তর্ক ছাড়াই উঠে গেল। রুমের বাইরে আড়াল হলো। সাইবান আস্তে করে বিছানার পাশের চেয়ারে বসল। কিছু না বলে যত্নশীল হাতে জলপট্টি তুলে ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে ভালোমত নিংড়ে আবার তিতলির মাথায় দিল। পুরোটা সময় একবারের জন্যও রমণী তার দিকে ঘুরে তাকালনা।
প্রায় মিনিট দশেক নীরবে কাটল। সাইবান কিছুক্ষণ বাদে বাদে জলপট্টি বদলে দিল। কখনো বা তিতলির মাথায় হাত বোলালো। অথচ কোনো হেলদোল হলোনা মেয়েটার। যেমন ছিল, তেমন পরে রইল। টু শব্দ অবধি করলনা। অবশেষে সাইবান মুখ খুলল,
“রাগ করেছিস?”
উত্তরহীন তিতলি। একই ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আরেক দফায় জলপট্টি বদলে দিতে দিতে সাইবান বিনা দ্বিধায় বলল,
“আ’ম সরি।”
এতক্ষণে রমণীর মনোযোগ আকর্ষিত হলো। মাথা সামান্য ঘুরিয়ে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকাল তিতলি। ফর্সা গাল দুটো জ্বরের তাপে লাল হয়ে আছে। উত্তাপে উষ্ণতার রং ছুঁয়েছে ত্বক। শ্বাস প্রশ্বাস চলছে তুলনামূলক দ্রুতগতিতে। দাঁতে দাঁত পিষে তিতলি বসে যাওয়া গলায় রাগ ঝাড়ল,
“তোর সরি তোর পিছনে ভরে রাখ। আমার দরকার নেই। বেঈমান।”
সাইবান পাল্টা রাগ করলনা। বরং সুর পাল্টে উপদেশ দিল,
“আর কখনো ওসব গিলবি না। পরেরবার ধরতে পারলে জ্বর মানবনা আর। চুলের মুঠি ধরে পুকুরে চুবিয়ে আনব।”
শব্দ করে হাসল তিতলি, অবজ্ঞার হাসি।
“তার বেলায় চুম্মাচাটি আর আমার বেলায় চুলের মুঠি? ভালোই খেল দেখাচ্ছিস। রং পাল্টানোর খেলায় তোর সামনে গিরগিটিও ফেল, সাইবান।”
কত বছর বাদে প্রথমবারের মতন তিতলি ‘জিনি’- ডাকের বদলে সাইবানের নাম ধরে ডাকল? মনে পড়লনা। মনে করার চেষ্টাও সে করলনা। বরং শান্ত গলায় বলল,
“উনি আমার স্ত্রী, আমার ছেলের মা, আমার অর্ধাংশ।”
তিতলির শুষ্ক ঠোঁটে পরিহাসের হাসি ফুটল। রীতিমত ফিসফিস করে সে উচ্চারণ করল,
“সত্যি করে বল তো, আমি কি তোর কাছে আজীবন খেলনাই ছিলাম?”
সাইবান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেলল। দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার চোখজোড়া গভীর হয়ে উঠল। তিতলি ভাবল উত্তর আসবেনা। তাই মুখ ঘুরিয়ে চোখ বুঁজে বিষণ্নতা এবং বিরহবেদনা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল। অথচ কিছুক্ষণ বাদে উত্তর এলো,
“না। তুই আমার কাছে আজীবন বন্ধু ছিলি আর তাই থাকবি।”
ঝট করে ফিরে তাকাল তিতলি। চোখের জ্বলুনি বাড়ল। সাইবান তার দিকে চেয়ে নেই। দৃষ্টি অদূরে। পাত্রে রাখা বরফ ভাসা ঠান্ডা পানির মাঝে। সাইবান গভীরতম কন্ঠে বলে গেল,
“তুই একটা জায়গায় সঠিক তিতলি। হয়তবা আমার জীবনে উনি না আসলে একটা সময়ে আমি তোকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হতাম। অস্বীকার করার কিছু নেই। অন্যায় আমারও ছিল। আমি তোর অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিয়েছি। আমার দায়িত্ব পালন তুই অন্য অর্থে নিয়েছিস। আমার অ্যাটেনশন তুই অন্যভাবে দেখেছিস। মাঝে মাঝে বুঝতাম, মাঝে মাঝে বুঝতাম না। ভাবতাম, যেভাবে চলছে চলুক, পরেরটা পরে দেখা যাবে। এই গা ছাড়া ভাবটাই আমার সবচেয়ে বড় দোষ। অনুভূতির মূল্য দেয়া উচিত ছিল। গাঢ় হওয়ার আগেই আশার বাতি নেভানো দরকার ছিল। এক হাতে তালি বাজে না। আমরা দুজনেই সমান দোষে দোষী। শুধু মেয়ে বলে সব কর্মফল নিজের কাঁধে নিবি কেন? আমারও দায় আছে। সেই দায় থেকেই বলছি, পারলে কোনোদিন আমাকে মাফ করে দিস।”
তিতলি কম্বল চেপে ধরল দূর্বল আঙুলে। তিরতির করে কাঁপল তার ঠোঁট। কোনো শব্দ বেরোলনা। অভিব্যক্তিতে শুধু নিরেট বিস্ময় এবং বাঁধভাঙা আবেগ। সাইবান তার কপালের জলপট্টি বদলে আবার বলল,
“ব্যাপারটা তোর আর আমার, তাই বলছি, এর মধ্যে ওনাকে টানিস না। আমার ভুলের শাস্তি যদি দিতেই হয় তবে আমায় দে। আমি নিজের বুকে তীরের ফলা সইতে পারব, কিন্তু ওনার গায়ে পাঁপড়ির টোকাও সইবনা।”
সাইবান হাত সরিয়ে নেয়ার আগেই ক্ষীপ্র গতিতে তিতলি তার কব্জি পাকড়াও করল। মেয়েটার চোখে এবার জ্বলজ্বল করছে অশ্রু। শুধু গড়িয়ে পড়ছেনা অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে। তার হাতের বাঁধন ভীষণ দূর্বল, আঙুলে জ্বরের উত্তাল। সুগভীর নেত্রে সে তাকাল সাইবানের দৃষ্টিমাঝে, অত্যন্ত আবেগে ভেসে শুধাল,
“কোনোদিন ওই আসক্ত চোখে আমায় কেন দেখলিনা, জিনি?”
সাইবান চোখ সরালনা, তাকিয়ে রইল তিতলির টলটলে আবেগে, দীর্ঘক্ষণ। তার বুকের ভেতর কষ্ট হলো। কিন্ত সেটা অনুভূতির বিনিময় না দিতে পারার কষ্ট নয়। বন্ধুর জন্য বন্ধুর কষ্ট। অপরাধবোধের হালকা দহন। খুবই ধীরে আর সাবধানে নিজের কব্জি থেকে তিতলির হাত ছাড়িয়ে ফের কম্বলের ভেতর ঢুকিয়ে দিল সে। ক্ষীণ হাসি নিয়ে জানাল,
“এই আসক্তি আমার মূল্যবানের নামে বিলীন। তাতে দ্বিতীয় পক্ষের ভাগ নেই, আর না কোনোদিন হবে।”
নিজের আঙুলগুলো তিতলির চুলে হালকা করে বুলিয়ে আনল সাইবান। রমণী আবেশে এবং আঘাতে চোখ বুঁজে নিল। সেই বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে গড়াল অশ্রুফোঁটা। সাইবান দেখল, তবে মুছলনা, ঝরতে দিল।
“একপাক্ষিক অনুভূতির ভয়াল অভিশাপে নিজেকে খোঁয়াস না তিতলি। যখন আমার কেউ ছিলনা, তখন তুই ছিলি। সেই সুন্দর ভরসা হয়েই পাশে থেকে যাস। তোকে এখনো ক্ষমার আওতায় রেখেছি আমি। ভবিষ্যতে রাখতে পারব কিনা জানিনা। আমার কলিজায় হাত বাড়াস না। ধ্বংস ছাড়া আমার উপায় থাকবেনা। ভালো থাক তুই, নিজের মতন। এমন জগৎ বানা যেখানে তোকে কোনো কষ্ট ছুঁতে পারবেনা। কথা দিচ্ছি, সে জগতে বন্ধু হয়ে আমি তোর পাশে থাকব। এর বেশি চেয়ে নিজেকে পোঁড়াস না।”
আর বসলনা সাইবান। শেষ একবার তিতলির কপালে জলপট্টি দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। দূর্বল অবয়বের দিকে চেয়ে নরম কন্ঠে ব্যক্ত করল,
“ভালোবাসার বহু রূপ আছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম, নিজেকে ভালোবাসা। ফরগেট মি, অ্যান্ড চুজ ইওরসেল্ফ, তিতলি।”
এটুকুই। আর দাঁড়ালনা সাইবান। হেঁটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে গেল। সে চলে যেতেই শূন্যতা নেমে এলো রুমে। বদ্ধ চোখজোড়া খুলল তিতলি। এবার স্বাধীনভাবে ঝরতে লাগল তার অশ্রু। ভিজিয়ে তুলল সমস্ত গাল। কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করল সে,
“ফরগেট ইউ?”
বুকের ভেতর ভাঙচুর হলো ভীষণ। পরিতাপের ভগ্ন হাসিতে মোহর পড়ল হৃদয়ের দুয়ারে। ভেজা চোখে লাগল সূর্যের আলো। প্রজ্জ্বলিত দগদগে অনুভূতি ভাসলো মানসপটে।
“নিজেকে ভোলা এতই সহজ, জিনি?”
বিকালের মিষ্টি রোদ উঠান আলোকিত করে তুলেছে। গাছের পাতার ফাঁক বেয়ে সেই আলো খেলা করছে তৈলচিত্রের মতন। ঝাঁকে ঝাঁকে বকপাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে নীড়ের পানে। এমন সময়ে বাইরে পা রাখল সুগন্ধা। ভালোমত পবিত্র পরিপাটি হয়ে একটা ব্লক প্রিন্টের সালোয়ার কামিজ পড়েছে সে। বড় ওড়নাটা মাথায় তুলে ঘোমটা দেয়া। হাতে একটি পিতলের থালা। তাতে ফুল, ঘি এবং প্রদীপ। পায়ে পায়ে সে এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু এমন সময়ে পিছন থেকে ডাক ভেসে এলো,
“যাচ্ছ কোথায়?”
সুগন্ধা থামল। মাথা কাত করে তাকিয়ে দেখল বাড়ির পাশের জলপাই গাছের শাখায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে অনুরাগ। পরনে একটা নীল শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। মুখ টিপে হাসল সুগন্ধা,
“হনুমান!”
“কি বললে?”
অনুরাগ গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করতেই সুগন্ধা মাথা দুলিয়ে জানাল,
“যাইতেছি গোবিন্দ মন্দিরে। এইতো, রাস্তা ধইরা হেঁটে গেলে পূব দিকে হিন্দুপাড়া। ভাবলাম, আসছি যখন পূজা দিয়া আসি। যাইবেন নাকি?”
“চলো।”
গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে হাত ঝাড়ল অনুরাগ। সুগন্ধা অবাক হয়ে গেল। প্রস্তাবটা সে এমনিতেই দিয়েছিল, ভদ্রতার খাতিরে। অনুরাগ সত্যি সত্যি সঙ্গে যেতে চাইবে ভাবেনি। তবে মানা করার কোনো কারণ নেই। তাই একটি নিঃশ্বাস ফেলে সুগন্ধা বলল,
“চলেন।”
সুগন্ধার পিছু নিল অনুরাগ। সাইবানদের বাড়ি পেরিয়ে এদিকে আধপাকা ইটের রাস্তা। সেই রাস্তা পেরিয়ে পুরোপুরি কাঁচা মাটির রাস্তা। দুইপাশে সবজিক্ষেত। ক্ষেতের মাঝে মাঝে টিনশেডের বাড়ি নয়ত একতলা দালান। বাড়ির গৃহিণীরা বিকালে উঠোনে গল্প করতে বসেছে, হাস্যরসাত্মক আলোচনার মাঝে একে অপরের চুলে বিলি কাটছে। ক্ষেতের আইল ধরে ছেলে মেয়েরা ঘুড়ি নিয়ে দৌড়াচ্ছে। মফস্বলেও শহরের ছোঁয়া আছে। পথের ধারে নারিকেল গাছের তলায় বসে মোবাইল নিয়ে গেম খেলছে দুই কিশোর। তাদের দেখতে দেখতে পাশ কাটিয়ে মৃদু হাসল অনুরাগ। সামনে সুগন্ধা যাচ্ছে। ঘোমটার নিচে মেয়েটার লম্বা চুলের বিনুনি দোল খাচ্ছে পেন্ডুলামের মতন। অনুরাগ খানিকটা বিস্মিত হলো। আগে কখনো ঠিকমত তাকায়নি বলে খেয়াল করেনি, মেয়েটার চুল ভীষণ লম্বা। কোমর ছাড়িয়ে হাঁটুর কাছাকাছি পর্যন্ত যায়। কালো কুচকুচে চুল, বিনুনির মাত্রাও মোটাসোটা। এক হাতের মুঠো সমান তো হবেই! ক্ষণিকের জন্য চুলের মাঝেই কেমন নিজেকে হারিয়ে ফেলল অনুরাগ। পরক্ষণে আবার বিব্রত বোধ করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল,
“তা সাইবানদের বাড়িতে থাকা শুরু কি করে?”
কাহিনী অনুরাগের জানা নেই। কোনোদিন জানতে ইচ্ছা হয়নি। একদিন হুট করে কিশোরী মেয়েটাকে সাইবানদের বাড়িতে দেখেছিল সে। জিজ্ঞেস করতে বন্ধু বলেছিল, গ্রামের আত্মীয়। কোনোদিন সে ওই বাড়ির লোকদের মুখে সুগন্ধার জন্য ‘কাজের লোক’ সম্বোধনটি শোনেনি। এর আগে বিশেষ আগ্রহও হয়নি জানার। এখনো অবশ্য হচ্ছে না। তবে চুপ থাকলেই হেলতে দুলতে থাকা বিনুনির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে বিধায় কথা ঘোরানো দরকার।
“আমার বাবায় এই বাড়িতে কেয়ারটেকার ছিল। যে বাড়িতে এখন আমরা থাকতেসি আরকি, শহরেরটা না আবার।”
অবশেষে সুগন্ধার জবাব এলো। অনুরাগ মাথা দুলিয়ে এবার দূরত্ব কাটিয়ে তার পাশে চলে এলো। বিনুনিটা বেশি জ্বালাচ্ছে! সুগন্ধা অবশ্য এটুকু জবাব দিয়েই ক্ষান্ত নেই, হাঁটতে হাঁটতে বলে যাচ্ছে,
“আম্মাজান বলছে আমার ঠাকুরদা আর ভাইজানের দাদায় বহুত ভালো বন্ধু ছিল। আমাদের ছোট ব্যবসায়িক পরিবার আছিল, ওনার দাদার মাছ – ধানের ব্যবসার হিসাব আর কাজ করত আমার ঠাকুরদা।”
“ওহ। তাই নাকি? সাইবান কখনো বলেনি।”
“ঢোল পিটানোর মতন কিছু তো না। ঠাকুরদার দুইটা ছেলে, একটা আমার বাবায়, আরেকটা বজ্জাত।”
চাচার নাম পর্যন্ত মুখে নিলনা সুগন্ধা। অনুরাগের কেন যেন হাসি পেল। তবে সেটা সে চেপে গেল,
“বজ্জাত কেন?”
“হের জন্যই তো সব দুর্দশা! জুয়া খেলতে খেলতে বাপরে পথে বসাইয়া দিল। নেহায়েত পোলার প্রতি মহৎ টান ছিল ঠাকুরদার, জমি জমা যা ছিল সব গেল। পোলা খালি থানা পুলিশ করে, ঢুকে আর বাইর হয়। সেই চিন্তায় চিন্তায় ঠাকুরদা পড়ল বিছানায়। আমার বাবায় একলা আর কত দিক দেখব? তাও অনেক চেষ্টা করছিল, কিন্তু শেষমেশ ঠাকুরদারে বাঁচান যায়নাই। কিডনি নষ্ট হইয়া গেছিল। ওই আমলে তো চিকিৎসায় আরও খরচা ছিল। আমার বাবায় করেনাই এমন কিছু বাকি ছিলনা। যা ধন সম্পদ একটু তলায় বাকি ছিল, তাও ঠাকুরদার জন্য উৎসর্গ হইল। ভাইজানের দাদায়ও অনেক সাহায্য করছিল আমগো, তয় ঠাকুর যারে পছন্দ করে তারে ঠেকানোর সাধ্য কার?”
সুগন্ধা কথাগুলো একদম স্বাভাবিকভাবে বলছে। তার চেহারায় কোনো বিষণ্নতার ছাপ দেখা গেলনা। আসলেই কোনো দুঃখ নেই নাকি অনুভূতি লোকাতে পারদর্শী মেয়েটা? অনুরাগ বুঝতে পারলনা।
“তোমার চাচার কি হলো?”
সুগন্ধা নাক সিঁটকাল,
“খবরদার! বজ্জাত কন!”
“আচ্ছা। বজ্জাতটার কি হলো?”
“জানিনা। শুনছি, ঠাকুরদা বিছানায় পড়তেই একদিন কোথায় জানি গায়েব হইয়া গেছে। থানা পুলিশ কইরাও আর খুঁইজা পাওয়া যায়নাই। ভালোই হইছে, ওই বজ্জাতরে দেখলে আমি কিলামু!”
“চিনবে কীভাবে? তুমি তাকে দেখেছ?”
“ছবিতে দেখছি। এক্কেবারে হাড় বজ্জাতের মতোই দেখতে!”
অনুরাগ মুখ ঘুরিয়ে কাঁধে ঠোঁট গুঁজে নিঃশব্দে হাসতে বাধ্য হলো। এমন দুঃখের কাহিনী শুনে সে হাসছে এই লজ্জায় তার শিক্ষা দীক্ষা নেতিয়ে পড়ল বুঝি। সুগন্ধার অবশ্য হেলদোল নেই। ঠোঁট বাঁকিয়ে পাল্টা হাসল সেও।
“খুব মজায় আছেন মনে হয়।”
“না না…অ্যাহেম! সরি!”
“সরি কওয়ার কিছু নাই। ঐটা আমার পূর্ব পুরুষগো কাহিনী। আমার তেমন গায়ে লাগে না।”
“তাহলে তোমার কাহিনীটা কি?”
“কি আবার?”
কাঁচা রাস্তা ঘুরে একটি লাউক্ষেতের সরু আইলে প্রবেশ করে লাফিয়ে এগোল সুগন্ধা। অনুরাগ পিছনে পিছনে বুক ভরে বিশুদ্ধ প্রকৃতির বাতাস টানল। নিজের কথার পিঠে সুগন্ধা জানাল,
“ঠাকুরদা চইলা যাওয়ার পর বাবায় খুব ভাইঙ্গা পড়ল। পড়ালেখাটাও খুব বেশি আগাইতে পারেনাই। তহন ভাইজানের দাদায়ই তারে আগলায় নিল। ঠাকুরদার কাজগুলা বাবায় করতে লাগল। বছর কাটল। এরপর একটা সময় দাদায়ও পরপারে গেলেন গা। বাড়ির আমেজ কইমা গেল। সব ভাইবোনেরা শহরে গেল নইলে বিদেশ। ফাঁকা বাড়িতে বাবায় থাইকা গেল দায়িত্ব নিয়া। এরপর একটা সময় বাবায়ও….”
সুগন্ধা বাকিটুকু আর বললনা। প্রথমবারের মতন তার চেহারায় মলিনতা দেখতে পেল অনুরাগ। তাতেই মনের ভেতরের সব প্রফুল্লতা গায়েব হলো। ভর করল তিক্ততা। সুগন্ধার মতন মেয়ে অবশ্য বিলাপে সময় কাটায়না। পরক্ষণে বিরাট হাসি দিয়ে বলল,
“আম্মাজান আর আব্বাজানে আইসা এরপর আমারে ঢাকা শহরে নিয়া গেল। পড়তে দিল, খাইতে দিল, থাকতে দিল। আপনে হয়ত বিশ্বাস করবেন না, কেউ আমারে কোনোদিন কাম করতে বলেনাই। আমি নিজেই করতাম টুকটাক, এরপর নিজেই বলছি কাম করতে না দিলে ওনাদের বাড়িতে থাকমুনা।”
অদম্য ইচ্ছাশক্তি। অনুরাগ স্নিগ্ধ চোখে তাকাল মেয়েটার দিকে। বিকালের মিষ্টি রোদ তার চোখেমুখে ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটাকে মায়াবী দেখাচ্ছে, সদ্য প্রস্ফুটিত কলির মতন।
“সবই শুনলাম। তবে তোমার মা? উনি কি….”
“মন্দির আইসা পড়ছে, অনুরাগ দা।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অনুরাগকে থামিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল সুগন্ধা। অনুরাগ থমকাল। মেয়েটা কি এইমাত্র তাকে এড়িয়ে গেল? বড্ড বেশি ব্যক্তিগত হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। বিধায় অনুরাগ আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করলনা। এগোল।
পাশে পুকুর আর সামনে মন্দির। খুব বেশি বড় নয়, মাঝারি আকৃতির। স্থাপত্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব পুরাতন আমলের। প্রবেশপথ দিয়ে অভ্যন্তরের রাঁধা কৃষ্ণের প্রতিমা চোখে পড়ছে। পুরোহিত মশাই বসে পূজো দিচ্ছেন। ঘোমটা তোলা এক মহিলা শাঁক বাজাচ্ছেন। সেই মিষ্টি ধ্বনিতে ছেয়ে গেছে চারপাশ। বেশ অনেকেরই আনাগোনা আশেপাশে। সংখ্যায় পুরুষের থেকে মহিলা বেশি। ভক্তিভরে প্রার্থনা করছে তারা। মন্দিরের সামনের উঠোনে তুলশীস্তম্ভ। তাতে জল অর্পণ করছে গৃহিণীরা। দৃশ্যগুলো এতটাই মনোমুগ্ধকর যে অনুরাগ চোখ ফেরাতে পারলনা। সে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকল। এগিয়ে গেল সুগন্ধা। তুলশী প্রণাম করে সে দুহাত তুলে চোখ বুঁজে প্রার্থনায় মত্ত হলো। অনুরাগ বুকে দুবাহু বেঁধে ঠোঁটে মোলায়েম হাসি নিয়ে চেয়ে রইল। কড়া আগরবাতি আর ধূপের ঘ্রাণ বাতাসকে মোহনীয় করে তুলছে ক্রমশ। চোখ বুঁজল সে, প্রাণভরে শ্বাস টানল।
“কই? আসেন?”
সুগন্ধার ডাকে সম্মোহন কাটল অনুরাগের। চোখ খুলে দেখল মেয়েটা জুতো খুলে মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। অনুরাগ দেরি করলনা। সিঁড়ির কাছে গিয়ে জুতো খুলতে খুলতে বলল,
“চুরি হবে না?”
“বরিশাইল্লারা খ্যাতার গাট্টি হইতে পারে, চোরের গুষ্টি না! চোর ছ্যাঁচ্চড় সব শহরে গাট্টি গাট্টি!”
অনুরাগ না পারতে খিলখিল করে হাসল। মুখ তুলে সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকা সুগন্ধাকে দেখল। মেয়েটার মাঝে একটা সহজাত ভঙ্গি আছে। যেকোন মানুষকে হাসাতে পারদর্শী। এই নিয়ে বুকে একটু দ্বিধা হলো তার। কারণ হাসিখুশি মানুষগুলোই জগতে সবথেকে একা হয়। উদাহরণ তার নিজের বন্ধুই।
সিঁড়িতে পা রাখতেই অনুরাগ দেখল সিঁড়ি ভেজা। খুব সম্ভবত ধোঁয়ামোছা করা হয়েছিল শীঘ্রই। তাকে মেপে মেপে পা চালাতে দেখে কুটিল হাসল সুগন্ধা।
“দেইখেন, বন্ধুর লাহান উষ্টা খাইয়েন না আবার!”
“আমি উষ্টা খাইনাআআ….!”
অবশ্যই! ভাগ্যের কাজ তো এটাই! যেখানে সেখানে হড়কে ফেলা! হোঁচট খেল অনুরাগ। মন্দিরের সিঁড়িতে পা পিছলে পড়তে নিল। কিন্তু সুগন্ধার ক্ষীপ্র হাত তাকে এই দফায় বাঁচিয়ে নিল। কয়েক সিঁড়ি লাফিয়ে নেমে অনুরাগের কব্জি চেপে ধরে ফেলল মেয়েটি। জমে গেল অনুরাগ। তার শরীরটা বেশ খানিক হেলে গিয়েছে পিছনে। চুলগুলো উড়ে কপালে এসে পড়ল দমকা হাওয়ায়। সেই হাওয়া সুগন্ধার মাথায় তোলা ঘোমটাকেও ফেলে দিল। তৈল চকচকে কালো কুচবরণ চুল উন্মুক্ত হলো। ছড়িয়ে পড়ল গালে, নদীর স্রোতের মতন। অনুরাগ প্রসারিত নয়নে স্থির চেয়ে রইল। সুগন্ধার আঙুলগুলো আরেকটু শক্ত হয়ে চেপে বসল তার হাতে।
আমার আলাদিন পর্ব ৫০
“থ…থ্যাংকস।”
অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল অনুরাগ। মেয়েটির চুলের বরণ তাকে লজ্জায় ফেলল। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হলো সে। তা দেখে তীর্যক হেসে হুট করে সুগন্ধা শুদ্ধ ভাষায় বলে উঠল,
“মনমত উষ্টা খান, বাঁচিয়ে নেয়ার জন্য নাহয় আমি এভাবে প্রতিবার হাত বাড়িয়ে দেব?”
