Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

এশার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে তুষার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল নাওফিলের জন্য। নাওফিল ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিল মসজিদের ভেতর। সুস্থতা ফিরে পাবার পরও মানসিক প্রশান্তি ফিরে পাচ্ছে না সে। অবশ্য মানসিক প্রশান্তিতে কবেই বা দেখেছে ওকে? এই প্রশান্তি হারিয়ে ফেলার কারণ ইমাম না জানলেও তিনি যথা সম্ভব চেষ্টা করেন অনেক আদেশ-উপদেশ, জ্ঞান দিয়ে ওর মনকে শান্ত রাখতে। তিনি কিছুটা হতাশও নাওফিলের প্রতি। বছর তিন হলো নাওফিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-কালাম পড়তে আসা ছাড়া মসজিদে তেমন আসেই না, তাবলীগ করাও বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়াও ওর অনেক অবনতিও উপলব্ধি করেছেন ইমাম। অজ্ঞাত কারণেই নাওফিলকে তিনি প্রচণ্ড স্নেহ করেন। তাই আজ অনেকক্ষণ যাবৎ সময় নিয়েই কথা বললেন ওর সঙ্গে, অনেক বুঝ, জ্ঞান দিলেন আবারও। নাওফিল মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসেই তুষারকে জিজ্ঞেস করল, ‘খাওয়া-দাওয়া করে ফিরবি?’

-‘কেন? ঐশী রান্না করবে না?’
-‘ফোন করে নিষেধ করে দে আমাদের জন্য কিছু না করতে। বিয়ের মাত্র হলো কিছুদিন ওদের। এসেই আমার ভেজাল ঘাড়ে পড়ল। ভালো লাগে না নিজের কাছেই।’
-‘হুঁ, ঠিকই বলেছিস। যতই করুক, বিরক্ত তো হতেও পারে।’
পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঐশীকে কল করে বারণ করে দিলো তুষার তখনই। তারপর জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘কতদূর এগোলো দীধিতির ব্যাপারটা?’
উত্তর দিলো একটু দেরিতেই নাওফিল, ‘আমি বোধ হয় ভুল কাউকে সিলেক্ট করেছি৷ যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটা নয় ও।’
-‘একটু তো সময় লাগবে। ধীরে ধীরে মানিয়ে নেবে তো।’
-‘আমার প্রয়োজন আমারই মতো কাউকে। যেমনটা ও চায় ওরই মতো কাউকে। জটিলতা দেখে ওর মতো বুদ্ধিমতী মেয়ে কোনোভাবেই আমাকে মেনে নেবে না। ভেবেছিলাম মানিয়ে নিতে পারব হয়তো ওকে। কিন্তু সম্ভব না তা। যতটা বাস্তববাদী ততটাই আবেগপ্রবণ ও। আমার তো আবেগপ্রবণ, নরম মনের সঙ্গী প্রয়োজন নয়। আমার তো আমার থেকেও দৃঢ় মানসিকতার মানুষকে প্রয়োজন। যে আমাকে সামলে নিতে পারবে। একটা মানুষকে শুধু শুধু মানসিকভাবে হয়রান করছি৷ ওকে ছেড়ে দেওয়া উচিত বলেই মনে হচ্ছে আমার।’

-‘একটা মাসও তো গেল না। আর কয়েকটা দিন দ্যাখ। তাছাড়া তুই ফল করে গেছিস ওর ওপর। ছেড়ে থাকতে পারবি?’
-‘তোরা আছিস তো। ভালোবেসে ফেলেছি তো কী হয়েছে? ছেড়ে থেকে মরে তো আর যাব না।’
-‘কী এমন কারণে এখন মনে হচ্ছে ও তোর জন্য পারফেক্ট না?’
-‘ধৈর্যটা খুব কম ওর। আমাকে বুঝে নিতে পারবে না ও৷’
হাঁটতে হাঁটতে দু’জন বাসার কাছে চলে এসেছে। নাওফিলের কথাগুলো একটু সময় নিয়ে ভাবল তুষার। ভাবনা শেষে শুধু বলল ওকে, ‘আরেকটু ভেবেচিন্তে দ্যাখ। এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিস না।’
এ কথার উত্তরে নাওফিল নিশ্চুপ রইল। দুর্বল গলায় কিছুক্ষণ পর বলল, ‘বড়ো ভাইয়া আজকে ডেকেছে ওর নতুন বাসায়। রাতটা ওখানেই থাকব।’
যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা যে নিয়ে নিয়েছে নাওফিল। আজ সন্ধ্যার পর থেকে দীধিতির অশ্রুসিক্ত চোখদু’টোর অসহায় চাউনি ওর সমস্ত উদ্দেশ্য, স্বার্থপরতা, দৃঢ়তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। এমনটা হতো না, যদি দীধিতির প্রতি ভালোবাসাটুকু উপলব্ধি না হতো ওর। নির্দয় তো নয় সে, যে নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য পছন্দের মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করবে।

রাতটা জ্যোৎস্নালোকিত নয় আজ। তবুও ঘুমন্ত শহরকে দেখতে পাওয়া যায় নিয়ন বাতির আলোয়। পড়ার ফাঁকে দীধিতি আজও জানালার সামনে বসে আছে, নিমেষহীন চেয়ে আছে সেই খোলা ছাদটাতে, অপেক্ষার অবসান ঘটাক কেউ ওখানে একবার অন্তত এসে। সেই মানুষটি এসে কার্ণিশ ঘেঁষে দাঁড়াক, বিষণ্নতায় আবিষ্ট রবে তার মনন আর চোখজোড়া। আর সে এখানটাতে বসেই দেখতে পাবে সেই মানুষটির রোদন ভরা অন্তঃপুর। এমনটাই কেন চায় সে? একজন সুখী মানুষের বিচরণও তো হতে পারে সেখানে। কিন্তু ছাদটা যে শূন্যতায় মৃত বলেই তার অবচেতন মন একজন দুঃখবিলাসী মানুষকেই দেখতে চায়। আজ তার মনটাও ভালো নেই। তাই আজ খুব করে চাইছে, তারই মতো কেউ একজনের আগমন ঘটুক ওই ছাদটাতে, সঙ্গ পাক তারও বিষণ্ন মনটা। সে যে নাওফিলের কাছ থেকে ফিরে আসার পর আরও বেশি ভুগছে বিষণ্নতায়। এই পুরুষটির বক্ষস্থল থেকে তার মন শুনতে চাইছে একটি ডাক, ‘প্রাণেশ্বরী’। ক্ষণে ক্ষণে সে আরও বেশি উতলা হয়ে যাচ্ছে এই জটিল মানুষটিকে এক নিমিষে জয় করে ফেলবার জন্য। কিন্তু ধৈর্যের কাছেই যে বারবার হেরে যাচ্ছে, মন আর মস্তিষ্কের দ্বন্দে বারবার দ্বিধায় পড়ছে, নাওফিলের মন মতো সিদ্ধান্তে আদৌ পৌঁছতে পারবে কিনা তা নিয়ে এখনো হয়ে আছে সে অনিশ্চয়। সন্দিগ্ধচিত্ত তার নিজেকেই সব থেকে বেশি পীড়াতে ফেলছে।

এই নিশিথিনি আজ তার নিদ্রা দেশে যাবার জন্য নয়। সঠিক সিদ্ধান্তে তাকে আসতে হবে। নাওফিলের জন্য নয়, তার নিজের মুক্তি লাভের জন্য। মনের যত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, দোটানা সবটা এই ক্ষণেই কাটিয়ে উঠতে হবে তার। এজন্য প্রয়োজন নাওফিলের সহযোগিতাই। নাওফিলের বাসা থেকে ফিরে মোবাইলাটা আর হাতে নেওয়া হয়নি। কোথায় রাখা হয়েছে সেটাও খেয়ালে আসছে না। খুঁজে খুঁজে ব্যাগের মধ্যেই ফোনটা পেল। এখন বাজে রাত দু’টো। সেই সন্ধ্যা সাতটা থেকে এখন অবধি ফোনটা ব্যাগেই ছিল। ইস! কতজন ফোন দিয়েছে কে জানে? হাতে নিয়েই দেখতে পেল মা আর বোনের মিসড কল, ঊর্মি আপুও কল করেছিল। কল না ধরার জন্য কী টেনশনটাই না করছে মা! এখন আর তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। সব থেকে জরুরি এই মুহূর্তে নাওফিলের সাথে কথা বলা। এত রাতে কল করা শোভা দেখায় না ঠিকই। কিন্তু তার এখনি কথা বলতে হবে। সকাল হতে হতে মনটা আবার অন্য কিছু ভেবেও ঘুরে যেতে পারে। হাহ্! কী মন তার! নিজের মনের ওপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ নেই আজ কাল।

কিন্তু নাওফিলের নাম্বারে কল করার পূর্বেই নোটিফিকেশনে দেখতে পেল হোয়াটসঅ্যাপে আসা নাওফিলের অনেকগুলো ভয়েজ মেসেজ। অনেকদিন বাদে আজ নাওফিলের থেকে কোনো মেসেজ এল। বরাবরের মতো আজও অত্যধিক উত্তেজনা নিয়ে মেসেজটা ওপেন করল দীধিতি। ভয়েজটা চালু হবার পরও কয়েক সেকেন্ড শুধু নাওফিলের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। তারপরই বলতে শুরু করল নাওফিল, ‘আজকের মেসেজগুলো পেয়ে তুমি স্যাটিসফাইড হবে, দীধি। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। তোমাকে ভুল বলেছিলাম। আমার জীবনের উদ্দেশ্য একটা নয়, দু’টো। প্রথম উদ্দেশ্যটা পূরণের জন্যই দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের পিছে ছুটছি আমি। একজন প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী, যাকে আমার নিজেকে বোঝাতে সক্ষম হবো, নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে যে আমাকে সব সময় ভালো খারাপ সব মুহূর্তে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত৷ খুঁজছি এমন কাউকেই। কিংবা এমন কাউকে না পেলেও অন্তত নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারব, এমন কেউ। এটাই আমার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। আমি স্বার্থবাদী মানুষ, দীধি৷ ভালোবাসাটাই আমার কাছে মূখ্য নয়। আমার জীবনের প্রথম উদ্দেশ্যটা পূরণের জন্যই কাউকে আমার জীবনের সঙ্গে জড়াতে চাই আর এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই আমি বেঁচে আছি। যেটা আমি একা পূরণ করতে পারব না। আমার পুরো পরিবার নির্ভেজাল হলেও শুধু আমি মানুষটাই ভেজালযুক্ত। কিন্তু কারও ক্ষতি করে আমি নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছি না। তোমার চোখে যতদিন অবধি নিজের জন্য রাগ, বিরক্ত, ঘেন্না, ভয় দেখেছি, ততদিন অবধি ভেবেছি আমার জন্য তুমিই এক মাত্র বেস্ট। কিন্তু আজকের পর প্রমাণ পেয়েছি আমার ধারণাটা ভুল ছিল। আমি তোমাকে হেল্পলেস দেখতে চাই না, দীধি। মুক্ত বিহঙ্গকে শান্ত আকাশের বুকেই মানায়। ওকে কৃত্রিম জঙ্গলে মানায় না।’

এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য কী তা বুঝতে পারল দীধিতি শেষ ভয়েজ মেসেজটা চালু করে। ‘আল্লাহ করুক, আজকের দেখা হওয়া এবং কথায় আমাদের মাঝে যোগাযোগের সমাপ্তি। দীপ্ত আমার কথাতেই আর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তুমি বরং দীপ্তকেই ভেবো। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তোমাকে ভালো রাখবে ও, ওকে অন্তত বিশ্বাস কোরো। আমার বন্ধু হলেও আমার মতো নয় ও। অবশ্য আমিও দুর্বোধ্য নই। তবে সেটা আমার জন্য যে তৈরি শুধু তার কাছে। তুমি আমার জন্য নও, তাই তো আমাকে আবিষ্কারের ক্ষমতা তোমার নেই। আল্লাহ হাফেজ।’
চিরবিদায় দেবার পরও কয়েক সেকেন্ড নীরবে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটুকু শুনতে পেল নাওফিলের। তারপরই মেসেজটা শেষ। পরিতৃপ্তি অনুভব এবং মুক্তি মিলল আজ থেকে দীধিতির৷ জীবনের দ্বিতীয় বড়ো সঙ্কট থেকে উদ্ধার হলো সে। আনন্দে অক্ষিকোটর থেকে অশ্রুজলের দেখা মিলল কি? খুশিতেই কি রুদ্ধ হয়ে এল কণ্ঠ? তাহলে স্নায়ুতন্ত্রী দুর্বল হয়ে আসছে কেন? বক্ষ ছেদ করে গগনবিদারী চিৎকারই বা বেরিয়ে আসতে চায় কেন?

কাঠ হয়ে আসা গলাটা ডলতে থাকল দীধিতি। হঠাৎ করেই মাইগ্রেনের ব্যথাটার উৎপত্তি ঘটল এবার। হাতের ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে পানির বোতলটা খুঁজে তৃষ্ণাদগ্ধ গলাটা ভিজিয়ে নিলো। বোতলটা বুকের সাথে জাপটে ঠোঁট চেপে ধরে কান্নায় বাধ সেধে ভাবতে রইল, এতটা দুর্বলতা ওই ছেলেটির জন্য? এ কখন তৈরি হলো তার মাঝে? এই ভাবনার আর কোনো যুক্তিই নেই এখন আর। হাসফাস করতে থাকল সে বাতাসের জন্য। ফ্যানের বাতাস যেন গায়েই লাগছে না। জানালার কাছে এগিয়ে এসে পুরো থাইগ্লাসটাই সরিয়ে দিলো এই আশায়, একটু যদি দয়া করে প্রকৃতি! কিন্তু অকস্মাৎ অপার্থিব দেখা ঘটনায় নিঃশ্বাস আটকে রইল ওর, তবে কষ্ট হচ্ছে না।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯

মরুভূমির মতো খোলা ছাদের অন্তিম সিঁড়িটাও চোখে পড়ে। আঁধার জাল ভেদ করে সেই সিঁড়িটা পার করে এল কেউ। এক আজনবি গা ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াল কার্ণিশের ঠিক গা ঘেঁষে। নিয়ন আলোর প্রখরতা আরেকটু বেশি হলো না কেন? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না যে মানুষটিকে। তবে সে কোনো সুদীর্ঘ যুবক। অন্ধকারে বোঝার সাধ্য এটুকুই। তার নিষ্প্রভ চোখের দৃষ্টি কিছু একটা খোঁজার মতো আশপাশ ঘুরে এসে থামল এবার সোজাভাবে দীধিতির খোলা জানালাতে। আঁধার তলে এক সঙ্গে মিলল তখন দু’জোড়া শূন্য চাউনি। তা কি দু’জনের একজনও বুঝতে পারল?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here