আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৮ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘আমি হইলাম বাইদানি(বেদেনি) জাতির মাইয়া। আমার মায় আমগো বাইদ্যা গুষ্টির ভিত্রে হগ্গলের চাইতি ভালা সুরতের আছিল। আমার গুষ্টি খুলনা নদীর পাড়ে থাকত তহন। সাপের খেলা, বানরের খেলা, সাপ ধরা, সাপ বিক্রি, এইগুলানই করত অরা। মায় দেখতি মেলা সোন্দর আছিল কইয়া এক পান ব্যপসায়ী মায়রে পসন্দ করে৷ মায়’র লগে হের মিলামিশা শুরু হয়। আমি মায়’র পেডে চইলা আহি এরফর। হেই কতা আমার বাপেরে কইলে আমার বাপে আর মায়’র লগে দেহা করে না, কতাও কয় না৷ মায় বাপের খোঁজ নিয়া দেহে, হের ঘরে বউ বাচ্চা সবই আছে। বাপের হেই বউ’র পাও ধইরা মা সব কইয়া দেয়, আমার পেডে আসার কতাও কয়। কিন্তু অই সিনা* বেডি অর ভাতারের বিচার না কইরা আমার মায়রে মাইরা বাইর কইরা দেয়৷ তাও মায় বহুবার গিছিল বাপের কাছে। বাপে জাউরাও আমার মায়রে মাইরা খেদায় দেয়। তারফর আর যায় নাই মায়৷ আমি জন্মানোর পরই মায় মইরা যায় মেলা রক্ত যাওয়ার লিগা। তারফর আমারে নানিই পালে।
আমার আট বসরে নানিও মইরা যায়৷ নানার লগে তহন আমি সাপ খেলা, বানর খেলা দেহাই বাজারে বাজারে৷ চাইর বসর এইরামেই যায়। এরফরই আমার জেবনের দুক্ক শুরু অয়, স্যার। রাতির বেলা নানা পিরায় পিরায়ই (প্রায় প্রায়ই) কামে যাইত৷ হেইদিন আর ফিরত না। আমার ছাউনিতি তহন আমি একলাই থাকতাম। একদিন আমার মামায় আইসা কয়, হেয় আমার লগে থাকব৷ আমি একলা থাকতি ভয় পাতি পারি। এই কতা কইয়া থায়ে আমার লগে। মেলা রাত্তিরি হুঁশ পাই, মামায় আমার গা’র কাফর সব খুইলা নিছে। আমি কতা কইলিই আমার মুখ চাইপ্পা ধইরা আমারে ম্যালা দুক্ক দেয় ওই রাতি। কারুরে যদি কইয়া দেই, তাইলি আমারেসহই নানারেও মাইরা দিব। এই কতা কইয়া ডর দেহাইয়া আমারে এরফরতে একলা পাইলেই মামায় আইসা দুক্ক দিত। হের এই কাজ একদিন হের বড়ো পোলায় দেইহা ফেলায়। অই কী কইরল জানেন, স্যার? অর মায়রে না কইয়া অয়ও শুরু করল আমারে দুক্ক দিয়া। হেতেও ডর দেহাইল, তার কতা কারুরে কইলে হগ্গলরে জানাইব আমি মামার লগে আকাম করি। মামারেও জানাইবার না কইরল৷ তয় মামায় নিজিই একদিন দেইহা ফেলে তার পোলায়ও আমার কাছে আহে। তাইতি কী যেনি ভাইবা হেয় আর আইতো না।
দুইডা বছর চলবার থাকল এমনেই। আমি বহুবার কইবার চাইছি নানারে, মামিরে। কিন্তু অগো লিগাই পারি নাই৷ অরা বুইঝা যাইত। আড়ালি নিয়া আমারে মাইরতো৷ দুই বছর ফর মামায় আবার আমার কাছা আওন ধরে৷ তহন আমার লগে আমার মামার পোলার লাইন হইয়ি গ্যাছে। আমি আর দুক্ক পাইতাম না অই কাছে আইলি৷ ভালা লাগত৷ কিন্তু মামায় আইসা জোরজারি কইরলি আমি অরে বিচার দিলি কইত মাইনা নিতি। আমি অরে ভালাপাইছিলাম। তাই ম্যালা দুক্ক পাইছিলাম অর কতায়৷ তারফর তো আমার পেডে বাচ্চা আইলো। কিন্তু অয় বাচ্চা মামার না মামার পোলার, তা জাইন্না। নানায় আমারে যহন জিগাইল, তহন সাহস নিয়া কইয়া দেই সব। নানায় সর্দার আছিল। সব শুইনা মামা হের পোলা হইলেও হেয় দাও নিয়া কুবাইতি যায় মামারে। নানার পর মামারই সর্দার হওয়ার কতা৷ তাই মামা নানার লগে মারামারি কইরা নানারে কুবায় মাইরা ফেলায়। আমারেও মারতি চাইছিল৷ আমি হেইদিন জান নিয়া পলাইছিলাম। কিন্তু আল্লাহই আমার পেডের বাচ্চাডা রাহেনাই৷ হুঁশ হারাইয়া রাস্তার মদ্দি পইড়া গিছিলাম। হুঁশ আইলে দেহি হাসপাতালে৷ যেই নার্স আফা আমারে চিকিৎসা দিছিল, হেতি আমার সগল দুক্কুর কতা হুইনা আমারে মায়া করে। হের এক আত্মীয়র বাড়ি ঢাহা আছিল৷ তাগো একখান কম বয়সী কাজের মাইয়া দরকার৷ আমারে সেহানে পাডায় দেয় ওই আফা৷ আমি নিশ্চিন্তেই কয় মাস কাজ করিছিলাম ওই বাইত৷ মেলা কাম করাইত৷ বাজার করারতে শুরু কইরা রান্নাবান্না, সবই করাইত৷ তাও আসরই(আশ্রয়) পাইছি একখান, তাই ভাইবা সব মুক বুইজা করতাম।
কিন্তু আমার কফালে যে আরও দুর্গতি লেহা আছিল৷ তাইতি অইহানের বখাইট্টা পোলাগো নজরে পইড়া যাই৷ বাসার মালকিনরে কইলেও হেতি গুরুত্ব দিত না। আরও আমারেই দুষ দিয়া চর থাবড়াও দিত গালে৷ এইরাম কইরা মাস দুই গিলি বখাইট্টা চাইরজন আমারে একদিন গলির মোড়ে ঘিরা ধইরা আমার গায় গতরে ম্যালা খারাফ কইরা ছুঁয়াছুঁয়ি করে, আমারে কয় অগো সাতে গিলি আমারে টাহা দিবো ম্যালা। আমি চিল্লাইয়া ফাল্লাইয়া অহানের মানুষ জড়ো কইরা ফেলি হেইদিন৷ অই এলাকার মানুষগুলান ম্যালা ভালা আছিল, স্যার। অরা অই চাইরজনরে মাইর ধইর কইরা এলাকারতেই বাইর কইরা দেয়। অরা আরাক এলাকার আছিল। এরফর কয়দিন আর সমেস্যা হইছিল না৷ রুজার মাসে মালকিন একদিন বাজারেরতে জিলাফি কিইনা আনবার কইল আমারে৷ আমি জিলাফি কিনা বাড়ি আহনোর পতে মাগরিবির আজান দিয়া দেয়। গলির ভিত্রে যেই ঢুকলাম, সামনে আইসা তহন একখান মডরসাইকেল খাঁড়াইল। আমি অগো দিক তাহানোর(তাকানোর) পরপরই অরা আমার মুকের মইদ্দে এসিড চাইলা মারে। মাইরাই অরা জলদি অইহান্তে চইলা যায়। আমি তহন জানতাম না ওই পানিরে এসিড কয়৷ আমার মাতায় তহন ভালা কইরা উড়না দিয়া আছিল কইয়া মুকের এই একপাশে আইসা লাগে অই এসিড৷ আমি সইতি পারি নাই মুকের ওই দুক্ক৷ জবাই করা মুরগির মতো ছডফডাইতে থাহি রাস্তায় পইড়া। আমারে এলাকার মানুষজন হাসপাতালে নিয়া যায়৷ চিকিৎসা আমার মালিকগো বাইত্তে করাইলেও বেশিদিন করায় না হেরা।
আমারে আর কাজেও নেয় নাই৷ কয়রা টাহাপয়সা হাতে দিয়া চইলা যায় আমারে হাসপাতারে রাইখাই৷ আমি ইটু সুস্ত হইলি হাসপাতালেও আর রাহেনাই৷ পতে পতে দুইদিন কাটাইতি পারলিও তারফরের দিন রাতির কালে বিরিজিরতে(ব্রিজের) এক সাহেব ব্যাডা আমার কাছে আহে বহে৷ তারফর হুনে আমি এই জাগায় ক্যা থাহি? আমার মুকে এসিড মারল কেডায়? আমি তারে ভালা মানুষ ভাইবা কই সব কতা। হেয় আমারে থাওনের জাগা আর কাজ দিবার চাইল৷ আমি হেরে বিশ্বাস কইরা হের লগে যাই৷ গাড়ির ভিত্রে বইয়া হেয় আমারে কয় আমারে যেহানে কাজ দিবো, অইহানে পেথমে আমার মুক দেহানো যাইব না। আমিও হের কতা মানলাম। হেয় আমারে নিয়া আইলো নডি পাড়ায়৷ তহন জানতাম না অই জাগারে নডি পাড়া কয়। অইহানের সর্দারনীর কাছে আমারে নিয়া দেহাইল অই ব্যাডা। মুকের এই পুড়া জাগাটুক ঢাইকা রাকলি কেউ ট্যারও পায় না আমার মুকে এসিড মারা। আর্দেক(অর্ধেক) মুক দেইহাই কাস্টোমার হাতাইতি পারুম আমি। এইসব কতাবাত্তাই(কথাবার্তা) হইতেছিল তাগো মইদ্দে। অই ব্যাডায় আমারে সর্দারনীর কাছে বেইচা দিয়া যায়৷ তারফর সর্দারনী আমারে কাছে বহাইয়া সব বুঝায় কয়। ক্যামনে কাস্টুমার ধরা লাগব, ক্যামনে টাহা বেশি পামু। আমার তহন মাইনা না নিয়া ছাড়া তো কুনো উপায়ও আছিল না। অইদিনের পর থেইকাই আমি আমার নতুন কাজে লাইগা যাই। আইজকা যার লগে আইছিলাম, হেরে সর্দারনী ম্যালা ডরায়। অই খাচ্চর ব্যাডা আমার মুকের এই একপাশ দেইহা পাগল হইয়া আমারে সর্দারনীর কাছ থেইকা নিয়া আহে কিছু টাহাপয়সা দিয়া। বাকি টাহা আমারে নিয়া সুক করার পর দিবার চাইছিল।’
-‘তাহলে তুই এখন কী করবি? টাকা জোগাড় হলে তোর সর্দারনীর কাছে ফেরত যাবি, তাই তো?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ফোনের স্ক্রিন অন করে সময়টা দেখে নিলো ইয়াসিফ কথার ফাঁকে।
-‘এই কাম ছাড়া আর কী করুম, স্যার? আর থাকুমই বা কই? শহরের রাস্তাঘাটে কামের লিগা বাইর হইলেও তো অহন মাইয়াগো নিরাপত্তা নাই। কী জানি কয় ওই যে ইংর্যাজিতি? র্যাপ! র্যাপ কইরা মাইরা ফেলায় যায় রাস্তায়। জেবন তো সেই একই দিকেই যাইব।’
-‘হুঁ, কথা ঠিকই বলেছিস। তো তোকে যদি ভালো কাজ দিই থাকার জায়গাসহ৷ করবি সেই কাজ?’
-‘ও আল্লাহ! করুম না ক্যা, স্যার? আফনে যদি কন দুইনিক আফনের পার জুতা চাইট্টা সাফ কইরা দিতি হইব। বদলে আফনে বেতন দিবেন৷ আমি তাইতেই রাজি।’ দু’পাটি দাঁত দেখানো একদম প্রফুল্ল হাসি মেরিনার মুখে।
ইয়াসিফ ওর কথা শুনে জহুরি চোখে ওর হাসিটা দেখে নিয়ে আদেশ করল, ‘আমার পাশে এসে বসে পড়।’
মেরিনা উঠে দাঁড়িয়েই খালি পায়ে এক দৌঁড়ে গাড়ির অপরপাশে এসে দাঁড়াল৷ দরজাটা খুলে দিতেই সে তড়িঘড়ি করে ভেতরে বসে পড়ে বলল, ‘আফনে আমারে মায়া কইরা যেই কামই দিবেন, স্যার। আমি টু শব্দ ছাড়াই হেই কাম করুম।’
-‘আপাতত তোর কাজ আমার কাছেই৷ ভালো রান্নাবান্না তো জানিস, না কি? রান্না যেমন তেমন হলে আমার কাছে কাজ নেই তোর। অন্য জায়গায় কাজের বুয়া হিসেবে সেট করে দেব।’
-‘তাইলি আমার রান্না আইজই খাইয়া দেহেন, স্যার৷’
-‘না, আজকে কিচ্ছু করতে হবে না৷ কাল সকালের নাশতা বানাবি।’
-‘কী নাশতা বানামু, স্যার? কন!’
-‘ধীরে… এত তাড়া কীসের? কাল সকালেই জেনে নিবি।’
লম্বা বেলকনিটার অর্ধেকের বেশি অংশই কেমন ফাঁকা পড়ে আছে৷ তাই সেখানে আজ সকাল থেকেই দীধিতি
টবে রোপণ করা গুটি কয়েক ফুলের চারা গাছ সাজিয়ে রাখতে শুরু করেছে।
এইতো ঘণ্টাখানিক আগে নাওফিলকে দিয়ে আজ ব্যাপক পরিশ্রম করিয়েছে সে। টবগুলো লিফটম্যানকে দিয়েই রুফটপ থেকে নামিয়ে আনতে পারত সে৷ কিন্তু নাওফিলের গতকালের দুর্ব্যবহারের জন্য শাস্তিস্বরূপ তাকে পনেরোটার মতো চারা লাগানো বড়ো বড়ো টব বহন করিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের বেলকনি অবধি আনিয়েছে। এখন সে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় ঘুমে বিভোর।
রুফটপে যে দুটো ঘর তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে বড়ো ঘরটা জিমনেসিয়াম। বারবার করে টবগুলো আনা নেওয়া করতে গিয়ে ভোরবেলা যে পরিশ্রম গিয়েছে নাওফিলের, তাতে আজ আর শারীরিক ব্যায়ামের প্রয়োজন পড়েনি তার। আর জিমনেসিয়ামের পাশে যে ছোট্ট আরেকটি ঘর, সেখানে দুজন মানুষের থাকার মতো কেবল শখ করেই তৈরি করা অনেকটা চিলেকোঠা। যেমন গতকাল রাতে নাওফিল দীধিতির মান ভাঙাতে ভাঙাতে গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল, তখন ও ঘরটিতেই ঘুমিয়েছিল ওরা।
বউয়ের শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে নাওফিল এখন প্রচুর হয়রান। দীধিতি নাশতা বানিয়ে কমপক্ষে আটবার ডেকে গেছে তাকে। কিন্তু তার কোনো হুঁশই নেই৷ অথচ ঘুম ভেঙে গেছে তার প্রথম ডাকেই।
একটু আগে বাসায় ঐশী এসেছিল। খিচুড়ি রেঁধে ওদের দুজনের জন্য দিয়ে গেছে সে৷ খাবার টেবিলে নতুন করে সেটা পরিবেশন করে দীধিতি নাওফিলকে শেষবারের মতো ডাকতে এলো আবার। নাওফিলের চোখের ওপর বেলকনি থেকে আসা রোদের তির্যক রেখা এসে পড়েছে। বিরক্তি নিয়ে চোখজোড়া মাত্রই খুলেছিল সে৷ যখনই দীধিতিকে ঘরে ঢুকতে দেখল, অমনি চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল আবার। মায়ের ধমক খেয়ে বাচ্চারা জোর করে চোখ বুজে থাকলে চোখের পাতা যেমন ঘনঘন কাঁপে— রৌদ্ররশ্মি চোখের ওপর নিয়ে ঘুমানোর অভিনয় করতে গিয়ে নাওফিলও ঠিক তেমনই করছে। তা দেখে দীধিতি ওর মুখের ওপর একটু ঝুঁকে পড়ে হুমকি দিলো, ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে না আসো তাহলে সব খাবার আমি গেটের সিকিউরিটি আর লিফটম্যানকেও দিয়ে আসব।’
কপাল করে আজ বউয়ের হাতের রান্না খেতে পারবে নাওফিল। নাটক ফাটক করতে গিয়ে যদি সেই খাবার হাতছাড়া হয়ে যায়? ভেবেই সে গা থেকে চাদরটা ফেলে দিয়ে বিছানা থেকে নেমেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর আর দাঁড়ালও না এক সেকেন্ড৷ যেন চোখের পলকে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। দীধিতি তখনও বিছানার কাছেই দাঁড়িয়ে। নাওফিলের বাচ্চামো কাজকারবার দেখল সে অদ্ভুত চোখ করে৷ তারপর আর দাঁড়াল না৷ নিচে নেমে টেবিলে এসে বসে পড়ল। রাতের পোশাক বদলে তার মিনিট সাতেক পরই নাওফিল চলে এলো খেতে। তবে দেখার মতো একটা বিশেষ বিষয় ছিল তখন৷ সিঁড়ি বেয়ে নাওফিল গা ছেড়ে এমন নিস্তেজ ভঙ্গিমায় হেঁটে আসলো, যেন যুদ্ধ থেকে আহত সৈনিক হয়ে ফিরছে সে। এর পরের মুহূর্তটাও দীধিতি বক্র চোখ করে না দেখে পারল না। ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের মতো মাথা নুইয়ে, শরীর ভেঙে বসল নাওফিল চেয়ারে৷ পনেরোটা টব লিফটে চড়ে হাতে করে আনতে গিয়ে এরকম বিশালদেহী যুবক ছেলের এমন ভাঙাচোরা অবস্থ হয় না কি?
তা ভেবে দীধিতি চেহারায় বিরক্তির অভিব্যক্তি ধরে রেখে নাওফিলের প্লেটে খাবার বাড়তে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবে? ঐশী মুরগির মাংসের ভুনাখিচুড়ি রেঁধে দিয়ে গেছে।’
নাওফিল মুখ তুলে খাবার টেবিলে চোখ বুলাল। দীধিতি খুব ভারী খাবার রাঁধেনি। আটার রুটি, ডিমের অমলেট আর সবজি ভাজি। পাশাপাশি আবার ওটস, ফলমূলের সালাদ আর দই রাখা দেখে নাওফিলের ভালো লাগল সবটা। তার রোজকার সকালের নাশতার মেনু কী কী থাকে, তা কখন যেন দীধিতি বাসায় কল করে জেনে নিয়েছে কারও থেকে। এজন্যই তার ভালো লাগাটা বেশি অনুভব হচ্ছে। কিন্তু কার সাথে কথা হয়েছে দীধিতির? দাদী না কি আম্মু?
এখন কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। এখন নিজেকে খুব দুর্বল মানুষের মতো দেখাতে হবে বউয়ের কাছে। নয়ত তাকে খাটানোর শোধ অসুল করা যাবে না, বউয়ের সেবাও পাওয়া হবে না৷ ভ্রু নাচিয়ে ইশারাতে তাই রুটি, ভাজি দেখাল৷ দীধিতির কাছে নাওফিলের এমন অসুস্থ মানুষের মতো ভাব ধরে থাকা খুব বাড়াবাড়ি ন্যাকামো লাগছে। ও মোটেও বিশ্বাস করতে পারছে না নাওফিল এত বেশি ঝিমিয়ে পড়তে পারে ভোরবেলায় মাত্র ওটুকু পরিশ্রম করেই। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে সে প্লেটে রুটি, ভাজি, ডিম তুলে দিয়ে নিজের খাবার খেতে শুরু করল। পানি পান করার ফাঁকে দেখল নাওফিলের আরেক ন্যাকামো কাণ্ড। রুটি এমন ধীরে ছিঁড়ে টুকরো করছে, যেন জোরে টেনে ছিঁড়লে রুটি ব্যথা পাবে৷ বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে দীধিতি হাতের গ্লাসটা ঠাস করে টেবিলে রেখে কটমট করে বলে উঠল, ‘নব্বই বছরের থুরথুরে বুড়ো তুমি? তোমার দাদাও তো এত দুর্বল হয়ে পড়েননি এখনও।’
নাওফিল খুব দুঃখ পেল যেন দীধিতির ব্যবহারে। তেমন অভিব্যক্তিতেই সে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার দু’হাত পুরো অবশ হওয়ার মতো হয়ে আছে। আমি কি ইচ্ছে করে করছি? হাত তো উঁচুই করতে পারছি না সহজে।’
-‘সিরিয়াসলি?’ চোখে বিস্ময় আর সন্দেহ দুটোই দীধিতির।
-‘আমি মিথ্যা বলার মতো মানুষ?’
বেজায় দুঃখ নিয়ে বেচারা সে আবারও প্রচণ্ড ধীর গতিতে রুটি ছিঁড়ে টুকরো করে নিতে থাকল। এক টুকরো মুখে পুরতে গিয়ে তার হাতটা বোধ হয় মৃদু কাঁপতেও থাকল। এটা দেখার পর মনে সন্দেহ থাকলেও দীধিতি পারল না নিজে আগেভাগে খেয়ে বসে থাকতে। নাওফিলের প্লেটটা এগিয়ে নিয়ে খায়িয়ে দিতে আরম্ভ করল তাকে৷ খাওয়ার ফাঁকে তাকে পানিটুকুও মুখের কাছে ধরে দিতে হলো— এতখানিই তার হাতের নাজুক অবস্থা!
সকালের নাশতায় নাওফিল যে পেটপুরে খায় সেটা জানা ছিল না দীধিতির৷ গোটা পাঁচেক রুটির পর সে ঐশীর রান্না খিচুড়িও খেলো ওর হাতে। খাওয়া শেষে হঠাৎ আহ্লাদ করে বলল, ‘ঘামটা মুছে দাও না, স্মরণ।’
দীধিতি টেবিল ছেড়ে সবেই উঠে পড়েছিল। নাওফিলের কথায় ওর মুখের দিকে চেয়ে কোথাও ঘামের অস্তিত্ব পেলো না সে, ‘ঘাম কোথায় তোমার?’
-‘এই তো কপালে, কানের পাশের চুলের গোড়ায়, ঘাড়ের পিছের চুল বেয়ে ঘাম ঝরেই যাচ্ছে আমার সেই ভোর থেকে। তুমি আমার কেয়ারই করছ না?’ অভিমান গলায় অভিযোগ জানাল সে।
ঘামের তরঙ্গ সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখার জন্য দীধিতি নাওফিলের কাছে এসে তার মুখটা দেখল, ঘাড়টাও দেখল। নাওফিল তখন চেহারাটা মেকি বিষণ্ন করে বসে আছে। কয়েক পল সেই মুখে ভ্রু কুঞ্চিত করে চেয়ে থেকে দীধিতি হঠাৎ ঠোঁট টিপে লুকোনো হাসি হাসল। ওড়নার আঁচলে নাওফিলের সারা মুখ, ঘাড় আর শেষে টি শার্টের গোল গলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বুকটাও মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হয়েছে?’
-‘নাহ, ঘাড়ের পেছনের চুল বেয়ে আবারও ঘাম ঝরছে।’
-‘আচ্ছা?’
-‘হুঁ। একটু ফুঁ দাও ওখানে।’
-‘এসিতে বসেও?’
-‘অনেক অনেক বেশি পরিশ্রম করলে আমার তখন এসি দু’টো লাগে। কিন্তু এখন যে একটা। তাই তো কাজে দিচ্ছে না।’
-‘আহারে! আমার ফুঁতে শরীর জুড়াবে?’
খুব গম্ভীর গলায় বলল তখন নাওফিল, ‘মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ মাখলুকাত তো এজন্যই। ওসব ইলেকট্রনিক যন্ত্রবাতির বাতাস কি আর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ফুঁ’র সঙ্গে পারে?’
দীধিতি মিটিমিটি হাসতে হাসতে তার গলার খুব কাছে মুখটা এগিয়ে ফুঁ দিতে শুরু করলেই তখন আবার নাওফিল জানাল, ‘কাজ হচ্ছে না। বরফ লাগবে।’
প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল দীধিতি, ‘বরফ? কী করব তারপর?’
-‘নিয়ে এসো আগে। তারপর বলছি।’
মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে দীধিতি ঠোঁটের কোনায় চোরা হাসি ধরে ফ্রিজ থেকে বরফের টুকরো নিয়ে আসতে গেল৷ নাওফিল খাবার টেবিল ছেড়ে সে সময় সোফায় গা এলিয়ে বসে। ট্রে থেকে বরফের কিউবগুলো বের করে বাটিতে নিয়ে দীধিতি এসে বসল তার পাশে, ‘এখন কী করব?’
সোফায় এলিয়ে রাখা ঘাড়টা কাত করে সে গাঢ় চোখে
তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে, ‘আমি বলে দিলে তুমি বুঝবে?’
-‘কেন? তুমি কি স্প্যানিশ ভাষায় বলবে?’
-‘উহুঁ।’
-‘তাহলে বুঝব না কেন?’
-‘ওকে। একটা কিউব মুখে নাও।’
-‘মুখে কেন নিতে যাব? আজব!’
-‘আহা মুখে নেওয়ার পরই তো কাজ৷ আমার খুব ঘাম ঝরছে, স্মরণ। জলদি নাও মুখে। তবে পুরোটা মুখে ঢুকিয়ে নেবে না। অর্ধেকটা।’
দীধিতি ঠোঁটের হাসিটা আর না টানলেও নাওফিলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চোখদুটোই সেও প্রগাঢ় চাহনি মেলে রইল কিছু সময়। তারপর সহসাই ঠোঁটের মাঝে এক টুকরো বরফ ধরে ভ্রুজোড়া নাচাল, ইশারাতে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
‘এরপর?’
আবেশ কণ্ঠে নাওফিল বলে দিলো পরবর্তী কাজ। দীধিতির দু’ঠোঁটের কোনা গড়িয়ে তখন বরফ গলে পানি পড়ছে, শীতলতায় রাঙাও হয়ে উঠেছে ঠোঁটজোড়া। লাভ শেপের পুরু সেই রসালো, রক্তিম ঠোঁটদুটো নাওফিলকে অধৈর্য করে তুলতে চাইল মারাত্মকভাবে। ঘোর চোখে দীধিতির ওই ঠোঁটে চেয়ে থাকতেই তার কণ্ঠদেশ বরফ শীতল, কোমল ঠোঁটের ছোঁয়ায় সিক্ত হয়ে উঠল আচমকাই।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৮
ঠোঁটের ফাঁকে বরফের টুকরো চেপে রেখেই দীধিতি নাওফিলের সারা গ্রীবা, স্কন্ধে ছুঁয়ে দিতে থাকল ততক্ষণ, যতক্ষণ না বরফটা গলে যায়। কিন্তু দেহের ভেতরের অস্থিরতা আর অধৈর্যতায় নাওফিল পারল না নিজেকে বেকার রাখতে। দীধিতির মুখটা তুলে ধরেই আকস্মিকভাবে ওর শৈত্য অধরে তার উষ্ণ ওষ্ঠদ্বয় চুমুতে মাতল। এক টুকরো গলে পড়া বরফ শেষমেশ উন্মাদ, মাতাল, বিক্ষুব্ধ করে তুলল ওদেরকে।
