Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৪৪

আমার আলাদিন পর্ব ৪৪

আমার আলাদিন পর্ব ৪৪
জাবিন ফোরকান

একজন রোগীর রিপোর্ট দেখতে দেখতে হাসপাতালের করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছেন সামিয়া। তিনি এই হাসপাতালের গাইনোকোলজির সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত। দেশের অন্যতম বিখ্যাত প্রাইভেট হাসপাতাল এটি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সমস্ত পড়াশোনা শেষ করে তিনি পরবর্তীতে এখানে নিযুক্ত হয়েছিলেন। আজ কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল হিসাবে নেই তার। অথচ কাজের প্রতি ডেডিকেশন যেন আজও ঠিক প্রথম দিনের মতোই। এজন্য ডাক্তার মহলে তিনি বিশেষ সমাদৃত এবং রোগীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় বটে। আজ কোনো অপারেশন নেই তার। ইমারজেন্সি না হলে বিশেষ কোনো চাপ পড়ার কথা না। তবুও তিনি বাড়ি থেকে হাসপাতালে চলে এসেছেন। কারণ, বাড়িতে আহমদ আছেন। ওই লোকটার আশেপাশে থাকার ধৈর্য্য তার ফুরিয়েছে বহু আগেই।
করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অফিস চেম্বারের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে একটি উৎফুল্ল ডাক ভেসে এলো।

“ম্যাম!”
সামিয়া থমকালেন। পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলেন এক যুবক দন্ডায়মান। ফরমাল শার্ট এবং প্যান্টের উপর সাদা অ্যাপ্রোন জড়ানো। গলায় ঝুলছে স্টেথোস্কোপ। শ্যামলা চেহারা, বাবরি গোছের চুল। গালে খয়েরী রঙা তিলের মতন। ইংরেজিতে ওগুলোকে ফ্রেকেলস বলে। চোখে গোল ফ্রেমের রিমলেস চশমা। ঠোঁটে চওড়া হাসি। একে চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু হাসপাতালে আগে কোথাও দেখেছেন বলে মনে পড়ছেনা। আইডি ব্যাজ ঝুলছে তার শার্টের বুকপকেটে।
মেডিকেল অফিসার— আদিত্য দেবনাথ।
পুরাতন ডাক্তাররা এতটা ফিটফাট হয়ে চলেন না। এত উত্তেজনা এবং নিয়ম কানুন রক্ষা শুধু নতুনদের মাঝেই দেখা যায়। আদিত্য নামটাও চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক কোথায় দেখেছেন মনে পড়লনা সামিয়ার। ততক্ষণে মেডিকেল অফিসার আদিত্য নামক যুবকটি এগিয়ে এসে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই নুয়ে সামিয়ার পা ছুঁয়ে নমস্কার করতে শুরু করল। সামিয়া ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। নতুনদের অনেকেই এমন করে, বিশেষ করে ইন্টার্নশিপ করা ছেলেমেয়েগুলো।

“থাক বাবা। বেঁচে থাকো। তুমি…”
“আমি আদিত্য। চিনতে পারেননি ম্যাম?”
উঠে দাঁড়াল আদিত্য। তার হাসিটা আগের মতোই, ঝকঝকে। সামিয়াকে খানিক ভ্রু কুঁচকে তাকাতে দেখে সে বলল,
“মৌসুমী দেবনাথের ছেলে।”
“ওহহহ!”
সামিয়ার চেহারায় বিরাট প্রফুল্লতা ফুটল। মৌসুমী দেবনাথ তার বেশ কয়েক বছর আগেকার একজন রোগী। মূলত জরায়ুর সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। এরপর থেকে যে কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন, সামিয়াই তার চিকিৎসা করেছেন। শেষমেষ অবশ্য মৌসুমীকে বাঁচানো যায়নি। জরায়ুতে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। চিকিৎসায় সামিয়া অনেকটা সাহায্য করেছিলেন। আদিত্য তখন ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী ছিল। দুনিয়ায় এক মা ছাড়া তার কেউই ছিলনা। সামিয়া দেখেছেন, বছর বছর ধরে কীভাবে সংগ্রাম হয়েছিল এই ছোট্ট পরিবারটির। আদিত্যর সঙ্গে পরবর্তীতে আর দেখা হয়নি সামিয়ার। শেষবার মৌসুমীর মৃ*তদেহ হস্তান্তরের সময় দেখেছিলেন ছেলেটিকে। দুহাত ভরে দোয়া করেছিলেন, ছেলেটা অনেক বড় ডাক্তার হবে।
আজ সেটাই তার সামনে বর্তমান। সামিয়া খানিক গর্ববোধ করলেন। আদিত্যকে নতুন করে দেখলেন। তখন ছেলেটাকে দেখতে বাচ্চা মনে হত। মায়ের আঁচল ধরে বসে থাকত। ওই একটা জীবন রক্ষার জন্য কত প্রার্থনাই না সে করেছে! কিন্তু জন্ম আর মৃত্যু তো জগতের নিশ্চিত সত্য। সেই সত্যের সঙ্গে লড়াই করে সাধ্য কার? বর্তমান আদিত্যকে দেখতে একজন সুপুরুষ মনে হচ্ছে। বয়সটাও সাইবানের কাছাকাছি, তাই সামিয়ার আরও বেশি মায়া অনুভূত হলো।

হাসপাতালের নিজস্ব কেন্টিন ব্যবস্থা আছে ডাক্তার এবং কর্মীদের জন্য। সেখানেই গেলেন সামিয়া আদিত্যকে নিয়ে। দুজন কফি নিয়ে একটি টেবিলে বসে আলাপ করলেন। সামিয়া শুনলেন কীভাবে মৌসুমীর চলে যাওয়ার পর কত সংগ্রাম করে আজকের এই জায়গায় পৌঁছেছে আদিত্য। সে চাইলে বি সি এস দিয়ে সরকারি হাসপাতালে চাকরির চেষ্টা করতে পারত। কিন্ত সামিয়ার প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধাবোধ এবং অনুরাগ আছে তার। তাই এখানেই আবেদন করেছিল। অসাধারণ ফলাফল এবং ইন্টারভিউয়ে বেশ ভালো করায় তাকে মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আজকে তার দ্বিতীয় দিন। গতকাল সামিয়াকে সে খুঁজেছিল, কিন্তু সামিয়া বিশেষ কাজে অন্য একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন বিধায় সাক্ষাৎ হয়নি।
“ম্যাম। আপনি আমার আইডল। সত্যি বলতে আপনার সহযোগিতা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবনা। আমার মাও আপনার মাঝে একজন ডাক্তার নয় বরং যেন সঙ্গিনী খুঁজে পেয়েছিলেন। তার অন্তিম সময়টাকে মধুর করার জন্য আপনার কাছে যত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিনা কেন কম হয়ে যাবে।”
সামিয়া মুচকি হাসলেন। হাত বাড়িয়ে আদিত্যর কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বললেন,

“হয়েছে ছেলে। আর বলতে হবেনা। তোমাকে এখানে দেখে আমি কতটা খুশি হয়েছি বোঝাতে পারবনা। প্রার্থনা করছি, তুমি আরও অভিজ্ঞ হও, আরও ভালো জায়গায় পৌঁছাও। কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে। আমি তো আছিই এখানে।”
“থ্যাংক ইউ, ম্যাম।”
আদিত্য খানিক লজ্জাবোধক হাসল। ছেলেটার মুখটা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দেখলেন সামিয়া। অতঃপর শুধালেন,
“তারপর বলো। ব্যক্তিগত জীবনে কেমন আছো? কোনো সমস্যা নেই এখন আর এই আশাই রাখছি।”
মাথা নাড়ল আদিত্য।
“না ম্যাম, সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে আর কোনো সমস্যা নেই। হাসপাতালের কাছাকাছি যে কোয়ার্টার আছে, ওখানে বাসা ভাড়া নিয়েছি। দশ মিনিটের পথ। আসি, যাই, একলা মানুষ দিন চলে যায়।”
সামিয়া ভ্রু তুললেন,

“এখনো একলা? জীবনে সেটেল হওয়ার চিন্তা তো এবার করাই যায়। আফটার অল, মানুষ সামাজিক প্রাণী।”
মাথা চুলকালো আদিত্য। মৃদু হাসি নিয়ে জানাল,
“সেটা তো ঠিক। কিন্তু অনাথকে কেই বা মেয়ে দেবে?”
হুট করে সামিয়া থমকালেন। এক মুহূর্ত নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। তার মাথায় কিছু একটা একেবারে হঠাৎ করেই উদয় হয়েছে।
“কেন? তুমি আজকালকার ছেলে। মনের মানুষ নেই?”
বন্ধুসুলভ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সামিয়া। তার নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাতে শ্যামলা গালে লালিমার ছাপ পড়ল আদিত্যর।
“ম্যাম। কি যে বলেন! আমার যে জীবন, পড়াশোনা, চাকরি, ঘর সামলে যে কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর সময় পাই সেটাই তো ভগবানের দয়া!”

“তা ঠিক।”
সামিয়া হাতঘড়ি দেখলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন।
“ওহ, আমার একজন রোগীকে দেখতে হবে এখন। কিছু মনে করোনা, সামনে তোমার সাথে আরও কথা হবে। নাম্বারটা দিও তোমার।”
ফোন বাড়িয়ে দিলেন সামিয়া। আদিত্য তৎক্ষণাৎ সেটা নিয়ে নিজের নাম্বারটা সেভ করে দিল।
“পরে দেখা হচ্ছে তাহলে, ভালো ছেলে।”
“ম্যাম!”
লজ্জা পেল আদিত্য। তাতে তার পিঠ চাপড়ে মুচকি হেসে সামিয়া চলে এলেন। আদিত্যও দাঁড়িয়ে থাকলনা। সে নিজের কাজে গেল। করিডোর ধরে পুনরায় অফিস চেম্বারে ফিরে যেতে যেতে ফোনে সেভ করা নাম্বারটা দেখলেন সামিয়া। হয়ত সুগন্ধার বাবাকে দেয়া কথাটা রাখার সুযোগ অবশেষে হয়েছে তার।

পার্টি চলছে আপন গতিতে। মিউজিকের বিট এবং খোলা বাতাসের উন্মাদনায় দোল উঠেছে মনে মনে। হেলেদুলে আনন্দ উদযাপন করছে সকলে। একপাশে একটা সোফায় বসে হুইস্কির গ্লাস হাতে চারপাশ নীরবে পর্যবেক্ষণ করছে অরণ্য। গ্লাসের ভেতর বরফের টুকরোগুলো ঘোরাতেই সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ঠোঁটে ঠেকিয়ে সেই স্বাদ নিতে নিতে স্টেজের দিকে নিগূঢ় নয়নে চেয়ে আছে সে। সেখানে বিট বক্সের পিছনে লাফিয়ে চলা ছেলেটার উপর থেকে নজর সরছেনা তার। সাইবান জ্যাকেট খুলে ফেলেছে। তাতে নিচে হাফ হাতা টি শার্ট বেরিয়ে এসেছে, যার দরুণ শক্তিশালী মাংসপেশীর গঠন স্পষ্টত চোখে লাগছে। হালকা ঘেমে উঠেছে ছেলেটা, তাতে উজ্জ্বল ত্বক কেমন চিকচিক করছে। সাদা ওড়নাটা এখনো গলায় ঝুলছে।
সুদর্শন। বেপরোয়া। দুঃসাহসী। পাগলাটে।
মনে মনে ভাবল অরণ্য। দুর্বোধ্য একটি হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। এই খেলাটা জমে ক্ষীর হবে বলেই মনে হচ্ছে। হুইস্কির গ্লাস রেখে দিয়ে দুই আঙুল তুলে পাশের একজনকে ইশারা করল সে। লোকটা এগিয়ে আসতেই তার কানে কানে কোনো নির্দেশ দিল অরণ্য। পরক্ষণেই লোকটি ভিড়ে উধাও হয়ে গেল। ফিরে এলো একটি মাইক্রোফোন নিয়ে। অরণ্যর হাতে দিতেই সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সামনে। অতিথি সকলে বসকে লক্ষ্য করে মুহূর্তেই সরে জায়গা করে দিল। অরণ্য কন্ঠ পরিষ্কার করে মাইক্রোফোনে বলে উঠল,

“হ্যালো।”
বসের কন্ঠস্বর সাউন্ড সিস্টেমে প্রতিধ্বনিত হতেই নাচ এবং উদযাপনে ব্যস্ত থাকা সকলে জমে গেল। মুহূর্তেই ভদ্রবেশে দাঁড়িয়ে গেল চারপাশে। স্টেজের উপরে থাকা সাইবান বাটন টেনে ভলিউম কমিয়ে দিল। কান থেকে নামিয়ে রাখল হেডফোন। সুচারু নজরে সামনের দিকে তাকাল। অরণ্যর শকুনে চোখজোড়া বরাবর তার দিকেই আবদ্ধ। মুচকি হাসল সে, অমায়িক এক হাসি।
“আজকের এই মনোমুগ্ধকর আয়োজনের জন্য আমি আমার প্রত্যেক কর্মচারীকে মন থেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আপনারা আমার জন্য এত বিশাল একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছেন, আমার অনুভূতি ব্যক্ত করাটা দুষ্কর।”
আশেপাশে উৎসাহ এবং হাততালির ঝড় উঠল। বসকে কেই না খুশি করতে চায়! অরণ্যর হাসিটা ক্রমশ বিস্তৃত হলো, সে স্টেজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মিস্টার চৌধুরী, রাকিন, রবি, লায়লা, আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ এই আয়োজনটা এত সুন্দরভাবে করার জন্য। আপনারা সবাই আমার জন্য এতকিছু করেছেন, তাই আমারও উচিত নয় কি আপনাদের উদ্দেশ্যে কিছু করা? বলুন কি চান আপনারা?”
চারপাশে গুঞ্জন উঠে গেল।

“না না বস। এই উদযাপনে আপনি সামিল হয়েছেন তাতেই আমরা খুশি।”
“হ্যাঁ। আমাদের প্রত্যেকের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”
“কোম্পানির সাফল্য আমাদের সাফল্য!”
সকলেই তোষামোদে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অরণ্য বিনোদনমূলক দৃষ্টি নিয়ে সবটা দেখে গেল। অতঃপর ভিড়ের মাঝখান থেকে হঠাৎ একজন হাত তুলে বলে উঠল,
“বস বস! আপনার গলায় একটা গান শুনতে চাই!”
কথাটা ঠিক কে বলেছে দেখা গেলনা। এর আগেই একযোগে বাকিরা বলে উঠল,
“হ্যাঁ! আপনার গলায় গান!”
“আমাদের উপহার!”
সবাই একযোগে হাততালি দিয়ে উঠল যেন মহা বিখ্যাত কোনো গায়ককে উদ্দীপনা যোগানো হচ্ছে। বসের মন ভোলানোর জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! বাঁকা হাসল অরণ্য, চারপাশের উন্মাদ উত্তেজনা থামাতে একটি হাত তুলে বলল,

“ওকে ওকে। ফাইন। একটা গান তো? গাইতে সমস্যা কোথায়?”
“ইয়ে! সিং! সিং!”
“অবশ্যই। তবে আমার সঙ্গে আমাদের ডি জে সংগত করলে ব্যাপারটা জম্পেশ হয়, বলুন?”
এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো চারিদিকে। কেউ কোনো টু শব্দও করলনা। স্টেজের উপর থেকে নির্লিপ্ত চেয়ে রইল সাইবান। অরণ্য হাসিমুখে তাকাল তার মুখপানে,
“আফটার অল, আমি শুনেছি আমাদের ভেরি মাচ ট্যালেন্টেড ডি জে গান কম্পোজিংও করেন। ওনার গায়কীও অসাধারণ ধরে নিচ্ছি। সংগত করতে ক্ষতি কি?”
“ডি জে আলাদিন! ডি জে আলাদিন!”
অরণ্যর কথার তালে সবাই অদ্ভুতুড়ে এক উল্লাসে ফেটে পড়ল। দৃষ্টি সরু হয়ে এলো সাইবানের। অরণ্য ঠিক কি করতে চাইছে তার বোধগম্য হলোনা। তবে এমন ওপেন চ্যালেঞ্জে পিছপা হওয়ার বান্দা সে নয়। মৃদু হাসল সে তাই। প্যানেলে হাত বাড়িয়ে সাউন্ড ঠিকঠাক করতে করতে সে বলল,
“লাভ বই ক্ষতির কিছু তো দেখছিনা।”
জায়গাটা কোনো স্টেডিয়াম নয়। তবুও বাকিদের তীব্র উল্লাসধ্বনিতে অনুভূত হলো যেন স্টেডিয়ামে হাজার দর্শকের মাঝে পারফর্ম করতে যাচ্ছে কোনো বিখ্যাত শিল্পী। তৎক্ষণাৎ হাতে হাতে উঠে এলো মোবাইল ফোন। কোনো কর্মচারীই নিজেদের বসের গান গাওয়ার মুহূর্তটা একবার দেখায় সন্তুষ্ট হবেনা। এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল তারার মতন। ছোট্ট একটা কনসার্ট হল মনে হলো জায়গাটাকে। অরণ্য ঠোঁটের সামনে মাইক্রোফোন ধরল। তার খড়খড়ে এবং খানিকটা বেসুরো কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,

~একেলা পাইয়াছি হেথা পালাইয়া যাবে কোথা~
গানের সুর ধরতে ধরতে স্টেজে জমে গেল সাইবান। ঝট করে ফিরে তাকাল। তার চেহারায় প্রথমবারের মতন বিস্ময় ফুটল। অরণ্য তাতে বিরাট এক হাসি উপহার দিল। তার গায়কী মোটামুটি, কিন্তু গুরুগম্ভীর কন্ঠটা সাউন্ডবক্সে হালকা সুরের মিশেলে এমনভাবে ধ্বনিত হচ্ছে যে মন্ত্রের মতন লাগছে। অশুভ মন্ত্র! আশেপাশের সকলে এতক্ষণ যাবৎ চিৎকার করছিল, তালি দিচ্ছিল, তবে সবাই এখন মন্ত্রমুগ্ধ। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে দৃশ্যপটে। অরণ্য ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গাইতে থাকল,
~চৌদিকে ঘিরিয়ারে রাখব, চৌদিকে ঘিরিয়ারে রাখব
সব সখীগণে~
তেজী হয়ে উঠল অরণ্যর কন্ঠস্বর। যেন কোনো গান গাইছে না সে, সরাসরি কথা বলছে সাইবানের সঙ্গে। বরফের ন্যায় চেয়ে রইল সাইবান, অরণ্যর কন্ঠ তার কানে গোত্তা খেল বারংবার,
~আজ পাশা খেলব রে, শাম~

ঠোঁটের অমায়িক হাসিটি ক্রমশ অদ্ভুতুড়ে হয়ে উঠল অরণ্যর। তার ছন্দ, সুর এবং ব্যাখ্যাতীত উপস্থাপন যেন প্রত্যেকের আত্মার শক্তিকে নিংড়ে দিয়েছে। এর মোকাবেলা করে সাধ্য কার? সাধ্য বোধ হয় একজনেরই। নিজের বরফসত্তা ত্যাগ করে মাইক্রোফোন হাতে স্টেজ থেকে নেমে এলো সাইবান। তার চেহারাটা আর আগের মতন শান্ত, নির্লিপ্ত নেই। তাতে ফুটে উঠেছে অজানা এক প্রলয়ংকরী ঘূর্নিপাক। গলায় ঝোলানো সাদা ওড়নাটা ভালোমত পেঁচিয়ে কাঁধের একপাশে তুলে দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে আসতে আসতে সাইবান অরণ্যর বিপরীতে গেয়ে উঠল,
~আঁতরও গোলাপও চন্দন মারো বন্ধের গায়ে~
অরণ্যর কণ্ঠের তুলনায় সাইবানের কন্ঠস্বর একেবারেই আলাদা। অস্বাভাবিক রকমের আলাদা। সুরেলা, গুরুগম্ভীর এবং অব্যক্ত অনুভূতিতে পূর্ণ। হঠাৎ করে শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে পারে, মনে হবে যেন কোনো অশরীরী গাইছে। রূপটাও ঠিক তেমনি। হেলেদুলে গা ছাড়া ভাব নিয়ে এমনভাবে সাইবান হেঁটে এসে অরণ্যর মুখোমুখি দাঁড়াল যে অরণ্য হাজার চেয়েও নিজের হাঁটুর বয়সী ছেলেটার উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা। সাইবানের চোখজোড়া গভীর কালো, এতটাই যে সেখানে তাকালেও বুঝি আপন সত্তা হারিয়ে যাবে। কেমন একটা অশুভ প্রভাব লেপ্টে আছে তার সমস্ত শরীরে, অঙ্গভঙ্গিতে এবং অভিব্যক্তিতে। তাই অরণ্যর বেলায় যারা মন্ত্রমুগ্ধ ছিল, সাইবানের বেলায় তারা ভয় পেল বেশি!

~ছিটাইয়া দাও শুয়া চন্দন, ছিটাইয়া দাও শুয়া চন্দন
ওই রাঙা চরণে~
অরণ্যর গা ঘেঁষে এসে তার পায়ের দিকে নির্দেশ করল সাইবান, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি চোখের দিকে,
~আজ পাশা খেলব রে শাম~
প্রথমবারের মতন অরণ্যর শান্ত এবং বিনোদিত চেহারায় হালকা চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল। ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো দারুণভাবে। হাত তার সামান্য কাঁপল। সাইবান মুচকি হেসে নিজের হাত বাড়িয়ে তার হাত ছুঁয়ে মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের সামনে তুলে দিল। অরণ্যর কন্ঠস্বর এবার ভাঙা ভাঙা শোনাল,
~শাম রে তোমার সনে, একেলা পাইয়াছি রে শাম~
~এই নিগূঢ় বনে~

পরের লাইনটা গাইল সাইবান। অরণ্যর চোখমুখ খিঁচে এলো। ছেলেটার গলা একদম বুকের ভেতর গিয়ে ঢাক পেটাচ্ছে এমন অনুভূতি হচ্ছে। অরণ্য বিশ্বাস করতে নারাজ, কিন্তু তার ঘাড়ের বেশ কতক লোম যে খাঁড়া হয়ে গিয়েছে সেটা সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে। সাইবানের চোখজোড়া অতীব কালো, যেন মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হয়েছে সে। সাদা ওড়নাটা অশুভ পেন্ডুলামের মতন দুলে দুলে যেন বিপদসংকেত দিচ্ছে। আশেপাশের মানুষের অবস্থা একে অপরে মত্ত থাকা পুরুষযুগল টের পাচ্ছেনা। অথচ দৃশ্যটা এতটাই সম্মোহনী এবং প্রভাবশালী যে প্রত্যেকে নিজেদের স্থানে পাথরমূর্তি হয়ে আছে। যেন নিঃশ্বাস ফেললেও এই মুহূর্তের অসাধারণ অলৌকিকতা ভেস্তে যেতে পারে। কারো নিজেদের চালু করা ভিডিওর প্রতিও বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। বনের বাঘ এবং সিংহ মুখোমুখি হলে কেমন দেখতে লাগে, সেটা অনুভবের আর প্রয়োজন নেই কারোরই। অরণ্য এবং সাইবানের কন্ঠস্বর এবার একযোগে মিলিত হলো। বাহ্যিকভাবে সুরের লড়াই, কিন্তু অভ্যন্তরে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে সম্মিলিতভাবে বারংবার প্রতিধ্বনিত হয়ে গেল,
~আজ পাশা খেলব রে শাম
আজ পাশা খেলব রে শাম~

ইরাম বেশ চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছে। মিসির আধ ঘণ্টা আগে নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। ইরাম আটকানোর চেষ্টা করেছিল, লাভ হয়নি। যদিও মিসির অফিসের কাজের বাহানা দিয়েছে, ইরাম নিশ্চিত তেমন কোনো কাজ তার নেই। সে শুধুমাত্র সারিকার কাছ থেকে দূরে যেতে চাইছে। সারিকাও সেই যে নিজের রুমে গিয়ে ঢুকেছে, দরজা লক করে বসে আছে। তিতলি আজ বাড়িতে নেই। সে যে ক্লাসমেটের ভাইয়ের বিয়েতে এসেছে, তার গ্যাংয়ের সাথে দুপুরের পরেই ঘুরতে বেরিয়েছে। এখনো ফেরেনি। বাড়িতে থাকা সুগন্ধা এবং অনুরাগ অবশ্য এতকিছু জানে না। অনুরাগকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। সে বসার ঘরের সোফায় বসে ফোন ঘাঁটছে। সুগন্ধা রান্নাঘরে সকলের রাতের খাবার গরম করছে। তারা সত্যিই বিশ্বাস করেছে মিসির এমনিতেই চলে গিয়েছে। আসল ঘটনা ইরাম ছাড়া তো কেউ জানেনা!
“বৌদি। অনেকক্ষণ যাবৎ দেখছি আপনি পায়চারি করছেন। কোনো সমস্যা?”
অনুরাগের প্রশ্নে ইরাম থমকাল। কি বলবে বুঝতে পারলনা।

“না। কিছুনা। এমনিই।”
অনুরাগকে আশ্বস্ত মনে হলোনা।
“সাইবানকে কল করব?”
ইরাম জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
“ও শো তে আছে। বিরক্ত করার দরকার নেই। আমি ঠিক আছি, সত্যি।”
জোরপূর্বক নিজের পায়চারি থামিয়ে সোফায় বসল ইরাম। বিষয়টা নিয়ে তার একটু বেশিই চিন্তা হচ্ছে। কারণটা হয়ত অতীত। যদিও তার এবং অরণ্যর সম্পর্কের সঙ্গে সারিকা এবং মিসিরের কোনদিক দিয়েই মিল নেই, তবে বিয়ের পরের এই অনুভূতি জটিলতা, অসৎ আচরণ ইরাম মানতে পারেনা। এজন্যই বোধ হয় তার এমন চিন্তা হচ্ছে। তাছাড়া, একটা সংসারকে এভাবে নষ্ট হতে সে চুপচাপ বসে বসে দেখবে তাতেও কেমন হীনমন্য লাগছে। আচ্ছা, সে কি সামিয়াকে জানাবে সবকিছু? তাছাড়া সাইবান? সে জানেনা নিজের বড় বোন আর বেস্ট ফ্রেন্ডের সম্বন্ধে? এটা বিশ্বাস করাটা কঠিন। না চাইতেও মিসিরের জন্য খারাপ লাগছে ইরামের। লোকটাকে দেখে মনে হয়, সে চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু কোনো চেষ্টাই যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেনা।
আচ্ছা, ইরাম নিজে কি সারিকার থেকে ব্যতিক্রম?

হুট করে অপ্রত্যাশিত চিন্তাটা ঘিরে ধরল ইরামকে। অন্যের বেলায় সে দেখে সবকিছু বুঝে যাচ্ছে। অথচ নিজের বেলায় কি বুঝতে শিখেছে? সাইবানকে যদি মিসিরের জায়গায় বসানো হয়, তাহলে ছেলেটা কি তার জন্য কম করেছে? কিন্তু ইরাম বিনিময়ে ছেলেটাকে ঠিক কি দিয়েছে? সারিকার মতন উপেক্ষা হয়ত করেনি তবে অনুভূতির বিনিময়ও ঠিকঠাক করেনি। হ্যাঁ, ইরামের কাছে সবটাই এখনো অস্থায়ী মনে হয়। যেন একটা ঝোড়ো বাতাস এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিতে পারে। অরণ্য বর্তমান থাকাকালীন ইরামের আতঙ্ক কখনোই মুছবে না। কিন্তু সেই আতঙ্ক ধরে থাকলে সাইবানের সঙ্গে কি অন্যায় করা হবে?
ইরাম উত্তরটা ভাবতে পারলনা। এর আগেই ক্ষীপ্র পদশব্দ তার মনোযোগ ভাঙল। অজান্তেই মাথা হেলিয়ে তাকাল সে। সিঁড়ি বেয়ে হনহন করে নেমে আসছে সারিকা। একটা কুর্তি আর জিন্স পরনে। হাতে লাগেজ। অবাক হয়ে গেল সবাই। ইরাম প্রশ্ন করার আগেই অনুরাগ বলে উঠল,

“কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
সারিকা থামলনা। এমনকি ঘুরে অব্দি তাকালনা। লম্বা পা ফেলে হন্তদন্ত হয়ে এগোল সোজা দরজার দিকে। সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে পড়ল অনুরাগ। দ্বিধায় ভুগল। সেটা খেয়াল করে ইরাম উঠে গেল, কাছে গিয়ে সারিকার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“কোথায় যাচ্ছ?”
“ঢাকা। সামনে থেকে সরুন।”
ইরামকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল সারিকা, কিন্তু রমণী সরলনা। পাল্টা ঝাঁঝ নিয়ে বলল,
“ঢাকা যাবে মানে? এত রাতের বেলা? একা একা? মগের মুল্লুক নাকি?”
সারিকাকে বেশ ক্রুব্ধ দেখাল। কিন্তু ইরাম দমলনা। নিজের ফোনটা তুলে খানিকটা কঠোর গলায় বলল,
“যদি যেতেই হয়, অপেক্ষা করো। আমি মিসির ভাইয়াকে কল করছি। উনি দাঁড়াবেন, তোমাকে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দিয়ে আসা হবে।”

“ওর ফোন বন্ধ।”
সারিকার কথায় জমে গেল ইরাম। চোখ পিটপিট করল। তবুও কল দিল। সত্যিই কল না ঢুকে কেটে গেল।
“আপনি আমার মম লাগেন না, তাই আলগা জ্ঞান দেবেন না। আমি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে জানি। সামনে থেকে সরুন এবার!”
ইরামকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে এগোল সারিকা। ততক্ষণে উত্তেজনা টের পেয়ে সুগন্ধাও বসার ঘরে চলে এসেছে। বিরাট বিস্ময় এবং আতঙ্ক নিয়ে সে দৃশ্য দেখছে। তবে সারিকা বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে পারলনা। এর আগেই তার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল অনুরাগ। শান্ত এবং ভদ্র ছেলেটাকে প্রথমবারের মতন চটতে দেখল বাকিরা। অনুরাগ ধমকে উঠল রীতিমত,
“এখানে কি যাত্রাপালা চলছে? রাত বিরাতে এসব কোন ধরণের রেকলেস আচরণ? ঢাকা যাবেন? ফাইন! কালকে সকালে, আমি পৌঁছে দিয়ে আসব। একটা কথা না আর, চুপচাপ বাড়ির ভেতরে ঢুকুন!”
অনুরাগেরও তবে তেজ আছে! ইরাম এবং সুগন্ধা উভয়ে বিস্মিত। সুগন্ধা একটু বেশিই হতচকিত। কিন্তু সারিকা নিজ স্থানে অটল। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। হুট করে একটি হাত তুলে অনুরাগের বুক বরাবর ধাক্কা দিয়ে বসল সে, পাল্টা গর্জে উঠল সিংহীর ন্যায়,

“আমি আমার স্বামীর কাছে যাব। আমাকে রোখার তুমি কে?”
অনুরাগ ধাক্কা খেয়ে সামান্য পিছিয়ে গেল। চোখেমুখে অবিশ্বাস ফুটল তার। তেজ রূপান্তরিত হলো চমকে। সারিকার চোখে কোনো নমনীয়তা নেই। তাতে গভীর অভিমান এবং সুতীব্র ক্রোধ। আঙুল তুলে রমণী তাকে শাসাল,
“একদম অধিকারবোধ ফলাতে আসবেনা। আমার জীবন, আমার সংসার, আমার ইচ্ছা, আমার মর্জি, আমার স্বামী! আর আমার ইচ্ছা হয়েছে আমি এখানে থাকব না, তো থাকব না। এক সেকেন্ডের জন্যও না। গেট আউট অব মাই ওয়ে!”
নির্দয়ভাবে অনুরাগকে আরেকটা ধাক্কা দিয়ে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিল সারিকা। অনুরাগ দরজার সাথে গিয়ে গোত্তা খেল। সারিকা দেখল না ফিরে। গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে। দৃশ্যটা এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল যে সকলে বেশ কিছুক্ষণ কোনো প্রতিক্রিয়াই করতে পারলনা। অনুরাগকে ভীষণ মর্মাহত দেখাচ্ছে। সুগন্ধা হাতের আঙুলের মাঝে নিজের ওড়না পেঁচাতে লাগল। সে কি কিছু করবে? কিছু বলবে? উচিত হবে? তার অবশ্য হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হলনা। এর আগেই ইরাম বলল,

“অনুরাগ। আমার সাথে চলো, সারিকার পিছনে যাব। আর সুগন্ধা, কুচুপু ঘুমিয়েছে। ওর খেয়াল রেখ। আমরা যত দ্রুত সম্ভব চলে আসব।”
দেরী করলনা ইরাম আর। ওড়না কাঁধে ছড়িয়ে মাথায় ঘোমটা তুলে এগোল। অনুরাগও বিনা বাক্য ব্যয়ে পিছু নিল। সুগন্ধা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাদের চলে যেতে দেখল। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে তার। কেমন অশান্তি হচ্ছে। তাই দুহাত জুড়ে চোখ বুঁজে সে আপনমনে ফিসফিস করল,
“ভগবান, রক্ষা করো।”

পার্টি সমাপ্ত প্রায়। অথচ সাইবান এবং অরণ্যর পরিবেশনার রেশ এখনো কাটেনি কারো ভেতর থেকে। প্রকাশ্যে না বললেও ফিসফিসানি এবং গুঞ্জনে মুখরিত চারপাশ। এমন অদ্ভুত জুটিকে ঠিক কেমন উপাধি দেয়া যায়? বন্ধু? শত্রু? অন্যকিছু? তাদের ভেতরের শীতল দৃষ্টি বিনিময়, অব্যক্ত কথন, একে অপরের প্রতি নিক্ষিপ্ত প্রতিটা নীরব আগ্রাসনকে ঠিক কি দ্বারা আখ্যায়িত করা যায় কারো জানা নেই। কিন্তু অবশ্যই এই নিয়ে বিষদ কৌতূহল দেখানো হয়ত নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মা*রার সামিল হবে।
সাইবানের কাজ শেষ। ঘেমেনেয়ে একাকার সে। ব্যাকস্টেজ থেকে টি শার্ট বদলে নিয়েছে। টিমের ছেলেরা আস্তে আস্তে গোছগাছ শুরু করছে। পার্টি থেকে এখনো কেউ যায়নি। কারণ অরণ্য উপস্থিত। বস যতক্ষণ না প্রস্থান করছে ততক্ষণ সমাপ্ত করা যায়না কিছুই। ব্যাকস্টেজ থেকে রুফটপে ফিরে এসে অরণ্যকে দূরে এক কোণায় রেলিংয়ের ধারে দেখল সাইবান। রুফটপের চারপাশে সুরক্ষার জন্য প্রায় কোমর সমান উচ্চতার লোহার শিকের গেটের মতন দেখতে রেলিং দেয়া আছে। সেখানে দুহাত রেখে ভাবুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য। সাইবান চাইলে চলে যেতে পারে। হয়ত তাকে রোখা হবেনা। কিন্তু সে গেলনা। হেঁটে এগোল অরণ্যর দিকে।

সাইবানের পদশব্দ টের পেল অরণ্য। তবে ঘুরে তাকালনা। নিঃশব্দে পকেট থেকে লাইটার আর দুটো সিগারেট বের করল। একটা ধরিয়ে ঠোঁটে পুরে ধোঁয়া ছাড়ল বাতাসে। সাইবান তার পাশে দাঁড়াল। রেলিংয়ে হাত রেখে তাকাল আকাশের দিকে। অরণ্য নীরবে অপর সিগারেটটি বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। আপাতদৃষ্টিতে দুজনকে দেখলে মনে হবে তারা পরিচিত বন্ধু!
অরণ্যর দেয়া সিগারেটটা সরিয়ে দিয়ে হাত নাড়ল সাইবান।
“থ্যাংকস। ট্রায়িং টু কোয়াইট।”
ভ্রু তুলল অরণ্য। সাইবানের মুখে আকাশে উদিত হওয়া একফালি চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। তাতে একইসঙ্গে কেমন অশরীরী এবং মায়াবী দেখাচ্ছে ছেলেটাকে।
“বাসায় বাবু আছে তো। সিগারেটে সংযত হওয়া দরকার।”
এবার অরণ্যর গায়ে লাগল। হাতের মাঝে সিগারেটটা সে মুচড়ে ফেলল। সাইবান আড়চোখে তার প্রতিক্রিয়া ঠিকই খেয়াল করল। ঠোঁটের জ্বলন্ত সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে তামাটে ধোঁয়া ছেড়ে অরণ্য খসখসে গলায় বলল,

“ভোগদখলে আলাদা একটা সুখ আছে।”
সাইবান কোনো প্রতিক্রিয়া করার আগেই মাথা কাত করে তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল অরণ্য,
“অপরের অবহেলার জিনিস হাত পেতে ভিক্ষা নেয়াটা খুব মজার, তাইনা?”
অরণ্যর কথায় পাল্টা একগাল হাসল সাইবান। দূর আকাশের পানে চেয়ে গভীর গলায় বলল,
“কারো তাকদীরের অবহেলার পাখি, আমার ঘরের সুখের রাণী। রাণী তো জঙ্গলে রাজ করেনা, রাণী রাজ করে রাজপ্রাসাদে।”
ক্ষণিকের জন্য অরণ্যর শরীর বরফখণ্ডে পরিণত হলো। পরক্ষণেই আবার সে নিজেকে স্বাভাবিক করে সাইবানের পাশ ঘেঁষে আসল।
“সো রাইট! প্রাসাদ আর জঙ্গল তো এক নয়। প্রাসাদ সভ্য আর জঙ্গল অসভ্য। সভ্য অসভ্যের লড়াইয়ে জয়টা অসভ্যের হয়।”
এবার খানিক শব্দ তুলে খিলখিল করে হাসল অরণ্য, সেই হাসি ধ্বনিত হলো চারপাশে বেপরোয়াভাবে।
“সভ্য ছাড়া চলেনা দুনিয়া, অসভ্য লয় তার জীবন ছিনিয়া।”
সাইবান উল্টো ঘুরে রেলিংয়ে পিঠ হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দুহাত একত্র করে হাততালি দিতে দিতে বলল,
“আপনি ভুল সময়ে জন্ম নিয়ে ফেলেছেন কবি মহাশয়। আর একশো বছর আগে জন্মালে সাহিত্যের প্রথম নোবেলটা বাংলাদেশের বুকে আসতো। একটুর জন্য ইতিহাস মিস!”
অরণ্যর হাসিটা দ্বিগুণ হলো। রেলিংয়ের একপাশে হাত রেখে সাইবানের উপর ঝুঁকে এলো সে। দুজনের চোখ সমানে সমান, মুখোমুখি।

“তোমাকে উষ্ণ র*ক্তের প্রাণী ভেবেছিলাম। ঘটে কিছুটা শীতল ধৈর্য্য আছে জেনে ভালো লাগল। এবার পাশাটা আরো বেশি জমবে।”
“আর আপনাকে আমি কিছু ভাবিনি। ভাবার তো দরকার নেই। যার এক পা ইতোমধ্যে কবরে তাকে নিয়ে ভাবাভাবি করে সময় ক্ষেপণের কি দরকার?”
বাঁকা হাসি ফুটল সাইবানের ঠোঁটে। একটি হাত তুলে অরণ্যর স্যুটে লেগে থাকা কিছু অদৃশ্যমান বালুকণা ঝেড়ে দেয়ার ভান করে ফিসফিসিয়ে জানাল,
“আফটার অল, এমনিতেই আমার সময় কম। দিনে ৩৬ ঘণ্টা হলে ভালো হতো। সারা রাত, সারা দিনে ২৪ ঘণ্টার আদরে ক্ষুধা পোষাতে বড্ড টানাটানি পরে যায়।”
অরণ্য টলল। এবার সত্যিই অরণ্যর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙেছে সাইবান সেটা নিশ্চিত। লোকটার মুখে তীব্র বিতৃষ্ণা ফুটল। সমস্ত মিথ্যা মুখোশ উবে গিয়ে আসল ঘৃণাটা ছলকে বেরোল। তীব্র আক্রোশ ভর করল তার চোখেমুখে। রেলিংয়ে চেপে বসল আঙুল, কন্ঠটা ঘড়ঘড়ে শোনাল তার,
“কবর, কাফন শব্দগুলো তোমার ভীষণ পছন্দের মনে হচ্ছে। কখনো ভেবে দেখেছ কি? যার এক পা কবরে, তুমি তার আগেই কবরে দুই পা দিয়ে ফেলতে পারো? আফটার অল, এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, ওহে মানুষ কেন করো মিছে আশা?”

আমার আলাদিন পর্ব ৪৩

সাইবান পাল্টা কিছু বলতে পারলনা। শুধু অনুভব করল। যে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল, সেই রেলিংটা হুট করে নড়ে উঠল। যেমন করে দেয়ালের অংশ ধ্বসে পড়ে, তেমন করে সেকেন্ডের মাথায় লোহার রেলিংয়ের অংশটা ধ্বসে পড়ল নিচে। সাইবান আর কিছুর সাহায্য পেলনা। তার শরীরটা ভারসাম্য হারিয়ে পিছনের দিকে হেলে গেল। সম্পূর্ণ ঘটনাটা বুঝি কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মাঝে ঘটল। সাইবান অনুভব করল তার শরীরটা হাওয়ার মাঝেই ভাসছে। তীব্র বাতাসের ঝটকা তাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
স্থির অবস্থা থেকে পড়ন্ত বস্তুর বেগ সময়ের সমানুপাতিক।
অন্তিম মুহূর্তে নিউটনের পড়ন্ত বস্তুর সূত্রটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল সাইবানের, সঙ্গে কানে বাজল সম্মিলিত কণ্ঠের আর্তচিৎকার।

আমার আলাদিন পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here