Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গতার গভীর অনুভব ইয়াসিফ পেশা জীবন থেকেই পেতে শুরু করে৷ অধিকাংশবারই কোনো না কোনো মিশনের স্বার্থে ‘চকলেট বয়’ নামে আখ্যায়িত পাওয়া সুন্দর পুরুষদের মতোই বহু নারীদের সঙ্গে ওঠা-বসা করতে হত ওকে। আবার মিডিয়া পাড়ার রূপসীদের নজরেও আটকে যায় সে একটা সময়৷ সেই থেকেই তথাকথিত অসংখ্য প্রেমিকা জুটতে থাকে ওর। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের শারীরিক বা মনের টান কারও জন্যই কখনো অনুভব হয়নি। কখনো এই নারী তো কখনো ওই নারী– এমনভাবে সম্পর্কে জড়ানোর জন্যই বিয়ে বা বৈধরূপে এক নারীর মাঝে আটকে থাকার ব্যাপারেও অনীহা চলে আসে। আর মারিহাম জীবনে আসার পর যে তিনটি মাস দুজন নিজেদের উদ্দেশ্যে একত্রে থাকতে শুরু করে, তারপর মারিহামের প্রতি নিজের অজান্তেই অধিকার ফলানোও শুরু করে সে, অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় মারিহাম ওর। তাই তো মারিহামের আকস্মিক বিশ্বাসঘাতকতা খুব বেশিই ক্রুদ্ধ করে তোলে ওকে। বিয়ে বা বৈধ সম্পর্কের প্রতি অনীহাটা বেড়ে যায় আরও। সেই সাথে নারীদের প্রতি অনুভব করে এখন প্রবল বিতৃষ্ণা।

লিভ টুগেদারে জীবনে প্রথমবার ইয়াসিফ মারিহামের সাথেই জড়িয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মারিহাম যখন পালিয়ে গেল আর বিশেষ একটা চিরকুট ফেলে রেখে গেল ওর উদ্দেশ্যে, সেই চিরকুটটা দেখার পর সে বুঝতে পারে– অসহ্যভাবে মারিহাম ওকে প্রত্যাখ্যান করে গেছে।
প্রকৃতপক্ষে, এই প্রত্যাখ্যানই মেনে নিতে পারেনি ইয়াসিফ৷ নিজের অহংবোধে এই প্রথম কোনো নারী থেকে আঘাত মিলেছে ওর। অথচ দুজনের এই সম্পর্কে প্রথমে এগিয়েছিল তো মারিহামই।

সে রাতে ওকে মারিহামই নিজের প্রতি প্রলুব্ধ করেছিল৷ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গাড়িতে দুজনের সম্ভোগ মুহূর্ততে ইয়াসিফ নিজেকে দায়ী ভাবত৷ কিন্তু তারপর হুটহাট মারিহামের কাছে চলে আসা আর ওর প্রতি মারিহামের মুগ্ধতা উপলব্ধি করার পর বুঝতে পারে সে, ওই রাতে মারিহাম চেয়েছিল বলেই দুজন কাছাকাছি এসেছিল৷ শুরু থেকেই ওকে নিয়ে খেলেছে মারিহাম৷ অথচ ইয়াসিফ তা বিন্দুমাত্র টের পায়নি৷ সেটা কেউ শুনলে আদৌ বিশ্বাস করবে? কিন্তু এটাই সত্য৷ মারিহামের শান্ত স্বভাব, ধৈর্যশীলতা, সহনশীলতা আর কঠিনত্বের আড়ালে কোমলতা, এসবই যে নাওফিলের বৈশিষ্ট্য৷ আর এখানেই ইয়াসিফ ধরাটা খায়৷ অনায়াসেই বিশ্বাস করে ফেলে মারিহামকে। নাওফিল ওর ভাই বলেই এতখানি বিশ্বাস করতে দ্বিধাবোধ হয়নি। এবং এটাই ছিল ওর জীবনের সব থেকে বড়ো বোকামি।

দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হচ্ছে অনেকক্ষণ যাবৎ। চোখ বুজে মারিহামকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ইয়াসিফ৷ মদের বোতলটা অবহেলায় গড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। কার্পেট ভিজে একাকার। শব্দে চোখ মেলে নিচে পা দিতেই বিরক্তিতে চেহারা কুঁচকে গেল ওর।
-‘এই ইয়াসিফ? শুনতে পাচ্ছ?’ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বিরতিহীন ডেকে চলেছে মাভিশা।
-‘পাচ্ছি। ওয়েট আ মিনিট।’ বলে ইয়াসিফ বাথরুমে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে গেল।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে মাভিশাকে দেখল, ড্রয়িংরুমে বসে আছে সে চুপচাপ। মাভিশাও ওকে দেখে চঞ্চল গলায় বলল, ‘আমি না হয় ক্লান্ত ছিলাম বলে সন্ধ্যা অবধি ঘুমিয়েছি৷ তুমি কী করে একেবারে টাল হয়ে ঘুমোচ্ছিলে? কখন থেকে ডেকে যাচ্ছিলাম! ঘুমই ভাঙে না তোমার।’

-‘খিদে পেয়েছে, না?’
-‘সেটা বলতে হবে? ক্ষুধায় জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে পেট।’
-‘চলো, বাইরে থেকে ডিনার করে আসি।’
-‘ও.কে।’
মারিহামকে নিয়ে আলোচনাটা করতে চাইছে ইয়াসিফ ঠান্ডা মাথায়। কিছুটা রিফ্রেশমেন্টেরও প্রয়োজন ওর। তাছাড়া মাভিশার সঙ্গে সহজ আর স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে৷ কোনোভাবেই তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না, বুকের ভেতর মারিহামের জন্য কেবল ওর পাহাড়সম রাগ। নয়ত দেখা যাবে, মাভিশা ওকে আর সহায়তা করতে চাইবে না। পাল্টি খেয়ে যাবে আর মারিহামকেও সতর্ক করে দেবে। তখন খেয়াল করেছিল ইয়াসিফ, মাভিশা ওর হাবভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।

রাত আটটা। কিরণ চলছে বোনের বাসার উদ্দেশ্যে। পাশেই বসে আছে তাওসিফ স্বভাবজাত গম্ভীর চেহারায়। আর প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ফিহা উদাস চোখে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে৷ মনের ভেতরে আনন্দ আর আতঙ্ক এক সঙ্গে কাজ করছে তার। চারটা বছর পর নাওফিলকে দেখতে পাবে, এই ভেবে যতখানি আনন্দ হচ্ছে ঠিক ততখানিই আবার ভয়ও লাগছে। তাকে দেখার পর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে নাওফিল কে জানে! সে এখনো জানে না, নাওফিল বর্তমান দীধিতির কাছাকাছিই থাকছে এবং ওর গানম্যান হিসেবেও ওই মেয়েটিই নিযুক্ত। এ তথ্য বাড়িতে এখন অবধি কেউ-ই জানে না বলা যায়। মাহতাব শেখের সময় যায় আজ-কাল মুমূর্ষু জান্নাতি বেগমের সঙ্গে আর আল্লাহর ইবাদতে। নিজের শরীরটাও খুব একটা ভালো যায় না যে! মৃত্যুদূত কখন এসে হাজির হয় সামনে, তাও তো বলা যায় না।

এজন্যই নাওফিলের ওপর গত কয়েক মাস ধরে তেমন নজরদারি করার সময় হয় না তার। তাছাড়া তার বিশ্বাস– নাওফিলকে তিনি নিজের ইচ্ছামতোই গড়ে ফেলতে পেরেছেন। যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন, ঠিক তেমনটিই হয়েছে নাওফিল।
বিচ্ছিরিরকম নিস্তব্ধতা চলছে গাড়িতে। ফিহার উপস্থিতিতে কিরণ যেমন মুখ ভার করে আছে, তেমন তাওসিফও বোনের জন্য পারছে না বউয়ের সঙ্গে একটু আধটু ঘনিষ্ঠ হতে। কেবল জোর করে বউয়ের হাতটা চেপে ধরে রেখেছে কোলের ওপর। আর মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে বাচ্চা বউয়ের ক্লান্ত, মলিন মুখটা। পড়াশোনার প্রচণ্ড চাপে এই হাল মেয়েটার! মুখটা দেখে তাওসিফের খুব ইচ্ছা হলো তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরার। কিন্তু ধরতে গেলেই তো ছ্যাঁত্ করে উঠবে ঘাড় বাঁকা মেয়েটা! তাই শুধু একটু গা ঘেঁষে বসা অবধিই সীমাবদ্ধ রইল সে। এর মাঝেই কিরণ ফিরে তাকাল ওর দিকে। ‘এত জায়গা থাকতে গায়ের মধ্যে এসে বসছেন কেন?’

-‘কেন তা বুঝতে পারছ না যেন?’ কপট বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল তাওসিফ।
-‘জায়গা নেই, অজায়গা নেই, সব সময়ই ফাজলামির ধান্দা। কন্ট্রোল ছাড়া পুরুষ, ছিহ্!’ নাক শিটকে জানালার দিকে ঘাড় ফেরাল কিরণ।
-‘কন্ট্রোল ছাড়া? আচ্ছা তোমার কি সৌভাগ্য না, কিরণ বিয়ের চার বছরেও মিস্টেকেনলি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়োনি তুমি? আবার বলছ কন্ট্রোল ছাড়া! কন্ট্রোল ছাড়া হলে চার বছরে দুই বাচ্চার মা হয়ে যেতে।’ বেশ আওয়াজ তুলেই বলে উঠল সে। লজ্জায় কিরণ ওর হাতে খামচি বসিয়ে দিলো। ‘আস্তে! আপনার গলারও লাগাম নেই দেখছি।’
-‘লাগাম ঠিকই আছে আমার। কিন্তু প্রোগ্রামের পর আর রাখব না, শিওর থাকো।’
সামনের সিটে বসে ড্রাইভার তাওসিফের সমস্ত কথায় শুনে মিটমিট করে হাসতে থাকল৷ ফিহা নিজের ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছে বলে খেয়াল করল না ভাই আর ভাবির খুনসুটিগুলো।
কিরণ আর ভুল করেও তর্কে গেল না। তাওসিফ কখনোই নিচু আওয়াজে কথা বলতে পারে না, সেটা তো ভুলেই গিয়েছিল সে। তবে তাওসিফের এই দুষ্টু কথাটাই আজ স্মরণ করিয়ে দিলো কিরণকে, অতীতের ওই দিনটা। ওইদিন তো তারা কেউ-ই নিজেদের কামজ অনুভূতিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। হয়তোবা চেষ্টাও করেনি তারা।

সেদিন পার্টিতে তাওসিফের বাবা জাহিদ সাহেব তার এক ব্যবসায়িক বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে তাওসিফের আলাপ করিয়ে দেন হঠাৎ। আর সকল অতিথিদের সামনে অপ্রত্যাশিত এ ঘোষণাও দেন, খুব দ্রুতই তার বড়ো ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হবে৷ ঘটনা পুরোটাই নাটকের ঝটকার মতো ছিল তাওসিফ, ইয়াসিফ আর নাওফিলের জন্য। কোনো আগাম আলোচনা আর তাওসিফের পছন্দ বা সিদ্ধান্ত ছাড়াই এমন একটা ঘোষণা জাহিদ সাহেব কীভাবে দিলেন? তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার অবকাশও মেলেনি তখন তিন ভাইয়ের। সকল অতিথির অভিনন্দন গ্রহণ করতে করতেই পুরোটা সময় কেটে যায় তাওসিফের৷ বদমেজাজি তাওসিফ এক ফাঁকে মা’কে বাগে পেয়েই তাকে টেনে ঘরে আনে আর জোর কণ্ঠে কৈফিয়ত চায়, ‘এই ডিসিশন নিয়েছ তোমরা কার থেকে অনুমতি নিয়ে, আম্মু? বিয়ে আমার। আর আমি কোনো মতামত জানানোর সুযোগ পাবো না?’

-‘সুযোগ তো দিয়েছিলামই একবার। সেই সুযোগের দারুণ সৎ ব্যবহার করেছিলি না? আল্লাহ সহায় ছিলেন বলে জাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে ঝামেলা পার হয়েছে সেদিন। তারপর আবারও একই বোকামি করব ভেবেছিস?’ তিনি স্পষ্ট হুমকি গলায় জানিয়ে দেন ছেলেকে, ‘আমাদের পছন্দে যদি বিয়ে না করিস, আমি এবার খালি বাড়ি ছাড়ব না। এই দুনিয়ায় ছেড়ে দেবো বললাম৷ তাই বুঝেশুনে চলিস।’
তাওসিফ বিস্ময়ে মুক হয়ে যায়৷ হঠাৎ কেন এত তারা উঠেপড়ে লাগল ওর বিয়ের জন্য? কিছুতেই ভেবে পেলো না কারণটা।

পার্টিতে আমোদ ফূর্তির জন্য শেখ বাড়িতে কখনোই মদের ব্যবস্থা করা হয় না। এ কাজে পুরোপুরিই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মাহতাব শেখ। আবার নাওফিল আর ওর বন্ধুদের মাঝেও মদ সেবনের অভ্যাস নেই। কিন্তু তাওসিফ আর ইয়াসিফের উচ্চবিত্ত পরিবারের বন্ধুমহলের জন্য এ আয়োজন রাখতেই হয় সব সময়৷ আর সেটা করা হয় নাওফিলের বাংলো বাড়িতেই। যদিও অনুমতি দিয়ে থাকে না নাওফিলও। কিন্তু উচ্চবাচ্যও করার উপায় নেই ওর। বড়ো ভাইদের সম্মানের প্রশ্ন থাকে বলেই৷ তাই এবারও ইয়াসিফ বিদেশি নামীদামী মদের আসর জমায় সে বাড়িতে। উল্লাস শেষে বন্ধুরা বিদায় নিলে তাওসিফকে পাওয়া যায় একদম টালমাটাল অবস্থায়। বাবা-মায়ের ওপর রাগটা পুরোপুরি জাহির করতে না পারার ব্যর্থতায় দেদারসে সেদিন মদ খেয়েছিল৷ রাগে উন্মাদ হয়ে ভালো-মন্দ কিছু বোঝার বিবেকও হারিয়েছিল সে। নাওফিল তখন শেখ বাড়িতে তাওসিফের বিয়ের বিষয়ে দাদা আর চাচার সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত।

কিছুটা সামলে উঠে, মদের গন্ধ শরীর থেকে বিলীন করে রাত প্রায় দুটোর বেশি হলে তাওসিফ বাড়িতে আসে। সকলেই যার যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল তখন৷ নিজের ঘরে যাবার আগে তাওসিফের হঠাৎ মাথায় এলো কিরণের কথা। পার্টিতে ওই ঘোষণার সময় কিরণকে সে আশেপাশে কোথাও দেখতে পায়নি। যে মেয়েটার প্রেমে আছাড় খেয়ে সে কুপোকাত, সে মেয়েটা কি তার জন্য কোনো অনুভূতি রাখে মনে? প্রশ্নটা মনে আসতেই এর জবাবের আশায় তক্ষুনি সে ছুটে যায় কিরণের ঘরের মুখে। আলতো আওয়াজে চারবার নক করতেই দরজাটা খুলে যায়। ঘুম চোখে কিরণ তাওসিফকে দেখে আড়ষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে, ভাই? কোনো দরকার?’

-‘দরকার।’ ভারী কণ্ঠ ওর।
-‘দরকারটা সকালে বললে হবে না? মাত্রই ঘুমটা এসেছিল৷’ খুব বিরক্ত বোঝা যায় কিরণের মাঝে। তা দেখে মেজাজটা যেমন চড়ে যায় তাওসিফের, সেই সাথে দুঃখও হয়। ওর মনে হয়, এতদিন ও একাই কেবল প্রেমের ওই বাজে অনুভূতি বহন করে আসছে৷ কিরণের থেকে বয়সে ও বড়ো বলে কিরণ কখনোই ওকে নিয়ে অতিরিক্ত কিছু ভাবেনি। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। এই প্রথম সে কাউকে এতটা পছন্দ করল। অথচ যাকে করল, তার মাঝে ওর জন্য কিচ্ছু নেই। এই ভাবনাটুকু যে ওকে কতটা আঘাত করল সেই মুহূর্তে! যার দরুন বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে বোকার মতো কিরণকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে দেখতে কি খুব সিনিয়র লাগে তোমার? আমি কি অ্যাজ আ বয়ফ্রেন্ড অর হাজবেন্ড হ্যান্ডসাম না? যেমনটা তোমার বয়সী মেয়েরা আশা করে থাকে?’

-‘হ্যাঁ?’ থতমত খেয়ে কিরণ বলে, ‘এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন, ভাই? কী হয়েছে?’
-‘অনেক কিছু হয়েছে। তুমি জানো না? পার্টি চলাকালীন তুমি ছিলে কোথায়?’
-‘নাওফিল ভাইয়ার বাংলোতে গিয়েছিলাম ঐশী আর তন্বী আপুর সাথে। হয়েছে কী?’
-‘ভেতরে এসে বলি?’
-‘ধুর! কী বলেন! এত রাতে আপনি এই ঘরে এলে ব্যাপারটা কেমন দেখায় না?’
-‘কেমন দেখায় তা দেখার জন্য কেউ জেগে নেই।’ বলেই তাওসিফ হনহনিয়ে চলে আসে ভেতরে আর আদেশ গলায় বলে, ‘দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসো, কিরণ। পাঁচ মিনিট সময় নেব।’
দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে কিরণ দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এসে তাওসিফের কাছে৷ তাওসিফ বিছনার এক কোনায় পা ঝুলিয়ে বসে তখন। কিরণ বেশ দূরত্ব রেখে বসে আর দৃঢ় গলায় বলে, ‘আপনি কিন্তু কোনো উলটাপালটা কথা বলবেন না আমাকে এম্বারেসড করার জন্য।’
তাওসিফ বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া জানাল না। শুধু একবার চোখ তুলে কিরণকে দেখে আবার নিজের ভাবনায় মগ্ন হলো৷ একটা পর্যায়ে বলে উঠল, ‘তুমি একটা সত্য কথা জানাবে আমাকে। আমি যেটা জিজ্ঞেস করব তার উত্তর দেবে শুধু এক শব্দে।’

-‘কী কথা?’
-‘আগে বলো যেটা বলবে সত্য বলবে।’
-‘মিথ্যা বলার মতো কিছু জিজ্ঞেস করবেন না-কি?’
-‘আহ্ কিরণ, কথা পেঁচিয়ো না৷’
-‘আচ্ছা বলব।’ বড়ো এক হাই ছেড়ে জবাব দিলো কিরণ।’
-‘আল্লাহর কসম করো।’
-‘আরে কী শুরু করলেন বাচ্চাদের মতো?’ বেজায় বিরক্ত নিয়ে তাকাল কিরণ।
-‘করতে সমস্যা কী তোমার?’ ধমকে বসল তাওসিফ।
কিছুটা চমকেও গেল কিরণ সে ধমকে। রেগে বলল, ‘আল্লাহর কসম, সত্যিই বলব।’
-‘আমাকে নিয়ে তোমার মনে প্রেমের ফিলিংস হয়নি কখনো?’
কিরণের সকল ঘুম উবে গেল ওই এক প্রশ্নেই। বিস্মিত বা অপ্রস্তুত হয়ে চুপ থাকার সময়টুকু দিতে নারাজ তাওসিফ৷ তাই তাড়া দিলো, ‘ফাস্ট বলো, কিরণ৷ তুমি কিন্তু কসম করেছ সত্যি বলবে৷ তাড়াতাড়ি উত্তর দাও।’
-‘আপনি এইসব শোনার জন্য আমার ঘরে এসেছেন?’
-‘কথা বাড়াবে না, কিরণ।’ মেজাজ হারিয়ে আবারও ধমকে উঠল তাওসিফ।

কিন্তু তাতে কিরণ আরও বেশি জড়সড় হয়ে পড়ল আড়ষ্টতায়। সেটা লক্ষ করে তাওসিফ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে ওর কাছে এগিয়ে এসে বসল। স্নেহের সঙ্গে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে খুব কোমলভাবে ‘স্যরি’ বলে
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করল, ‘আমি গত চারটা মাসে একটু একটু করে তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি, কিরণ। কিছুদিন হলো বুঝতে পেরেছি, না চাইতেও তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আর এটাই আমার প্রথমবার৷ নিজের প্রথম অনুভূতি যাকে ঘিরে, তাকেই আমি আমার জীবনসঙ্গী করতে ইচ্ছুক। এজন্য জানাটা দরকার, আমাকে তুমি কী নজরে দেখো। কোনো ফিলিংস আছে তোমার আমাকে ঘিরে? প্লিজ বলো, কিরণ।’
বলতে সঙ্কোচ হলেও কিরণ জানে, বেয়ায় বেশে তাওসিফের দুষ্টুমির জন্য সে লজ্জা আর অপ্রতিভ হওয়ার মাঝেই কখন যেন সৌরভকে পুরোদমে ভুলে বসল। আর এই পুরুষের দুষ্টুমির ছলে বলা কথাগুলোই তার আবেগী মনে আবারও নতুন করে কিছু নতুন অনুভূতির জন্ম দিলো। তাওসিফ আর সে যখন আচমকা মুখোমুখি হত, ঠোঁটে বাঁকা এক হাসি ঝুলিয়ে তাওসিফ বেশিরভাগ সময়েই তখন বলত তাকে, ‘আমার নিব্বি বেয়াইনের বিয়ের পাগলামি বিদায় নিয়েছে তো? না নিলে আমাকে বলতে পারেন, বেয়াইন৷ কবুলটা বলার দায়িত্ব না হয় আমিই নেব।’

এই মারাত্মক দুষ্টুমিসুলভ বাক্যগুলোই আবেগী কিরণের মনে ঝড় তুলতে শুরু করে এক সময়৷ তাওসিফ সত্যিই তার স্বামী হলে কেমন দেখাবে, প্রেম কী করে হবে দুজনের মাঝে, এসব রঙিন ভাবনাও ভেবে বসত সে সময়ে অসময়ে। ভেবে নিজেই আবার নিজেকে গালমন্দ করত, লজ্জাও পেত। মূলত কবে সে তাওসিফের জন্য বিশেষ অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করে, সেই সময়টা সে তাওসিফের মতো নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে বলতে পারবে না।
-‘বলো না কিরণ! আমাকে পছন্দ হয় তোমার?’ জানতে চাইলো আকুল স্বরে তাওসিফ আবারও।
-‘হয়।’ মাথা নুয়িয়ে অনুচ্চস্বরে স্বীকারোক্তি দিয়েই দিলো কিরণ।

জবাব শুনে তাওসিফের মনে হলো যেন, ওর জীবনের সমস্ত সাফল্যের মাঝে কিরণের মন জয় করতে পারাটাই ছিল সব থেকে বড়ো বিজয়। কিরণের বাহু ধরে আকস্মিক টানে তাকে নিজের দিকে ফেরায় ও, জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘এই কিরণ, সত্যিই বললে তো?’ কিন্তু আকণ্ঠ লজ্জায় কিরণ আর দ্বিতীয়বার জবাব দেওয়ার পরিস্থিতিতে ছিল না তখন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাওসিফ জড়িয়েও ধরে ওকে। অসংখ্যবার শুধু একই বুলি আওড়াতে থাকে সে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, কিরণ! থ্যাঙ্ক ইউ।’ ওর প্রশস্ত বুকের মধ্যে কিরণের নরম, ছোট্ট শরীরটা ছোটার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছিল। সেদিকে কোনো হুঁশই ছিল না ওর। উলটে প্রিয় নারীর সংস্পর্শে নিষিদ্ধ অনুভূতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে নিজের সীমা ভুলে যায় তাওসিফ। এলোমেলো চুমুর অত্যাচারে শুরুতে কিরণ ছুটে যাওয়ার জন্য ছটফট করে খুব। অস্বস্তি আর লজ্জায় দিশাহারা হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন যে ওদের ভাগ্যে অন্য কিছুই লেখা ছিল। তাই তো আনাড়ি আর নাজুক কিরণ প্রথমবার পুরুষের অমন আদরে বেসামাল হয়ে পড়ে শেষ মুহূর্তে। ভালো লাগার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল বলেই সেও ভুলে গিয়েছিল, তারা কতখানি সীমা অতিক্রম করছে… কত বড়ো পাপ করছে! আর এর পরিণামই বা সামনে কী হতে পারে! তা ওদের উপলব্ধি হয়েছিল ঠিকই এক পর্যায়ে। কিন্তু দুর্ঘটনাটা ততক্ষণে ঘটেই যায়।

অফিসে খুব বেশি সময় থাকতে পারেনি নাওফিল। ওর আহত শরীরটা সবে সুস্থ হচ্ছে। জাকির সাহেব তাই কঠোর গলায় আদেশ করেন, দ্রুত বাসায় ফেরার জন্য। নাওফিলও আজ-কাল বাবার অবাধ্য হয় না৷ কেননা, বাবা ওর অনেক বড়ো চাওয়া পূরণ করেছেন কিনা। রাত ন’টা বাজতেই বাসায় আসলো সে। দীধিতি নিজের বাসায় ঢুকতে পারেনি তখনো। নাওফিলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে সে নিজে থেকেই ওর বাসায় এসেছে৷ নাওফিল বলল তাই, ‘আমি আগে ফ্রেশ হব, ডিনার করব, তারপর আপনার সঙ্গে মিটিংয়ে বসব। ততক্ষণ কি ওয়েট করবেন?’

গোটাদিনের মাঝে আজ দীধিতির কাছাকাছি ঘেঁষার চেষ্টা করেনি নাওফিল একদমই। বলা ভালো, সে সুযোগ হয়নি ওর৷ মন্ত্রণালয়ের দপ্তর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল ওকে নিজ এলাকায়৷ সেখানে যে সকল উন্নয়নমূলক কাজে হাত দিয়েছে তা কেমন চলছে, সেসব পরিদর্শনের পর ফিরে আসে ঢাকাতে। দাদার দেওয়া কোম্পানিতেও কিছুটা সময় দিয়ে আবার ফিরে আসে দপ্তরে। সেখানের কাজে একটু সময় দিয়ে তারপর বাসায় ফেরা হলো এখন৷ ওর এত ব্যস্ততার মাঝে দীধিতি নিজেও যেমন আলাদাভাবে কথা বলার মতো সুযোগ পায়নি, তেমন নাওফিলও যেন ভুলে গিয়েছিল তার কথা। ব্যস্ততা শেষে যখন গাড়িতে ওঠে দুজন, তখন আবার সেখানে অন্য কিছু মানুষের উপস্থিতি ছিল৷
নাওফিলের প্রশ্নে দীধিতি কিছুক্ষণ গম্ভীরমুখে তাকিয়ে থাকল। বুঝতে চেষ্টা করল, সকালের মতো কেন আর স্বাভাবিক সুরে কথা বলছে না নাওফিল? এমন সাহেবি ভাব কায়দায় কথা বললে তো ব্যক্তিগত কথাগুলো তুলতে পারবে না সে। তাই নিজেই পদক্ষেপটা নিলো সে৷ বলল, ‘আমি জানতে চাই, আমাকে কেন ফোর্সফুলি হিজাব পরতে বাধ্য করানো হলো সকালে? এটা কি স্টেট মিনিস্টার আর তার গানম্যানের সম্পর্কের আওতায় পড়ে? জবাবটা এক্ষুনি দেবে।’

‘দেবে’ শব্দটা শুনে নাওফিল এক পলের জন্য থমকে গিয়ে মনে মনে হাসল। ওকে দীধিতির আপনি সম্বোধন থেকে এই মুহূর্তে হঠাৎ তুমিতে নেমে আসার কারণটা ধরতে পেরেও সে মোটেও একই সুরে সুর মেলাল না৷ কারণ, এতে যে দীধিতি কথা শোনানোর সাহস আর সুযোগ, দুটোই পেয়ে যাবে। আর এমনটা চলতে দিলে সে নিজের মতো করে তাকে একদমই চালাতে পারবে না। তাই গাম্ভীর্যের সঙ্গেই জবাব দিলো, ‘ওয়েল আমি অবশ্যই এ ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা করব আপনার সঙ্গে। কিন্তু সেটা আমার কাজ শেষে৷’
-‘আমি এতক্ষণ বসে থাকতে পারব না, শুনেছ?’ কাঠ গলায় বলল দীধিতি।
সোফায় গা এলিয়ে বসেছিল নাওফিল৷ আর দীধিতি ছিল ওর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে। সটান হয়ে বসে সে দীধিতির দিকে সরাসরি দৃষ্টিপাত করে পুনরাবৃত্তি করল, ‘শুনেছ? স্মরণ, আপনি কি এই মুহূর্তে আপনার হাজবেন্ডের সঙ্গে কনভারসেশন কন্টিনিউ করতে চাইছেন?’

-‘এক্স হাজবেন্ডের সঙ্গে’, শুধরে দিয়ে বলল দীধিতি, ‘কাইন্ডলি সেও যেন এই ক্যারেক্টারেই কথা বলে।’
নিম্ন ঠোঁট জিভের ডগায় ভিজিয়ে নাওফিল মৃদু হাসল আর দীধিতিকে দেখতে দেখতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আর ইউ শিওর, স্মরণ? হাজবেন্ডের ক্যারেক্টারে ঢুকতে বলছেন?’
-‘এক্স… এক্স হাজবেন্ড।’ চড়া গলায় শুধরে দিলো দীধিতি আবারও।
-‘অলরাইট।’ মুচকি হেসে নাওফিল উঠে এলো দীধিতির কাছে, তার মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে বলল, ‘তুমি চাইলে আমি সব সময়ই হাজবেন্ডের ক্যারেক্টার প্লে করতে রাজি, আর এক্স শব্দটাকে ভ্যানিশ করতেও। চলো তাহলে।’ তারপরই দীধিতির কব্জি চেপে ধরে তাকে টানতে টানতে নিজের ঘরের দিকে চলতে আরম্ভ করল সে। দীধিতি প্রথমে ভড়কে গেলেও পরবর্তীতে চেঁচিয়ে উঠে ওকে গালমন্দ করে হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করল কিছুক্ষণ।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৯

সিঁড়ির মধ্যপথে এসে ওর বাহুতে আচমকা কিল, থাপ্পড়ও দিয়ে বসল। কিছুদিন আগের দুর্ঘটনায় সেখানে আঘাত পেয়েছিল নাওফিল। তা আজ সকালে দেখেছিল দীধিতি। তাই ইচ্ছা করেই সেখানে মারতে থাকল। কিন্তু তাতে সে ছাড়া পাওয়ার বদলে আটকে গেল আরও বেশি৷ ব্যথা পেলেও নাওফিল ছাড়েনি তার হাত। উপরন্তু দীধিতিকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে ঘরে ঢুকে ছুঁড়ে ফেলল তাকে বিছানার মাঝে। রিমোট দিয়ে দরজাটা বন্ধ করেই রিমোটটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। হাসতে হাসতে তাকে বলল, ‘ইচ্ছামতো চিৎকার করো, কোনো সমস্যা নেই৷ ততক্ষণে আমি পিয়িং সেড়ে আসি? তারপর আমরা এক সঙ্গে করব চিৎকার, সোনা৷ ওহ না, আই সেইড রং। ওটা হবে শীৎকার।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here