আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
মেঘে মেঘে তুমুল সংঘর্ষে যেন খণ্ড বিখণ্ড হয়ে আকাশ ভেঙে জমিনে পড়তে চাইছে। অবিরত বর্ষণ আর ঘনঘন বিদ্যুতের ঝলকানি, চলছে আজ গোটা দিন ধরে৷ এই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করেই নাওফিল দীধিতিকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে। বিয়ের পর দিনই নাওফিলের পুরো ফ্ল্যাটটা নতুন নতুন আসবাবে সাজিয়ে দিয়েছে তাওসিফ আর ইয়াসিফ। আজ নব দম্পতির পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছিল সারা ঘর৷ পুরো অ্যাপার্টমেন্টের সকল ভাড়াটিয়া আর নাওফিল দীধিতির বন্ধু-বান্ধব মিলেই কত মানুষের সমাগম ছিল সে ঘরে! তবে ওদের দুজনের ফিরতে ফিরতেই রাত হয়ে গিয়েছিল সাড়ে দশটা৷ ঘণ্টা দুই সবাইকে নিয়ে খাওয়া-আড্ডা চলে এরপর৷ তবে আগামীকাল থেকে সবারই অফিস আদালাত আছে বলে খুব বেশি দেরি করা সম্ভব হয়নি।
রুমান আর ঐশী ওদের ফ্ল্যাটটা আবারও ফিরে পাওয়ায় আজ আর শিহাব তন্বীকে ছুট দিতে দেয়নি৷ নাওফিল দীধিতির সঙ্গে রুমান, সবুজ, রাতুল, তুষার, তামান্না আর ঐশী ওদের দুজনেরও বাসর ঘর সাজিয়ে দিয়েছে তাই। সাড়ে বারোটা বাজতেই ওরা সবাই নাওফিল দীধিতিকে একলা ছেড়ে চলে যায় রুমানের ফ্ল্যাটে।
এসেছে পর থেকে দীধিতি খুব ভাবুক হয়ে পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। নাওফিল ওর আগের ফ্ল্যাট পরিবর্তন করে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট নিলো কেন হঠাৎ? এটাই ওর ভাবনার কারণ। কেননা বিয়ের পর থেকে যতটুকু দেখেছে সে নাওফিলকে, তাতে এটা স্পষ্ট ওর কাছে যে নাওফিল যদি হঠাৎ করে বাগানের মাঝে সামান্য একটা ফুল গাছ লাগায়, তবে সেই ফুল গাছ লাগানোর উদ্দেশ্য কেবল ওই ফুল নয়৷ তার চেয়েও বড়ো কোনো হেতু থাকে তার পিছে।
সেদিনের পর আজ পুরো এক সপ্তাহ ওদের দুজনের মাঝে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে৷ তাছাড়া শেখ ভিলা থেকে এই এক সপ্তাহের মাঝে একটি মানুষও ওদের দুজনের কাছে আসেনি, কল করেও কথা বলেনি৷ এ নিয়ে নাওফিলের মন মেজাজ খুবই বিষণ্ন৷ উপরন্তু দীধিতিও দোটানায় ভুগছে বলে স্বাভাবিক হতে পারছে না ওর সাথে৷ সব মিলিয়ে নাওফিল কিছুটা মানসিক অবসাদ নিয়েই ঘুরছে ফিরছে এ ক’টা দিন।
বিছানাতে বসে এসব ভাবনার মাঝে কতক্ষণ সময় অতিক্রম করে যাচ্ছে দীধিতি, সেদিকে খেয়াল নেই তার।বালুকা ঘিয়ে রঙা দেওয়ালে ফটো ফ্রেমের ঘড়িতে তখন রাত বারোটা ছেচল্লিশ বাজে। নাওফিল বাথরুমে গোসল নিলো দশ মিনিট যাবৎ। বেরিয়ে এসেই যখন দেখল চিন্তাগ্রস্ত দীধিতিকে, অবিলম্বে বলে উঠল ভার গলায়, ‘ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন নেই?’
একটু চমকিত হলো তখন দীধিতি৷ হঠাৎ করে আজ প্রথম নাওফিলকে কোমরে তোয়ালে পেচিয়ে থাকতে দেখে খানিকটা আড়ষ্ট হলো৷ দীর্ঘ উচ্চতার টগবগে এই আপন পুরুষকে এত কাছাকাছি আলগা দেহে দেখাটা স্বাভাবিক কোনো ঘটনার মতোই৷ কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতটা স্মরণে আসে নাওফিলকে খোলা দেহে দেখলেই৷ তার জন্যই একটু লাজুক ভাব চলে আসে মনে।
জবাব না দিয়ে দ্রুত কাপড় হাতে নিয়ে সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল৷ নাওফিল বলতে চাইল ওকে ‘টাওয়ালটা নিয়ে যাও।’ কিন্তু এত তাড়া নিয়ে ঢুকল সে, যেন লম্বা সিরিয়াল থেকে মাত্রই সুযোগ পেল গোসলের৷ কিঞ্চিৎ হতবুদ্ধি অবস্থায় তাকিয়ে থাকে নাওফিল তখন ওর যাওয়ার পানে। তারপর কী ভেবে যেন ঠোঁট এক কোনে নিয়ে একটু হেসে কেবিনেট থেকে জামা কাপড় বের করায় ব্যস্ত হয়।
রাতের বেলা হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় নাওফিলের ক্ষুধা লেগে। তাই ঘরে ছোট্ট ফ্রিজ রাখার ব্যবস্থা ছিল ওর সকল বাড়ির শোবার ঘরেই। কিন্তু দীধিতির থেকে যেদিন জানল শোবার ঘরটা একদম ছিমছাম পছন্দ ওর, তারপরই এ বাসার সমস্ত ডেকোরেশন ওর মনমতোই সাজাতে বলে দিয়েছিল। তবে আজ রাতের খাবার খেতে খেতে দেরি হয়েছে বিধায় রাতে দ্বিতীয়বার ক্ষুধা লাগার সম্ভাবনা নেই বোধ হয়৷ তবুও এখন ঠান্ডা কিছু খাওয়ার প্রত্যাশা হলো নাওফিলের। তোয়ালে ছেড়ে রাতের পোশাক পরে নিয়ে নিচে চলে আসে সে তখনই৷ রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ থেকে একটা ক্যান হাতে নিয়ে নিচের সকল বাতি নিভিয়ে সিঁড়িতে উঠতেই আচমকা মেঝেতে ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ পেল৷ অনেকটা পাথর বা ইট পড়ার শব্দের মতো। নাওফিল সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপে সবে। আর আওয়াজটা ওর থেকে মাত্র দুই হাত দূরে হয়েছে।
চট করেই ও পেছনে ঘুরতে গিয়েও ঘুরল না কিছু একটা ভেবে। স্বাভাবিকভাবেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে থাকল আবার। তখনই স্পষ্ট শুনতে পেল বিড়ালের ডাক, একবারই৷ অথচ এই সারা অ্যাপার্টমেন্টের কোথাও ইঁদুর, বিড়াল, কোনো কিছুর অস্তিত্বও পাওয়া যাবে না৷ শরীরটা হঠাৎ করেই ভার ভার লাগতে থাকল তখন নাওফিলের। তবুও পিছু ফিরে দেখার জরুরি বোধ করল না৷ নির্লিপ্ত হয়ে হেঁটে উপরে আসতেই ঘর থেকে দীধিতির চিৎকার ছুটে এলো কানে৷ এবার আর দেরি করল না নাওফিল৷ দৌঁড়ে ঘরে আসতেই শুনল বাথরুমের ওপাশ থেকে দীধিতি বলছে, ‘তুমি কি ঘুমিয়ে গেছ, নাওফিল? বুঝলাম না, আমার ডাক কি তুমি শুনতে পাচ্ছ না?’
-‘নিচে গিয়েছিলাম। কেন কী হয়েছে?’ গাম্ভীর্য নিয়ে বলল নাওফিল।
-‘আমি টাওয়াল রেখে চলে এসেছি৷ বাথরুমেও কোনো টাওয়াল নেই। একটু দাও।’
-‘তো দরজাটা তো খুলতে হবে? না কি ভূতের মতো দরজার ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়ে দেব?’
দীধিতি টের পেল নাওফিলের কণ্ঠে গম্ভীরতা৷ গত ক’দিন ধরেই এমন চলছে। কিন্তু এই দূরত্ব ওর মোটেও ভালো লাগছে না৷ একটু আগেও বন্ধু, পড়শীদের সাথে কত খোশগল্প, হাসাহাসি, রসিকতা করল ছেলেটা! অথচ ওর সাথে এই শীতলতা। দরজাটা ফাঁক করলে নাওফিল তোয়ালেটা নিয়ে এগিয়ে দিলো ওকে৷ একটু দুষ্টুমি করার চিন্তা করেছিল এই তোয়ালে দেওয়ার সময়। কিন্তু একটু আগের ঘটনাটা মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। যদিও এই ব্যাপারগুলো নতুন ঘটনি নাওফিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা বেশ ক’মাস আগের কথা। দীধিতির সাথে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটাতেই শেষবার ঘটেছিল এমন কিছু। হঠাৎ করে আবার কেন ঘটছে? দীধিতিকেও এখন বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে মনে হচ্ছে।
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গুটি কয়েক ঝলমল তারার আকাশটা দেখছে নাওফিল নির্নিমিখ। ভাবছে সেই সাথে জীবনের সকল সমস্যার কথা৷ সেই শৈশব থেকেই জীবনটা ওর কত জটিলতায় ভরপুর! সেসবের শেষ কোথায়, তা অজানা। তবে এত সমস্যার মাঝেও একটা স্বস্তির জায়গা তো মিলেছে! সেটা হচ্ছে দীধিতি। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরলেই প্রাণপ্রিয়াকে বুকে তো নেওয়া যাবে, পাশেও পাবে সর্বক্ষণ৷ এবং বিশ্বাস সর্ব পরিস্থিতিতেও। কিন্তু কখনও ব্যক্ত করা হয়নি তাকে সে কতখানি ভালোবাসে, কতখানি আপন ভাবে! কবে প্রকাশ করতে পারবে তাও অজানা। সবটাই যে নির্ভর করছে দীধিতির ওপরই।
ভেজা চুল হেয়ার ড্রায়ারে শুকিয়ে নিতে গিয়েও দীধিতি নাওফিলকে এক ঝলক দেখে শুকাল না৷ সেটা ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো। নাইটির রোবটাও খুলে রেখে দিয়ে তোয়ালে নিয়ে চুল মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াল নাওফিলের পাশে। আকাশ পানের দৃষ্টি হটিয়ে নাওফিল তখন নির্বিকারভাবে পাশে তাকাল। কিন্তু অপ্রত্যাশিত সুন্দরতায় চোখ আটকে গেল দীধিতির পানে। কামনার আগুন জ্বলে উঠল আটদিনের দহিতার খোলা বক্ষ বিভাজন, সুন্দর স্কন্ধ আর লতার মতো কোমল বাহু দেখে। দীধিতির চোখে তাকাল এরপর। সেও ওর মতো মেঘ সরে যাওয়া আকাশটা দেখছে চোখ পিটপিট করে।
আমুদে গলায় বলল তখন, ‘আজও ডিনারে কি এক্সাইটেন্টস ছিল? চোখে পড়ল না তো।’
বক্র চোখে তাকাল দীধিতি ভ্রু’কুটি করে, ‘থাকলেই আমি খেতাম?’
-‘তাহলে হিসেব তো মিলছে না।’
-‘হিসেব, বেহিসেবের কী আছে? তুমি ঘুমানোর পোশাক পরোনি? আমিও পরেছি! সিম্পল ফ্যাক্ট।’
-‘ওয়েদার ডিমান্ড, বুঝলাম।’
-‘হতেই পারে। কিন্তু আমি কোনো ডিমান্ড বুঝে পরিনি। কমফোর্টের প্রয়োজনবোধ করেছি, ব্যাস।’
বিজ্ঞের মতো অভিব্যক্তিতে মাথা নাড়াল নাওফিল, ‘ও আচ্ছা। বুঝলাম।’ তারপরই শুধাল, ‘ঘুমাবে না? রাত অনেক কিন্তু।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩১
-‘হ্যাঁ, চলো তাহলে।’
-‘তুমি কি আমাকে ডাকতে এসেছ তাহলে?’ বুঝেও হঠাৎ কৌতুক করে বলল ও।
দীধিতিও বুঝল ওর ঠাট্টা, তাই জবাবও দিলো সেরকমই, ‘কী আর করব! আপাতত দ্বিতীয় স্বামী তো নেই।’
-‘আহা তাই তো! আমারও আপাতত দ্বিতীয় বউ নেই। কার জন্যই বা দাঁড়িয়ে থাকব? চলো তাহলে!’
