আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৮ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
স্থির চোখে মারিহাম ইয়াসিফের মলিন মুখপানে তাকিয়ে রইল, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে৷ একাকী ভাবার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ার কথা ভেবে পা বাড়াতেই সহসা ওর হাতের কব্জি চেপে ধরে বাধ সাধল ইয়াসিফ, ‘গোটা পনেরোটা দিন তুমি নির্দয়ের মতো আমাকে টর্চার করে গেছ৷ আমি সবটা ভুলে তোমাকে হেল্প করতে চাইছি মানে তোমার বোঝা উচিত, নিশ্চয়ই বিশেষ কারণ আছে বলেই আমি তোমাকে হেল্প করব বলছি।’
-‘তাহলে তুমি কেন বারবার ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসতে ইন্টারোগেটের সময়?’ চকিতেই কঠোর গলায় শুধাল মারিহাম।
-‘যাতে তুমি অধৈর্য হয়ে জেরার মাঝেই একটুখানি হলেও বলে উঠতে আমাকে আসলে কেন ভিক্টিম ভাবছ!’
ইয়াসিফও অবিলম্বে জবাব দিলো।
উত্তরটা বিশ্বাসযোগ্য লাগল ওর। ছোটোবেলা থেকেই এডওয়ার্ডের সঙ্গ পেয়ে বড়ো হওয়ায় ক্রিমিনালদের ইনটারোগেট করা, তাদের সাইকোলজি বোঝা, আরও অনেক কিছুতেই ধারণা অর্জন করেছে সে। আলিয়া আর এডওয়ার্ড এক সঙ্গে থাকাকালীন এডওয়ার্ড ব্যক্তিটি আপন কন্যার মতোই ওকে আগলেছে, সব কিছুতে ওর অবলম্বন হয়েছে। তাই তো মারিহাম যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হতেই এডওয়ার্ডের পেশাকেই গ্রহণ করেছিল সে। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনায় সিটি অফ লন্ডন পুলিশ অফিসার পদটি ত্যাগ করে আজ বাংলাদেশের মাটিতে সে মায়ের খোঁজে।
কব্জিতে চেপে ধরা ইয়াসিফের হাতটা সরিয়ে মারিহাম নীরবে ইয়াসিফের কাছে বসল৷ ইয়াসিফ নিজেও উঠে বসার চেষ্টা করল তখন। শরীরের হাড়েহাড়ে ব্যথা তার! মারিহামের প্রতিটা মারের কৌশলই ছিল এমন যে, ব্যথা হজম করা মুশকিল হবে… ঘুমিয়েও সে ব্যথার অনুভব ভুলতে পারবে না৷ ইয়াসিফ সত্যিই অবাক হয়। না, নিজের দুর্দশা দেখে নয়৷ অবাক হয় সে মারিহামের মারের কৌশল আর জেরা করার ধরন দেখে।
-‘শুয়ে থাকো। আগামী সাতদিন প্রপার ট্রিটমেন্ট পেলেই সুস্থ হয়ে যাবে।’ ভরাট কন্ঠ মারিহামের৷ তাই উপদেশটা খুব গম্ভীর শোনাল।
ইয়াসিফ তবুও চেষ্টা করে উঠে বসল। তখনই মেরুদণ্ড আর কোমরে বিষের মতো ব্যথা অনুভব করতেই চেহারা বিকৃতি হয়ে উঠল তার। মারিহাম তা জানত বলেই ব্যতি-ব্যস্ত হলো না। বালিশটা বিছানার হেডবোর্ড স্ল্যাটে ঠেকিয়ে দিয়ে ইয়াসিফকে আধশোয়া করে বসিয়ে দিলো আর হাঁটুর নিচে আরেকটা বালিশ রেখে দিলো তার।
-‘থ্যাঙ্কস। আমি সত্যিই জানি না তোমার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে আমাকে কেন দোষী ভাবছ তুমি। শেখ পরিবারই বা কীভাবে জড়িত, সেটাও বুঝতে পারছি না।’
ইয়াসিফ যদিও অনুমান করছে আলিয়া নাওফিলের জন্যই শেখ বাড়ি এসেছিল হয়তো।
চুপচাপ কিছুক্ষণ ভেবে মারিহাম শেখ বাড়ির গেটে থাকা সেই সিকিউরিটি গার্ডের কাছে পাওয়া আলিয়ার ফোনের বিষয়টা জানাল আর এই ফোন খোলা ছিল বলেই তা ট্রেস করে সে শেখ বাড়ি অবধি পৌঁছতে পেরেছে।
ইয়াসিফ নিজেও এবার ভাবনার অথই সমুদ্রে ডুবল। তা ওর চোখের তারায় আর কুঞ্চিত কপালের রেখাতেই ফুটে উঠল। সে মুহূর্তে মারিহামও চেয়ে থাকল তার দিকে। জহুরি চোখে ইয়াসিফের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ করে কিছুটা এই উপলব্ধি হলো ওর– ইয়াসিফ আলিয়া সম্পর্কিত ঘটনার সঙ্গে সত্যিই হয়তো জড়িত নয়।
মুখ খুলল ইয়াসিফ, ‘আমি প্রায় এক বছর যাবৎ আমার স্পোর্টস কার ব্যবহার করি। পুরোনো কারটা এখন আমার বাসার নারী সদস্যদের জন্যই থাকে। আর এখানেই মিলাতে পারছি না ব্যাপারটা৷ আচ্ছা তুমি কি বলতে পারবে তোমার মমকে কত তারিখে দেখা গেছিল ওখানে? এক্সাক্ট তারিখটা না বলতে পারলেও আগে পিছের তারিখটা?’
মারিহাম জিজ্ঞেস করেছিল সিকিউরিটি গার্ডকে তারিখটা। সে জানিয়েছিল ১৩ই আগস্ট। সেটাই জানাল ইয়াসিফকে। ইয়াসিফ জিজ্ঞেস করল করল সেদিন কী বার ছিল। ফোন থেকে বারটা খোঁজ করে মারিহাম তাকে জানালে ইয়াসিফ ভাবতে বসল, তিন মাস আগের ওই দিনে নাওফিল, তাওসিফ, কেউই গাজীপুর ছিল না। সে নিজে রাঙামাটি আর তাওসিফ তো দেশের বাইরে। তার বাবা জাহিদ শেখ আর বড়ো কাকু জাকিরও তখন উত্তরা নিজেদের অফিসে ওইদিন। শনিবার ছিল সেদিনটা। মাহতাব শেখের তো সে সময়ে বাসায় থাকার কথায় না । তাহলে কি ফোনে থেকেই এই তিনজনের কেউ আলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল? কেন তাকে আটকে ফেলল তারা? কথাটা ঠিক তারা নয়, যে কোনো একজন ব্যক্তি আলিয়া মামলাটি হ্যান্ডেল করেছে৷ সেই একজনটা কে সেটা জানার জন্য গাজীপুরই যেতে হবে ওকে।
আকস্মিকভাবে ইয়াসিফ জখম হওয়া নিজের ডান হাতটাতে মারিহামের কোলের ওপর রাখা ওর হাতদুটো আঁকড়ে ধরল নরম করে, ‘আমি তোমাকে এখন যাব বলব তা কি তুমি বিশ্বাস করবে?’ নিবিড়ভাবে তাকিয়ে ইয়াসিফ।
মারিহাম সন্দিগ্ধ চোখে চায় তখন, ‘কী বলবে তুমি?’
-‘আমাকে বিশ্বাস করতে হবে সেটা কিন্তু বারবার বলছি তোমাকে। তার আগে আমাকে একটা কথা জানাও, তোমার সঠিক বয়সটা। স্যরি এটা জানতে চাওয়া ম্যানারসের মাঝে পড়ে না। কিন্তু আমার জানাটা অপরিহার্য।’
মারিহামের এবার সন্দেহ হচ্ছে। এই শেখ পরিবারেই ওর রক্তের রেখার হদিস রয়েছে কি? ভাবতেই ভাবতেই জানিয়ে দিলো, ‘টুয়েন্টি ফোর প্লাস।’
-‘মিথ্যা বলছ না তো?’ সন্দেহ, দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।
মারিহামের ভার মুখটা সে প্রশ্নে আরও গম্ভীর হলো, ‘বয়স নিয়ে ন্যাকামি করার মতো মেয়ে নই আমি।’
ঝট করে তখনই ওর হাতটা ছেড়ে দিলো ইয়াসিফ। যে মায়া আর টান নিয়ে মারিহামের হাতটা ধরেছিল সে, তা হলো নিজের রক্তের আপন কেউ ভেবে। কিন্তু সেই টানটা আদৌ সত্য না কি মিথ্যা তা ভেবেই এখন বিভ্রান্ত হচ্ছে ইয়াসিফ। নাওফিলের জমজ বোনের নামও মারিহাম ছিল। সে হিসেবে তো তাহলে আটাশ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা মারিহামের। কিন্তু পাশের এই মেয়েটির ছিপছিপে শরীর আর মুখের আদলেই মনে হচ্ছে বিশ বা বাইশ বছরের সে। এজন্যই প্রশ্নটা করল ইয়াসিফ৷ সেখানে মারিহামের চব্বিশ প্লাস স্বীকারোক্তি দেওয়াটা মিথ্যা হওয়ার কথা না আসলেই। এদিকে যে কারণে মারিহামকে চেনা চেনা লাগছিল তার কারণটাও খুঁজে পেয়েছে সে৷ আয়মান মেহরিনকে ছবিতে সে দেখেছে সেই কলেজ জীবনে। কিংবা তারও আগে হবে হয়তো৷ সেই মানুষটির মুখাবয়ব স্মৃতির পাতায় কিছুটা ঝাপসায় বলা যায়৷ তবুও যতটা মনে আছে তাতেই মারিহামের মুখের আদলের সঙ্গে আয়মানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় অনেকখানি। ওদিকে নাওফিল বাবা-মা সম্মিলিত হয়েও তার মাঝেও এতটা সেই সাদৃশ্য নেই। মাথার ভেতর এলোমেলো লাগছে ইয়াসিফের৷ হঠকারীর মতো মারিহামকে অনুরোধ করে বসল, ‘টেরোরিস্ট আয়মান মেহরিন লিখে একবার গুগল করবে প্লিজ?’
-‘কেন? তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না। একবার বয়স জিজ্ঞেস করছ, আবার টেরোরিস্টকে দেখতে চাইছ। গেম খেলছ আমার সঙ্গে?’ সীমাহীন বিরক্ত আর অধৈর্য ঝরে পড়ল মারিহামের কথায়।
-‘কী বলব! আমার নিজের ব্রেইনই আমার সঙ্গে গেম খেলছে মনে হয়। পাজলস তো মেলে না!’ বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল ইয়াসিফ। মারিহাম শুধু কঠিন চোখে তার ঠোঁটদুটোই নড়তে দেখল। তা খেয়াল করে ইয়াসিফ জানাল, ‘আমাকে এভাবে জিম্মি করে রেখে তুমি তোমার মমকে পাবে না, মারিহাম। তার সঙ্গে মূলত কী হয়েছে তা জানতে হলে আমাকে ছাড়তেই হবে তোমাকে৷’
-‘আচ্ছা? তারপর পনেরোদিনের শোধ তুলতে আর দেরি করবে না, তাই তো?’ বিদ্রুপ গলায় বলল মারিহাম।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইয়াসিফ হতাশাগ্রস্ত হয়ে। ‘দেশি হোক আর বিদেশি! নারী জাত বুঝবেই কয়েক লাইন বেশি আর বেশি।’ মাথা দুলাতে দুলাতে মৃদুস্বরে স্বগতোক্তি করে ওঠে সে।
কথাটা কিন্তু ঠিকই কানে পৌঁছল মারিহামের, ‘তো কত লাইন কম বুঝতে হবে, বলো শুনি?’
নাহ, যতক্ষণ না ইয়াসিফ নিশ্চিত হতে পারছে নাওফিলের বোনই মারিহাম। ততক্ষণ সে এ ব্যাপারে কিছুই জানাবে না ওকে।
-‘শেখ পরিবারের কাছে আমি কেন প্রেশিয়াস, বলো তো? তুমি অনেক কিছুই জানো আমি বুঝতে পারছি৷ সব খুলে বলো আমাকে এখনই।’
-‘সেটা আসলে তোমার মমকে খুঁজে পাওয়ার পর বলতে পারব। কারণ, আমি নিজেও কনফিউজড।’
-‘তোমার পরিবারের সঙ্গে আমার কোনো কানেকশন আছে?’
-‘ডাউট করছি তেমনই৷ কিন্তু সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হলে তোমার মমকে প্রয়োজন। তুমি কি তার ছবি দেখাবে আমাকে?’
মারিহাম না করল না৷ ফোন থেকে আলিয়ার ছবিটা বের করে ইয়াসিফকে দেখালে ইয়াসিফ আরও বেশি বিভ্রান্তে পড়ল। আয়মান আর আলিয়া জমজ বোন। অথচ আয়মানের মুখের আদলের সঙ্গে এই আলিয়ার কোনো মিলই পাচ্ছে না সে। জহুরি চোখে এবার ইয়াসিফ মারিহামকে লক্ষ করতে থাকল৷ এদিকে তো ঠিকই এই মেয়েটার সঙ্গে আয়মান মেহরিনের সাদৃশ্য পুরো স্পষ্ট। কিন্তু সে আবার নাওফিলের জমজ নয়৷ সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই কেমন ধাঁধার মতো হয়ে যাচ্ছে।
থমথমে মুখ করে খাবার টেবিলে বসে আছে নাওফিল অনেকক্ষণ ধরেই। কিন্তু একটা খাবারও সে মুখে তুলছে না। কিরণ তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে৷ প্রতি বেলাতেই খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব আজ-কাল তাকেই নিতে হয়।
গত সাতদিন ধরে এ বাড়িতে বিশেষ একটা পরিবর্তন ঘটেছে। দীধিতি প্রতিদিন যতটা সুস্থ হচ্ছে, ততটাই সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠছে কেন যেন। তবে সেটা কিরণ বা তাওসিফের সঙ্গে নয়। কেবল নাওফিলের সাথে৷ যে রাতে ওরা দু ভাই রুফটপে অনেকটা সময় কাটাল, ঠিক সে রাত থেকেই দীধিতি কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে নাওফিলকে৷ কথা বললেও সে কথাতে নাওফিলের জন্য বিরক্ত স্পষ্ট৷ যেন নাওফিলের সঙ্গে মাত্র চার মাসের সংসারেই সে বড্ড অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একদিন, দুদিন করে গোটা সাতদিন যাবৎ এমনটা চলতে থাকলে শান্ত ধারার নাওফিল আজ প্রচণ্ড রুষ্ট। এমন কেন করছে দীধিতি? তা নানাভাবে জিজ্ঞেস করেও নির্দিষ্ট কোনো জবাব পায়নি সে তার থেকে। আরও বলা যায় দীধিতি ওর প্রতি বিরক্তভাব বেশিই প্রকাশ করেছে তাতে। তার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে এ ক’দিন নাওফিল তা মেনে নিয়ে মুখ বুজে ধৈর্য ধরে থাকলেও আজ ওর ধৈর্যচ্যুত হলো। আজকে অফিসে জরুরি মিটিং। উপস্থিত থাকতে হবে সবাইকে। তাওসিফ তাই নাশতা সেড়েই নাওফিল দীধিতির নখরা দেখার অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেছে, জিদ করে বসে থাকা নাওফিলকে খাবার টেবিলে ফেলেই।
-‘ভাইয়া, আপনার তো অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনের মতো খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন প্লিজ৷’ মিনমিনে সুরে বলল কিরণ।
-‘তুমি ঘরে গিয়ে পড়তে বসো, কিরণ। সামনে এক্সাম। এসব ফালতু ব্যাপার নিয়ে মাথাব্যথা দেখাবে না৷’ প্রচণ্ড কঠিন গলায় বলল নাওফিল। সে তীক্ষ্ণ চোখে সিঁড়ির পানে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরেই৷ দীধিতিকে ডেকে পাঠানো হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু অবাধ্য দীধিতি সে ডাক তোয়াক্কাও করেনি। এদিকে আজ সে নিচে এসে নাওফিলকে খাবার বেড়ে না দেওয়া অবধি আর নাওফিলের পাশে বসে নাশতা না করা অবধি নাওফিল এভাবেই বসে থাকবে বলে পণ করেছে।
নাওফিলের এমন কঠোরতার মুখোমুখি কিরণ দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেলো না আর। উপরে এসে দীধিতির ঘরে ঢুকে দেখল, ফোনে কিছু একটা করছে দীধিতি বসে বসে।
-‘আপু?’
-‘কী হয়েছে? নাশতা করেছিস?’ ফোনে মগ্ন থেকেই বলল দীধিতি।
-‘তোকে কতবার ডাকছে ভাইয়া! আজকে জরুরি মিটিং অফিসে৷ কিন্তু তোর বাড়াবাড়ির কারণে সে না খেয়েই বসে আছে। এমন অবাধ্য আচরণকে বেয়াদবি বলে, আপু।’
নাওফিল এখনও যায়নি শুনেই দীধিতি চমকাল। ফোনটা বিছানাতে রেখে কিরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করল অবাক গলায়, ‘ও যায়নি?’
-‘নিচে গিয়েই দ্যাখ। আমার মনে হচ্ছে তোর জন্য আজকে খুব বড়ো একটা ঝামেলা হবে বাসায়।’
কোনো জবাব দিলো না দীধিতি। ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো দ্রুত৷ সিঁড়ির কাছে আসতেই নাওফিলের শীতল, দৃঢ় চাউনির মুখোমুখি হলো সে। সাদা শার্টের হাতাটা এলোমেলোভাবে গুটিয়ে রাখা ওর, টাইটা রাগের চোটে হয়তো টানাটানি করেছিল। তাই সেটা এখন ঝুলে আছে ঢিলা হয়ে। হাতের পিঠে থুঁতনি ঠেকিয়ে শক্ত চোয়াল করে বসে সে স্থির চেয়েই আছে সিঁড়ির দিকে। তা দেখে ভেতরে ভেতরে দীধিতির কিছুটা ভয় হলেও চেহারাতে গত ক’দিনের অকারণ গম্ভীরতা তবু সরল না তার। নাওফিলের পাশে এসে বসল অনায়াসেই। নীরবে নাওফিলের প্লেটে খাবার তুলে নিজের প্লেটেও খাবার বেড়ে নিলো। কিন্তু কোনা চোখে দেখতে পাচ্ছে সে, একইভাবেই নাওফিল চেয়ে আছে তার দিকে। তাই ধীরস্বরে বলল, ‘খেতে আরম্ভ করো। দেরি হয়ে যাচ্ছে তো অফিসের।’ বলে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো ওকে। খাবার মুখে দেওয়ার পূর্বে পানি পান করা নাওফিলের রোজকার অভ্যাস।
কিন্তু কিরণের কথায় অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। কাচের গ্লাসটা হাতে নিয়েই নাওফিল অকস্মাৎ আছড়ে ফেলল মেঝেতে। ঝনঝন বিকট আওয়াজে কিরণ আঁতকে উঠে ছুটে এলো ঘর থেকে। সিঁড়ি থেকে নামার সাহস হলো না যদিও।
দীধিতির আত্মাটাও যেন ভয়ে তটস্থ হলো। খাবার প্লেটে নির্নিমেষ চেয়ে থাকল, ভুলেও নাওফিলের চোখে তাকাবার সাহস হলো না। তখনই বজ্রকণ্ঠে কিরণকে আদেশ করল নাওফিল, ‘কিরণ, কোচিং-এ বেরিয়ে আজ লাঞ্চটা বাইরে থেকে করে নিয়ো। মিহাদের ড্রাইভার চলে আসবে দুপুরে৷ ওর সঙ্গেই যাবে তুমি। রান্নার কাজের জন্য আমি রুনাকে না পাঠানো পর্যন্ত আজ যেন বাসায় কোনো রান্নাবান্না না হয় বলে দিচ্ছি!’
দীধিতির দিকে ফিরে না চেয়েই স্যুট হাতে নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল নাওফিল। কিরণ বোনের কাছে এসে রাগ গলায় বলে উঠল তখন, ‘না খেয়ে গেল ভাইয়া আজ তোর জন্য। তুই এমন কেন করছিস বল তো? যেটা প্রবলেম সেটা নিয়ে ডিসকাস করলেই তো সলিউশন পাওয়া যায়। তুই খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেছিস এ ক’দিন। কী হয়েছে তোর?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৮
খাবার প্লেট থেকে হাতটা তুলে নিয়ে দীধিতি নীরবেই উঠে পড়ল। বলতে পারল না বোনকে, জাকির শেখ প্রতিটা দিন একটু একটু করে নাওফিলকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে তার থেকে। রোজ নাওফিলের এই অফিস যাতায়াত, ওকে দিয়ে পার্টি অফিস সামলানো, এসব কিছুই তার থেকে নাওফিলকে ছিনিয়ে নেওয়ার সূচনা। এবং নিখুঁত পরিকল্পনা জাকির শেখের। যেটা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে ওরা গাজীপুর গেলেই। এগুলো কি নাওফিলকে বললে নাওফিল বুঝবে? বিশ্বাস করবে তাকে? নিশ্চয় না। করলে কি আর বাবার এক কথায় নিজের চাকরি ছেড়ে বাবার অফিসে ঢুকে পড়ত? না রাজনীতিতে জড়াত?
