Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি

জাকির সাহেবের গর্জনে দু ভাই নীরব বনে চোখে চোখেই ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ ছোটাল। ইয়াসিফ আর দাঁড়াল না তারপর। কেবিন থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে যেতেই জাকির সাহেব ছেলের ওপর চড়াও হলেন, ‘নিজেকে সংযত কর, বলছি! বাপ, দাদার মতো নৃশংস হোস না। মানুষ মরে গিয়েও বেঁচে থাকে তখনই, যখন অন্য মানুষের মুখে তাকে নিয়ে স্তুতিবাণী শোনা যায়। এমন কিছু না হতে পারলেও অন্তত খারাপও হোস না।’

জবাবের বদলে থমথমে মুখে চুপটি করে বসে রইল নাওফিল। জাকির সাহেব কতক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ছেলের সুন্দর মুখপানে, যেখানে সদ্য বেশ কিছু কাটাছেঁড়া তৈরি হয়েছে। যা দেখতে একদমই ভালো লাগছে না তার। শেষবার দেখা জায়িনের সেই হিংস্র মুখটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে তাকে। যেদিন চার বছরের ছেলেকে চুরি করতে এসে পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল জায়িনকে। সে সময় জাকির সাহেব দেখেছিলেন, পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর তার ছোটো ভাইটার মুখে ছোটো-ছোটো এমনই বহু কাটাছেঁড়ার দাগ। যা ছিল তার নৃশংসতার চিহ্ন। তাছাড়া সেও যে ছিল বক্সিং চ্যাম্পিয়ন৷ নাওফিল নিজের বাবার আর কোনো বৈশিষ্ট্য অর্জন না করলেও এই গুণটি কবে আর কীভাবে যেন নিজের মাঝে আয়ত্ত করে নিয়েছিল ভার্সিটির সময়কাল থেকেই। তাকে জানতেও দেয়নি কখনও। কারণ, তিনি জানলে ছেলেকে এই শখ পূরণ থেকেও দূরে রাখার চেষ্টা করতেন কিনা! জায়িনের কোনো দোষ, গুনই তিনি দেখতে চান না নাওফিলের মাঝে। কিন্তু গত চার বছরে জায়িনের সুন্দর মুখের আড়ালে থাকা বিধ্বংসী সেই রূপটা যেন হঠাৎ হঠাৎই দেখতে পান তিনি ওর মধ্যে। কখনও জায়িনের মতোই শীতল মেজাজী, কূটকৌশলী। আবার সহসা আহত বাঘের মতো গর্জেও উঠতে দেখেন ওকে। যেমনটা ছেলেকে বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় চাপা ক্রোধ আর যন্ত্রণায় হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল জায়িনও।

আচ্ছা, এমনই এক যন্ত্রণা আর রাগ কি বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছে না নাওফিলও? প্রশ্নটা আপনা থেকেই জাকিরের ঠোঁটে এসেও তা উচ্চারণের পূর্বে দমিয়ে নিলেন তিনি৷ ছেলেটার না পাওয়ার জীবনে পরম পাওয়া ছিল ওই মেয়েটি। যে ছিল দুঃসাহসী, প্রতিবাদী অথচ বোকা। যাকে নিজের বোকামির খেসারত দিতে হলো চিরতরে ওর জীবন থেকে বিদায় নিয়ে। শেখ পরিবারের মানুষগুলোর অতীত কেন এত দীর্ঘশ্বাসের হয়? কেন সে অতীতে এক চিলতে সুখের রেশ নেই তাদের?
খিচুড়ির প্লেটটা সেন্টারটেবিল থেকে তুলে ছেলের কাছে এসে বসলেন জাকির। লোকমা তৈরি করতে করতে নাওফিলকে জানালেন, ‘সারা রাত নিজের ডিউটি করে সকালে বাড়ি গিয়ে রেস্ট না নিয়ে আগে তোর কাছে এসেছিল ও নাশতা নিয়ে৷’
কথাটা শুনেও কোনো ভাবান্তর ঘটল না নাওফিলের৷ আগের মতোই পাথর মুখ করে রইল। তা দেখে জাকির সাহেব বললেন, ‘নিজেদের মাঝে শত্রুতা করা চরম বোকামি, জাদ। তাতে বাইরের শত্রুরা খুব সহজেই ভেতরে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।’

-‘আপনি কীভাবে আশা করেন আমাদের মধ্যে আগের সেই মধুর সম্পর্ক থাকবে? মাহতাব শেখের বিশাল এক প্রোপার্টির মালিক যবে থেকে হয়েছি, তবে থেকেই কি এই শত্রুতা বাড়ায়নি আপনার মেজো ভাইয়ের পরিবার?
প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে জাকির সাহেব লোকমা তুলে ধরলেন ওর মুখের সামনে৷ বিনা সঙ্কোচেই তা মুখে পুরল নাওফিল। তখন বললেন জাকির, ‘তোরও উচিত হয়নি ওদের দুই ভাইকে বঞ্চিত করার।’
-‘বঞ্চিত করেছি?’ ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকাল নাওফিল, ‘আমার প্রাপ্য যতটুকু, আমি কি সেটাই বুঝে নিইনি? ওদের বাপ একটা আর আমার বাপ দুইটা৷ আমি আমার দুজন বাপের সম্পর্দের অংশীদার, তাই না? স্বাভাবিকভাবেই সেটা ওদের দুজনের তুলনায় বেশি৷ তাহলে কীভাবে বঞ্চিত করলাম?’
থমকে গেলেন জাকির সাহেব, নাওফিলের অনড় দৃষ্টিতে চোখ রেখে৷ দুজনের মাঝে নীরবতাটুকু কাটতে সময় লাগল কিছুটা। আচমকা পরিবর্তন হওয়া বিমূঢ় অভিব্যক্তি সামলে নিয়ে তিনি পুনরায় নাওফিলের মুখে গ্রাস তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘আমার কেবল মায়ের সম্পদের অংশ ছাড়া আর কোনো সম্পদ প্রাপ্য নেই, জাদ। তুই যেটা তোর দাদার কাছ থেকে আদায় করেছিস, তা আমি অন্যায় বলব।’

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে অদ্ভুত এক শব্দ করল নাওফিল মুখের ভেতর৷ জাকির সাহেবের কথাটার কোনো মূল্যায়ন করছে না সে, সেটাই যেন বোঝাল। তাকে বলল, ‘শেখ বংশের প্রথম উত্তরাধিকার আপনি। তারপর আসবে জাহিদ আর জায়িন শেখের কথা। আপনি আপনার প্রাপ্য এতটাকাল ছেড়ে দিয়ে এসেছেন, সেটা আপনার উদারতা। আমিও আপনার মতোই উদার হতাম, যদি না আমার জীবনের মোড় বদলাত। মাহতাব শেখের কাছ থেকে আপনি যতখানি বঞ্চিত হয়েছেন, আমি নাওফিল শেখ তার চেয়েও বেশি আদায় করে নেব।’
-‘তোকে আমি অন্যায় করতে শিখাইনি, জাদ।’ এ পর্যায়ে কঠোর স্বরে বলে উঠলেন জাকির, ‘তুই স্মরণকে নিজের ওই বারোতলা অ্যাপার্টমেন্ট লিখে দিয়েছিস। তা নিয়ে আমি কোনো সাউন্ড করিনি, তোর দাদাকেও করতে দিইনি৷ কিন্তু যা কিছু সমান ভোগের অধিকার মিহাদ, নিহাদ, ওদের আছে। তা তুই একা ভোগ করতে পারিস না। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হোস না কিন্তু।’
গ্লাস ভেঙে ফেলায় পানির জগে সরাসরি ঠোঁট বাঁধিয়ে চুমুক দিলো নাওফিল। গলা ভিজিয়ে নিয়ে তারপর রয়েসয়ে একই উত্তর দিলো সে, ‘আমার অধিকার যতটুকু, আমি ততটুকু আদায় করবই। তাছাড়া শেখ বাড়ির প্রতি কোনো দাবি তো আমি করছি না৷ আমার মায়ের বাংলো বাড়িতেই আমি কাটাব আমার শেষ দিনগুলো। আমার দাবি থাকবে ওই বাড়ি বাদেই।’

ছেলের জেদি সুর জাকির সাহেবকে প্রচণ্ড চিন্তিত করে তুলল। ইতোমধ্যে ইয়াসিফদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে গেছে। যাওবা চেষ্টা করছেন তিনি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার। কিন্তু নাওফিলের কর্মকাণ্ডে একদিন সত্যিই হয়তোবা পুনর্বার খুনোখুনি বেঁধে যাবে ভাইয়ে ভাইয়ে। তাতে তো এলোমেলো হয়ে থাকা ছেলেটার এই জীবন আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে যে নিজের কাছেও তিনি চরমভাবে হেরে যাবেন। বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা করলেন তিনি যে ছেলেকে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার জন্য, নিজের গোটা জীবনের সুখকেও বিসর্জন দিলেন। সেই ছেলের এমন বিগড়ানো পরিণতি ঘটলে পরকালে স্নেহের ছোটো ভাইয়ের কাছেই বা কী জবাব দেবেন তিনি? আর কত কঠিন হবেন তিনি ওর সঙ্গে? কঠিন হতে হতে আজ বহু দূরত্ব তাদের মাঝে৷ তারপরও কি পারলেন তিনি নাওফিলকে ভালো রাখতে?

নাওফিলও বোধ হয় বুঝল, জাকির সাহেবের স্তব্ধীভূত মুখখানি দেখে তার মনের অবস্থাটা। কিন্তু তাতে সে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র টলল না৷ বলল তাকে, ‘আপনি ফ্যামিলি বিজনেসের টেনশন রেখে দলের প্রতি কনসেনট্রেট করুন তো। আর রাত হলে আরামের ঘুম দেবেন। এত ভাবতে কে বলছে আপনাকে?’
-‘ভাবনা ছাড়া রেখেছিস কবে আমাকে?’ ধমকে উঠলেন জাকির৷ খাবারের প্লেট নামিয়ে রেখে চড়া কণ্ঠেই বললেন, ‘ইচ্ছাকৃত নিজের ওপর অ্যাটাক এনেছিস সেদিন। ইচ্ছাকৃত সেদিন রাতে পুলিশ প্রোটেকশন না নিয়ে একা গিয়েছিলি গ্রামের ওদিকে৷ তুই জানতি কেবল মাত্র ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরে তোকে সুযোগ পেলেই যখন তখন কিডন্যাপের চেষ্টা করবে একটা দল৷ তারপরও বিপদ ডেকে আনলি কীজন্য, ভেবেছিস তা কি আমি বুঝিনি? স্মরণকে টেনে নিয়ে আসার পরিকল্পনায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা কত বড়ো নির্বোধের মতো কাজ, তা নিশ্চয়ই বুঝেছিস?’ আহত পা’কে ইশারা করলেন শেষ কথায়। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘ওকে আর নিজের সাথে না জড়ানোর পরামর্শ দেব, যদি ওর ভালো চাস। ভাবিস না, দাদার বিশাল সম্পদের বিশাল এক অংশ পেয়ে গিয়েছিস বলে তার মতের ওপর দিয়ে চলতে পারবি। মিহাদ আর নিহাদ তার সঙ্গে গোঁয়ার্তুমি করার ফল পেয়েছে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েই। আদরের নাতি ওরাও৷ তাও তোদের দাদা ছাড় দেয়নি৷ সে কোনোদিনই কাউকে ছাড় দেয় না৷ কথাটা মনে রাখিস।’

-‘চার বছর আগের হিসাব আলাদা, মন্ত্রী সাহেব।’ সাবলীল কণ্ঠেই বলতে থাকল নাওফিল, ‘তখন আমি ক্ষমতাহীন, অর্থহীন, বুদ্ধিহীন, উপায়হীন ছিলাম৷ চিনতে পারিনি সবার প্রকৃত রূপ৷ যেদিন থেকে চিনেছি, সেদিন থেকেই ধীরে ধীরে আখের গোছাতে শুর করেছি আগে। তারপর নিজেও পালটেছি৷ ওই ভয় এখন আর আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই।’
স্ব স্ব স্থানে দুজন থমকানো মুখে বসে রইল৷ একই বিষয়বস্তুকে ঘিরেই যে তারা ভাবনাগ্রস্ত, তা দুজনই জানে৷ একটা সময় পর জাকির সাহেব ঠান্ডা স্বরে বললেন, ‘স্মরণকে ওর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। ওখানেই ভালো থাকত ও।’
-‘চেয়েছিলাম তো। কিন্তু পারিনি। নিজের মায়ের পরিচয়টুকুই যেখানে আর জানতে চাইল না, সেখানে কীভাবে পাঠাতাম?’
-‘মিস জেরিনকেও জানাতে পারতি।’

-‘যাতে তার কাছেও ঘৃণিত হই?’ যন্ত্রণাদগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্নটা করল যেন নাওফিল। ওর চোখে চাইলেন তখন জাকির সাহেব। মায়ায় পরিপূর্ণ চোখদুটোই কত কিছু হারানোর কান্না ছেলেটার! কিন্তু আজ অবধি ওকে কাঁদতে দেখলেন না তিনি। তাছাড়া সত্যিই তো! জেরিন যখন জানবেন দীধিতির কথা, তখন তো সবটাই জানবেন তিনি। শেখ পরিবারের মানুষগুলো কীভাবে তার সন্তানকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল একটা সময়৷ যে নাওফিলকে নিজ সন্তানই ভাবেন জেরিন, সেই নাওফিল তার মেয়ের থেকে সংসার সুখ কেড়ে নিয়েছে৷ এ কি তিনি সহ্য করতে পারবেন? না-কি তার চোখে ঘৃণা জন্মালে নাওফিলই তা সহ্য করতে পারবে? ও-ই বা আর কত আপনজনকে হারাবে? তার চেয়ে বরং দীধিতি যেদিন মায়ের কথা জানতে চাইবে, সেদিনই না হয় জেরিনও জানবেন মেয়ের কথা।
নাওফিলের মুখটা দেখতে দেখতেই জাকির সাহেবের মাঝে আচমকা কী একটা ভাবনা উদয় হলো যেন। আর তা দীধিতিকে কেন্দ্র করেই। জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘যদি স্মরণ তোর দাদা-দাদির সামনে পড়ে, তখন কি সামলাতে পারবি তাদের? সেদিনের মতো স্মরণকে টেনেহিঁচড়ে যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয় তারা, এবার ঠেকাতে পারবি?’

লম্বা মুখটার টানটান চোয়াল নাওফিলের শক্ত হয়ে উঠল অতীতের দিনটির কথা মানসপটে আসতেই। ‘হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতোই পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছিল সেদিন আমাকে। আজ আমি অনায়াসেই পারি যে কাউকে নিমেষেই নিজের পাতা জালে প্যাঁচাতে। তার প্রমাণ কি পাননি, মাহতাব শেখের সম্পত্তি বাগিয়ে নেওয়ার কৌশল দেখে?’
-‘মুভ অন করতে পারিস না, জাদ?’ হঠাৎ ভীষণ কোমল গলায় বলে উঠলেন জাকির, ‘ওকে ভুলে পরিবারের পছন্দসই কারও সাথে সুখে জীবনটা কাটা, বাপ।’ এমন আদর সুরে শেষ কবে কথা বলেছিলেন তিনি? তা নিজেও মনে করতে পারলেন না। ছেলের কথাবার্তা, ভাবনাচিন্তা দেখে তিনি ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপদের আভাস পাচ্ছেন যে!
নাওফিল অবশ্য এতক্ষণে মুচকি হাসল, জাকির সাহেবের কথার ভঙ্গিমা বদলে যেতে দেখে। আর সে হাসি দেখেই বুঝলেন জাকির, ছেলেটা সেই স্কুল পড়ুয়া কিশোর নেই আর। যে তার সব শাসন, বারণ মুখ বুজে মেনে নিতো অনায়াসেই। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, ‘আমি ওকে গ্রহণ করতে পারিনি পুত্রবধূ হিসেবে– এ কথা ভুল। আমি শুধু চেয়েছিলাম ও ওর গোপন অভিসন্ধি ছুড়ে ফেলে নির্ঝঞ্ঝাট একটা সংসার দিক তোকে। তাই নানাভাবে ওকে সাবধান করতাম। কিন্তু…! তুই কী ঘটাতে চাইছিস, জাদ? সত্যি করে বল।’ শেষে শক্ত গলায় আদেশ দিলেন ছেলেকে।

-‘আসল প্রশ্নটা এতক্ষণে করলেন?’
-‘ভণিতা না করে বল।’
-‘আপনাদের কাদের সিদ্দিকীর ছেলেটার নাম যেন কী?’
-‘তার নাম জেনে তোর কী কাজ?’
-‘ভয় নেই, তার সাথে গোলমাল করতে যাব না।’
-‘গোলমাল করতে যাব না মানে কী? গোলমালের কথা আসছে কেন?’ ছেলের মতিগতি আন্দাজ করতে পারছেন তিনি কিছুটা। কারণ ‘গোলমাল’ শব্দটা উচ্চারণ করেছে মানেই গোলমাল বাঁধানোর পরিকল্পনা চলছে ছেলের মগজে।
-‘ওর নামটা কী বলো আগে?’
-‘রাফি।’
-‘ও কী করে? আমার মতো বড়ো বিজনেস সামলায়? না-কি নেতা বনে গেছে? ওর এত সিকিউরিটি লাগে কীসের?’
-‘সেটা ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার। তোর কোন পাকাধানে মই দিয়েছে ও?’
-‘স্মরণকে নিজের সিকিউরিটির দায়িত্বে নিচ্ছে, শুনলাম। ওর থেকেও বেশি সিকিউরিটি কি আমার দরকার না?’
মনে মনে একচোট হেসে নিলেন জাকির সাহেব। তবে তিনিও সংবাদটায় খুশি হলেন না৷ হয়ত বাইরের মানুষ সেভাবে দীধিতিকে চেনে না নাওফিলের প্রাক্তন স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু ছিল তো একটা সময় শেখ বাড়ির বউ। আর শেখ বাড়ির বউ কিনা অন্য মন্ত্রীর ছেলেপেলের নিরপত্তার দায়িত্বে চাকরি করবে?

-‘তো এখন কি তার জন্য রাফিকে থ্রেট করবি? তুই কি গুণ্ডা মস্তান?’
বিরক্ত চোখে তাকাল নাওফিল তার দিকে। ‘আপনি বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি৷ তারপরও হেঁয়ালি করছেন কেন?’
-‘আমি তোর অন্তর্যামী না।’ গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন তিনি। তখন আবারও সে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে রইল জাকির সাহেবের দিকে। তারপর বলল, ‘ওকে যদি সরকার ভি আই পি’দের নিরাপত্তার দায়িত্বেই নিযুক্ত করে, সেই ভি আই পি হব কেবল আমি৷ আপনাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে, ও জয়েন করার পূর্বেই।’

-‘তারপর তোর দাদা জানালে কী হবে?’
-‘যা আমি হওয়াব, তাই হবে৷ আপনাকে আজ এই কথাটা ক্লিয়ার করছি৷ সেদিন আপনারা চেয়েছেন বলে ওকে ছাড়িনি। আমি চেয়েছি ওর সঙ্গে বিচ্ছেদটা হোক, তাই হয়েছে৷ ক্ষমতা, অর্থ আর সুযোগ সেদিন আমার ছিল না বলে সব কিছু মুখ বুজে দেখে গিয়েছি। আর অপেক্ষা করে গিয়েছি এই সব কিছুই অর্জন করার।’
কোনো জবাব দিলেন না আর জাকির সাহেব৷ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন আর বললেন ওকে, ‘রেডি হ। বের হব কিছুক্ষণের মাঝেই।’
-‘আমার জবাব পাইনি কিন্তু।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৭

ব্লেজার স্যুটের পকেট থেকে টিস্যু বের করে তিনি চশমা মোছায় মনোযোগ দিলেন নির্বিকারভাবে৷ নাওফিলও ধৈর্য নিয়ে চেয়ে থাকল তার দিকে, জবাবের আশায়। বেশ সময় নিয়ে জাকির চশমা মুছে চোখে পরলেন৷ তারপর জবাব দিলেন ছেলেকে, ‘বড়ো কোনো ঝামেলার পূর্বাভাস পেলে আমি কিন্তু এক মুহূর্ত দেরি করব না স্মরণকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিতে। কোনোভাবেই আর ওর সাথে যোগাযোগ করতে দেব না তোকে। কথাটা মাথায় থাকে যেন।’ বলা শেষেই গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি কেবিন থেকে।
আর নাওফিল তার যাত্রাপথে চেয়ে হাসল একটু। স্বগোতক্তি করল বিড়বিড়িয়ে, ‘আমি কি আপনার আর আপনার ছোটো ভাইয়েরই ছেলে নই, আব্বু? যারা স্ত্রীকে ভালোবেসেই সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়েছিল ফেলেছিল এক সময়!’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here