আমার আলাদিন পর্ব ৪৫
জাবিন ফোরকান
সাইবান পড়ে যাচ্ছে।
রুফটপ থেকে নিচের সড়কে গিয়ে আছড়ে পড়লে তার শরীরের কোনো অংশ অবিচ্ছিন্ন থাকবে কিনা সন্দেহজনক।
অরণ্য অত্যন্ত আয়েশ নিয়ে দৃশ্যটা দেখল। মাত্র কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের ঘটনাটা তার চোখে ভাসল বুঝি কয়েক ঘণ্টা হয়ে। ঠোঁটে ফুটল তীর্যক তৃপ্তির হাসি। একটি পিঁপড়াকে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যুভয় দেখানোর পর হুট করে ছেড়ে দেয়ার মাঝে আলাদা একটা মজা আছে। নিজেকে তখন জগতের শ্রেষ্ঠ কেউ মনে হয়, যার হাতের মুঠোয় জীবন। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে চোখের ভেতর যে জ্বলজ্বলে হাহাকার ফুটে ওঠে, সেটার স্বাদ অতুলনীয়। তাই তো বারবার শুধু….
অরণ্য নিজের ভাবনাটা শেষ করতে পারলনা। পায়ের গোড়ালির উপরিভাগ বরাবর মোক্ষম এক আঘাত অনুভব করল। পতন উপভোগে সে এতটাই মশগুল ছিল যে ওইটুকু হালকা ধাক্কাও তার শরীর সহ্য করার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলনা। ভারসাম্য রক্ষার জন্য কিছু আঁকড়ে ধরার আগেই তার ভারী শরীরটা হেলে পড়ল সামনে, পিছলে গেল পা। মানুষের আর্তচিৎকার কানেও গেলনা বুঝি তার। সে পড়ে যাচ্ছে। নিচে। নিজের খোড়া কবরে।
ধপাস!
বুকের নিচে শক্ত কিছুর অস্তিত্ব টের পেল অরণ্য। উষ্ণ, প্রশস্ত, ভেতরে আবার ছন্দিত হচ্ছে হৃদস্পন্দন। নিঃশ্বাস আটকে মাথাটা কাত করে তাকাল অরণ্য, প্রথমটায় শুধু দেখল কংক্রিটের সড়কপথ। বহু নিচে। গাড়ি চলছে। ওখানে গিয়ে পড়লে শরীরের উপর দিয়ে গাড়ি চলে যেতে বিন্দুমাত্র সময় নেবেনা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে সবকিছু। হাসপাতালে নেয়ার মতন সময়ও পাওয়া যাবেনা। অতঃপর অরণ্যর দৃষ্টি উপরে উঠে এলো। ঠিক যেখানটায় এসে আটকেছে সে। প্রথমটায় চকচকে সিলভারের আইব্রো পিয়ার্সিং দেখা গেল। অতঃপর শক্তিশালী কাঠামোর পুরুষালী বুক, বাহুজুড়ে সুগঠিত মাংসপেশির বহর।
সাইবান আলাদিন।
অরণ্য সাইবানের শরীরের উপর এসে পড়েছে!
রুফটপে রেলিংয়ের নিরাপত্তা ছাড়াও এপাশে কয়েক মিটার সেফটি নেটের সুরক্ষা। সাইবান রেলিং ভেঙে ছিটকে এসে পড়েছে সেই নেটের উপর। তবে সে একা পড়েনি। সঙ্গে করে অরণ্যকে নিয়ে পড়েছে! চোখ পিটপিট করল অরণ্য, কয়েক লহমার জন্য তার নিজের দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি, ইন্দ্রিয় ক্ষমতা কোনটাকেই বিশ্বাস হতে চাইলনা। তার নিচে থাকা সাইবান আস্তে করে নিজের মাথাটা সোজা করে তাকাল। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে বুক ওঠানামা করছে তার, অরণ্য উপরে থাকায় স্পষ্ট টের পাচ্ছে প্রতিটা শারীরিক প্রতিক্রিয়া। সাইবানের চেহারাটা ক্ষণিকের জন্য অতিমানবীয় দেখাল। চেহারাজুড়ে খচিত ঘামের ফোঁটা। ঠোঁটে অতি ধীরে ফুটল সূক্ষ্মতর এক অশুভ হাসি। অরণ্য অনুভব করল, তার পিঠজুড়ে সাইবানের শক্তিশালী বাহুজোড়া চেপে বসেছে, যেন জড়িয়ে ধরেছে তাকে। অরণ্যর বুক কাঁপিয়ে ধ্বনিত হলো সাইবানের গভীরতর কন্ঠস্বর,
“ভাগাভাগি করলে সবকিছুর স্বাদ বেড়ে যায়, সে খাবার হোক বা মরণ।”
হতবিহ্বল অরণ্য চেয়ে রইল। সাইবানের চেহারা থেকে সে নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা। এতটা কাছ থেকে ওই কালো চোখের মাঝে যে ভৌতিক প্রলোভন দেখা যাচ্ছে, তা কি কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব?
না। সাইবানকে মেরে ফেলার কোনো পরিকল্পনাই অরণ্যর আজ ছিলনা। সে তো শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিল। সাইবান ছাদ থেকে ছিটকে গিয়ে সেফটি নেটের উপর পড়বে। এর মাঝে যে কয়েক সেকেন্ড সে মৃত্যুযন্ত্রণায় দগ্ধ হবে, সেই যন্ত্রণাটুকু অরণ্য প্রাণভরে উপভোগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই ছেলেটি শুধুমাত্র নিজের পরিণতি বরণ করেনি, বরং টেনে হিঁচড়ে অরণ্যকেও একই পরিণতিতে নামিয়ে এনেছে। ওই কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের ভেতর অতিমানবিক এই চিন্তা করা আদৌ মানুষের পক্ষে সম্ভব?
ছাদ থেকে যে পড়ে গিয়েছে, আর সেফটি নেট যেকোন মুহুর্তে একসঙ্গে দুজনের ভার বইতে না পেরে ছিঁড়ে যেতে পারে এমন কোনো লক্ষণই সাইবানের চেহারায় দেখা যাচ্ছেনা। বিন্দাস চেয়ে আছে সে অরণ্যর কুঞ্চিত ভ্রুজোড়ার মাঝে। কপাল বরাবর। অরণ্য না পারতে শুধাল,
“তোমার মৃত্যুর ভয় নেই?”
সাইবানের ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হলো,
“যে জগতের দুয়ার ছুঁয়ে এসেছি, সেই জগতে প্রবেশে ভয় কিসের? আমার সাথে চলুন নাহয়, আপনাকে ওপাড় থেকে ঘুরিয়ে আনি।”
উন্মাদ! বদ্ধ উন্মাদ! সাইবান আলাদিন নামক ছেলেটা একটা বদ্ধ উন্মাদ যার অতি সত্বর মানসিক চিকিৎসা দরকার। এছাড়া অরণ্যর মাথায় আর কোনো যুক্তি এলোনা।
“বস! বস!”
অবশেষে ডাকটা কানে গেল অরণ্যর। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সে। রুফটপ থেকে হাত বাড়িয়ে আছে তার লোকেরা। সবার চেহারায় ভয়ানক আতঙ্ক। শেষ একবার মুখ ঘুরিয়ে তার নিচে আয়েশ করে শুয়ে থাকা সাইবানকে দেখল অরণ্য, কোনো শব্দ সাজাতে পারলনা। তাই উঠে গিয়ে লোকগুলোর সাহায্যে পুনরায় রুফটপে উঠে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই সাইবানও সেফটি নেট থেকে উঠে এলো। এইপাশের রেলিংটা ভেঙে গিয়েছে। মিস্টার চৌধুরী অরণ্যকে ধরলেন। একজন ছুটে পানির বোতল নিয়ে এসেছে।
“বস, আপনি ঠিক আছেন? ওহ গড! আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।”
“এটা কেমন ধরণের হোটেল যে লোহার রেলিং পর্যন্ত ভেঙে যায়? সিকিউরিটি? ম্যানেজার কোথায়? এক্ষুণি ডাকো তাকে। এই ঘটনার সুরাহা না করে তো আমরা ছাড়বনা!”
চারপাশে হম্বিতম্বি শুরু হয়ে গেল। অরণ্য ঠান্ডা পানির বোতলে চুমুক দিয়ে সমস্তটা শেষ করে একদিকে ছুঁড়ে ফেলল। সোফায় ধপাস করে বসেছে সে। এখনো হাঁপাচ্ছে খানিক। ঘেমে নেয়ে একাকার। তাই কোট খুলে ছুঁড়ে ফেলল দূরে। কর্মচারীদের কেউ কেউ তাকে বাতাস করছে। অন্যরা ডাক্তার ডাকবে কিনা সেই নিয়ে বকবক করছে। অথচ কোনোকিছুই মাথায় ঢুকলনা অরণ্যর। ভ্রু কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে সে তাকাল সামনের দিকে। তার নিজের এমন নাজেহাল অবস্থা, অথচ ওই ছেলেটাকে দিব্যি সুস্থ দেখাচ্ছে। অদূরে চেয়ারে বসে মাথায় ঠান্ডা পানি ঢেলে দিল সাইবান। তার পরনের টি শার্ট ভিজে উঠল, সাদা ওড়নাটা লেপ্টে গেল ত্বকের সঙ্গে। পানির স্রোতের মাঝে তার কালো চোখজোড়ায় অশুভ এক ঝিলিক খেলে গেল। আর ভেজা ঠোঁটজুড়ে পাশবিক এক হাসি।
বরাবর অরণ্যর দিকেই চেয়ে আছে সে! রূপকথার গল্পে বিবরণ দেয়া পৈশাচিক দানবগুলোর মতন।
ভ্যানগাড়ি ছুটছে দ্রুতগতিতে। শীতল বাতাসের ঝাঁপটায় চুল উড়ছে সারিকার। লাগেজটা ভ্যানের একপাশে রাখা। পিচঢালা পাকা সড়ক হলেও উচ্চ গতির কারণে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে ভ্যান। তাতে বিশেষ খেদ নেই সারিকার মনে। চুপটি করে অপেক্ষায় আছে সে। তার ফোনে কল আসছে একের পর এক। কখনো ইরাম, কখনো বা অনুরাগ। বাড়ি থেকে বেরোনো মাত্র একটা ভ্যানগাড়ি পেয়ে সেটাতেই চড়ে বসেছে সে। যখন অনেকটা দূরে চলে এসেছে তখন পিছনে অনুরাগ আর ইরামকে ছুটে আসতে দেখেছে। কিন্তু থামেনি সে। থামার কোনো ইচ্ছা আজ নেই তার। হয়ত ইরাম আর অনুরাগ দুজন বাস স্টপ পর্যন্ত আসবে ভিন্ন গাড়িতে। সে আসুক তারা যেভাবে ইচ্ছা। সারিকার কিছু যায় আসেনা।
রাত হওয়ায় গাড়ির সংখ্যাটাও কম। মানুষজনের উপস্থিতিও আশেপাশে হাতে গোণা। দোকানপাটগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ, দুই একটি বাদে। চোখ বুঁজে ফেলল সারিকা। শীতলতার প্রবাহ তাকে নিয়ে চলল বিয়ের আগের অতীতে~
রমনা পার্ক। বিকালবেলায় ভিড় একটু বেশিই বেড়ে যায় এখানে। ইতিউতি দম্পতিদের দেখা যাচ্ছে। মেয়েগুলোর হাতে ফুল, চুলে গাজরা। ছেলেগুলোর ঠোঁটে চওড়া হাসি। কেউ কেউ চুপটি করে প্রেয়সীর বকবক শুনে যাচ্ছে। বাচ্চাসমেত কিছু পরিবারও দেখা যাচ্ছে। একটা মেয়ে বাবু বেলুন নিয়ে দৌড়াচ্ছে, পিছনে পিছনে তার বাবা ছুটছে। দৃশ্যগুলো সুন্দর। অথচ সারিকার মনে আজ শুধুই বিষাদ। চোখ ঘুরিয়ে সে নিজের হাতে ধরে রাখা বাদামভর্তি ঠোঙার দিকে তাকাল। সবগুলোই রয়ে গিয়েছে, একটাও খায়নি সে। তার পাশে বসা পুরুষটি কিছু বলছে না। যেন সময় দিচ্ছে, অপেক্ষায় আছে। সারিকার মনে হলো এই পুরুষটা এতটাই অমায়িক যে তার পাশে চুপ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও সে কিছুই মনে করবেনা।
কাগজের ঠোঙার উপর আঙুল চেপে বসল সারিকার। তারপর দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে সে বলে বসল,
“আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।”
তার পাশে বসা মানুষটি মিসির ইকবাল। হবু স্বামী। এই কথাটা নিশ্চয়ই সবকিছু গড়ে ওঠার আগেই ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ মিসিরের শান্ত মুখে সারিকা বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলনা। শুধু নরম গলায় মিসির বলল,
“আচ্ছা।”
সারিকার ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো। এটা নির্লিপ্ততা নাকি ঝড়ের পূর্বের শীতল অবস্থা বুঝতে বেগ পোহাতে হলো।
“আমার মম ড্যাড চায় আমি আপনাকে বিয়ে করি।”
কথা আরেকটু আগাল সারিকা। এবার মিসির শুধাল,
“তাহলে আপনি আপনার পরিবারকে জানান আপনি একজনকে ভালোবাসেন এবং তাকে বিয়ে করতে চান।”
বুকটা চেপে এলো সারিকার। চোখে অদেখা অশ্রু ভর করল।
“জানাতে পারবনা।”
“কেন?”
“কারণ আমার ভালোবাসার কোনো পরিণতি নেই। সে অন্য ধর্মের মানুষ।”
এবার মিসিরের শান্ত চেহারায় খানিক বিস্ময় ফুটল। মাথা ঘুরিয়ে নিজের জুতোর দিকে তাকাল সে। উভয়ে পার্কের একটি বেঞ্চে বসে আছে। অদূরে একজন হকার বেলীর গাজরা বিক্রি করছে। সেই সুঘ্রাণ ভেসে আসছে এখান পর্যন্ত। অনেকক্ষণ যাবৎ মিসির কোনো কথা বললনা।
“আমাদের বিয়েটা না হলে কি আপনার ভালবাসা রক্ষা হবে?”
“না। হবেনা।”
জবাব দিতে সময় নিলনা সারিকা। মিথ্যা বলে কি লাভ? একটি ঢোক গিলল সে, পুনরায় বলল,
“আমি শুধু আপনাকে জানাতে চেয়েছি। বিয়ের পরে যেন আপনি মনে না করেন আপনাকে ঠকানো হচ্ছে।”
মৃদু হাসল মিসির। সারিকা আড়চোখে দেখল। হাসলে লোকটাকে খুব মিষ্টি লাগে। কিছু মানুষ আছে না যাদের চেহারা দেখলেই কেমন শান্তি শান্তি লাগে, মিসির ঠিক তেমনি।
“তবে বলতে হচ্ছে, আমি এবং আপনি খুব বেশি ব্যাতিক্রম নই।”
মিসিরের নির্মল কন্ঠে ভীষণ অবাক হলো সারিকা। না পারতে সম্পূর্ণ ঘুরে বসল বেঞ্চে। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল হবু স্বামীর মুখপানে। জিজ্ঞেস করল,
“মানে? আপনিও কি অন্য কাউকে ভালোবাসেন?”
“ভালোবাসতাম।”
শুধরে দিল মিসির। সারিকা যতটা না বিষন্ন, মিসির ততটাই স্বাভাবিক। ঘা শুকিয়ে গেলে যেমন আর গায়ে লাগেনা, মিসিরের ক্ষেত্রেও বোধ হয় তেমন কিছুই হয়েছে। সে শান্ত গলায় বলে গেল,
“আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসতাম। কিন্তু মেয়েটা আমাকে ভালোবাসত না। সে আমাকে শুধু একজন বন্ধু ভাবত।”
—একপাক্ষিক ভালোবাসা। কি যন্ত্রণাদায়ক! সারিকা বাদামের ঠোঙাটা বুকে চেপে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। কান খাড়া করে শুনে গেল হবু স্বামীর প্রত্যেকটা কথা,
“মেয়েটা আমাকে ব্যবহার করত। আমরা প্রতিবেশী ছিলাম। ঐযে, আগেকার দিনের নাটক সিনেমায় দেখানো হতো না, পাড়ার প্রেম? ঠিক ওইরকম। আমাদের মধ্যে অবশ্য কোনোদিন প্রেম বলে কিছু ছিলনা। কারণ প্রেম তাকেই বলে যাতে বিনিময় পাওয়া যায়। আমার ক্ষেত্রে আমি শুধু নিবেদন করেছি, বিনিময়ে জুটেছে আস্ত একটা শূন্য। প্রায় দেখা সাক্ষাৎ ছিল বিধায় পাড়ার বন্ধুদের মতন সবসময় পাশে থাকতাম আমি তার। বলা বাহুল্য, আমার অনুভূতি সে জানত। আমার আফসোস নেই সে আমার অনুভূতি গ্রহণ করেনি, কিন্তু আফসোস একটাই যে আমাকে সে কুকুর ভেবে বসেছিল। কুকুর যেমন মালিকের পিছনে ঘুরঘুর করে, তেমন করে আমিও তার পিছনে ঘুরঘুর করতাম। সে অন্য ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করত। তার ব্রেকআপ হলে আমার কাছেই এসে কান্নাকাটি করত। আমিও ভালো বন্ধুর মতন সামলাতাম। আর অপেক্ষা করতাম, হয়ত একদিন সে আমায় বুঝবে, আমায় মেনে নেবে।”
মিসির থামল। যেন নিঃশ্বাস নেয়া প্রয়োজন। সারিকা শুনতে শুনতে অজান্তেই বাদাম ভেঙে মুখে দেয়া শুরু করেছে। চিবুতে চিবুতে সে প্রশ্ন করল,
“তারপর?”
মিসির বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসল। গোধূলির আকাশপানে চেয়ে বলল,
“তারপর আর কি? এভাবেই চলতে লাগল। আমি কখনো তার ভালোবাসার মানুষ হতে পারিনি। সে আমার কাছে শুধু প্রয়োজন মেটাতেই আসত। বহু বছর পেরিয়ে গেল। পড়াশোনা শেষ করলাম। আর্কিটেকচারাল ফার্ম খুললাম। কাজে ব্যস্ত। এরপর হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম, তার সাথে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
সারিকা জমে গেল। অদ্ভুত হলেও সত্যি, মিসিরের সামনে বসে সে নিজের জীবনের গল্পটাই ভুলে বসেছে। এতটাও নাটকীয় কারো জীবন হয়?
“তাহলে সে কি এখন আপনার বেস্ট ফ্রেন্ডের বউ?”
মাথা নাড়ল মিসির।
“না। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অন্য একজনকে ভালোবাসে। সেটা আরেক জটিল কাহিনী। আপনি ভবিষ্যতে এমনিই জানতে পারবেন। সে যাক, শেষমেষ তার বিয়েটা হয়নি। বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার পর, প্রায় পনেরো বছরের একপাক্ষিক ভালোবাসা পূর্ণতা পেলো আমার। মেয়েটা আমার কাছে এলো, বলল সে নাকি আমায় ভালোবেসে ফেলেছে। অবশেষে।”
সারিকা অজান্তেই বাদাম ছিলে ছিলে মিসিরের হাতের তালুতে রাখল। মিসির দৃশ্যটা লক্ষ্য করে মুচকি হেসে বাদামগুলো মুখে দিল। সারিকা বলল,
“তাহলে ভালোবাসতাম বললেন কেন? আর সে আপনার সাথে নেই কেন?”
খানিকটা সময় নিয়ে চিবিয়ে মিসির নির্দ্বিধায় জানাল,
“আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি।”
হতবাক হয়ে গেল সারিকা। ফিরিয়ে দিয়েছে? এতগুলো বছর একটা মেয়ের ভালোবাসার অপেক্ষার পরও ফিরিয়ে দিয়েছে? এটা আদৌ সম্ভব? মিসির বোধ হয় সারিকার বিহ্বলতা ধরতে পারল। তাই মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“প্রথমবারের মতন আমি নিজেকে বেছে নিয়েছিলাম, সারিকা। আমার অনুভূতির প্রয়োজন নেই, আত্মমর্যাদার প্রয়োজন। আমি কারো সেকেন্ড অপশন হবনা। এটা না পেলে সেটা। এই সেকেন্ড চয়েজ আমার জীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছিল। শেষমেষ আমি মুক্তি পেয়েছি। আর বিলিভ মি, আ’ম হ্যাপি, ট্রুলি হ্যাপি।”
সারিকা এরপর আর কিছুই বলতে পারলনা। একটা মানুষ কারো দ্বিতীয় পছন্দ হতে চায়না। আত্মসম্মান তার কাছে এতটাই দামী যে সে জীবনের প্রথম ভালোবাসাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিয়েছে। এই মানুষটার সঙ্গে কি সারিকা কখনো মানিয়ে চলতে পারবে?
“সারিকা?”
মিসিরের ডাকে মনোযোগ ভাঙল সারিকার। মাথা তুলে তাকাল সে। মিসির সোজা হয়ে বসেছে।
“আমার কথায় কিছু মনে করবেন না। আমি সত্যি কৃতজ্ঞ যে বিয়ের আগেই আমাদের মধ্যবর্তী সকল জটিলতা দূর হয়ে গিয়েছে। আমরা কেউই নিজেদের অতীত নিয়ে বলা থেকে বিরত থাকিনি। আপনাকে ধন্যবাদ আমার সঙ্গে সত্যি কথাটা শেয়ার করার জন্য। যদি আপনার মনে হয়, এই বিয়েটা আপনি আর করতে চান না, তাহলে আমার পক্ষ থেকেও কোনো জবরদস্তি থাকবে না। বাকিটা সম্পূর্ণ আপনার সিদ্ধান্ত। তবে আমার কি মনে হয় জানেন?”
“কি?”
মিসির এক লহমা চুপ থেকে বলল,
“আমি আর আপনি অনেকটা একরকম। সেই কারণে হয়ত আমরা একে অপরকে বুঝতে পারব। পৃথিবীর সকল বিবাহিত দম্পতিই কি একে অপরকে ভালোবাসে? না। কেউ কেউ সমাজ, পরিস্থিতি এবং পরিবারের কারণে মানিয়ে নিয়ে চলে। আমি বিশ্বাস করিনা আমাদের মধ্যে নতুনভাবে ভালোবাসা হওয়া সম্ভব। তবে দুজন ভাঙাচোরা মানুষ যদি একে অপরের বন্ধু হয়, তবে ক্ষতি কিসের? বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, ভরসা এবং স্বপ্ন, এটুকু যথেষ্ট নয় কি? আমরা যতদিন একে অপরের প্রতি সৎ থাকব, ততদিন অব্দি এর বাইরে আমার আর কিছুই চাওয়ার থাকবেনা। উই ক্যান ট্রাই টু ওয়ার্ক দিস আউট, টুগেদার।”
সারিকা নিষ্পলক চেয়ে রইল মিসিরের মুখপানে। যে বলবে এই দুঃসাহসী, লড়াকু লোকটা ভেতর থেকে এতটা ভাঙাচোরা?
বর্তমান~
ভ্যানটা স্পিড ব্রেকারে গোত্তা খাওয়ায় ঝটকা খেয়ে বাস্তবে ফিরে এলো সারিকা। মাথা ঝাঁকিয়ে চারপাশে তাকাল। বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে প্রায়। কিন্ত এই রাস্তাটা একটু বেশিই নির্জন। দূরে আলো দেখা যাচ্ছে। সেখানে ঢাকার বাসগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সারিকা সোজা হয়ে বসল। নিজের হ্যান্ডব্যাগ ঘেঁটে ওয়ালেট বের করে নিল। ভ্যানভাড়া বের করার জন্য টাকা হাতে নিতেই হুট করে নিজের কব্জি বরাবর হ্যাঁচকা টান খেল সারিকা।
“আহহ!”
কি হলো বুঝে ওঠার আগেই ভ্যান থেকে ছিটকে রাস্তায় পরে গেল রমণী। ভ্যানচালক হতচকিত হয়ে ভ্যান থামিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখল একটি মোটরসাইকেল থামানো। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হেলমেট পরনে দুই ছেলে। একজনের হাতে ছোট্ট একটা ছুরির মতন। সারিকা রাস্তায় পরে কপালে ব্যথা পেয়েছে। হাত চেপে মাথা তুলে তাকাতেই একটা ছেলে তার বাহু চেপে ধরল,
“যা যা আছে এখনি দে! তাড়াতাড়ি!”
ছিনতাইকারী? কিন্তু ছেলেগুলোকে খুব বড় মনে হচ্ছেনা। কিশোর বয়সী। সারিকা নিজের হাত ঝটকা দিল,
“হাত ছাড় আমার। পুলিশকে কল করব কিন্তু!”
“এই মাইয়া! এক্কেবারে খাইয়া দিমু কিন্তু! চাইয়া দেখছস?”
ছুরিটা উঁচিয়ে সারিকার চিবুক বরাবর ধরল অপর ছেলেটা। হেলমেটের কারণে চেহারা দেখা যাচ্ছে না। শুধু চোখজোড়া দৃশ্যমান। কেমন যেন লালচে। নেশাখোর, নেশার ঘোরে আছে স্পষ্ট। সারিকা আশেপাশে তাকাল, ভ্যানচালক ভয়ে ভ্যানের পিছনে উবু হয়ে বসে আছে। ঝামেলায় পড়তে নারাজ। সারিকা আতঙ্কের চাইতে বেশি বিরক্তবোধ করল।
“দে! মাল দে!”
সারিকার হাতের ওয়ালেটটা কেড়ে নিল একজন। অন্যজন ভ্যান থেকে লাগেজ টেনে নামিয়ে রাস্তার উপরেই খুলে ঘাঁটতে লাগল। পোশাক আশাক সব ওলটপালট করে টানা বা গয়না আছে কিনা সেই সন্ধান করতে লাগল। সারিকা ভ্রু কুঁচকে দেখে গেল কাহিনী। তারপর হুট করে তাকে ধরে রাখা ছেলেটার হাতে মোক্ষম একটা কামড় বসিয়ে দিল।
“আ…খানকিমা***!”
অশ্রাব্য একটি গালি দিয়ে অপর হাতে সারিকার চুলের মুঠি পেঁচিয়ে ধরে ফেলল ছেলেটা। রমণী দৌঁড় দিতে চেয়েছিল, কিন্তু চুলে টান খেয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠল।
“আহ!”
“অনেক তেজ না তোর? ভাবছিলাম লুইটা নিয়াই পগারপার। কিন্তু না, এখন তো এত সহজে ছাড়মুনা।”
সারিকার বুকে হাত চেপে খেঁকিয়ে উঠল ছেলেটা,
“একেবারে ধইরা নিয়া ভই….আহহহহ!”
শেষ করতে পারলনা সে। এর আগেই আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারপাশ। সারিকা টেরও পেলনা ঠিক কি ঘটেছে। সে শুধু দেখল একটা ঝটকার মতন খেয়ে ছেলেটা রাস্তার মাঝে লুটিয়ে পড়েছে। হেলমেট খুলে গড়িয়ে ছিটকে গেছে অদূরে। অন্য ছেলেটাও ভড়কে গিয়ে ঘুরে তাকিয়েছে। সারিকা এক পা পেছাতে গিয়েই পুরুষালী উষ্ণ বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেল। মাথা কাত করে তাকাতেই সে দেখতে পেল মিসিরকে। সুউচ্চ দন্ডায়মান। সদা নির্মল এবং শান্ত মিসিরের চেহারায় তীব্র ক্রোধের ভাঁজ। এক হাত মুঠ করে রাখা শক্তভাবে, তাতে আধভাঙ্গা ইটের টুকরো। চোখ বেয়ে বুঝি আগুন ঝরছে তার। সারিকার দিকে চেয়ে নেই সে, তাকিয়ে আছে ছেলেগুলোর দিকে।
“ইউ ডেয়ার টু টাচ মাই ওয়াইফ?”
অরণ্যর গাড়িটা রাতের আঁধার কেটে বাড়ির সামনে এসে থামল। ড্রাইভারের পিছনে ব্যাকসিটে বসা অরণ্য। সে একা নয়। তার অন্যপাশে সাইবান।
পার্টি শেষ হওয়ার পরপর এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে এটা কি চাট্টিখানি কথা? হম্বিতম্বি কম হয়নি। হোটেল কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষমা চেয়ে বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে। সেটা আদতেই ধামাচাপা থাকবে কিনা সেটা অবশ্য পুরোপুরি অরণ্যর উপর নির্ভর করছে। সাইবান টিমের ছেলেদের সাথে চলে আসছিল। কিন্ত তার পার্টিতে এত বড় ঘটনা ঘটেছে এই বাহানায় অরণ্য নিজে এসেছে সাইবানকে বাড়িতে নামিয়ে দিতে। ড্রাইভারের পাশে অরণ্যর কর্মচারী মিস্টার চৌধুরীও আছেন। তাই সাইবান মানা করেনি।
পুরোটা রাস্তা নিঃশব্দে কেটেছে শুধুমাত্র মিস্টার চৌধুরীর বকবক বাদে। লোকটা থেকে থেকে শুধু নিজের বস আর সাইবানের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কারণ পার্টি আয়োজনের মূল দায়িত্বটা তারই ছিল। নিরাপত্তার ব্যাপারটা তার ব্যর্থতা। অরণ্য শুধু কপাল ঘষতে ঘষতে শুনে গিয়েছে। সাইবান মনে মনে ভেবেছে, লোকটা যদি জানত এই সবকিছু তার বসেরই কুকীর্তি তবে কেমন অনুভব করত? নাকি মিস্টার চৌধুরী আসলে সবকিছু জানে শুধু সাইবানের সামনে অভিনয় করছে? অনেক কিছুই হতে পারে।
গাড়ি থামতেই মিস্টার চৌধুরী আরেক দফায় বললেন,
“আমাদের ক্ষমা করবেন মিস্টার আলাদিন। এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে আমরা কেউই কল্পনা করিনি। প্লীজ, আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড।”
“যা ঘটেনি তা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। আশেপাশে চেয়ে দেখুন, কত লোক অসন্তুষ্ট বসে।”
কথাটা বলেই নিজের পাশের গাড়ির দরজাটা খুলে ফেলল সাইবান। উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাওয়া। সে বাইরে পা রাখতেই পাশ থেকে ভেসে এলো অরণ্যর গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“যা ঘটেনি তা যে আর ঘটবে না তার গ্যারান্টি কি?”
সাইবান থামল। সামনে বসা মিস্টার চৌধুরীও অবাক হয়ে নিজের বসের দিকে তাকাল। অরণ্য এতক্ষণ নির্বাক বসে ছিল। তবে এখন তার ঠোঁটে খুবই সূক্ষ্ম একটি হাসির রেখা ফুটল। মাথা কাত করে সরাসরি সাইবানের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“আজকাল নিজের বাড়িতেও মানুষজন নিরাপদ নয়। সেখানে বাচ্চাকে একা ফেলে যাওয়াটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়।”
জমে গেল সাইবান, হাতের আঙুল সামান্য কাঁপল তার। অজান্তেই মাথা তুলে অদূরে বাড়ির দিকে তাকাল। তাদের গ্রামের বাড়িটা অন্যান্য প্রতিবেশী বাড়ির থেকে আলাদা। কারণ সড়কের একেবারে শুরুতে পরে। বাকি বাড়িগুলো কাঁচা রাস্তা ধরে গেলে আরও ভিতরে বিধায় সুনসান নীরবতা বেশি। অরণ্য অন্তিমবার বলল,
“বাড়ি যাও।”
কিন্তু তার সতর্কবার্তা শোনার অবস্থায় তখন সাইবান নেই। সে ইতোমধ্যে দ্রুতপায়ে ছুটতে শুরু করেছে বাড়ির দিকে। অরণ্য নীরবে দৃশ্য দেখে ইশারা করল। তার গাড়িটা সড়ক ধরে এগিয়ে গেল। জানালা দিয়ে দেখল সে, সাইবান লম্বা পা ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে।
আমার আলাদিন পর্ব ৪৪
রীতিমত ঘূর্ণিঝড় হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল সাইবান। প্রথম যে দৃশ্যটা তাকে বরণ করল, তাতেই হাড় হীম হয়ে গেল তার। সোফায় এলিয়ে পড়ে আছে সুগন্ধা। চোখজোড়া বন্ধ। মাথাটা ঝুলে আছে ফ্লোরের দিকে। তার আশেপাশে কোথাও ইযানের চিহ্ন টুকুও নেই। নেই ইরাম, অনুরাগ, সারিকা, মিসির, তিতলি কেউই!
“সুগন্ধা!”
সাইবানের তীব্র হুংকারে কেঁপে উঠল সমস্ত বাড়ি।
