আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
দীধিতিকে একটু আগে কেমন যেন একটা লাগছিল না? হাতের মধ্যে ওর দেওয়া চিরকুটটা রেখে আঙুল কচলাতে কচলাতে কেমন অপরাধী মুখ করে দৃষ্টি নত করে ছিল সে। আবার বন্ধু তিনজনের মুখেও তখন বোধ হয় চিন্তা চিন্তা ভাব ছিল। সেটা এখন খেয়াল হলো নাওফিলের।
আয়নাতে নিজেকে দেখতে ব্যস্ত থাকা দীধিতির দিকে সুচালো দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নাওফিলের ভাবনা চলছে , পারফিউমের কথাটা সরাসরি জিজ্ঞেস করা ঠিক দেখাবে কি না। এত জলদিই একে অপরের মাঝে বিশ্বাস, অবিশ্বাসের টানাপোড়েন হতে দেওয়াটা সুখকর হবে না নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের জন্য। তাছাড়াও এ প্রশ্নটায় দীধিতির দিকে সন্দেহের তির নিক্ষেপ করা বোঝাবে। এতে যেমন দীধিতি কষ্ট পাবে, তেমন ওকে অসম্মানও করা হবে৷
ব্যাপারটা নিয়ে না হয় নিজের মতো আগে ভালো করে আরেকটু ভেবে দেখুক সে। তবে এটা আশিভাগ নিশ্চিত, দীধিতি কিছু একটা অপরাধ করেছে। মুখের অভিব্যক্তি তো তা-ই বলছিল।
হাতের ঘড়িটা খুলে ক্যাবিনেটের ড্রয়ারে আর জামাকাপড় বের করে বিছানাতে রেখে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ল নাওফিল৷ আচমকা দরজা বন্ধের শব্দে দীধিতি একটুখানি চকিত হলো৷ খেয়াল করল বিছানাতে রাখা তার জামাকাপড়। ওর সঙ্গে আর কোনো কথা ছাড়াই বাথরুমে চলে গেল যে? একটু আগেও তো রসিকতা করছিল। হঠাৎ আবার ভার হয়ে গেল কেন? বুঝতেই পারে না দীধিতি এই ছেলেটাকে!
ঘর থেকে বেরিয়ে ঐশীকে ডেকে ডাইনিংয়ে চলে এলো সে। রান্নাবান্না করার মতো মানসিকতাই ছিল না। অথচ নাওফিল যে চেয়েছিল ওর হাতের রান্না খেতে! টেবিলে খাবারের ব্যাগগুলো দেখে আরও বেশি মন খারাপ হয়ে গেল দীধিতির। ঐশী বলল, ‘আমি তো রান্না করে নিয়ে এলাম। ভাইয়া খাবার আনতে গেল কেন?’
কথা না বলে খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে নিতে নিতে ও বলল, ‘কত কিছু আজ রান্না করতে চাইলাম। লেমনেড করেও রাখতে চেয়েছিলাম ওর জন্য। ভেবেছিলাম বাইরে থেকে ফেরার পরই দেব। দ্যাখ, তার কিছুই করতে পারলাম না। নাওফিল আশা করেছিল আমি কিছু রেঁধে রাখব আজ।’
-‘আজকে যা গেল! আবার তুই তো একটু অসুস্থও। ভাইয়া বুঝতে পারবে অবশ্যই সমস্যা। অত বেশি ভাবছিস কেন? তুই ওদের ডেকে আয় খেতে বসতে৷ আমি সালাদ কেটে নিয়ে আসি।’
তুষারদের আর ডাকতে হলো না৷ ওরা এসে টেবিলে বসে পড়ল নিজে থেকেই। পরিবেশন শেষ হতেই দীধিতি উপরে যেতে চাইল যখন, দেখল নাওফিল ঝটপট গোসল শেষ করেই ইতোমধ্যে সেও নিচে আসছে। ওকে সিঁড়িতে উঠতে দেখে নিচে নামতে নামতে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ফোন কই?’
-‘ফোন তো লিভিংরুমে। পড়ে গিয়ে ডিসপ্লে ফেটে গেছে।’
-‘কখন? আমি বাসায় আসার আগে কল করেছিলাম অনেকবার।’
-‘ভেঙেছে বেলা এগারোটায়৷ ফোনে কল এসেছিল। কিন্তু স্ক্রিনে তো কাজ হচ্ছিল না তাই রিসিভ করতে পারিনি।’
দুজন এক সঙ্গেই এলো ডাইনিংয়ে। ঐশী সালাদ রেডি করে টেবিলে রেখে বলল, ‘ভাইয়া, দীধিতিকে নিয়ে বসে পড়েন৷ আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি সবাইকে।’
-‘আরে না, তোমাকে খাবার বেড়ে দিতে হবে না। সবাই নিজের মতো করে নিয়ে খাবো। বসে পড়ো তো রুমানের পাশে।’ বলতে বলতে দীধিতিকেও ইশারা করল চেয়ারে বসতে।
নাওফিলের কথামতোই ঐশী বসে পড়লে সবাই এগিয়ে যুগিয়ে দিতে থাকল খাবার নিজেদের মধ্যে। দীধিতিকে পানসে মুখ করে প্লেটে ভাত নাড়াচাড়া করতে দেখে নাওফিল বলল, ‘তুমি ভাতের সঙ্গে লেবু নিয়ে খাও। স্বাদ লাগবে কিছুটা।’
তারপরই ভাবনাতীত সে রাতুল, সবুজ, তুষার, রুমান, ওদের চারজনকে উদ্দেশ্য করেই খেতে খেতে শুধাল, ‘তোদের বন্ধু কি এবারও লন্ডন থেকে ফ্লোরিস এনে দিয়েছিল?’
-‘কই না তো! বলল না যে আনতে ভুলে গেছে?’ অবিলম্বে সবুজ সরল চিত্তেই জবাব দিলো।
কিন্তু হঠাৎ করেই দীপ্ত প্রসঙ্গ কেন উঠাল নাওফিল? ওরা তো এখনও কেউ-ই কিছু জানায়নি৷ সবুজ বাদে বাকি তিন বন্ধুর মনেই খটকা লাগল এ ব্যাপারটা৷ তুষার দীধিতির মুখে তাকাল। দীধিতি তখন ভাতের মধ্যে লেবু চিপে নিতে মনোযোগী৷ ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে না ও বুঝতে পেরেছে, যে নাওফিল দীপ্তর ব্যাপারে প্রশ্ন করেছে৷ তার মানে নাওফিলের সঙ্গে দীধিতির কোনো কথা হয়নি এখনও দীপ্তকে নিয়ে।
নাওফিল আজ খুব দ্রুত খেয়ে উঠে পড়ল৷ তুষারদের খাওয়া শেষে লিভিংরুমে আসতে বলে ও ঘর থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে সেখানে এসে বসল সিঙ্গেল সোফাটাই। দীধিতির পাশে বসে তখনও স্পষ্ট ওর নাকে এসে লাগছিল পারফিউমের ঘ্রাণটা। স্মৃতিশক্তি অবিশ্বাস্য প্রখর বলেই ও শতভাগ নিশ্চিত হতে পেরেছে, ওটা দীপ্তরই ব্যবহারকৃত পারফিউমের ঘ্রাণ৷ অফিস যাওয়ার পর দীধিতি বাসা থেকে বের হয়নি এটা ও জানে৷ বের হলে গোপনে নিযুক্ত করা ওর গার্ড অবশ্যই জানাত। এখন কথা থাকে তাহলে কারও বাসায় প্রবেশের ব্যাপার৷ কিরণ, সৌরভ, এরাও তো ব্যবহার করতেই পারে। কোনোভাবে কি এরা কেউ এসেছিল বাসায়? সেটা জানতেই নাওফিল ল্যাপটপ থেকে অ্যাক্সেস করে ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে বসে গেল।
ওর অফিস যাবার পরের সময় থেকে ফুটেজ ফরওয়ার্ডে টেনে দেখতে দেখতেই সেই মুহূর্তটাই গিয়ে থামল৷ যেখানে দীধিতি ফোনে কাউকে কাউকে লাগাতার কল করতে করতে নিচে নেমে দরজার সামনে গিয়ে ডোর হোলে না দেখেই দরজাটা খুলে দিলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাজামা-পাঞ্জাবিতে দীপ্তকে নাওফিল চিনতে পারল না সহজে। ওদের কথোপকথন চলাকালীন সময়টুকু জুম করে নিলো দ্রুত৷ তারপর একে একে সমস্ত চিত্রটা দেখতে থাকল গভীর মনোনিবেশে।
তুষাররা খাওয়া শেষ করে এসে বসল কিছুক্ষণ পরই। কপালে ভাঁজ ফেলে নাওফিলকে অত মনোযোগ দিয়ে পলকহীন ল্যাপটপে চেয়ে থাকতে দেখে তুষার জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘অফিস থেকে এসে এখন আবার ল্যাপটপে কী করতে বসলি?’
কথা বোধ হয় কানেই যায়নি নাওফিলের। সে ভ্রুক্ষেপহীন তুষারের কথায়৷ রুমান একটু ধমকে বলল তখন, ‘এই ব্যাটা, ওইটা রাখ! কথা আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
ওরা সবাই ভেবে রেখেছে দীপ্তর ব্যাপারটা ধীরেসুস্থে ঠান্ডা মাথায় নাওফিলকে জানাবে৷ তাই তো ও আসামাত্রই তড়িঘড়ি করে কেউ কিছু বলেনি। দীধিতিকে আপাতত এ কথাগুলো বলার সময় নাওফিলের সামনে থাকতে বারণ করা হয়েছে বলে সে খাওয়া শেষ করে ঐশীর সঙ্গে নিচেই বসে আছে।
বিশ মিনিট সময় অতিক্রম হওয়ার পথে। কোনো কথা বলেই নাওফিলের সাড়া না পেয়ে পাশের সোফায় বসা সবুজ শেষে উঁকি দিয়ে যখন দেখল ল্যাপটপে মূলত কী দেখছে নাওফিল, ত্বরিতেই সে বিস্ফারিত নেত্রে বাকি তিনজনকে যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল তার অর্থ ‘সর্বনাশ’। সবুজের চাহনিতেই তা বুঝতে পেরে ওরা তড়াক করে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে ছুটে এলো নাওফিলের কাছে। ওর পাশে আর পেছনে দাঁড়িয়ে সবাই দীপ্ত দীধিতিকে পেছন থেকে জাপটে ধরে রাখার সময়টুকু দেখতে থাকল। নাওফিলকে নিয়ে বলা দীপ্তর কথাগুলো কান খাড়া করে শুনল প্রত্যেকে। আর তা শুনেই তুষার জিভে কামড় দিয়ে মাথায় হাত দিলো, সবুজ ওর চোখের চাহনির সেই অর্থটা এবার মুখেই উচ্চারণ করল, ‘সর্বনাশ!’ পুলিশ মানুষ রুমানের মুখ থেকে তো খাস বাংলা গালিই বেরিয়ে এলো, ‘তোর বাপ বে* ঠা**, শু*য়োরের বাচ্চা!’
অত নিবিড়ভাবে দীধিতিকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ের মাঝে দীপ্তর মুখ গোঁজা দেখেই নাওফিলের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া অস্বাভাবিক বেড়ে গেল। নিমিষেই চোখ বুজে নিলো সে ওই ক্ষণটুকুতে। অমন অসহনীয় চিত্র দেখার মনোবল নেই ওর। কিন্তু রহস্যময়, লোমহর্ষক কিছু সিনেমার সমাপ্তিতে যেমন চমক পায় দর্শক। তেমনই ওরাও করিডরের ওই ফুটেজের শেষ দিকে এসে অবিশ্বাস্য চমক পেল। দীপ্তর মুখে যখন দীধিতি মাথা দিয়ে তীব্র জোরে গুঁতা দিলো, তারপর পায়ের পাতাতে আর হাঁটুতে লাথি মেরে পুরোপুরি কুপোকাত করে ফেলল দীপ্তকে, রাতুল যেন তখন ক্রিকেট ম্যাচে ছক্কা হাঁকানো দেখল। ‘ওওও…. মার্ভেলাস শট, ভাবিজান! ফাটাফাটি!’ বলে চেঁচিয়ে উল্লাস করে উঠল সে।
হতবাক বাকি চার পুরুষ কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না। দীধিতি দীপ্তকে অজ্ঞান করে তখন দীপ্তর ফোন থেকেই রুমানকে কল করেছিল, নিজের ফোনটা ধস্তাধস্তির সময় হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাওয়াই। ওই অবধি আসতেই রুমান কথা বলল, ‘আমি বাসায় ছিলাম না তখন। থানা থেকে ছুটে আসি আর ঐশীকে বলি দড়ি নিয়ে দ্রুত তোর বাসায় আসতে। দীধিতি দীপ্তকে ওভাবে ফেলেই ঘরের দরজা আটকে বসেছিল৷ কলিংবেলের শব্দ শুনে আঙুলের মধ্যে নাকল স্ট্রাইকারস পরে আর পকেট নাইভস লুকিয়ে তোর বউ দরজা খোলে এসে। ব্রাভো গার্ল! ও ভেবেছিল দীপ্ত মোটেও একা আসেনি ওকে কিডন্যাপ করতে। তাই আরও মারামারি করার প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছিল, দীধিতি। গেটের সিকিউরিটি রহিম চাচাকেও ফোন করে তার ছেলেকে পাঠাতে বলি তোর বাসায়৷ আমি আসার পথে তুষার, ওদেরকে কল করতে করতে বাসায় পৌঁছই। ততক্ষণে অজ্ঞান দীপ্তকে হাত পা বেঁধে ফেলেছে ওরা তিনজন। তুষার, রাতুল আর সবুজ আসার পর ভাবনাচিন্তা করে ঠিক করি ওকে আপাতত আবারও গুম করে রাখব।’
-‘কোথায় রেখেছিস ওকে?’ নাওফিল জানতে চাইল।
-‘আছে, আমাদের হেফাজতেই আছে৷ তুই মাথা গরম করে কিচ্ছু করবি না ওর সঙ্গে৷ নিহাদ ভাইকে কল করেছিলাম আমি, ধরেনি। তাই সবটা মেসেজে জানিয়ে রেখেছি৷ ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে ওর যা ব্যবস্থা করার তা আমি করব। তুই আমাকে ভরসা না করলেও নিহাদ ভাইকে তো করিস? তাই নিশ্চিন্তে থাক৷ ও উপযুক্ত পানিসমেন্ট পাবেই।’
ইয়াসিফের কথা শুনে নাওফিলের কুঞ্চিত কপাল মসৃণ হলো। হঠাৎ ফোনে কারও নাম্বার ডায়াল করল ও। ওপাশ থেকে কল তুলতেই বলল, ‘চাচা, আমার বাসায় আসেন তো এখনই।’ এটুকু বলেই ব্যক্তিটির জবাব শুনে ফোন রাখল।
-‘কাকে আসতে বললি? রহিম চাচাকে?’ রুমান জিজ্ঞেস করল।
নাওফিল কোনো জবাব দিলো না৷ ল্যাপটপটা বন্ধ করে, ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখদুটো বুজে সোফায় ঘাড় এলিয়ে দিলো৷ তুষার ওকে লক্ষ করছিল ভালো করে৷ জিজ্ঞেস করল হঠাৎ, ‘দীধিতি বলল তুই ওকে সাবধান করে গিয়েছিলি সকালেই৷ তুই কি আগে থেকেই জানতি দীপ্ত কোনো খারাপ প্ল্যান করছে?’
একটু সময় চুপ থেকে নাওফিল জবাব দিলো, ‘আমার, আমার বাপ-চাচা, দাদার কি কম শত্রু আছে? সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাদা অবসর নিলে তার বদলে তার বড়ো ছেলে মনোনয়ন পত্র কিনবে। আবার আমাকেও এবার নির্বাচনে দাঁড় করানোর ইচ্ছা দাদার৷ খবরটা স্বদলীয় প্রতিদ্বন্দীনের মাঝে আমাদের ঘনিষ্ঠ কেউ একজন চাউর করে দিয়েছে৷ ব্যক্তিটাকে চেনা মুশকিল৷ তারা তো খুব বুদ্ধিমান। তাই ধারণা করছে ভোট দিয়ে না, টাকা দিয়ে আসন নেব আমরা৷ তাদের এই নিয়ে আলোচনাটা আবার আমাদের কানে এসেছে তাদের লোকের মাধ্যমেই৷ আগামী নির্বাচনে আমি বা আব্বু কেউ যেন নমিনেশন না পাই, নির্বাচন না করতে পারি। আগে সেটার চেষ্টা করবে তারা। আর চেষ্টা করা মানে বুঝতে পারছিস তো কী কী ভাবে করতে পারে? গার্ড ছাড়া চলাচল করতাম বলে আক্রমণের শিকার তো কমবার হইনি। ব্যবসায়িক শত্রুতা বলি, রাজনৈতিক শত্রুতা বলি আর ব্যক্তিগত শত্রুতা বলি৷ আমাকে আর আমার পুরো ফ্যামিলিকে সব সময়ই সাবধানতা অবলম্বন করে চলতে হচ্ছে। আমার আর স্মরণের বিয়ের খবর জানার পর দীপ্ত অপেক্ষায় ছিল আমাদের ঢাকায় আসার। আর আসার খবরটা জানা মাত্রই ও যে বসে থাকবে না, এটা তো মাত্র আন্দাজ করে রেখেছিলাম। কিন্তু কী করবে, কখন করবে, সেটা তো গণকের মতো জেনে বসে থাকিনি আমি৷ তবুও সর্বদিক আগাম চিন্তা করেই ওকে সাবধান থাকতে বলে গেছি। যদি দীপ্ত বুদ্ধিমানের মতো লোকজন নিয়ে ঢুকে পড়ত ভেতরে? ও পারত নিজেকে সেফ করতে?’
ওভাবে চোখ বুজে, মাথা এলিয়ে থেকেই ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীরব বনে গেল নাওফিল৷ দীধিতি ভুল করে হোক আর বেখেয়ালেই হোক, অনেক বড়ো বিপদের মুখোমুখি হয়েছে সে। বিপদটা থেকে মুক্ত না হতে পারলে ওর সাথে কী ঘটত, নাওফিলের মনে শুধু সে ভাবনাটাই তোলপাড় করে চলেছে৷ আল্লাহ পাকের কাছে শুকরিয়া আদায় করলেও মনটাকে শান্ত করতে পারছে না একদমই।
তুষার হয়ত ওর মনের অবস্থাটা ধরতে পারল। তাই একটা সময় সে দুটো পরামর্শমূলক কথা বলল ওর উদ্দেশ্যে, ‘যদি কথাটাকে টানলে অনেক কিছুই ভাবা যায়, নাওফিল। তুই তো দীধিতিকে সুস্থ, স্বাভাবিকভাবেই পেয়েছিস এসে। চিন্তা করলে এই কথাটা চিন্তা কর শুধু। বিয়েটা তোদের না হতে হতে শেষ পর্যন্ত হয়েছে। আজকে যদি বিয়েটা তোর সঙ্গে না হয়ে মিহাদ ভাইয়ের সাথেই হত? তোদের বিয়ের পর কি এই যদিটা নিয়ে একবারও ভেবে মন খারাপ বা দুশ্চিন্তা করে থেকেছিস? থাকিসনি তো। তাহলে আজকের বিপদটা কেটে যাওয়ার পরও যদি নিয়ে ভাববি কেন?’
রুমান, সবুজ আর রাতুলও তুষারের কথায় সায় জানিয়ে নাওফিলকে বোঝাতে থাকল৷ কিন্তু বিপরীতে নাওফিল সেই মৌন হয়েই বসে থাকল।
ওদিকে সিকিউরিটি রহিম চাচা এসে দরজার মুখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। নাওফিলদের কথা চলছে বলে আওয়াজ করার সাহস পায়নি সে। কারণ, নাওফিল যে কেন ডেকেছে তাকে তা বুঝতে পেরে ইতোমধ্যে খুব টেনশনে আছে সে। ওদের কথা থামতেই সে নাওফিলকে ডেকে জানান দিলো নিজের উপস্থিতি। চোখজোড়া মেলেই নাওফিল তাকে ঘরের ভেতরেও আসতে বলল না, কোনো কৈফিয়ত না চেয়ে সরাসরি জানিয়ে দিলো, ‘চাচা, আপনি আর আপনার ছেলে পরশুদিন থেকে আর আসবেন না৷ আমার প্রয়োজন আরও দায়িত্বশীল, সতর্কবান, বুদ্ধিমান আর কঠোর ধারার দুজন গার্ড৷ চিন্তা নেই, আপনাদের দুজনের চাকরির ব্যবস্থা আমি অন্য জায়গায় করে দেব।’
পঞ্চাশ বছর বয়সী রহিম চাচার ম্লান হয়ে যাওয়া মুখখানি দেখে রুমানের মায়া লাগল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘দীপ্ত যখন গেটে প্রবেশ করল তখন আপনারা দুজন কোথায় ছিলেন, চাচা? আমাদের এখানে অতিথি বা অপরিচিত মানুষের ঢুকতে দেওয়ার আগে যে রুলস ছিল, তা কি মানেননি?’
-‘বাবা, আমাগের ধুঁকা দিছিল সে। গেটের বাইরে একটা মাইয়্যার কান্নাকাটি শুইনা আমি গেট খুইলা বাইরে আইসা দেহি মাটিতি পইড়া ছটফটাচ্ছে ওই মাইয়া। কী হইছে শুনলি চিক্কার দিয়া কানতি কানতি কয় হেতি নিঃশ্বাস নিবার পারতিছে না৷ ইনহেলারের কথা কইতে থাকে বারেবারে৷ আমার পাও দুইখান ধইরা কয় দুকান থিকা আইনা দিতি। ওই সুমায় রতন ছিল না গেটে। অর এক বন্ধু ফোন দিছিল কী কামে জানি। কইল সামনেই খাড়াই আছে সে৷ তাই দশ মিনিটির জন্যি যায়। আমি ওই মাইয়্যার অমন অবস্থা দেহে ভয় পায়ি গিছিলাম মেলা। যদি মইরা যাই তাই ভাইবা রতনরে ফোন দিয়া কই চলে আসতি। ও কইল পথেই ও। দুই তিন মিনিটির ভিতর আসতেছে৷ তাই শুইনা আমি মাইয়্যাটানে ওইহানে রাইখাই সামনের ফার্মাসিতি যাই ইনহেলার আনতি। আইনা দেহি রতন গেটে খাঁড়ায় আছে। কিন্তু ওই মাইয়া নাই। ওর কাছে শুনলাম মাইয়্যাডার কথা। ও কইল ও আসার পর দেহেনাই কাউরেই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৫
-‘এই ঘটনাটা কি আপনার কাছে আশ্চর্যজনক লাগেনি, চাচা? আপনার জানানো উচিত ছিল না কথাটা আমাকে বা নাওফিলকে?’
রুমানের প্রশ্নের উত্তর দিতে রহিম চাচা মুখ খোলার পূর্বেই নাওফিল বাধা দিলো, ‘আমি কোনো এক্সপ্ল্যানেশন জানতে চাচ্ছি না। চাচা, আপনি দাঁড়ান৷ আমি এই মাসের পুরো বেতনটাই দিয়ে দিচ্ছি আপনাদের দুজনের৷ আর এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য কোথাও চাকরির ব্যবস্থা করে দেব ইন শা আল্লাহ।’
বেলকনি থেকে শোবার ঘরে চলে এলো নাওফিল কথাগুলো বলে। দীধিতিও তখন মাত্রই ঘরে ঢুকেছে। নাওফিলের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ও এগিয়ে গেল তার দিকে। কাছে এসে দাঁড়াতে নাওফিল শীতল কণ্ঠে বলে বসল, ‘ডোন্ট কাম টু মি। অ্যান্ড ডোন্ট টাচ।’
