আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
জেরিনের সঙ্গে রেজার প্রথম পরিচয় হয়েছিল প্লেনে৷ এরপর বন্ধুত্ব দুজনের৷ সেই থেকেই জায়িন আর আয়মানের সঙ্গেও পরিচয় জেরিনের৷ বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে জীবনে কখনই না পাওয়া বহু মূল্যবান এক অনুভূতি লাভ করে রেজা। তা হচ্ছে ভালোবাসা৷ জাইমাকে জায়িনের কথামতো বিয়েটা করলেও সেটা ছিল ওর কাছে নামমাত্র বিয়ে। যার ভিত্তি বা মূল্য কোনোটাই ছিল না ওর ভাবনায়৷ তাই জাইমাকে বাংলাদেশে স্থায়ী হতে সাহায্য করার পর ওর কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। একটা সময় যখন জেরিনের সঙ্গে প্রণয় সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন ও আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করে। আর তা হলো সততা৷ জেরিন তার ব্যক্তিগত ও কর্মজীবন উভয় জায়গাতেই সততাকে প্রাধান্য দিয়েছে৷ তাই চেয়েছিল নিজের জীবনসঙ্গীও তেমন কেউ-ই হোক। তার এ চাওয়া জানার পর থেকে রেজা নিজেকে সমস্ত অন্যায় থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। আর এটাই হয় ওর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনার মূল। নিজেকে শুদ্ধ করতে গিয়ে সে জায়িনের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে৷ যা খুবই অকল্পনীয়ই ছিল জায়িনের কাছে।
রেজা ভেবেছিল, জায়িনকে কোনোভাবে আইনের হাতে তুলে দিয়ে সে জেরিনকে নিয়ে বাংলাদেশ চলে আসবে৷ কিন্তু তার পূর্বেই ওর সে পরিকল্পনা আর বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পড়ে যায় জায়িনের কাছে। জায়িনের কাছে সকল কিছু সহ্য করার ক্ষমতা থাকলেও ধোঁকাবাজি ও কখনই মেনে নিতে পারেনি৷ রেজাকে নিজের পরিবারের থেকেও বেশি বিশ্বাস করত সে, তাছাড়া ভালোওবাসত আপন ভাইয়ের মতোই৷ তাই তো খুব সহজে হত্যাও করতে পারছিল না ওকে। কিন্তু একের পর এক তার অন্যায়ের সমস্ত প্রমাণ রেজা আইনের হাতে তুলে দেওয়াতে ধৈর্যচ্যুত হয়ে পড়ে জায়িন। শেষে রেজাকে বিনাশ করার দায়িত্বটা দেয় সে নিজের ঘনিষ্ঠ চারবন্ধু লুকা, লুইস, কপার আর স্যামুয়েলকে। আর সেটাই সর্বনাশ ডেকে আনে জেরিনের জন্যও। তখনও গা ঢেকে অস্ট্রেলিয়াতেই রেজা। ওকে খুব সহজে মুঠোয় আনার জন্য জেরিনকে ওই চার বন্ধু নিজেদের কাছে বন্দি করে৷ সেদিনই বাঙালি সেই মিষ্টি চেহারার জেরিনকে দেখে মোহে পড়েছিল স্যামুয়েল। তাই তার কামুকতার শিকারও হতে হয়েছিল জেরিনকে৷ কিন্তু সব থেকে দুঃসহ সত্য হলো– সেই অমানুষটির পর লুকা, লুইস, কপারও গণধর্ষণ করে জেরিনকে।
যা সেদিনও অজানা ছিল রেজার কাছে, জায়িনের কাছে আর হয়ত স্যামুয়েলের কাছেও। কারণ, জেরিনের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ছিল তারপর। সেটার দায়ভার ওরা তিনজন কেউ-ই নিতে রাজি ছিল না। কেননা তাতে জায়িনের সাথে সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দোষটা তাই স্যামুয়েলের কাঁধেই চাপায় ওরা। তারপর ওরা চারজন বাধ্য হয় জেরিনকে হাসপাতালে নিতে৷ তবে জায়িনকে জানানো হয় স্যামুয়েল প্রচণ্ড জোরজবরি করার ফলেই এই হাল জেরিনের। জায়িন তখন জেরিনের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল আয়মানের সুস্থতার জন্য৷ তাই সে মেনে নিতে পারেনি জেরিনের সাথে হওয়া অন্যায়টা৷ যার ফলে স্যামুয়েলের সাথে সাংঘাতিক ঝামেলা হয় তার।
রেজার অবস্থাটাও তখন খুব খারাপ। জেরিনের কাছে অবধি পৌঁছনোর সুযোগটাও পায়নি সে। গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ অফিসার থেকে আদেশ ছিল ওর ওপর, কোনোভাবেই যেন জায়িনের হাতে ধরা না পড়ে সে। প্রচণ্ড অসহায়তা নিয়ে প্রতিটি দিন তখন পার হত ওর। জেরিন সুস্থ হলেও তাকে সর্বক্ষণের জন্য জায়িনদের নজরবন্দি হয়েই থাকতে হয়। তারপর হঠাৎ জানা যায় জেরিনের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কথা৷ অথচ বাচ্চাটি কার তা অজানা ছিল জেরিনের। জায়িন আর স্যামুয়েল শুধু মনে করে ওই সন্তান স্যামুয়েলেরই। যদিও স্যামুয়েল জেরিনকে বিয়ে করে নিতে রাজি হয়েছিল এক পর্যায়ে, জায়িনের কথামতো। কিন্তু জেরিন রাজি হয়নি কোনোভাবেই। তাতে স্যামুয়েলের আপত্তি ছিল না। শুধু চেয়েছিল বাচ্চাটাকে স্যামুয়েল নিজের পরিচয়ে, নিজের কাছে রেখে বড়ো করতে। তারপর দীর্ঘ সাড়ে ন’মাস পর যেদিন বাচ্চা ডেলিভারির জন্য জেরিনকে হাসপাতাল নেওয়া হয়, ঠিক সেদিন রাতেই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে রেজা সুযোগ পায় জেরিনের কাছে আসার। ওই অল্প সময়ের মাঝেই জেরিন আবদার করেছিল রেজার কাছে, ‘আমি কলঙ্কিত নারী। কিন্তু আমার বাচ্চা নয়, রেজা। ওকে একটা সুস্থ জীবন দেবে তুমি? আমি আর ফিরতে পারব না তোমার কাছে। আমি চাই না তুমি ওদের কাছে হেরে যাও। তাই আজকের পর আর কখনই তুমি এ দেশে পা রাখবে না, আমার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করবে না। আমার বাচ্চাটাকে কোনো রেপিস্টের পরিচয়ে বড়ো করতে চাই না আমি। ও স্বাভাবিক জীবনও পাবে না নয়ত। ওকে যেভাবে পারো তুমি নিয়ে যাও না, রেজা!’
প্রিয় মানুষের ওই পরিণতি রেজা সেদিন ঠোঁট কামড়ে সহ্য করে নিয়েছিল শুধু ওই একটা আবদার রক্ষার জন্যই। সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে সে যখন বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয় তখনই মুখোমুখি হয় আলিয়ার। আয়মান আর আলিয়া দুজনই উপস্থিত ছিল সেদিন হাসপাতালে। আয়মান বরাবরই নিষ্ঠুর হৃদয়ের মানুষ। জেরিনের বাচ্চাটাকে জায়িনের কথামতো দেখতে এলেও সে বেশিক্ষণ থাকেনি ওখানে। তাই আলিয়ার চোখেই ধরা পড়ে যায় রেজা৷ এবং অবিশ্বাস্যভাবে কেন যেন সেদিন আলিয়াই সহযোগিতা করে রেজাকে বাচ্চাটা নিয়ে পালিয়ে যেতে এবং অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে। এর কারণ আজও অজানা। এদিকে জেরিনও স্বেচ্ছায় সকলের কাছে আড়াল করে গেছে সে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। জায়িন আর তার চার বন্ধুদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানা ছিল বলেই পুলিশের কাছেও অভিযোগ জানাতে পারেনি সে। জীবনের ওই নির্মম পরিণতির গল্প রেজাকে জানাতেও খুব কুণ্ঠাবোধ করেছিল সেদিন। আজও আছে সেই কুণ্ঠা তার মাঝে৷
এবারের আগেরবার নাওফিল যখন অস্ট্রেলিয়া জেরিনের কাছে গেল আর জায়িন আয়মান সম্পর্কে গল্প বলতে বলল তাকে, সেবারই ওদের গল্প বলতে বলতে জেরিন নিজের জীবনের লুকিয়ে রাখা তিক্ত সত্যটাও জানিয়ে দেয় ওকে৷ ততদিনে নাওফিল দীধিতির সম্পর্কে পুরোপুরি খোঁজ নিয়ে রেখেছিল৷ জেরিনের কাছে রেজা হক নামটা জানার পর থেকেই দীধিতির বাবা রেজা হককে সন্দেহের তালিকাতে রাখে সে। কেননা হিসেব মতো রেজা হক জেরিনের বাচ্চাটিকে নিয়ে তো দেশেই এসেছিল৷
তারপরই নাওফিল দেশে ফিরে দীধিতির ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে তাওসিফ, ইয়াসিফের সাহায্য নেয়। এরপর জানতেও পারে, দীধিতি রেজা আর ঝুমুরের সন্তান নয়। নাওফিল ঠান্ডা মাথায় সবটা ভেবে একটা সমাধান বের করে–
রেজা হকও দেশে এসেছিল আর জাইমাকেও চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশে পাঠানো হয়েছিল। কোনোভাবে ওরা দুজন আবার একত্র তো হতেই পারে। ইয়াসিফকে তা জানালে নিজ উদ্যোগে তখন দীধিতির ফোন নাম্বার, কিরণের আর ঝুমুরের ফোন নাম্বারও ট্র্যাক করে নেয় ইয়াসিফ। যদি সত্যিই জাইমার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকে সেই আশায়। আর তারপর হঠাৎই চমক পায় ওরা দীধিতির ফোনে আসা কলগুলোর রেকর্ড চেক করে৷ যে কলটা করত এবং এখনও করে জাইমা খুব সিকিউরিটির সাথে। ধীরে ধীরে তখন থেকেই নাওফিল জানতে পারে দীধিতির সমস্ত পরিকল্পনা আর উদ্দেশ্য৷ অপরদিক থেকে তাই বাধ্য হয়ে ওরা তিনজনও পরিকল্পনা সাজায় দীধিতিকে নিয়ে।
এতদিনে দীধিতি যা কিছু করেছে সমস্তটাই জাইমার কথা মতো করলেও নিজের গায়ে ধর্ষিতার অপবাদ জড়িয়ে, তাওসিফের থেকে সহানুভূতি আদায় করে তাকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করার পরিকল্পনাটা দীধিতিরই ছিল। শুধু সকল সাহায্য আর বন্দোবস্তটা করে দিয়েছেন জাইমা৷ মুম্বাই বসে কীভাবে তিনি এতসব সহযোগিতা করলেন, ফুড কোর্টের ম্যানেজার আর স্টাফদের সঙ্গেই বা কী করে যোগাযোগ করে টাকা খায়িয়ে কাজ করালেন? এর উত্তর আপাতত তিনি মুলতবি রেখেছেন দীধিতির কাছে।
আর এদের দুজনের এ সমস্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পেরে নাওফিলের ক্রোধ আর জেদ দীধিতির প্রতি প্রেমের অনুভূতিকেও ছাড়িয়ে যায়৷ তাই দীধিতির চাওয়াকে সহজ করে দিতে তাওসিফকে বলা হয় ওকেই বিয়ের প্রস্তাব রাখতে সেদিন।
দীধিতির শারীরিক অবস্থার দিকে কারও খেয়াল নেই৷ বন্ধু তিনজন ব্যস্ত রাতে ওদের দুজনের মাঝে কী কী ঘটেছে তা জানতে কেবল। একের পর এক প্রশ্নে দীধিতির মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে তন্বী, তামান্না, ঐশী। ওরা তিনজন ঘরে আসার পর দীধিতিকে ডেকে তুললে দীধিতি লজ্জায় চাদরের নিচ থেকে বেরই হচ্ছিল না৷ পাছে ঐশী চাদরটা কেড়ে নিলে একদম ঠিকঠাকই দেখতে পায় দীধিতিকে। তবুও কেন এত লজ্জায় মরিমরি অবস্থা বন্ধুর? তা জানতেই এক জোটে নেমে পড়ে তারা তিনজন। ঐশী বড্ড দুঃখ গলায় বলে, ‘কী রে বোন! তোর গায়ে কোনো স্পট নেই কেন? তুই নাকি ট্যাবলেটটা খেয়ে নিয়েছিলি?’
-‘আরে স্পট পাওয়া যাবে নাওফিল ভাইয়ের গায়ে। কালকে মনে হয় ভাইয়ার বদলে আমাদের বান্ধবী শেরনি হয়ে গিয়েছিল৷ আর নাওফিল ভাই নিজের ইজ্জত বাঁচাতে ছটফট করে শিহাবদের ডাকছিল “বাঁচা! আমাকে বাঁচা তোরা ভাই!” বলে।’ হাত নেড়ে নেড়ে অভিনয় করে দেখায় তন্বী।
তামান্না হাসতে হাসতে ঐশীর গায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে তখন। দীধিতি বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে বুক অবধি চাদরটা টেনে রেখেছে, প্রচণ্ড ক্লান্তির ছাপ সারা চেহারায় ওর। বান্ধবীদের ঠাট্টা মশকরায় লজ্জা শরম না লাগলেও নাওফিলের সাথে গতরাতে করা কাজগুলো মনে হতেই এখান থেকে পালিয়ে যেতে মন চাইছে ওর। যতই স্বামী হোক সে! তার মনের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে অন্তরঙ্গ হতে সর্বোচ্চ জোরজবরদস্তি করেছে সে, সোজাভাবে বললে মেয়ে হয়ে সে এক প্রকার মলেস্ট করেছে নাওফিলকে। ছিঃ কী বিশ্রী শোনায় কথাটা! বিয়ের প্রথম রাতটা যেভাবে স্মরণীয় করে রাখল সে, তাতে নাওফিল কেন সে নিজেই আমৃত্যু ভুলবে না তা।
-‘ও সুন্দরী! আর কত রেস্ট নেবে? এবার যাও সুন্দরী ফ্রেশ হয়ে এসো। বেচারা ভাইয়া এখনও কিন্তু নাশতা করেনি তোর জন্য।’
ঐশীর ঠেলা পেয়ে নড়েচড়ে বসে দীধিতি৷ বিরস গলায় তামান্নাকে বলে, ‘আমার কাপড় বাথরুমে রেখে আয় না! তারপর নামছি বিছানা থেকে।’
-‘আমাদের সামনেও নাইটিতে থাকতে লজ্জা পাচ্ছিস? রাতে লজ্জা কোথায় উড়েফুড়ে গিয়েছিল?’ টিটকারি গলায় বলে হাসে তামান্না।
দীধিতির মুখটাতে অমবস্যা, ‘তোরা কাজটা ঠিক করিসনি। আমার গতকাল রাতে কেমন জঘন্য অনুভূতি হচ্ছিল শরীরের মাঝে তা তোরা নিজেদের সাথে না হলে বুঝবি না। খুব খারাপ করেছিস তোরা। নাওফিল বারবার আমাকে দূরে ঠেলেছে। আর আমি যৌন তাড়নায় উন্মাদ এক প্রস্টিটিউটের মতো নিজেকে প্রেজেন্ট করেছি ওর কাছে। যেখানে আমরা দুজন দুজনকে আজও ঠিকমতো চিনি না, বিচার করতে পারিনি সেখানে বিয়ের প্রথম রাতেই নিজের ব্যক্তিত্বকে, পুরোটা নিজেকেই নিচু পর্যায়ে নামিয়েছি আমি। আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে গেছে ওর সামনে। আত্মমর্যাদা, আত্ম অহমিকা বলতে আমার কিছুই নেই ওর কাছে।’
কথাগুলোই বান্ধবী তিনজনের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল ক্ষণিকেই৷ নিজেদের মধ্যে এখন অপরাধবোধ কাজ করছে ওদের৷ দীধিতি খুব নরম মনের মেয়ে তা ওরা ভুলে বসেছিল।
নাওফিলের সঙ্গে ওর সম্পর্কের রসায়নটা খুব অন্যরকম। এখনও ওরা নিজেদের কাছে বন্ধ বইয়ের মতো। একজন আরেকজনকে পড়ার সুযোগই পায়নি। তার আগেই দৈহিক মিলন দীধিতি এবং নাওফিল, দুজনের কাছেই অনুচিত, অপ্রত্যাশিত আর অস্বস্তিকর। এই ব্যাপারটা বন্ধুরা কেউ-ই বুঝে উঠতে পারেনি।
দরজার মুখেই মুখেই নাওফিল দাঁড়িয়েছিল। কেউ খেয়াল করেনি ওরা। কথাগুলো শোনার পর নিজের মনের অভিসন্ধি বদলে ফেলল সে। ফিরে এসে বসার ঘরের সোফায় বসে গা এলিয়ে দিলো। চোখ বুজে স্মৃতিচারণ করল মধুর রাতটা৷ দীধিতিকে গতরাতে সত্যিই অমন করে কাছে টানতে চায়নি সে৷ এর কারণ দীধিতি না জানলেও সে তো জানে৷ ওদের দুজনের প্রতি দুজনের ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করা যে এখনও বাকি! এক মন আরেক মনের সাথে আজীবনের জন্য জুড়ে যাওয়া বাকি। যেখানে সহস্র তুফান বয়ে গেলেও মনদু’টো আলাদা হবে না। তারপর না কাছাকাছি আসা! দীধিতি মনের টানে নয়, শুধুই শরীরের উন্মাদনার জন্যই যে নিজেকে সঁপে দিতে চাইছে, তা বুঝতে পেরেই নাওফিল চায়নি ওই মিলন। আবার শেষ মুহূর্তে ফেরাতেও পারেনি বউয়ের কষ্টের কথা ভেবে৷ রাতের মধ্যভাগে যখন বউটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল তখনই সে অনুসন্ধানে নামে, কেন তার চেনা দীধিতি এমন করল? ট্রে’তে চোখ গেলেই দেখতে পায় সেই ক্যাপসুল। সেটা কীসের ক্যাপসুল তা খাপ না থাকায় প্রথমে চিনতে না পারলেও সকাল হলেই দরজা খোলা পেয়ে ফোন নিয়ে এসে গুগল থেকে তথ্য বের করে দেখে তা।
বেলা বারোটায় সকলে সকালের নাশতা করতে বসে টেবিলে। দীধিতিকে টেনে এনেও ঘরের বাইরে বের করা গেল না। নাওফিলের মুখোমুখি হতে সে নারাজ। তা বুঝতে পেরে নাওফিলও দুপুর অবধি আর দীধিতির সঙ্গে দেখা করেনি। যোহরের নামাজ পড়ে বন্ধুদের দেওয়া বিয়ের উপহার Yamaha এর বাইক নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে বাইরে। তারপর ঘণ্টা দুই পর ফিরে এসে দেখে দীধিতি তন্বীদের সাথে বাগানে ঘোরাঘুরি করছে। তামান্না তাকে দেখে দীধিতিকে জোর করে ঘরে পাঠায়। আর কত পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবে মেয়েটা?
ঘরে ঢুকেই দীধিতি দেখতে পায় সবেই নাওফিল গায়ের শার্টটা খুলে সোফায় গা ছেড়ে বসেছে। রোদের মধ্যে বাইক নিয়ে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির কারণে ঘামে ভিজে অস্থির সে। তা খেয়াল করে দীধিতি ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিয়ে এগিয়ে দেয় তাকে। বোতলটার দিকে একবার চেয়ে তারপর আবার দীধিতির দিকে মুচকি হেসে তাকায় নাওফিল, ‘গ্লাসে ঢেলে দিলে বেশি সুন্দর দেখাত বোধ হয়।’
ছোট্ট করে জিভে কামড় দিয়ে দীধিতি সরে আসে তার সামনে থেকে৷ কালকের জন্য নার্ভাসনেসে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর। গ্লাসে পানি ঢেলে এনে নাওফিলের হাতে তুলে দিলে নাওফিল এক চুমুক দেওয়ার পর বলে, ‘টেবিলে রাখা ওই ব্যাগটা নিয়ে এসো প্লিজ।’
গতরাতেই ব্যাগটা দেখেছিল দীধিতি৷ ওর মন বলেছিল ওতে নিশ্চয়ই ওর দেনমোহরের টাকাগুলো রয়েছে। কারণ, টাকার ব্যাগই লাগছে ওটাকে৷ নাওফিলকে এনে দিলে নাওফিল সত্যিই ব্যাগ থেকে কতগুলো টাকার মোটা বান্ডল বের করে বলে, ‘গতকাল রাতেই দিতে চেয়েছিলাম। খেয়াল ছিল না৷ এটা তোমার সম্মানী।’
-‘আমার প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি, রেখে দাও।’
-‘বললেই হলো? বিয়ে করে সেই রাত ন’টায় ছুটেছি ব্যাঙ্কে। আমার কষ্টের দাম নেই না কি?’
ভ্রু, কপাল কুঁচকে বলে দীধিতি, ‘ব্যাঙ্ক কি তোমার বোজম ফ্রেন্ডের যে রাত ন’টায় খুলে বসে থাকবে তোমার জন্য?’
-‘হায় হায় তুমি কী করে জানলে?’ কপট বিস্ময় নিয়ে বলল নাওফিল।
-‘হাহ্! লো ক্লাস ঢপ।’
-‘কীসের ঢপ? ওই ব্যাঙ্ক সত্যিই আমার জন্য যখন খুশি তখন ওপেন হয়৷’
দীধিতি বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে। নাওফিল পানিটুকু চুমুক দিয়ে হেসে বলে, ‘মজা করলাম৷ ওটা ব্যাঙ্ক নয়, সমিতি৷ আমরা বেশ ক’জন ফ্রেন্ড মিলে সমিতিটা গঠন করেছি। মাস শেষে সকলে নির্দিষ্ট একটা অ্যামাউন্ট জমা করি ওখানে৷ যার যখন প্রয়োজন তখন সে ওখান থেকে টাকা তুলতেও পারে, লোনও নিতে পারে। যে কোনো বেকার মানুষদেরও লোন দিয়ে থাকি উইথআউট ইন্টারেস্ট। মূলত স্বল্প আয়ের মানুষ আর বেকার মানুষদের চিন্তা করেই সমিতিটা করেছিলাম। তবে এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল আমার আত্মসম্মানবোধ থাকা বন্ধুরা যারা বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াত, তবু আমাদের থেকে হেল্প নিতে চাইত না। ওদের জন্য।’
-‘সত্যি! খুব ভালো কাজ তো! কতদিন হলো করেছ এটা?’ খুব উৎসুক হয়ে শুধাল দীধিতি।
-‘বছর তিন হচ্ছে।’
মনেমনে বেশ গুণমুগ্ধ হলো দীধিতি। নাওফিলকে কাছ থেকে জানার সত্যিই এখনও অনেক বাকি ওর।
সোফা ছেড়ে উঠে নাওফিল পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোটো একটা জুয়েলারি বক্স বের করে দীধিতির সামনে এসে দাঁড়াল, ‘এটাও গতকাল দিতে মনে ছিল না। হাতটা দাও।’
ফর্সা, অল্প লোমশযুক্ত, কোমল, সুন্দর হাতটা বাড়িয়ে দিলো দীধিতি। স্বর্ণের হালকা ডিজাইনের ব্রেসলেটটা পরিয়ে দিলো নাওফিল সে হাতে। হাতটার দিকে মৃদু হেসে চেয়ে থেকে মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘মাশা আল্লাহ! চমৎকার লাগছে হাতটা।’
দীধিতিও মুগ্ধ হলেও পরে বিব্রতস্বরে বলল, ‘স্যরি, আমি কোনো গিফ্টের প্ল্যান করিনি।’
-‘সমস্যা নেই। আমাকে কবুল করাটাই গিফ্ট ছিল আমার জন্য।’
খুব গভীরতা ছিল কথাটায়। তা উপলব্ধি কনে হঠাৎ
দীধিতি বাথরুমে যাওয়ার বাহানা দিয়ে সরে এলো ওর কাছ থেকে। বাথরুমের আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে স্বগতোক্তি করল, ‘আর কোনো ধোঁকা নয়, স্মরণ৷ সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে হবে আমায়৷ আমি চাই না নাওফিলকে হারাতে। বরং আমি চাই আমার সংগ্রামে নাওফিল আমার পাশে থাকুক৷ যা কিছু ঘটে গেছে সব অতীতে৷ বর্তমানে আমি আর কোনো ছলনা করতে চাই না ওর সঙ্গে।’ বলেই চোখের লেন্সগুলো খুলে ফেলল৷ ভয় হচ্ছে ওর। সমস্ত স্বীকারোক্তির পর নাওফিল মুখ না ফিরিয়ে নেয়৷
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল নাওফিল টি শার্ট পরছে। ওকে বলল, ‘আমি কিছু কনফেস করতে চাই তোমাকে, নাওফিল।’
নাওফিল নিঃশব্দে মুচকি হাসে৷ তা দেখতে পায় না দীধিতি। ওর দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ইশারায় বিছানায় এসে বসতে বলে। দুজন পাশাপাশি বসলে দীধিতি জানিয়ে দেয়, ‘আমি দীপ্তর ব্যাপারটা নিয়ে সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম তোমাকে। তাছাড়া পরিচয়ের শুরুতেও তুমি ডেডবডি নিয়ে যেটা করেছ সেটাও আমার মনে সেদিন আবারও নেগেটিভ থট দিয়েছিল।’
নাওফিল ভেবেছিল দীধিতি এবার সব সত্যগুলো বলে দেবে ওকে। কিন্তু তার বদলে দীপ্তর দুর্ঘটনাটাকে থার্ড ক্লাস বাহানা হিসেবে খাঁড়া করল! নিমিষেই মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল ওর। তারপরই দীধিতি বলে উঠল, ‘এর থেকেও আসল যে ব্যাপারটা সেটা হলো, আমার বাবা রেজাউক হকের মৃত্যুর জন্য দায়ী তোমার বাবা জায়িন মাহতাব। আর হয়তো তোমার বড়ো কাকু জাকির শেখও জড়িত৷ যারা আমার বাবার মৃত্যুর কারণ, তাদের ছেলেকে নিয়ে আজকের দিনটা ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার৷ আমি চাই আমার বাবার হত্যাকারীদের সাজা মিলুক। তোমার সঙ্গে আমি এক হলেও এ কারণে যদি আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়, সেই আশঙ্কা থেকেই তোমার থেকে দূরে চলে এসেছিলাম।’
-‘তাহলে কাল বিয়েটা করলে কেন? ভাবনা বদলে ফেলেছ এখন?’
দীধিতি মাথা তুলে তাকাল। তখনই নাওফিলের চোখে পড়ল দীধিতির চোখের নীল মনিদুটো। গতকালের মতো আজও মনে হচ্ছে, এই মনি দু’টোই এই চোখজোড়ার আসল মনি। লেন্স তো মনেই হচ্ছে না। কাল লাইটের আলোয় দেখে ভেবেছিল বুঝতে ভুল হয়েছে ওর। কিন্তু দিনের আলোতেও তো একই ভাবনা আসছে। এ নিয়ে না হয় পরে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে৷ দীধিতির স্বীকারোক্তি শুনল, ‘আমি পুরোটা বলি। তারপর হয়ত তুমি বুঝতে পারবে। তার আগে কোনো প্রশ্ন কোরো না প্লিজ৷ আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান নই। তাদের পালিত সন্তান। খুব ছোটোবেলা থেকেই আমার প্রতি মায়ের উদাসীনতা দেখেছি, আর স্রেফ দায়বদ্ধতা থেকে যতটুকু দায়িত্ব পালন না করলে নয় ততটুকুই করতে দেখেছি৷ তারপর একটা সময় জানতে পারলাম আমি আমার মায়ের পেটের সন্তান নই। বাবার প্রথম স্ত্রী ছিলেন একজন। ধারণা করে সবাই, আমি সেই স্ত্রীর মেয়ে। কারণ, বাবার সেই প্রথম স্ত্রী আমাকে বেশ ক’বছর যশোরে দেখতে আসতেন। এরপর হঠাৎ করে আসা বন্ধ করে দেন তিনি। ও বলা হয়নি, বাবার সাথে ওনার বিচ্ছেদ হয়েছিল বিশেষ কোনো কারণে৷ কিন্তু আমার টানেই তিনি বারবার ছুটে আসতেন। আমি ক্লাস এইটে ওঠার পর এসব জানতে পারি। তারপর থেকে চেষ্টা করি ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করার।
মায়ের কাছে ওনার নাম্বার চাইতাম। কিন্তু মা দিতো না। অনেক রাগারাগি করত। এরপর আর আমিও চেষ্টা করিনি। এইচএসসির পর আমার পার্সোনাল ফোন হলে একদিন হঠাৎ করেই আমার কাছে অচেনা নাম্বার থেকে কল আসে। কলটা ছিল আমার বাবার সেই স্ত্রীর। সেদিন তার সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পারলাম তিনি আমার মা নন। আমার জন্মপরিচয় এতই বেশি সিক্রেট ছিল যে, সেটা একমাত্র বাবা ছাড়া কেউই জানে না৷ তিনিও না। তবে যতটুকু জানতে পারলাম তা হলো– আমাকে বাবা অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়ে এসেছিলেন। আমি বাবার প্রেমিকার সন্তান। কিন্তু সেই সন্তানের বাবা অন্য কেউ। আমার যে জন্মদাত্রী, তিনি একরকম বাধ্য হয়ে আমাকে বাবার কাছে তুলে দেন আর অনুরোধ করেন, আমাকে যেন সুস্থ আর স্বাভাবিক একটা জীবন দেওয়া হয়। আমার পিছে পড়ে ছিল অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত ক’জন মাফিয়া ধরনের মানুষ৷ যাদের মাঝে তোমার বাবাও ছিলেন একজন৷ বাবা তার প্রেমিকার কথা রাখলেন।
আমাকে সত্যিই স্বাভাবিক একটা জীবনে বড়ো করে তুললেন। কিন্তু আমাকে ভালো রাখতে গিয়ে, সেফ রাখতে গিয়ে বাবাকেই মরতে হলো। না, তাকে মারা হলো৷ নাওফিল, তুমি বোধ হয় জানো তোমার বাবার পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট ছিলেন আমার বাবা। একটা সময় তোমার বাবার সকল অপকর্মের প্রমাণ আমার বাবা গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্টের অফিসারদের হাতে তুলে দেন। আর তাতেই তোমার বাবা রেগে যান খুব। তাই বাবাকে অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে খুন করে দেন। কিন্তু তখন তোমার বাবা সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে। বাংলাদেশে তখন তোমার বাবা দাগি আসামি৷ এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও। তাই দেশে আসার সুযোগ বা অবস্থা তার ছিল না। তাহলে অন্য কারও সহযোগিতা ছাড়া তো আর তিনি আমার বাবাকে মারতে পারেননি। সেই অন্য কেউ হওয়ার বেশিরভাগ আশঙ্কা জাকির শেখ। যিনি তোমার বাবাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আমি আমার বাবার হত্যার বিচার চাইতেই আর হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ খুঁজে তাকে সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করতেই তাওসিফকে বিয়ে করে শেখ বাড়িতে আসতে চেয়েছিলাম।’
কথাগুলো শেষ করে নাওফিলের চোখে চোখ রাখল দীধিতি। নাওফিল তখন জিজ্ঞেস করল, ‘চেয়েছিলাম কেন? এখন আর চাও না?’
অকপটেই বলল দীধিতি, ‘এখনও চাই।’
কতক্ষণ নীরব থেকে নাওফিল প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘ওকে, তোমার কথার প্রেক্ষিতে আমার মনে যে প্রশ্নগুলো উদয় হয়েছে তা এখন আমি একেক করে জিজ্ঞেস করি। তবে তার আগে বলে রাখি ওই ডেডবডি নিয়ে তামাশা করার রহস্যটা। আমি পূর্বে যা যা করেছি অন্যায় কাজ, তার সবটাই কেবল নিজেকে ক্রিমিনাল দেখানোর জন্য। নিজে খারাপ কাজ করে নিজেই সেটার প্রমাণ পাঠিয়ে দিতাম আমার অভিভাবকের কাছে। তারপর পুলিশ অবধিও পৌঁছে দিতাম নিজেই। উদ্দেশ্য একটাই ছিল। তা হলো জাকির শেখের একমাত্র পুত্র তার ছোটো ভাই জায়িন মাহতাব শেখের মতোই ক্রিমিনাল তৈরি হচ্ছে, সেটা প্রমাণ করে দেশবাসীকে জানানো। আমাকে আমার বাবা-মায়ের থেকে কেড়ে এনে নিজের কাছে আটকে রাখার শাস্তি হিসেবে এমনটা করেছি আমি। কারণ, তাদের কাছে থাকলে আমি তাদের মতোই হব।
তাই তিনি নাকি আমাকে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য ছিনিয়ে এনেছিলেন তাদের থেকে৷ অথচ আজ অবধি তিনি আমার সঙ্গে শক্ত গলায় ছাড়া কথা বলেননি, ছোটোবেলায় কখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেননি, আহ্লাদ করেননি৷ ছোটো অন্যায় অপরাধ করলে তার জন্য বড়ো বড়ো শাস্তি বরাদ্দ রাখতেন৷ সেই শাস্তিগুলো হত আমার সঙ্গে বাড়িে কাউকে কথা বলতে না দেওয়া, আমার সঙ্গে মিহাদ নিহাদকে মিশতে না দেওয়া, আমাকে খায়িয়ে দিত দাদী অথবা আম্মু। সেটাও করতে দিতেন না তিনি৷ একা বসে নিজে নিজে ভাত তরকারি বেড়ে খেতে হত, একা ঘরে ঘুমাতে হত, নিজের সব কাজ একা করতে হত৷ স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হত। এগুলো ছিল প্রাইমারি পর্যায়ের শাস্তি আমার৷ হাইস্কুলে ওঠার পর শাস্তির ধরন বদলে আরও বেশি স্ট্রিক্ট হত৷ টানা একদিন না খেতে দিয়ে ছাদের চিলেকোঠায় রেখে আসা হত। আমার কাছে কারও আসা বারণ থাকত তখন৷ সারাদিন, সারারাত একা আমাকে চিলেকোঠায় পড়ে থাকতে হত। যখন কলেজে উঠলাম তখন আমার পছন্দের জিনিস বা প্রিয় জিনিস কেড়ে নেওয়া হত, ভেঙে ফেলা হত শাস্তিস্বরূপ। মানে আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার চেয়ে মানসিক কষ্টটা দিয়ে এসেছেন তিনি।
মিহাদকে, নিহাদকে নিয়ে কাকুর আর কাকির আদরযত্ন, আহ্লাদীপনা দেখলে আমি ওই মানুষটার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। আমাকেও যেন তিনি ওদের মতো করে আদর করেন, ভালোবাসেন। ভাবতাম, সবার থেকে ভালো ছেলে হয়ে থাকলে তিনি আমাকে ভালো না বেসে থাকতেই পারবেন না৷ সেই চেষ্টাও করেছিলাম কয়েকমাস রাত দিন পড়াশোনায় ডুবে থেকে ক্লাসে স্যার, মিসদের কাছে সবার থেকে গুড স্টুডেন্ট হয়ে সুনাম কামিয়ে। কিন্তু তার বিনিময়ে ফলাফল একই পাই। আজকে দীর্ঘ দশ বছর পর আমি বাইকে চড়েছি। এসএসসিতে খুব ভালো রেজাল্ট করে দাদার কাছে গিফ্ট হিসেবে পেয়েছিলাম শখের একটা বাইক। স্কুলে গিয়ে ক্লাস নাইন থেকেই বড়ো ভাইদের থেকে রোডে চালানোটা রপ্ত করেছিলাম। তাই রেজাল্টের পর আবদার করেছিলাম বাইকের। দাদা আমাকে সব থেকে কম শাসন করেছেন। আমার মনে পড়ে না তিনি শেষ কবে আমার ওপর উঁচু গলায় কথা বলেছেন। আজ যোহরের ওয়াক্তে আমাকে মসজিদে জামাআতে নামাজ আদায়ের জন্য কল করে ডাকেন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছি৷ নামাজ শেষে তিনি চুপচাপ বাসায় ফিরে গেছেন। গতকাল যে কাজটা করলাম তার বিনিময়ে তিনি কখনই আমাকে রাগারাগি করে কিছু বলবেন না। যা বলার কাছে বসিয়ে ঠান্ডা গলায় বলবেন।
তো বাইক নিয়ে কলেজ যাতায়াত করার আদেশ ছিল না আমার৷ সপ্তাহে ছুটির দিনটাতেই শুধু বাইক নিয়ে বের হওয়ার সুযোগ ছিল৷ তা নিয়ে আমি কখনই দ্বিমত করিনি বা মন খারাপও না। কিন্তু ওই একটা দিনই চালাতে গিয়ে একদিন বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করলাম একজন সাইকেল চালকের সাথে। মূলত তাকে সেফ করতে গিয়ে আমিই আহত হলাম বেশি৷ সেই ব্যক্তিও হলেন সামান্য। কিন্তু ঘটনাটা রটিয়ে গেল মুহূর্তেই, জাকির এমপির ছেলে রাস্তায় উশৃংখলের মতো বাইক চালিয়ে মানুষ অ্যাক্সিডেন্ট করে। এমপির কান অবধি পৌঁছে গেলে তিনি হসপিটাল থেকে আমাকে বাসায় নিয়ে আসেন সেই দিনেই৷ আমি তখন ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিলাম না। তিনি আমাকে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে গেটের সিকিউরিটি দুজনকে শান্ত গলায় আদেশ দিলেন বাইকটাকে পুরোপুরি অকেজো করে দিতে। মানে এত বিশ্রীভাবে ভেঙেচুরে দিতে বললেন যাতে ওটা কোনো ভাঙারির দোকাদারও নিতে না চায়। ঠিক তা-ই হলো৷ আমারই সামনে বাইকটাকে তিনি ভেঙেচুরে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। এরকম আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমার ভেতরে ক্রিমিনাল সত্ত্বাটা জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করেছি বহুবার। কেন পারিনি জানি না।
হয়ত আমার বাবা-মা জন্মগতভাবে ক্রিমিনাল ছিলেন না বলেই আমার রক্তে খারাপ কাজের ধারা আসে না৷ আমি আজও কারও গায়ে একটা সুইয়ের আঘাতও করতে পারিনি৷ মারামারি যেটুকু যা করেছি কাছের বন্ধুদের সাথে, ভাইদের সাথে। তুমি যে কাটাছেঁড়া ডেডবডিটা আমার রুমের বাথরুমে দেখেছিলে, ওটা ওভাবেই মোটা টাকা দিয়ে মর্গ থেকে ভাড়া করে এনেছিলাম। আমি পণ করেছিলাম নিজের কাছে, মিথ্যেমিথ্যি হলেও নিজেকে জায়িন মাহতাবের মতো গড়ে দেখাব জাকির শেখকে৷ আর একজন ফেক আয়মান মেহরিনও তৈরি করব৷ সেই একজন তোমাকে সিলেক্ট করেছিলাম। কিন্তু সেটা কেবল নাটকীয়ভাবেই। শুধু সত্য মনে হবে জাকির শেখের কাছে৷ এবং ওটাই তার মানসিক শাস্তি হবে যে, তিনি পারেননি আমাকে মানুষ করতে৷ আমাকে যেমন তিনি কখনও শরীরে আঘাত করে শাস্তি না দিয়ে মনে আঘাত দিয়েছেন। আমিও তেমন করেই দিতে চেয়েছিলাম। হ্যাঁ, “চেয়েছিলাম”। এখন আর চাই না।’
ব্যথাহত চাহনি নিয়ে তাকিয়ে রইল দীধিতি ওর দিকে৷ আশ্চর্য হলো এই ভেবে, একদিক থেকে ওদের দুজনের জীবনের গল্পটা প্রায় একইরকম। ও যেমন মায়ের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারেনি, তেমন নাওফিল পায়নি বাবার স্নেহ, ভালোবাসা। স্তিমিত কণ্ঠে শুধাল, ‘আর দীপ্তর ব্যাপারটা? ওকে কেন ওভাবে বন্দি করে রেখেছিলে?’
-‘এ ব্যাপারটা বলতে চাইছি না এখন৷ ওর সঙ্গে যেটা করেছি সেটা ওর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি৷ তবে প্রশ্নটা করে ভালো করেছ। দীপ্তর সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করবে না। তোমার সিম নাম্বার চেইঞ্জ করে দিতে চাই আমি। ও তোমার নাগাল অবধি পৌঁছক, তা আমি চাই না। আমি নতুন সিম কিনেও এনেছি। আজই নিয়ে নেবে তুমি।’
সিম নাম্বার পরিবর্তনের কথাটা পছন্দ হলো না দীধিতির, ‘নাম্বার চেইঞ্জের দরকার পড়বে কেন তাতে? আমি ওর সঙ্গে কথা না বললেই তো হলো।’
-‘আমি চাইছি এটাই কি যথেষ্ট নয়? তোমার তো প্রবলেম হওয়ার কথা না এতে। তোমার মা, বোন, বান্ধবী আর আমি ছাড়া তোমার লাইফে বিশেষ তো আর কেউ নেই আমার জানামতে।’
-‘কে বলল নেই? আমার মাম্মাম আছেন!’
এটাই চাইছিল নাওফিল। সরাসরি জাইমার কথাটা স্বীকার করুক দীধিতি। নয়ত সেও প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পারত না।
-‘মাম্মাম কে? ও… তোমার বাবার সেই প্রথম স্ত্রী?’
-‘হুঁ।’
-‘এখনও তোমাকে দেখতে আসেন? বিয়েতে তো মনে হলো না এমন কেউ ছিলেন।’
-‘এখানে থাকেন না মাম্মাম। মুম্বাই থাকেন।’
-‘ও আচ্ছা। তো তাকেও নতুন নাম্বারটা জানিয়ে দিলেই তো হয়।’
দীধিতি সব কথা তো উল্লেখ করেনি নাওফিলের কাছে। তাই সমস্যাটা আসলে কোথায় সেটাও বলতে পারছে না৷ জাইমা রাজেশ মল্লিকের কাছে ওর এই নাম্বারটাই পাঠিয়ে দিয়ে বলেছেন দেশে ফিরে যেন তিনি একবার হলেও ওর সঙ্গে দেখা করেন৷ রাজেশ মল্লিকের সাথে যোগাযোগ করাটা খুব কঠিন। তিনি অধিকাংশ সময়ই আউট অফ রিচ থাকেন। তাই এই মুহূর্তে নাম্বার পরিবর্তন করলে তিনি তো কল করে ওকে পাবেন না। তার সঙ্গে যোগাযোগ করাটাই যেহেতু কষ্টসাধ্য, তাই নতুন নাম্বার জানানোও অসম্ভব।
-‘আমি কিছুদিন পর চেইঞ্জ করি? বেশ কয়েক জায়গায় চাকরির এপ্লাই করেছিলাম তো। সেখানে এই নাম্বারটাই দেওয়া৷’
-‘তুমি কেমন ধরনের জব করতে চাও?’
এই মুহূর্তে দীধিতি নাওফিলকে এটাও বলতে পারবে না সে গোয়েন্দা সংস্থাতেই নিযুক্ত হতে চায়৷ কারণ, তার আগে জানতে হবে নাওফিলের মনোভাব কী আজ তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সবটা জানার পর। প্রসঙ্গ এড়াতে দ্রুত জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আমার কাছে কী কী যেন প্রশ্ন করতে চেয়েছিলে? করবে না?’
-‘ও হ্যাঁ, কথাই কথাই ভুলে গিয়েছি। তো প্রথম প্রশ্ন হলো, তোমার জন্ম ইতিহাস নাকি জানতেন একমাত্র তোমার বাবা৷ তাহলে তোমাকে তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়ে এসেছিলেন, তার প্রেমিকার সন্তান তুমি, তোমার খোঁজে মাফিয়ার মতো মানুষেরা পড়ে ছিল, তাদের মাঝে আমার বাবাও ছিলেন, তারপর তোমার বাবা আমার বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাকতা করে আমার বাবার অপকর্মের প্রমাণ আইনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তার জন্য তোমার বাবাকে খুন করেছে আমার বাবা, জড়িত সেই সাথে আমার বড়ো কাকুও৷ এগুলো তুমি কী করে জানলে?’
-‘মাম্মাম বলেছেন। আমাকে নিয়ে বাবা মাম্মামের সাথেই থাকতেন ঢাকা, প্রথম এক দেড় বছর৷ তারপর একদিন বাবা এসে জানালেন তাকে খুঁজে চলেছে ওই মানুষগুলো৷ বাবার জন্য মাম্মামের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তার জন্যই বোধ হয় মাম্মামকে মুম্বাই চলে যেতে বলেন।’
-‘মুম্বাইতেই কেন? তারপর তো তোমার বাবা কিরণের আম্মুকে বিয়ে করেন। ক্ষতি তো তারও হতে পারত! তাকে কেন বিয়ে করে সাথে রাখলেন?’
বিমূঢ় দেখাল দীধিতিকে এখন। ও চাইছিল না জাইমার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে৷ জাইমা তার বিষয়ে কাউকে কিছু না বলমে কোনো নিষেধাজ্ঞা না করলেও তার জীবন ইতিহাস জানার পর দীধিতিই উপলব্ধি করেছে, জাইমার নিরাপত্তার জন্য তার ব্যাপারে খোলাখুলি কাউকে কিছু না বলা শ্রেয়। অপ্রস্তুত হয়ে চুপচাপ বসে ভাবতে থাকল, কীভাবে সামলে নেবে এখন প্রশ্নগুলো?
অপরদিকে নাওফিলের ধৈর্য ভেঙে আসতে চাইছে৷ জাইমাকে নিরাপদে রাখাটা একদম সহ্য হচ্ছে না ওর। দীধিতি সবটা স্বীকার করতে চেয়েও কতগুলো বিষয় এখনও আড়ালেই চেপে রাখল৷
আড়চোখে নাওফিলের কাঠিন্য মুখটা দেখে দীধিতি বোধ হয় বুঝতে পারল নাওফিলের থেকে কিছু কথা লুকিয়েছে ও, তা নাওফিল টের পেয়ে গেছে। তাই জন্যই রেগে গেছে সে।
অকস্মাৎ ভাবনাতীত প্রশ্ন করে বসল নাওফিল, ‘আমাকে বিয়ে করতে কেন রাজি হয়েছিলে?’
সরল চোখে তাকাল দীধিতি ওর চোখে, ‘আমি ফিল করেছিলাম তোমাকেই আমি চাই। অন্য কাউকে মেনে নিতে পারতাম না, তাকে ভালো রাখতে পারতাম না। তাতে অন্যায় করা হত তার সঙ্গে। মাম্মামের বিষয়টা আপাতত অফ রাখি? আমি পরে কখনও জানাব তার ব্যাপারে সব কিছু।’
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে কয়েক পল তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে চেয়ে দৃঢ় গলায় বলল, ‘তোমার খুশি।’
-‘আমি যে কারণে তোমার বাড়ির বউ হতে চেয়েছি তা শুনে তুমি কী ভাবলে, নাওফিল?’ সাবধানে প্রশ্নটা রাখল দীধিতি।
-‘ভেবেছি অনেক কিছুই। তোমার চাওয়া অন্যায় নয়৷ কিন্তু আমার কথা হচ্ছে আমার বাবা আর বড়ো কাকুর বিরুদ্ধে তুমি যে খুনের ব্লেমটা করছ, তার যথাযথ এবং সত্য প্রমাণ কালেক্ট করতে পারলে আমি নিজে তোমাকে সহায়তা করব তোমার কাজে। আমার বাবাই যে তোমার বাবাকে খুন করিয়েছে, সেটা তুমি জোর গলায় দাবি করেছ৷ কী প্রমাণে? সেটার কৈফিয়ত আমাকে এখনই দিতে হবে তোমায়।’ আগের থেকেও আরও বেশি কঠোর শোনাল নাওফিলের কথাগুলো।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০
দীধিতি নীরব হয়ে যায় চিন্তিত মুখ করে৷ জায়িন মাহতাবের বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে চেয়েছেন জাইমা। আর জাকির শেখের বিরুদ্ধে প্রমাণ খুঁজতেই তাকে এ বাড়িতে আসা। তাতে সহায়তা করতে চেয়েছেন স্বয়ং রাজেশ মল্লিক৷ এ কথাগুলো তো আর এখন প্রকাশ করতে পারবে না সে। তখনই নাওফিল প্রখর দৃষ্টি ছুঁড়েই বলে উঠল, ‘আমার বাবার জীবনে সব থেকে বড়ো ধোঁকাবাজ ছিলেন রেজা হক৷ আমার বাবা যে অপকর্মগুলো করেছিলেন, তার ডান হাত ছিলেন রেজা হক৷ অথচ প্রমাণ সাবমিট করেছেন তিনি প্রশাসনের কাছে শুধু জায়িন মাহতাবের। এখানে তুমি রেজা হককে কীভাবে বিচার করবে, দীধি? আই হোপ অনেস্টলি আন্সার দেবে।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০ (২)
কী আর বলি! শেষ করব বললেই কি আর শেষ করা যায়? লিখতে বসার আগে ভাবি, আজকেই সব সলিউশন দিয়ে এন্ডিং টেনে দেব এই পরিচ্ছদের৷ কিন্তু লিখতে বসে এত কথা যে কই থেকে আসে? শেষ হওয়ার বদলে বেড়েই যাচ্ছে টপিকস৷ দেখি কোথায় গিয়ে শেষ হয়! আর আপনাদের মন্তব্য কই? সবাই পড়ে পড়ে নীরবে বিদায় নেন শুধু। অথচ রোজা রেখে ক্লান্তি নিয়ে আমি এত বড়ো বড়ো পর্ব লিখে আপনাদের পড়তে দিই কত প্রত্যাশা নিয়ে।
