আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি
পায়ের যন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করে মধ্যরাতে সারা কেবিন জুড়ে ভূতের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে নাওফিল। আজ ঘুমের ওষুধটা নেওয়া হয়নি বলে এক বিন্দু ঘুম নেই চোখের পাতায়। না, ইনসমনিয়ায় ভুগছে না সে। রাতের ঘুমটুকু জোর করে হলেও ধরে রাখা প্রয়োজন তার। তার জন্য প্রতিরাতে ঘুমের ওষুধের শরণাপন্ন হতেও দু’বার ভাবেনি৷ পরিপূর্ণ ঘুম না হলে নিজেকে সুস্থ আর শক্ত রাখা যে কঠিন হয়ে পড়বে।
ফোনটা আচমকা বিপ্ বিপ্ আওয়াজ তুলে হাতের মুঠোয় কেঁপে উঠল৷ কাঙ্ক্ষিত নাম্বার থেকে কলটা এসেছে। পেছন ফিরে সোফায় বসে পড়েই ঘুমিয়ে থাকা সেবিকাকে দেখে একবার ভাবল, মস্ত এক ধমকে ঘুম ভাঙিয়ে তাড়িয়ে দেবে কেবিন থেকে। কিন্তু কোনো এক কারণবশত সেবিকার প্রতি দয়া দেখাল৷ ফোনটা কানে ঠেকাল চুপচাপ। ওপাশের কথাগুলো কেবল শুনতে থাকল আর মৃদু কণ্ঠে ‘হুঁ, হুঁ’ বলে উত্তর দিয়ে গেল। কথার শেষ পর্যায়ে ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটি বলল, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ছেলেটার সিকিউরিটির দায়িত্বে ওকেও নিয়োগ দেওয়ার কথাবার্তা চলছে।’
এবার মুখ না খুলে থাকতে পারল না নাওফিল৷ জিজ্ঞেস করল, ‘গতকালের ঘটনার পর আজ কী প্রতিক্রিয়া দেখলে ওর মাঝে?’
-‘নিরুদ্বেগ। যেন ওর কিছু যায় আসে না তোমার ওরকম দু’চারটা ভিডিয়োতে।’
-‘আচ্ছা।’ মুচকি হাসল নাওফিল। তারপর একটুক্ষণ নীরব থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে ও রাঙামাটি থেকে ফিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বডিগার্ডের চাকরি নেবে? চার বছর ধরে এত পরিশ্রম করল মানুষের বডিগার্ড হওয়ার জন্য?’
-‘আহা বডিগার্ড কেন বলছ? ও কিন্তু রাঙামাটিতে ওর ডিউটি পালন করছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এমন আদেশ কেন এসেছে বুঝতে পারছ না? মন্ত্রীর ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়েছে ওই রাঙামাটি থেকেই। আর চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারি তোমার প্রাক্তনকে দেখে ব্যাটার হৃদয় ঝলসে গেছে। দেশের মাটিতে ওরকম একটা বিদেশী রূপসী! তাও আবার অফিসার বেশে। তুমি নিজেই ওকে দেখলে কুপোকাত হয়ে পড়বে, ব্রাদার। আর আফসোস করবে আরও বেশি, ওকে হারিয়ে ফেলার জন্য।’
-‘আমি কি জেনে-বুঝেই ওকে হারালাম না, ব্রাদার?’ ঝিমিয়ে আসা বিষণ্ন গলায় কথাটা বলে উঠল নাওফিল। যা শুনে ফোনের ওপাশের পুরুষটি নিজেকে নিজেই দুটো থাপ্পড় কষে দিলো গালের মধ্যে; ভুল সময়ে ভুল কথা বলার জন্য। প্রসঙ্গ বদলাতে তাড়া নিয়ে নাওফিলকে জানাল, ‘কিন্তু আমার মন বলছে ও যতই নির্বিকার দেখাক নিজেকে। কালকের মধ্যেই তোমার মুখোমুখি হবে ও।’
-‘আমার মনও যে একই কথা বলছে৷ আমার মুখোমুখি করার জন্যই তো নিজের ইমেজে স্পট ফেলতে হলো৷ অপেক্ষাই থাকব সেই ক্ষণের জন্য।’
-‘আত্মসম্মান বোধ থাকা নারীরা সব কিছু সয়ে নিলেও নিজের সম্মানে আঘাত পেলে চুপ থাকে না। ও-ও থাকবে না৷ তাই টেনশন নিয়ো না। তোমার মুখোমুখি না হলেও তোমার পুলিশ ভাইয়ের কাছে তো যাবেই।’
দরজার মুখে সেবিকা দুটোকে কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইয়াসিফ থমকে পড়ল বাইরেই৷ প্যান্টের পকেটে এক হাত পুরে অন্য হাতে খাবারের বক্স নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে রইল সে, চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকল মেয়েদুটোর সরে দাঁড়ানোর। তবু নিজের উপস্থিতি জানিয়ে মুখ ফুটে বলল না, তাদেরকে পথ করে দেওয়ার কথা।
কেবিনের ভেতর থেকে তখন নাওফিলের শুষ্ক গলায় ভেসে এলো, ‘আপনাদের দেখে আমি শুরুর দিন থেকেই অসুস্থবোধ করছি খুব। সাফোকেটেড লাগছে। দুটো দিনে আপনাদের খুব কষ্টে টলারেট করেছি। আজকে বিদায় নেব। এই মুহূর্ত থেকে আমার যাওয়ার আগ অবধি আপনাদের দুজনের মুখ আর দেখিয়েন না প্লিজ।’
জড়তা সুরে একজন সেবিকা সাহস করে জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা কি কোনো ভুল করেছি, স্যার?’
-‘আমাকে যদি সেটা উচ্চারণই করতে হয়’, ঘৃণার সঙ্গে তাদের দিক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো নাওফিল। ‘তাহলে কমপ্লেইনটা সরাসরি ডক্টরকেই দেব।’
কথাটা শুনে সেবিকাদের চোখেমুখে ভীতি স্পষ্ট হলো। ইয়াসিফ তাদের থেকে দু’হাত পিছে দাঁড়িয়েই তা দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠল, ‘কী করেছেন আপনারা?’
পেছন থেকে হঠাৎ করে তার কণ্ঠে বেজায় চমকাল দুজন। নাওফিলও ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল তখন দরজার দিকে। ইয়াসিফকে জলদি ভেতরে আসার জায়গা করে দিলো সেবিকা। ‘কী করেছেন?’ আবারও জিজ্ঞেস করল সে।
-‘তুই এখানে কী করছিস?’ তীক্ষ্ণ গলায় তক্ষুনি প্রশ্ন ছুড়ল নাওফিল।
ইয়াসিফ আপাতত প্রশ্নটা এড়িয়ে সেবিকাদের চেহারার অভিব্যক্তি দেখতে থাকল৷ এক চোরের অভিব্যক্তি যেন। সেটা বুঝতে পেরেই দুজনের আপাদমস্তক লক্ষ করল সে৷ নজর আটকাল একজনের হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটার দিকে৷ যেটা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই আগলে রাখছে সে হাতের মাঝে৷ অনুমান করল ইয়াসিফ, ওই ফোনই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত নিশ্চয়ই! চকিতেই হাতটা বাড়িয়ে দিলো ফোন ধরে থাকা সাবিহা নামের সেবিকার দিকে, ‘ফোনটা দেখতে চাই।’ শান্ত মেজাজে বলল তাকে।
-‘কেন স্যার?’ থতমত খেয়ে সমস্বরে বলে উঠল সেবিকা দুজনই।
সরু চোখে তাকিয়ে রইল ইয়াসিফ নীরবে। কিছু কিছু পুরুষ থাকে, যাদের কেবল হিম চাউনি দেখলেই গা ছমছম করে ওঠে৷ মনে হয় যেন বুকের গহিনে লুকিয়ে রাখা সমস্ত গোপন রহস্য দেখে ফেলছে সে। ইয়াসিফের দৃষ্টি ঠিক তেমনই৷ আর ওদিকে নাওফিলের চোখজোড়া অবিরত বয়ে চলা স্বচ্ছ দীঘির মতোই শান্ত, মায়াময়। সে চোখে চোখ রাখলেই কেমন যেন অপার্থিব লাগে আশপাশ, দুর্বল নারী মনকে অনায়াসেই প্রেমের জালে জড়িয়ে ফেলতে চায়।
-‘ওর ফোনটা সকাল থেকেই অন হচ্ছে না, স্যার। কীভাবে যেন পানির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, ভেঙেও গেছে স্ক্রিন।’ সাবিহার সঙ্গী তাহমিনা কম্পিত গলায় বলল ইয়াসিফকে। তারপর ফোনও বাড়িয়ে দিলো ওকে।
হাতে নিয়ে ভালোভাবে ফোনটা পর্যবেক্ষণ করে দেখল ইয়াসিফ৷ সত্যিই অচল হয়ে আছে সেটা৷ কোনা চোখে একবার নাওফিলের দিকে তাকাল সে৷ রাশভারী চেহারায় নাওফিলও তখন তারই দিকে চেয়ে। সেবিকাদের বলল ইয়াসিফ, ‘ফোনের মাদারবোর্ড শেষ। আরও কী কী ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তা মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে গেলেই জানতে পারবেন। এখন আমাকে জানিয়ে যান, কী ক্রাইম করেছিলেন এই ফোন দিয়ে? মিথ্যা বলার চেষ্টা করবেন না। নয়ত এমপির টাকা চুরির দায়ে থানায় নিয়ে গিয়ে সকালের নাশতা করাব।’
-‘স্যারের কিছু ছবি তুলেছিলাম আর…’ মিনমিন গলায় বলতে বলতে সাবিহা ভয়ে ঢোঁক গিলে নিলো। ‘আর ভিডিয়োও করেছিলাম একটু।’
-‘কী ভিডিয়ো করেছিলেন?’ সাবলীল সুরে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ, ‘ওর ন্যাকেড মোমেন্টস?’
মেয়েদুটো লজ্জা আর আতঙ্কে আর কোনো কথায় বলতে পারল না। গতরাতে প্রচণ্ড গরম লাগার ফলে নাওফিল পরনের জামাটা খুলে ঘুমিয়েছিল৷ তার লালচে ফরসা বর্ণের অ্যাথলেটের মতো শরীরটা দেখে এই মেয়েদুটোর কামজ অনুভূতিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল যেন। তাই চূড়ান্ত দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ঘুমন্ত নাওফিলের সঙ্গেই সেলফি আর তার নগ্ন শরীরের ভিডিয়ো রেকর্ড করে নিতেও দু’বার ভাবেনি। কিন্তু নাওফিলের শান্তিপূর্ণ, গভীর ঘুম দীধিতির বিদায় আর মারিহাম ফিরে এসেও আবার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গেই ত্যাগ করেছে৷ এজন্যই মেয়েদুটোর ফিসফিসানি আর কাণ্ডকারখানা চোখ বুজেও সে উপলব্ধি করেছিল সবটাই৷ সাবিহা মেয়েটি যখন ঘুমিয়ে পড়ে হঠাৎ। তখন নাওফিল তার ফোনটা নিয়ে বাথরুমে এসে প্রথমে ভাবে, কমোডে ফ্লাশ করে দেবে ভেঙেচুরে৷ পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পালটে ফেলে। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে পানিভর্তি জগের ভেতর ফোনটা ডু্বিয়ে রেখে দেয়।
-‘বুড়ো মন্ত্রী মিনিস্টারদের সঙ্গেই আজ-কাল সুন্দর মেয়েরা ঘুমানোর জন্য পাগল৷ সেখানে তো আমার ভাই আবার আপনাদের কাছে নায়ক।’ কথাটা বলে ইয়াসিফ বাঁকা হাসে নাওফিলের দিকে চেয়ে আর বলে, ‘আপনাদের মতো কিছু জাতই আছে খালি ঘুমাতে চায় টাকার গন্ধ পেলে। কী আর বলব আপনাদের, বলেন? কিন্তু তাই বলে নার্সের ইউনিফর্মটাকে লজ্জা দিয়েন না প্লিজ৷ তার চেয়ে ভালো বাসা বাড়িতে বুয়াগিরি করার মানসিক প্রস্তুতি নিন আজ থেকে। এখন দূর হন। আউট!’
সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল তারা। বাজেভাবে ফেঁসে গেছে দুজন। চাকরিও যে আর এখানে থাকবে না, ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই তারা ছুট লাগালো সিনিয়র স্টাফ নার্সের কাছে৷ তার হাত-পায়ে ধরে স্বীকারোক্তি দিয়ে যদি মাফ পাওয়া যায়, তবে তিনিই ওদের হয়ে কথা বলবেন।
নাওফিলের থমথমে চেহারাটা দেখতে দেখতে ইয়াসিফ ঠোঁটের কোনে হাসিটা ঝুলিয়ে এগিয়ে এলো, ‘আজ-কাল সিনেমা, ড্রামা দেখছিস না-কি?’ খাবারের বক্সটা পাশের ছোট্ট সেন্টারটেবিলের ওপর রাখতে রাখতে নাওফিলকে বলল। নাওফিল ধারাল চোখে ওকে দেখতে দেখতে বলে উঠল, ‘তুই কী চাস? আমি তোর গায়ে আবারও হাত তুলি?’
-‘তুলতে চাইলে তুলবি। তোর সে ক্ষমতা আছে এখন। আমার মতো দু’চারটা পুলিশকে যখন তখন খুন করে গুম করে দিবি। তারপর ওরকম দু’চারটা ছ্যাঁচড়া মেয়েদের বিছানায় ফেলে ঠান্ডা করবি। তাহলেই না ক্ষমতার সদ্ব্যবহার হবে!’ নির্বিকার গলায় জবাব দিলো ইয়াসিফ।
-‘ভেতরে ঘেন্না আর প্রতিশোধের আগুন থাকলে কি খুন করতে ক্ষমতা লাগে? তোকে খুন করতে চাইলে এতগুলো বছর বাঁচিয়ে রাখতাম না। আর খুন করে গুম করার অভিজ্ঞতা তো তোর আছে, আমার নেই।’
হাসল ইয়াসিফ, ‘তাই? তাহলে কিছু করবি না আমাকে?’
-‘তুই আমাকে ত্রিসীমানায় না থাকলে কিছুই করব না৷ আসিস না আমার চোখের সামনে।’
কথাটা যেন শুনতেই পায়নি ইয়াসিফ। তেমনভাবেই বক্সের খাবারগুলো বের করে প্লেটে তুলতে থাকল সে। যদিও জানে, খাবারগুলো ছুঁয়েও দেখবে না নাওফিল৷ তবুও প্লেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। মসুর ডালের ঝরঝরে ভুনা খিচুড়ি, ঝাল ঝাল আলু ভর্তা আর ডিম ভাজা। সকালের নাশতায় এই মেন্যু দীধিতির বরাবরই পছন্দের ছিল৷ প্লেটটার দিকে উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে তাকিয়ে থেকে নাওফিল চেঁচিয়ে উঠল নিমিষেই, ‘নিহাদ, বের হ তুই! আমি সিন ক্রিয়েট করতে চাইছি না কিন্তু।’
-‘কী বলিস!’ কপট অবাক মুখভঙ্গি ইয়াসিফের। তাকে বলল, ‘সিন ক্রিয়েট না করতে চাইলে জেনেশুনেও কেন তাহলে সেদিন বডিগার্ড নিসনি?’
-‘সেই কৈফিয়ত চাওয়ার তুই কে?’ আবারও চেঁচিয়ে উঠল সে।
-‘আমি তোর বাপ!’ রগড় গলায় বলে গেল ইয়াসিফ, ‘এ কথা তো আর বলতে পারছি না। আবার বড়ো ভাই তোর, তা তুই মানিস না। তাই সেটাও বলতে পারব না। তবে একজন কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের কাছে তখন তুই কৈফিয়ত দিতে বাধ্য, যখন তোর অভিভাবক তোর প্রাণ রক্ষার দায়িত্বে প্রশাসনকে জড়ায়।’
-‘প্রশাসন বলতে দুশ্চরিত্র আর খুনী অফিসার একমাত্র ইয়াসিফ শেখ নয় নিশ্চয়ই? আমার নিরাপত্তার জন্য আমি এমন অমানুষের সহায়তা নেব কি?’
-‘মুখ সামলে জাদ!’ সহসাই চটে উঠল ইয়াসিফ৷ কাঠিন্য চোয়ালে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, ‘তুই আরেকবার আমাকে খুনী বললে তোর সুস্থ পা’টাও সুস্থ থাকবে না বলে দিলাম।’
বিশাল এক ধাক্কায় দু’পা ছিটকে গেল সে। কথাটা বলার পরই নাওফিল দেরি করেনি ইয়াসিফকে ধাক্কাটা দিতে। গনগনে গলায় বলল ওকে, ‘তিনটা মাস তুই আমার বোনের সঙ্গে খেলেছিস। তারপর ঠিক সেদিন আমার মাইন্ড ডাইভার্ট করতে মারিহামের কথা জানালি, যেদিন আমি স্মরণের জন্য দিশাহারা। তুই জানতি, আমি সেদিন চাইলেও চট্টগ্রাম ছুটতে পারব না। আর তারপর? তারপরই যখন ওর কাছে ছুটলাম, শুধু পেলাম রক্তমাখা একটা ছুরি ওর ঘরে আর মেঝেতে পড়ে থাকা একটা চিরকুট। তোর নিজের লেখা চিরকুট ছিল সেটা৷ স্রেফ দুটো শব্দ লেখা ছিল তাতে, “Finish her”। ছুরিতে যে রক্ত ছিল, সেই রক্তের ডিএনএ আর আমার ডিএনএ নিরানব্বই শতাংশ ম্যাচ করেছিল। তবুও তুই বলে গিয়েছিস, ও না-কি আমার মায়ের সন্তান না৷ ও আমার বাবা আর খালা আলিয়ার অবৈধ সন্তান। এই কথাটা আর ওই চিরকুটই কি প্রমাণ করে না, কোনো এক স্বার্থে তুই ওকে খুন করিয়েছিস? খুন করে লাশটাও সরিয়ে দিয়েছিস?’
-‘না করে না। তুইও স্রেফ এ দুটো বিষয়ের জন্য আমাকে খুনী বলতে পারিস না। ওই মেয়ে একটা ফ্রড। ও তোর নিজের বোন হলে তিনটা মাসে ও তোর সাথে কেন যোগাযোগ করেনি, বল? জিনগতভাবে তোদের বাবা এক, তাই ডিএনএ ম্যাচ করেছে। আর ওই চিরকুটও আমি লিখিনি৷ ও আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে শুধু।’
আর সামলাতে পারল না নাওফিল নিজেকে৷ ক্যাবিনেটের ওপর থাকা কাচের গ্লাসটা নিয়ে ছুড়ে মারল ইয়াসিফকে লক্ষ করে। এক কদমও সরে পড়ার সুযোগ পেল না সে৷ কপালের কোনে লেগেই গ্লাসটা নিচে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল৷ সেই সাথে কেটে গেল ইয়াসিফের কপালটাও। বর্জ্র কণ্ঠে নাওফিল হুমকি দিলো ওকে, ‘এক মাস সময় তোর৷ এর মধ্যে যদি তুই তোর কথা প্রমাণ করতে পারিস, আমি আমার যাবতীয় সব কিছু তোদের দুই ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে চলে যাব। আর না পারলে অর্ধেক প্রপার্টি তো কব্জা করেছিই, বাকি অর্ধেকও করে নেওয়ার জন্য ফাঁদ তৈরি করতে সময় নেব না। শেখ বাড়ি থেকে বের করে দেব তোর পুরো পরিবারকে।’
-‘অলরাইট।’ কপালের রক্তটুকু মুছল না ইয়াসিফ। গমগমে কণ্ঠে বলল, ‘যে কাজ গোটা চার বছরে করিনি, এবার তা করব। মারিহাম নামের ওই ক্রিমিনালকে খুঁজে তোর সামনে আনবই৷ তারপর দেখব, তোর জবান এক থাকে কি-না!’
কথাগুলো বলেই বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো ইয়াসিফ। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তখন জাকির শেখ বেরিয়ে এলেন আড়াল থেকে৷ ইয়াসিফ চাচার মুখোমুখি হতেই নাওফিল ক্ষিপ্ত গলায় বলল জাকিরকে, ‘ওকে আমার ধারেকাছেও আসতে দেবেন না। নয়ত বহু বছর পর আবারও শেখ বাড়িতে ভাই ভাইকে হত্যার ইতিহাসটা পুনরাবৃত্তি হবে বলে দিলাম।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৬
-‘আচ্ছা তাই?’ তিরস্কারের সঙ্গে তাকাল ইয়াসিফ। তারপর এগিয়ে এলো পুনরায় নাওফিলের কাছে। ব্যঙ্গার্থে বলল, ‘তোর ওই খাইশ্টা সো কলড বোনকে খুন না করেও খুনী হয়ে গিয়েছি৷ সেই তকমাটা গায়ে বাস্তবেই সেঁটে নেব না হয় তোকে কবরে পাঠিয়ে।’
-‘থামবি তোরা, অমানুষের দল!’ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন জাকির শেখ।
