Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

দীধিতি জবাবে নীরবতাকেই বেছে নিলো, নাওফিলের চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে। নাওফিল বলে চলল, ‘এইচএসসি পাস করা এক এতিম ছেলে পেটের দায়ে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাসায় এসেছিল কাজের সন্ধানে৷ সে বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে মাস দুই চাকরি পেয়েছিল ছেলেটা। তারপর একদিন সেই বাড়ির ক্লাস এইটে পড়া একমাত্র মেয়ের সঙ্গে প্রেম প্রণয়ে জড়িয়ে যায়, ধরাও পড়ে যায় বাড়ির কর্তার চোখে তাড়াতাড়িই৷ পরিণামে মারধোর করে ছেলেটাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এভাবেই পথেঘাটে কয়েকদিন ঘুরে ফিরে বেড়াতে বেড়াতে এসে পড়ে সে গাজীপুরে৷ এখানে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সন্ধান পেয়ে একটা ফ্যাক্টরির গেটের সিকিউরিটিকে অনেক অনুরোধ করে সেখানে সাধারণ ওয়ার্কার হিসেবে চাকরি জুটিয়ে নেয়।

সারাদিন ফ্যাক্টরিতে কাজে থাকলেও রাতে মাথা গোঁজার ঠাই ছিল না৷ তাই এই এলাকার জামে মসজিদে এসে রাতটা পার করত সে প্রতিদিন। এমন করেই একদিন সৌভাগ্যক্রমে চোখে পড়ে যায় সে বনেদি গোষ্ঠীর বিশিষ্ট শিল্পপতি মাহতাব শেখের৷ ছেলেটাকে একদিন কাছে ডেকে তার সঙ্গে আলাপচারিতা করে জানতে পারেন তিনি, ছেলেটার দুনিয়াতে আপন বলতে কেউ-ই নেই৷ বাবা ছোটো থাকতেই মারা গেছে৷ মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড়ো করেছে তাকে৷ বছরখানিক আগে সেই মাও রোগে পড়ে মারা গেছে। তারপর থেকে গ্রামের বাড়িতে তার খাওয়া, পড়া, চলার মতো কোনো অবস্থা নেই৷ তাই ঢাকাতে কাজের সন্ধানে আসা। মাহতাব শেখ তখন চিন্তাভাবনা করে ছেলেটাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। বাড়ির বাজার-সদাই করার দায়িত্বে তাকে নিয়োগ দেন তিনি। এরপর কী ভেবে যেন তিনি ছেলেটাকে পড়াশোনা করার ব্যবস্থাটাও করে দেন। তার পড়াশোনা আর বাড়ির বাজার-সদাই করার মাঝে দিন চলতে থাকলে একদিন সে মাহতাব শেখের ছোটো পুত্রকে বাড়িতে ফিরতে দেখেন। ছোটো পুত্র জায়িন মাহতাব বাড়িতে আসতও আচমকা আর চলেও যেত কাউকে না জানিয়েই।

ছেলেটা জায়িন মাহতাবকে দূর থেকে দেখত খুব কৌতূহল চোখে৷ জায়িন মাহতাব ছিল তার বাবার অর্থাৎ মাহতাব শেখের একদম অবাধ্য ছেলে৷ অথচ তবুও ভীষণ আদরের। জায়িন মাহতাবের কার্যকলাপ, তার কথা বলার ভাবভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব, বাবার সামনে অনড় দাঁড়িয়েও মশকরার সাথে বাবার কথাকে অগ্রাহ্য করা, তার চালচলন, পোশাক-আশাক, চেহারা, সব কিছুর প্রতি সেই ছেলেটার এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করত। ভালো লাগত তার জায়িন মাহতাবকে। বলা যায় একরকম ভক্ত হয়ে গিয়েছিল সে জায়িন মাহতাবের৷ এক সময় তার অনার্স পড়া শেষ হলে মাহতাব শেখ তার ব্যবসায়ের কাজে তাকে নিতে চাইলে সে আর্জি জানায়, জায়িন মাহতাবের মতো সে গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতে চায়৷ চার বছরে জায়িন মাহতাবের কাজের সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক কিছুই বুঝে গিয়েছিল সে। ওই কাজও তাকে আকর্ষণ করত খুব। এ কথায় মাহতাব শেখ কিছু একটা ভাবেন। সে ভাবনাটা ছিল এমন, জায়িনের মতো অবাধ্য, দুষ্টু ছেলেটার ব্যাপারে চেয়েও কোনো খোঁজ রাখতে পারেন না তিনি। কোনোভাবেই তার পিছে গুপ্তচর নিয়োজিত করা যায় না। ওই এতিম ছেলেটা তার ভীষণ অনুগত।

তাই নিজের ছেলের খবরাখবর জানতে হলে ওই ছেলেটাকেই ওর পাশে রাখলে তাতে মন্দ হয় না, বরঞ্চ লাভই৷ ভেবেচিন্তে তিনি রাজি হন আর ছোটো ছেলে বাড়িতে ফিরলে তাকেও জানান তার সিদ্ধান্তের কথা৷ সেদিন বেপরোয়া, বেয়ারা জায়িন মাহতাবও কী যেন ভেবে বাবার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তবে শর্ত দেয়, নিজ যোগ্যতায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরবর্তীতে সকল ধাপে সে সহোযোগিতা করবে ছেলেটাকে। তারপর তা-ই হয়৷ ছেলেটা তার মেধা দিয়েই পরীক্ষায় পাস করে যায়। তারপর বাদ বাকি সব কিছু জায়িন মাহতাবই সামলে নেয়। সেই থেকেই সে ছেলেটা জায়িন মাহতাবের সহকারী এবং ডান হাত হিসেবে কাজ পায়। এরপর প্রমোশোন পাওয়ার জন্য আমার বাবা তাকে মাস্টার্সও পড়তে বলে৷ কিন্তু সে কোনো প্রমোশোন চায় না। তাই মাস্টার্স পড়লেও বাবার সহকারী হিসেবেই থেকে যায়। এত সুক্ষ্ম আর নিখুঁত অভিনয় দিয়ে আমার বাবার মনে বিশ্বাস আর ভালোবাসার মজবুত খুঁটি গেড়েছিল যে বাবা চাইলেও তাকে সন্দেহ করতে পারেনি। এই হলো রেজা হকের জীবনের ইতিহাস। যার স্বভাবই এমন, যে পাতে খাবে সে পাতেই হা*গবে। ধোঁকাবাজি রেজা হকের রক্তেই না কি কে জানে! নয়ত বারবারই কেন যার নুন খাবে তার সঙ্গে বেইমানি করবে? দীপ্তর সঙ্গে কেন অমন করেছি জিজ্ঞেস করলে না? এই একটা দিক থেকে রেজা হকের সঙ্গে ওর ধোঁকাবাজি মিলে গেছে। সারা জীবনের কাছের সম্পর্ককে এরা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে দু’দিন আসা সামান্য এক নারীর জন্য। অথচ এরা একজনও সেই নারীকে জীবনে পায়নি।’

একটুক্ষণ চুপ থেকে দীধিতি বলে, ‘আমিও বিশ্বাস করছি এখন, বাবা আসলেই নিকৃষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অন্যায় করে অনুতপ্ত হওয়ার পর নিজেকেও আত্মসমর্পণ করা উচিত ছিল তার। কিন্তু একটা কথা চিন্তা করো তো, নাওফিল! তিনি মানুষ হিসেবে খারাপ হলেও বাবা হিসেবে কি খারাপ ছিলেন? যেমনটা তোমার বাবাকে নিয়ে ভাবো তুমি! তোমার বাবা মানুষ হিসেবে খারাপ হলেও বাবা হিসেবে তিনি ভালো ছিলেন বলেই তো তার পাপকে তুমি ঘৃণা করলেও তাকে ঘৃণা করতে পারো না। আমিও তো তাই৷ তাহলে কী করে মেনে নেব আমার বাবার হত্যাটা? আইনের হাতে বাবা বন্দি হলেও এতটা কষ্ট লাগত না। তোমার বড়ো কাকু না হয় তাকে পুলিশের কাছেই ধরিয়ে দিতেন! আমার জন্মদাতা না হয়েও তিনি আমার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে দিতেও ভাবেননি। তাহলে তার খুনের বিচার চাওয়া কি আমার জন্য অন্যায়?’

নাওফিল গাঢ় চোখে চায় দীধিতির চোখে। এই চোখজোড়া কাল থেকেই খুব যেন টানছে। অথচ বিশেষ কোনো সৌন্দর্য নয়। এমন নীল নয়না নারী কতই তো দেখেছে সে! তবুও দীধিতির নীল নয়নজোড়ায় একটু একটু করে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে ও৷ কেবল ভালোবাসে বলেই কি? ভেবেই দীর্ঘ এক শ্বাস ছাড়ল। ভালোবাসার জন্যই তো৷ ভালো না বাসলে কি নিজের মনের সাথে দ্বন্দযুদ্ধ করে শেষমেশ বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিল?
দীধিতিকে জবাব দিলো, ‘না, মোটেও অন্যায় নয়৷ কিন্তু তার অন্যায়গুলোও সামনে আসবে যখন কোর্টে কেস উঠবে। তখন তাকে নিয়েও কিন্তু বিরোধী পক্ষের উকিল শুরু থেকে শেষ সব কিছু তুলে ধরবে। সাধারণ মানুষ জায়িন মাহতাবকে যেমন ঘৃণা করে, তাকেও করবে তখন৷ সহ্য করতে পারবে তো? এটাও কি পারবে জাকির শেখ আর তার ছোটো ভাইয়ের বিরুদ্ধে সঠিক প্রমাণ আনতে?’

ব্যাপারগুলো দীধিতিও যে ভাবেনি তা নয়৷ প্রথমত মৃত একজন মানুষকে গালমন্দের শিকার হতে হবে দেশের সকল মানুষের কাছে। এটা ভেবেই শুরুতে সংশয়ে পড়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু পাশাপাশি রেজা হক দেশের জন্য নিজের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলেছিল। ওই সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না তখন। তবুও তাকে উপরমহলের নির্দেশে নিজেকে প্রতিটিদিন বিপদের মাঝে রাখতে হয়েছে৷ জায়িন মাহতাবের মতো অত বড়ো একজন মাফিয়া গোত্রের অপরাধীকে সারা দেশের সামনে প্রমাণসহ তুলে ধরতে তাকে জীবন বাজিতে রাখতে হয়েছিল, এ কথা দেশবাসী জানে৷ তাই তার পূর্বের করা অপরাধগুলো সকলে জানলেও তারা এই মহৎ কাজের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাবে না? তাছাড়া জাকির শেখ সারা দেশের কাছে যতখানি ভালো মানুষ, আদকে কি তিনি তাই? তাকে শাস্তি দেওয়ার আসল উদ্দেশ্যেই তো রেজা হকের ওই অসম্মানটুকুও হজম করতে রাজি হয়েছে দীধিতি। জায়িন মাহতাব বেঁচে আছে কি মরে গেছে, তা জানা নেই৷ সে তার সারা জীবনের পাপের ফল ভোগ করে নিয়েছে ইতোমধ্যে। নিজের সন্তানের মুখটা অবধি দেখার সুযোগ যে বাবার মেলে না, সন্তানের কাছে আসারও উপায় নেই। এর চেয়ে বড়ো শাস্তি তার জন্য আর কী হতে পারে? কিন্তু জাকির শেখ! তিনি শুধু রেজার সঙ্গেই নয়, জাইমার সঙ্গেও যে অন্যায় করেছেন। অন্যায় করেছেন ঝুমুরকে বিধবা করে, কিরণকে পিতৃহারা করে। নাওফিলের জন্য বিশাল ক্ষমতাবান শেখ পরিবার থাকলেও কিরণ বা স্মরণের মাথার উপরের একমাত্র ছায়া তো শুধু রেজাই ছিল। তার অপরাধের শাস্তিস্বরূপ না হয় এক যুগ কারাদণ্ডই দিত! হত্যা কেন করতে হলো?

মুমূর্ষু রেজাকে মুম্বাই নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করার সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পূর্বে জাইমা জাকির শেখকে কল করেছিল সেদিন, তাকে রেজার অবস্থা জানিয়ে সাহায্যও চেয়েছিল। সেদিন জাকির শেখ বলেছিলেন, ‘ওর যা প্রাপ্য ও তাই পাচ্ছে৷ আমি ওর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করি কী করে? তুমি নিজের কথা ভাবো। নিরাপদে আছ নিরাপদেই থাকো৷ মুম্বাই ফিরে যাও এবং যেভাবে লুকিয়ে থাকতে সেভাবেই লুকিয়ে থেকো। ওর জন্য নিজের ঘাড়ে বিপদ ডেকে এনো না।’

অথচ কিছুদিন পূর্বেও এই জাকির শেখই না কত সিকিউরিটি দিয়েছিল ওদের? জাইমা কোনোভাবেই হিসেব মেলাতে পারছিল না সেদিন। হাসপাতালে থাকাকালীন রেজার ওপর আবারও আক্রমণ হয়েছিল ছদ্মবেশী নার্সের মাধ্যমে। তারপরই জাইমা কোনো কিছু না ভেবে খুব সাবধানে রেজাকে নিয়ে চলে যায় মুম্বাই৷
এর প্রায় তিন মাস পর জাইমা দেশে এসেছিল আবারও লুকিয়ে৷ জাকির শেখ কেন সেদিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন অমন কথাগুলো বলেছিলেন? এই কৈফিয়ত জানতেই সে দেখা করে তার সঙ্গে। সেদিন তিনি জাইমাকে আরও চমকে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার বা রেজার জন্য কোনো নিরাপত্তা দিইনি অতদিন। দিয়েছিলাম তোমাদের সাথে থাকা ওই বাচ্চাটার জন্য বিশেষ কারও কথামতো। কিন্তু সেই মেয়েটার দায়িত্ব এখন রেজার থেকেও ভালো কেউ কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাই আর রেজাকে নিয়ে ভাবার প্রয়োজনবোধ করিনি এবং করবও না। নিজ হাতেই খুন করতাম ওকে। কিন্তু ওর ভাগ্য ভালো ওর মৃত্যু আমার হাতে ছিল না। নয়ত কু-পিয়ে কু-পিয়ে মা-রতাম ওকে।

জাইমা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে তখন বলে ওঠে, ‘আপনার মাঝে আজ আমি ঠিক জায়িন মাহতাবকে দেখতে পাচ্ছি যেন। কিন্তু আপনি তো ওর মতো খারাপ নন, নিষ্ঠুর নন।’
-‘আমি তোমার ভাবনার থেকেও খারাপ এবং নিষ্ঠুর। নয়ত কি নিজের জানের ছোটো ভাইয়ের সাথেও নিষ্ঠুরতা করতে পারি? আমার মাঝে তুমি জায়িনকে নয়, জায়িনের মাঝে তুমি আমাকে খুঁজে পাবে। কারণ, ওর বড়ো ভাই আমি৷ আমার এই হাতে ওকে গড়েছি, বুঝেছ? তুমিও আরেক নিমকহারাম। কথায় আছে না মানিকে মানিক চেনে? তুমি আর রেজা তারই প্রমাণ। যে জায়িন তোমাকে নিরাপদ জীবনের ব্যবস্থা করে দিলো সেই মানুষের বিরুদ্ধে নেমেছ সো কলড হাজবেন্ডের জন্য! বিয়ের পর ওই হাজবেন্ড কই ছিল? এসেছিল খোঁজ নিতে? গোল্লায় যাক সেসব কথা! মরার আগে তোমাকে রেজা বলে যায়নি তোমার জন্য বাংলাদেশ নিষিদ্ধ? তারপরও কোন সাহসে তুমি এসেছ?’

মাথা নত করে সেসব কথা শুনে অসহায় দৃষ্টি মেলে জিজ্ঞেস করে তারপর, ‘কেন আমার জন্য এই দেশ নিষিদ্ধ? আমাকে মুম্বাই পাঠানোর পেছনে আপনিই বাধ্য করেননি তো রেজাকে?’
-‘হ্যাঁ, আমিই বাধ্য করেছি। কারণ, ওই যে যার সহায়তা নিয়ে এই দেশে স্বচ্ছল জীবন ভোগ করছিলে, তার সাথেই ধোঁকাবাজি করেছ! তাহলে কী করে তুমি আশা করো সেই সুখী, সুন্দর, নিরাপদ জীবন তোমাকে উপভোগ করতে দেব আমি? বিদায় হও আমার সামনে থেকে! নিজে জীবিত থাকতে চাইলে আর কক্ষনও এই দেশে পা দেবে না! নয়ত ওই মেয়েকে আমি তুলে দেব তাদের হাতে, যারা ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

জাকিরের করা সেই দিনের ব্যবহারের কথা জাইমা
দীধিতিকে জানিয়ে বলেছে, এই লোকটার জন্যই তার সংসার হয়নি, রেজাকে পাওয়া হয়নি, সন্তান হিসেবে ওকেও পাওয়া হয়নি।
তবে রেজা বেঁচে থাকাকালীন দীধিতির জন্যই যে তিনি নিরাপত্তা দিয়েছেন, এ কথা সাবধানে ওর থেকে লুকিয়ে গেছে জাইমা। জাকির শেখের প্রতি রাগ আর ক্ষোভটা একটুখানি নয় তার। একটা সাজানো গোছানো সুন্দর জীবন ফেলে তাকে মুম্বাই ফিরে এসেও আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। তার বিশ্বাস, জাকির শেখও একজন অসৎ মানুষ নিজের ছোটো ভাইয়ের মতোই। দীধিতি ওই ব্যক্তির সকল অপকর্মের প্রমাণ খুঁজে তা তার হাতে তুলে দিলেই সে জাকির শেখের ধ্বংস বয়ে আনবে। এবং পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য এটাই। এরপর দীধিতির জন্ম পরিচয় জানা।

-‘কথা বলো, দীধি। আমাকে জবাব দাও। আর স্বীকারোক্তি যখন দিলেই তখন পুরোটা দাও। তুমি যে তোমার স্বীকারোক্তিতে বহু ফাঁক রেখে গেছ তা কিন্তু যে কেউ শুনলেই বুঝে যাবে৷’
নিঃশব্দে দীধিতি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। নাওফিলের কোনো কথার জবাবই সে দিতে পারবে না আপাতত। ওর মনে হচ্ছে কেন যেন, ও যেমন নাওফিলকে পরিপূর্ণ সত্য বলেনি তেমন জাইমাও হয়ত বলেনি ওকে। কোনো না কোনো ফাঁক থেকে গেছে তার কথাতেও। তাই আগে ওকে সেই ফাঁকটা কোথায় থেকে গেছে তা জানতে হবে জাইমার কাছ থেকে। তাই বুঝে সেও সিদ্ধান্ত নেবে।
নাওফিল আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করল ওকে, ‘আর সেদিনের কিডন্যাপিং, তোমার রেপ, মিহাদের হাত ধরে সেদিনই বিয়ে করতে চলে যাওয়া, এর মাঝেও একটা গল্প আছে কি? কেননা তোমার সঙ্গে খুবই অন্যায় কিছু হয়েছিল সেদিন, তার রেশটা ঠিক খুঁজে পাওয়া যায়নি তোমার মাঝে। এটা কীভাবে সম্ভব? শুনতে খুব লজ্জাজনক হলেও আমি কিন্তু গতকাল রাতে টের পেয়েছি তুমি কুমারীই ছিলে। তবে কি তুমি মিথ্যা বলেছ এই নিয়ে?’

ধক্ করে উঠল দীধিতির বুকের মাঝে৷ এই নাটকীয় অধ্যায়ের কথাটা তো ভুলেই গিয়েছিল সে! নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে ফেলার মতো নিকৃষ্ট অভিনয় করতে হয়েছে, মিথ্যা বলতে হয়েছে। যেটা কোনো সুস্থ মানসিকতার মেয়ে কখনই করতে চাইবে না৷ অথচ সে সবটাই বুঝেশুনে করেছে। সেদিন তো ভাবেনি, আজ নাওফিলের স্ত্রীর পরিচয়ে থাকবে সে, এই মিথ্যার জবাবদিহি করতে কবে।
ভীতসন্ত্রস্ত, অপরাধী মুখ করে নাওফিলের দিকে তাকাল ও। নাওফিলও চেয়ে আছে। অপেক্ষারত সে উত্তরের জন্য। চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ঠোঁটের একপাশ কামড়ে কতক্ষণ মৌন রইল দীধিতি। তারপর জানাল, ‘ওই ঘটনা তাওসিফকে বিয়ে করার একটা সাজানো পরিকল্পনা মাত্র। তোমার বাড়িতে প্রবেশের জন্য এই মিথ্যে নাটকটা করতে হয়েছিল আমাকে। তাছাড়া আর কোনো উপায় পাচ্ছিলাম না।’
-‘তারপর কিডন্যাপারগুলোকে পালিয়েও যেতে বলেছিলে পুলিশ আসার আগেই।’
নাওফিল স্বাভাবিক সুরে বললেও প্রচণ্ড লজ্জাবোধ করছে দীধিতি। হঠাৎ ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল নাওফিল, একটু সময় ওর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ‘ক’জন পুরুষের কাছে রেপ হওয়ার কষ্টটা কেমন, উপলব্ধিটা কেমন, জানা আছে তোমার? এমন নৃশংস অভিজ্ঞত থাকা কোনো মেয়ের থেকে সেই অভিজ্ঞতার গল্প শুনেছ কখনও, দীধি?’

নিরুত্তর দীধিতি। এর জবাবে মাথাটা ঝুঁকিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছু করার নেই ওর। লজ্জা, অপরাধবোধে গলা ঠেলে কান্না আসছে। এই ভুল কাজটার জন্য হয়ত সব সময় ওকে নত হয়ে থাকতে হবে নাওফিলের কাছে।
-‘আমি সেদিন উপস্থিত না থাকলেও মিহাদ জানিয়েছিল সেদিন তোমাকে কেমন লাগছিল দেখতে৷ খুব পারফেক্ট ছিল বিধ্বস্ত চেহারার মেকআপটা। তোমার আত্মচিৎকার শুনে, তোমাকে দেখে মিহাদ তো ভেবেই নিয়েছিল সবটা সত্য। ও খুব নরম মনের ছেলে তো। তাই ভেবে নিয়েছিল তোমার ভাড়া করা লোকগুলো সুযোগের সৎ ব্যবহার করে গেছে তোমার সাথে। আচ্ছা যদি সত্যিই এমনটা হত, দীধি? কী হত তাহলে?’
-‘আ’ম স্যরি! খুব খারাপ কাজ করেছি। এটা করা উচিত হয়নি আমার। সেদিন ঠিক মনে হলেও আজ মনে হচ্ছে…!’

ওর কান্না জড়ানো কথাগুলো সম্পূর্ণ করতে দিলো না নাওফিল, বলে উঠল, ‘প্রতিটি মানুষকেই তার প্রত্যেকটি কাজের ফল ভোগ করতেই হবে। তুমিও করবে, দীধি। অতিশীঘ্রই। আমি ছেলে হলেও ওই কষ্টের যে উপলব্ধিটা করতে পেরেছি, তা তুমি মেয়ে হয়ে আরও বেশি করবে আশা রাখি৷ কিন্তু ভয় নেই, সেদিন তোমার কষ্ট অর্ধেক ভাগ করে নেব আমি।’
কষ্ট কি ভাগ করে নেওয়া যায়? এমন কথা কেন বলছে নাওফিল? শেষ কথাটা শুনে ভেজা, লাল চোখে দীধিতি জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে৷ কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসটা আর পায় না।
-‘তোমার স্বভাবটা ঠিক আমার দাদীর মতো। যে কেউ তাকে খুব সহজেই ম্যানিপুলেট করতে পারে৷ আরও একটা তিক্ত সত্য হলো, তোমার মাইন্ডটাকে চট করেই একটা ক্রিমিনাল মাইন্ডে গড়ে তোলা সম্ভব।’
-‘কী বলছ তুমি? এটা তুমি কোন যুক্তিতে বললে?’ রেগে উঠল দীধিতি। অনেকটা কষ্টও পেল ওকে নিয়ে নাওফিলের এমন চিন্তাধারায়।

-‘সেটার প্রমাণ তুমিই দিয়েছ, দীধি। মিহাদকে কিডন্যাপ, ওকে ট্র্যাপে ফেলে বিয়ের চিন্তা, বিয়ে করে উদ্দেশ্য হাসিল শেষে আবার ডিভোর্স দিয়ে দেওয়ার চিন্তা। আরও কিছু ব্যাপার আছে। বিষয়গুলো পরিকল্পনা করা আর সেই মোতাবেক কাজও করা, এটা তোমার জায়গায় ঐশী, তন্বী বা তামান্না হলে কিন্তু পারত না। কারণ, ওদের মাঝে জেনে-বুঝে অপরাধ করার প্রবণতা নেই। যেটা তোমার মাঝে আছে। তুমি কি জানো, দীধি আমি তোমার প্রতি অত্যধিক অসন্তুষ্ট আর রাগান্বিতও?’
সিক্ত চোখদুটোই এবার বিস্ময় যুক্ত হলো দীধিতির। কই? গতকাল থেকে এখন অবধি তো একটুও মনে হয়নি নাওফিলের কোনো কথা বা কাজে! নাওফিলের চোখে চায়তেই সে চোখে এখনও কোনো রাগের আভাস পেল না। শান্ত দীঘির মতোই শীতল সেই চোখজোড়া। নাওফিলকে তবে একচুলও চেনে না ও, বোঝে না এই পুরুষের সাধারণ কথার গভীর অর্থ।

-‘তুমি আমাকে নিয়ে গেম প্ল্যানিং করেছ প্রতিদিন। তা আমি টেরও পেয়ে গেছি৷ এটা তোমাকে ভাবায়নি কেন, দীধি? তোমার তো সেটা বুঝে ফেলা উচিত ছিল পিকনিকের সেই রাতেই।’
দীধিতিকে হতবুদ্ধি হতে দেখা গেল। তাওসিফকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ও এত বেশিই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল যে, নাওফিলের কথাগুলো নিয়ে অত বেশি ভাবার কথা মনেই আসেনি।
-‘নিজেকে ধর্ষিতা বানানো, আমার ভাইকে ইউজ করে বিয়ে নিয়ে খেলা, এই দুটো কারণে তোমাকে অনেক কিছু সাফার করতে হত। যদি না আজ তুমি আমার স্ত্রী হতে।’
-‘আ’ম রিগ্রেটফুল, নাওফিল!’ আর্দ্র গলায় বলে দীধিতি।
-‘সেটা তখন মেনে নেব যখন তুমি সবটা স্বীকার করবে আমার কাছে।’
কথাটা বলেই বাথরুমের দিকে এগোলো নাওফিল৷ বাথরুমে ঢুকে পড়ার পূর্বে আবার কিছু মনে পড়তেই দাঁড়িয়ে গেল, ‘তুমি যেন কী জবের কথা বলছিলে? বাইরে কোথাও জবের ট্রাই করার প্রয়োজন নেই। আব্বুর অফিসেই জয়েন কোরো। আমার বদলে অন্তত তার পুত্রবধূ করলেই তিনি হ্যাপি হবেন।’

-‘আমি নিজ যোগ্যতায় জব ট্রাই করব।’
-‘ওকে, আমিও সেটাই চাই। প্রথমে সেটা আমার আব্বুর অফিসেই হোক। আমাদের কম্পানি তো আর ছোটোখাটো নয় যে তোমার যোগ্যতা অনুযায়ী হবে না।’
দীধিতি তখন চট করেই বলে দিলো, ‘আমার ফার্স্ট টার্গেট ডিটেক্টিভ গ্রুপে যুক্ত হওয়া।’
চকিতেই কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল নাওফিলের। দীধিতির নির্মল, স্নিগ্ধ মুখটাই চেয়ে ভাবল সে, জাইমার কথায় কি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চাইছে দীধিতি? জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘আর এমন লক্ষ্য কবে থেকে হলো তোমার?’

-‘যেদিন থেকে জানলাম আমার বাবার চাওয়া ছিল এটাই।’
-‘যে জানাল সে নিজের চাওয়া তোমার বাবার নামে চালিয়ে দিলো না তো?’
-‘এমন করে কেন বলছ তুমি? আম্মুও সেদিন বললেন বাবা চাইতেন আমি বা কিরণের মাঝে যে কোনো একজন যেন তার মতো হই৷ কিরণকে আম্মু ডাক্তারি পড়াতে চান৷ তাই আমিই বাবার চাওয়া পূরণ করতে চাই।’
-‘কিন্তু আমি চাই না।’ কঠিন গলায় জানিয়ে দিলো নাওফিল।
দীধিতি আজ বারবার চমকে যাচ্ছে নাওফিলের সকল অভিব্যক্তিতে, ‘তুমি কি এমন স্বামী, নাওফিল? যে নিজের মতামত, চাওয়া স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেয়?’
-‘কখনই না। আমি সেটাই চাই যেটা আমার স্ত্রীর জন্য ভালো, আমার জন্য ভালো। আর একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে স্বামীর সেই চাওয়াকে অবশ্যই তোমার গুরুত্ব দিতে হবে।’
-‘শুনেছি তুমি না কি রাজনীতিতে যুক্ত হবে। কিন্তু আমার রাজনীতি পছন্দ নয়৷’
-‘অথচ তুমি জেনেশুনেই রাজনৈতিক পরিবারে বউ হয়ে এসেছ। তাহলে তোমার উচিত ছিল বিয়েটা না করা।’

-‘আমার ধারণা তুমিও বিয়ের আগেই জানতে আমার এই লক্ষ্যের কথা। তাহলে তুমিও জেনেশুনেই বিয়েটা করেছ, নাওফিল। তোমার পেশা যদি আমি গ্রহণ করি, তবে আমার চাওয়া তুমি কেন মানবে না?’ দৃঢ়ভাবে বলে উঠল দীধিতিও।
-‘অনেক কারণ আছে৷ তার মধ্যে একটা কারণই বলি৷ আমার দাদা, আব্বু তোমার ওই চাওয়াকে ঘেন্না করবে।’
-‘তারা আমাকে গ্রহণই করেননি৷ আমার চাওয়াকে মূল্যায়ন করবেন, তা আমি আশাও করি না৷ আমি সংসার করব তোমার সঙ্গে। তাই তোমার মূল্যায়ন করাটাই বেশি জরুরি এখানে।’
নাওফিল স্পষ্ট বুঝতে পারছে দীধিতির কথাতে, চাহনিতে কঠিন জেদ। এই জেদই যদি অটুট থাকে, তবে খুব বেশিদিন হবে না ওদের এক সাথে থাকা।

-‘আমার থেকেও যদি তোমার এই চাওয়া বড়ো হয়, তাহলে করতে পারো তোমার চাওয়া পূরণ।’
এরপর আর দাঁড়াল না সে জবাবের প্রতীক্ষায়৷ বাথরুমে ঢুকে পড়তেই দীধিতি ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বসে পড়ল বিছানাতে। ভাগ্য যখন ওদের দুজনকে এক করেছে, তখন কোনো কিছুর বিনিময়ে ও চায় না নাওফিলকে হারাতে। অপরদিকে রেজা হক মানুষটি নাওফিলের কাছে খারাপ, বেইমান হলেও ওর কাছে একমাত্র ওই মানুষটিই প্রিয় আপন। যার অসিলাতে আজও ও শ্বাস নিচ্ছে, ভালোভাবে বেঁচে আছে৷ এবং ওর জন্যই সেই মানুষটিকে দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়েছে৷ নাওফিলের আগে এই মানুষটিকে ও ভালোবেসেছে। তুলনা না করা গেলেও পরিমাপ করা যায়, নাওফিলের থেকেও ওই বাবা লোকটিকে বেশি ভালোবাসে ও। তাই তার ইচ্ছাটাকে ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? ভুলতে পারবে ও?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১

নাওফিল দীধিতির রসায়ন ছাড়া নীরস অথচ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের সমাপ্তি এখানেই টানলাম।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here