আমার আলাদিন পর্ব ৪২
জাবিন ফোরকান
বিছানায় বেঘোরে ঘুমুচ্ছে সারিকা। উপুড় হয়ে বালিশে মাথা গুঁজে স্বপ্নের সবথেকে গুরুতর মুহূর্তটাই দেখছিল, ঠিক এমন সময়ে পিঠের উপর বুঝি কোনো একটা হাতির বাচ্চা লাফিয়ে পড়ল। চেঁচিয়ে উঠল সে,
“ওমাগো! ওমাগো!”
চোখ খুলে গেল তার। মেরুদণ্ডে ভয়ানক ব্যথা নিয়ে ধড়ফড় করে তাকাল পাশে। দেখল, ভাই তার পিঠের উপর গড়াগড়ি দিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ঘুম থেকে তোলার এমন জঘণ্য টেকনিক সারিকার মাথায় র*ক্ত চড়িয়ে দিল। ভয়ংকর একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে,
“আলাউদ্দিন!”
সাইবান রুদ্রমূর্তি বোনের উপর থেকে লাফিয়ে সরে গেল। জিভ বের করে ভেংচি কেটে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই দৌঁড় দিল রুমের বাইরে। বিছানা থেকে হাচড়ে পাচড়ে উঠল সারিকা। তাকে হিংস্র জন্তুর মতো দেখাল। এলোমেলো শুষ্ক চুল, জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে। ওই অবস্থায়ই ক্ষোভে চেঁচাতে লাগল সে,
“আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন! অত্ত বড় দামড়া ব্যাটা চুনোপুঁটির উপর লাফিয়ে পড়লে পুঁটির প্রাণ থাকে? ওই, দাঁড়া তুই, দামড়া!”
সাইবানের পিছনে ছুটে গেল সে। দুই ভাইবোনের পদশব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। সাইবান যে গতিতে দৌঁড়ে চলেছে তাতে তাকে ধরা মুশকিল। সরু করিডোর পেরিয়ে ঝপাৎ করে সে বসার ঘরের দিকে চলে গেল। পিছনে দৌঁড়ে এলো সারিকা,
“ওই হাতির নাতি! আজকে তোকে সাড়ে চুয়ান্নটা থাপ্পড় দিয়ে তবেই আমি…আহহহহ!”
সারিকা এত জোরে প্রাণপণ ছুটছিল যে দিগ্বিদিক কোনোকিছু জ্ঞানেই ছিলনা। সে খেয়ালও করেনি। শুধু নিজের মুখের উপর আঠালো পলিথিনের মতন কিছু জাপটে বসতে অনুভব করল সে। করিডোর থেকে বসার ঘরে যাওয়ার দরজার ফ্রেমজুড়ে বর্ণহীন স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল। সারিকা এসে সপাত করে জালে ধরা পড়া মাছের মতন সেটাতেই গোত্তা খেয়েছে। স্কচটেপ জড়িয়ে গেল তার সমস্ত মুখে। সঙ্গে বেরিয়ে এলো আর্তনাদ,
“আহাম্মকের ঢেলাটা! মওওওওম!”
কিন্তু সামিয়া যে এখানে নেই! সারিকা রীতিমত কাঁদোকাঁদো হয়ে মুখোশের মতন মুখে আর চুলে জড়িয়ে যাওয়া স্কচটেপ টানাটানি করতে করতে বসার ঘরে এসে পড়ল, তখনি সম্মিলিত কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,
“সারপ্রাইজ!”
সারিকা স্কচটেপ টানা থামিয়ে প্রসারিত দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই জমে গেল। বাড়ির বসার ঘরটাকে ক্ষণিকের জন্য চিনতেই পারলনা সে। চারিদিকে ঝুলছে রঙিন কাগজের কাটা ঝালর। দেয়ালজুড়ে বেলুন আর জরিফিতা। একপাশে বড় একটা পোস্টার টাঙানো। তাতে কাটাকুটি করে লিখা হয়েছে,
—আজ আপদকে জন্ম দিন।
সারিকা হতভম্ব হয়ে গেল। সাইবানের কল্যাণে অনেক রোমহর্ষক জন্মদিনের সারপ্রাইজ তার আগে পাওয়া হয়েছে। সেটা হোক তার বিছানায় ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া থেকে শুরু করে মিষ্টি কেকের বদলে স্পাইসি কেকের অর্ডার দেয়া। সব রকমের অত্যাচার সে এযাবৎকাল সহ্য করে এসেছে। তবে এবারের জন্মদিনের এই পরিবেশনাটা তার হৃদয়ে অন্যভাবে কড়া নাড়ল।
মেঝের একদম মাঝখান বরাবর দাঁড়িয়ে আছে মিসির। সাদা শার্ট আর কালো ফরমাল প্যান্ট পরনে। হাত দুটো পিছমোড়া করে রাখা, চেহারায় প্রজ্জ্বলিত খুশি। সে একা নয়, একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুগন্ধা, তিতলি। অন্যপাশে ইরাম এবং অনুরাগ। সকলে উপস্থিত। সুগন্ধার হাতে পার্টি স্প্রে, ইতোমধ্যে সেটা ছড়িয়ে ফেলেছে চারদিকে। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল সারিকা। কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারলনা। মিসির কয়েক পা এগিয়ে এলো, মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
“হ্যাপি বার্থডে, সারিকা।”
স্বামীর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের বাহ্যিক অবস্থার কথা বেমালুম ভুলে গেল সারিকা। তবে বাকিরা ঠিকই দেখল তাকে, দেখে হাসি চেপে ফেলল নিজেদের। পাখির বাসার মতন চুল, চেহারা আর মাথায় জড়ানো স্কচটেপ, একদম অসাধারণ সাজসজ্জা, শুধু মাথায় ডিম ভাঙার কমতি ছিল। সারিকা মিসিরের দিকে চেয়ে বুঝি হারিয়েই গিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু কানে ভেসে এলো,
“আরে, শুভ নববর্ষ অ্যাসাইলামের পাগলিটা!”
কোত্থেকে সাইবান উদয় হয়ে পিছন থেকে সারিকাকে জাপটে ধরে তার মুখে এক খাবলা সাদা সাদা কি যেন ঘষে দিল।
“ইয়া…আআআ…ছাড়! ছাড় বলছি!”
মুখে ঢুকে গেল সব। জিভে লাগতেই সারিকা টের পেল ওটা হুইপড ক্রিম। দুই ভাইবোনের ধস্তাধস্তি দেখে হাসল সবাই। অবশেষে সারিকা যখন ছাড়া পেল, তখন তার অবস্থা বিধ্বস্তপ্রায়। তাই ছাড়া পেত না, নেহায়েত মিসির হস্তক্ষেপ করল। সারিকার কাঁধে হাত রেখে কাছে টেনে সাইবানের থেকে উদ্ধার করে বলল,
“ব্যাস, অনেক হয়েছে শালাবাবু। তোমার মতন একটা পাঠা আমার আধ শুকনো বউটার টুঁটি টিপে ধরলে ওর কিছু থাকে?”
সাইবান গর্জে উঠল তৎক্ষণাৎ,
“আমি পাঠা? বেশ আমি পাঠা! নিজে তো একটা ঢ্যামড়া পাটকাঠি। বাতাস আসলে উত্তর থেকে দক্ষিণে গিয়ে পড়বেন!”
“আলাদিন।”
মৃদু গলায় সতর্ক করল ইরাম, কিন্তু মিসিরের চেহারায় বিরাট হাসি ফুটল। সে এসবে অভ্যস্থ। হাসতে হাসতে সে বলল,
“বলতে দাও, বলতে দাও আমার শালাবাবুকে। উনি যে খাস শয়তানের শিষ্য এটা সবাই জানে।”
“হ্যাঁ, আমি আপনার শিষ্য, আপনার পদধূলি পরাণে মেখে চলি।”
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল চারপাশ। সারিকার জন্মদিনের শুরুটা এমন নাটকীয়ভাবেই হলো। শেষমেষ বেচারীকে গোসল করে কাপড় পাল্টে তারপর আসতে হলো। কেক কাটা হলো। ইরাম এবং সুগন্ধা দায়িত্ব নিয়ে সব কাজকর্ম করল। প্লেটে প্লেটে খাবার সাজানো হলো, ঠিক যেমনটা করে অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই নিজেদের ছোটবেলায় জন্মদিন পালন করে এসেছে। সারিকা প্রাণভরে চেয়ে দেখল ইরাম প্লেট সাজাচ্ছে। কেক, মিষ্টি, চানাচুর, ফল, বাদাম ভাজা, পাপড়, চিপস, ওয়েফার এবং চকলেট দিয়ে। সঙ্গে সোডা।
“আমি কখনো ভাবিনি ছোটবেলার পর আর কখনো এভাবে বাচ্চাদের মতন করে জন্মদিন পালন করা হবে।”
সারিকার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল মিসির। সে শুনল স্ত্রী কি বলছে।
“আমি যখন ছোট ছিলাম, মম আর ড্যাড এভাবেই আমার জন্মদিন পালন করত। এখনকার মতন তখন আমাদের এত ধন দৌলত ছিলনা। কিন্ত আবেগ ছিল প্রচুর। প্রতিবেশী সব বাচ্চাদের দাওয়াত দেয়া হত। মম সব নাস্তা নিজের হাতে বানাত, সঙ্গে সকলের জন্য বিরিয়ানী। বর্তমানের উচ্চবিত্ত পার্টিগুলোর মতো এত জৌলুস, গিফটের বহর আর চাকচিক্য জগৎ তখন ছিলনা। অথচ আজও সেই সব স্মৃতি আমার মনে গেঁথে আছে।”
“জানি, তুমি আগেও একবার বলেছিলে।”
নরম গলায় বলল মিসির। সারিকা পাশ ফিরে তাকাল, পুরুষটির শান্ত মুখচ্ছবি দেখে গেল। আগে কখন বলেছে তার নিজের মনে নেই, তবে মিসিরের মনে আছে। তাহলে কি আজকের দিনটা সেভাবেই পরিকল্পনা করেছে স্বামী তার? সারিকা জানে না কেন, তার ভেতরে অদ্ভুতুড়ে একটা অনুভূতি হলো। এত এত নিঃস্বার্থ আবেদনের ভার সে কীভাবে বইবে? অজান্তেই তার নয়নজোড়া খুঁজে নিল ভিন্ন একটি অস্তিত্বকে। সুগন্ধা এক হাতে একত্রে তিনটি প্লেট নিয়ে যাচ্ছে বলে সোফা থেকে উঠে তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অনুরাগ। দৃশ্যটায় আঠার মতন চোখ আটকে গেল তার। খেয়ালই করলনা তার স্বামীও ঠিক একইভাবে বিষন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তারই দিকে।
ইযান ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। তাই উপরতলা থেকে ছেলেকে নিয়ে নিচে নেমে ইরাম খেয়াল করল এখন গিফট দেয়া নেয়ার পর্যায় চলছে। তিতলি হেসে একটা বক্স ধরিয়ে দিল সারিকার হাতে,
“হ্যাপি বার্থডে আপু, দিনদিন আরো সুন্দর হয়ে যান আর আমাদের দুলাভাইয়ের মাথা খান এই দোয়াই করি।”
“পাজি মেয়ে!”
হালকা ধমক দিয়ে হাসল সারিকা। বক্সটা খুলল। ভেতরে বিশেষ ডিজাইনার কামিজ এবং একজোড়া ম্যাচিং হিল। চকচক করে উঠল সারিকার চোখজোড়া,
“ওয়াও! এটা কি সুন্দর! থ্যাংক ইউ তিতলি!”
“এটা কিন্তু আমার নিজের ডিজাইন করা, লেটেস্ট, একদম ওয়ান পিস করেছি শুধুমাত্র তোমার জন্য।”
“তুমি অনেক ট্যালেন্টেড, তিতলি। এটা খুব সুন্দর, সত্যিই আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। থ্যাংকস।”
মুচকি হাসল তিতলি। এবার এলো সুগন্ধা। গলা খাঁকারি দিল। ওড়না ধরে আঙুলে পেঁচিয়ে যাচ্ছে সে,
“ওই মানে আফাজান, আমি মানে…”
ইতস্তত করল সে। এত দামী চাকচিক্যের মাঝে নিজের উপহার নিয়ে বোধ হয় অস্বস্তিবোধ করছে। বুঝতে পেরে সারিকা হাত বাড়িয়ে দিল।
“দে। এক্ষুণি আমার গিফট দিবি, আমি কোনো কথা শুনব না।”
সুগন্ধার গাল লাল হয়ে উঠল। দুহাত এগিয়ে একটা ছোট প্যাকেট সারিকাকে দিল সে। প্যাকেট খুলতেই ভেতর থেকে চুড়ি বেরিয়ে এলো। হাতে ডিজাইন করা রেশমি সুতার উপর পাথর বসানো চুড়ি। অদ্ভুত হলেও সত্য, তিতলি যে কামিজ দিয়েছে, সেটার রঙের সাথে চুড়িগুলো বেশ মানিয়েছে। চোখ কপালে তুলে ফেলল সারিকা।
“ওয়াও! তুই এসব কবে শিখলি রে মেয়ে?”
লজ্জা পেল সুগন্ধা।
“ওই মানে, বরিশালে আসার আগে আগে বানাইসি, জানতাম আপনার জন্মদিন মাঝখানে পড়বে। আমার হাত অত ভালো না, কিছু মনে কইরেন না।”
“হাত দুটো কে*টে আমায় দিয়ে দে। কিছু মনে করব না আর।”
খিলখিল করে হেসে উঠল সবাই,
“সত্যি রে, এটা অনেক সুন্দর হয়েছে। এখন থেকে আমার জন্য বানিয়ে রাখবি, তোর থেকে চুরি করে নিয়ে যাব কিন্তু প্রতিবার!”
“আইচ্ছা আফা, নিয়েন!”
ভীষণ খুশি হলো সুগন্ধা। তার সামান্য উপহারে সারিকা এত খুশি হয়ে যাবে ভাবেনি।
“সত্যিই বেশ সুন্দর হয়েছে। আমার মাও এমন চুড়ি খুব পছন্দ করে। অনলাইন থেকে নিয়েছিল কিছুদিন আগে। কিন্তু সেগুলোর থেকে তোমার ডিজাইন অনেক ইউনিক লাগছে।”
মন্তব্য করল অনুরাগ। বুকে দুবাহু বেঁধে সে সারিকার হাতে পড়ে নেয়া চুড়িগুলো দেখছে। সুগন্ধা মাথা কাত করে তাকাল। যেটুকু লজ্জাবোধ ছিল, সেটুকু উবে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অনুভূতি ভর করল তার বুকের ভেতর। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সেই উত্তাল আবেগ টুকু নিয়ন্ত্রণ করল সে, বলল,
“আমি আপনার মায়ের জন্য একজোড়া বানিয়ে দিবনে।”
“না না, আমি তো এমনিতেই..”
“আপনি যখন মুখ থেকে বাইর করসেন, তখন আপনাকে নিতেই হবে। নাইলে আমি রাগ করব।”
অনুরাগ থতমত খেয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল সুগন্ধাকে। সে এমনিতেই কথাটা বলেছিল, তবে মেয়েটা এভাবে জোর করতে পারে ভাবেনি। শেষমেষ একটি নিঃশ্বাস ফেলে মুচকি হাসল সে,
“ঠিক আছে। দিও। এখন থেকেই বলে রাখতে পারি, আমার মা খুব খুশি হবে।”
সারিকা চুপচাপ দৃশ্যটা দেখল। কোনো মন্তব্য করলনা। এবার এগোল সাইবান। একটা পলিথিনের পুঁটলি সটান ছুঁড়ে দিল সে বোনের কোলে। সারিকা ঘাবড়ে গেল। পলিথিনটা দুই আঙুলে এমন সতর্কভাবে তুলে ধরল যেন সেখানে নিষিদ্ধ কোনো বস্তু আছে। তীর্যক হাসল সাইবান,
“গাঞ্জা দেইনি, শুঁকে দেখতে পারিস।”
“ছিঃ! অসভ্য!”
ভাইয়ের বাহুতে চাপড় মেরে পলিথিনটা খুলে উপুড় করে সোফায় ঢালতেই চিৎকার দিয়ে একটা লাফ দিল সারিকা। ওই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অনুরাগ, তাই রমণীকে ধরে ফেলতে বাধ্য হলো সে।
“সাবধানে!”
“বোম দিসে নাকি ভাইজান? দিলেও দিতে পারে, বিশ্বাস নাই!”
সুগন্ধা টিটকারী মারতেই সাইবান হাত দিয়ে ছোবলের মতন করে তার গায়ে চিমটি কেটে দিল। কেঁপে উঠে নিজের ত্বক ঘষতে লাগল সে। তিতলিই সাহস করে এগিয়ে সোফা থেকে জিনিসগুলো হাতে তুলে নিল। অনুরাগের বাহুর মাঝে সারিকা হাত তুলে কাঁপতে লাগল,
“তে…তেলাপোকা! তেলাপোকা!”
মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে জিনিসগুলো তুলে ধরল তিতলি। সিলভারের রিংয়ের সঙ্গে ঝুলছে দুটো তেলাপোকা, আসল নয়, প্লাস্টিকের।
“আরে আপু, এগুলো তেলাপোকা শেইপড কানের দুল!”
সারিকার মুখে ছায়া নেমে এলো। অশনির দৃষ্টিতে সে তাকাল ভাইয়ের দিকে যে বত্রিশ পাটি দাঁত কেলিয়ে হাসছে। সুগন্ধা মুখ টিপে বলল,
“মাথার সার্কিট হাউজ নষ্ট না হইলে কেউ নিজের বোনরে জন্মদিনে তেলাপোকার দুল উপহার দেয়?”
“সাইবানের বাচ্চাআআআ!”
হুংকার দিল সারিকা। সোফা থেকে পলিথিনটা তুলে হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“আজকে এই পলিথিনে বেঁধে যদি তোকে পুকুরে না চুবিয়েছি আপদ কোথাকার!”
সাইবান দাঁড়ালনা, তৎক্ষণাৎ দৌঁড় দিল। তিতলির হাত থেকে ছো মেরে দুলজোড়া নিয়ে তার পিছু পিছু ছুটল সারিকা।
“এই তেলাপোকা আমি তোর কানে পড়াব, শালা দামড়া পাঠা!”
“তেলাপোকা ছাগলে খায়, তুই ট্রাই করতে পারিস, মচমচে ভাঁজা ভাঁজা!”
“সাইইই!”
“হেহেহে!”
অদূরে দাঁড়িয়ে সবাই ভাইবোনের হুলুস্থুল কান্ড দেখে গেল শুধু। ইরামও ইযানকে কোলে দোলাতে দোলাতে হাসল মনে মনে। তবে চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই সে দেখল মিসিরকে। এতগুলো মানুষের মাঝে একমাত্র সেই ব্যক্তিটির ঠোঁটেই আজ হাসির বড্ড অভাব।
দুপুরের রান্নাটা আজ ইরাম করবে। মোরগপোলাওয়ের জন্য সবকিছু তৈরি আছে। সে বিশাল পাতিলে মাংস চড়িয়ে দিয়েছে। আরেকটা চুলায় পায়েসের দুধ ফুটতে দিয়েছে। ইযান তার বুকে লেপ্টে আছে। মাত্র খেয়েছে তাই অন্য কারো কোলে যায়নি, এখানেই মায়ের সঙ্গে সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে সে। ইরাম কাজে মগ্ন ছিল। তাই খেয়ালই করলনা কখন তার পিছনে এসে দাঁড়াল কেউ। শুধু গভীর কন্ঠস্বরটা কানে গেল,
“কোথাও একটু স্বামীর খেদমত করবে তা না, রান্নাঘরে সিঁধিয়ে বসেছে।”
চমকে উঠল ইরাম। পিছন ফিরে তাকানোর আগেই তার কোমরজুড়ে একজোড়া বাহু জড়িয়ে গেল। বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলনা তার।
“ছাড়, আলাদিন। কেউ এসে পড়বে।”
তার কাঁধে মুখ গুঁজে প্রাণভরে প্রশ্বাস টানল সাইবান। ফিসফিস করল,
“আসলে আসুক। দেখবে আমি আপনাকে আদর করছি।”
“ছিঃ। অসভ্য একটা।”
“বউকে আদর করা যদি অসভ্যের কাজ হয় তাহলে আমি বিশ্বসেরা অসভ্য।”
ইরামের গাল দুটো রেঙে উঠল। দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়াল সে। ইযানকে এগিয়ে দিল,
“ওকে কোলে নিয়ে চুপচাপ সবার সাথে বসার ঘরে গিয়ে বসো, যাও।”
“আই!”
ইযান নিজের ছোট ছোট হাত পা দুখানা নাড়িয়ে শব্দ করে উঠল। সাইবানের ভ্রু কুঁচকে গেল। অবিশ্বাস্যভাবে সে তাকে কোলে না নিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল। ইরাম বিস্মিত হলো।
“আমার কোলে কোনো বিশ্বাসঘাতকের জায়গা নেই।”
“আ…বা?”
আঙুল চুষতে চুষতে মাথা কাত করে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকাল ইযান। আঙুল তুলে গর্জে উঠল সাইবান,
“দেখ দেখ, কেমন নিষ্পাপের মতন তাকাচ্ছে পাপীটা! ভাঁজা মাছটাও যেন উল্টে খেতে জানে না! অথচ সময়মত ঠিকই বাঁশি বাজিয়ে দিতে জানে! বেঈমানের ঘরের বেঈমান একটা!”
“আলাদিন, কি বলছ তুমি?”
না পারতে হেসে ফেলল ইরাম। ইযান পা দুখানা ছুঁড়ে যেন প্রতিবাদ জানাল,
“আ…গু!”
“হ্যাঁ। গুয়ের সর্দার তুই, পোটলা! তোর ডি এন এ দানবীর আছে না? তুই ওটার এক নম্বর গোয়েন্দা। আমি শিওর তুই ওই দানবীরের যোগ্য উত্তরসূরী, এজন্যই তোর মায়ের সাথে আমার লীলাখেলা হজম হচ্ছে না তোর। যা, আমিও কোলে নেবনা তোকে আর, আমার হাত ক্ষয়ে যাবে না, যত্তসব!”
“আআ…আআআ!”
কেমন যেন ছটফট করে উঠল ইযান। এত জোরে হাত পা ছুঁড়তে লাগল যে ইরাম সামলাতে বেগ পোহালো।
“আরে, কুচুপু!”
“উয়াআ!”
ইরামের কোলে যেন সে থাকবেই না। এবার চোখ ভিজিয়ে বুক ভাসিয়ে ভয়ানক কান্না জুড়ে দিল। সাইবান উল্টো ঘুরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু কান্নার শব্দ শুনে থমকে গেল। ফিরে তাকাল। দেখল ইরাম বুকে চেপে ছেলেকে দোলাচ্ছে,
“না না, এইযে আম্মু। আব্বু তো মজা করছে, একটুখানি রাগ করেছে, এইযে একটু! কাঁদেনা আমার কুচুপু, আমার সোনাটা।”
সাইবানের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল। শক্ত একটি ঢোক গিলল সে। দারুণ অপরাধবোধ গ্রাস করল তাকে। ওই কান্নার ধ্বনি তার সবটুকু আগ্রাসী অভিমান ভেঙে চুরমার করে দিল। লম্বা পায়ে এগিয়ে এলো সে।
“আমার কাছে দিন।”
বলেই সে হাত বাড়িয়ে ইযানকে তুলে নিল। নিজের বুকে চেপে ধরতেই ছোট হাত পা ছড়িয়ে তার শক্ত বুকে লেপ্টে ফোঁপাতে লাগল বাচ্চাটি। তাকে নিজের সঙ্গে যত্ন নিয়ে আগলে রেখে সাইবান রান্নাঘরের একপাশে পায়চারি করতে লাগল।
“মহারাজের আবার গোস্সাও আছে। নিজেই বাগড়া দেবে, আবার নিজেই ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদবে। নাটকবাজ সব আমার ঘাড়েই কেন যে ওঠে!”
“উয়া! আ!”
“আরে না না, আমি গালি দিচ্ছি না। এইতো এইতো, আমি প্রশংসা করছি। পোটলা একটা গুয়ের ডিব্বা, একটা লঞ্চের সাইরেন, একটা গোলুমুলু – লাল্টুফুল্টু মরিচপোড়া, একটা অসহ্যকর পাঁকনা বিষফোঁড়া!”
কথাগুলো সাইবান এমনভাবে হাসিমুখে আদর দিয়ে বলছে যে শয়তানও বুঝি দেখলে দ্বিধায় পড়ে যাবে। ইযানও কান্না থামিয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। তার ঠোঁটে হাসি ফুটেছে, কারণ পিতা তার ভুয়সী প্রশংসা করছে বলে কথা! অদূর থেকে ইরাম মনোমুগ্ধ নয়নে দেখে না হেসে পারলনা। সে রান্নায় মনোযোগ দিল।
সাইবান ইযানকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরের বাইরে চলে এলো। তার ঘাড় জড়িয়ে আয়েশ করে পড়ে আছে বাচ্চাটা, মুখ ঘষছে ক্ষণে ক্ষণে আর শব্দ করছে।
“আমার একটামাত্র টিকটিকির ডিম রে! আমার বাসরঘরের খাইস্টা দারোয়ান রে! বাপের পিছনে আগুন দেয়া বিচ্ছু সৈন্যটা রে!”
“উই!”
ইযান চরম খুশি! তাই সে লাথিও দিচ্ছেনা। সাইবানের মাঝে মিশে শান্তভাবে পরে আছে। মৃদু হাসল সাইবান। অজান্তেই ইযানকে অতি আদুরেভাবে ধরে তার মাথায় ছোট্ট একটা চুমু বসিয়ে ফিসফিস করল,
“মাই ক্রেজি বেবি বয়, মাই সুইট এনেমি।”
এমন সময়েই পকেটে ফোন ভাইব্রেট করে উঠল সাইবানের। এক হাতে ইযানকে ধরে রেখে অন্য হাতে ফোন রিসিভ করল সে। তার ম্যানেজার ফোন করেছে। ম্যানেজার বলতে, টিমের একজন যে তার শো গুলো বুকিংয়ের কাজ করে থাকে। ছেলেটা বয়সে সাইবানের সমান প্রায়। তাই তুমি তুমি করেই কথা হয়।
“হ্যালো?”
সাইবান বলতেই ওপাশ থেকে বলা হলো,
“হ্যাঁ, সাইবান? একটা আর্জেন্ট শো এর অফার এসেছে। বরিশালেই। আজকে রাতের। একটা প্রাইভেট পার্টি।”
সাইবানের ভ্রু কুঁচকে গেল, তৎক্ষণাৎ মাথা দোলাল সে,
“মানা করে দাও। আমি এমন লাস্ট মিনিটে শো নেই না জানো না তুমি?”
“হ্যাঁ। আমিও সেটাই বলেছি। কিন্তু ওরা ডাবল অফার করছে। বলল, তুমি যা চাইবে তাই দেয়া হবে। শুধু শো টাতে তোমাকেই চাই।”
এইবার সাইবান একটু থমকাল। ইযানকে কাঁধে ঠেলে দিল, বাচ্চাটি মুখ গুঁজে চুপটি করে পিতার কথা শুনে যাচ্ছে, একটুও বিরক্ত করছেনা।
“প্রাইভেট পার্টি?”
“হ্যাঁ।”
“কোনো কোম্পানির?”
“হ্যাঁ। বলল একটা প্রজেক্টের সাকসেস সেলিব্রেট করতে পার্টি।”
সাইবান কয়েক মুহূর্ত কি যেন ভাবল। তারপর বলল,
“আমি যা চাইব তাই দিতে রাজী?”
“তাই তো বলল। ডাবল অফার করল।”
“সাত লাখ চাও।”
ওপাশে পিনপতন নীরবতা। তারপর ভেসে এলো উত্তেজিত কন্ঠস্বর,
“তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ? বর্তমান রেঞ্জ অনুযায়ী তোমার পেমেন্ট দুই থেকে আড়াই লাখ নেই আমরা। তুমি তো ডাবলেরও বেশি চাইছ! এটা কেমন কথা?”
“লিসেন। ওদের বলো, সাত লাখ, অওর নো শো।”
ওপাশ থেকে আর কিছু বলতে না দিয়েই সাইবান ফোন কেটে দিল। ইযানকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোল। সামনের পথে বিশুদ্ধ বাতাস কয়েক দফা হাঁটাহাঁটি করতেই তার ফোনে মেসেজ এলো। ম্যানেজারের মেসেজ এসেছে,
আমার আলাদিন পর্ব ৪১
—ওরা রাজী। পেমেন্ট রিসিভড।
স্ক্রিনের মেসেজের দিকে তাকিয়ে তীর্যক হাসি ফুটল সাইবানের ঠোঁটে। ইযানকে দেখাল সে। কৌতূহলী হয়ে ড্যাবড্যাব করে ফোনের দিকে চেয়ে রইল ছোট্ট ইযান। সাইবান বাঁকা হেসে বলল,
“তোর ডি এন এ দানবীর আমাকে দেখার আশায় একটু বেশিই উতলা, পোটলা।”
