Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৭০

আমার আলাদিন পর্ব ৭০

আমার আলাদিন পর্ব ৭০
জাবিন ফোরকান

পেরিয়েছে গোটা এক সপ্তাহ। একটা সময় যাদের ছাড়া জীবন চলবেনা মনে হতো, এখন তাদের ছাড়া দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে। সময় কারো জন্য থামে না। জীবন কাউকে করুণা করেনা। উভয়ে বয়ে চলে আপন মর্জিতে। সেই মর্জিতে কারো জবরদস্তি চলে না।

রান্নাঘরের মেঝেতে বটি নিয়ে বসে লাউ কুটছে ইরাম। ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা তার ম্যাকবুক। স্ক্রিনে লোডিং আইকন ভাসছে। গতকাল সারারাত জেগে করা প্রজেক্টের কাজটা অন্তিম পর্যায়ে আছে। এই সাত দিনে ইরাম কত ঘন্টা ঘুমিয়েছে তা হাতের আঙুলে গোণা সম্ভব। চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে। নিচে জন্মেছে ডার্ক সার্কেল। গাল দুটো ফুলেছে অস্বাভাবিকভাবে। ঘুম, বিশ্রামের অভাব এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে চেহারা ভেঙে আসতে শুরু করেছে। তাতে বিশেষ পরোয়া নেই ইরামের। রূপ লাবণ্য তাকে আর জীবিকা এনে দিতে পারবেনা। আগে ফ্রিল্যান্সিংয়ের যে কাজগুলো কম পারিশ্রমিকের কারণে নিত না, এখন সেগুলোর কাজও সে নেয়। কত টাকা পায় বাছবিচারের সুযোগ নেই। শুধু টাকা পেলেই হলো। এজন্য তার কাজের পরিমাণ বেড়েছে অত্যধিক। সারাদিন সারারাত ল্যাপটপেই কাটাতে হয়। যে কয়েক ঘণ্টা কাজ করে না, সেই কয়েক ঘণ্টা সে ঘরের কাজ করে, ইযানকে সময় দেয়। আজকাল ছেলের সঙ্গে খেলার সময়টাও তাকে জীবিকার পিছনে দিতে হচ্ছে। এক হাতে যখন ছেলেকে বল ছুঁড়ে দেয়, অন্য হাত তখন কি বোর্ডে ঘুরতে থাকে। এই নিয়ে ইযান নারাজ। মাঝে মাঝে তার সাথে খেলতে চায়না। মুখ ঘুরিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। তার মা কেন অন্য কিছুতে সময় দেবে? কই? আগে তো এমন করত না! ছেলের জন্য বুকটা হাহাকারে ফেটে যায় ইরামের। কিন্তু কিছু করার নেই। ইযান প্রায়শঃই রাতে ঘুমের মাঝে ‘বাব্বা, বাব্বা’ করে ডাকতে থাকে। কিন্তু ছেলের সকল ইচ্ছা পূরণের সামর্থ্য ইরাম আর ধারণ করেনা।

এর মধ্যেই হাত মুঠ করে ফেলেছে সে। ইযানের জন্য অতি দরকারী খরচ ছাড়া অন্য কোনো খরচই সে করে না। তার নিজের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। কায়সানের পাশাপাশি আরও দুটো ইউটিউব চ্যানেল আর ইনস্টাগ্রাম আইডির কাজ সে নিয়েছে। আগে সেগুলো ছোট আর মজুরি কম বিধায় নিতে চায়নি। এখন সবটাই করা হয়। না করলে সঞ্চয় জমবে কীভাবে? ভাতটুকুও সে আজকাল টিম মিটিংয়ে থাকতে থাকতে চুপিচুপি খেয়ে নেয়। রাতে প্রায়শই লোড শেডিং হয়। তখন কোলে ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় ঘুমন্ত ছেলেকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে ইরাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অক্লান্তভাবে। সাইবানদের বাড়িতে নিজস্ব জেনারেটর আর আই পি এস দুটোই ছিল। যার দরুণ লোডশেডিং বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব বোঝা যায়নি কখনোই। বাইরে তেমনটা নয়। এখানেও অবশ্য রাবিয়ার রুমে ছোট্ট আই পি এস আছে। তাতে একটা লাইট জ্বলে, ফ্যান আর ওয়াইফাই চলে। ইরামকে দেখে দেখে মাত্র সাত দিনেই রাবিয়া অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। সেদিন রাতে তো এসেই গিয়েছিল, বাচ্চাকে নিতে। ইযানকে নিয়ে নিজের রুমে ফ্যানের নিচে শুইয়ে দেবে সে। ইরাম মৃদু হেসে মানা করে দিয়েছে। রাবিয়া নিজের ঘুম কত রাত নষ্ট করবে?

ইহান একদিন পরপরই ইরাম আর ইযানকে দেখতে আসে। যখনই আসে, কিছু না কিছু নিয়েই আসে। সেটা নাস্তা হোক বা সংসারের টুকিটাকি সরঞ্জাম। ছোট ভাই এই টাকা কোথা থেকে পায় জেরা করলে ইহান একটা সত্যি স্বীকার করে। সে নাকি বন্ধুর মায়ের হোমমেড ফুড বিজনেসে ইভিনিং শিফটের ডেলিভারির কাজ করে। এটা কবে থেকে ধরেছে সেটা হাজার জিজ্ঞেস করেও জানা যায়নি। ইহানের খরচ সাধারণত রাহাতই বহন করে। তাই ছোট ভাই বেপরোয়া ভাবেই চলে। ইহান যে কাজটা শুধু ইরামের জন্যই নিয়েছে, সেটা বুঝতে বোনের বিশেষ বাকি থাকেনি। আচ্ছা, যদি ইহান জানতো সে মানুষ হিসাবে কতটা ব্যর্থ, তাহলে কী এভাবে ভালোবাসতো? ইরামের ভয় হয়। অনেকগুলো সম্পর্ক সে হারিয়ে ফেলেছে। গুটিকতক যারা এখনো আছে, তাদের নতুন করে সে হারাতে চায়না।
ইযান বিছানার সামনে ম্যাটে বসে নিজে নিজে খেলছে। এই ফাঁকে ইরাম রান্নার কাজটা সেরে নিচ্ছে। ছেলের জন্য পাতলা খিচুড়ি করবে। নিজের আর কী? একমুঠো ভাত আর লাউ হলেই চলে যাবে। রান্নায় যত কম সময় দেয়া যায় ততই মঙ্গল। এর মধ্যেই রাবিয়ার চিৎকার চেঁচামেচি কানে এলো। ফোনে কারো সঙ্গে উচ্চবাচ্য করছে সে। কিছুক্ষণ বাদে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো হতাশমুখে। ইরাম একমুঠো চাল ধুয়ে চুলায় বসাতে বসাতে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে রাবিয়া?”
থপথপ করে পা ফেলে এসে রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল রাবিয়া। ভ্রু কুঁচকে জানাল,
“আর বলো না আপু। আমার রান্নার খালাটা, সে নাকি আর আসতে পারবেনা। স্বামীর নাকি অসুখ, হাসপাতালে ভর্তি। বলি, তা হলে তো কাজ আরো বেশি দরকার, নাহলে হাসপাতালের খরচ দেবে কীভাবে? আমি শিওর, অন্য জায়গায় বেশি টাকায় কাজ পেয়েছে। সোজাসাপ্টা বললেই হয়। এত বাহানা করলে চলে? এখন আমি অর্ধেক মাসে রান্নার লোক কোথায় খুঁজব? এমনিতেও এই শহরে কাজের লোক পাওয়া যে কঠিন!”
রাবিয়ার কথা শুনে ইরাম থমকাল। তারপর পাতিলে আরও কিছুটা বাড়তি চাল তুলে দিয়ে বলল,
“তোমার আর রান্নার লোক খুঁজতে হবেনা। আমিই করব।”
রাবিয়া অবাক হলো। বলতে নিল,
“না না আপু! তুমি কেন? তুমি নিজের বাচ্চা, কাজ নিয়েই হিমশিম খাও আর…”
“ফ্রিতে দিচ্ছিনা। রান্নার লোক যেহেতু লাগবেই, সেহেতু আমি করলে ক্ষতি কী? তুমি একটা মানুষ, কাজই বা কতটুকু?”
“কিন্তু…তবুও…”

“বিনিময়ে আমার রুম ভাড়াটা যদি আরেকটু কমিয়ে রাখো তাহলে সুবিধা হয় আমার।”
রাবিয়ার চোখ দুটোতে অস্বাভাবিক একটা বেদনা ফুটে উঠল। দ্রুত কয়েক কদমে কাছে পৌঁছে সে হুট করেই ইরামকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ইরাম সেখানে জমে গেল। রাবিয়া হঠাৎ বলল,
“আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। এই কারণে অনেক আদরে বড় হলেও একাকীত্বে ভুগতাম। আমার যদি কোনো বোন থাকত, তাহলে সে কেমন হতো? তোমাকে দেখে আমার একটা না থাকা বোনের শখ মিটে গিয়েছে। এই ঘরটা তোমারই ইরাম আপু। তুমি যা মন চায় করো, আমার কোনো আপত্তি নেই। ভাড়া নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না। তোমার হাতের রান্না প্রতিদিন খেতে পারলে তো সোনায় সোহাগা! তবে হ্যাঁ, বাজারটা কিন্তু আমি মনের মতন করব। এই লাউ ঝাউ আমার পছন্দ না। তুমি শুধু রান্না করবে আর আমার সাথে খাবে। কেমন?”
ইরাম একটা নিঃশ্বাস ফেলল। কিছু কিছু মানুষ এত স্বার্থহীন হয়! একটুখানি আদরের জন্য কতকিছু করতে পারে! কী সরল তাদের বিশ্বাস! তার স্বামীটাও তো তাকে এভাবেই বিশ্বাস করেছিল। একটুখানি আদর চেয়েছিল। অথচ ইরাম কী স্বার্থপর হয়ে গেল! ইরামের লালচে চোখে অশ্রু জমলনা। অনুভূতিরা নিজেদের শুধরে নিতে শুরু করেছে। দরজার আড়াল ছাড়া আর কোথাও ঝরেনা।
ঠিক এমন সময়েই কলিং বেলের আওয়াজ। রাবিয়া দরজা খুলতে গেল। কিছুক্ষণ বাদে এসে আবার রান্নাঘরে উঁকি দিল,

“আপু, তোমার একটা পার্সেল এসেছে।”
ইরাম অপর চুলায় ডিম ভুনা বসিয়েছে। যেহেতু রাবিয়াও খাবে আজ। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে সে এগোল। পার্সেল? এই বাসায়? কিন্তু তার এই নতুন ঠিকানা কেউ তো জানেনা। সামিয়া কিছু পাঠিয়েছেন? তাকে সে আর ইযান ঠিক আছে এমন একটা টেক্সট মেসেজ পাঠানো ছাড়া আর যোগাযোগ করেনি ইরাম। পার্সেলের লোক একটা ছোট বক্স তার হাতে ধরিয়ে ওটিপি নিয়ে ডেলিভারি কনফার্ম করে চলে গেল। রাবিয়া তখন গিয়েছে ইযানের কাছে। খেলছে। দুজনের হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছে রুম থেকে। ইরাম টেবিলের উপর বক্সটা রাখল। কোনো প্রেরক ঠিকানা নেই। অদ্ভুত তো! ছু*রি এনে কে*টে বক্সটা খুলল সে। ভেতর থেকে এক টুকরো মখমল কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট একটা জিনিস বেরিয়ে এলো। সেটা হাতে নিতেই ইরামের চক্ষু চড়কগাছ। একটা ক্রেডিট কার্ড! মাস্টারকার্ড, প্রিমিয়াম! প্রথম কয়েক সেকেন্ড ইরাম ঠাওর করতে পারলনা কিছু। তারপর বক্সের দিকে তাকাতেই অন্য একটা জিনিস নজরে এলো। একটা চিরকুট। সেটা খুলতেই রমণীর সমস্ত শরীর তীব্র ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠল। হাতের প্যাঁচানো লিখা চিনতে একটুও ভুল হলোনা।

‘শুনলাম, সেপারেশনে আছো? আ ভেরি গুড ডিসিশন মাই সুইটহার্ট! কিন্তু তোমার আগুনে আমার ছেলেটাকে আবার জ্বালিয়ে ফেলনা। তুমি আমাকে চাও বা না চাও, আমার দরজা যেমন তোমার জন্য খোলা, তেমনি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। আবারও গরীব দুঃখীর জীবনে অভ্যস্থ হওয়ার দরকার নেই। কার্ড লিমিট ৪০ লাখ। স্পেন্ড অ্যায মাচ অ্যায ইউ ক্যান বিফোর আই সেন্ড আ সেকেন্ড ওয়ান, কবিতা। আফটার অল, আমি তোমার মাথা গরম স্বামীর মতন পাষাণ না।’
চিরকুটটা হাতের মাঝেই মুচড়ে ফেলল ইরাম। ইচ্ছা হলো কার্ড আর চিরকুট দুটোকেই আগুনে জ্বালিয়ে দিতে। কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে দমাল সে। চেয়ারে বসে জোরে জোরে শ্বাস টানল। হাত কাঁপছে তার। মিনিট দশেক প্রয়োজন হলো তার নিজেকে শান্ত করতে। তারপর হুট করেই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। চটজলদি উঠে নিজের ফোন এনে কার্ড আর চিরকুট দুটোরই ভিডিও এবং ছবি তুলে নিল সে। তারপর সুন্দরভাবে বক্সে ভরে যত্ন করে লুকিয়ে রাখল। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। ফোন থেকে অরণ্যর নাম্বারটা খুঁজে বের করল সে। রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় ভাত নেড়ে দিতে দিতে মেসেজ পাঠাল,

—কার্ড শুধু আপনার একার আছে বলে মনে করেন, মির্জা সাহেব?
এক লহমা থেমে ইরাম দীর্ঘ দম নিয়ে দ্বিতীয় এবং অন্তিম মেসেজ দিল,
—ভিকটিম কার্ড, সিমপ্যাথি কার্ড, ওমেন কার্ড, মাদার কার্ড, ডিভোর্সি কার্ড…. আই উইল প্লে এভ্রি ড্যাম কার্ড আই ওউন! আপনার প্রতিপক্ষ এবার আলাদিন না, ইযানের মা। কথা দিচ্ছি, খুব জলদিই আফসোস করবেন মিস্টার মির্জা।

দুপুরের কড়া রোদ রুমে এসে পড়লেও ঘুম ভাঙেনি এখানকার বাসিন্দার। এমন না যে সে রাতে ঘুমায়নি। বরং সারাদিন সারারাত সে এখানেই পড়ে থাকে। কিছু করে না। শুধু জোর করে খাওয়ানো হলে যা একটু মুখে তোলে। ছেলেকে নিয়ে বেজায় চিন্তিত আহমদ। আজও যখন বাসায় ফিরে দেখলেন সাইবান রুম থেকে বেরোয়নি, তখন তিনি হতাশাবোধ করলেন। হাতঘড়ি দেখলেন, তিনটা বেজে এসেছে প্রায়। বিকালের মধ্যে তাদের এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরোতে হবে। এইমাত্র ওই বাড়ি থেকে এসেছেন আহমদ। সাথে এনেছেন সাইবানের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আর ফেরেনি সাইবান। এই ফ্ল্যাটেই থাকে সে, আহমদের সাথে।
ওভেনে খাবার গরম করতে দিয়ে আহমদ শার্টের হাতা গুটিয়ে ঢুকলেন বেডরুমে। পর্দা সকালেই সরিয়ে দিয়েছিলেন। উজ্জ্বল সোনালী রোদে সমস্ত ঘর উপচে পড়ছে এখন। এত ঝকঝকে আলোতেও বিছানায় দিব্যি ঘুমুচ্ছে সাইবান। সুদর্শন চেহারাটায় মলিনতার ছাপ পড়েছে। অতি শখের শরীরজুড়ে অযত্নের ছড়াছড়ি। চিবুকে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চুলগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে। শরীরে কোনো কাপড় নেই। শুধু একটা কালো ট্রাউজার পরনে। বিছানায় কম্বলের নিচে শুয়ে আছে সে। বুকে একটা খেলনা জড়িয়ে ধরে রাখা। আহমদ এগোলেন। সূর্যের আলোয় স্পষ্ট দেখলেন সবুজাভ ডায়নোসর প্লাশি। বাচ্চারা যেমন খেলনা জড়িয়ে ঘুমায়, সাইবানও তেমনি সেটাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা আহমদের শুষ্ক চোখে কেন জলের উদ্রেক ঘটাল বুঝতে পারলেন না তিনি। অশ্রু গড়ানোর আগেই দ্রুত মুছে ফেললেন তা হাতের পিঠে। বিছানার কোণায় বসে ঘুমন্ত ছেলের মাথায় হাত বোলালেন,

“চ্যাম্প? এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে? রেডি হতে হবে। উঠবি না?”
প্রথম কিছুক্ষণ সাইবান কোনো প্রতিক্রিয়া করলনা। অতঃপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। আহমদ ছেলেকে জেগে উঠতে দেখে মৃদু হাসলেন। উঠে গিয়ে অর্ধেক গোছানো লাগেজটা টেনে এনে বাকি জিনিসগুলো ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন,
“জলদি ওঠ। ওভেনে খাবার গরম দিয়েছি। গোসল করে খেয়ে নে। তাড়াতাড়ি!”
সাইবান উঠে বসে রইল। চোখ পিটপিট করতে করতে শূণ্য দৃষ্টিতে পিতাকে দেখে গেল। আহমদ হঠাৎ মাঝপথে কাজ থামিয়ে দৌঁড়ে কোথায় গায়েব হলেন। আবার ফিরে এলেন শেভিং ক্রিম, তোয়ালে আর রেজর হাতে। অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ছেলের সামনে বসে পটু হাতে চিবুকে শেভিং ক্রিম মাখিয়ে শেভ করে দিতে লাগলেন তিনি। সাইবান বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেললেও তিনি ছাড়লেন না। বড়জোর কয়েক মিনিট লাগল তার। তারপরই তোয়ালেতে সাইবানের মুখটা মুছে দিয়ে একগাল হেসে তিনি বললেন,

“যা। এবার গোসল করে নে।”
এবার আর গাইগুই না করে সাইবান উঠে ধীরপায়ে বাথরুমের দিকে গেল। বিছানায় তার ফেলে যাওয়া ডায়নোসর প্লাশিটার দিকে একপলক চেয়ে সেটা হাতে নিয়ে লাগেজে ঢুকিয়ে দিলেন আহমদ।
বাথরুমে ঢুকে কিছুক্ষণ অযথাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল সাইবান। নিজেকে চিনতে বেগ পোহাল সে। এই কয়েকদিনেই শরীরে যেন আমূল পরিবর্তন এসেছে। মাথা নামিয়ে রোবটের মতন নিজের ফোনের দিকে তাকাল সে। কাউন্টারের উপর রাখা সেটা। ভাইব্রেট করে যাচ্ছে। ফ্রেন্ডগ্রুপে একের পর এক মেসেজ আসছে। অনুরাগ, নীরব, আফনান সবাই অস্থির হয়ে গেছে। অথচ সাইবান না কারো মেসেজ দেখল, না কারো রিপ্লাই করল। ফোনটার সুইচড অফ করে উল্টোভাবে ফেলে রাখল আবার। কাজটা করতে গিয়েই হঠাৎ নিজের হাতের উপর দৃষ্টি গেল তার। বাম হাতের অনামিকায় এখনো জ্বলজ্বল করছে সিলভারের আংটি। মৃদু দ্যুতি ছড়াচ্ছে ছোট্ট সবুজাভ পাথর। সাইবান সহস্র চেষ্টা করেছে। আংটিটা খুলে ছুঁড়ে ফেলেছে দেয়ালে, মেঝেতে। তার মিনিটখানেক বাদেই আবার কুড়িয়ে এনে আঙুলে পড়েছে। আংটিটা তাকে অদৃশ্য বলে টানে। সেই টানের এতই জোর যে সাইবান আলাদিন নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি। সেই আংটিটার দিকে স্থির চেয়ে থেকে শাওয়ার অন করে দিল সে। সমস্ত শরীর ভিজে টইটুম্বুর হলো। আর সে দাঁড়িয়ে দেখে যেতে লাগল আংটিটাকে।

গোসল সেরে নিজে থেকেই তৈরি হয়ে নিল সাইবান। কালো হুডি আর এর উপর ওভারকোট পরে নিল সে। আহমদ এখনো শেষ মুহূর্তের গোছগাছ করছেন তাই তাকে বিরক্ত না করে নিজে থেকেই কিচেনে গেল। ওভেন থেকে খাবার বের করে প্লেটে নিয়ে চামচ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খেতে লাগল। ঠিক এমন সময় হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ। সাইবান অবাক হলো। আহমদের এই বাসায় তো কেউ আসেনা! সারিকা আসতে চেয়েছিল, আহমদ ফোন করে মেয়েকে মানা করেছেন। তবে? খানিকটা কৌতূহল নিয়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলল সাইবান। ওপাশে দাঁড়ানো অপ্রত্যাশিত মানুষটা তাকে জমিয়ে দিল। টপ আর স্কার্ট পরনে এক সুদর্শনা দাঁড়িয়ে। পরিচিত মুখখানায় নির্মল ভাব। আগের তীক্ষ্ণতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সাইবানকে দেখে মিষ্টি হাসল সে,
“ভেতরে আসতে পারি, জিনি?”

চারটা নাগাদ কাজকর্ম সেরে লম্বা একটা গোসল দিয়ে ছাদে এসেছে ইরাম। ইযানকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। রাবিয়া তার রুমে বসেই ল্যাপটপে কাজ করছে তাই চিন্তা নেই। ভেজা কাপড়গুলো ধীরে ধীরে দঁড়িতে মেলে দিতে লাগল সে। চুলের গামছা খুলে মুছে নিয়ে সেটাও মেলে দিয়ে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়াল সে। বাতাস বইছে। সারাদিনের উদ্ভট গরমটা কমে এসেছে। দিগন্তে ছুঁয়ে যাচ্ছে কমলা রেখা। দৃশ্যটার দিকে একনাগাড়ে চেয়ে রইল ইরাম। দূরে পাখির দল উড়ে যাচ্ছে। নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি। ঢোক গিলল ইরাম। ওই পাখিরও আপন নীড় আছে। সেখানে ইরাম আজীবন বানভাসীই থেকে গেল। আজ এখানে, কাল সেখানে। তার নিজের বলতে শুধু কবরটাই কপালে রয়ে গেছে।
“কী ভাবছ?”
কন্ঠস্বরটা কানে গেলেও ইরাম চমকালনা। খুব সহজেই এর মালিককে চিনে ফেলল। পিছন ঘুরে তাকানোর প্রয়োজন পড়লনা।

“পাখিদের দেখছি। দিনশেষে বাড়ি ফিরছে ওরা, আপনজনের কাছে।”
ইরামের পাশে এসে দাঁড়াল কায়সান। পরনে নীলচে স্যুট তার। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। একটা সেমিনার ছিল। সেখানে সে আমন্ত্রিত অতিথি এবং কম্পিটিশনের বিচারক ছিল। এখানে আসতেই রাবিয়া জানাল ইরাম ছাদে, তাই ছাদে চলে এসেছে।
“পাখি একটা চমৎকার প্রাণী। তবে ওদের যে দেখতে এসেছ, কিছু খেয়ে এসেছ? মানুষের সন্ধ্যার নাস্তা করার সময় ঘনিয়ে এলো, তুমি দুপুরের খাবারটা অন্তত পেটে দিয়েছ?”
কায়সানের চিন্তায় মৃদু হাসল ইরাম। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে কপালে। আঙুলের সাহায্যে সেগুলো ছড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আজকাল খেতে ইচ্ছা হয়না। নেহায়েত শরীরের জন্য দরকার। নাহলে এই প্রকৃতির হাওয়াই অধিক সুস্বাদু।”
কায়সান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার কপালের বলিরেখায় প্রকাশ পেল জবাবটা পছন্দ হয়নি। ইরামের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে নিজের হাতটা রেলিংয়ের হয়ে রাখল কায়সান। আকাশের দিকে তাকাতেই তার চশমার ফ্রেমে নীলচে গগন প্রতিফলিত হলো।

“অনেকের বাঁচতে ইচ্ছা হয়না। তবুও তারা বাঁচে। অনেকের মরতে ইচ্ছা হয়না। তবুও তারা মরে। এটা জগতের নিয়ম। যে নিয়ম লঙ্ঘন করার সাধ্য তোমার আমার মতন তুচ্ছ মানুষদের হয়না।”
ইরাম চুপ করে রইল। কায়সান তার দিকে ফিরল। ভেঙে আসা চেহারাটা দেখে নরম গলায় বলল,
“নিজেকে ভেঙে যদি ভালো থাকা যেত, তাহলে এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ ভালো থাকত। ভালো থাকা বলে আদতে কিছু হয়না। তুমি ভাবছ সকলের কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। অথচ একটা জীবন তোমাকে আঁকড়েই বেঁচে আছে। হয়ত কখনো চোখের বদলে মনের দুয়ার খুলে দেখোনি, নাহলে তোমার প্রয়োজন নিয়েই কাউকে না কাউকে বেঁচে থাকতে দেখতে।”
এবার আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে সরাসরি কায়সানের দিকে তাকাল ইরাম। চশমার ওপাশে থাকা গাঢ় অনুভূতিসম্পন্ন চোখজোড়ার সাথে তার দৃষ্টি মিলিত হলো।
“তুমি আমাকে পছন্দ করো, কায়সান?”
কায়সানের চেহারা থেকে নমনীয়তাটুকু এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। বিব্রত দেখাল বেশ। চোখজোড়া কাঁপল আতঙ্কে। মুখ ফিরিয়ে নিল সে অন্যদিকে। এমন সরাসরি প্রশ্ন আশা করেনি। রেলিংয়ের উপর আঙুলগুলো চেপে বসল। ইরাম প্রত্যেকটা প্রতিক্রিয়াই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। শেষমেষ কায়সান অস্বীকার করলনা।

“যদি বলি করি, তবে কী খুব ভুল হবে?”
ইরাম সন্তুষ্ট হলো। সৎ জবাব দিয়েছে, এটা ভালো ব্যাপার। চোখ ফিরিয়ে পুনরায় আকাশের দিকে তাকাল ইরাম,
“উহু। আগে বলোনি কেন?”
“আগে বললে তুমি কী আমার হতে?”
“দেখা যেত।”
“ওয়েল…দেখা যায়নি। খুব বেশি দেরী করে ফেলেছি। নিজেকে তোমার যোগ্য হিসাবে গড়ে তুলতে তুলতে অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছিল।”
ইরাম কিছু বললনা আর। দুজনের নীরবতার মাঝে শনশনে হাওয়া খেলে গেল। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। কায়সান একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে হঠাৎ বলে উঠল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“করো।”

“তোমার কী মনে হয়? সত্যিই অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে? জানি, অনেক কঠিন। তবুও যদি বলি, আরেকটাবার নতুন শুরু করা যায়?”
কায়সানের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে। অনেক ভয়ে আছে, চেহারায় নীলচে ছাপ পড়েছে। ইরাম মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তারপর হঠাৎ করে মুচকি হাসল। এমন গুরুতর মুহূর্তে ইরামের হাসিটা বেমানান লাগল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল কায়সান,
“হাসছ কেন?”
“হাসছি আমার নসিব দেখে। তোমরা আমার মতন জোড়াতালি দেয়া মানুষের মাঝে কী পাও বলো তো?”
“আবারও দেরী হয়ে গিয়েছে?”
“অনেকটা।”

ঢোক গিলল কায়সান। ইরাম তার চোখে চোখ রেখে উদাসী গলায় জানাল,
“তোমার দেরী হওয়া না হওয়ায় আমার কিছু আসে যায়না, কায়সান। কারণ এই মনটা আমি বোঝার আগেই একজনের নামে লিখিত হয়ে গেছে।”
“তুমি কাউকে ভালোবাসো?”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৯

এবার কায়সানের উপর থেকে চোখ সরিয়ে দিগন্তে চেয়ে ইরাম বলল,
“আমি বাসিনা। আমার অন্তর বাসে। তাই সরি, এই এক অন্তরে আর কোনোদিন নতুন সূচনা হবেনা। ইরামের জীবনপন্যাস বিচ্ছেদের অধ্যায়েই সমাপ্ত।”

আমার আলাদিন শেষ পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here