Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৮

আমার আলাদিন পর্ব ৬৮

আমার আলাদিন পর্ব ৬৮
জাবিন ফোরকান

এক নিস্তব্ধ সকালের সূচনা। ডাক্তার সামিয়া মুন্সী আর ব্যবসায়ী আহমদ উদ্দিনের বাড়িজুড়ে আজ ভারী নীরবতার বিচরণ। কোথাও কোনো আনন্দ নেই, প্রফুল্লতা নেই, উচ্ছলতা নেই। বাতাসে শুধু দীর্ঘশ্বাসের বাস। বাড়ির পরিবেশটা মাত্র একদিনের ব্যবধানে ঘুমপুরীতে পরিণত হয়েছে। যেখানে কেউ কারো না, কেউ খুশি না। সবাই বয়ে চলেছে আপন আপন জীবনের বোঝা। সম্পর্কের জটিল সমীকরণের গ্লানি। এক ছেলে হারিয়েছে তার জন্মগত পরিচয়, এক মেয়ে হারিয়েছে তার পারিবারিক বন্ধন, এক মা হারিয়েছে কোলেপিঠে করে মানুষ করা বুকের ধনকে আর এক স্বার্থপর স্ত্রী হারিয়েছে নিজের স্বামীকে। এই বাড়িতে আজ থেকে কেউ কারো জন্য না, সবাই নিজের জন্য। এই পৃথিবীতে আমাদের একলা আসতে হয়, যেতেও হয় একলাই। মাঝখানে শুধু সম্পর্কের বোঝা বাড়ে। একটা জোরালো ঝড় উঠলেই বোঝা যায় পৃথিবীতে আমাদের একলা পাঠানো এবং একলা ফেরত নেয়া ওই এক সৃষ্টিকর্তা বাদে কেউই আমাদের আপন নয়।

রান্নাঘরে সকালের নাস্তার কাজ চলছে নিঃশব্দে। সুগন্ধা রুটিমেকারে রুটি তৈরি করছে। সারিকা চুলায় বসানো প্যানে ডিম পোঁচ করে নিচ্ছে। সে সাধারণত রান্নার কাজে হাত লাগায় না। এই বাড়িতে এলে তো আরও না। কিন্তু আজ এত অস্থির লাগছে যে বসে থাকতে পারেনি। কোনোকিছুতে মন দেয়া জরুরী নাহলে মাথায় সারাক্ষণ ঘুরতে থাকে সাইবান তার ভাই না, তাদের বাবা মা বহু বছর আগে এমন এক সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে যা সন্তানদের জীবন উলটপালট করে ফেলেছে। গভীর রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বেশ কয়েকবার লাফিয়ে উঠে পড়েছিল সারিকা। স্লিপ প্যারালাইসিস হয়ে গিয়েছিল যেটাকে এদেশে বলে বোবা ভূতে ধরা। এমন কিছু তার কস্মিনকালেও হয়নি। গত রাতে যতবার সে জেগেছে, মিসির তাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিয়েছে। ওই লোকটার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে। কোনো কথা বলে না। শুধুমাত্র চুপচাপ বুকে আগলে নিয়ে বসে থাকে। তাতেই সারিকার অশান্ত হৃদয় শান্ত হয়ে যায়। স্বামীর কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ সে। যদি মানুষটা না থাকত, তাহলে কিছুতেই সে এত বড় ঝড়টা সামলাতে পারতনা। সবসময় লটরফটর করতে থাকা সুগন্ধাও আজ নির্বাক। মুখে কোনো রা নেই। কাজ করছে নতমুখে। অন্যান্য সময়ে সুগন্ধার পটপট কথা আর রিলস দেখে অট্টহাসির কারণেই বাড়ির মানুষের ঘুম ভাঙার রেকর্ড আছে। আজ মেয়েটা একদম চুপ। চঞ্চল মানুষ শান্ত হয়ে গেলে বোঝা যায় জীবনটা রঙিন নয় বরং সাদাকালো।

মিসিরের গতকাল ভালো ঘুম হয়নি। এই বাড়ির কারোরই হয়নি সেটা সে নিশ্চিত। সারিকাকে পৌঁছে দিয়ে গতকাল চলে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষমেষ যেতে পারেনি সে। যে কাহিনী হয়ে গিয়েছে এরপর তার চলে যাওয়াটা অশোভন। বাড়ির মানুষগুলোর উপর দিয়ে যা যাচ্ছে, তাতে তাদের বাস্তবতার সঙ্গে বেঁধে রাখতে হলেও ঠান্ডা মাথার কাউকে দরকার। আহমদ বিশেষ মন্তব্য রাখেন না কোনোকিছুতে। সেক্ষেত্রে মিসিরকেই আপাতত দায়িত্বশীল গুরুজনের ভূমিকায় পদার্পণ করতে হবে। সারিকা কিছুক্ষণ আগে নিজের হাতে তাকে চা দিয়ে গিয়েছে। হলরুমের সোফায় বসে চুমুক দিতে দিতে সে ভাবছে কি করা যায়। সে এই বাড়ির জামাই। তার কি এই বিষয়ে কিছু বলা উচিত হবে? না বলেও বা কোনো উপায় আছে? কী হতে যাচ্ছে সামনে? কেন যেন অশুভ একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। অজান্তেই দুই তলার দিকে চোখ গেল তার। সাইবানের বেডরুম ওখানে। গতকাল রাতে ছেলেটা বাড়ি ফিরেছে কিনা জানা নেই।

ফিরে থাকলেও কী বউয়ের কাছে গিয়েছে? সেটা আরেক রহস্য। অবশ্য মিসিরকে বেশিক্ষণ ভাবতে হলোনা। এর আগেই তার ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করে বেডরুমের করিডোর থেকে বেরিয়ে এলো সাইবান। সাদা ট্যাঙ্ক টপ আর আর্মি প্রিন্টের ট্রাউজার পরনে ছেলেটার। উন্মুক্ত ফর্সা ত্বকে পানির ফোঁটা চিকচিক করছে। চুলগুলো হালকা ভেজা। খুব সম্ভবত সকালের ওয়ার্ক আউটের পর গোসল দিয়েছে। চেহারাটা স্বাভাবিক। তবে তাতে বরাবর যে দুষ্টুমির ঝিলিক মাখা থাকত, সেটার বড্ড অভাব। নিঃশব্দে নিচে নেমে কিচেনের দিকে গেল সে। সারিকা আর সুগন্ধার সঙ্গে দেখা হলেও কেউই একে অপরের সঙ্গে কোনো কথা বললনা। আড়চোখে ভাইকে খেয়াল করল সারিকা। সাইবান প্রতিদিনের মতন স্বাভাবিকভাবে ফ্রিজ খুলে ডিম নিল। এগ বয়লারে পানি দিয়ে ডিম সিদ্ধ হতে দিল। তারপর প্রোটিন পাউডার স্ট্যানলিতে নিয়ে প্রোটিন শেক তৈরি করে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেল। মনটা ভীষণ কু ডাকল সারিকার। তাণ্ডব চালানো মানুষের নীরবতা তাণ্ডবের চাইতেও যে ভয়াবহ হয়!

কিছুক্ষণ বাদে বাড়ির সদর দরজায় দেখা মিলল এক অপ্রত্যাশিত ব্যক্তির। ভেতরে প্রবেশ করল ইহান। কিশোর ছেলেটার পরনে ঢোলা জিগজ্যাগ শার্ট আর জিন্স। চোখেমুখে শীতল দৃষ্টি। এই ছেলের বয়স কম, কিন্তু চেহারায় এমন একটা তীক্ষ্ণতা যে মনে হয় বয়সের দ্বিগুণ তার অভিজ্ঞতা। ছোট বলে তাই হেলাফেলাও করা যায়না আজকাল। মিসির ইহানকে চেনে। সাইবানের বিয়ের সময় দেখা হয়েছিল। চায়ের ফাঁকা কাপ কফি টেবিলে রেখে দিয়ে মিসিরই জিজ্ঞেস করল,
“ভালো আছো ছোট্ট মরিচ?”
মিসিরকে দেখে চেহারায় খানিকটা নমনীয়তা ফুটল ইহানের। পরিহাসের হাসি হাসল সে,
“ভালো আর থাকতে দিচ্ছে কোথায় এই পরিবার?”

মিসির ভ্রু তুলল। সাইবান চেয়ারে বসে চুপচাপ প্রোটিন শেকে চুমুক দিচ্ছে আর হাতের ফোন স্ক্রলিং করছে। ইহানকে দেখেও না দেখার ভান করল সে। ইহানও দুলাভাইয়ের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখালনা। যদিও তার ইচ্ছা ছিল এসেই ওই ছেলের উপর আরেক দফায় ঝাঁপিয়ে পড়ার তবে বোনের কঠোর বারণ আছে বিধায় হাত গুটিয়ে রাখতে হচ্ছে। সারিকা আর সুগন্ধা নাস্তা নিয়ে হাজির হয়েছে ততক্ষণে। টেবিল সাজাচ্ছে। ইহানকে দেখে সারিকার মেজাজ গেল বিগড়ে। তবে কিছু বললনা। মিসিরই স্বাভাবিক আচরণের চেষ্টা চালাল,
“আচ্ছা। এসেই যখন পড়েছ তখন নাস্তা করতে আসো আমাদের সাথে। বাকি কথা পরে হবে।”
ইহান মাথা নাড়ল।
“এই বাড়ির এক ফোঁটা পানিও আমি গিলব না আর। আমার আপু আর ভাগিনাকে দিয়ে দিন, আমি চলে যাই।”

“বেয়াদব ছেলে!”
সারিকা ধমক দিল। তাতে মিসির হাত তুলে স্ত্রীকে শান্ত থাকতে বলল। নিজে শীতল গলায় শুধাল,
“আপু আর ভাগিনা? ইউ মিন ইরাম আর ইযান? এটা ইরামের শ্বশুরবাড়ি আর ইযানের বাবার বাড়ি। তোমাকে কেন দিয়ে দেব?”
“ইহান। ক্যান ইউ হেল্প?”
মিসিরের কথার পরপরই মেয়েলী কন্ঠটা ভেসে এলো। সবাই মুখ তুলে তাকাতেই সিঁড়ির মাথায় দেখতে পেল ইরামকে। দুটো বড়সড় লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রমণী। পুরোদস্তুর তৈরি। ধবধবে সাদা সালোয়ার কামিজ পরনে, বুকের কাছটায় সিলভার চুমকির কাজ। ইযানও তৈরি। নরম লিনেনের টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। পা দুটো ছোট হওয়ায় ট্রাউজারের প্রান্ত কয়েক ভাঁজ করে গুটিয়ে রাখা। ছোট্ট পা দুখানায় জুতো। সাধারণত বাইরে না গেলে ইযানকে এমন পোশাক পরানো হয়না। তাই সবাই যারপরনাই বিস্মিত হলো। একমাত্র সাইবান আর ইহান বাদে। বোনকে সিঁড়ির উপরে দেখেই ইহান ছুটে গেল। উপরে উঠে লাগেজ দুটো নিজের হাতে তুলে নিল। যদিও ইরাম তাকে একটা দিয়ে নিজে অন্য হাতে আরেকটা নিতে চাইল তবে ইহান দিলনা। দুটোই হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। ইরাম ছেলেকে কোলে নিয়ে পিছন পিছন নামল।

“আমি সি এন জি বলে রেখেছি। চলে আসবে। চলো, সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াই।”
ইহানের কথা শুনে বাড়ির মানুষগুলো বুঝি আকাশ থেকে পড়ল। কেউ কিছু বলার আগেই সুগন্ধা খেঁকিয়ে উঠল,
“রাস্তায় দাঁড়াইবা মানে? কই নিয়া যাইতেছ আমগো ভাবীজান আর পোটলারে? মন মেজাজ ঠিক নাই আমার। মাথা মুতা ফাডাই দিমু কিন্তু!”
ইহান শুধু চোখ ওল্টাল, সুগন্ধাকে পাত্তা দিলনা। লাগেজ নিয়ে চুপচাপ এগোল দরজার দিকে। ইরাম পিছু ডেকে বলল,
“একটু দাঁড়া ভাই।”
থামল ইহান। ইরাম পিছনে ঘুরে গলা চড়িয়ে ডাকতে নিল,
“আম্মু…!”
পরক্ষণেই ডাক বদল করল সে,
“খালামণি? খালামণি!”

সামিয়া অন্দরমহলে নিজের রুমে শুয়ে ছিলেন। আজ হাসপাতালে যাননি। ইমারজেন্সি না হলে যাবেন কিনা ঠিক নেই। সারারাত জেগে ছিলেন। এখনো জেগেই আছেন। দুই চোখের পাতা এক করেননি। ডাক শুনে ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। তার বিধ্বস্ত রূপ দেখা গেল। পরনের শাড়িটা কুঁচকে আছে। চুলগুলো পাখির বাসার মতন এলোমেলো, পিঠ ভাসিয়ে নেমে গেছে কোকড়া হয়ে। চোখে কোনো চশমা নেই, বরং ইয়া বড় কালো কালো ডার্ক সার্কেল। চোখদুটো রক্তবর্ণ। সামিয়ার বয়স ৫৫ ছুঁইছুঁই হলেও তার মধ্যে এতদিন বার্ধক্যের ভার দেখা যায়নি। অথচ আজ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তার বয়স যেন এক দশক বেড়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে পঁয়ষট্টি সত্তরের বৃদ্ধা। সামিয়া নিষ্প্রাণ রোবটের মতোই এলেন। অথচ লাগেজ, পুরোদস্তুর তৈরি ইরাম আর ইযানকে দেখে তার দৃষ্টিতে আতঙ্ক ফুটল। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলেও নিজে থেকে কিছুই উচ্চারণ করতে পারলেন না। ইরাম এগিয়ে গেল। ছেলে দাদীকে দেখেই যাওয়ার জন্য ছোট্ট হাত দুখানা বাড়িয়ে শব্দ করল,

“দা…দা!”
সেই শব্দটুকু সামিয়ার রক্তাভ চোখে অশ্রুর জোয়ার তুলল। নিঃশব্দে চোখ উপচে গাল গড়িয়ে বইতে লাগল স্রোতের মতন। ইরাম ছেলেকে তার কোলে দিলনা। বরং মাথাটা ধরে নিজের বুকে চেপে সামিয়াকে বলল,
“আমরা চলে যাচ্ছি, খালামণি। জানিনা আবার কবে দেখা হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা। ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিও। রোগী দেখতে দেখতে নিজের রোগশোক ভুলে বসোনা। শরীরটাকে বিশ্রাম দিও, বয়স হয়েছে। যদি ইচ্ছা হয় মাঝে মধ্যে ফোন করব, নাহলে করব না। পারলে কোনোদিন সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো।”
একটুখানি থামল ইরাম, তারপর জানাল,
“তোমাদের প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। সব দাবী দাওয়া আজ থেকে ত্যাগ করলাম। কোনোদিন ব্যাখ্যাও চাইবনা। একটাই অনুরোধ থাকবে, যদি পারো সংসারটা টিকিয়ে রেখো। ছেলেকে দেখে রেখো। একটু অবুঝ আর বেপরোয়া। আদর দিয়ে বললে অবশ্য বুঝে যায়। তুমি আমার থেকে ভালো জানো। আসি।”

সামিয়া প্রত্যুত্তর করতে পারলেন না। কাঁপা কাঁপা হাত তুললেন ঠিকই তবে মেয়েকে আর ছোঁয়া হলোনা তার। ইরাম ঘুরে এগিয়ে গেল। সামিয়ার হাত ছুঁতে পারল শুধু শূন্যতা। উষ্ণ তরল গাল গড়িয়ে নামতে লাগল অঝোর ধারায়, ভিজিয়ে তুলল তার বুক। অথচ সেই বুক ভাসানো অশ্রুও বুঝি আজ শোকের সামনে কম পড়ল। আর সহ্য হলোনা সারিকার। গর্জে উঠল,
“এসব কী হচ্ছে? কোন নতুন নাটক? ক্যান এনিওয়ান এক্সপ্লেইন?”
স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে মিসির চোখের ইশারা করল। তারপর নিজে তাকাল ইরামের দিকে,
“ইরাম। কী হয়েছে? কোথায় যাচ্ছ ইযানকে নিয়ে? বাড়ি ছেড়ে দেয়াটা কোন ধরণের অবিবেচক কাজ? বাইরে বিপদ তুমি জানো না? এই সময়ে এমন আচরণের অর্থ? তুমি বোঝদার মেয়ে। তবে?”

ইরাম থমকাল। বুকে লেপ্টে থাকা ইযানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত কণ্ঠে জানাল,
“নতুন বাসায় যাচ্ছি।”
“বাড়ি থাকতে নতুন বাসা কেন?”
“কারণ এই বাড়ির ভাত এবং সম্পর্ক দুটোই এখন আমার জন্য হারাম। আমি আর আলাদিন তালাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বাড়ির কেউই আর অবাক হলোনা। অবাক হওয়ার চূড়ান্ত সীমা তারা গতকালই পেরিয়েছে। এবার যা অনুভূত হলো, তা শুধুই অন্তরের জ্বালাপোড়া। সারিকা স্বামীর হাত ছাড়িয়ে হেসে ফেলল, বলল,
“ওহ! আপনি দেখছি তালাকে ভীষণ এক্সপার্ট!”
ইরাম অপমানটুকু গায়ে মাখলনা।
“অতীতে বেঁধে কষ্ট পাওয়ার থেকে ছেড়ে দেয়া উত্তম। তাইনা?”

সারিকার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জ্বলে উঠল বুঝি। আগ্রাসী হয়ে উঠল সে। কিন্তু পিছনে স্বামী নামক মানুষটার অস্তিত্বের কারণে সে মুখের কথা মুখেই আটকে ফেলল। বাড়ির ভেতর এতকিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ একটা মানুষের মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই। সাইবান সেই যে চেয়ারে বসে ফোন স্ক্রলিং করতে শুরু করেছে, এখনো তাই করছে। একবারের জন্যও ফোন থেকে দৃষ্টি সরায়নি। যদি সূক্ষ্মভাবে কেউ দেখত, তবে তার হাতের আঙুলের অস্বাভাবিক কম্পন ঠিকই নজরে পড়ত। সেভাবে দেখার কেউ নেই আর।
শান্ত মিসিরেরও ইরামের বক্তব্য পছন্দ হলোনা। ভদ্রভাবেই গলা উঁচু করল সে,

“সংসারে অনেক ঝুঁটঝামেলা হয়। আবার মিটেও যায়। সবকিছুকে তালাক পর্যন্ত টেনে নেয়ার মানে হয়না। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে তিনটি ব্যাপারেই আল্লাহ তায়ালার নিয়ত, রহমত আর ইচ্ছা থাকে। তাই মানুষের শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিৎ। তোমাদের সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাচ্ছি। তবে অভিজ্ঞ আর গুরুজন হিসাবে বলব, আবেগের বশে যেনতেন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসোনা। ভবিষ্যতের চিন্তা করো। ইযানের কাস্টাডি কেইস চলছে, এর মধ্যে তালাক কীভাবে হবে? তাছাড়া ইচ্ছা হলো, তিন তালাক বললাম এবং তালাক হয়ে গেলো এমনটাও না। ওটা হারাম। ইদ্দতকাল আছে, রুজুর ব্যাপার আছে। তোমরা সবকিছুকে এত হালকাভাবে নাও কেন? বিষয়টা খুবই দুঃখজনক।”

ইরাম চুপচাপ মিসিরের কথা হজম করল। কিছু বললনা। মিসির গলা খাঁকারি দিয়ে পরক্ষণে বলল,
“যাই হোক, এই বাড়ির জামাই বা কারো দুলাভাই হিসাবে নয়, বরং একজন বড় ভাই হিসাবে দুই জনকেই বলছি, প্লীজ রিকনসিডার। তোমাদের দুজনের সাথে একটা নিষ্পাপ বাচ্চার জীবন জড়িয়ে আছে। জানি, সত্য থেকে পালানো মুশকিল। সত্য বুকে চেপে বাঁচাও মুশকিল। তবুও বলব চেষ্টা করতে। দরকার হলে সেপারেশনে যাও, আলাদা থাকো, নিজেদের সময় দাও, চিন্তাভাবনা করো। তবুও তালাক হালকাভাবে নিওনা। বিশেষ করে তুমি, ইরাম। একবারের ডিভোর্সি হয়ে যে জাহান্নাম দেখেছ, দুইবারের ডিভোর্সি হলে কী দেখবে তার ধারণা তুমি আমার থেকে ভালো রাখো।”
দীর্ঘক্ষণ বাড়ির কেউ কোনো কথা বলতে পারলনা। শেষমেষ একটা নিঃশ্বাস ফেলল ইরাম। বলল,
“ধন্যবাদ মিসির ভাইয়া। আপনার কথাগুলো আমি মনে রাখব। তবে কী বলুন তো? কাদায় যখন পা ডুবিয়েই ফেলেছি তখন আর শরীর বাঁচিয়ে কী হবে? তাছাড়া তালাকের কথা আলাদিন বলেছে, আর ওর সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাই। যদি ও না চায়, আমি আর কোনো সম্পর্কেই ওকে বাঁধবনা।”
“আপু!”

তাড়া দিল ইহান। ইরাম ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে মাথা দোলাল। শেষ একবার সকলের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি স্থির হলো টেবিলে বসে তখনো ফোন স্ক্রল করতে থাকা সাইবানের উপর। ছেলেটার সমস্ত হাতটাই এবার কাঁপছে। চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলছে সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তারপরও গো ধরে ওখানেই বসমান সে। ইরাম মনে মনে হাসল, পরিতাপ আর অনুশোচনার হাসি। এই ছেলেটাকে সে সর্বশান্ত করে ফেলেছে, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ইরাম যেখানেই যায়, সেখানেই আঁধার নেমে আসে। পরিবারের সন্তান হতে পারেনি, পালক পরিবারে শান্তি রাখতে পারেনি, বাবা হারিয়েছে, মা লামিয়া পাগল হয়েছে, ভাইদের মানুষ করতে সর্বস্ব জলাঞ্জলী দিয়েও হতাশ হতে হয়েছে। এক ভাই সুখের সংসার পেয়েছে কিন্তু তাতে তার জায়গা নেই। আরেক ভাই এখনো নিজের ঠিকানা গড়তে পারেনি। অরণ্য নামক এক পুরুষের সাথে বিয়ে হলো, সেখানেও অশান্তি। গর্ভের প্রথম প্রাণ ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিল। দ্বিতীয় প্রাণ যাও না ভূমিষ্ঠ হলো, মায়ের চাইতেও যন্ত্রণাদায়ক জীবনের সাক্ষী হলো। সামিয়া মুন্সীর গোছানো পরিবারটার শান্তিও সে নষ্ট করে ফেলেছে। ইরাম আসলেই একটা অভিশাপ। যার জীবনেই যায় তাকেই ধ্বসিয়ে দেয়। কী দরকার আর এই ছেলেটার যতটুকু জীবন বাকি আছে ততটুকু নষ্ট করার? যা করার সে ইতোমধ্যে করে ফেলেছে। সেই আঘাত থেকে সাইবান শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ। প্রতি মুহূর্তে তার মুখটা দেখলেই ছেলেটার মনে পড়ে যাবে কতখানি যন্ত্রণা স্ত্রী তাকে দিয়েছে। এমন স্ত্রী হয়ে থেকে যাওয়ার চাইতে না থাকাটাই বরং ভালো।

“আসছি। তালাকের কাগজ পাঠিয়ে দিও, আমি সই করে দেব।”
কথাটা ইরাম কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে দেখা না গেলেও স্পষ্ট বোঝা গেল। আর দাঁড়ালনা রমণী। হনহন করে হাঁটা দিল সদর দরজার দিকে। ইহান লাগেজ নিয়ে এর মধ্যেই মূল ফটকে পৌঁছে গিয়েছে। চৌকাঠের বাইরে পা দিতে গেল ইরাম, ঠিক তখনি হঠাৎ,
“বা…!”
ইযান এতক্ষণ যাবৎ শান্ত থাকলেও এবার থাকলনা। ইরামের বুক থেকে মাথা তুলে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠল। তারা বাইরে যাচ্ছে, অথচ সাথে বাবা আসছে না এটা ছোট্ট প্রাণটা ধরতে পেরেছে বোধ হয়। নাকি এমনিতেই ডেকেছে? থমকালো ইরাম। মুখ নামিয়ে ছেলের দিকে তাকাল।
“হুশ, আব্বু, এইতো আমরা এখন ঘুরতে যাচ্ছি। ঐযে দেখো, মামা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্য। ঘুরুঘুরু করব আমরা, বেড়াব, কুচুপুকে চকলেট কিনে দেব। খাও না তুমি? হুম?”
ইরাম আবারও বাইরে যেতে গেল কিন্তু তার বাহুর মাঝে বাইন মাছের মতন ঝটকা দিয়ে উঠল ইযান। যাবে না সে, কিছুতেই যাবেনা! ছেলেকে ধরে রাখতেই বেগ পোহালো ইরাম। শেষমেষ উপায়ান্তর না পেয়ে কোল থেকে নামাতে বাধ্য হলো। ছাড়া পেতেই ইযান এমনভাবে হামাগুড়ি দিতে শুরু করল যেন হামাগুড়ির রেসে নেমেছে। কেউ ছোট্ট বাচ্চাটার পথে হস্তক্ষেপ করলনা। প্রসারিত নয়নে চেয়ে চেয়ে দেখল। ইযান হামাগুড়ি দিয়ে এসে টেবিলের কাছে থামল। মুখ তুলে সাইবানকে দেখল।

“বা!”
আরেকবার ডাকল সে। পাথরের মতন বসে থাকল সাইবান। শরীরের সবটুকু শক্তির দরকার হলো মাথা ঘুরিয়ে না তাকানোর জন্য। ফোনটা আর দেখতে পারছেনা। ওটা টেবিলের উপরেই সশব্দে আছড়ে পড়ল। পিতার আগ্রহ না পেয়ে ইযান হামাগুড়ি দিয়ে নিকটে পৌঁছাল। ছোট্ট দুখানা হাতে সাইবানের পা আঁকড়ে ধরল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ইযানের দুই চোখ ভিজে উঠেছে, মুখটা লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মুহূর্তেই তার কান্না ধ্বনিত হলো, গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে আচমকা বাচ্চাটা ডেকে বসল,
“বাব্বা!”
সাইবানের সমস্ত শরীরে বুঝি বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল সে বাচ্চাটার দিকে। সর্বাঙ্গ কাঁপল তার যেন ধরায় ভূমিকম্প হচ্ছে। তার পা জড়িয়ে ধরে তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে ইযান আধো আধো বুলিতে বারংবার ডাকছে ওই একটা শব্দ,
“বাব্বা…বা…বা…বাব্বা!”

একটা শব্দ। যে শব্দটা পরিপূর্ণভাবে শোনার আশায় হাজার রজনীযাপন। সেই শব্দটা অবশেষে কানে এলো পিতৃত্বের অনুভূতির জলোচ্ছ্বাস তুলে। অথচ ভাগ্য কী কুটিল! আজ আনন্দযাপনের উপায় নেই। চারিদিকে শুধু বিরহের মাতম। সাইবানের সামনে সমস্ত পৃথিবীটা বুঝি গুঁড়িয়ে গেল। শুষ্ক চোখজোড়ায় আচমকা বন্যায় ভাঙা বাঁধের মতন প্লাবন ঘটল অশ্রুর। ওই ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটার জন্য বুকে অজস্র বেদনা হানা দিল। ঝুঁকে গেল সে, ইযান তখনো বাব্বা বাব্বা ডেকে যাচ্ছে আকুল হয়ে। সাইবানের কাঁপা কাঁপা হাত দুটো ছেলের। দিকে এগোল ঠিকই। কিন্তু ছুঁয়ে দিতে পারলনা। এর আগেই ইরাম ভেতরে চলে এলো। ক্রন্দনরত ছেলেকে জোরপূর্বক সাইবানের পায়ের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিজের কোলে তুলে নিল। সাইবানের হাত মাঝপথেই থেমে গেল। সেগুলো গুটিয়ে ফেলল সে সহসা। নিজেকে শাসাল। দূর্বল হয়ে যাচ্ছিল সে! ইযানের ছটফট করতে থাকা শরীর জোর করে নিজের বুকে চেপে ধরে ইরাম ফিসফিস করে একটাই শব্দ উচ্চারণ করল,

“সরি।”
আর দাঁড়ালনা সে। সমস্ত মায়া ছিন্ন করে হেঁটে চলে গেল বাড়ির বাইরে। অপেক্ষারত ইহানের অনুসরণে এগোল। বাইরে থেকে তখনো ইযানের তীক্ষ্ণ কান্নার শব্দ ভেসে আসছে,
“উয়াআ…বাব্বা…আ…বাব্বা!”
একসময় সেই কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে গেল। চলে গিয়েছে ইরাম। দূরে। ছেলেকে নিয়ে বহু দূরে। সাইবান মূর্তিমান হয়ে রইল। সকলের নিস্তব্ধ নয়ন তার অবয়বে আবদ্ধ। আর সহ্য করা সম্ভব হলোনা। সাইবানের শরীরটা বারকয়েক ঝটকা দিয়ে উঠল যেন ইলেকট্রিক শক খেয়েছে। তারপরই ডুকরে কেঁদে ফেলল সে। বাচ্চাদের মতন করে। অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল তার দুই চোখ উপচে। ইযানের কান্নার স্থান দখল করে নিল সাইবানের ফোঁপানোর শব্দ। কেউ তাকে ধরলনা। ধরে কী হবে? শান্তনা দেয়া যাবে? সর্বহারা পিতাকে শান্তনা দেয়া আদৌ সম্ভব?

আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। থেকে থেকে মেঘের ঘর্ষণের ফলে গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হচ্ছে। প্রকৃতিতে উঠেছে ঝোড়ো বাতাস। এলোমেলো করে দিচ্ছে সবকিছুকে। আজকাল আবহাওয়ার ঠিক নেই। মানুষের দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে এই রোদ, এই বর্ষণ। বাতাসের ঝাঁপটায় সড়কের এদিক সেদিক পড়ে থাকা ময়লাগুলো উড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির থেকে বাঁচতে পথচারীরা দ্রুত পা চালাচ্ছে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে। সাইবান এলোমেলোভাবে হাঁটছে সড়কের ধার ঘেঁষে। তার কোনো গন্তব্য নেই। কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই। সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। কোথায় কোথায় ভবঘুরের মতন হেঁটে বেরিয়েছে আনমনে নিজেরই হিসাব নেই। তার এমন বিধ্বস্ত চলনে আশেপাশের কতক মানুষ ফিরে ফিরে দেখছে। আবারও নিজেদের কাজে যাচ্ছে। সাইবানের তাতে বিশেষ পরোয়া নেই। কোনোদিকে মনোযোগ নেই। কূলহারা এক পথিক সে। বুকের ভেতর ফাঁপা শূন্যতা। চোখের পানি গালের উপর শুকিয়ে দাগ বসে গিয়েছে। চুলগুলো বাতাসের ঝাঁপটায় হয়েছে উষ্কখুষ্ক। হোক, ঠিক করার মতন আর কিছুই তো তার জীবনে বাকি নেই।

গন্তব্যহীন হাঁটতে হাঁটতে সাইবান যে কোথায় পৌঁছাল নিজেও বলতে পারবেনা। চেনা শহরটাকেও আজ অচেনা লাগছে। পাশে ছোট একটা পার্কের মতন। সিমেন্টের বেশ কতক বেঞ্চ পাতা। সেই বেঞ্চে বসে আছে ভার্সিটি ফেরত বন্ধুর দল। একজনের হাতে গাঢ় নীল রঙের একটা গিটার। ঝোড়ো মৌসুমটাকে বেশ উপভোগ করছে তারা। হুট করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আশেপাশের সব মানুষেরা ছুটে ছুটে গেল দোকানপাটের ভেতর আশ্রয় নিতে। ব্যস্ত সড়কের যানবাহন ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব আর রইলনা। ঠাসাঠাসি করে গাছতলায় নয়ত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছে অনেকে। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে ধরল মাথায়। সাইবান বৃষ্টির তোড়ে মুহূর্তেই ভিজে গেল। পরনের ট্যাংক টপের উপরে থাকা বোতাম খোলা আকাশী শার্ট তার শরীরে লেপ্টে গেল। আর্মি প্রিন্টের প্যান্ট জড়িয়ে গেল অঙ্গজুড়ে। চুলগুলো কপালে লেপ্টাল। হাড়হিম করা বাতাস শিরায় শিরায় তরঙ্গ খেলিয়ে দিল। এরপরও সাইবানের বোধ নেই। বন্ধুর দলটাকে পাশ কাটিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছিল ঠিক তখনি কানে গেল গিটারে তোলা সুর। তারাও কেউ ফিরে যাচ্ছেনা। বৃষ্টিভেজা লগ্নে গিটার বাজাতে বাজাতে দরাজ গলায় ধরেছে গান।

~যে পাখি ঘর বোঝেনা~
সাইবানের কী হলো সে বলতে পারবেনা। দাঁড়িয়ে পড়ল ওখানেই। কাকভেজা হয়েছে সে। ঠান্ডা বৃষ্টির পানির সঙ্গে সন্ধিতে মেতেছে তার নিজের চোখের উষ্ণ অশ্রু। গানটার সুর কানে যেতেই তার সমস্ত আত্মাজুড়ে অদ্ভুত বিষাদ ছড়িয়ে গেল। এই বিষাদ চেপে রাখা যায়না। যে ছেলেগুলো গান গাইছে তাদের সাইবান চেনে পর্যন্ত না। অথচ নিজেকে দমানোর আগেই দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে আকাশের পানে চেয়ে চোখ বুঁজে সে গেয়ে উঠল,
~যে পাখি ঘর বোঝে না উড়ে বেড়ায় বন বাঁদাড়ে
ভোলা মন মিছে কেন মনের খাঁচায় রাখিস তারে~
অচেনা এক লোককে নিজেদের সঙ্গে গাইতে লক্ষ্য করে বন্ধুর দলটি চমকালো। তবে তার আধ্যাত্মিক আবেদন তাদের মনে মুগ্ধতার সৃষ্টি করল। গিটার থামলনা, সাইবানের গায়কীর তালে তালে বেজে চলল। সাইবানের শরীরটা দুলতে লাগল হালকাভাবে। ঠিক যেমনভাবে কিছু কিছু মানুষ দেহতত্ত্বের গানগুলো গাওয়ার সময় নেচে চলে। যাদের দেখলে মনে হয় তাদের ভেতর পরাবাস্তব অস্তিত্বের বাস। খানিকটা বাউলদের মতন। ছাতা মাথায় যাওয়া পথচারীরা থমকে দাঁড়িয়ে দেখল এক ছেলেকে দুলতে দুলতে গাইতে। আর এক বন্ধুর দলকে সুরের মূর্ছনা তুলতে। বৃষ্টির জলধারা, মেঘের গর্জন আর বাতাসের শনশন ছাপিয়ে ক্ষণিকের জন্য সাইবানের কন্ঠস্বর গোটা ধরিত্রীকে ভুলিয়ে দিল কাজে যাওয়ার তাড়া।

~ও পাখি ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা
মানেনা প্রেমের শিকল
ও পাখি দশ দুয়ারে
শত মন করে দখল~
সাইবানের কন্ঠ, চোখের অশ্রু আর বৃষ্টি আর সঙ্গত করেছে। গাইতে গাইতে দুলতে দুলতে সাইবান সড়কের ধারের সেই ফুটপাতেই বসে পড়ল। অতঃপর ঠান্ডা পথে পিঠ ঠেকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। গিটারের সুর তুঙ্গে উঠল সঙ্গে তার গলাও,
~যে পাখি ঘর বোঝে না, যে পাখি ঘর বোঝেনা~

আশেপাশের অনেকেই সাইবানকে পাগল ভাবল। কেউ কেউ তো তার শরীর ডিঙিয়েই হেঁটে চলে গেল। কেউ কেউ হাসল। কেউ আবার মজা নিল, ছবি তুলল। শুধু মজা নিলনা ভার্সিটির ছেলেদের দলটা। কোনোকিছুতে আর কিছুই যায় আসেনা সাইবানের। তার পাওয়ার কিছু নেই, তেমন হারানোরও আর কিছুই বাকি নেই। বৃষ্টি কমে এলো। আকাশে রোদ ঝলমল করল। অথচ সাইবানের জীবনে আর রোদের ঔজ্জ্বল্য ফিরলনা। বন্ধুর দলটাও একসময় সাইবানের কাঁধ চাপড়ে একে একে বিদায় নিল। মানুষজন নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যাস্ত হলো। প্রকৃতি হলো শান্ত। সড়কের ধারে তখনো একইভাবে পড়ে রইল সাইবানের শরীরটা। এক সুতীব্র যাতনাময় বিচ্ছেদের সাক্ষীস্বরূপ।

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭ (২)

সাইবান বোধ হয় রাস্তায় শুয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। এই পৃথিবী তার জন্য আর থামেনি। চোখের উপর কিছু একটার ছায়া পড়তেই সে মিটমিট করে তাকাল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে বিশাল কালো ছাতা মাথায় এক পরিচিত মুখ তার দিকে ঝুঁকে আছে। প্রথমটায় ঝাপসা চোখে সাইবান দেখতে পেলনা। চোখের উপর হাত দিয়ে মিটমিট করে তাকাল। ভেজা ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো তার। ফিসফিস করল,
“ড্যাড….”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৯