আমার আলাদিন পর্ব ৪৯
জাবিন ফোরকান
ডাঃ সাইবান আলাদিন।
স্বপ্নের শেষ।
ডি জে আলাদিন।
শখের শুরু।
তিরতির করে কাঁপছে গাছের পাতা। শনশনে হাওয়া গায়ে ঝাঁপটা দিয়ে বোঝাচ্ছে বৃষ্টি আসন্ন। কালো মেঘের আস্তরণে ছেয়ে গেছে অসীম গগন। চাঁদ – তারা সেথায় বিলীন। সাইবান তাকিয়ে আছে অদূর দিগন্তে। যেখানে খুব ক্ষীণ আলোর রেখার প্রস্ফুটন। ধেয়ে আসছে সকাল। নতুন একটি দিনের সূচনা। বুকটা ভীষণ হালকা লাগছে এখন। যেন বহুদিন যাবৎ চেপে রাখা দুঃখের পাহাড় ধ্বসে পড়েছে। বারান্দার প্রবেশপথে দরজার সাথে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ইরাম। দৃষ্টি শূণ্য। চেয়ে আছে সাইবানের অবয়বে। যে এক জাগ্রত ধ্রুবতারা।
“অসভ্য ছেলে, মাস্তান, বড়লোকের বিগড়ানো বাচ্চা, সারাদিন নেচেকুদে বেড়ায়, মানুষের মনোরঞ্জন করে, নর্তকগিরির পয়সা, বেলাজ, বেহায়া।”
সাইবানের কন্ঠস্বর ধ্বনিত হল, বড্ড নরম তা,
“মানুষ এখনো আমাকে হাজার নামে ডাকে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এখন আর আগের মতন গায়ে লাগে না। যতদিন মানুষের কথা গায়ে লাগিয়েছিলাম, ততদিন কষ্টে ছিলাম। এখন কোনকিছুতে কিছু যায় আসেনা। নিজের মতন বাঁচি আমি, যখন যা ইচ্ছা হয় তাই করি, মুক্ত পাখির মতন ডানা ঝাপটাই, আনন্দে বাঁচি। ব্যাস, এইতো চলছে বেশ।”
অতঃপর ঘটল অতর্কিত ঘটনাটি। সাইবান সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই দরজা ছেড়ে ইরাম ছুটে এলো তার কাছে। লতানো দুই বাহু মেলে জড়িয়ে ধরল তাকে। নিজেকে সাইবান আবিষ্কার করল অর্ধাঙ্গিনীর বুকের মাঝে। বড্ড উষ্ণ তা, আদরে টইটুম্বুর। সহ্য হলনা তীব্র অনুভূতিটুকু। শক্তিশালী দুই বাহু আঁকড়ে ধরল ইরামকে। তার কাঁধে মাথা গুঁজে দিল সাইবান। নিজের কাঁধে উষ্ণ তরলের উপস্থিতি টের পেল রমণী। কাঁপা কাঁপা গলায় সাইবান ফিসফিস করল,
“সেদিন আমায় কেন তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, ইরাম আপু? যদি একবার আমার কথাটা শুনতেন, যদি একটাবার আমার মাথায় হাত রেখে বলতেন সব ঠিক হয়ে যাবে, হয়ত আমি বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে নিতাম। রাগ হয়েছিল আমার, ভীষণ রাগ। চেয়েছিলাম আপনিও একদিন একাকীত্বের স্বাদ পান। অথচ পারিনি, কোনোদিন পারিনি আপনাকে একটুখানি ঘৃণা করতে।”
ইরাম কিছু বললনা। সাইবানকে ধরে রাখল নিজের মাঝে। যেন বুকের মাঝে সে আগলে রেখেছে জগৎটাকে। সাইবান ফোঁপাতে ফোঁপাতে হাজার অভিযোগের খাতা খুলে বসল,
“চেয়েছিলাম আপনাকে কষ্ট দিতে। মনের কষ্ট, যত্নের কষ্ট, একাকীত্বের কষ্ট। কিন্ত আপনি আমার সাথে এমন নাইনসাফি কেন করলেন? নিজের অংশকে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি একটা দুধের বাচ্চার উপর কীভাবে জুলুম করতাম? আপনাকে অর্ধাঙ্গিনীর রূপে দেখার পরও কীভাবে অভিমান চেপে বসে থাকতাম? আপনি খুব স্বার্থপর ইরাম আপু, খুব স্বার্থপর! আমার জীবনে দ্বিতীয়বার এসে আপনি সবকিছু ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছেন। আই হেইট ইউ, আই হেইট ইউ সো মাচ!”
দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য বুঝি কারো মাঝেই আর অবশিষ্ট নেই। বারান্দার মেঝেতেই বসে পড়ল দুজন। তবুও আলিঙ্গন ছাড়লনা। পোষা প্রাণী যেমন করে মালিকের কোলে আদর খোঁজে, তেমন করেই সাইবান ইরামের সঙ্গে লেপ্টে রইল। মুখে অভিযোগের ফুলঝুড়ি, অথচ স্বভাবে বৈপরীত্য। ইরাম তাই এত কষ্টের মাঝেও না হেসে পারলনা। টলটলে চোখের নিচে থাকা ঠোঁটজোড়া তার সূক্ষ্ম হাসির রেখায় আবর্তিত হলো,
“একবার বলো ঘৃণা করতে পারোনি, আবার বলো হেইট ইউ। সত্যি করে বলো তো, আলাদিন। আমি তোমার কে?”
এই প্রশ্নের উত্তর এলোনা। ইরাম শুধু অনুভব করল, তার কোমরে সাইবানের বাহুজোড়া দ্বিগুণ শক্তিতে চেপে বসেছে। ব্যথা হলো খানিক, কিন্তু ইরাম বাঁধা দিলনা। সাইবানের মাথাটা আলতো করে ধরল সে, যেন প্রজাপতি ধরেছে, হালকা চাপলেই পিষ্ট হয়ে যাবে। গালে গাল মিশিয়ে উষ্ণতা বিলিয়ে ইরাম বলল,
“সময় থাকতে আমরা আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোকে গুরুত্ব দেই না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায়না, কথাটা শুধু প্রবাদ নয়, বাস্তব। আমিও বুঝতে পারিনি। স্বার্থপরের মতন তোমায় ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। যদি একবার তোমার কথা শুনতাম, যদি একবার আমার বুক উজাড় করে তোমায় কাঁদতে দিতাম, তবে হয়ত তোমার গল্পটা ভিন্ন হতো, সঙ্গে আমারও।”
এবার ইরামের অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে নামল টপটপ করে, রীতিমত ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল সে,
“মাফ চাওয়ার মুখ আমার নেই। তবুও বেহায়া হয়ে বলছি, মাফ করে দেয়া যায় কি আমার আলাদিন?”
দাঁতে দাঁত পিষে ফেলল সাইবান, আক্রোশ ফুটল চেহারায়, ভ্রু কুঁচকে গেল। ইরামকে নিজের মাঝে রীতিমত পিষ্টন করে ফেলল সে। তার শরীরের ভয়ানক শক্তির জোরে ইরাম সোজা হয়ে বসে থাকতে পারলনা, উল্টে পড়ে গেল মেঝেতে। ওই আলিঙ্গনরত অবস্থায়ই তার উপরে শুয়ে তাকে জাপটে ধরে রাখল সাইবান। ভোররাতের শীতল বাতাস গায়ে ঝাঁপটা দিলেও স্বামীর শরীরী ভারে তপ্ত উষ্ণতা ছাড়া কিছুই টের পেলনা ইরাম। তার রীতিমত নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, তবুও কোনো শব্দ করলনা। সাইবান তার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল,
“মাফ করবনা আপনাকে। কোনোদিন মাফ করবনা। এই জঘণ্য অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আপনাকে সারাটা জীবন আমার বউ হয়ে থাকার দন্ড দেয়া হলো। নির্বাসিত হোন আপনি আমার মাঝে। ঘুচে যাক আপনার সব স্বার্থপরতা।”
ইরাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারলনা নিজেকে এবার। ভারী অপরাধবোধ এবং তীব্র অনুভূতির জোয়ার তার চোখের অশ্রু হয়ে ঝরল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সেও,
“কেন এত মধুর শাস্তি? কেন বারবার আঘাতের পরেও আত্মনিবেদন? কেন এই বেহায়াপনা? কে আমি তোমার?”
“জানিনা, জানিনা। আপনি আমার কে আমি জানিনা। আমি শুধু এটুকু জানি, আপনি আমার শান্তি।”
সাইবানের কন্ঠস্বর অতি আবেগে রুক্ষ হয়ে উঠেছে। ইরামকে সে পারছেনা শুধু নিজের শরীরের সঙ্গে প্লাস্টার করে মিশিয়ে ফেলতে। ঠোঁট কাঁপল তার, চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো অনুভবে। সত্যিই, ইরাম কে তার?
কেউ না। আবার সবকিছু।
কমফোর্ট জোন বলে একটা থিওরি ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত আছে। এর অর্থ, এমন একজন মানুষ, যাকে নিজের আপনের চাইতেও আপন মনে হয়। মা, বাবা, ভাই, বোন, পরিবারের সঙ্গেও যা বলা যায় না, তা অকপটে সেই মানুষটার সামনে বলা যায়। কারণ, মানুষটা আমাদের বুঝতে পারে। মুখ ফুটে বলার আগেই অন্তরের দ্বন্দ্ব ধরতে পারে। বিনা বিচারে পাশে থাকতে পারে। অন্তরে প্রশান্তি দিতে পারে। তার কাছেই আমরা সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি। রক্তের সম্পর্কও মাঝে মাঝে যে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই মানুষটা আমাদের সেটাই দেয়। আত্মার চাহিদা নিবারণ করে।
ছোটবেলা থেকে সাইবানের কাছে ইরাম ছিল তেমন কিছুই। হাসপাতালে ব্যস্ত ডাক্তার মা, ব্যবসায় ব্যস্ত বাবা, সারাক্ষণ ইদুর বিড়ালের মতন লেগে থাকা বোন। এই সম্পর্কগুলো সাইবানের যে চাহিদা মেটাতে পারতনা, সেটা মেটাত ইরাম। ইরামের দুয়ার থেকে ওই একবার ব্যাতিত কখনো খালি হাতে ফেরেনি সাইবান। ইরামের কাছে সবসময় তার জন্য দু দন্ড সময় ছিল। নিজের ভাইদের খাওয়ানোর সময় সযত্নে সাইবানের মুখে গ্রাস তুলে দিত সে। তার সারাদিনের স্কুল পাগলামির কথা শুনত। পড়াশোনায় টুকটাক সাহায্য করত। স্কুলে প্রথম একটা সুন্দরী মেয়েকে দেখে ক্রাশ খাওয়ার কথাটা পর্যন্ত সাইবান কাউকে বলতে না পেরে ইরামের কাছে বলেছে। বিনিময়ে মুচকি হেসে তার লাল টুকটুকে গাল টেনে রমণী বলেছিল,
“আচ্ছা, আরেকটু বড় হও, যেদিন আমার কাঁধসমান হবে সেদিন ওই মেয়ের বাড়ি প্রস্তাব নিয়ে যাব, কেমন?”
অতঃপর একদিন হুট করে সাইবানের পছন্দ বদলে গেল। নাহ, স্কুলের মেয়েটাকে আর ভালো লাগতনা। তার ইরাম আপুর মতন বোঝদার নয়। সেদিনও ইরামের কোলে মাথা রেখে পা দোলাতে দোলাতে সে বলেছিল,
“আপু? ওই মেয়ের বাড়ি প্রস্তাব পাঠাতে হবে না।”
“কেন? ভালো লাগা বদলে গিয়েছে?”
“হু।”
“এখন তবে কাকে ভালো লাগে?”
“আপনাকে।”
ইরাম অবাক হয়ে মুচকি হেসেছিল।
“আমার মাঝে ভালো লাগার কিছু আছে নাকি?”
“অনেক কিছু আছে। এইযে আপনি আমার সব কথা শোনেন, আমাকে আদর করেন, আমাকে ভালোবাসেন।”
“আপনি তোমাকে ভালোবাসি না আলাদিন।”
ইরামের দুষ্টু কথায় সেদিন ঠোঁট উল্টে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলেছিল সাইবান। পরে ইরামই আবার তাকে বুকে টেনে শান্তনা দিয়েছিল।
“আচ্ছা আচ্ছা, সরি বাবা, আমি আমার আলাদিনটাকে খুব ভালোবাসি। ঠিক আছে এবার?”
“জি। ইরাম আপু, আপনি কিন্ত শুধু আমার বলে দিলাম।”
কথাটা সাইবান শিশু মনের নিষ্পাপ আবদার হিসাবেই বলেছিল, ইরামও সেই হিসাবেই নিয়েছিল। কিন্তু আজ যদি বিষদভাবে ভাবা যায়, তবে সাইবান উত্তর পেতে বেগ পোহায়। সত্যিই তো, ইরাম তার কাছে কি ছিল?
ইরাম তার কাছে কি ছিল সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই ইরামের বাবা কিবরিয়া সাহেব ইন্তেকাল করলেন। আর শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলো সব মুখ থুবড়ে পড়ল। বছর পেরোল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ল, সৃষ্টি হলো দ্বৈরথ, দূরত্ব। সেসবের ভিড়ে হারিয়ে গেল দুটো নিষ্পাপ সত্তার অটুট বন্ধন।
ইরামের শরীরে জড়িয়ে থাকা গাঢ় সুবাস সাইবানকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। চোখ বুঁজে গভীরভাবে প্রশ্বাস টানল সে, কাঁপা ঠোঁট ছুঁয়ে গেল অর্ধাঙ্গিনীর কানের নিচের ত্বক। নিগূঢ় কন্ঠে সে জানাল,
“আপনার বিয়ের দিন আমার কেমন লেগেছিল, জানেন? মনে হচ্ছিল, আমার আত্মার অর্ধেক অংশ কেউ জোর করে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এতই তাড়াহুড়ো ছিল আপনার? একটুখানি আশেপাশে তাকিয়ে দেখা যেতনা? আমার আত্মাটাকে ফিরিয়ে দেয়া যেতনা? আরেকটু অপেক্ষা করা যেতনা?”
ইরাম দুহাত স্বামীর পিঠে ঠেকাল। নরম গলায় উত্তর করল,
“ত্রিশে পড়ে গিয়েছিলাম যে, কীভাবে অপেক্ষা করতাম? সমাজ তো কথার বাণেই ছিঁড়ে খাচ্ছিল।”
“ছোটবেলায় বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে পড়েছি, মানুষের কল্যাণের জন্যই নাকি সমাজের সৃষ্টি। তবে এই সমাজ আমাদের সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার ছিনিয়ে নেয় কেন? বইয়ে কি ভুল শেখানো হয়েছিল?”
ইরাম উত্তরহীন। কিছু প্রশ্নের জবাব হয়না। সাইবান মুখ তুলল। হাতের উল্টোপিঠে নিজের অশ্রু মুছে নিয়ে ইরামের দিকে হাত বাড়াল। অর্ধাঙ্গিনীর অশ্রু বৃদ্ধাঙ্গুলে মুছল সযত্নে।
“খুব সুখে ছিলেন? ভালোবাসতেন তাকে?”
তাকে– বলতে সাইবান যে অরণ্যকে বুঝিয়েছে ইরাম উপলব্ধি করতে পারল। মলিন এক হাসি ফুটল তার অধরে।
“ভালোবাসা কাকে বলে, আলাদিন?”
“আপনি জানেন না?”
“উঁহু। যেটাকে ভালোবাসা ভাবতাম, আজ ফিরে তাকালে মনে হয় সেটা স্রেফ সরলতা। তুমি যদি জানো ভালোবাসা কি, তবে বলে দাও। আমিও একটু বুঝতে পারি।”
“আমিও জানিনা।”
ঝুঁকে এলো সাইবান, ইরামের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল তার তপ্ত শ্বাস। ফিসফিস করে সে বলল,
“আমি জানিনা আপনাকে আমি ভালোবাসি কিনা। তবে আমি এটুকু জানি, আমার শুধু আপনাকে চাই। আমার অর্ধেক আত্মা ফিরে এসেছে, আমার অন্তরের প্রশান্তি ফিরে এসেছে আমার কাছে। আমি আল্লাহর এইটুকু রহমত হারাতে চাইনা।”
ইরামের বুক কাঁপল। তার ধারণা নেই, এর থেকে আরও গভীরভাবে নিজেকে সমর্পণ করা সম্ভব কিনা। কি হলো তার বলতে পারবেনা সে। অজান্তেই চোখজোড়া গিয়ে আবদ্ধ হলো সাইবানের গলার দিকে। যেখানে আর কোনো দাগ অবশিষ্ট নেই। অথচ একটা সময় ছিল, তার দগদগে অতীতের সাক্ষী হয়ে। দাগটি কল্পনা করেই রমণীর চোখজোড়া অশ্রুতে ভিজে এলো আবার। মাথাটা একটুখানি তুলে সেই সুস্থ ত্বকে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল ইরাম। ধীরে ধীরে অসংখ্য ছোট ছোট চুমু খেল। সঙ্গে বারংবার ফিসফিসিয়ে বলল,
“সরি। সরি। সরি। সরি মাই আলাদিন। আপুকে মাফ করে দাও?”
হুট করে ইরামের হাতের কব্জি চেপে ধরল সাইবান। নেত্র তার সুগভীর হয়ে উঠেছে, জ্বলজ্বলে আবেগ তাতে।
“ইউ আর মাই প্রেশিয়াস, অনলি মাইন।”
ইরামের কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে সে বিড়বিড় করল,
“আলাদিন’স প্রেশিয়াস।”
অতঃপর কি হলো তা উপলব্ধি হলোনা, শুধু অনুভূত হলো। নিজের ঠোঁটের মাঝে উষ্ণ, নরম অপর ঠোঁটের অস্তিত্ব টের পেল ইরাম। চোখ ভারী হয়ে বুঁজে এলো তার। হাতজোড়া প্রশস্ত, পুরুষালী পিঠে আঁকড়ে বসল। জগৎটা নিভে গেল। শুধু রয়ে গেল সে আর তার আলাদিন।
পুলিশের কর্মকর্তা কথা শেষ করে মোবাইল ফিরিয়ে দিলেন মিসিরের কাছে। তার পিছনে পুলিশের জ্বীপে তোলা হচ্ছে মাতাল ছেলে দুটোকে। তিনি সম্মানসূচক হেসে বললেন,
“আহমদ সাহেব আপনার শ্বশুর লাগে এটা আগে বলবেন না?”
“কেন? সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশের কাছে সেবার অভাব?”
ফোন ফিরিয়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে বলল মিসির। পুলিশ কর্মকর্তাকে তাতে খানিকটা লজ্জিত মনে হলো,
“সেটা বলতে চাইনি। অ্যাহেম! কিছু চিন্তা করবেন না, আমরা বিষয়টা দেখছি। যেহেতু নাবালক, কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর সম্ভাবনাটাই বেশি।”
“হুম। ব্যবস্থা করুন।”
পুলিশ কর্মকর্তা সালাম বিনিময় করে চলে গেল। জ্বীপটা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে বিদায় নিল। মিসির একটি নিঃশ্বাস ফেলে ভেতরের প্যাসেঞ্জার রুমে এলো। এক কোণায় একটি চেয়ারে লাগেজ নিয়ে চুপচাপ বসে আছে সারিকা। মেয়েটার মুখ কেমন চুপসানো। চুলগুলো হালকা এলোমেলো হয়ে পড়েছে। অভিব্যক্তি ভাবলেশহীন। মিসির প্রথমে হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ৪ টা বেজে এসেছে প্রায়। অতঃপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। প্রথমটায় কিছু না বলে সারিকার পাশের সিটে বসে পড়ল। যে বাস ধরবে ভেবেছিল, সেই বাস ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। ঝামেলার কারণে ধরা সম্ভব হয়নি। কাউন্টার থেকে বলা হয়েছে পরের বাসটা ৭:০০ টায় ছাড়বে। অনেকটা সময়। মিসির খানিকক্ষণ চুপ করে শেষে বলল,
“চলো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। ফিরে আবার আমাকে ৭ টার বাস ধরতে হবে।”
সারিকা স্বামীর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল,
“দুটো টিকিট কাটো। আমি যাব তোমার সাথে।”
মিসির কপালে আঙুল চালালো। এই মেয়ে দেখছি নাছোড়বান্দা হয়ে গিয়েছে আজ। ইরাম আর অনুরাগ দুজন পিছন পিছন এসেছিল। রাত বেশি বেড়ে যাওয়ার আগেই তাদের আবার ফেরত পাঠিয়েছে মিসির। সারিকাকে পাঠাতে পারেনি। পুলিশও আসছিল। সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি কয়েক ঘণ্টা কেটেছে তার। ক্লান্ত শরীরে আর তর্ক করতে ইচ্ছা হচ্ছেনা। সিটে এলিয়ে বসে রইল সে। মাথাটা ঠেকাল পিছনের থামে। চোখ বুঁজে রইল নিঃশব্দে। সারিকাও বিশেষ কিছু তাকে বললনা। ওই একই ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মিসির আপনা থেকেই উঠে গেল। সারিকা আড়চোখে দেখল কাউন্টারের কাছে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কি যেন বলল সে। এরপরই ফিরে এলো। একজন কর্মী এসে তাদের লাগেজগুলো নিয়ে একটা নিরাপদ রুমে গিয়ে রেখে এলো। মিসির এক হাত বাড়িয়ে সারিকার কব্জি ধরে তাকে টেনে তুলল।
“চলো।”
“কো…কোথায়?”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সারিকা। তবে উত্তর এলোনা। অগত্যা স্বামীর হাত ধরে বাইরে এলো সে। চারপাশে খুব ক্ষীণভাবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দোকানপাট বন্ধ। মানুষ নেই বললেই চলে। হেঁটে হেঁটে তারা দুজন বেশ খানিকটা সামনে যেতেই একটা খোলা দোকান চোখে পড়ল। টিমটিমে হলদে বাল্ব জ্বলছে। কয়েক সারি বেঞ্চ আর টেবিল পাতা। সেখানে হাতে গোণা চার পাঁচজনকে চোখে পড়ছে। অন্যান্য বাসের যাত্রী। মিসির সারিকাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে একটা টেবিল দখল করে বসল। বছর দশেকের উদাম শরীরের একটা ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কি খাইবেন স্যার?”
“ভাত আছে?”
মিসিরের প্রশ্নে ছেলেটা মাথা দোলাল,
“হ, এইমাত্র নতুন ব্যাচ রান্না হইসে।”
“ঠিক আছে। দু প্লেট ভাত, ডিমভাজি আর আলুর ভর্তা দিও।”
“মুরগীর গোশত আছে, বাসী না, রাইতের রান্না করা।”
“এক বাটি দিও তাহলে। সম্ভব হলে লেবু আর শুকনো মরিচ দিও দুটো।”
“আইচ্ছা।”
অর্ডার নিয়ে হেলেদুলে ছেলেটা চলে গেল। সারিকা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল। সেই দুপুরে খাওয়া হয়েছে। জন্মদিন উপলক্ষ্যে রান্নাবান্না হয়েছিল। এরপর এক দানাও পেটে পড়েনি। মিসির খাবার অর্ডার করার পরেই টের পেল সে, প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিল।
খাবার এসে গেল কিছুক্ষণ পরেই। বাস কাউন্টারের কাছাকাছি দোকানটা চালায় এক মধ্যবয়সী মহিলা। নিজেই রান্না করে। রাত থেকে খোলা থাকে মূলত বাসের যাত্রীদের জন্যই। ব্যবসা মোটামুটি ভালোই। সঙ্গে রান্নাও। হাত ধুয়ে খাবার খেয়ে সারিকা খুব তৃপ্তি পেল। বিশেষ করে মুরগীর গাঢ় ঝোলটা দারুণ। নিজের আঙুল চাটতে চাটতে সে অজান্তেই বলে বসল,
“রান্না দারুণ না?”
“হুম।”
মিসির চামচ দিয়ে খাচ্ছে। ছেলেগুলোর সঙ্গে ঝামেলার সময় তার হাতে খানিকটা ক্ষত হয়েছে। সারিকা নিজেই ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিল। এখন সেখানে পাতলা একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ।
“বেশি ব্যথা হচ্ছে?”
সারিকা শুধাল।
“না।”
সংক্ষিপ্ত জবাব মিসিরের। কথা বলছে যেন একেবারে গুণে গুণে। অস্বাভাবিক নয়। মনে মনে অপরাধবোধ অনুভব করল সারিকা। কিন্তু রাস্তাঘাটে নয়। যা বলার সে বলবে শহরে ফিরে। তাই আপাতত খাওয়ায় মনোযোগ দিল। চুলগুলো খোলা থাকায় বারবার সেসব মুখের সামনে চলে আসছে আর সারিকা ঝটকা দিয়ে সরাচ্ছে। মিসির কিছুক্ষণ নিঃশব্দে স্ত্রীর কান্ডকারখানা দেখল। তারপর চামচ রেখে দুহাত এগিয়ে দিল। সারিকা মুখে খাবার তুলতে তুলতে থেমে গেল। মিসির আঙুল চালিয়ে তার সিল্কি চুলগুলো গোছগাছ করে মাথার পিছনে নিয়ে সুন্দর করে একটা হাতখোপা বেঁধে দিল। অতঃপর কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে ফের বসে পড়ে নিজের খাবারে মনোযোগ দিল।
অথচ সামান্য এই আবেদনটুকুতেই খাবার মাথায় উঠে গেছে সারিকার। জ্বলজ্বলে চোখ মেলে সে তাকিয়ে রইল স্বামীর নির্লিপ্ত মুখের দিকে। পাশের টেবিলে বসা অপর এক দম্পতি তাদের দিকে চেয়ে নিজেদের মাঝে কি যেন ফিসফিস করল। খারাপ কিছু নয় বরং ভালো কিছুই, তা তাদের চেহারায় প্রকাশ পেল। সারিকা চোখ ঘুরিয়ে ফেলল। অজান্তেই তার গালজোড়া রেঙে উঠল গোলাপরঙে। ওপাশ থেকে মিসির স্ত্রীর গালে লালিমা দেখে ক্ষণিকের জন্য খেই হারাল। পরক্ষণেই একটু কেশে বলল,
“তাড়াতাড়ি খাও।”
সারিকা মাথা দোলালো। দৃষ্টি লুকিয়ে মুখে ভাতের গ্রাস তুলল। সেদিনের বিষন্ন রাতে সে প্রথমবারের মতন হৃদয়মাঝে শীতলতার বদলে উষ্ণতা অনুভব করল।
নাক ডেকে ঘুমে কাদা সুগন্ধা। শরীর যেন নয় একেবারে মমি তার। চাদর পেঁচিয়ে দুই পা টানটান সোজা করে এমনভাবে ঘুমায় যেন পিরামিডের কফিনে ঘুমন্ত রাণী ক্লিওপেট্রা। তবে সাধের ঘুম তার টিকলনা বেশিক্ষণ। দরজায় ধড়াম ধড়াম শব্দে হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠল সে।
“রাম রাম!”
অস্ফুট উচ্চারণ করে ভয়ানক আতঙ্কগ্রস্ত হৃদয় সামলে উঠে গেল সে। ঘুমের কারণে চোখ খুলে রাখা দায়। ওই অবস্থাতেই দরজা খুলল। ওপাশে দাঁড়ান মানুষটাকে দেখে মনে হলো দুঃস্বপ্ন দেখছে।
দন্ডায়মান সাইবান। একা নয় সে। বুকে অতি যত্নে ধরে রাখা ঘুমন্ত ইযান। চাদর দিয়ে মুড়িয়ে নিয়েছে। আচমকা ঘড়ির দিকে চোখ গেল সুগন্ধার। ঘড়ির কাঁটায় সময় ভোররাত ৪ টা। সুগন্ধা হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারলনা। সাইবান কিছু না বলেই বিনা অনুমতিতে তার ঘরে ঢুকল। তারপর বিছানার উপর অতি সাবধানে ছেলেকে শুইয়ে দিল যেন ঘুম না ভাঙে। ইযান অবশ্য নড়াচড়ায় একটু গাইগুই করল, তবে সাইবান দ্রুতই সামলে নিল স্নেহের ছোঁয়ায়। পুনরায় ঘুমে ডুবে গেল ইযান। পুরোটা সময় সুগন্ধা হতবিহ্বল হয়ে শুধু দেখেই গেল।
সাইবান দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“ভালোমত দেখেশুনে রাখবি। যদি আরেকবার আমার বাচ্চা হারায় জরিনার আম্মা সকিনা তোকে হাটে নিয়ে বেঁচে দিয়ে আসব!”
সুগন্ধা ঘুম ঘুম চোখে সাইবানকে চলে যেতে দেখে বলে উঠল,
“এই ভোরবেলা রুম বদল করতেসেন ক্যান? আপনার রুমে কি ঠাডা পড়ছে?”
“একদম বেশি কথা বলবি না। উষ্টা মারব ধরে।”
“রাইতের শেষে আপনার মাথা কোন শাকচুন্নি খাইছে ভাইজান?”
সাইবান হুট করে ঘুরে তাকিয়ে তীর্যক হেসে জানাল,
“রাত এখনো বাকি, প্রেম রাতেরই পাখি। চুপচাপ যা দায়িত্ব দিয়েছি পালন কর। খবরদার, আজ পোটলার সাইরেন বাজবে সাথে তোর মরণের ঘণ্টা।”
আমার আলাদিন পর্ব ৪৮
সাইবান শেষ একবার ইযানকে দেখে এমন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল যে দরজা দিয়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল সুগন্ধা। সন্দেহ তার চোখেমুখে। ব্যাপারটা ঠিক কী হলো?
ব্যাপার যাই হোক না কেন, আজকের জন্য তার ঘুম হারাম।
“বিলইয়ের নাকের চুল কোথাকার!”
অস্ফুট গালি দিয়ে দরজা আটকে ভেতরে চলে গেল সুগন্ধা।
