Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি

চোখদুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্মুখের রাস্তাটাই নজর রাখার পাশাপাশি গাড়ির রেয়ার ভিউ মিররেও আটকে রেখেছে নাওফিল। ফ্রন্ট সিটে বসা ইয়াসিফও ঘটনাটা খেয়াল করেছে৷ পুরোপুরি নিশ্চিত হতে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘ফেউ লাগল বোধহয়?’
শান্ত চোখদুটোই আবারও রেয়ার ভিউ মিররে দেখে নিলো নাওফিল পেছনের গাড়িটাকে। ‘বোধহয় না। আসলেই লেগে গেছে।’ মৃদুস্বরে জবাব দিলো সে ইয়াসিফকে।
-‘কী করবি? খসাবি না?’
-‘খসানোর দরকার আছে?’
-‘নিহাদ আর কিরণের হানিমুন। সেটা মনে আছে?’
-‘এজন্যই কি ওদের আলাদাভাবে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম না? ইস্তাম্বুল যাবার আগ পর্যন্ত ওরা আমাদের এই ঝামেলায় জড়াতে পারবে না। পুরোপুরি সেইফ থাকবে। ক্যাঙ্গারু দ্বীপে যেতে ওদের কোনো বাধার মুখে পড়তে হবে না। এতক্ষণে মনে হয় জারভিস পৌঁছে যাবার কথা।’

-‘ঝামেলার আশঙ্কা করছিস?’
-‘করছি আবার করছি না৷ তবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো না?’
-‘হুঁ, সেটা ঠিক। স্মরণ আর মাভিশাকে জানিয়ে রাখি তাহলে।’
-‘বিচে পৌঁছনোর পর বলা যাবে। তাছাড়া ফেউটা যে স্যামুয়েলেরই লাগানো, সেটা আরও ভালোভাবে কনফার্ম হতে চাইছি।’
-‘সে ছাড়া আর কে লাগাবে! এর আগে কি তোর পেছনে কাউকে লাগতে দেখেছিস?’
-‘না। তাও দেখি, পথের মধ্যেই আটকাতে চায় কি-না।’
কাঁধ ঝাঁকাল ইয়াসিফ৷ পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করল মেয়েদের, ‘তোমরা দুজন চুপচাপ কেন? সিডনি তোমাদের অসন্তুষ্ট করল না-কি?’
প্যাসেঞ্জার সিটে বসা দীধিতি আর মাভিশা ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু শোনার প্রয়োজনবোধ করেনি এতক্ষণ। দুজনেই চুপচাপ জানালার বাইরে চেয়ে সিডনিকে দেখতে ব্যস্ত ছিল। ইয়াসিফের প্রশ্নে মুচকি হেসে বলল মাভিশা, ‘আমার আর স্মরণ দুজনেরই ফার্স্ট টাইম অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ। তাই দুজনেই চুপচাপ দেখছি আর ইনজয় করছি।’

দীধিতির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল ইয়াসিফ, ‘কেমন লাগছে বললে না, স্মরণ?’
জবাবে হাসল দীধিতিও৷ কিন্তু হাসিটা কেমন ফ্যাকাসে। ওর মনের ভাব বুঝেও বুঝল না ইয়াসিফ। কনুইয়ের খোঁচা দিলো সে নাওফিলকে। জিজ্ঞেস করল, ‘ঠিকঠাক আছে তো স্মরণ?’
-‘ফিজিক্যালি ঠিকই আছে।’ নির্বিকার গলায় জানাল নাওফিল।
-‘মেনটালি কী প্রবলেম? স্যামুয়েল টেলরকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ?’
-‘সঙ্গে মনিকে নিয়েও। মনি জানত ও বাংলাদেশে। যত বিপত্তিই থাকুক, পেটের সন্তান তো। তাও একবারের জন্য মনি যায়নি ওকে খুঁজতে৷ স্বাভাবিকভাবেই এ ব্যাপারটা পীড়া দেবে। ওকেও দিচ্ছে।’
-‘হুঁ।’ গম্ভীরস্বরে বলল ইয়াসিফ, ‘আমি ভেবেছিলাম মাকে পাওয়ার আনন্দে এই ব্যাপারটা ওকে ভাবাবে না।’
-‘ভাববার মতোই। কিন্তু ভাবা উচিত না৷ যতই ভাববে ততই কষ্ট হবে।’
-‘কিন্তু ও অবুঝ না, জাদ। ভাবনাটা দূর করতে পারবে না সহজে। তবে আমারও পরিষ্কারভাবে জানতে ইচ্ছে করছে, তিনি কেন যাননি কখনও বাংলাদেশে?’

উত্তরটা দিতে গিয়েও চুপ থাকল নাওফিল৷ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে জেরিন যে ওকে আজীবনের জন্যই ত্যাগ করেছিলেন, তা জানলে মাকে পাওয়ার আনন্দটা দীধিতির একদম ফিকে হয়ে যাবে। তাই আপাতত ইয়াসিফের কাছেও ব্যাপারটা চেপে গেল সে।
ওদের গাড়িকে দীর্ঘক্ষণ ফলো করতে থাকা গাড়িটা আচমকা পেছন থেকে দ্রুতগতিতে ওদেরকে পার করে সামনে এগিয়ে গেল। কিছুটা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েও পড়ল রাস্তার পাশে। সেটা দেখেই চিন্তিত হয়ে পড়ল দু ভাই। রাস্তাটা বেশ নিরিবিলি। একপাশে উঁচু পর্বত আর অন্যপাশে সমুদ্র। যেভাবে ওদের পাশ ঘেঁষে গেছে গাড়িটা, দীধিতি আর মাভিশা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে, একপাশে চাপতে গিয়ে কিংবা গাড়িটার ধাক্কায় সোজা ওরা নিচে সাগরে পড়বে।
পাঁচদিন হলো ওরা সিডনিতে আছে। কথা ছিল দুদিন আগেই ইস্তাম্বুলের ফ্লাইটে চাপবে নাওফিল, ইয়াসিফ আর মাভিশা। আর দীধিতি তাওসিফ, কিরণের সাথে এখানেই থেকে যাবে। তবে সে সিদ্ধান্তটা ছিল নাওফিলের। দীধিতি আর জেরিন তা মানেনি। জেরিনের কথা, অন্তত পাঁচটা দিন থাকতেই হবে নাওফিল আর ইয়াসিফকে৷ আর দীধিতি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়, ওদের সঙ্গে সেও যাবে ইস্তাম্বুল। যার জন্য মা-মেয়ের কথা রাখতে গিয়ে ওরা এখনও সিডনিতে। গত তিনদিনে সবাই বাইরে বাইরে ঘুরেছে৷ কিন্তু পিছে এভাবে ফেউ লাগতে দেখেনি, কোনো বিপদের ইঙ্গিতও পায়নি৷ আজকে হঠাৎ করেই গাড়িটা মাঝরাস্তা থেকে পিছু নিতে আরম্ভ করল। দীধিতি আর মাভিশার আশঙ্কা করছে, হাইজ্যাকার কোনো দল আছে গাড়িতে। সেজন্যই একটু ভয় ভয় করছে ওদের। তবে যথেষ্ট ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে মন আর মস্তিষ্ককে। কারণ, বিপদে পড়লে তা মোকাবেলা করার জন্য মানসিক শক্তি থাকা প্রয়োজন।

-‘কী বুঝছিস?’ সামনের গাড়িটাকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ নাওফিলকে।
-‘খারাপ কিছু ঘটবে না আপাতত।’ কথাটা নাওফিল বলতে না বলতেই গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে বসা জানালা থেকে স্যুট পরা একটা পুরুষালি হাত বের হলো। এক মুহূর্তের জন্য ইয়াসিফ ভড়কে গিয়ে ভেবেই নিয়েছিল, হাতে পিস্তল দেখবে। কেবল নাওফিল বিকারহীন আর আগের মতোই শান্ত রইল। তবে স্টিয়ারিং ধরা তার হাতটা শক্ত হয়ে চেপে বসেছিল স্টিয়ারিংয়ের গায়ে। যদিও তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছিল খারাপ কিছু ঘটবে না। তবুও পরিস্থিতি বিপরীতে যেতে পারে আর তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে সে।
কিন্তু সত্যিই খারাপ কিছু হলো না। গাড়িতে বসা লোকটা হাতের ইশারায় ওদেরকে থামাতে বলছে গাড়ি৷ হাইজ্যাকার বা সন্ত্রাস ধরনের কেউ হলে এমন ভদ্রভাবে থামতে বলত না। ভাবতে বেশি সময় নিলো না নাওফিল। দু মিনিট ভেবেই গাড়িটাকে ওই গাড়ির পেছনেই দাঁড় করাল। ইয়াসিফ পেছনে ঘুরে মেয়েদের আশ্বস্ত করল, ‘ভয় পাবার মতো কিছু হয়নি। ঘাবড়িয়ো না দুজন।’

প্রায় সাড়ে ছ ফুটের মতো এক বিশালদেহী অস্ট্রেলিয়ান পুরুষ নেমে এলো গাড়ি থেকে। দেহের তুলনায় টাক মাথাটা তার ছোটো লাগল৷ চেহারার নিষ্ঠুর কাঠামো আর শরীরের আয়তন দেখে বোঝায় যাচ্ছে, প্রচুর শক্তিধর সে। বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাঝে। চোখে কালো সানগ্লাস আর পরনেও কালো স্যুট-প্যান্ট তার। সাধারণত দেহরক্ষীর মতোই লাগছে তাকে। নাওফিল গাড়ি থেকে নামতেই এগিয়ে এলো সে। আঁতকে উঠল দীধিতি, তাকে নাওফিলের মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখে৷ তখনই আবার ইয়াসিফও গাড়ি থেকে নেমে নাওফিলের পাশে দাঁড়াল৷ তা দেখে মনের ভয়টা একটু কমল দীধিতির।

ওদের গাড়ির কাচ সাউন্ড প্রুফ। বাইরে দাঁড়িয়ে নাওফিলদের সঙ্গে কী কথা বলছে লোকটা, তা শুনতে পাচ্ছে না দীধিতি আর মাভিশা। স্রেফ তিনজনের অঙ্গভঙ্গি দেখে আন্দাজ করছে, ওদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে আসেনি লোকটা। নয়ত ইয়াসিফের চেহারার অভিব্যক্তি অন্তত বদলাতে দেখত। ওরা দু ভাই চুপচাপ শুধু সামনের মানুষটির কথা শুনে যাচ্ছে। একটা পর্যায়ে নাওফিল কথা বলল। উত্তরে সে লোকটিও কিছু বলতে নাওফিল আবার কী বলল কে জানে! যার জন্য হঠাৎ করে লোকটির চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠতে দেখা গেল। ব্রেস্টপকেট থেকে ফোন বের করে বিরক্তি নিয়েই কাউকে কল করছে সম্ভবত৷ রিসিভ হলে ত্রিশ সেকেন্ডের মতো কথা বলল সে৷ তারপর ফোনটা এগিয়ে দিলো নাওফিলকে। মুখটা গম্ভীর করে নাওফিল কথা বলল ফোনের ওপাশের লোকের সঙ্গে। দীধিতি অনেক চেষ্টা করছে নাওফিলের লিপরিড করার জন্য। দু’চারটা শব্দ উদ্ধারও করতে পেরেছে। তাতে বিশেষ কোনো ফায়দা হলো না। অগত্যা তাই ধৈর্য ধরে, চিন্তা চেপে অপেক্ষা করতে থাকল ওদের ফেরার।

প্রায় পনেরো মিনিটের কথোপকথন শেষে লোকটি বিদায় নিলে দু ভাই গাড়িতে চেপে বসল। বরাবরের মতোই ইয়াসিফ দায়িত্বের সঙ্গে দীধিতি আর মাভিশাকে জানিয়ে দিলো, ‘আজকে বিচে ঘোরা হচ্ছে না আমাদের৷ তার বদলে বিশেষ একজনের ইনভাইটেশন রক্ষা করতে যাব আমরা। মন খারাপ কোরো না, গার্লস।’
-‘এটাকে কেমন ইনভাইটেশন বলে, ভাই?’ সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে টিটকারির সুরে বলল নাওফিল। হাসছেও সে। তার কথা শুনে হাসল ইয়াসিফও। জবাব দিলো, ‘সেটা তোর হোস্টকে জিজ্ঞেস করিস। সরাসরি তোকে ফোন করল না। বডিগার্ড না কাকে পিছু লাগিয়ে রাস্তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে ইনভাইটেশন বার্তা দিলো৷ বড়ো বড়ো শহরের বড়ো বড়ো মানুষগুলোর নিয়ম-কানুন এমনই মনে হয়।’
-‘সাদা দৈত্যটা নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে টানা তিনদিন লেগে ছিল আমাদের পেছনে। টের পেয়েছিস আজকের মতো?’

-‘সিরিয়াসলি?’ কণ্ঠে বিস্ময় ইয়াসিফের।
-‘আমিও টের পাইনি। আমাদের সবাইকে ভালোভাবে নজরে রেখেছে। তারপর রাতভর স্টাডি করেছে মাভিশা আর স্মরণের ব্যাকগ্রাউন্ড। ওদের দুজনের মাঝে স্মরণের ডোশিয়ে নিশ্চয়ই সন্দেহজনক লেগেছে।’
-‘শুধু ডোশিয়ে? উহুঁ, নিশ্চয়ই এই উইলিয়াম ব্যাটার থেকে স্মরণের ছবিও দেখেছে স্যামুয়েল। তারপরই এমন সিরিয়াস হয়েছে। কিন্তু আমাদের নিয়ে যাচ্ছেটা কোথায়?’
উইলিয়াম নামের ওই বিশালদেহী লোকটা তার গাড়ির পিছু পিছু আসতে বলেছে ওদের৷ এই মুহূর্তে ওরা দিকবদল করেনি ঠিকই। কিন্তু বিচ ছাড়িয়ে গাড়িটা যাচ্ছে আরও বহুদূরে। নাওফিল ফোনে যার সঙ্গে কথা বলেছে, তাকে ও নামে চেনে৷ স্যামুয়েল টেলরের একমাত্র ছেলে লিয়াম টেলর। বেশ আন্তরিকতা ছিল ছেলেটার কথাতে৷ এবং তার কথায় বোঝা গেছে, ওর ব্যাপারে লিয়াম বেশ ভালোভাবেই অবগত। নিশ্চিন্তে উইলিয়ামের সঙ্গে আসতে বলেছে ওকে। কিন্তু জায়গাটা কোথায় তা বলার প্রয়োজনবোধ করেনি। হয়ত যেতে যেতে ও দেখতে পাবে বলেই জানায়নি।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৩

-‘এত দ্রুত স্যামুয়েলের চোখে পড়বে স্মরণ, সেটা ভাবিনি।’ বিড়বিড় করল নাওফিল।
-‘কী বলছ এসব তোমরা?’ আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠল দীধিতি পেছন থেকে। ‘লোকটা কে? কার হয়ে ইনভাইটেশন জানিয়েছে, নাওফিল? কোথায় যাচ্ছি আমরা? খুলে বলছ না কেন?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here