Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৬

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৬

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি

রাত ১২:৩০
মাথার উপর দ্রুত গতিতে ফ্যানটা চলার পরও দরদর করে ঘামছে কিরণ৷ কান্নার দমকে আর আতঙ্কে শরীরটাও কাঁপছে ওর থরথরিয়ে। আলো ঝলমল করা সারা ঘরের মাঝেও মনে হচ্ছে যেন, সে একাকি কোনো অন্ধকার গুহায় আটকে আছে কতক্ষণ যাবৎ! আর ওর আশেপাশে ঘুরছে এক অশরীরী।
বাসার নিচে বান্ধবীর লাশটা পড়ে আছে বিশাল এক লাগেজ ব্যাগের মধ্যে। গেটের দারোয়ানটাও আজ উধাও। সে কি পুলিশে কল করে জানাবে? কিন্তু তাতে যে ওরই ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন কীভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে সে? কার কাছে সহযোগিতা চাইবে? মা’কে অথবা সোহাইল সাহেবকে জানালে এরা আগে বকাঝকা করবে, জিজ্ঞেস করবে সে হোস্টেল থেকে বান্ধবীর ফ্ল্যাটে কার অনুমতিতে এসেছে, কেন এসেছে, কখন এসেছে! তারপর টেনশনে মা প্রেশার বাড়িয়ে হবে অজ্ঞান।

তখন তাকে নিয়েই দৌড়াদৌড়ি করতে হবে সোহাইল সাহেবকে। একমাত্র বোনকেও কল করার উপায় নেই আজ, সৌরভেরও সারারাত ও.টি রয়েছে। এদিকে এমন পরিস্থিতিতে এই শুনশান বাসায় একা একা সে থাকতেই পারবে না কোনোভাবে। এখন একমাত্র উপায় শেখ বাড়ির লোকটা। কিন্তু সেই লোকের কাছে সহযোগিতা চাওয়া মানেই বোনকে খেপিয়ে তোলা এবং সেই লোকটাকেও নিজের কাছে ঘেঁষার সুযোগ করে দেওয়া। অথচ এছাড়া উপায়ই বা কী?
চোখের পানি মুছে আগে গ্লাসের অর্ধেক পানিটুকু খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলো সে। তারপর হাতে ধরে থাকা ফোনে ডায়াল করল গোপনে মুখস্থ করে রাখা নাম্বারটা। কল করতে গিয়ে দ্বিধায় দু’বার স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াতে চেয়েও ছোঁয়াল না প্রথমে। শেষমেশ নিজের ন্যাকামিতে নিজেই বিরক্ত হয়ে কলটা করেই বসল৷ ভাবল, রিসিভ হবে না সহজে। কারণ এত রাতে ওই কর্মব্যস্ত লোকটি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে হয়তোবা। কিন্তু ওকে চমকে দিয়ে মাত্র একবার রিং হতেই রিসিভ হলো ওপাশ থেকে। ‘বলো কিরণ?’ একদম পরিষ্কার গলায় বলল তাওসিফ। কোনো ঘুমের আভাস নেই।

-‘আপনি কি জেগে আছেন?’ জড়তা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল কিরণ।
-‘গাড়ির মধ্যে তো আর ঘুমানোর অভ্যাস নেই তোমার মতো। তো এতদিন পর নিজে থেকে কল করলে যে? মনে আছে কী বলেছিল আমাদের শেষ সাক্ষাতের সময়?’
-‘কোথায় আপনি?’
-‘হসপিটাল থেকে ফিরছি।’
-‘ওহ’, নিষ্প্রাণ সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন এখন নাওফিল ভাই?’
-‘ভালো। কাল ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। তোমার গলা অমন মৃতপ্রায় রোগীর মতো শোনাচ্ছে কেন? মদ টদ খেয়ে টাল হয়ে কল করে ফেলেছ না-কি?’

তাওসিফের মজাটা এমন মুহূর্তে পছন্দ, অপছন্দ, কোনোটাই হলো না কিরণের৷ ও সরাসরি প্রসঙ্গে এলো, ‘শুনুন, আমি বড়ো একটা বিপদের মধ্যে আছি৷ আমার কথাগুলো প্লিজ একটু মন দিয়ে শুনুন। তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন আমাকে সাহায্য করবেন কি-না। আমি আজ হোস্টেল থেকে আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে ওর ফ্ল্যাটে এসেছি বিকালে৷ মেডিকেল কোচিং থেকে পরিচয় হয়েছিল ওর সাথে। সন্ধ্যার পর হঠাৎ ওর দরকারি এক ফোনকল আসে। খুব সম্ভবত ওর বয়ফ্রেন্ড। এমার্জেন্সি দেখা করতে হবে তার সঙ্গে, এ কথা বলে ও বেরিয়ে যায়। ফেরার কথা ছিল রাত দশটার মধ্যে। কিন্তু দশটা বাজার পর ও ফিরছে না দেখে কল করতে থাকি। রিসিভ হয় না। একটা সময় ফোনই বন্ধ পাই৷ আমি টেনশনে কী করব ভাবতে ভাবতে এসে বসি ব্যালকনিতে। ঠিক বারোটার সময় একটা কালো গাড়ি এসে থামে বাসার নিচে। ল্যাম্পপোস্টের ঠিক ওখানেই কালো রঙের বড়ো লাগেজ রাখে স্যুট প্যান্ট পরা দুটো লোক। মুখ ঢাকা ছিল তাদের কালো কাপড়ে। তারা লাগেজের চেইনটা খুলে রেখেই আবার গাড়িতে উঠে চলে যায়। আমি ল্যাম্পপোস্টের আলোতেই স্পষ্ট দেখতে পাই, আমার বান্ধবী তিশার মুখটা, ওর নিথর দেহটা। এখন পর্যন্ত ওভাবেই হয়তো পড়ে আছে। আমি ভয় পেয়ে তখনই ছুটে আসি ঘরে। আর যাইনি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’

-‘থ্যাঙ্কস আ লট, আমাকে অ্যাটলিস্ট শুভাকাঙ্খী ভাবার জন্য। অ্যাড্রেস দাও কুইক।’
-‘আপনি আসবেন? কিন্তু গেটের কাছে দারোয়ানও নেই। ঢুকবেন কীভাবে?’ বলতে গিয়ে একই আতঙ্কে গলা কেঁপে উঠল ওর। তাওসিফ তা বুঝতে পেরে তার গম্ভীর গলায় আরও গম্ভীরতা এনে আশ্বাস দিলো, ‘আমি দেখব সেটা। তোমাকে ভাবতে হবে না। অ্যাড্রেস পাঠাও।’
-‘ও.কে।’

বসার ঘরের সোফায় গুটিসুটি হয়ে বসে কিরণ অপেক্ষা করতে থাকল তাওফিসের। নিজের তেইশ বছরের জীবনে এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে সে এর আগে কোনোদিন পড়েনি৷ তবে গতকাল অবধিও ভাবত সে– যেদিনটাতে ওর কুমারীদশার পরিসমাপ্তি ঘটাল তাওসিফ, তারপর কী করে যেন ওকে বিয়েটাও করে নিতে বাধ্য করল সে, কেবল সেদিনটাই ওর জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ছিল। কালও সেদিনের পরিস্থিতিগুলো মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিতো। আর শুধুই ভাবত, দোষটা সেদিন আসলে কার ছিল?
নিস্তব্ধ ঘরে আচমকা বেল বাজার শব্দে চমকে উঠল সে। বারোটা পঞ্চাশ বাজে সবে৷ কে এলো এখন? তাওসিফ তো এত জলদি আসতে পারবে না! পুলিশ কি খবর পেয়ে গেছে? না-কি বাসার দারোয়ান? না-কি অন্য কোনো ভাড়াটিয়ার নজরে পড়েছে তিশার লাশটা? এসব ভাবনার মধ্যেই পুনরায় বেল বাজল আর সেই সঙ্গে ফোনটাও৷ হাতের মুঠোতেই ছিল ফোন। দেখল, তাওসিফ কল করছে। জলদি রিসিভ করে হড়বড়িয়ে বলে উঠল, ‘কে যেন এসেছে। বেল বাজাচ্ছে। দরজাটা কি খুলব?’
-‘না খুললে ঢুকব কীভাবে?’
-‘কী?’

পাক্কা পাঁচ সেকেন্ড পর কথাটা বুঝতে পেরে কিরণ লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে এসে দরজাটা খুলল। নীল রঙা স্যুটটা এক হাতের রেখে ওপর আরেক হাতে কানে ফোন চেপে দাঁড়িয়ে আছে তাওসিফ। দুজন মুখোমুখি হলে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে সে ভেতরে এলো, যেন মনে হলো অফিস শেষ করে নিজের বাড়িতেই ফিরল। কিরণ দরজাটা আটকে কান্না ভেজা ভীত গলায় একের পর এক প্রশ্ন করে গেল তাকে, ‘আপনি কীভাবে এত তাড়াতাড়ি এলেন? নিচে কি দেখেছিলেন তিশার লাশটা? ওখানেই পড়ে আছে? আর দারোয়ানকে কি পেলেন?’
স্যুটটা সোফায় ফেলে তাওসিফ গলার টাই ঢিলে করতে করতে বলল, ‘দারোয়ান গেটের এপাশে বসে ঘুমাচ্ছিল৷ আর নিচে কোনো লাশ টাশ কিছুই নেই।’

বিস্ময়বিমূঢ় চোখে কিরণ তার কথাগুলো শুনে হঠাৎ ছুটে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়াল। ল্যাম্পপোস্টের কাছে কোনো লাগেজের চিহ্নও নেই। তাওসিফকে ফেলে রেখে তারপরই আবার বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ নিচে এসে দেখল, সত্যিই দারোয়ান বসে ঝিমাচ্ছে। অথচ আধা ঘণ্টা আগে যখন এসেছিল, তখন ডাকাডাকি করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তগুলো সূর্যের মতো সত্য ছিল। ওসব যে ওর ভ্রম, তা ও কোনোদিনও বিশ্বাস করবে না। না-কি মেডিকেলের পড়া পড়তে পড়তেই ওর মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে? যেটা তাওসিফ দেখা হলেই বলে ওকে! সংশয়াকুল হয়ে ফিরে এলো সে। তাওসিফকে বসার ঘরে কোথাও না দেখে তিশার শোবার ঘরে এসে পেল তাকে। টাই খুলে, ইন করা থেকে শার্টটাও খুলে সে নিশ্চিন্তে বিছানার মাঝখানে শুয়ে আছে চোখ বুজে। এরকম একটা বিপদে তার এই বিকারশূন্যতা দেখে কিরণ রাগ, বিরক্তি, কিছুই প্রকাশ করতে পারল না। কারণ, তিশার লাশের ঘটনাটা মারাত্মকভাবে এবার ওর স্নায়ুতে চাপ ফেলছে। মাথা ধরে বিছানার এক পাশে বসে পড়তেই তাওসিফ চোখ মেলল, ওকে বলল, ‘তোমার বোধ হয় হ্যালুসিনেশন হয়েছিল, কিরণ। একা বাসায় ছিলে তো, হয়তো ভয় পাচ্ছিলে। এজন্যই ওরকম কিছু কল্পনা করেছিলে। স্ট্রেস নিয়ো না। তুমি বরং মেয়েটাকে আবার কল করো।’

কথাগুলো শুনে মাথা তুলে তাকাল কিরণ ভ্রু কুঁচকে। তাওসিফের নির্বিকার চেহারা দেখে কী যেন ভাবল সে। তারপর সত্যিই ফোন করল তিশার নাম্বারে৷ এবং ওকে চমকে দিয়ে ফোনটা রিসিভও হলো, ‘হ্যালো, কিরণ? স্যরি রে, বনু৷ অনিকের ছোটোবোনটা অ্যাক্সিডেন্ট করে হসপিটাল এডমিট হয়েছে৷ ছোটাছুটির ওপর ছিলাম। তাই তোর কল রিসিভ করার সময় পাইনি। অনিকের পাশে থাকার জন্য আজ ফিরতেও পারছি না।’ স্পষ্ট এবং সুস্থ স্বরে বলল তিশা।
মুহূর্তমধ্যে ঘটে গেল প্রলয়, বজ্রকণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল কিরণ, ‘তুই ফোন করে কথাটা জানাতি পারতি না? নিজে ডেকে এনে এভাবে আমাকে বাসায় একা ফেলে যাওয়ার পর নূন্যতম দায়িত্ববোধ থাকবে না তোর? তুই কি মানুষ!’
তিশা আর কিছু বলার সুযোগ পেল না৷ কলটা কেটে দিয়েই কিরণ ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়।

-‘কী? মেয়েটা ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে, তাই না?’ তাওসিফ বলল। কিন্তু কিরণ কোনো জবাব দিলো না। সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল ভ্রু কুঁচকানো চেহারায়। তা দেখে তাওসিফ শুয়ে পড়ল। ‘প্লিজ এখন আবার বিদায় হতে বোলো না আমাকে। আমি প্রচণ্ড টায়ার্ড।’
-‘আজকের পুরো ঘটনাটা আপনার প্ল্যান, তাই না?’ আচমকা প্রশ্নটা ছুড়ে কিরণ কঠিন মুখ করে এগিয়ে এলো তার কাছে, ‘তিশার সাথে আপনি কোনোভাবে যোগাযোগ করে এই প্ল্যানটা করেছেন। তাই তিশা আজ হঠাৎ করেই আমার হলে আসে। তারপর আপনাকে যাতে ফোন করতে বাধ্য হই, সেজন্যই এরকম ভয়ঙ্কর নাটকটা করলেন তিশার সাহায্যে।’
মুচকি হেসে তাওসিফ কিরণকে কাছে টানার জন্য হাত বাড়াতেই কিরণ ‘খবরদার’ বলে হুমকি দিয়ে বসে, ‘হাত কেটে ফেলে দেবো আমাকে ছুঁতে চাইলে। মন্ত্রী মিনিস্টার বাড়ির ছেলে বলে আপনার সাথে ঘুমানোর জন্য মরিয়া না আমি।’

রগচটা তাওসিফের খোশমেজাজে আগুন লাগল শেষ কথাতেই। উঠে বসেই কিরণের কব্জি শক্ত করে ধরে ওকে টেনে ফেলল বিছানায়। ‘শুধু ঘুমানোর জন্য আমি আজ চারটা বছর কুকুরের মতো তোমার পেছন পেছন ঘুরছি? এতদিনে অন্য কাউকে বিয়ে করলে দুই বাচ্চার বাপ হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু তোমাকে ঘরে তোলার জন্য বাপ-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, সবার সাথে প্রতিদিন অশান্তি করছি। আর তুমি শুধু তোমার পায়ে পড়ায় বাদ রেখেছ আমার।’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল তাওসিফ।
-‘আমার বোনের সংসার হলো না যে বাড়িতে, সেই বাড়িতে আমি জ্ঞান থাকতে কোনোদিন যাব না।’ একদম জিদ্দি সুরে বলল কিরণ।

-‘আলাদা থাকার অপশন দিইনি তোমাকে? তোমার মা আর সোহাইল কাকুর যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে তুমি কেন স্মরণের জন্য নিজের সংসার গ্রহণ করবে না?’
-‘স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কথাতেও আমি আপনার সাথে সংসার করব না। আর আলাদা কেন, আপনি আমাকে নিয়ে তাজমহলে থাকার সুযোগ দিলেও আমি যাব না। আমার মায়ের কাছে আপু কোনোকালেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু আমার কাছে ছিল আর আছেও। ওর বিরুদ্ধে আপনার বাড়ির প্রতিটি মানুষ ষড়যন্ত্র করে ওকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তা এ জীবনে ভুলব? আপনিও সেদিন ওর পাশে থাকেননি।’
-‘সেদিনের পরিস্থিতি তুমি জানো না, কিরণ।’ কোমল গলায় বলল ওকে তাওসিফ, ‘আর এসব কথা অনেক পুরোনো। এখন আর আমরা কেউ-ই সেই জায়গাতে আটকে নেই। সবাই-ই তো নিজেদের জীবনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে আমি, তুমি কেন থেমে থাকব, বলো?’
দৃষ্টি নত করে কিরণও শীতল গলায় বলল, ‘আপুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নেবো। তার আগে আমাকে আপনি কনভিন্স করতে পারবেন না।’
হতাশার শ্বাস ফেলে ওর হাতটা ছেড়ে তাওসিফ শুয়ে পড়ল, ‘ও.কে। আমিও কথা বলতে চাই স্মরণের সাথে। ওর ট্রেনিং তো শেষ, তাই না?’

-‘হুঁ। আরও কয়েকদিন আগেই।’
-‘জাদের ওপর হামলা হয়েছিল, তা জানে?’
-‘জানবে কোথা থেকে?’ পুনরায় কঠিন হয়ে উঠল কিরণের মুখটা। ‘আমি তো ভাইয়ার ব্যাপারে কিছু বলি না। আর আপনার লুচ্চা টুইনের সঙ্গেও ও কোনো যোগাযোগ রাখেনি, যে সে জানাবে ওকে।’
-‘নিহাদকে এভাবে ডিজরেসপেক্ট কোরো না, কিরণ। ও তোমার অনেক বড়ো কিন্তু।’
-‘তাতে কী? আমার তাকে শুরু থেকেই অপছন্দ ছিল। পরবর্তীতে তার স্বভাব চরিত্র জেনে তো আরও অপছন্দ এখন। তার প্রতি আমার সামান্যতম রেসপেক্টও আসে না।’
-‘না আসলেও ওর সামনে কখনো এমন করবে না ভুলেও। ও কিন্তু আর সেই আগের মতো রসিক নেই, ফ্র্যাঙ্কলিও নেই৷ এখন আমার থেকেও শর্ট টেম্পারড আর সিরিয়াস পার্সোন। যার তার সাথে অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যায়। দাদাকেও মানে না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ উদাস গলায় বলল কিরণ, ‘চারটা বছরে আমরা সবাই-ই ভিন্ন একেক চরিত্রের মানুষ হয়ে গিয়েছি যেন।’
-‘মানুষ বদলায় জীবনে নানান পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে।’ বলল তাওসিফও।

দুদিন আগের গুলিবিদ্ধ পায়ে আজই পুরোপুরি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল নাওফিল। সেবিকা দুজন একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে ওর থেকে৷ তারা উৎসুক চোখে তাকিয়ে দেখছে প্রচণ্ড একরোখা স্বভাবের এই ভি আই পি রোগীকে। ডাক্তার মাত্র কিছুক্ষণ আগে এসে তাকে চেক-আপ করে বলে গেল, আগামী এক সপ্তাহের মাঝেও হাঁটাহাঁটি না করায় ভালো হবে তার জন্য। তখন পাশে ছিলেন এই রোগীর বাবা ওরফে সদ্য শিল্পমন্ত্রী জাকির শেখ। কথাটা শোনা মাত্রই তিনি বলেন, ‘পা পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ওকে পা ফেলতেই দেবো না আমি।’ অতিরিক্ত পিতৃ স্নেহের এই কথায় ডাক্তার মৌনতা দেখাতে বাধ্য হয় তখন। কিন্তু তারা দুজন বিদায় নিতেই সেবিকারা তাজ্জব হয়ে পড়ল রোগীর গোঁয়ার্তুমি দেখে। তাদের একজনকে ডেকে হঠাৎ রুক্ষ স্বরে বলল সে, ‘ওয়াশরুম যাব। আই নিড স্লিপারস।’
সঙ্গে সঙ্গে একজন স্লিয়ার এগিয়ে দিলো ওকে আর জিজ্ঞেস করল, ‘স্যারকে ডেকে দেবো? না-কি আমরা হেল্প করব, স্যার?’

-‘কাউকে প্রয়োজন নেই।’ আরও কর্কশ সুর ওর। তা শুনে আর নাওফিলের চেহারার দিকে তাকিয়ে
সেবিকা দুজন আর সাহস করল না সাহায্য করতে চাইবার৷ ওর সেই পূর্বের শান্তশিষ্ট, সুন্দর, কোমল রূপটা আর নেই। কপাল, থুঁতনি আর ওর গালে হালকা, দৃঢ় বহু কাটাকাটির চিহ্ন এখন। যার কিছু গত দুদিন আগের আর কিছু এই চার বছর ধরে তৈরি হওয়া। সে চেহারায় তাকালে এখন রূঢ়, নিষ্ঠুর এক পুরুষকে দেখা যায়। অবশ্য একজন বক্সারের চেহারায় কোমলতা আশা করায় বোকামি। সেবিকা দুজন নাওফিলকে নিয়ে গত দুদিনে অনেক কিছুই জেনেছে। যার মাঝে নতুন তথ্য হলো– এমন কঠিন রূপের সুন্দর রাজনীতিবিদ পুরুষটা রীতিমতো মুষ্টিযোদ্ধাও।

গত চার বছর যাবৎ নাওফিল সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে দেশের প্রায় সকল বিভাগেই ওর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তখন থেকেই তরুণ স্বপ্নবাজ নাওফিল শেখ জাদকে চিনতে শুরু করে সবাই। তারপর ধীরে ধীরে রাজনীতিতে প্রবেশ করে সে। আর এ বছরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন গাজীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে। যেটা ছিল শেখ পরিবারসহ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কাছেও অপছন্দনীয়। ওকে বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগও পাননি মাহতাব শেখ। তবে নাওফিল তার মুখও ডুবাননি। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছে সে। কিন্তু দুদিন আগ পর্যন্তও সে ক্লিন ইমেজ ধরে রাখলেও হঠাৎ করেই গতকাল রাত থেকে ওকে নিয়ে কিছু একটা নারীঘটিত বিষয়ে আলোচনা, সমালোচনা চলছে সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। কে বা কারা যেন ওর সঙ্গে একটি মেয়ের কিছুটা অন্তরঙ্গ ছবি সংগ্রহ করে নেট পাড়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে এমন শিরোনামে — ‘গভীর রাতে দিয়াবাড়ির রাস্তার পাড়ে তরুণ প্রতিমন্ত্রী নাওফিল শেখ জাদকে দেখা যায় এক নারীর কোলে মাথা পেতে শুয়ে থাকতে। দেখা যায় আবার গাড়ির মাঝেও সেই নারী সঙ্গেই চুম্বনরত অবস্থায়। কে এই নারী? কী হয় সে নাওফিল শেখের?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৫

যদিও ছবিতে সে নারীর মুখ স্পষ্ট নয়। আর না গাড়ির মাঝে দুজনের চুম্বনরত কোনো মুহূর্ত স্পষ্ট৷ এটুকু নিছকই বাড়াবাড়ি। এ নিয়েই গতকাল রাত থেকে তোলপাড় চলছে নেট পাড়া এবং মিডিয়া পাড়াতেও৷ কেননা, নাওফিলের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো– মাহতাব শেখের সব থেকে বড়ো ব্যবসা অর্থাৎ অস্ত্র ব্যবসার অর্ধ ভাগ শেয়ারের মালিক বর্তমান সে-ই। এমন একজন ব্যক্তি দেশের শীর্ষ কোনো যশস্বী ব্যক্তিদের চেয়ে কোনো অংশ কম নয় নিশ্চয়ই?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here