Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

ভারী মেঘের বর্ষণেও এ শহরের তপ্ত বাতাসে শীতলতা অনুভূত হয় না, নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা মেলে না রাতের প্রগাঢ়তা বাড়লেও । ব্যস্ত শহরের প্রধান উদ্দেশ্যই যেন সর্বক্ষণ ব্যস্ততা দেখানো। শহর জেগে থাকে তাই। কিংবা জেগে থাকতে হয়।
উৎকণ্ঠা মন নিয়ে দীধিতি টেবিল ঘড়িটার দিকে বারবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করছে। সময় দেখা শেষে আবার চোখ মেলছে জানালার বাইরে৷ অদূরের কিছু অট্টালিকা ঘুমন্ত আর কিছু জাগ্রত। তার ঘরের জানালা বরাবর খানিকটা দূরে চারতলা অট্টালিকার অনেক বড়ো ছাদটায় জ্যোৎস্না যেন উছলে পড়েছে। সেদিকেই মনোযোগ তার। এই নতুন বাসায় যেদিন থেকে এসেছে সে, সেদিন থেকে ওই ছাদটার প্রতি প্রবল আকর্ষণ বোধ করে সে। মনে হয়, কারও একজনের অপেক্ষায় থাকে ওই বিশাল ছাদটা। কখনো কারও বা হয়তো ওখানে সর্বদা যাত্রা ছিল এই নিঝুম রাতে। আর সে ওই মানুষটিকে দেখার জন্য এখানে আসার চারটা রাত চলছে জানালার সামনে বসে চেয়ে থাকে ছাদের দিকে। এমন উদ্ভট ভাবনার কোনো যুক্তি নেই তার। শুধু তার মনে হওয়াটার ওপর বিশ্বাসটা এত দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছে যে, এই বিশ্বাস থেকে সে বিচল হতে চায় না। সে খুব চায়, কেউ আসুক আর সত্যিই তার বিশ্বাসটা রাখুক।

যে নাওফিলের বানোয়াট অভিযোগে তাকে হোস্টেল ছাড়তে হয়েছিল, সেই হোস্টেলে সে আর ফিরে যায়নি। হোস্টেলের মালিক কল করার পরেও না। ঊর্মির কাছেও থাকেনি। ভীষণ কান্না করেছিল ঊর্মি তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য৷ ইরফানও মাফ চেয়ে তাকে ওদের কাছে থাকার অনুরোধ করেছিল। দীধিতি তখন শুধু প্রশ্ন করেছিল, ইরফান কেন নাওফিলের কথায় এমনটা করেছে? কোনো জবাব দেয়নি ইরফান। তারপর সেও আর ওদের সাথে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। এটুকু বুঝে গেছে দীধিতি, নাওফিলের দৃষ্টিসীমার বাইরে সে কখনো থাকতে পারবে না। ওর থেকে আড়ালে থাকার ইচ্ছাও আর নেই দীধিতির। ঊর্মি ওর বান্ধবীদের সঙ্গে একটা ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মিরপুর দশে আছে সে আপাতত। তামান্না, তন্বী, ঐশী রোজ রোজ তাকে কল করে এক প্রকার নাকিকান্না শুরু করেছে দেখা করবার জন্য। আজ গায়ে হলুদ ছিল ঐশীর। সারাদিনের বৃষ্টির প্রখারত্ব ভয়ানক ছিল, এই অসিলায় গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটা এড়িয়ে গেছে সে। আগামীকালই শহরের বড়ো কোনো কনভেনশন সেন্টারে ঐশী আর রুমানের বিয়ে। সেখানকার নামটাও জানে না সে, জানার আকাঙ্ক্ষাও হয়নি। এসবের মাঝে ক্ষুদ্র একটা বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে নাওফিল এ ক’দিনে আর যোগাযোগ করেনি তার সঙ্গে।

ঘড়িতে বারবার সময় দেখছিল, রাত দেড়টা বাজার অপেক্ষাতে আছে সে। অপেক্ষার মূল হেতু দীপ্তর ফোনকল। গত চারদিনে নাওফিলের সাথে পরিচয়ের আড়াইটা মাস সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ভেবে প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে, আগামীকাল দীর্ঘ সময় নিয়ে নাওফিলের সাথে কথা বলবে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, আজ দীপ্তর সাথে অর্থবিহীন সম্পর্কটার সমাপ্তি টানবে। সময় তো সামনের দিকে অগ্রসর হয়েই চলেছে। কল করার নাম নেই দীপ্তর৷ সে বুঝে উঠতে পারছে না, দীর্ঘ দু’মাসের যোগাযোগ না করার ফলে এই সম্পর্কটার শেষ আপনা আপনিই হয়ে গেছে কি না! এমনটা হলে তো তার আর দায় নেই। কিন্তু নিশ্চিত হওয়া তো জরুরি। শেষবারের মতো ঘড়িতে তাকিয়ে আরেকবার ছাদটার দিকে তাকাল। কেউ আসেনি, আসবে কি না জানা নেই। তবে এখন তাকে ঘুমাতে যেতে হবে।

বৃষ্টির আধিক্য আজও ভীষণ আর তিন বান্ধবীর ফোনকলও। কিন্তু দীধিতি ভেবেছেই এমনটা, যাবে বাকিদের মতো একটা গিফ্ট হাতে। নিমন্ত্রণ রক্ষা করা শেষে বেরিয়ে আসবে। তাই দুপুরের কিছু সময় পর যাবার পরিকল্পনা তার। ভার্সিটি গিয়ে ক্লাসে করে ফিরেছে দুপুরে। মোবাইলটা আজ এত বেজেছে, বাজতে বাজতে চার্জ খতম হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ফোনটা চার্জে বসিয়ে একটু বিশ্রাম শেষেই গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কনভেনশন সেন্টার ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই সময়ে দীপ্তর কল এল। প্রায় সারারাত অপেক্ষা করার পর এখন আর কথা বলতে ইচ্ছা করল না ওর। ভাবল বাসায় ফিরে একটা মেসেজ করে দেবে। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হবার কাছাকাছি। আজ জ্যামে বসেও সে বিরক্ত হচ্ছিল না, সেই চাইছিলই দেরিটা হোক।

আমন্ত্রণ কার্ড ব্যতিত ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। এখানে একটু সমস্যাতেই পড়ে গেল সে। নামীদামী লোকের ভীড় আছে বলেই হয়তো এত কড়া নিরাপত্তা। ও হ্যাঁ, সে তো ভুলেই গেছে। নাওফিলের বাবা এমপি। রুমানের পরিবার ওদেরই স্বজন। এমন আরও সম্মাননীয় মানুষ আছেন নিশ্চয়ই এখানে। কিন্তু তার কাছে তো আর আমন্ত্রণের কার্ডটা নেই। এখন কি ঐশীকেই শেষমেশ কল করবে? বিয়ের কনেকে বিরক্ত করতে একটুও ইচ্ছা করছে না ওর। কল করল তামান্নাকে, সমস্যাটা জানাল। তামান্না তাকে দু’মিনিট অপেক্ষা করতে বলে ফোন কাটতেই তার সামনে হাজির হলো তুষার। মুচকি হেসে অনেক সুন্দর করে সালাম দিলো সে। দীধিতি বুঝে পায় না, এত অতিরিক্ত ভদ্রতা কি ওর সামনেই দেখায় এরা? না কি বস্তুতই ছেলেগুলো ভদ্র? অন্তত নাওফিলকে সে ভদ্র বলে বিশ্বাস করবে না এ জীবনে।
ভেতরের সজ্জা খুবই দারুণ। সেদিকে নজর দিতে গেলে দ্রুত আর ফেরা হবে না। কোথার থেকে তামান্না আর তন্বী এসেই ওকে জাপটে ধরল৷ কিন্তু পাত্তা এদিকে না দিয়ে ও আশেপাশে নাওফিলকে খুঁজতে শুরু করল। তামান্না আর তন্বীর অভিযোগের বক্তব্য থামিয়ে ওদেরকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, ‘নাওফিলকে কোথায় পাওয়া যাবে?’
খুবই অবাক হলো ওরা দু’জন। এতদিন পর ওদের সাথে সাক্ষাতের প্রতি এতটা উদাসীন দীধিতি! উলটে নাকি আগ্রহী নাওফিলের প্রতি!

-‘সন্ধ্যায় আসবে শুনেছি। ঐশীর কাছে চল।’ তন্বী বলল।
আসার পর থেকে নিজের বান্ধবীসহ নাওফিলের বন্ধুদের আতিথেয়তাতে দীধিতি হাসবে না কি রাগবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত। অত্যাশ্চর্য ব্যাপার আরেকটি হলো, রুমানের বাবা-মা তার সঙ্গে এসে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে কথা বলে গেছেন। মনে হচ্ছিল ছেলের বউ ঐশী নয়, সে-ই। এমন আদরের অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হচ্ছে সে বারবারই। যতটুকু বুঝতে পারল, নাওফিলের পরিবার থেকে বাকিরা এসে পড়লেও নাওফিল আর তার বাবা-মা আসেননি৷ নাওফিলের চাচা-চাচি, জমজ চাচাতো দু-ভাই আর ছোটো একটা বোনকে চেনাল ঐশী। পরিবারের এই সদস্যগুলোর চেহারার সাথে নাওফিলের চেহারার হালকা মিল পাওয়া যায়। এর মাঝে দু’টো আশ্চর্যজনক সুসংবাদও শুনল সে। এই দু’মাসের মাঝে তামান্না তুষারের ওপর অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, ওদের মাঝে একটা ভালো সম্পর্ক আছে। কিন্তু তুষারের তরফ থেকে ভালোবাসার অনুভূতি টের পায় না তামান্না। তাই সে এগোতেও দ্বিধাতে আছে। আরেক দিক থেকে শিহাব তন্বীকে সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসে আছে। তন্বী শিহাবকে পছন্দ করলেও প্রস্তাবটা ঝুলিয়ে রেখেছে। শিহাব ধৈর্য নিয়ে কতদিন তার পিছে সময় ব্যয় করতে রাজি তা দেখার পরই সিদ্ধান্ত নেবে সে, এ প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি করবে না।

মাগরিবের আযানের অনেকটা সময় পরই নাওফিল বাবা-মায়ের সাথে এসে পৌঁছল কনভেনশন হলে। দূর থেকে দীধিতি এক পলক ওকে দেখেই ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। রুমানের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার সময় তাদের হাবভাব সুবিধার লাগেনি ওর। এতক্ষণে আন্দাজ করেছে সে, ওঁরা জানে নাওফিল তাকে পছন্দ করেছে। এবং বিয়েও করতে চায়। এখন আবার নাওফিলের বাবা-মাও এসে হাজির। না জানে, তাঁরাও ছেলের এ সিদ্ধান্ত জানে কি না! তাই আপাতত এই পরিবার থেকে সে দূরেই থাকতে চায়।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাকআশাক, সাজসজ্জা দেখছিল দীধিতি। এই পরিবেশের সাথে সে মানানসই ছিল কি না এটাই দেখছে। জাম রঙা কানের দুলটার দিকে নজর পড়তেই একটু আগে দেখা জাম রঙা পাঞ্জাবির নাওফিলের চেহারাটা মনে পড়ে গেল। গাঢ় রংগুলোতে এই ছেলেটিকে একটু বেশিই উজ্জ্বল লাগে আর ভালোও লাগে। কিন্তু এই ছেলের রহস্য তার পছন্দ নয়, ইদানীং রহস্যময় কোনো কিছুই তার পছন্দ হয় না নাওফিলের মুখোমুখি হবার পর থেকে। এমনকি রহস্যময় উপন্যাস পড়াও বন্ধও করে দিয়েছে শুধু নাওফিলকে স্মরণ না করতে।
ঘড়িতে সময় দেখল সাতটা বেজে গেছে। অথচ ভেবেছিল কত দ্রুত বেরিয়ে পড়বে! দেরি যেহেতু হয়েই গেছে আরেকটু দেরি করে যেতে চায় সে। নাওফিল নিজে থেকে তাকে কল করে কি না এটা দেখা জরুরি।

পরিকল্পনা করে রাখা বিষয়গুলোই কেন এলোমেলো হয়ে যায়? নাওফিলের মুখোমুখি হবার পরও দীধিতিকে এড়িয়ে গেছে সে। এতে দীধিতির খুশি হওয়া উচিত না রেগে যাওয়া উচিত এ নিয়েও সে দ্বিধান্বিত। পরিস্থিতির এত গড়বড় অবস্থা আগে কখনো তার সাথে হয়নি। আসার পর থেকে তামান্না আর তন্বী তার পাশাপাশি থাকছিল সব সময়। এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে ঐশীর কাছে বহু কষ্টে ওদের পাঠিয়ে দেয়। হল থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ই নাওফিল, তুষার, রাতুলকে দু’জন লোকের সঙ্গে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে। ওকে কেউ খেয়াল করেনি তখনো। নাওফিলের মুখ থেকেই প্রথম কথা শুনতে পায়, ‘কিন্তু আপনাদেরকেই আমার ডেডবডির ব্যবস্থা করতে দিতে হবে। পেমেন্ট প্রয়োজনে বাড়িয়ে দেবো আরও।’
অপরিচিত ব্যক্তি দু’জনের একজন মিনতির সুরে বলল তখন, ‘স্যার, চাকরি নিয়ে টানাটানিতে পড়ে যেতে হবে আমাদের।’

-‘চাকরির ব্যাকআপ আমরা দেবো বলেছি না?’ কঠোর গলায় বলে তুষার।
ওই ব্যক্তি জবাবে বলে, ‘সরকারি চাকরির মতো ব্যাকআপ হলে টেনশন করব না। কিন্তু পুলিশে ধরা পড়লে?’
-‘আপনারা বোধ হয় ভুলে যাচ্ছেন সেখান থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতাও আমাদের আছে।’ তারপরই রাতুল বলে ওঠে ঠান্ডা সুরে। বলেই আশেপাশে সাবধানি নজরে রাতুল তাকাতেই দীধিতি সরে পড়ে। ভেতরে আবার কয়েক মিনিট ঘোরাফেরা করে যখন দেখল নাওফিলরা আর নেই জায়গাটাতে, তখনই সে সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই কালো একটা গাড়ি এসে থামে তার সামনে, পেছন সিটের জানালা থেকে মুখ বের করে নাওফিল বলে ওঠে তাকে, ‘কথা আছে না আমার সঙ্গে তোমার? তোমার বাসায় যেতে যেতে বলবে, এসো।’
-‘আপনার মতো সিনেমা করতে ইচ্ছা করছে না। সামনে থেকে সরুন গাড়ি নিয়ে।’
-‘এত মিহি গলায় ধমকালে গায়ে বাধে না। রাগ করাও শেখোনি, ধমকানোও শেখোনি। এদিকে তোমার জন্য আমাকে আমার ব্যক্তিত্বের বাইরে চলে আসতে হচ্ছে বারবার। আমার মামা-মামি তোমাকে খুঁজছে আমার আব্বু আম্মুর সামনে নিয়ে যাবার জন্য। আব্বু-আম্মু তোমাকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে আছেন। গাড়িতে না এলে আমি কিন্তু জানিয়ে দেবো তুমি মাত্রই বেরিয়ে সেন্টারেে সামনে এসে দাঁড়িয়েছ। এ কথা শুনে এক্ষুনি তোমাকে মামা নিয়ে যেতে লোক পাঠাবেন।’

কী বলে যে রাগ প্রকাশ করবে দীধিতি, তাও ভেবে পেল না সে। জিজ্ঞেস করল, ‘আমার সিকিউরিটি কে দেবে আপনার সঙ্গে গাড়িতে উঠলে আমার যে কোনো ক্ষতি হবে না?’
-‘সিনেমা নিজেও তো কম জানো না। ক্ষতি করার শখ থাকলে এতদিনেই কি করতাম না?’
আর কোনো কথা বাড়াল না দীধিতি। তবে সে যে নাওফিলের সঙ্গে আছে এ খবরটা তামান্না আর তন্বীকে জানিয়ে রাখা জরুরি। দু’জনের নাম্বারে মেসেজ করেই গাড়িতে উঠে পড়ল। দু’জন দু’প্রান্তে বসেছে। গাড়ি ছাড়তেই নাওফিল জিজ্ঞেস করল, ‘দীপ্তর ভেজালটা মিটিয়েছ তো? না দায়িত্বটা আমি নেব?’
-‘একদম ফাজলামি কাজটাজ করবেন না।’

কথাটা এত জোরেই ধমকে বলল দীধিতি, সামনে থেকে ড্রাইভারও পেছন ঘুরে তাকাল একবার। নাওফিল জানালার বাইরে চেয়ে প্রশ্নটা করেছিল। ধমকটা শুনে চোখ বড়ো করে তাকাল ওর দিকে। গাড়িতে আলো না জ্বললেও রাস্তাঘাটের আলোয় স্পষ্ট দু’জন দু’জনের মুখ দেখতে পাবে। নাওফিলের ছোটো চোখদু’টো হঠাৎ বড়ো হওয়াই দীধিতি টের পেল, চমকে নয় রেগেই তাকিয়েছে নাওফিল তার দিকে। সেটা স্পষ্টও হলো যখন নাওফিল মৃদুস্বরে বলল তাকে, ‘মেয়েদের রাগান্বিত কণ্ঠও নিচু হওয়া উচিত।’
ব্যাপারটা গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিলেও আপাতত নাওফিলের সামনে তা মেনে নিতে রাজি নয় দীধিতি। জবাব দিলো, ‘স্বামীর ঘরে যাবার পর ভালো হবো। আমার বিষয়ে উচিত অনুচিত নিয়ে আপনার থেকে কোনো কথা শুনতে রাজি নই।’
কথাগুলো শুনে একবার শীতল চোখে ওকে দেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো নাওফিল। দীধিতি জিজ্ঞেস করল এরপর, ‘আমাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যটা কী ছিল আপনার?’

-‘তোমাকে বিয়ে করা।’
অধৈর্য সুরে দীধিতি বলে উঠল, ‘আমি পরিষ্কারভাবে সবটা জানতে চাইছি, নাওফিল। সরাসরি বুঝিয়ে বলুন আমাকে। কোনো হেয়ালি করবেন না। সেদিন ছাদে কেকটা আপনিই আমার গায়ে ছুঁড়েছিলেন, তাই তো?’
-‘আমি ছাড়া এমন মজা কে করবে তোমার সঙ্গে?’
-‘কেক ছোঁড়ার পর মিনিট চারেক সময় আমি ছাদে ছিলাম। এই চার মিনিটের মাঝে আপনি ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিলেন।’
-‘তুমি ফ্ল্যাটে আসবে তাই গিয়েছিলাম।’
-‘আমি ছাদে যাবার আগে আপনার অ্যাপার্টমেন্টটা ঘুরে ফিরে দেখেছি। আপনার বেডরুমের দরজাটাও খোলা ছিল। রুমে ঢুকিনি ঠিকই। কিন্তু বাইরে থেকেই যতটা চোখে পড়ে তাতে আমার চোখে তখন কোনো অস্বাভাবিকতা পড়েনি। যদিও বাথরুম দেখা যায়নি। আপনি চার মিনিটের মাঝে এসে একটা জীবন্ত মানুষকে পুরোপুরি কেটে ছিঁড়ে খুন করে ফেলতে পারবেন না।’

গাড়িতে উঠলে নাওফিল কখনোই গান শোনে না। আদতে গান শোনার ইচ্ছা, অভ্যাস কোনোটাই নেই তার। কিন্তু এই কথাগুলোর মাঝেই ড্রাইভারকে সে গান চালিয়ে দেওয়ার আদেশ করল একটু বেশি আওয়াজেই। কোনো একটা হিন্দি গান চলছে। এমনি সময়ে শুনলে গানটা দীধিতি খুব উপভোগ করত। আপাতত সে কথা চালিয়ে গেল, ‘কারণ, লিফট থেকে নেমে পৌঁছতেও দু’মিনিট সময় যাবে, তারপর ঘরে ঢুকে একটা জীবন্ত মানুষকে বাকি দু’মিনিটে অত ভয়ানকভাবে খুন করা সম্ভব নয়। আপনি যেটা দেখিয়েছেন সেটা সাজানো, পরিকল্পিত। লাশটার চোখদু’টো বন্ধ ছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে আরও আগেই মারা গেছে। খুন করার সময় আপনি নিশ্চয়ই ওর চোখ বন্ধ করে রাখেননি। আর লাশটাও ঘুমিয়ে থাকার মতো চোখ বন্ধ করে চিৎকার করবে না। রক্তগুলো তাজা ছিল ঠিকই। কিন্তু লাশের ফ্যাকাশে শরীর দেখে তখন মাথায় না এলেও এখন স্পষ্ট, রক্তগুলো ওই লাশের ছিল না। হয় কোনো পশুর রক্ত, নয়তো ব্ল্যাড ব্যাঙ্ক থেকে সংগ্রহ করা ছিল। কিংবা ওগুলো কোনো রক্তই নয়। আপনি এমনভাবে লাশটার শরীরে আর ফ্লোরে রক্ত কিংবা রক্তের মতো দেখতে কোনো কেমিক্যাল ছড়িয়ে রেখেছিলেন যেন দেখে মনে হয় সদ্যই খুন করা লাশটার রক্ত ওগুলো। যে চিৎকারের আওয়াজ এসেছিল কানে, সেটা সাউন্ড বক্সে প্লে করা ছিল। আপনার অ্যাক্সিডেন্টের দিন আপনাকে দেখতে গিয়ে সাউন্ড বক্সটা চোখে পড়েছিল। আফসোস, আজকের মতো এত কিছু সেদিনও ভেবে দেখিনি। যা করেছেন সবটাই নাটক আর আমাকে ভয় দেখানোটাই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আপনার। এখন বলুন, কেন আমাকে ভয় দেখিয়েছেন?’

দেরি করল না নাওফিল জবাব দিতে, ‘তুমি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মেয়ে। তা কিছুটা বুঝেছিলাম তোমার সাথে দেখা হবার দ্বিতীয় দিনে। আর অনেকটা আত্মসংযমী, প্রতিবাদীও। তোমার সৌন্দর্য আর এই গুণগুলোই তোমাকে টার্গেট করার আসল কারণ। কিন্তু আমার জরুরি বেশি সাহসী আর বুদ্ধিমুতী মেয়ের। তোমার সাহসিকতা দেখায় ওই দিনের নাটকটা করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।’
-‘আমার সাহসিকতা দেখে আপনার কী লাভ?’
-‘ওই যে বললাম, বিয়ে করা। আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী চাই যে অন্য মেয়েদের থেকেও অনেক বেশি সাহসী আর বুদ্ধিমতী হবে।’
-‘আপনার কি মনে হয় না আপনার কথাবার্তা, ভাবনাচিন্তা সবটাই অদ্ভুত, অস্বাভাবিক? পাগলামি বললেও ভুল হবে না। আমি এমন অস্বাভাবিক চরিত্রের মানুষকে কেন নিজের জীবনে জড়াব?’
এবার বিরক্ত হচ্ছে নাওফিল, ‘সব কিছুর পেছনেই একটা উদ্দেশ্য থাকে, দীধি। আমি তোমাকে সেদিন বলেছি। শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়, আমার সহযোগী হিসেবেও তোমাকেই আমার জরুরি।’

-‘আমি এতটুকুতেই বুঝতে পেরেছি আপনার জীবনটা জটিল। শুধু আমাকেই ভয় দেখাতে কোনো ডেডবডি কিনে এনে ছেলেখেলা করবেন না আপনি। আর এসব বুঝেই আমি আপনার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাই না। আমিও আগেই বলেছি, আমি সাধারণ মানুষ। সাধারন, নির্ভেজাল জীবনটাকেই আমি গ্রহণ করব।নিজের ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করে দিয়ে বাড়ি ফিরেও যেতে পারছি না। আপনি আমার জীবনটাকে নষ্ট, থেমে যাওয়া ঘড়ির মতো থামিয়ে রেখেছেন। কোনোভাবেই আমি এগোতে পারছি না। মাত্র কয়েকটা মাস আছে আমার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার। অনার্সের রেজাল্টের ওপর আমার আগামীটা নির্ভর করছে। কী করলে আপনি আমাকে রেহাই দেবেন বলুন?’
-‘আমাকে বিয়ে করে নাও। এখনের থেকেও সহজ আর সুন্দর ভবিষ্যত উপহার করব তোমাকে।’
ধৈর্যের সীমা লঙ্ঘন হওয়ার দরুন দীধিতি আবারও তখনকার মতো চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘আপনার থেকে রক্ষা পেতে সামনের মাসেই আমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নেব, বুঝেছেন?’

-‘অন্য কাউকে বিয়ে করার আগেই এই ঢাকা ছাড়া করব, ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেবো, মায়ের ডাক্তারি ক্যারিয়ারও ছাড় দেবো না, জীবনে যাতে কোনো ছেলে বিয়ে করার সাহস না করে সে ব্যবস্থাও করে রাখব।’
হুমকিগুলো কোমল কণ্ঠে দিলেও দীধিতির কথাটাই যতটা না রাগ হয়েছে নাওফিলের, তার থেকে রাগ হয়েছে বেশি দীধিতির উচ্চস্বর শুনে। পকেটে এই মুহূর্তে বাবার দেওয়া গানটা রাখা জরুরি ছিল বলে মনে হচ্ছে তার। ভালোবাসা, ভয়, কোনোটা দেখিয়েই কাবু করতে পারছে না সে দীধিতিকে। অথচ এগুলোর উলটো পথ ধরলে ঠিকই রাজি করানো যাবে। কিন্তু এতে তো তাদের সংসার জীবনে খারাপ প্রভাব পড়বে। একটু আগেই যেটুকু বলতে বাধ্য হয়েছে, তার রেশই থেকে যায় কি না কে জানে। একদম চুপসে গেছে দীধিতি।

নাওফিল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘খোঁজ নিয়ে জেনেছি তোমার বড়ো মামার সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক ভালো নয়। যেহেতু কোনো ভাই নেই তোমাদের, তাই তোমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পদটুকুর ওপর তার নজর খুব। তোমার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে তোমার বিয়েটা না দিতে পারলেও তোমার বোনকে তারা টার্গেটে রেখেছে। যে-কোনো সময় ওর সাথে অঘটন ঘটে যেতে পারে। তা নিয়ে তুমি, তোমার মা খুব চিন্তাতে থাকো। তুমি চাইছ খুব দ্রুত বোনটাকেও নিজের কাছে নিয়ে আসতে। সেই তুমিই যদি ঢাকা ছাড়া হয়ে যাও তো বোনকে কীভাবে রক্ষা করবে? আর তোমার ছোটো মামা? যে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত। তিনি এখনো অবিবাহিত। নিজের পেশা নিয়ে তিনি খুব ব্যস্ত। যখন তোমাদের সাহায্য প্রয়োজন সেই সময়ে তিনি সাহায্য দিতে পারবেন না। সেই মুহূর্তে দেশেই থাকবেন কি না সন্দেহ। আমি আমার ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চাই না, দীধি। পারিবারিকভাবে আমি আমাদের বিয়েটা সম্পন্ন করতে পারি তুমি চাইলে। আর যদি চাও, আমাকে বিচার করে, দেখেশুনে, বুঝে তারপর বিয়ে করবে তাহলে সময় নিতে পারো। তার জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস সময় পাবে।’
কথাটা শুনে দীধিতি থমথমে মুখটা তুলে ওর দিকে তাকাল, তাচ্ছল্য সুরে শুধাল, ‘বিচার বিবেচনা করার পর আমার খারাপ লাগলে বিয়ে করবেন না?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭

এতক্ষণের উজ্জ্বল মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল নাওফিলের, কিছুটা মলিন হলো। একটু সময় চুপ থেকে বলল, ‘খুনের নাটকের ঘটনাটা বাদে আমি চাই তুমি আমাকে দেখেশুনে, বুঝে আমাকে বিচার করো। যদি সত্যিই খারাপ লাগে আমাকে, ওয়াদা করছি বিয়ে করব না তোমাকে। কিন্তু এই বাছ বিচারের মধ্যে গত আড়াই মাসের কোনো কিছু রাখা যাবে না। তোমাকে যা দেখিয়েছি, আমাকে যেমনটা চিনিয়েছি, এ সবই আমার চরিত্রের বাইরে।’
প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়ল দীধিতি। মাথাটা নুইয়ে নরম গলায় বলল, ‘আচ্ছা, আমি মেনে নিচ্ছি আপনার কথা।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here