আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি
কী এক জ্বালা হলো! চিত হতে না পারলে, এপাশ-ওপাশ না ফিরতে পারলে কি আরাম করে শোয়া যায়? না কি আরাম করে ঘুমানো যায়? আবার বসতেও অসু্বিধা। পেশা জীবনে কতবার আহত হলেও এরকম বিপদে পড়তে হয়নি ইয়াসিফকে। উপরন্তু দুটো মেয়ে লোকের সহায়তায় এটা করতে হচ্ছে, ওটা করতে হচ্ছে, সকালবেলা বাথরুম পর্যন্ত যেতে হয়েছে একজনের ওপর নির্ভর হয়ে। মেজাজ যার জন্য বেকায়দারকম রুক্ষ ওর৷
সময়ে অসময়ে একটু বেশি খেয়াল নিচ্ছে এসে মাভিশা মেয়েটাই। অথচ চোটপাট দেখাচ্ছে ইয়াসিফ তার ওপরই বেশি৷ এই তো কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটা ডালিম, আঙুর, কমলা আর স্ট্রবেরি ভর্তি বাটি এনে তার সামনে রাখল আর কোমল গলায় বলল ওকে, ‘দ্রুত ক্ষত শুকাতে হলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া বেশি দরকার তোমার। ইন শা আল্লাহ তাহলে জলদি সেড়ে যাবে।’
সাধারণ এবং উপকারী একটা পরামর্শ। কিন্তু ইয়াসিফের এত অসহ্য লাগল সেই সামান্য কথাটা যে, সে অকারণেই খেঁকিয়ে উঠল, ‘তোমাকে মিনিটে মিনিটে এসে জ্ঞান দেওয়ার জন্য রেখেছি না কি আমি?’ বলার পর কিন্তু ঠিকই সে ফলগুলো মুখে পুরতে থাকল। মাভিশার হাস্যোজ্জ্বল চোখে অপমান আর বিষণ্নতার ছায়া দেখা যায় তখন। তবুও মুখে হাসি রাখল এজন্যই, সে বুঝতে পারে ইয়াসিফের মুড সুইং চলছে বারবার। মারিহাম এসব নীরবে দেখে শুধু। মাভিশার মতো যত্নআত্তি সে না করলেও ভেতরে ভেতরে ইয়াসিফের এই দশার জন্য ভীষণ অপরাধবোধে পুড়ছে৷ অনেকবার ভেবেছে পনেরোটা দিন নিজের নির্মম আচরণের জন্য অনুতপ্ত সুরে ক্ষমা চাইবে ইয়াসিফের কাছে৷ কিন্তু কেন যেন আটকে যায় সে নিজের কাছেই৷
ইয়াসিফের থেকে তখন অমন অপমানের শিকার হয়ে মাভিশা ওকে একা রেখে চলে আসে। সেটাও ভালো লাগেনি ইয়াসিফের। পরবর্তীতে উপলব্ধি করল নিজের ব্যবহারটা ঠিক হয়নি তখন৷ সেটা বুঝতে পেরেই বিছানা থেকে কষ্টেসৃষ্টে অসম্ভব ব্যথাটা হজম করে একাই উঠে পড়ল। মেয়ে দু’টোকে খুঁজতে খুঁজতে এসে ড্রয়িংরুমে দেখল মাভিশা সোফায় বসে টিভি দেখছে একাকীই। ‘এই মেরি, আ’ম স্যরি গার্ল।’ পেছনে দাড়িয়েই বলে উঠল মাভিশাকে।
মাভিশা চকিতে পিছু ফিরে ওকে দেখে হেসে বলল, ‘ওহ ম্যান, স্যরি হওয়ার কিছু নেই৷ তুমি হাঁটাহাঁটি করছ এটা কিন্তু বেশ। ভালো লাগবে এতে।’
-‘হ্যাঁ, শুয়ে বসে তো আরাম পাচ্ছি না। কিন্তু দাড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।’
-‘সে একটু হবেই। বাট হাঁটাহাঁটি করাটাও দরকার। আচ্ছা চলো তোমার ঘরের বেলকনিতে যাই৷ সি বিচ দেখতে দেখতে গল্প করা যাবে।’
-‘এসো তাহলে।’
বেলকনিতে এসে দাড়িয়ে ইয়াসিফ সমুদ্রতটে নিবিড় চোখে চেয়ে রইল৷ মাতাল হাওয়ার তোড়ে দেহ, মন সত্যিই চঞ্চল হয়ে উঠছে এখন৷ মাভিশাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ফ্রেন্ড কোথায়?’
-‘বিচে গেছে একটু হাঁটতে। ওর মনটা ভালো নেই জানো? তোমার এই অবস্থার জন্য নিজেকেই তো দায়ী ভাবছে। আবার এলিন আন্টের নিখোঁজের সময় বেড়েই যাচ্ছে প্রতিদিন। এদিকে আমার যাওয়ারও সময় চলে এসেছে।’ মাভিশার কণ্ঠেও মন খারাপ জেগে উঠল।
ইয়াসিফ ভ্রু কুটি করে শুধাল, ‘তুমি ফিরে যাচ্ছ না কি?’
ফ্যাকাসে হেসে মাথা দুলাল মাভিশা। ‘কিন্তু কেন?’ চকিতেই জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ। উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলল, ‘কী এমন দরকার পড়ল যে কলিজার বন্ধুর পাশে থাকতে পারবে না? এটা কি ঠিক হবে?’
-‘ঠিক হবে না জানি। আসলে আমি এসেছি আমার এঙ্গেজমেন্টটা পেন্ডিং রেখে।’
একটু অবাক হয়েই হাসল ইয়াসিফ, ‘এঙ্গেজমেন্ট? বাহ্ বাহ্! তাহলে বিদেশী বয়ফ্রেন্ডের পাশাপাশি একটা দেশি বয়ফ্রেন্ডও দরকার মনে হয়েছিল না কি আমাকে দেখে?’
হাসল মাভিশাও, ‘পিঞ্চ করতেই পারো। কিছু মনে করছি না।’
-‘তোমার গল্পটা বলো তো। আরও কত কী চমক রেখেছ আল্লাহ জানেন।’
-‘আমার আর রাফির অ্যাফেয়ার অনেক বছরের। এই তো মাসখানিক আগেই এঙ্গেজমেন্ট হওয়ার কথা ছিল আমাদের। তার মধ্যেই ফ্লোরেন্সের থেকে কল পেলাম। ও হতাশ আর খুব ভেঙে পড়ছে বুঝতে পেরে আমি বাধ্য হই এঙ্গেজমেন্ট ক্যান্সেল করে দিতে৷ মম আর ড্যাডও তাতে সাপোর্ট করে আর জলদি পাঠিয়ে দেয় আমাকে ওর কাছে৷ কিন্তু রাফি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এতে। ওকে কোনোরকমে সামলে ছিল মম ড্যাড। তবে কথা দিতে হয় এক মাস পরই এঙ্গেজমেন্টটা কমপ্লিট করতে হবে৷ বিয়ের ডেটটাও আর দেরিতে রাখতে চায় না ও। ভেবেছিলাম এলিন আন্টকে খুঁজে পেয়ে যাব এক মাসের মাঝেই৷ কিন্তু তা আর হলো কই? গতকাল রাফি খুব মিস বিহেভ করেছে আমার সঙ্গে৷ এখনই ফিরে না গেলে ব্রেকআপ করে নেবে ও। মারিহাম সেটা শুনতে পেয়ে আমাকে না বলেই আজ সকালে কখন যেন টিকিট বুকিং দিয়ে ফেলে। ফ্লাইট আর দু’দিন পরই। কিন্তু সত্যি আমি চাই না ওকে এমন একটা সময়ে একা রেখে যেতে।’
-‘হি ইজ সো ক্রুয়েল অ্যান্ড ওয়ান্টস টু ডোমিনেট য়্যু। য়্যু শুড রিজেক্ট হিম।’
নিষ্প্রাণ হাসল মাভিশা, ‘তুমি সবটা জানো না আমাদের ব্যাপারে। তাই এ কথা বলছ। সবটা জানলে বলবে রাফির আমাকে রিজেক্ট করা উচিত। আমি ওকে ডিজার্ভ করি না।’
ইয়াসিফ চুপ করে চেয়ে রইল। তখন বলতে শুরু করল মাভিশা, ‘বছর দেড় আগের কথা। আমি আসলে ওর সঙ্গে দীর্ঘ দিনের রিলেশনশিপে কেমন হাঁপিয়ে উঠেছিলাম তখন, বোরিং হয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম একটু স্পেস দরকার আমার। কিছুদিন দূরে দূরে থাকলেই এই সমস্যাটা ঠিক হয়ে যাবে। সেটা ওকে বললামও৷ ও কষ্ট পেয়েছিল জানি। কিন্তু নিষেধও করেনি। আর করলেও আমি সে বারণ গ্রাহ্য করতাম না। এরপরই আমি আমার ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ভ্যাকেশনে বেরিয়ে পড়ি। তিন মাসের মাঝেই আমি ডেট করি আমার ক্লোজ ফ্রেন্ডের এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে। বেশ ভালোই লাগছিল তখন আমার। প্রায় ছ’মাস ডেট করেছি তার সঙ্গে। এর মাঝে রাফি অনেকবার আমাকে নক করেছে, মিট করতে চলে এসেছে বাসায়, সারপ্রাইজ দিতে বিশেষভাবে ডিনারের আয়োজন করেছে। কিন্তু আমি ইন্ট্রেস্টেড হইনি।
এভাবে প্রায় ন’মাস কেটে গেলে ও বুঝতে পারে আমি আর ওকে চাইছি না৷ তাই নিজেই ব্রেকআপ করে ফেলে৷ সত্যি বলতে আমি তখন রিলিফ ফিল করেছিলাম। ফ্লোরেন্স তখন পুরোদমে নিজের পেশাতে ডুবে। তাই ওর সঙ্গে এসব ব্যাপারে আলোচনা করারও সুযোগ হয়েছিল না। তো মোটামুটি দশ মাস নতুন সম্পর্কে হ্যাপি থাকতে পারলেও তারপর হঠাৎ করেই আমি অভাবনীয়ভাবে রাফিকে মিস করতে শুরু করি। ওর সঙ্গে ব্রেকআপের তিনটি মাস ধরে আমার অনুভূতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হলাম আমি। আমরা আকাঙ্ক্ষিত বস্তু বা সম্পদটা সহজে হাতের নাগালে পেয়ে গেলে আসলে তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে চাই না৷ সেটা উপলব্ধি করতে একটু দেরি করে ফেলেছিলাম আমি৷ রাফি খুব কষ্ট পেয়েছিল। ও লন্ডনের মতো জায়গাতে ক্যারিয়ার গড়েও পুরোদস্তুর বাঙালি মনা মানুষই এখনও৷
বড্ড অভিমানী আর আবেগপ্রবণ৷ আমি ওর কাছে ফিরে আসতে চাই যখন, তখন ও সরাসরিই না করে দেয়৷ যেটা স্বাভাবিকই ছিল। ভেবেছিলাম কয়েকদিন অভিমান করে থাকলেও পরে নিজেই ডাকবে আমাকে৷ সব সময় যেটা হত আরকি৷ কিন্তু তা মোটেও হয়নি। ওকে ফিরে পেতে, পুনরায় ওর বিশ্বাস, ভালোবাসা অর্জন করতে আমার এক বছর সময় লেগেছে। তখন ফ্লোরেন্স আমার পাশে না থাকলে আর নানাভাবে সাহায্য না করলে রাফিকে আর পেতামই না। এরপর রাফিকে ফিরে পেলেও সেই আগের মতো আমাকে মরিয়া হয়ে ভালোবাসাটা ও আর দেখায় না। কিন্তু আমি জানি আমার জন্য ওর ভালোবাসা একই আছে। হয়ত আর কখনও সেভাবে তা প্রকাশ করবে না। আমার এখন খুব খারাপ লাগে, কষ্ট হয়। যখন ও হুটহাট ব্রেকআপের কথা বলে৷ এখন মাঝেমধ্যেই কারণে, অকারণে খুব রুড হয়ে যায় আমার প্রতি৷ তখন মনে হয় সম্পর্কটা আর না ঠিক হলেই ভালো হত।’
বেশ কিছুক্ষণ ইয়াসিফ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। বিড়বিড় করে বলল, ‘সত্যিই জটিল জিনিস মেয়ে মানুষ। এরপরও তুমি কিন্তু পরিশুদ্ধ হতে পারোনি, মেরি।’
-‘তোমাকে সিডিউসড করতে চেয়েছিলাম, তার জন্য বলছ?’ নির্দ্বিধায় বলে উঠল মাভিশা।
-‘উহুঁ, শুধু এজন্যই না৷ দেহের কামনার কাছে নারী-পুরুষ উভয়ই দুর্বল বেশিরভাগ৷ তুমি যদি শুধু এই কামনা থেকেই আমাকে সিডিউসড করতে চাইতে তাহলে তোমাকে ডিজলয়্যাল মনে হত না৷ কিন্তু আমি তোমার চোখে-মুখের এক্সপ্রেশন, তোমার নানান কার্যকলাপে স্পষ্ট অনুভব করেছি আমাকে তুমি পার্টনার হিসেবে চাও৷ আমাকে নিয়ে মেয়েদের মতিগতি যেমনই হোক, তা কিন্তু আমি ধরে ফেলি৷ তাই এখন তুমি অস্বীকার করলেও তা মিথ্যা হবে।’
মাভিশা মৌন রইল। ইয়াসিফ তাই বলে গেল, ‘আমি যদি ভুল না হই, তুমি আসলে রাফির থেকে আগের মতো অ্যাটেনশনটা পাচ্ছ না বলেই অনায়াসেই আমার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলে।’
-‘ভুল বলোনি৷ আমরা প্রতিটা মানুষই কিন্তু নিজের সঙ্গীর থেকে নিজের জন্য পূর্ণ মনোযোগটাই কামনা করি। আশা করি পাগলের মতো ভালোবাসুক আমাদের সঙ্গী মানুষটা। এখন এটা রাফির থেকে আমার আশা করাটা বেমানান জানি৷ কিন্তু তার থেকে তো সেইরকম ভালোবাসাটাই পেয়ে এসেছি। তার জন্যই তার পরিবর্তনটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। সে আমাকে তার অবহেলার মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে আমার অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। যেটা আমি বুঝি। আমার এখন তাই মনে হয়, বিয়ের পর রাফি আরও বেশি আমাকে এই কষ্টগুলো দেবে৷ আমার ভয় হয় তার জন্য। তোমাকে দেখার পর চোখের ভালো লাগা থেকেই অপরিকল্পিতভাবে ঝুঁকে পড়েছিলাম আসলে৷ রাফির থেকে অপমান, অবহেলা না পেলে এমনটা হত না।’ এ মুহূর্তে ক্ষীণ শোনাল কণ্ঠ মাভিশার।
ইয়াসিফ গাম্ভির্যতার সঙ্গে বলল, ‘কিন্তু তুমি যেটা করেছ রাফির সঙ্গে, রাফির বদলে অন্য কোনো আত্মসংযমী বাঙালি ছেলে হলে দ্বিতীয়বার তোমাকে অ্যাক্সেপ্ট করত না। মেরি, তোমার কথার মাঝে কোথাও খুঁজে পেলাম না তুমি চেষ্টা করেছ কখনও নিজ প্রচেষ্টায় রাফির মনকে জয় করতে। সম্পর্কটা পুনরায় গড়তে মারিহাম সহায়তা করেছে বললে৷ কিন্তু রাফির মনে তুমি যে আঘাতটা দিয়েছ সেটার ট্রিটমেন্টটা কেবল তোমাকেই করতে হবে৷ যেভাবে রাফি তোমাকে ভালোবাসত, তোমারও সেভাবে ওকে ভালোবাসতে হবে। সেভাবেই কি বেসেছ? না কি শুধু চেয়েই গেছ রাফিই তোমাকে আগের মতো করে কেয়ার করুক, ভালোবাসুক?’
এবারও মাভিশা নিশ্চুপ। সে মুখটা দেখেই ইয়াসিফ জবাব পেলো। বলল, ‘তুমি সত্যিই ভীষণ স্বার্থপর গোছের মানুষ, মেরি৷ নিজের মনের মতো করে যখন আর রাফিকে পাচ্ছ না, তখন প্রথমবারের মতোই আবারও নতুন কাউকে খুঁজছ। কিন্তু তোমার করণীয় ছিল সবটা দিয়ে রাফিকে নিজের দিকে টেনে আনা। তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি রাফিকে ডিজার্ভ করো না। ছেলেটা তোমাকে এখনও আগের মতোই ভালোবাসে বলে বিয়েটা আর দেরিতে করতে চাইছে না। এর আরও দুটো কারণ। তুমি এখনও ওর বিশ্বাস ফিরে পাওনি৷ এবং সে তোমাকে নিয়ে ইনসিকিউর ফিল করে এখনও৷ ইনসিকিউরিটি তখনই ফিল হয় যখন মানুষটা তার সঙ্গীকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। ভয় পায় তাকে হারাতে। অথচ তুমি সেই ছেলেটাকে আবারও ডাম্প করার চিন্তা করেছিলে, বিয়ের পর তোমাকে টর্চার করবে এমন একটা মিথ্যা অজুহাত নিজেকে দিয়ে।’
-‘আমি জানি।’ ভেজা কণ্ঠ মাভিশার৷ মুখটা নুইয়ে রাখা।
-‘রাফিকে বারবার আঘাত করার রাইট তোমার নেই। আর সেটা কোনো মনুষ্যত্বপূর্ণ, বিবেকনিষ্ঠ মানুষের কাজ হতে পারে না, মেরি।’
ম্লান হেসে বলল মাভিশা, ‘আমি এতটা খারাপ মানুষ হতে চাই না। আমি আসলে এত বেশি অপরাধবোধে ভুগি রাফির সঙ্গে থাকলে! নিজের মানসিক শান্তিটাই অনুভব করি না৷ এর জন্যই আরও বেশি স্বার্থপরের মতো চিন্তাভাবনা করে ফেলি৷ রাফি ভালো ছেলে। ভালো প্রেমিকও ছিল৷ প্রেমিক হিসেবে তার ভালো সত্তাকে আমি ধ্বংস করলেও হাজবেন্ড হিসেবে আমি চাই ও বেস্ট হোক।’
-‘সেই আগের রাফিকে পেতে হলে তোমার সত্যিই এখন রাফিকে সময় দেওয়া জরুরি, নিজেকে লয়্যাল করতে হবে ওর প্রতি। তোমাকেও একজন বেস্ট বেটারহাফ হতে হবে। তবে বিয়ে ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না। আমি এই সম্পর্কটা নিয়ে আগ্রহীও না, আশাবাদীও না। এটা তোমাদের বর্তমান বোঝাপড়া থেকে ডিসাইড কোরো। কিন্তু যখন দুটো মানুষ একটা সম্পর্কে কমিটমেন্ট রাখে, তখন সে সম্পর্কে দুজনকেই অনেস্ট থাকতে হবে। ডেডিকেটেড হতে হবে। এ ব্যাপারটা বিশ্বাস করি৷ তার জন্যই তোমাকে এতগুলো কথা বললাম।’
মারিহাম ফিরে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। ইয়াসিফকে দেখার জন্য সে ঘরে প্রবেশ করল যখন, বেলকনি থেকে দুজনের কথোপকথন শুনতে পেয়ে আর এগোলো না সেদিকে। তবে মনোযোগ দিয়ে ইয়াসিফের কথাগুলো শুনে গেল। কিছু একটা ভাবলও সেখানে দাড়িয়ে৷ তারপর আবার হঠাৎ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর ঠিক সে সময়ই ইয়াসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের মাঝে তাকাল, দেখতে পেল মারিহামের প্রস্থান। তবে তার আগমনের কথা জানাল না মাভিশাকে। ওদের দুজনের কথার প্রসঙ্গ বদলে গেছে এর মাঝে৷ ইয়াসিফকে অনুরোধ করতে থাকল মাভিশা, ‘বলো না ইয়াসিফ, কীভাবে তুমি আমাদের প্ল্যান বুঝেছিলে?’ অনেকক্ষণ ধরেই এই ব্যাপারটা জানতে চাইছে ওর কাছে৷ কিন্তু ইয়াসিফ রহস্য করে কেবল হাসতে থাকে৷ শেষবার মাভিশা অনুরোধ করলে তারপর জানায় সে, ‘তোমাদের দুজনের অতিরঞ্জিত ওই নাটকীয় ঘটনা পরপর ঘটলে আমার মতো যে কোনো পুলিশ মানুষই বুঝে যাবে। তবে আমার মনে হয় তুমি ইচ্ছা করে নিজেকে ধরা দিয়েছিলে আমার কাছে, তাই না?’
মাভিশা নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করল, ‘হুঁ। কারণ, ওটাও পরিকল্পনারই অংশ। আমি ধরা দেবো। তুমি তখন আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে৷ আর তখনই ফ্লোরেন্স উপস্থিত হবে তোমার দোরগোড়ায়। যেটা তোমার কাছে অস্বাভাবিক লাগবে না। ফ্লোরেন্স যে গল্পটা ফেঁদেছিল, সেটাও তো মিথ্যা ছিল না। মিথ্যা এটুকুই ছিল যে, ফ্লোরা মেয়েটা আমাদের পরিচিত কেউ না। কিন্তু তাও তুমি বুঝে ফেললে আমাদের চাল। কিন্তু এটা কী করে বুঝলে তোমার সঙ্গে খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে? আর আমি ফ্লোরেন্স একই সঙ্গে আছি?’
-‘প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা এটাই। একই সময়ে পরপর অচেনা দুটো মেয়ের আগমন আমার কাছে। এবং তার মাঝে একজন আবার ব্রিটিশ নাগরিক। এবং তোমার ইংরেজিটাও ছিল ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে। কথা বলার সময় তুমি বেখেয়ালিভাবেই নিজের অ্যাকসেন্টে বলতে, মেরি। এবার বুঝেছ তোমরা এক সঙ্গে কীভাবে সেটা বুঝেছি?’
মাভিশা সত্যিই বিমুগ্ধ, ‘তোমার তো ইনটেলিজেন্স অফিসার হওয়া উচিত ছিল, ইয়াসিফ৷ এত সুক্ষ্ম ব্যাপারগুলোও তুমি যেভাবে নোটিস করে ফেলো! তাতে তোমাকে শুধু আন্ডারকভার হিসেবে বিশ্বাস হতে চায় না আমার৷’
ইয়াসিফ মৃদু হেসে এবার জানাল, ‘তো দুজন ব্রিটিশ নারী এসে আমাকে তাদের জালে আটকাতে চাইছে কেন? আমি তে এমন কোনো স্পেশাল কেসও হ্যান্ডেল করছি না এই মুহূর্তে। যার জন্য আমাকে জব্দ করতে হবে। তাহলে থেকে যায় পার্সনাল কোনো শত্রুতা আমার সঙ্গে। আর বিষয় যেহেতু পার্সনাল, আমি রিস্ক অপারেশন করতে ভালোবাসা মানুষটা রিস্ক না নিয়ে যাই কীভাবে? কিন্তু কিডন্যাপ হওয়ার আগে একটা ঘটনা আমাকে খুব মজা দিয়েছিল।’
-‘কোন ঘটনা?’
-‘মেরি, তোমার ফ্রেন্ড মেসমেরিজম শিখেছে কার থেকে?’ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ গলায় জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।
মাভিশা তা শুনে বিস্মিত হলো, ‘তুমি কী করে জানলে ও হিপনোটিজম জানে? তোমার ওপর ট্রাই করেছিল না কি?’
-‘কেন তুমি দেখোনি গাড়িতে বসে?’
-‘না, কবের কথা বলছ? যেদিন রাতে তোমাকে অজ্ঞান করে ধরেছিলাম?’
-‘ইয়েস। শি ওয়ান্টেড টু হিপনোটাইজ মি। অ্যান্ড শি ফেইলড ইন দ্যাট।’
মাভিশা হতাশ চেহারায় কপাল চাপড়াল। ‘আমাকে তো এ ব্যাপারে ফ্লোরেন্স কিছুই বলল না।’
ইয়াসিফ চওড়া হাসি দিয়ে বিদ্রুপ স্বরেই বলল, ‘কারণ, সে ভেবেছিল আমাকে হিপনোটিজম করতে সে সাকসেস হয়েছে। আমিও ভান ধরে সুযোগে একটা চুমু খেয়ে নিয়েছিলাম তখন।’
ইয়াসিফের বাহুতে একটা চাপড় মেরে দিলো মাভিশা। কপট রাগ কণ্ঠে বলল, ‘তুমি এত পাঁজি কেন?’
-‘সিরিয়াসলি ওর মতো মেয়েও যে এরকম বোকাসোকা হতে পারে তা বিশ্বাসই হয় না।’ হাসতে হাসতে ইয়াসিফ ডিভানে বসতে চেষ্টা করল। দ্রুত এগিয়ে এসে তখন সাহায্য করল ওকে মাভিশা। আর চাপা গলায় বলল, ‘প্লিজ ওর সামনে এ বিষয়টা বোলো না। নয়ত আমার সব হাড়গোড় ভেঙে ফেলবে।’
-‘কেন? তোমার দোষ কী এখানে?’
রেলিংয়ে হেলে দাড়িয়ে জানাল মাভিশা, ‘দোষ তো আমারই৷ আসলে প্রথম দোষ ড্যাডের। ড্যাডের মাঝে মধ্যেই অদ্ভুত একেক কাজ করতে মন চায়, একেক জিনিস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে মন চায়। একদিন সে এসে আমাদের বলল তার বন্ধুর থেকে সম্মোহন বিদ্যা শিখেছে। তো সে মমকে করেও ফেলল আমার আর ফ্লোরেন্সের সামনে। ড্যাডের সকল অদ্ভুত কাজকর্মের সঙ্গী হয় সব সময় ফ্লোরেন্সই। মমকে দেখে ওরও হঠাৎ ইচ্ছা জাগল ড্যাডের থেকে শিখবে। ড্যাড তো ভীষণ খুশি ওর আগ্রহ দেখে। এদিকে মম এসে আমার সঙ্গে হাসি মজা করতে থাকে এ নিয়ে। কারণ, মম মোটেও হিপনোটিজড হয়নি তখন। ড্যাডকে বোকা বানিয়েছিল সে। কিন্তু ফ্লোরেন্সকে তা বললাম না আমরা দুজনের তামাশা দেখার জন্য। সময় পেলেই সে অতি আগ্রহ নিয়ে ড্যাডের থেকে এসব শিখতে বসে যেত। তারপর একদিন সে এসে বলে আমাকে হিপনোসিস করবে। আমিও ওকে বোকা বানাতে ভান ধরি মমের মতো। ও-ও ড্যাডের মতো তখন বিশ্বাস করে নেয় যে, ও শিখে গেছে হিপনোটিজম। তাই বলে ও যে কখনও অন্য কারও সঙ্গেও এটা করতে যাবে তা ভাবিনি।’
ইয়াসিফ খুব হাসল। হাসতে হাসতে চোখে জলও চলে এলো ওর। তা দেখে মাভিশা নিজেও হেসে ফেলল। ‘কী একটা কাণ্ড! আমার তো হাসি পাচ্ছে এজন্য, দ্বিতীয়বার যার সঙ্গে করল সেও ওকে বোকা বানাল।’
সেটা শুনে ইয়াসিফ আরও জোরে হাসল। সে আওয়াজ চলে গেল মারিহামের ঘরেও। বিছানায় বসে ল্যাপটপ খুলে ইন্টারনেটে শেখ পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত আরও তথ্য জানার চেষ্টা করছিল সে। ইয়াসিফের অট্টহাসি শুনতে পেয়ে ভাবল ওদের সঙ্গে বসবে একটু। কিন্তু তার দ্বিধা, জড়তা নিয়ে থাকা মনটা বাধা দিলো এবারও তাকে।
-‘ইয়াসিফ!’ হঠাৎ করেই মাভিশা একটু অন্যরকম গলায় ডেকে ওঠে।
-‘হুঁ, বলো।’ ফোন থেকে নজর তুলল না ইয়াসিফ৷ তাওসিফকে জরুরি বার্তা প্রেরণে ব্যস্ত সে। ভাইটা ওর কাছে আসার জন্য ছটফট করছে। তাই তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বারণ করছে।
-‘তুমি জিজ্ঞেস করলে না তোমার ফোন, গাড়ি, সব কী করেছি আমরা?’
-‘সব ভোগে পাঠিয়েছ জানি৷ ফিরে পাওয়ার আশা নেই।’
-‘আ’ম স্যরি, ডিয়ার৷ তোমার সঙ্গে ফার্ম হাউজ থেকে যা করেছি তা এখন মনে পড়ছে খুব। আর সেই সাথে ভীষণ অপরাধবোধ হচ্ছে।’ বিষণ্ন মুখ করে স্বীকারোক্তি দিলো মাভিশা।
ইয়াসিফ সে কথায় মুচকি হাসল ফোনে কাজ করতে করতেই। ফোনের ব্যবস্থা ওকে ম্যানেজারই করে দিয়েছে৷ এখন পর্যন্ত মাভিশা আর মারিহামের ব্যাপারে খোলাখুলি কাউকেই জানায়নি সে৷ আপাতত কাউকে জানাবেও না বলে ঠিক করেছে।
প্রগাঢ় চোখে হাস্যোজ্জ্বল ইয়াসিফকে দেখতে দেখতে মাভিশা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের ওপর কি তোমার একটুও রাগ নেই, ইয়াসিফ? তোমার তো খুব কষ্ট হত যখন ফ্লোরেন্স হিট করত তোমাকে। মাঝেমধ্যে নীরবেই তোমার চোখের কোন বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ত দেখতাম। তখন বুঝতাম কতটা যন্ত্রণা হচ্ছে তোমার৷ এত আঘাত পেয়েও তুমি কীভাবে সহ্য করছ আমাদের? আর এরকমভাবে কেউ লাইফ রিস্ক নেয়? তুমি বুঝতে পেরেছিলে খারাপ কিছু হবে তোমার সাথে। প্রাণটাও তো যেতে পারত এতে। তবুও কেন পনেরোটা দিন মুখ বুজে মার খেয়েছ? তুমি কিছুই জানো না৷ অথচ তাও রহস্য করে কথা বলতে, হাসতেও রহস্য করে। যেচে পড়ে মারগুলো খেয়েছ রোজ।’
-‘হুঁ, খুব কষ্ট হত। তবুও হজম করে গেছি রোজ৷ কারণ, মারিহামের মুখটা পরিচিত লাগত৷ বিশ্বাস করেছিলাম এই মুখটা জানা কিংবা কোনো অজানা সত্যের মুখোমুখি করবে নিশ্চয়ই৷ ক্ষুদ্র কোনো কারণে এই মেয়ে সুদূর লন্ডন থেকে আমাকে ধরতে ছুটে আসেনি। আর হলোও তাই। যেদিন দেখেছ আমার চোখ থেকে পানি পড়ছে, সেদিন বাড়ির সবার কথা মনে পড়ত অনেক। মা, ভাই দুটো, ছোটো বোনটা, দাদী, এরা আমার কোনো দুর্ঘটনার কথা জানলে পাগল হয়ে যেত। দাদা, আব্বু, চাচা, এরা সব সময় শাসন করলেও অপ্রকাশ্যে আদর করে ভীষণ৷ ভেতরে ভেতরে এরাও চিন্তায় অস্থির হয়ে যেত আমার কিছু হলে। তাই মারিহামের টর্চারে যন্ত্রণায় শুধু মনে পড়ত, যারা আমার শরীরের ছোটো আঘাতেও পেরেশান হয়। তাদের কথামতো এই পেশায় না জড়ালে আজ এত বিপদের মধ্যে দিন কাটাতে হত না৷ ওদের কাছে যেতে ইচ্ছা করত খুব। কবে যেতে পারব, কবে শেষ হবে তোমাদের খেলা! সেসব ভাবলেই বেশি কষ্ট হত।’ বলতে বলতে ইয়াসিফের কণ্ঠও কেমন আবেগী হয়ে উঠল। চোখে উদাসীনতা দেখা গেল।
-‘আমাদের মাফ করে দাও প্লিজ। তোমার যন্ত্রণার ভাগ নিতে পারব না জানি৷ কিন্তু মন থেকে সত্যিই ভীষণ অনুতপ্ত আমি।’ এগিয়ে এসে ইয়াসিফের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল মাভিশা।
-‘করে দিয়েছি। তুমি নিশ্চিন্তে লন্ডন ব্যাক করো আর রাফিকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করো।’ মুচকি হেসে বলল ইয়াসিফ।
সে হাসি দেখে মাভিশা বিমোহিত হলো। ‘তুমি ছেলেটা প্লেবয় না হয়ে কোনো মেয়ের পাগল প্রেমী হতে পারতে, ইয়াসিফ।’
কোনো উত্তর দিলো না ইয়াসিফ। ঠোঁটে হাসি জড়িয়েই ফোনের মধ্যে ডুবল আবার। সে সময় আবার ডাকল মাভিশা, ‘ইয়াসিফ, শোনো?’
-‘বলো।’
-‘আমি এঙ্গেজমেন্ট শেষে দ্রুত ফেরার ট্রাই করব৷ ততদিন কি তুমি ফ্লোরেন্সের খেয়াল রাখতে পারবে?’
ভ্রুজোড়া উঁচু করে তাকাল তখন ইয়াসিফ। মাভিশা বলে গেল, ‘স্ট্রং মনের মানুষও কঠিন সময়ে ভেঙে পড়ে, জানো তো? আমি জানি না এলিন আন্ট ঠিক আছে কি না। কিন্তু মন বলছে খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে ফ্লোরেন্সের জন্য৷ আমি চলে যাওয়ার পর ও মন থেকে ভেঙে পড়বে, যদি সত্যিই খারাপ কিছু হয়ে যায় আন্টের। তাহলে ও নিজেও কোনো বিপজ্জনক পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারে। তখন কেউ একজন পাশে থাকলে কিছুটা হলেও সামলাতে পারবে হয়ত নিজেকে। আন্ট ছাড়া আপন বলতে আর তো কেউ নেই ওর।’
-‘তুমি না বললেও মারিহামকে আমি খেয়াল করব, সর্বক্ষণ ওর পাশে থাকব। ভেবো না তুমি৷ তাছাড়া মিসেস এলিন তার রেকোর্ডেড ভিডিয়োটাতে যদি সত্যি বলে থাকে, তাহলে কিন্তু মারিহাম শেখ পরিবারের সব থেকে আদরের সন্তান জায়িন মাহতাবের চিহ্ন। তুমি জানোই না তাহলে কতটা মূল্যবান হবে সে সবার কাছে। তাই আমার তো ওকে আগলে রাখতেই হবে।’
-‘থ্যাঙ্ক য়্যু, ইয়াসিফ। তুমি ওকেও মাফ করে দিয়ো প্লিজ। এখন ও নিজেও খুব অপরাধবোধে ভুগছে৷ অনেকটা ইন্ট্রোভার্ট বলেই সহজে কিছু প্রকাশ করতে পারে না।’
ইয়াসিফ মুচকি হেসে চোখের পাপড়ি ঝাপটাল। তা দেখে আশ্বস্ত হলো মাভিশা৷ কিন্তু ইয়াসিফ যে তাকে মিথ্যা বলেছিল সেদিন। মাভিশার সঙ্গে ওর চরিত্রের দারুণ একটা সাদৃশ্য রয়েছে। সে নিজেও প্রচণ্ড প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তি বলেই ডিপার্টমেন্টের হেডের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষে নেই এবং তাই বহুবার ওয়ার্নিংও পেতে হয়েছে তাকে।
মাভিশার আনন্দমুখর হাসিটা শীতল চোখে দেখে যায় ইয়াসিফ। তা দেখতে দেখতেই সে মনে মনে বলে যায়, ‘আমি আমার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করতে পারি না কখনই৷ মারিহামকে নিয়ে আমার ভাবনা কী, তা আমি এখনও জানি না। ওর আগামীটা তো নির্ভর করছে কেবল ওর পরিচয়ের ওপর। ও তখনই নিরাপদ থাকবে আমার কাছে, যখন প্রমাণিত হবে জায়িন মাহতাব আর আয়মান মেহরিনের একমাত্র কন্যা ও৷ নইলে… ‘ সেটাও সে ভাবেনি এখন পর্যন্ত।
রোজকার মতো রাতের খাবার শেষে নাওফিল আর তাওসিফ একাকী সময় কাটাতে ট্যারেসে বসেছে। কথা চলছে ইয়াসিফকে নিয়ে৷ কথা বললে ভুল হবে৷ মূলত মেজাজ খারাপ নিয়ে তাওসিফ তার ভাইকে গালাগাল করে যাচ্ছে সমানে। তার ধারণা, সুন্দরী মেয়েদুটোকে হাতের নাগালে পেয়ে অসুস্থতার ভান ধরে হোটেলে পড়ে আছে ইয়াসিফ, আমোদ ফুর্তি করা যেদিন শেষ হবে সেদিন লুচ্চাটা ঘরে ফিরবে।
ঘণ্টাখানিক আগে নাওফিলের সাথেও কথা হয়েছে ইয়াসিফের। নাওফিলকে শুধু বলল সে, ‘বাড়ি ফিরে এবার ঘরের লোকেদের মুখোশ টেনে খুলতে হবে, বুঝলি? তাই মনোবল বাড়াচ্ছি এখানে বসে।’ এছাড়া খু্ব বেশি কথা হয়নি ওদের৷ কথাটা নিয়ে ভাবতে গিয়েও নাওফিল পারল না তাওসিফের গালাগালির চোটে কান ধরে আসায়। বিরক্ত হয়ে তাই দুমাদুম তার পিঠে এক জোড়া কিল বসিয়ে দিলো। আর্তনাদ করে উঠে নাওফিলকেও অকথ্য এক গালি দিয়ে তারপর ক্ষান্ত হলো তাওসিফ। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর নাওফিল গম্ভীর গলায় বলল, ‘স্মরণ আর সৌরভের ঘটনা নিয়ে কিছু বলি, শোন।’
-‘বল শুনছি।’ তাওসিফও গম্ভীর হলো।
-‘সোহাইল কাকু বলছেন, পুলিশের কাছে সৌরভ ঠিকঠাক কোনো জবানবন্দি দেয়নি৷ একেক সময় একেক কথা বলেছে। ইভেন ও নাকি এটাও ঠিকমতো মনে করতে পারেনি ও কীভাবে ছুরির আঘাত পেয়েছিল।’
-‘কিন্তু তোর কাছে ও যা এক্সপ্লেইন করল সেটা কী ছিল? মিথ্যা কেন বলল তোকে? আমিও তো বলি, ওইটুকু বয়সে সিনেমার জ্যাক রোজের মতো ভালোবাসা কীভাবে বুকে পুষতে পারে? হিরোর মতো নিজের বুকে আবার ছুরি চালিয়েও নিতে পারে! এসব শুনে আমার সত্যি তখনই অবিশ্বাস হয়েছিল।’
নাওফিল সরু চোখে তাকাল তখন। ‘আমাকে মিথ্যে বলে ওর কী লাভ?’
-‘আরে কী লাভ মানে? ও স্মরণের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। সেটাই তোর কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছে।’ একটু বিরক্ত গলায় বলল তাওসিফ। নাওফিলের প্রশ্নটা তার কাছে বোকাবোকা লেগেছে বিধায়।
নাওফিল বলল তখন, ‘শুভাকাঙ্ক্ষী প্রমাণ করেই বা লাভ কী? স্মরণের কাছাকাছি থাকতে আমি কোনো বাধা দেবো না এটা ভেবেছে ও? তাহলে ও সেই যে বিদায় নিলো, আর কোনোভাবেই তো ওকে ইনভাইট করেও আনা গেল না। স্মরণ বলেছিল কিরণকে সপ্তাহে দুটো দিন হলেও একটু এসে পড়িয়ে দিয়ে যায় যেন। ও সে কথাও অমান্য করেছে। কিরণ বা স্মরণ কারও সঙ্গেই ও কোনো যোগাযোগ রাখছে না। এসব দ্বারা কী বুঝবি তাহলে?’
একটু ভাবুক দেখাল তাওসিফকে এ কথায়। দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘তুই কী ভাবছিস তাহলে? তবে কি সোহাইল কাকু ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বললেন?’
-‘কিন্তু তিনিই বা কেন বলবেন সেটা?’
-‘আচ্ছা আবার সৌরভের সাথে কথা বললেই তো হয়। পরিচ্ছন্ন মিথ্যা বলতে গেলে কথা সাজিয়ে নিতে হয় আগেভাগে। আর সাজাতে না পারলেই সে মিথ্যা অপরিচ্ছন্ন লাগে। তুই কথা বলেছিলি সেদিন মুখোমুখি। তাই এটা তোরই ভালো বুঝতে পারার কথা।’
-‘সাজানো মিথ্যা বলতে হলেও কিছুটা সত্যের আশ্রয় নিতে হয়। যেন মিথ্যাটাকে খুব সহজেই বিশ্বাস করা যায় সত্য ভেবে। সৌরভের সেদিন জানার কথা ছিল না, আমি আকস্মিকভাবে ওই দুর্ঘটনার প্রসঙ্গটা টানব। যে সেজন্য ও আগেভাগেই কথা সাজিয়ে রাখবে। আর ওর মনে যদি নেগেটিভিটিই থাকত, তাহলে তো সুযোগ ছিল আমার মনে স্মরণ আর ওকে নিয়ে একটা বাজে মনোভাব তৈরি করার৷ ও কি বলতে পারত না সেদিন ওর আর স্মরণের মাঝে অন্তরঙ্গতা হয়েছিল? যাতে এটা জেনে আমার আর স্মরণের মাঝে ঝামেলার সৃষ্টি হয়! যেহেতু স্মরণের কিছুই জানা ছিল না সেদিন ওর সঙ্গে কী হয়েছিল। তাই ও নিজের পক্ষে কিছু বলতেই পারত না। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারত সৌরভের। কিন্তু ও তা করেনি। বরং স্মরণ যে নিষ্কলুষ, সেটাতেই জোর দিয়েছে। এদিকে সোহাইল কাকুও এতটা বছর স্মরণের পরিবারকে সবরকম সাপোর্ট দিয়েছেন, বিপদে-আপদে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। তাকেও অ্যাকিউচড করতে পারছি না। কেবল মিসেস ঝুমুরকেই আমার সন্দেহের শীর্ষে ভাবতে মন চায়। যিনি সেই শুরু থেকে কখনই স্মরণকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি৷ আর এটাও নিশ্চয়ই জানিস না, রেজা হক তার সামান্য অর্জিত অর্থ বা সম্পদের সিংহভাগ স্মরণকে দিয়ে গেছে। এরপর মিসেস ঝুমুরের মানসিকতা স্মরণকে নিয়ে কীরকম হওয়া উচিত বলে মনে করিস?’
সম্মিত প্রকাশে তাওসিফ মাথা নাড়ায়৷ ‘মহিলাকে দেখে মনে হয় না কালপ্রিট ধরনের। তবে চেহারা দিয়ে তো আর মানুষ বিচার করা সম্ভব নয়৷ এখন সৌরভের কথাতে কোনো গোঁজামিল বা মিথ্যা ছিল কি না, তা জানা দরকার তোর। তুই এক কাজ কর, ওকে কল কর এখনই৷ দ্যাখ এখন কী বলে ও।’
-‘আমিও সেটাই ভাবছি কল করব। তাহলে করি এখনই।’ বলে ট্রাওজারের পকেট থেকে ফোনটা বের করেই সৌরভকে কল করল। কিন্তু রিসিভ হলো না৷ ভ্রু কুচকে দ্বিতীয়বার করল। তিনবার রিং হতেই রিসিভ হলো ওপাশ থেকে। ‘আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।’
-‘ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছ, সৌরভ? ব্যস্ত না কি?’
-‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ব্যস্ত বলতে পড়ছিলাম। তাই খেয়াল করতে পারিনি প্রথমবার যখন কল করেছিলেন। আপনারা সবাই কেমন আছেন?’
-‘আলহামদুলিল্লাহ আমরাও সবাই ভালো আছি। আমার শাশুড়ি তো খুব শীঘ্রই আমার চাচি হতে যাচ্ছে। জানো না কি সুসংবাদটা?’
সৌরভ হেসে ফেলল। ‘না তো ভাইয়া। তাহলে অবশেষে সোহাইল কাকুর বিয়ের ভাগ্য খুলছে? হা হা!’
-‘হ্যাঁ অবশেষে।’ হাসল নাওফিলও। ‘তোমার সাথে কয়েকটা কথা বলার ছিল, সৌরভ? সময় হবে?’
-‘বলুন, ভাইয়া৷ সমস্যা নেই।’
-‘তোমার আর স্মরণের সঙ্গে যে ইন্সিডেন্টটা হয়েছিল সেটা নিয়ে তদন্ত করার কথা ভাবছি পুনরায়৷’
-‘এটা তো ভালো কথা, ভাইয়া।’ উত্তেজিত কণ্ঠ সৌরভের। ‘যে কোনো দরকারে আমি প্রস্তুত।’
-‘গ্রেট। তুমি আমাকে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলে, তাতে কোনো ভুল নেই তো? মানে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা ভুলে যাওনি তো?’
-‘উহুঁ, কোনো কিছু বাদ রাখিনি বলতে। তবে ভাইয়া একটা মতামত দিই যদি কিছু মনে না করেন। সে বার আমার স্টেটমেন্ট নেওয়ার পরও পুলিশ কোনো কাজই করতে পারেনি৷ একটা দল গাড়ি করে আসল আমাদের সামনে, তারপর তুলে নিয়ে গেল৷ যেখানে নিয়ে গেল সেখানে পৌঁছতে আহামরি সময় লাগেনি। অর্থাৎ যশোরের মধ্যেই ছিলাম। আমি গাড়িটার নাম্বার না দিতে পারলেও গাড়ির মডেল বলেছি। যেদিক থেকে গাড়িটা এসেছিল সে রাস্তায় তো মানুষজন চলাচল করে, তাই না? তারপর যে গলি হয়ে বেরিয়ে গেল, সে গলি থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে উঠতেই হবে। মূল সড়কে বহু বড়ো বড়ো শোরুম, থ্রি স্টার রেস্ট্রন্ট, বড়ো বড়ো দোকানপাটের অভাব নেই৷ আর সেসব জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরারও অভাব নেই। মানে একটা দায়িত্বশীল ডিপার্টমেন্ট তারপরও কোনোভাবেই একটা ছোট্ট ক্লু পর্যন্ত খুঁজতে পারল না কোনোভাবেই! আমি বারবার সোহাইল কাকুকে বলেছি পুলিশ দায়িত্বসহকারে কেসটা তদারকি করছে না৷ কাকুও অনেকবার পুলিশ সুপারকে বলেছে ভালোভাবে তদন্ত করতে। কিন্তু দু মাসেও তারা কিচ্ছু করতে পারেনি৷ কেসটা গোয়েন্দা ভালো কোনো ডিপার্টমেন্টে দিতে বলেছিলাম তাই। তখন ঝুমুর আন্টি, আমার আব্বু-আম্মুও নিষেধ করল আর ঘাটাঘাটি না করতে এটা নিয়ে। এতে বেশি বেশি লোক জানাজানি হবে। যেটা স্মরণের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতির। তাই সোহাইল কাকুও আর এগোতে পারলেন না। এজন্য বলতে চাইছি, পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট মানে পিবিআই এর হাতে তদন্তের দায়িত্বটা দিতে পারেন, ভাইয়া।’
তাওসিফ নাওফিলের পাশে বসেই সৌরভের দৃপ্তকণ্ঠের কথাগুলো শুনে গেল। কলটার স্পিকার উচ্চ রয়েছে। নাওফিল তাওসিফের দিকেই চেয়ে তখন। সৌরভকে বলল, ‘সোহাইল কাকুর সাথেও আজ এ নিয়ে কথা হয়েছে৷ কিন্তু তিনি তো বললেন তুমি সঠিকভাবে কোনো স্টেটমেন্টই রাখতে পারোনি পুলিশের কাছে। যে সেই সোর্স ব্যবহার করে কেসটাকে এগোতে পারবে তারা। তোমার বুকে ছুরিটাও নাকি কিডন্যাপার মেরেছিল বলেছিলে?’
সৌরভ অস্বীকৃতি জানাল, ‘আমি এমন কিছু বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না৷ আমার যখন কোনোরকম জ্ঞান ফিরল, পুলিশকে আমি কী বলেছিলাম তা আমার সত্যিই মনে নেই৷ যতবার চোখ মেলেছি ততবারই আমি চেষ্টা করেছিলাম কথা বলতে৷ হয়ত এলোমেলোভাবে সবটা বলেছিলাম। কিন্তু আমি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর পাই টু পাই সব ঘটনা বলেছি তাদের। আমাদের তো কিডন্যাপার মারার জন্য তুলে নিয়ে যায়নি। ওরা চেয়েছিল আমার আর স্মরণের মধ্যে… আর আমার শরীরেও তেমনই একটা ড্রাগস দেওয়া হয়েছিল। নয়ত কেন আমার হঠাৎ করেই স্যালাসিটি ফিলিং হবে? আমার এখনও মনে পড়ে ওই বাস্টার্ডগুলো কী কী অশ্লীল আচরণ করে দেখিয়েছিল আর কী বলেছিল ইন্টিমেট হতে।’
নাওফিল শেষে সৌজন্যমূলক কিছু কথা বলে ফোনটা রাখল৷ তাওসিফ বলল, ‘সৌরভের কথায় কোনো ছলচাতুরি নেই মনে হচ্ছে। সোহাইল কাকু আসলে মুখে যতটা স্মরণের জন্য কেয়ারফুল দেখান, মনে হচ্ছে আদতে ততটাও না। তিনি এই বিষয়টা তখন যথেষ্ট হেলাফেলাভাবে নিয়েছিলেন৷ যেটা তার আজকের কথাতে ক্লিয়ার৷ আর এ কারণেই পুলিশ সুপারও সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। যদি দিতো তাহলে কোনো না কোনো সূত্র তো পেতোই। আর এর পেছনে কিছু্টা মিসেস ঝুমুরও দায়ী৷ নিজের মেয়ে নয় বলেই তিনিও খুব বেশি গরজ করেননি তখন। অথচ দ্যাখ কিরণের বেলাতে কোনো বাধা দেননি কাকুকে।’ বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল৷ ঝুমুরের এমন কতশত অবহেলা এ পর্যন্ত অনুভব করেছে দীধিতি! ছোটো থেকেই মেয়েটা এই অবহেলার মাঝেই বড়ো হয়েছে। খারাপ লাগল তাওসিফের, দীধিতির দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে।
চিন্তিত চেহারায় নাওফিল বলে উঠল, ‘আমি কখনও রেজা হকের মৃত্যুটা নিয়ে ভাবিনি৷ কারণ, যেভাবেই মরুক বা যে-ই মারুক। তাতে আমি খুশি ছিলাম৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা না ভেবেই ভুল করেছি। মিসেস ঝুমুরকে কাকু একটা দুটো বছর ভালোবাসছেন না। সেই একুশ বাইশ বছর বয়স থেকে। আমাদের শেখ বংশের পূর্ব পুরুষদের রক্তেই নাকি দাম্ভিকতা, উচ্চ মর্যাদা। তাদের মাঝে ছোটো থেকেই এমন সব ব্যাপারগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হত। সোহাইল কাকুর গল্প তো শুনেছিস যু্বক কালে কী পরিমাণ দাম্ভিক, রগচটা, জেদি আর দাঙ্গাবাজ লোক ছিলেন। রাজনীতিতে ঢুকেছেন কলেজ জীবন থেকেই। বড়ো বড়ো নেতাদের আন্ডারে থেকে খুনখারাবিও কম করেননি। সেই লোক বয়সে বড়ো এক নারীর মাঝে আটকালেন৷ পুরোদস্তর পাগলই হয়ে গিয়েছিলেন। যে নারী কিনা বিবাহিতাও। স্বামী, সন্তান আছে। যা তিনি সহ্য করতে না পারলেও নাকি করে গেলেন। তার এই গল্প আমাদের গোষ্ঠীতে সবার মুখে চর্চা হয়। অথচ তার নিজেরই তখন যে ক্ষমতা আর এই বংশের যে দাপট ছিল এবং এখনও আছে। তাতে সে চাইলেই কি পারত না রেজাকে নিমিষেই শেষ করে মিসেস ঝুমুরকে বিয়ে করে নিতে?’
-‘আর সেটাই কি সে করেনি? রেজা হকের মৃত্যু রহস্য খুব একটা গভীর না৷ এর পেছনে হয় বড়ো কাকু নয় ছোটো কাকু। এটাই ভেবে এসেছি আমরা। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সরষের মধ্যে ভূত।’
-‘এটা তো গেল। তারপরও একটা কিন্তু থেকে গেল না? তাহলে এতগুলো বছর কেন ঝুমুরকে বিয়ে না করে বসে রইলেন সোহাইল?’ তাওসিফকে প্রশ্নটা ছুঁড়ল নাওফিল।
তাওসিফ তা নিয়ে ভাবল। কিন্তু উপযুক্ত কারণ দাড় করাতে পারল না। নাওফিল বাঁকা হাসল তাওসিফের অপারগতায়। ‘কারণ, দ্বিতীয় বাধা ছিল স্মরণ।’
-‘তাহলে তো কিরণও বাধা হবে। স্মরণ একা কেন? আর হলেই বা খুন না করে সৌরভের সঙ্গে কেন স্ক্যান্ডাল করতে চাইবে?’ দ্বিধাজড়িত গলায় বলল তাওসিফ।
নাওফিল একটু সময় নীরব থেকে নিজের যুক্তিগুলো সাজিয়ে নিলো। তারপর ব্যক্ত করল, ‘স্মরণ রেজা হকের মাধ্যমে এ দেশে যখন আসে, তখন স্যামুয়েলদের থেকে স্মরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা নিয়েছিল তোর বড়ো কাকু। কিন্তু সেই বা কোনো কারণ ছাড়া উটকো ঝামেলা ঘাড়ে নেবে কেন? তবুও নিয়েছিল একমাত্র তার স্নেহের ছোটো ভাইয়ের অনুরোধে৷ যখন স্মরণকে যশোর নেওয়া হয়, তখনও রেজা হক দশটা বছর ওকে নিয়ে নিরাপদ ছিল বড়ো কাকুরই সহায়তায়। অর্থাৎ আব্বুর(জায়িন) অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়েই৷ কিন্তু তার মাঝেই সোহাইল কাকু জড়িয়ে গেলেন মিসেস ঝুমুরকে ভালোবেসে। এবং ওই জেদি, দাঙ্গাবাজ, বড়ো বড়ো নেতাদের ডান হাত মানুষটা চুপচাপ সহ্য করে গেলেন রেজার পাশে মিসেস ঝুমুরকে বছরের পর বছর। এর কারণ কি হতে পারে না তোর বড়ো কাকুর আদেশ বা নিষেধাজ্ঞায়?’
-‘সোহাইল কাকু জানলেন কীভাবে রেজা হক বা মিসেস ঝুমুর বড়ো কাকুর আশ্রয়ে তখন?’
নাওফিল মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘ওদেরকে যশোরে তোর বড়ো কাকু যে নিরাপত্তা দিয়ে গেছেন, তা কার বা কাদের মাধ্যমে বল তো?’
তাওসিফ বোকা হেসে মাথা দুলাল। এটা তার মাথাতেই আসেনি৷ ‘তুই এত বিস্তারিত জানলি কী করে? সোহাইল কাকু বলেছেন?’
-‘নাহ্। সেদিন আব্বু(জাকির) অফিসে বসে স্মরণের ব্যাপারে কথা বলেছে আমার সঙ্গে। জাইমা প্রসঙ্গ নিয়েও। মহিলা অবৈধ পথে বাংলাদেশে ঢুকেছে অনেকদিনই৷ তাই এলার্ট করে দিলো, স্মরণ যেন কোনোভাবেই যোগাযোগ না করে তার সাথে৷ জাইমার মাধ্যমে টেরোরিস্ট দল পর্যন্ত পৌঁছনোর চেষ্টা করা হবে৷ সেই সাথে জাইমাও অ্যারেস্ট হবে৷ তাই জাইমাকে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। মহিলার সাথে যাদেরই যোগাযোগ হবে তাদেরকেও পুলিশের আওতায় নেওয়া হবে।’
-‘আচ্ছা৷ মূল কথায় ফের এবার।’
-‘হুঁ, তো ওই প্রসঙ্গ থেকেই স্মরণকে কতগুলো বছর আর কীভাবে কীভাবে সেফটি দিয়ে গেছে সেসব গল্পই বলল আব্বু। তাও নিজে থেকেই৷ তখনও এরকমভাবে কোনো বিষয় মাথায় ক্লিক করেনি৷’
-‘এর মানে দাড়াচ্ছে যে, সোহাইল কাকু কষ্টেসৃষ্টে দশটা বছর রেজাকে সহ্য করলেও যখন সে মেয়র হয়ে গেল যশোরের, তখন আর দেরি করেনি রেজাকে সরিয়ে দিতে।’
-‘আর তারপর বাধা রইল স্মরণ। দুই দুইটা মেয়ের উটকো ঝামেলা ঘাড়ে নিয়ে ভালোবাসার মানুষকে গ্রহণ করার অত উদারতা বা নৈতিকতা সোহাইল শেখের মাঝে ছিল না৷ এদিকে চাইলেও স্মরণকে রেজার মতো খুন করতে হয়ত বিবেকে বাধা দিয়েছিল তার। কিংবা জাকির শেখ জানতে পারলে একটা ঝামেলা হলে হতেও পারে, তা ভেবেও স্মরণকে মারার চিন্তা করেনি৷ তাই স্মরণের সঙ্গে সৌরভের মেলামেশাকে টার্গেট করে সে। স্ক্যান্ডালে ওরা দুজন জড়িয়ে পড়লে ওই সময়েই মিসেস ঝুমুর নিশ্চয়ই সৌরভের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করে ফেলবেন। তাছাড়া আর কে-ই বা স্মরণকে বিয়ে করত ওরকম একটা ঘটনার পর৷ এমনটাই ভাবা স্বাভাবিক সৌরভের বাবা-মাও ভালো মানুষ বিধায় মেনেই নিতেন৷ মানে খুব সুক্ষ্ম উপায়ের পরিকল্পনা এটা। তাতে কী হতো? একটা ঝামেলা নেমে যেত ঝুমুরের জীবন থেকে। আর তাকে পাওয়ার পথটাও ততই সহজ হত তখন।’
-‘কিন্তু এরকম কিছুই হলো না শুধু সৌরভের প্রাণ সংশয় ঘটে যাওয়ায়।’ চকিতেই কথাটা সংযুক্ত করল তাওসিফ।
নাওফিল দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ল নিচেই। আকাশে দৃষ্টি মেলে বলল, ‘এসব কিন্তু আমাদের স্রেফ নিজস্ব যুক্তি সব ঘটনার প্রেক্ষিতে। তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ষাট ভাগ। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই৷’
-‘এমনটাই হবে দেখিস। বড়ো কাকুর সাথে তুই খোলামেলা কথা বললেই আরও অনেক কিছু জানতে পারবি। কিন্তু তুই তো তাকে বিশ্বাসই করতে চাস না। অথচ দ্যাখ সে-ই তোকে কত কথা জানিয়েছে নিজ থেকে। এসব না জানলে তুই এত কিছু আজকে আন্দাজই করতে পারতি না। তুই যতটা খারাপ ভাবিস কাকুকে, আমার কখনই তাকে সেরকম মনে হয় না। তোকে যে কাকু কতটা ভালোবাসে, তুই তা বুঝবি না।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫২
বলতে ইচ্ছা করল নাওফিলেরও, ‘তাকে খারাপ ভাবলে কি কখনও তার আড়ালে আব্বু বলে ডাকতাম? আমিও তাকে খুব ভালোবাসি৷ তার মাঝেই নিজের আব্বুকে খুঁজে নিয়েছি বহু আগে। বাড়ি থাকলে রাতের আঁধারে এখনও যে চুপিচুপি আমার ঘরে এসে আমাকে বারবার জান ডেকে নীরবে কাঁদে, চোখ বুজে তাকে আমিও মনেমনে আব্বু ডেকে তৃপ্ত হই। আমি যেমন তার মাঝে আমার আব্বুকে খুঁজি, জানি সেও আমার মাঝে তার পরম স্নেহের ভাইকে খোঁজে। আমি পারিনি তাকে না ভালোবেসে থাকতে।’
