আমার বোবাফুল পর্ব ৪
তৃপ্তি এহসান নাওরা
“সুখ আম্মা.. পইরা যাইবেন তো আস্তে দৌড়ান!”
সুখের পায়ের গতি শিথিল হয়ে এলো। মাঝ সিঁড়িতেই থেমে গিয়ে রেলিংয়ে হাত রেখে নিচের দিকে উঁকি দেয়ার মতো তাকায়।সাইমা বুয়া দাঁড়িয়ে আছে কোমরে একগাট্টি কাপড়ের স্তুপ নিয়ে। ওয়াশিং মেশিনে দিবে বোধহয়। জোরপূর্বক ঠোঁট এলিয়ে হেসে মাথা নাড়ায় সুখ।ধীর পায়ে সিঁড়ি শেষ করে প্রথমে চোখ রাখলো ড্রয়িং রুমে।দাদু প্রায়শই সেখানে থাকে।সুখ প্রচন্ড ভয় পায় তাকে। স্থান,কাল পরখ না করে কটু কথা শুনায় যে!সহজে তার সামনে পড়তে চায়না সুখ।দাদু যেনো ঘুনাক্ষরেও টের না পায় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পিলপিল পা ফেলে মায়ের কক্ষের অভিমুখে হাঁটা ধরে মেয়েটা।
“ ওই মাইয়া চোরের মতো কই যাস?”
তপ্ত শ্বাস ফেলে আহত চোখে সুখ অদৃশ্যে তাকিয়ে রয় অল্পক্ষণ। বাজপাখির নজর ঠিকই দেখে ফেলেছে তাকে।সুখ তার দিকে ঘুরে হাত নেড়েচেড়ে বুঝাতে চাইলো,
“ আম্মু’র ঘরে”
ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বৃদ্ধা কোণা চোখে চেয়ে দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করে গম্ভীর গলায়,
“ সেখানে কী করবি?”
সুখের কপাল কুঞ্চিৎ হয়।একজন মেয়ে তার মায়ের ঘরে কারণে অকারণে যেতেই পারে!সেটা জিজ্ঞেস করার কী দরকার?সুখ নিজস্ব ভাষায় জবাব করে,
“ কাজ আছে”
“ এই বিকাল বেলা ছোট বৌমার ঘরে তোর কী কাজ থাকতে পারে?”
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে সুখ। প্রত্যুত্তর করার মনোভাব তার মাঝে দেখ গেলো না। বৃদ্ধা উত্তর না পেয়ে সোফা হতে ঘাড় বাঁকিয়ে পুণরায় চাইলো। ততোক্ষণে সুখ পিঠ পিছে হেঁটে যাচ্ছে রুবাইয়্যাতের ঘরে।সে ভেতরে ঢুকে যেতেই হানিফা বেগমের চোখ পাকিয়ে এলো বিষ্ময়ে।
“ বোবার সাহস দেখছিস?আমার কথার জবাব না দিয়ে কেমনে চইলা গেলো?”
“ উফফ্ নানু!তুমি সবসময় ওর সাথে রুড বিহেভ করলে জবাব দেবে কেনো?আমি হলে তো কখনো ফিরেই চাইতাম না ”
বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তুহফা নিজ বক্তব্য শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। এখানে আর মন টিকবে না। গার্ডেনে গিয়ে কানে এয়ারফোন গুঁজে গান শুনা ঢের ভালো।হানিফা বেগম চুপসে গেলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
“ সবাইরে নিজের দলে টেনে নিয়েই গেলো অসভ্য বোবা মাইয়াটা”
বলা বাহুল্য,হানিফা বেগমের দুই পুত্র এবং এক কন্যা।বড়জন আযাদ শিকদার।তার ঘরে –বর্ণ, অভ্র ও নূরা’র জন্ম।ছোটজন তামিজ শিকদার।তার একমাত্র মেয়ে সুখ।কন্যা মুনতাহা।বিয়ের তিন বছরের মাথায় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃ!ত্যুবরণ করেন।তুহফা তারই মেয়ে।সেই থেকে বোনজিকে নিজেদের কাছে এনে রেখেছেন আযাদ এবং তামিজ শিকদার। নিজেদের সন্তানদের মতো সমান ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করে বড় করেছেন।
দুপুর হতে মাথাটা ধরে আছে রুবাইয়্যাতের।কপালে বাম মালিশ করে চোখ বুঝেছিলো ভদ্রমহিলা। পেটে ক্ষিদে পেয়েছে, কিন্তু মুখে নিতে ইচ্ছে করছে না কিছুই।তাই লাঞ্চটাও করা হয়নি।চোখের কার্নিশ বেয়ে আলগোছে ধীর লয়ে একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সময় মাঝপথে কেউ আলতো পরশে মুছে দিতেই ফট চোখ মেললেন তিনি।সুখ মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইলো ইশারায়,
“ যন্ত্রণা হচ্ছে খুব?”
রুবাইয়্যাত শুষ্ক ঠোঁটে মৃদু হাসলেন। উঠে বসে সুখকে নিজের পাশে বসিয়ে বললেন,
“ এইতো আমার আম্মা এসে গেছে।আর কোন যন্ত্রনা নেই ”
সুখ মায়ের কাঁধে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরলো।এই ভদ্রমহিলা পৃথিবীর সব আদর তার পায়ের কাছে ঠেলে রেখেও হয়তো বলবেন “ আম্মা.. আরো অনেক আদর বাকি আছে”!সবাই উনার ব্যবহারে আদিখ্যেতা বলে মুখ কুঁচকায়।এতে তার বিন্দু পরিমাণও পরিবর্তন হতে দেখেনি সুখ।এমন কেনো?মায়েরা সন্তানদের শুধু ভালোবাসে না।অনেক সময় মারেন ও, শাসন করেন। অথচ ভদ্রমহিলা কেবল আদরই দিয়ে এলেন দিনের পর দিন।
ঘরে,বাইরে মানুষ যেমন তাকে হেও করে তেমনি সুখের মাঝে মাঝে আর পাঁচটা মায়ের মতো রুবাইয়্যাতের মুখেও ভীষণ শুনতে ইচ্ছে করে “তুই অলক্ষ্মী।বোবা.. কপাল পোড়া।নিজের কপাল পুড়িয়ে জন্ম নিয়ে আমাদেরও কপাল পুড়েছিস”
তার সাধ জাগে চারপাশের আপনজনের কাছে এতোটা অবহেলা, বিরক্তি, কটুক্তি, দুঃখ,যন্ত্রণা পেতে…যতোটা আঘাত পেলে ভেতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে যায়। বেঁচে থাকার ইচ্ছেই মরে যায়।অথচ মা, বাবা দুজনেই তার কথা না বলতে পারাকে দূর্বলতা নয় বরং শক্তি হিসেবে ধরতে মনোবল জোগায়।
“ একটা প্রশ্ন করি?”
“ আজ আবার কী প্রশ্ন করবে আম্মা?”
ঠোঁটে হাসি ফুটিয়েই কথাটি বলেছিলেন রুবাইয়্যাত কিন্তু পরবর্তীতে সুখের ইশারা দেখে হাসিটা মিলিয়ে গেলো। সুখের কথার মর্মার্থ ছিল “ আমি কী সত্যিই তোমার মেয়ে?”
মায়ের চোখ মুখ শক্ত হতে দেখে সুখ দিশেহারা হয়। ইশারায় বলতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে আসে।ছোট ছোট মনের কথাগুলো ইশারায় নির্ভুল ভাবে অপর মানুষটিকে বুঝাতে সক্ষম হলেও জটিল কথাগুলো কেউ সহজে বুঝতে পারে না তার।
সুখ পাশ হাতড়ে রুবাইয়্যাতের ফোন হাতে নিয়ে অস্থির হাতে টাইপ করতে শুরু করে।চোখের পাপড়ি ভিজে আসছে।চোখের নোনাজল আর হাতের ইশারা ছাড়া তার যে আপন কোন ভাষা নেই!
রুবাইয়্যাত মেয়েকে দেখে যাচ্ছে অপলক। দুদিন ধরে মেয়েটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই প্রশ্ন করছে।এসবে কে ইন্ধন জুগিয়েছে?সুখ তার সাথে ফোনের স্ক্রিন তুলে ধরে।
“ ব্যাস, একবার বলো যে তুমি আমায় গর্ভধারণ করেছো।আর কোন প্রশ্ন করবো না। কাউকে কিচ্ছু বলবো না আম্মু!”
“ এর আগে তো তোমাকে এই নিয়ে কিছু বলতে শুনিনি অথচ দুদিন ধরে কীসব বলে যাচ্ছো?কে কী বলেছে তোমায়?দাদু বলেছে না এসব!আজ আমি ওনাকে ছেড়ে কথা বলবো না।এখনিই আমি….
কথাগুলো প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে উচ্চ শব্দেই বলেছেন রুবাইয়্যাত।বেড থেকে নেমে রুম ছাড়তে নিলে দুহাতে তাকে জাপটে ধরে সুখ। অশ্রুসিক্ত চোখে বারবার বুঝাতে চাইছে।
“ দাদু কিছু বলেনি আমায়।কেউ কিচ্ছু বলেনি।ব্যাস,আমি এবাড়ির কারো মতো দেখতে নয় বলে এমনিই জানতে চেয়েছি”
ফোন সরিয়ে মেয়ের মুখের দিকে সন্দিহান চোখে চাইলো রুবাইয়্যাত। কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছেন তিনি।সুখ মৃদু হেসে ঘাড় কাত করে বুঝালো “এটাই সত্যি”!
“ পৃথিবীতে সব সন্তান বাবা মা অথবা নিকটাত্মীয়দের মতো হয়না।কেউ কেউ পরিবারের সবার চেয়ে আলাদা দেখতে হয়।তাই বলে কী তারা তাদের বাবা মায়ের সন্তান না?”
সুখ মাথা দুলালো।যেনো মেনে নিলো রুবাইয়্যাতের যুক্তি। হঠাৎ একটা কাজ করে বসলেন ভদ্রমহিলা।সুখের হাত টেনে মাথায় রেখে বললেন,
“ কথা দাও -এই প্রশ্ন আর কোনদিন করবে না?”
নির্বাক চোখে চেয়ে রয় সুখ।মনটা ধ্বক করে উঠলো যেনো -তার প্রশ্ন কী তবে যুক্তিযুক্ত ছিল?তাই আম্মু ভয় পেয়েছে প্রশ্নের মোকাবেলা করার?সে হাসলো ক্ষীণ।উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো। কীসব ভাবছে নির্বোধের মতো!এই নিয়ে আর ভাববেই না সে।যে আম্মু তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার কথা বিশ্বাস না করে ওই পুরুষটির মুখের কথা বিশ্বাস করাটা কী বোকামি হলো না তার? নিশ্চয়ই বর্ণ ভাই তাকে দুঃখ দিয়ে, ভেঙেচুরে দিতে চেয়েছে, তাই যাচ্ছে তাই বলে দিয়েছে।ওনার কথা আর বিশ্বাসই করবে না সুখ! মিথ্যুক!
অভিমানের পাল্লা হুরহুর করে কয়েকগুণ বেড়ে গেলো নিষ্ঠুর পুরুষটির উপর।নিজের প্রতি আরো একবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো -স্বেচ্ছায় ওনার পাশেই ঘেঁষবে না আর।
দরজার ওপাশে হানিফা বেগমের চেঁচামেচি শুনা যায়। -“ কী হইছে ছোট বৌ? চিৎকার শুনলাম!”
টিভির পর্দায়, ফেইসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রামে রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’কে নিয়ে তুলপাড় উঠেছে যেমন। আলো আঁধারি স্টেজে বর্ণ’র মুখশ্রী রাতের আকাশের চাঁদের মতোই ঝলমলে।হাতে গিটার, ঠোঁটের কাছে স্পিকার। চঞ্চল পায়ে স্টেজের এপাশ হতে ওপাশে ছুটে ছুটে কন্ঠে সুর তুলেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চলছে একদল। ডুয়েট গান হচ্ছে না তাই কোন নারী শিল্পীর উপস্থিত নেই আপতত।সামনে দর্শকের হুঁ হুঁ কলরব।ফোনের ফ্লাশ অন করে স্ব স্ব স্থান থেকে ডানে বাঁয়ে স্লাইড করছে সকলে –দেখে মনে হচ্ছে অন্ধকারের বুকে মিটমিট দ্যুতি ছড়াচ্ছে নক্ষত্ররাজি।
ড্রয়িং রুমে ইয়া বড় টিভি সামনে নিয়ে বসেছে হানিফা বেগম, রুবাইয়্যাত,সাইমা বুয়া ও আরো দুজন মেইড।তুহফা আর নূরাও আছে।আইজা ছেলের উপর রেগে আছে প্রচুর।তার নাচন কুদন দেখবেনা বলে রুমে খিল এঁটে বসেছিল। কিন্তু বাহিরে নূরা আর হানিফা বেগমের উচ্ছাসে একঝলক এসে দেখে গেলেন শেষে।অভ্র বন্ধুদের সাথে ওখানেই গেছে।হয়তো বর্ণ’র সাথে দেখাও হয়েছে, হয়তোবা না!এতো এতো দর্শকের ভিড়ে ভাইয়ের কাছে ঘেঁষতে পারবে কী অভ্র?
অন্য সময় হলে সুখ সবার আগে টিভির সামনে বসে থাকতো। কখন বর্ণ’র চেহারা ভাসবে,কবে পুরুষটি কন্ঠে সুর তুলবে।তার পাশে কোন মেয়ে গান গাইছে।মেয়েরা কয়বার বর্ণ’র দিকে তাকিয়েছে,হেসেছে,
মেতেছে সব নোট করে রাখতো।আজ সেসব কিছুই করলো না সুখ। টিভির সামনেও গেলো না একবারের জন্যও।এতে অবশ্য হানিফা বেগম নারাজ।খাতা কলম হাতে টিভি দেখতে বসা মেয়েটার আজ কমতি অনুভব হচ্ছে।নূরা ডেকেছিল দুয়েক বার।সুখ যায়নি।
এতো দিনের নোট করে রাখা মোটা ডায়রিটায় তাচ্ছিল্য হেসে হাত বুলিয়ে দিলো সুখ। অতঃপর জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানায় এসে বসলো।ফোন হাতে ইন্সটাগ্রাম স্ক্রল করতেই বর্ণ সহ করো কজন শিল্পীদের মুখই আসলো কেবল।না চাইতেও স্ক্রল করে গেলো সুখ।মন বলছে দেখতে হবে না কিন্তু হাত যেনো ছাড়তে চাইছে না ফোন।
তামিজ শিকদার ব্যবসার কাজে বাহিরের দেশে আছেন বিগত দুই সপ্তাহ ধরে।রোজ কথা হলেও ব্যস্ততার কারণে কাল কথা হয়নি সুখের সাথে।ফোন বালিশে ঠেকিয়ে সুখ নিজ থেকেই তাকে কল দিলো। রিং হওয়ার খানিক পরেই রিসিভ হয়। ভদ্রলোক কোন এক হোটেলে উঠেছেন সেদেশের। খাবার খাচ্ছেন।সুখের ঠোঁটে হাসি ফুটলো।হাতের ইশারায় বললো,
“ আব্বু কখন আসবে?”
ভদ্রলোক হাসলেন অমায়িক,
“ খুব শীঘ্রই..
বর্ণ ফিরেছিল ঠিক দু’দিন পর। সেদিনের পর থেকে আজ তিন দিন পেরুলো।গত দিনগুলোতে সুখ একঝলকও নিজেকে বর্ণ’র সামনে পেশ করেনি।অন্যদিন হলে সময় সময় কফি নিয়ে তার রুমে হাজির হয়ে যেতো সে, গিটার হাতে গান ধরলে পাশে গিয়ে বসে থাকতো অকারণেই;তার কন্ঠে “বোবাফুল” নামটা ভীষণ আদুরে শোনায়।সে ভাবতো বর্ণ তাকে ভালোবেসেই এই নামে ডাকে। অথচ সেদিন বুঝলো –না, ভালোবেসে নয় বরং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেই তাকে নামটা দিয়েছে বর্ণ ভাই।সে যে বোবা ,মনের ভাব ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলতে অক্ষম -তা মনে করিয়ে দিতেই।
কলেজ থেকে ফিরে ঘরেই আটকে ছিল সুখ। মেয়েটা অল্পসল্প ঘরকুনো বলতেই চলে। লক্ষ্য করা যায়,গত কয়েকদিন ধরে তা আরো বেশিই হয়েছে।নূরা এলো তখন।ছয় বছরের নূরা’র কাছে সুখের হাত নাড়িয়ে কথা বলার ধরণ অনেক পছন্দ। অবোধ মেয়েটা একবার কৌতুহল মিশ্রিত আফসোস নিয়ে বলেও ছিল “ ইশশ্ সুখ।তুমি কী সুন্দর করে বলো!আমিও যদি বোবা হতাম। তোমার মতো হাত নেড়ে কথা বলতে পারতাম আর মানুষকে বোকা বানাতে”।বাচ্চা মেয়েটা হয়তো সেদিন বুঝেনি পৃথিবীতে কথা না বলতে পারাটা কতো বড় ভয়ঙ্কর অভিশাপ।
কথিত আছে, মানুষ অভ্যাসের দাস।বর্ণ মানুক বা না মানুক অথবা যতই অস্বীকার করুক।বোবাফুল তার অভ্যাসে মিশে গেছে।যা সে এই কয়দিন এড়িয়ে গেলেও আজ কিছুটা হলেও অনুভব করছে।এই যেমন খানিক আগে কফি চাইলো -দিয়ে গেলো একজন মেইড।সে তখন আশা রেখেছিল সুখ আসবে। অপেক্ষাও করেছিল বোধহয়। কিন্তু মেয়েটা এলো না। গিটার হাতে বারান্দায় বসেছিল কাল,কেনো যেনো দোর মেলে রেখেছিল।তখনো ভেবেছে বোবাবুল আসবে নিশ্চুপ হেঁটে। গুটিসুটি পায়ে কিছুটা সংকোচ,কিছুটা ভীতি নিয়ে বারান্দায় গিয়ে তার পাশে বসবে।অথচ বরাবরের মতো এমনটা হয়নি।
বারান্দায় বিন ব্যাগে পা ছড়িয়ে বসে চোখ মুখ কুঁচকে নিলো বর্ণ। বিড়বিড় করলো,
“ ইগনোর করে আমার ইগো হার্ট করছিস তুই বোবাফুল”
অযথাই সুখের উপর বিরক্তি উঠলো বর্ণ’র।সে নাহয় আসেপাশে ঘেঁষতে নিষেধ করেছে।তাই বলে এভাবে ইগনোর করবে?
কফি হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছাদের অভিমুখে রওনা দিলো সে। বহুদিন ছাদে ওঠা হয় না। বিস্তর আকাশটা চোখ মেলে দেখবে একবার।
“ সুখ তুমি ‘একা’ খেলতে পারো ”
সুখ প্রশ্নাতীত চোখে নূরার দিকে চাইলো। চোখ জ্বলজ্বল করছে তার। মেয়েটা ফের বুঝিয়ে বললো,
“ ওইযে পাঁচটা গুটি নিয়ে উপরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলে না?”
ঘনঘন উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেয় সুখ।নূরা যেনো এবার পেয়ে বসলো। আবদার করলো তারা দুজন খেলুক।সুখ বহুবার নিষেধ করেও লাভ হলো না।যেতে যেতে বললো,
“ আমার কাছে গুটি আছে। ফ্রেন্ডস দিয়েছে।তুমি এখানে থাকো আমি নিয়ে আসছি। কেমন?”
নূরা ছুটে নিচে নেমে আসে।মাঝ সিঁড়িতে থেমে গেলো একজনকে দেখে,
“ বর্ণ তুমিও ছাদে যাচ্ছো?”
“ আরে পাকনি! তুই ছাদে একা? নিষেধ…
“ একা নাতো সুখ আছে!”
মিনমিনে জবাব দিলো নূরা। বর্ণ’র মুখ বেঁকে আসে। কপাল সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে।নূরা তাড়া দেখিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো –বর্ণও যেনো তাদের সাথে একা খেলে।
আমার বোবাফুল পর্ব ৩
রেলিংয়ে বসে পা দুটো শূণ্যে ভাসিয়ে বাচ্চাদের মতো নাচাতে নাচাতে ঠোঁটে হাসি ফুটালো সুখ। দৃষ্টি দূরের ওই কড়াই গাছে। দুটো বক বসেছে সেথায়।পায়ের নূপুর থেকে ঝুনঝুন শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে চারিধারে। গোধূলির স্নিগ্ধ পরিবেশে শব্দগুলো সুর তালকেও যেনো হার মানাবে।সে থেমে গেলো একসময় বর্ণকে ছাদে প্রবেশ করতে দেখে। একঝলক চেয়েই নজর নামিয়ে রেলিং হতে নেমে গেলো তৎক্ষণাৎ। পুরুষটি তার দিকেই এগিয়ে আসছে। এখানে আর এক মুহূর্ত নয়।সুখ নত মস্তকে সামনে পা ফেললো। বর্ণ কে পাশ কাটিয়ে দুধাপ এগুতেই হঠাৎ…..
