Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৪৬ (২)

আমার আলাদিন পর্ব ৪৬ (২)

আমার আলাদিন পর্ব ৪৬ (২)
জাবিন ফোরকান

—যদি আমি কখনো পিছলে যাই, তবে আপনি নাহয় সম্পর্কের হালটা শক্ত করে ধরবেন?
সেদিন লঞ্চে, করিডোর ধরে কেবিনে ফিরে যাওয়ার সময়, ইরামের হাতটা ধরে কথাটা বলেছিল সাইবান। আজ, এই মুহূর্তে এই কথাটি হুট করে কেন স্মরণ হলো তা ইরাম খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করছে। অন্য সময় হলে হয়তবা সে এই মুহূর্তে সাইবানকে একটি চড় বসিয়ে দিতে পারত, ধমক দিতে পারত কিংবা একদম কিছুই না বলে শীতল ক্রোধ প্রকাশ করতে পারত। চাইলে ইরাম এখনো তা করতে পারে। বরং, সেটাই করতে ইচ্ছা হচ্ছে তার। তবে সে আজ নিজের অন্তরের সঙ্গে লড়াই করল। একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে শান্ত গলায় স্বামীকে শুধাল,

“কি হয়েছে?”
সাইবান ভ্রু কুঁচকে ইরামকে দেখল। তার ক্রোধ এখনো কমেনি।
“কি হয়েছে? জরিনার আম্মা সকিনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন কি হয়েছে।”
বলেই সাইবান উল্টো ঘুরে যাচ্ছিল কিন্তু পিছন থেকে ইরামের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“সুগন্ধা তো আমার স্বামী না, তুমি আমার স্বামী।”
থমকাল সাইবান। চোখ তুলে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে তাকাল। এমন কথা আশা করেনি। বলায় বাহুল্য নেই যে এই একটামাত্র বাক্যই তার অর্ধেক রাগ প্রশমিত করে ফেলল। ইরামের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সে। কণ্ঠের ঝাঁঝটা কমে এলো অনেকটা।
“পোটলাকে কোন ভরসায় একলা রেখে চলে গিয়েছিলেন আপনি?”
“সুগন্ধার ভরসায়। কম্পিউটার কোর্সে তো ওর নাহয় সারিকার কাছে রেখেই যেতাম। কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”

”হ্যাঁ। হয়েছে। সবদিন তো আর সবকিছু সমান থাকেনা। একে তো পায়েসের বাটি রেখেছেন রান্নাঘরের সবচেয়ে নিচের তাকে। বাড়িতে বাচ্চা আছে সেটা মাথায় ছিল না মনে হয়।”
“কে? কুচুপু? ও তো ঠিকমত বসতেই পারেনা!”
বিস্মিত হলো ইরাম। ইযানের বসে থাকার রেকর্ড এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ চার সেকেন্ড। তবে হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে কীভাবে যেন পেটের উপর ভর দিয়ে হামাগুড়ির মতন করে বিছানার কিনারে চলে যায়। এজন্য ইরাম সবসময় তাকে মাটিতে ম্যাটের উপর রাখে, নয়ত কড়া নজর রাখে বিছানার চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে। তার জন্য বাড়িতে ফিরে আলাদা বেডও কেনার কথা ভাবছে। হঠাৎ তার সঙ্গে পায়েসের বাটির যোগসাজশ হলো কীভাবে? হুট করেই উপলব্ধি গ্রাস করল তাকে,
“কুচুপু রান্নাঘরে চলে গিয়েছে?”
সাইবান আর জবাব দিলনা। ইরাম ধীরপায়ে হেঁটে বিছানায় পাশে বসল। ঝুঁকে ঘুমন্ত ছেলের মুখটা দেখল। কি আদুরে! দেখলে কে বলবে বিশাল দুষ্টুমি করে শান্তির ঘুম দিচ্ছে? মৃদু হাসল ইরাম, ঝুঁকে আলতোভাবে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করল,
“মাই দুষ্টু প্রিন্স, হামাগুড়ি তো দিনদিন বিপদজনক হচ্ছে তোমার! এবার কি তবে তোমায় বেড়ায় বাঁধার সময় হয়ে এলো? হুম?”

জননীর সতর্ক দৃষ্টি আদরের পাশাপাশি ছেলের গায়ে কোথাও কোনোপ্রকার আঘাত লেগেছে কিনা তাও নিশ্চিত করে নিল। অবশেষে নিশ্চিন্ত হয়ে ইরাম উঠল। সাইবানের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
“এজন্য তুমি আপসেট ছিলে?”
এবারেও সাইবান উত্তর করলনা। দুহাত মুঠো করে ফেলল। ইরামকে কীভাবে বোঝাবে সে কতখানি ভয় পেয়ে গিয়েছিল? ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল সব শেষ! এটাই হয়ত চেয়েছিল অরণ্য। সাইবান মৃত্যুর চাইতেও ভয়ংকর এক যন্ত্রণা ভোগ করুক। আর সে ঠিক সেই ফাঁদেই পা দিয়েছে। অরণ্যর কথাটা ইরামকে জানানো যাবেনা। তাই মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। নিজের উপর লজ্জাও হলো। দূর্বলতাটা শত্রুর কাছে এক নিমিষে প্রকাশ করে ফেলেছে। ইরাম জবাবের আশায় কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকেও যখন উত্তর পেলনা, তখন একটি নিঃশ্বাস ফেলল।
“আচ্ছা। ধরে নিলাম তুমি আপসেট ছিলে। তবে জেনে রাখো, এবার আমিও আপসেট হয়ে গিয়েছি।”
চমকে উঠল সাইবান। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ভয় আবারও ঘিরে ধরল তাকে।
“মানে?”

ইরাম হেঁটে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়াল। শান্ত গলায় জানাল,
“তোমার রাগ করাটা স্বাভাবিক ছিল। আমি হলেও হয়ত করতাম। দুটো চড়ও দিতে পারতাম। কিন্ত কি জানো তো? শরীরের ব্যথার থেকে মনের ব্যথাটা বেশি লাগে।”
স্তব্ধ হয়ে ইরামের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সাইবান। স্ত্রী তার ওই একই ভঙ্গিতে শান্তভাবেই জানাল,
“সামলাতে না পারলে জন্ম দিয়েছেন কেন? স্বামীকে ঘেন্যা লাগেনি তখন? সবকিছু জানার পরেও রাগের মাথায় হলেও এই কথাটা তুমি আমাকে বলেছ তাই আমি আপসেট।”
সাইবানের অন্তরটা বুঝি চেপে এলো। ইরামের মাঝে কোনো অভিমানের সুর নেই, ক্রোধ নেই, ঘৃণা নেই, প্রতিহিংসা নেই। শুধু সৎ বহিঃপ্রকাশ। কথাটা অর্ধাঙ্গীনির খারাপ লেগেছে সেটা স্পষ্ট জানিয়েছে সে। ইরাম দুহাত চেপে বলল,
“ঘৃণার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক নেই। আর অরণ্যকে আমি ভালোবাসতাম কি ঘৃণা করতাম সেই অনুভূতি তুমি জানো না। তুমি আমার অতীত জানো ঠিকই আলাদিন, কিন্তু আমার আবেগ জানো না। এই বিষয়টা টেনে না এনে রাগ ঝাড়লেও পারতে। তাছাড়া এত রাতে এমনি এমনি হুট করে বেরিয়ে যাওয়ার মানুষ আমি না, এটুকু বোঝার কথা তোমার। সারিকার পিছনে গিয়েছিলাম। বাকি কি, কেন, কীভাবে হয়েছে সেই ঝামেলার কথা তোমার মাথা ঠাণ্ডা হলে বলব।”

এটুকুই। ইরাম আর বেশি কিছুই বললনা। উল্টো ঘুরে গেল। আলমারি খুলে নিজের তোয়ালে বের করে নিল। বাথরুমে যাবে হাতমুখ ধুতে। সে যেই না আলমারি বন্ধ করে ঘুরেছে অমনি চোখের সামনের দৃশ্যটা দেখে হতবাক হয়ে গেল। তার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সাইবান। মুখটা নিচের দিকে। দুই হাত হাঁটুর উপর শক্তভাবে মুঠ করে রাখা।
“আলাদিন? তুমি ওখানে কি করছ?”
সাইবান নড়লনা, শুধু মুখটা তুলে ইরামের দিকে তাকাল। তার কালো চোখের মাঝে জ্বলজ্বলে অনুভূতির জাগরণ দেখা গেল। ইরাম স্পষ্ট দেখল, শক্ত একটা ঢোক নেমে গেল ছেলেটার গলা বেয়ে। তারপরই ঠোঁট ফাঁক হলো তার, বেরিয়ে এলো গভীর এক কন্ঠস্বর,
“যদি মলম লাগে আপনার ঘায়ে, তবে পতন হোক আমার আপনার পায়ে।”
ইরামের চোখজোড়া প্রসারিত হলো। তোয়ালে চেপে ধরে সে নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকল স্বামীর পানে। সাইবান একটি হাত নিজের বুকে রাখল, তারপর হুট করেই খামচে ধরল জায়গাটা।
“আমি একটা বলদ, গাধা, গরু, ছাগল। না, নিরীহ পশুগুলোকে আমার সাথে তুলনা করলে ওদেরকেও অপমান করা হবে। আমি হলাম আমিই। একটা আস্ত বোকা। যে চোরাবালিতে পা দিয়ে একবার ডুবেছি, সেই চোরাবালিতে গিয়েই আবার ঝাঁপ দিয়েছি। মানে একটা মানুষ এতটা আহাম্মক কীভাবে হতে পারে?”
সেদিন বাগানের স্মৃতিটুকু মনে পড়ল ইরামের। এভাবেই ছেলেটি নিজেকে দোষারোপ করেছিল। বেত পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল যেন ইরাম তাকে শাস্তি দিতে পারে! ছেলেটা বরাবরই অদ্ভুত থেকে গেল। ওদিকে সাইবান বলেই যাচ্ছে,

“আমি সরি বলব না। আপনি আমাকে ঘুরিয়ে জোরে একটা থাপ্পড় দিন যেন আমার দাঁতকপাটি নড়ে যায়। ওই থাপ্পড়ের জোরই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে রাগের মাথায় কি বলা যাবে কি বলা যাবে না।”
ইরামের সত্যি এবার খানিকটা হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু সেটা চেপে সে নুয়ে বসে স্বামীর মুখোমুখি হলো। সাইবান একটুও দ্বিধা করেনি, এমনভাবে নিজের বুক খামচে রেখেছে যে সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যথা হচ্ছে। ইরাম তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সেখানে নিজের হাত রেখে বলল,
“কামানের গোলা আর কথা কখনো ফিরে আসেনা।”
মানুষ ভূত দেখলে যেমন করে ভয় পায়, সাইবানের মুখটাও ঠিক তেমন দেখাল। ইরামের হাতটা খামচে ধরে নিজের গালে চাপল সে। বিড়ালের মতন মুখ ঘষতে ঘষতে আতঙ্ক নিয়ে বলে উঠল,
“প্লীজ, প্লীজ, প্লীজ, মাই প্রেশিয়াস। ঠিক করলেও আপনি আমার, ভুল করলেও আপনি আমার। প্লীজ আমাকে ছেড়ে দেবেন না। কথা বন্ধ করবেন না। আপনি অভিমান করলে আমার জীবন তলিয়ে যাবে।”

“আলাদিন…”
“না। প্লীজ। আগে বলুন মাফ করেছেন। এই নিন একটা থাপ্পড় দিন।”
“আলাদিন পাগলামি করা বন্ধ করো। আমি…”
“প্লীজ। চিৎকার করুন। থাপ্পড় দিন। আমি সেটারই প্রাপ্য। সেদিনের পর থেকে আমার ব্রেইন সার্কিটের একটা তার এমনভাবে ছিঁড়ে গিয়েছে যে আমি নিজেকেই নিজেই চিনতে পারিনা, নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। আমি একটা ভাঙাচোরা মানুষ, জোড়াতালি দিয়ে চলি।”
ইরাম এবার থমকাল। সাইবান তার হাতের মাঝে নিজের মুখ গুঁজে রেখেছে। তার তপ্ত ত্বক, উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ইরামকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এবার মেঝেতে আসুন করে বসে পড়ল রমণী। দুহাতের আঁজলায় সাইবানের মুখটা তুলে ধরল নিজের দিকে। স্বামীর চেহারা উদ্ভ্রান্ত, চোখে হারানোর ভয়, আর ঠোঁটে অপরাধবোধের কাঁপুনি। ইরাম বৃদ্ধাঙ্গুলে তার চোখের নিচটা মুছে নিল যেখানে এখনো অশ্রু গড়ায়নি। রমণীর নরম কন্ঠস্বর শুধাল,

“কোনদিন?”
সাইবান চুপ করে রইল। তার ঠোঁটের কম্পন বৃদ্ধি পেল। চোখজোড়া লুকিয়ে ফেলল দৃষ্টি। ইরাম তাড়া দিলনা, অপেক্ষা করল। সাইবান প্রায় মিনিটখানেক চুপ থাকার পর বলল,
“যেদিন আপনি আমাকে আপনার কাছ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।”
“তাড়িয়ে দিয়েছিলাম?”
“হুঁ।”
ইরাম স্মৃতিতে জোর দিল। সাইবান তার কাছে এসেছে আর সে তাড়িয়ে দিয়েছে এমনটা কোনদিন হয়েছে? প্রথম এক মিনিট সে সত্যিই মনে করতে পারলনা। কিন্তু পরে ভেসে এলো একটি দগদগে স্মৃতি,
—আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও, আলাদিন!
ইরামের বুকটা খিঁচে এলো বুঝি। ভারী একটা চাপ অনুভূত হলো অন্তরমাঝে। তবে কি সেদিনই…?
“সেদিনই।”
তার ভাবনা যেন সাইবান পড়তে পেরেছে। উত্তরটাও জানিয়ে দিল সে। ইরাম বিস্ময় এবং আশঙ্কা নিয়ে তাকে দেখল। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজের। পরক্ষণে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কে…কেন?”

সাইবানের ঠোঁটে একটি পরিহাসের হাসি ফুটল। প্রথমটায় সে কিছুই বললনা। একটা সময় ইরামের মনে হলো, বরাবরের মতন এবারেও সাইবান নিজের অতীত এড়িয়ে যাবে। অথচ তাকে সম্পূর্ণ হতবাক করে দিয়ে দুবাহু বাড়িয়ে দিল সাইবান। বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল অর্ধাঙ্গিনীকে। নিজের মাথাটা কাত করে রাখল কাঁধে, যেন কতকালের প্রাপ্য বিশ্রাম নিচ্ছে। ইরাম নিজের দুহাতে তাকে আগলে নিল। অস্বাভাবিক উষ্ণতা তাদের ঘিরে ধরল চাদরের মতন। একটি হাত সাইবানের পিঠে এবং অপর হাত তার মাথায় বোলাতে লাগল ইরাম। সাইবান দীর্ঘক্ষণ কথা বললনা। ইরামও একটুও জোর করলনা। অবশেষে মুখ খুলল সাইবান,
“সেদিন আমি নিজের চোখে মৃ*ত্যুকে দেখেছি।”

অতীত:
আলতো চাপে স্টপওয়াচটা থামল। সংখ্যা নির্দেশ করছে, উনিশ ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট চুয়ান্ন সেকেন্ড। সাইবান পড়ার টেবিল থেকে চেয়ার ঠেলে দুহাত উপরে তুলে স্ট্রেচিং করল। সমস্ত শরীর কেমন বসে গেছে তার। যেন কলকব্জাগুলোতে জ্যাম লেগে গেছে। গত মাস দুয়েক যাবৎ তার পড়ার রুটিন ১৫-১৮ ঘণ্টার মধ্যেই উঠানামা করেছে। টেবিলে একনাগাড়ে বসে থাকতে থাকতে ইদানিং পিঠ ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, কোমর ব্যথাও দেখা দিয়েছে। চোখের অবস্থা নাহয় বাদ দেয়া যাক। সামিয়া ছেলের পিছনে কত যে স্নেহ ব্যয় করছেন! হাসপাতালে কাজ না থাকলে বেশিরভাগ রাত তিনি ছেলের পাশেই বসে থাকেন। সাইবান পড়ে আর তিনি সেলাই করেন, বই পড়েন বা পেশেন্টের মেডিকেল রিপোর্ট দেখেন। আজকে তিনি নেই। অপারেশন ছিল ইমারজেন্সি। কিন্তু আগামীকাল সময়মত চলে আসবেন।
দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো সাইবান। ভোর পাঁচটা বেজে এসেছে প্রায়। আর মাত্র কিছু ঘণ্টা। এরপর তার জীবনের অগ্নিপরীক্ষা। এম বি বি এস ভর্তি পরীক্ষা। যে স্বপ্নটা লালন করে সে বড় হয়েছে, যে স্বপ্নের বাস্তব প্রতিচ্ছবি নিজের জননীর মাঝে দেখেছে, সেই স্বপ্নটাকে বরণ করে নিতে তার আর তর সইছে না। উত্তেজনায় মনে হয় ঘুমও আসবেনা আর। অথচ সে গতকাল থেকে এক ঘণ্টাও ঘুমায়নি। ফোন হাতে নিল সে। ফ্রেন্ড গ্রুপে ইতোমধ্যে মেসেজ এসে ভরে গিয়েছে। বন্ধুরা সবাই একে অপরকে শুভকামনা জানাচ্ছে। সাইবানও টাইপ করল,

: বেস্ট অব লাক, গাইয।
সে মেসেজ দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রুপ চ্যাটে ঝড় উঠল,
: লুক হু ইয টকিং!
: ভাই, আসলেই লাক সব আমাদের দরকার। তুই তো ব্যাটা ছক্কা মারবি।
: ঢাকা মেডিকেল কনফার্ম।
: ভাই, তুই মেডিকেলে প্রথম দ্বিতীয় হলে যখন বাসায় রিপোর্টার ইন্টার্ভিউ নিতে আসবে, তখন প্লীজ আমাদের কথা একটু বলিস। যে, এই জানের দোস্তরা তোকে সবসময় মোটিভেট করেছে।
আপনমনে হাসল সাইবান। টাইপ করল,
: হয়েছে হয়েছে। এখনো পরীক্ষা হয়নি। প্রশ্ন কেমন হয় কে জানে। কাট মার্কসের টেনশন আছে। আগে রেজাল্ট দিক এরপর এসব বলিস।

: কাট মার্কস ফার্কস তোকে কিছুই করতে পারবেনা। ওসবের ভ্যালু নেই।
: কোচিংয়ের রাফাত ভাই তো বলেই রেখেছে, উনি নাকি তোর সাইজের অ্যাপ্রোন অলরেডি অর্ডার করে দিয়েছে। শুধু টেকার পর সংবর্ধনা আয়োজনে যতটুকু দেরী আরকি।
: দেখ গিয়ে কলেজ ওয়েবসাইটে অলরেডি হয়ত তোর নাম লিখে রেজাল্ট শীট বানিয়ে ফেলেছে!
: যাহ! এত এক্সসেসিভ হোস না। আমি এমন কিছু না।
সাইবান মাথা দোলাল। পাঁচ মিনিট ব্যয় করল সে বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তায়। অতঃপর ফোন রেখে দিল। তিন ঘণ্টা মতন ঘুমানোর সময় আছে হাতে। আসলেই ঘুমানো দরকার। না ঘুমালে ব্রেন পরীক্ষার হলে শাট ডাউন হয়ে যায়। বিছানা ঠিকঠাক করে জানালা খুলে দিল সে। ভোরের শীতল বাতাস এসে চারিপাশ থেকে আবদ্ধ করে ফেলল তাকে। আপনাআপনি ঠোঁটে হাসি ফুটল বিস্তর। দূরে উদীয়মান সূর্য নজর কাড়ল। কি সুন্দর কমলাভ আলোয় ছেয়ে গিয়েছে গোটা পৃথিবী। দিগন্তের পানে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সাইবানের মনটা খারাপ হয়ে গেল। জানালার রেলিংয়ে হাতের আঙুল চেপে বসল শক্তভাবে। আজকের মতন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনেও হয়ত ওই মানুষটার কাছে সে যেতে পারবেনা। বাড়িতে আহমদ আছেন, সামিয়া আছেন। পিতা মাতা উভয়ে তাকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাবে। এর মধ্যে দেখা করার সুযোগ নেই। আচ্ছা, সাইবান কি এখন চুরি করে যাবে? কিন্তু যদি সে ঘুমিয়ে থাকে? যদি সে রাগ করে?

“ইরাম আপু…”
অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করল সাইবান। চোখজোড়া বুঁজে এলো তার। যেমন করে সে ইরামের কথা ভাবছে, তেমন করে কি ইরামও আজকাল কখনো তার কথা ভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরটা আর পাওয়া হবেনা সাইবানের।
বিছানায় শরীর ছুঁতেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেল সে। আটটার মধ্যে উঠেই রেডি হয়ে গেল। সামিয়া এসে পড়েছেন। আহমদ ইতোমধ্যে গাড়ি নিয়ে বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছেন। সাইবান তাড়াহুড়ো করছে। ফাইলপত্র ঘেঁটে দেখছে সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে নিয়েছে কিনা। সামিয়া ছেলের পিছনে পিছনে ব্রেড আর জেলি নিয়ে দৌঁড়াচ্ছেন।
“একটুখানি, আব্বু, একটুখানি খা?”
“মম! আমি সব বমি করে দেব। চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি, প্লীজ জোর করো না।”
“মম বলছি তো, এইযে এক কামড়…”
সাইবান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামিয়ার হাত থেকে ব্রেড নিয়ে সম্পূর্ণটা মুখে দিয়ে গাল ফুলিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল,

“এবাম…ঘুসি?” [ এবার খুশি? ]
সামিয়া হেসে ছেলের ফোলা গাল চেপে বললেন,
“একদম খুশি। আমি টিফিন বক্সে নিয়ে নিচ্ছি, পরীক্ষা শেষ করে গাড়িতে বসে খাবি।”
চোখ ওল্টাল সাইবান। পরক্ষণেই আবার হেসে ফেলল। মায়ের বিরুদ্ধে জিত বলে কিছু নেই। কিছুক্ষণ বাদেই বেরিয়ে পড়ল তারা। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছেন আহমদ।
“এইযে মা ছেলের আর কতক্ষণ লাগবে? পরীক্ষা কি আপনাদের জন্য বসে থাকবে মনে হয়?”
সামিয়া মুচকি হেসে গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে স্বামীর নাক টেনে দিয়ে বললেন,
“তুমি নাহয় শিক্ষাবোর্ডে ফোন করে একটা ব্যবস্থা করবে।”
আহমদ বাঁকা হাসলেন, স্ত্রী হাত সরিয়ে ফেলার আগেই সেটা টেনে ধরে তর্জনী বরাবর চুমু দিয়ে বললেন,
“আই উইশ আমি ব্যবসায়ী না হয়ে মাফিয়া হতাম, তাহলে আমার বউয়ের ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারতাম।”
“ছিঃ, কি অসভ্য!”
“তোমাদের রোমান্স শেষ হয়েছে মম, ড্যাড?”
সাইবান একদম শান্ত ভাবেই বলল। এসব নিত্য দেখে অভ্যস্থ সে। সামিয়া লজ্জা পেলেন, তবে আহমদের মধ্যে সেটার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলনা। তিনি বললেন,
“রোমান্স শেষ হওয়ার কোনো বয়স নেই সেটা তোমার বউ আসলেই বুঝতে পারবে। নাউ, গেট অন কার চ্যাম্প।”
“আমার বউ আসলেও তোমাদের রোমান্সের বয়স ফুরোবে না সেটা আমি জানি।”
বলে সাইবান গাড়িতে বসল। পিতামাতা উভয়ে হাসলেন। সামিয়া বসলেন ড্রাইভিং সিটে বসা আহমদের পাশে। গাড়িটা চলতে শুরু করল। গেট পেরিয়ে যখন রাস্তা দিয়ে এগোল, তখন আনমনেই মাথা কাত করে চেয়ে রইল সাইবান। ওই তো, খানিকটা দূরেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মুন্সীবাড়ি। সাইবান গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়াল। দুই তলার একটি রুমের জানালায় তার দৃষ্টি আটকে রইল। ফিসফিস করল সে,
“আমার জন্য দোয়া করবেন, ইরাম আপু।”

পরীক্ষা দূর্দান্ত হয়েছে সাইবানের। চোখ বন্ধ করে সে বলতে পারবে, মেডিকেলে একটা সিট অন্তর তার কনফার্ম। তার সেই আত্মবিশ্বাসের খুশি ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত পরিবারে। আজ রেজাল্টের দিন। ওয়েবসাইটে এখনো প্রকাশ করা হয়নি অথচ সকাল সকাল ত্রিশ কেজি মিষ্টি নিয়ে এসেছেন আহমদ। পুরো পাড়া প্রতিবেশীদের মাঝে বিলানো হবে। সামিয়া খুব একটা রান্না করেন না। কিন্ত আজ ভোর থেকে ছেলের পছন্দের হরেক পদ চুলায় চড়িয়েছেন। সারিকা মন খারাপ করে বসে আছে কারণ তার মা তাকে পাত্তা না দিয়ে সব ভাইয়ের পছন্দের রান্না করছে। এই নিয়ে সকাল থেকে দুই ভাইবোনের মাঝে তিনবার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। পিতার রামধমকের পর অবশ্য দুজন উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়ার মতন হলরুমের দুইপাশে অবস্থান নিয়েছে। সাইবান ডাইনিং টেবিলে বসে মনের মাধুরী মিশিয়ে একটা কাগজের ফুল বানাচ্ছে। এইতো, গতকালই ইউটিউব দেখে শিখল। আজ হাতে কলমে কাজে লাগাচ্ছে। এই জিনিসটা সে নিজের সবটুকু দিয়ে নির্মাণ করবে। অতঃপর নিবেদন করবে এই মানুষটার পদতলে। হ্যাঁ, আজকে শুধু রেজাল্ট দিক, সেই খবর জানানোর উছিলায় গর্ব নিয়ে সাইবান ইরামের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। ইরাম চোখে সেই চিরায়ত অগাধ মায়া নিয়ে দেখবে, তার সেই ছোট্ট আলাদিন এখন ভবিষ্যৎ ডাক্তার। এর চাইতে মধুর কোনো সময় হতে পারে?
সাইবান ফুল বানাতে এতই মগ্ন ছিল যে খেয়ালই করেনি কখন আহমদ পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

“চ্যাম্প, দেখি দেখি।”
পিতার স্পর্শে মাথা তুলে তাকাতেই সাইবান দেখল একটি সাদা অ্যাপ্রোন তার কাঁধে জড়িয়ে দিয়েছেন আহমদ।
“ড্যাড!”
উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সাইবান। আহমদ হাত তুলে তার মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“এটা তোমার উপহার।”
সামিয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়েছেন কিছুক্ষণের জন্য। স্বামীর কান্ড দেখে তিনি হাসি আটকাতে পারলেন না।
“তুমি পারোও বটে। ছেলে তোমার ডাক্তার হতে যাচ্ছে, এখনো হয়ে যায়নি।”
“সে আজ হোক কাল হোক, হবেই তো। ওর প্রথম অ্যাপ্রোনটা আমার পক্ষ থেকেই থাক।”
আহমদ অত্যন্ত আয়েশ নিয়ে স্ত্রীকে দেখলেন, দ্বিতীয় দফায় বললেন,
“আমার ওয়াইফ ডাক্তার, আমার মেয়ে ডেন্টিস্ট, আমার ছেলে ডাক্তার! তুমি শুধু ওয়েট করো সামিয়া। কালকে দেখে বাড়ির বোর্ডে নতুন নাম লিখা হবে—ডাক্তারবাড়ি।”
“পাগল একটা!”
স্বামীর কথায় খিলখিল করে হাসতে লাগলেন সামিয়া। পিতার বুকে লেপ্টে সবকিছু শুনে নিজেও না হেসে পারলনা সাইবান। তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল টেবিলে পরে থাকা কাগজের ফুলের উপর। আর মাত্র কিছু সময়, এরপরই…

ধপাস!
কিছু একটার শব্দে পারিবারিক সময় এবং সাইবানের ভাবনায় ছেদ পড়ল। সকলে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল, সোফায় বসে থাকা সারিকার হাতের ধাক্কায় কফি টেবিলে রাখা কয়েকটা মিষ্টির প্যাকেট মেঝেতে পড়ে গেছে। মেয়েটার এক হাতে আইপ্যাড, দৃষ্টি কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত। আহমদ দ্রুত মেয়ের কাছে গেলেন,
“প্রিন্সেস? কি হয়েছে?”
সারিকা আইপ্যাডটা নিজের পিছনে লুকিয়ে ফেলল। অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
“কি…কিছুনা…ড্যাড।”
“কি ব্যাপার? তুই না ওয়েবসাইট ঘাঁটছিলি? রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে?”
সামিয়া বললেন। এগিয়ে গেলেন টিভির দিকে। রিমোট হাতে নিলেন,
“সময় তো হয়ে গিয়েছে। দেয়নি এখনো?”
সারিকা সকলকে পেরিয়ে সাইবানের দিকে তাকাল, ভয়ার্ত দৃষ্টিতে। মেঝের মাঝখানে সাদা অ্যাপ্রোন পরিহিত ভাই তার দাঁড়িয়ে। সারিকার মাঝে চলা তোলপাড় সে ধরে ফেলেছে, তাই তার চেহারায়ও কেমন আঁধার নেমে এলো। এগিয়ে এলো সে, একদম বিনা দ্বিধায় জিজ্ঞেস করল,

আমার আলাদিন পর্ব ৪৬

“সিস…আমার রেজাল্ট দেখেছ?”
“কোন মেডিকেল?”
আহমদ প্রশ্ন করলেন। সারিকা এক এক করে বাবা, মা এবং সবশেষে ভাইয়ের দিকে তাকাল। দৃষ্টি লুকিয়ে ফেলল সম্পূর্ণ। মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর করল,
“সাই….মেডিকেলে টেকেনি।”

আমার আলাদিন পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here