Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৬

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৬

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৬
DRM Shohag

আনিকা অনামিকাকে টেনে সরিয়ে দেয় জেডি’র থেকে। এরপর জেডির দিকে চেয়ে বলে,
“আমাদের সাথে মজা করছিস তুই? সন্ধ্যা তোর ভালোবাসার মানুষ? আর এসবের পিছনে তুই ছিলি মানে?”
জেডি মাথা নাড়লো দু’দিকে। এরপর হেসে বলে, “এভি, সন্ধ্যাপ্রাণ, সৌম্য সবার জীবন এলোমেলো আমার কারণে। আর তারপর…..
বাকিটুকু বলার আগেই আনিকার হাসবেন্ড ঘরের ভেতর প্রবেশ করে জেডির দিকে চেয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,

“তোমাদের প্রাণের বন্ধু দিনের পর দিন আকাশের পিছন থেকে ছু’রি চালিয়েছে। তাদের প্রত্যেকের জীবন ধ্বংস করতে চেয়েছে। আর তোমাদের সবার প্রিয় আকাশের মাকেও মে’রে ফেলেছে৷ ওই ডক্টরটাকেও মে’রে ফেলেছে। সাথে সৌম্য’র একটা ফ্রেন্ডকেও মে’রে’ছে। মাত্র সব খবর নিয়ে আসলাম। ও তোমাদের বন্ধু নয়। বে’ঈ’মা’ন ও।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে আনিকার হাসবেন্ডের গলা ধরে আসে। হয়ত আসমানী নওয়ানের পরিবার তাদের আপন নয়, তবে আনিকার সূত্রে সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল। আজ সেই পরিবারের এই বেহাল দশা দেখে ছেলেটা নিতে পারছে না।
আনিকা তার হাসবেন্ডের মুখে প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে এসব কথা শুনে কেমন স্তব্ধ হয়। বিস্ময় দৃষ্টি জেডির পানে। এদিকে আনিকার পাশে দাঁড়ানো অনামিকার অবস্থাও একই। সে নির্জীব দৃষ্টিতে জেডি’র দিকে চেয়ে আছে। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়
আনিকা জেডির দিকে আঙুল উচিয়ে থেমে থেমে বলে,

“তুই সত্যি এসব করেছিস জেডি?”
জেডি হেয়ালি করে বলে,
“করলাম তো!”
কথাটা শুনতেই আনিকা জেডির গালে শক্তপোক্ত একটা থা’প্প’ড় দেয়। জেডি’র শরীর সামান্য নড়েচড়ে উঠল। তবে সে বিশেষ পাত্তা দিল না। থা’প্প’ড় খেয়েও ঘাড় দু’দিকে নাড়ায় আর বলে,
“ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে। একটু রেস্ট নিতে আসলাম। আর তোরা কি সার্কাস শুরু করলি?”
আনিকা রে’গে জেডির শার্টের কলার টেনে ধরে চিৎকার করে বলে,
“আমাদের আসমানী আন্টিকে মে’রেছিস তুই? তোর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এভি’র সাথে এতোবড় বে’ঈ’মা’নী করেছিস? মাথা ঠিক আছে তোর? কি করেছিস এসব?”
জেডি হেসে বলে,

“মাথা ঠিক আছে বলেই এতোসব করতে পারলাম। মাথা ঠিক না থাকলে প্লান সাজানো যায় মূর্খ?”
আনিকা রে’গে জেডিকে একটা ধাক্কা দেয়। চোখজোড়া ভিজে উঠেছে মেয়েটার। ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে,
“তোর কোনোদিন ভালো হবে না জেডি। তুই আন্টিকে কি করে….
আনিকা বলতে পারে না। গলা আটকে আসছে। জেডি আনিকার ব্য’থাতুর মুখের দিকে চেয়ে মলিন হাসলো। আনিকার বলা,
‘তোর ভালো হবে না কোনোদিন’ কোথাও একটা লাগলো খুব। জেডি কিছুটা শব্দ করে হেসে বিড়বিড় করে,
“জানি জানি। আমার ভালো হতে হলে তো আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণকেই হা’রা’তা’ম না। আমার সাথে খারাপ হবে বলেই তো আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে হারিয়েছি।”
আনিকা ভাঙা গলায় বলে,

“আরে সন্ধ্যা তোর এভি’র বউ। তার ভালোবাসা। তার সবকিছু। ও কতকিছু সহ্য করে সন্ধ্যাকে তার জীবনে ফিরে পেয়েছিল, জানিস কিছু? আর তুই, যে এভি’কে ভালোবেসে জান জান ডেকে, ভালোবাসার প্রুভ দিতে চেয়ে চেয়ে মুখের ফেনা তুলে ফেলতি। তুই সেই এভি’র সাথে কীভাবে এমন বে’ঈ’মা’নী করতে পারলি? তোর কলিজায় একটুও লাগেনি জেডি? তুই এতোটা অ’মানুষ কি কবে থেকে হয়ে গেলি?”
জেডি’র বুকে ব্য’থা উঠল। চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসলো। দমবন্ধ লাগলো। মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলে,
“বিলিভ মি, আমি আমার এভিজানকে ক’ষ্ট দিতে চাইনি আনিকা। এভিজান বিন্দুমাত্র দুঃখ পাবে না বলেই তো আমি এই পথে পা বাড়িয়েছিলাম।”
কথাটা শুনতেই আনিকা তেড়ে যেতে নেয় জেডি’র দিকে। কিন্তু আনিকার হাসবেন্ড এগিয়ে এসে আনিকাকে আগলে নেয়। আনিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“আবারও মিথ্যে বলছিস তুই? গত কয়েকটাবছরে আমি আকাশের ব্যাপার নিয়ে তোর সাথে কত হাজারবার কথা বলতে বসেছি। আর তুই দিনের পর দিন আমাকে মিথ্যে বলেছিস। দিনের পর দিন আমাকে বলেছিস, আন্টি তোর আপন, অথচ আজ তাকে মে’রে দিয়ে সে কথাও মিথ্যে বানিয়ে দিলি। মিথ্যা বলতে বলতে একদিন তোর জিভ কে’টে পড়ে যাবে জেডি।”
জেডি চোখ বুজে নিল। জীবনের প্রথম আনিকা তার সাথে এতো রূঢ় আচরণ করছে। তার কেন যেন আর সহ্য হচ্ছে না। অসহনীয় ব্য’থা নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
আনিকার হাসবেন্ড জেডি’র উদ্দেশ্যে রূঢ় কণ্ঠে বলে,
“এক্ষুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও জেডি। আমাদের বাসায় কোনো ক্রি’মি’না’লের জায়গা হবে না।”
জেডি আনিকার হাসবেন্ডের কথায় বিরক্ত হলো। রে’গে তাকালো লোকটির দিকে। নির্দিষ্ট ক’জন মানুষ ব্যতীত কারো বাঁকা কথা তো দূর, সোজা কথাও সহ্য হয়না তার। যেমনটা আনিকার হাসবেন্ডের কথা সহ্য হলো না। সে লোকটির উদ্দেশ্যে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“এ্যাই গলা নিচু। আমার বডিতে এখনো এনাফ এনার্জি আছে, বুঝেছ?”
আনিকা চেঁচিয়ে ওঠে,
“কি করবি? আমার হাসবেন্ডকেও মে’রে ফেলবি? নিজের স্বার্থে সামান্য ঘা লাগলেই যেকাউকে মে’রে দিস, এটাই তোর পেশা তাই না?
জেডি আনিকার দিকে চেয়ে ঢোক গিলল। কিছু বলতে নেয়, তার আগেই আনিকা কান্নামাখা গলায় শব্দ করে চেঁচিয়ে ওঠে,
“এক্ষুনি বেরোবি এই বাড়ি থেকে। নয়তো তোকে আজ খু’ন করে ফেলবো আমি। এতোদিন আমরা সবাই মিলে দুধকলা দিয়ে কা’ল’সা’প পুষেছি। বেরো আমার বাড়ি থেকে। বেরো বলছি।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে আরও জোরে চেঁচালো আনিকা। আনিকার কথায় জেডি’র যেমন খারাপ লাগলো, তেমনি ভীষণ অপমানিতবোধ হলো। এমন নয় যে, তার থাকার জায়গা নেই, এজন্য সে এখানে এসেছে। সে এসেছে তাদের বন্ধুত্বের শুরু থেকে তাকে মন থেকে সাপোর্ট করে আসা আনিকার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সবাই সব জেনে তাকে নোং’রাদের কাতারে ফেলে আর জায়গা দিচ্ছে না তাকে। একটু বড় হওয়ার পর তার আর আকাশের তো ঝামেলা লেগেই থাকলো। যার পরিধি বাড়তে বাড়তে এক বিভৎস পর্যায়ে চলে গিয়েছে। আর অরুণ তো তাকে কারণ ছাড়াই সহ্য করতে পারেনা। এর মধ্যে আনিকাই একজন ছিল, যার সাথে টুকটাক দেখা হলে বড় বোনের ফিল পেত জেডি। কিন্তু এখন আর এসবের দিন নেই। সবকিছুর পথ সে নিজ হাতে বন্ধ করেছে। জেডি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বেড থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছোট করে বলে, “যাচ্ছি।”

কথাটা বলে আনিকার দিকে তাকালো। আনিকা তার ভেজা মুখ মুখ ফিরিয়ে নিল জেডি’র দিকে। জেডি মলিন হাসলো। সে দেশে আসার পর সর্বপ্রথম আকাশের সাথে দেখা করত। আর দ্বিতীয় মানুষটা ছিল আনিকা। যদিও সে জে’লে থাকা অবস্থায় সবাই তাকে ভুলে গিয়েছিল। এরপর জে’ল থেকে বেরোনোর পর এতোসব কান্ডের পর স্বাভাবিক সে আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আকাশ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে আনিকা তার সাথে সব নরমাল করে নিয়েছিল। সে দূরে ছিল বলে, তাকে দোষারোপ করেছে। উত্তরে জেডি কিছু বলেনি। বলেনি, সে জে’লের এক কোণায় বসে একটা বন্ধুর মতো পিঁপড়ের জন্য হলেও কত অপেক্ষা করেছিল দিনের পর দিন। কিন্তু কারো দেখা পায়নি।

জেডি ঝাপসা চোখজোড়া আনিকার থেকে সরিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নেয়। কিন্তু দৃষ্টি অনামিকার দিকে পড়লে তার পা থেমে যায়। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় অনামিকার সামনে।
অনামিকা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে ব্যস্ত। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। জেডির সাথে তার পরিচয় ছোট থেকেই ছিল। যখন থেকে তার আপুর সাথে পরিচয় ছিল জেডির। কিন্তু ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যখন জেডির আকাশের সাথে প্রথম ঝামেলা হয়েছিল। তখন জেডি আনিকার কাছে সমাধানের জন্য অনেক বেশি আসতো। আর তখনই তার সাথে জেডির ভাই-বোনের মতো একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে তখন ভালোই ছোট ছিল। জেডি তাকে রোজ রোজ তার পছন্দের জিনিস এনে দিত। তার মাথায় হাত বুলাতো। অনেক আদর করত তাকে। অনামিকা প্রথম প্রথম জেডিকে ভ’য় পেত। না মেশার কারণে এমনটা হত। কিন্তু জেডির বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে ধীরে ধীরে অনামিকা সহজ হয় জেডির সাথে। জেডি বড় ভাইয়ের মতো খুব আপন একজন হয়ে হুট করেই হারিয়ে গিয়েছিল। অনামিকা দুঃখ পেয়েছিল। তার তো বড় ভাই ছিল না৷ এজন্য জেডি’কে সেই জায়গাটা সে মন থেকেই দিয়েছিল। তারা সবাই ভেবেছিল, জেডি তাদের ভুলে গিয়েছে। বছরের পর বছর চলে গিয়েছে। জেডি ইংল্যান্ড থেকে ফেরেনি। সে তার সব বান্ধবীদের বলে বেড়াত, তার একটা মিথ্যে মিথ্যে বড় ভাই ছিল। যে তাকে মিথ্যে মিথ্যে আদরও করতো। আর তারপর সত্যি সত্যি তাকে ভুলে গিয়েছে। এরপর হঠাৎ করেই অরুণের সাথে তার অনলাইনে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব আর তারপর ভালোবাসা। কিন্তু ক’বছরের মাথায় অরুণকে মেয়ে বাজ ছেলে হিসেবে জানার পর অরুণের সাথে তার ঝামেলা হয়েছিল। আর সেই ঝামেলা এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সে সু’ই’সা’ই’ড অ্যাটেন্ড করেছিল। তার ফ্যামিলি তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল।

এরপর সে ঘরকুনো হয়ে গেল। অরুণের ওই রূপ সহ্য করতে পারছিল না। তখন জেডির কথা খুব মনে পড়ত। তারা সবাই জানতো, জেডি অনেক ছোট থেকে একটি মেয়েকে ভালোবাসতো। সবার কথা সে জানেনা, তবে জেডিকে সে যতটুকু চিনেছে, জেডি ভালোবাসা নিয়ে অদ্ভুদ অদ্ভুদ কথা বলত। শুনতে ভালো লাগতো। জেডির সাথে থেকে থেকে তার ভালোই বুদ্ধি বেড়েছিল। বিশেষ করে এসব ভালোবাসার ব্যাপার স্যাপার নিয়ে। এরপর অনামিকা অরুণকে শিক্ষা দেয়ার জন্য নাটক করেছিল, সে বিয়ে করেছে। সত্যি বলতে সে অরুণকে টেস্ট করতে চাইছিল। কিন্তু সে দূর থেকে অরুণকে দিব্যি ভালো থাকতে দেখে হতাশ হয়। অরুণ একবার সত্যমিথ্যা যাচাই করতেও আসেনি। কে জানত, অরুণ আবারো মেয়েদের মেশা শুরু করেছিল কি-না! অনামিকা ধরেই নিয়েছিল, অরুণ তাকে ভালোবাসেনি। আসলে ভালোবাসার মাঝে অন্য মেয়েরা আসলে সেটাকে আর ভালোবাসা বলে না। অনামিকা মেনে নিয়েছিল। অরুণকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একা একাই নিজের জীবন যেভাবে পারছিল, চলছিল। এরপর হঠাৎ-ই একদিন বাংলাদেশে জেডির আগমণ ঘটে। সময়টা ছিল আকাশের এক্সিডেন্টের চার মাস পর। আকাশকে জীবিত সাথে জেডিকে দেখে তারা ভীষণ অবাক হয়েছিল। জেডি আনিকাকে এটা ওটা বলে মানাতে পারলেও, অনামিকা শুনছিল না। তার কথা ছিল,

‘আমার ভাইয়া ম’রে গেছে। সরো সরো।’
জেডি কনফিউজড হয়ে যেত। কি করবে বুঝতে পারতো না। আনিকার কাছে হেল্প চাইলে আনিকা নিজেই ভিলেন গিরি করত। জেডি ছিল ভীষণ মিশুক স্বভাবের। তার আদুরে ভঙ্গিতে যে কারো থেকে মন জয় করে নিতে পারতো। যেমনটা জেডি সেবার অনামিকার অভিমান ভাঙাতে করেছিল। কান ধরে উঠবস করেছিল। অনামিকা আর আনিকা সেদিন ভীষণ অবাক হয়েছিল। অনামিকার চেয়ে আনিকা বেশি অবাক হয়েছিল। সে বলেছিল,
“আকাশের জন্য সব মানা যায়। কিন্তু আমার বোনের জন্য..কিভাবে কি!”
জেডি হেসে বলেছিল,
“আমার তো এই একটাই ছোট বোন।”

জেডি কথাটা হেসে বললেও, সে কথায় হাজারো আবেগ মিশে ছিল। অনামিকা, আনিকা বুঝেছিল। জেডি’র ছোট বেলা থেকে বেড়ে ওঠার কাহিনীটুকু তারা জানতো। জেডি’র কেউ বলতে একজন র’ক্তের বাবা-ই ছিল। যে শুধু নামেই বাবা ছিল। আদতে জেডির কেউ-ই ছিল না। থাকার মধ্যে তারা বন্ধুরাই ছিল। আর জেডির সেই প্রেমিকা আর ভাই। তার এই শূণ্যতার জীবনে হুটহাট কাউকে পেয়ে গেলে, জেডি তাকে আপনের চেয়েও আপন করে নিত। যেমনটা সে অনামিকার ক্ষেত্রে করেছিল। খুব অল্প সময়ে মেয়েটিকে তার বোন বানিয়েছিল।

জেডি ফিরে আসার পর, অনামিকার অভিমান ভাঙলে আবারো তাদের সম্পর্ক সুন্দর হয়। আনিকার কাছে অরুণ আর অনামিকার কাহিনী জেডি শুনে, সে অরুণের ব্যাপারে খোঁজ নেয়। এরপর অনামিকাকে মানায়। অনামিকাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় অরুণের প্রতিটি পদক্ষেপ। অনামিকাকে উপলব্ধি করায়, অরুণ শুধু তাকে ভালোবাসে। অনামিকা সেদিন জেডির সামনে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। বছরের পর বছর যার থেকে দূরে থেকে যার জন্য চোখের জল ফেলেছে, সে শুধু তাকে ভালোবেসে আর কখনো কোনো মেয়ের সাথে মেশা তে দূর, কখনো কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি। উল্টে সে-ও দিনের পর পর অনামিকা বিয়ে করেছে ভেবে অরুণ কত দুঃখ পেয়েছে। খুব বেশিদিন হয়নি, জেডি অরুণ আর অনামিকার সম্পর্কটি একেবারে ঠিক করে দিয়েছে। তবে অনামিকার কাছে জেডি’র অনুরোধ ছিল, অনামিকা যেন অরুণ আর অনামিকার সম্পর্ক নিয়ে জেডি’র নাম অরুণের সামনে উচ্চারণ না করে। অনামিকা কারণ জিজ্ঞেস করলে জেডি উচ্চস্বরে হেসে বলেছিল, ‘কারণ আমি ওর শ’ত্রু আর ও আমার।’

জেডি’র কথা শুনে অনামিকা কেন যেন অনেক হেসেছিল। এরপর সে এ নিয়ে অরুণকে কিছুই বলেনি। জেডিকে দেয়া কথা রেখেছিল।
তারপর জেডির মুখে আবারো সেই অচেনা নামক সন্ধ্যার কথা শুনে অনামিকা ভীষণ এক্সাইটেড হয়ে যেত, তার জেডি ভাইয়ার ভালোবাসার মানুষকে দেখার জন্য। জেডি হাসতে হাসতে বলত,
‘আমার বরযাত্রী হিসেবে এভিজান আর তুই সবার আগে থাকবি। বাকিদের লাইন কিন্তু থাকবে না।’
আনিকা রে’গে বলত,
‘হায়রে অকৃতজ্ঞ, আমার জন্য-ই আমার বোনটাকে পেয়েছিস। একটু মনে রাখিস!’
জেডি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে হেসে বলত, ‘তুই আমার খালা। আর অনামিকা আমার ছোট্ট কিউট বোন। খালার সিরিয়াল নাই। দূরে যা।’

সেই পুরনো দিন হারিয়ে গেছে। নিমিষেই হারিয়ে গেছে সবকিছু। পুরনো সেই কথাগুলো ভেবে অনামিকার আরও দমবন্ধ লাগলো। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে জেডির দিকে চেয়ে বলে,
“তুমি এসব কিচ্ছু করনি। তুমি মিথ্যে বলছ, তাই না জেডি ভাইয়া?”
জেডি ঢোক গিলল। নিজেকে সামলে মৃদু হেসে বলল,
“মিথ্যে নয় অনামিকা। সব তো সত্য। তোদের প্রিয় আন্টিকে মে’রেছি নিজের স্বা’র্থে’র জন্য। এটা মেনে নে।”
অনামিকার ফোঁপানির মাত্রা বাড়ে। সে কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
“তাহলে তুমি নিজের স্বার্থের জন্য আমাকেও মে’রে ফেলবে, তাই না?”
জেডির বুকটা কেমন যেন করে উঠল। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো অনামিকার কান্নামাখা মুখের দিকে। কত হাজারবার যে এই মেয়েটার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়েছে সে, তার হিসেব নেই। মেয়েটাও কি আদুরে। বড় ভাইয়ের আদর পেতে সবসময় তার কাছে ঘুরঘুর করত। আর আজ তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, সে তার স্বা’র্থে’র জন্য তার বোনটাকেই মে’রে ফেলবে কি-না! জেডি অনামিকার থেকে তার ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া সরিয়ে নেয়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পলক ঝাপ্টে নিজেকে সামলায়। প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,

“অরুণ তোকে ভীষণ ভালোবাসে। ওকে আর কষ্ট দিস না, কেমন? আমাদের হয়ত আর দেখা হবে না। সাবধানে থাকিস। অরুণের সাথে বিয়েটা দ্রুত সেরে ফেলবি। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।”
পিছন থেকে আনিকা রাগান্বিত স্বরে বলে, “তোর এসব লোক দেখানো কাজ আমাদের লাগবে না। আমরা প’ঙ্গু না। সব কাজ আমরা নিজেরাই পারি। তুই প্লিজ চলে যা, শান্তি দে আমাদের। তোকে দেখলেই গা জ্ব’ল’ছে আমার।”
জেডি অনামিকার মাথায় হাত দিতে নিচ্ছিল, আনিকার কথায় থেমে যায় তার হাত। বুকে ব্য’থা উঠেছে খুব। কাঁপা ডান হাতটি সে ধীরে ধীরে অনামিকার মাথায় দিয়ে মলিন হেসে বলে, “যাচ্ছি।”
অনামিকা অসহায় কণ্ঠে বলে,

“কোথায় যাবে তুমি?”
জেডি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“নি’কৃ’ষ্টদের জায়গা যেখানে, সেখানেই যাবো। তুই মন দিয়ে সংসার করবি কিন্তু।”
অনামিকা ঢোক গিলে বলে,
“আবারও ইংল্যান্ড চলে যাবে? আর ফিরবে না?”
অনামিকার কথা শুনে জেডি একটু শব্দ করেই হেসে ফেলল। যদিও সে হাসিতে প্রাণ নেই। এরপর উল্টো ঘুরে একটু একটু করে এগিয়ে যায় আর ধরা গলায় বলে,
“দেখা যাক কোথায় যাওয়া যায়, তবে চিন্তা নেই, কারো সুখময় জীবনে আর আমি অধীরের কা’লো ছায়া ফেলবো না।”

কথাটা বলে সে উল্টোপথে এগোয়। আনিকা মলিন মুখে জেডির দিকে চেয়ে রইল। এই প্রথমবারের মতো সে জেডির সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করল। এই প্রথমবার সে জেডিকে একপ্রকার তার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। আনিকার দমবন্ধ লাগে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকা জেডির পানে চেয়ে নোনাজল গড়ায়। বা হাতে বেডের কোণা ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। শুনেছিল, বড় বোনরা না-কি মায়ের মতো হয়। সে জেডির বন্ধু ছাড়াও কি ছিল জানেনা। তবে আজ বুকটায় ভীষণ এক শূণ্যতা কাজ করছে। সে এসব মানতে পারছে না।
জেডিকে এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে, অনামিকার আরও কান্না পায়। সে বড় বড় পায়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে ভাঙা গলায় শব্দ করে ডাকে, “জেডি ভাইয়া?”
জেডির চলন্ত পা থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য। ঢোক গিলল দু’বার। এরপর আবারও এগিয়ে যায় সামনের দিকে। অনামিকার ডাককে অগ্রাহ্য করে সে এগোয়। ডান হাত উঠিয়ে শার্টের হাতা দিয়ে ঝাপসা চোখজোড়া মুছে নেয়। বিড়বিড় করে,

“তোদের সবাইকে ভীষণ ভালোবাসি আমি। আফসোস! এ কথা বিশ্বাস করার জন্য একটি পিঁপড়েও বোধয় আর বেঁচে নেই।”
জেডির দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়ায়। দমবন্ধকর অনুভূতি নিয়ে সে এগিয়ে যায় কোনো এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
ওদিকে অনামিকা থেমে নেই। সে জেডি’র পিছু পিছু আসছে তো আসছেই। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল থেমে নেই। মেয়েটি ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে আসে আর কান্নামাখা গলায় বলে,
“জেডি ভাইয়া দাঁড়াও। আমার তোমার সাথে কথা আছে। তুমি মিথ্যা বলছ আমি জানি। কেন মিথ্যা বলছ বলে যাও আমায়।”

অনামিকার বলা কথা জেডি’র কানে আসলে তাকে অসীম অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে। ঢোক গিলে শব্দ করে আওড়ায়,
“মিথ্যা বলছিনা আমি। তুই ভেতরে যা অনামিকা। পিছু পিছু এসে আমাকে ডিস্টার্ব করছিস কেন?”
জেডি কথাগুলো বললেও তার পা থেমে নেই। সে অলরেডি আনিকাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়েছে। ওদিকে অনামিকাও থেমে নেই। সে পিছু আসছে তো আসছেই। অনবরত ডাকছে জেডিকে। জেডি পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায় তার গাড়ির দিকে। তিন মিনিটের মাথায় জেডি তার গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। দু’হাতে গাড়ি আঁকড়ে ধরে চোখ দু’টো বুজে নেয়। শরীরটা আর চলছে না। মনটা বড্ড ক্লান্ত। ডানদিক থেকে অনামিকার কান্নামাখা ডাক অনবরত ভেসে আসছে। জেডি আর নিতে পারছে না। সেই অল্পকয়টা দিনে সে অনামিকাকে কি খুব বেশি ভালোবাসা দিয়েছিল? এজন্য মেয়েটা এখনও তার পিছু পড়ে আছে। সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও এই বাচ্চা মেয়েটা এখনও তার দিকে এগিয়ে আসছে। জেডি ডানদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে ঝাপসা চোখে বি’ধ্ব’স্ত হয়ে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে আসা অনামিকার দিকে তাকায়। মেয়েটির মাথা থেকে ওড়না পড়ে গিয়েছে। পায়ে জুতো নেই। জেডি’র ঝাপসা চোখ আরেকটু ঝপসা হয়। কিন্তু সে দ্রুত চোখ বুজে নেয়। সে গলে গেলে কি করে হবে? তার যে এখনো অনেক কাজ বাকি? জেডি নিজেকে শ’ক্ত করে বড় বড় পায়ে এগিয়ে গিয়ে অনামিকার সামনে এসে দাঁড়ায়। জেডিকে ফিরতে দেখে অনামিকার পা থেমে যায়। মেয়েটা একটু স্বস্তি পায়। তার জীবনে তার বড় ভাই নামে জেডির অবদান অনেক। আর জেডি যে অরুণকে ভালোবাসে, এটা সে বোঝে। কিন্তু জেডি নিজেকে যেমন দেখায়, সে আসলে তেমন নয়। এটা সে অরুণের ব্যাপার নিয়ে জেডির রিয়েকশন দেখে খুব ভালো করে বেশি বুঝতো। অনামিকা চোখ মুছে বলতে নেয়,

“জেডি ভাইয়া তুমি কেন মিথ্যা……
এটুকু বলতেই জেডি অনামিকার গালে ক’ষি’য়ে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। অনামিকা পাকা রাস্তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জীবনের প্রথম এতো আদুরে জেডির হাতে এতো জোরে থা’প্প’ড় খেয়ে অনামিকা স্তব্ধ হয়ে যায়। মাথা ভনভন করে উঠল। গাল টনটন করে ওঠে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে
জেডি তার ডান হাতের একটি আঙুল উঁচিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“আর কতবার বলব, এসব আমি করেছি। আমি নি’কৃ’ষ্ট। আমি খারাপ। মন টন কিছু নেই আমার৷ আমি শুধু মানুষকে দুঃখ দিতে ভালোবাসি। একটু আগে বলছিলি না, আমি নিজের স্বার্থের জন্য তোকে মা’র’তে পারবো কি-না! এই যে দেখিয়ে দিলাম। আমি তোকেও মা’র’তে পারবো। শুনতে পেয়েছিস তুই? আর আমার পিছন পিছন এসে ভাইয়া ডেকে ডেকে আমার কানের বারোটা বাজাবি না। সবাই দূরে……থাকবি আমার থেকে।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে আসে জেডির। যে হাতে অনামিকাকে থা’প্প’ড় মে’রে’ছে, সে হাতটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। জেডি রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অনামিকার দিকে তাকালো। লালিত চোখদু’টো অতিরক্তি ঝাপসা হয়ে এসেছে। বুকটায় কি অসহীয় ব্য’থা হচ্ছে, তা কাকে বোঝাবে? জেডি আর এখানে দাঁড়ায় না। সে দ্রুত উল্টো ঘুরে নুইয়ে আসা শরীরটা সামনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

নিঃশব্দে কান্নারত অনামিকা ধীরে ধীরে উঠে বসে। দু’পাতের কনুইয়ের দিলটায় ছিলে গিয়েছে। অনামিকা সেদিকে তাকালো না। সে তাকায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া জেডির পানে। তার বিশ্বাস হয় না, এটা জেডি ভাইয়া। যে গত ক’বছরে যে ভাইয়া তাদের বাড়ি আসলে সবার আগে তাকে খুঁজে বের করত। এই জেডি ভাইয়া থাকলে, তার বোন তাকে ঠিক করে বকতেও পারতো না। সেই ভাইয়া তাকে এভাবে থা’প্প’ড় মা’র’তে পারলো? অনামিকা হ্যাংলার মতো আবারও জেডিকে ডাকতে নেয়, তখন-ই পিছন থেকে একটি শক্তপোক্ত পুরুষালি হাত অনামিকার মুখ চেপে ধরে। অনামিকার চোখের আকাশ বড় হয়ে যায়। দৃষ্টি এখনো জেডির দিকে। সে দু’হাত বাড়িয়ে জেডিকে ডাকতে চাইলো, কিন্তু মুখ দিয়ে একটি টুঁ-শব্দটিও বের করতে পারলো না।

ওদিকে লোকটি একহাতে অনামিকার মুখ চেপে ধরে রেখে, আরেকহাতে অনামিকার দু’হাত শ’ক্ত করে ধরে। অনামিকা মোচড়ানো শুরু করে। লোকটি অনামিকাকে ধরে টেনে তার গাড়িতে উঠাতে ব্যস্ত। অনামিকা আগের চেয়েও শক্তি দিয়ে মোচড়াতে থাকে। কিন্তু সে লোকটির শ’ক্তির সাথে পেরে ওঠে না। তার ব্য’থাতুর দৃষ্টি এখনো জেডির পানে। চেপে ধরে রাখা মুখের আড়ালে নিরব চিৎকার করে ডাকল ‘জেডি ভাইয়া’ বলে৷ কিন্তু জেডি একবারের জন্য-ও এদিক ফিরলো না। কি করে ফিরবে? সে তো মানুষের চিৎকারের শব্দ শুনতে পায়, কিন্তু নিরব চিৎকার? তা কি করে শুনবে? সে ক্ষমতা তো আল্লাহ্ তাকে দেয়নি। নয়তো সে কি তার ছোট বোনকে বাঁচাতে ছুটে আসতো না? যাকে একটা থা’প্প’ড় দিয়ে, হাজার কণা ব্য’থা নিয়ে দুর্বল পায়ে সে এগোচ্ছে।

লোকটি অনামিকাকে টেনে মাইক্রো গাড়ির ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে। অনামিকা চিৎকার দেয়ার আগেই লোকটি অনামিকার উপর ঝুঁকে বা হাতে আবারও অনামিকার মুখ চেপে ধরে। সামনে থেকে ড্রাইভার গাড়ির দরজা আটকে দেয়। এরপর সে গাড়ি স্টার্ট দেয়৷ এদিকে অনামিকা লোকটির থেকে ছাড়া পাবার জন্য গলা কা’টা মুরগির ন্যায় ছটফটায়। এতোক্ষণে বুঝেছে, সে এক জ’ঘ’ণ্য লোকের কবলে পড়েছে।

জেডি অনামিকাকে থা’প্প’ড় মে’রে তার গাড়ির পিছনে এসে রাস্তায় বসে। হেলান দিয়েছে গাড়ির সাথে। সে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। যে এভিকে একটা ফুলের টোকা দেয়ার কথাও ভাবতো না, সেই এভিকে সে নিজে কত ক’ষ্ট দিয়েছে। যেই সন্ধ্যার মুখ থেকে কখনো হাসি ফুরাতে দিবেনা ভাবতো, সেই সন্ধ্যাকে কতশতবার কাঁদিয়েছে, যাকে একটা বোন বানিয়েছিল, যে খুব আদুরে ছিল, তাকে কখনো একটি ছোট্ট আ’ঘা’ত করার কথা কল্পনাও করেনি। আজ তাকে কত জোরে থা’প্প’ড় মে’রে’ছে। জেডি’র দমবন্ধ লাগলো। জীবন তাকে আজ কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! চারিদিকে শুধু অন্ধকার। সে না পেরে দু’হাতে সর্বশক্তি দিয়ে মাথার চুল টেনে ধরল। আর এই জীবন বইতে পারছে না সে। এক সময় ধীরে ধীরে নিজেকে সামলায়। এখনো তার কাজ বাকি। তাকে শ’ক্ত হতে হবে। জেডি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ডান হাতে দু’চোখে জমা পানি ছিটকে ফেলে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। রাস্তাটি ফাঁকা। চারিদিকে মানুষ নেই তেমন। মানুষের চলাফেলা খুব কম এদিকে। জেডি আশেপাশে একবার তাকালো। অনামিকা খুঁজল। দেখতে না পেয়ে ভাবলো, সে বাড়ির ভেতর চলে গিয়েছে। জেডি ডান হাতে আরেকবার ঝাপসা চোখজোড়া মুছে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

জেডির গাড়ি থেকে কিছুটা সামনের গাড়িটিই সেই গাড়ি যে গাড়িতে এক বি’কৃ’ত মস্তিষ্কের লোক অনামিকাকে তুলে নিয়েছে। অথচ জেডি বুঝতেও পারলো না, যাকে একটি সামান্য থা’প্প’ড় দিয়ে সে বারবার চোখ ভিজিয়ে ফেলছে, তার সেই আদুরে বোনকে তার সামনের গাড়িটিতে এক ন’র’খা’দ’ক তার সতিত্ব হরণ করার খেলায় নেমেছে। সেই আদুরে বোনের জীবন ধ্বং’সের পথে নেমেছে৷

এদিকে গাড়িতে থাকা লোকটি অনামিকার গলা থেকে ওড়না টান মে’রে সরিয়ে দেয়। এরপর অনামিকার মুখ সেই ওড়না দিয়ে শ’ক্ত করে বেঁধে দেয়। অনামিকা ছটফটিয়ে উঠার সুযোগটুকু পেল না। তার আগেই লোকটির হিং’স্র থাবায় নিরুপায় মেয়েটি বদ্ধ মুখে চিৎকার করে ওঠে। মুখ খোলা থাকলে হয়ত চিৎকারটি ওই দূর আসমান পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কিন্তু আফসোস, অরুণের একমাত্র ভালোবাসা, জেডির সেই আদুরে বোন, আনিকার আদরের ছোট বোনের চিৎকার এই বদ্ধ চলন্ত গাড়ির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলো। অনামিকা শব্দহীন খুব ডাকলো ‘জেডি ভাইয়া’ বলে। ডাকলো তার এতো বছরের ভালোবাসার অরুণকে। চোখের সামনে ভেসে উঠল, ক’দিন আগে অরুণ সব জানতে পেরে দৌড়ে এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য। ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে অরুণ তাকে তার বুকে জড়িয়ে নেয়ার দৃশ্য। আর তারপর তাকে ছেড়ে ঝাপসা চোখে চেয়ে বলেছিল,

“স্যরি! এটাই শেষ। এরপর একেবারে বিয়ের পর তোমায় স্পর্শ করব। এই শেষবারের মতো ক্ষমা কর।”
অনামিকা অবাক হয়ে কেবল অরুণকে দেখছিল। একটা সময় যে অরুণ বিয়ের আগে সবকিছু করে ফেলার ব্যাপারটি সাধারণভাবে নিত। সেই অরুণকে বিয়ের আগে তাকে সামান্য জড়িয়ে ধরার কারণে স্যরি বলতে দেখে।
বি’ধ্ব’স্ত অনামিকার কানে বেজে উঠল, আজ সকালে অরুণের বলা আবেগীয় শেষ কথা,

“তোমাকে অনেক ভালোবাসি অনামিকা। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমায় বিয়ে করে আমার ঘরের রাণী করে নিয়ে যাবো। তুমি যেভাবে চাইবে, সেভাবেই আমরা আমাদের সংসার সাজাবো। ইরার মতো তোমার গ্রামে থাকতে ইচ্ছে হলে আমাকে বলবে, আমি তোমার জন্য এই দেশেই পার্মানেন্ট হয়ে যাবো। একটি ছোট্ট গ্রামে আমরা আমাদের সুখের সংসার গড়বো। যে অনলাইনের কারণে আমাদের মাঝে এতো দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। সেসব আমাদের জীবন থেকে মুছে ফেলবো। ঝামেলা হবে, এমন কিচ্ছু থাকবে না আমাদের জীবনে। শুধু থাকবে আমার আর তোমার অফুরন্ত ভালোবাসা। গত চার বছরে আমি অনেক দুঃখ পেয়েছি। তুমি তোমার ভালোবাসা দিয়ে আমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দিও অনামিকা।”

অনামিকার টকটকে লালিত দু’চোখের কোণ ঘেঁষে নোনাপানি গড়িয়ে পড়ে। দু’পা দ্বারা দু’পা ছিলে ফেলেছে। কিন্তু তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া এই ন’র’প’শুর থেকে একচুল পরিমাণ বাঁচতে পারলো না মেয়েটি। কতশত বার যে গুঙিয়ে উঠল। বুকফাটা আর্তনাদে নিরব চিৎকার দিল কে জানে! একসময় নুইয়ে পড়া নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে মনে মনে আওড়ায়,

“আমি পারলাম না অরুণ, তোমার দুঃখ ভুলিয়ে দিতে। পারলাম না তোমার সাথে একটি সুখের সংসার বাঁধতে। আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে মনে রেখ।”
দু’চোখের পাতা বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে।
ন’র’প’শুটি তার খায়েশ মিটিয়ে অনামিকার উপর থেকে সামান্য ওঠে। ততক্ষণে অনামিকার শরীরের সব শ’ক্তি শেষ। একেবারে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে।
লোকটি অনামিকার মুখের বাঁধন খুলে, ওড়নাটি অনামিকার গলায় পেঁচিয়ে দু’দিক থেকে সর্বশক্তি দিয়ে টান দিয়ে ধরে। অনামিকার বন্ধ চোখ খুলে যায়। বড় বড় হয়ে যায়। শেষবারের মতো বাঁচার আশায় ছটফট করে উঠল। দু’পা মোচড়ালো। হাত দিয়ে লোকটিকে সরিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু ব্য’র্থ হলো। শেষবারের মতো চোখের পর্দায় ভেসে উঠল,, অরুণের হাস্যজ্জ্বল মুখ, ভাসল জেডির করা তার সাথে দুষ্টুমি, ভাসলো বড় বোনের কতশত আদর! অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,

“আ..পু, জ..জেডি ভা….ইয়া, অ..রুণ ভালোবা……
অনামিকা তার কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না। ছটফটানো থেমে গেল। মোচড়ানো পা দু’টো নিস্তেজ হয়ে গেল। চোখদু’টো স্থির হয়ে গেল। থেমে গেল বুঝি নিঃশ্বাস! শেষবারের মতো দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। ক’মিনিটের ব্যবধানে সব কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এক বদ্ধ গাড়িতে চাপা পড়ে গেল অরুণ আর অনামিকার সাজানো স্বপ্ন। হে’রে গেল তারা নিয়তির কাছে।
অনামিকার মৃ’ত্যু নিশ্চিত হয়ে লোকটি গাড়ির দরজা খুলে অনামিকার নিথর দেহ চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা মে’রে ফেলে দেয় রাস্তার পাশে। এরপর সাথে সাথে গাড়ির দরজা আটকে দেয়। ড্রাইভার গাড়ির স্পিড বাড়ায়। মাতাল ছেলেটি সিটে আয়েশ করে বসে একটি সিগারেট ধরায়। হাতের সাথে একটি কাপড় বাঁধলে দেখল র’ক্তমাখা পায়জামা, যেটা অনামিকার পরনে ছিল। ছেলেটি বিরক্ত হয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে পায়জামাটি ছুড়ে ফেলে দেয়। এরপর সিটে গা এলিয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকে।

জেডি বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ সামনের গাড়িটির জন্য বিরক্ত হচ্ছিল। কারণ গাড়িটি ঠিকভাবে চলছিল না৷ ভীষণ আঁকাবাঁকা হয়ে চলছিল৷ যার ফলে সে গাড়িটি পাস করে সামনে যেতে পারছিল না। গাড়ি থামতে দেখে সে পাস করতে নিচ্ছিল, তখন-ই চোখে পড়ে গাড়িটি থেকে কাকে যেন ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো৷ জেডি সাথে সাথে গাড়ির ব্রেক কষে। সামনের গাড়িটি আবারো স্টার্ট দিলে জেডি ভ্রু কুঁচকে তাকায় রাস্তার পাশে। চোখ আটকায় পরিচিত জামা, যেটা সে কিছুক্ষণ আগে অনামিকার পরনে দেখেছিল। জেডির বুকটা হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল। সে ঢোক গিলে নিজেকে বোঝালো, অনামিকা এখানে কি করে আসবে! ও তো বাড়ি চলে গিয়েছে। জেডি নিজেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় মেয়েটির পাশে।

উপুড় হয়ে থাকায় চেহারা দেখতে পাচ্ছে না। দৃষ্টি পড়ল মেয়েটির হাঁটুসমান উম্মুক্ত র’ক্তা’ক্ত পায়ের দিকে। জেডি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। বুঝেছে বোধয় অনেককিছু। বুকটা কাঁপছে কেন যেন। ওড়নার দিকেও চোখ পড়েছে, তাছাড়া সে অনামিকাকে একটু হলেও তো চেনে। পিছন থেকে চেনা তার কাছে খুব একটা কঠিন কিছু না। কিন্তু জেডি মানতে নারাজ। সে নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ করছে, এটা অনামিকা নয় সে কথা মানাতে। জেডি ঢোক গিলে ধীরে ধীরে বসে পড়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে। কাঁপা ডান হাত দ্বারা ঠেলে মেয়েটির পাশ ফিরিয়ে দিলে অনামিকার ভ’য়া’বহ এক বিধ্বস্ত মুখ ভেসে ওঠে। জেডি যেন কারেন্ট শক খেল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গের ভেতর জ্ব’ল’ন্ত উল্কা’পি’ণ্ডের ন্যায় কি যেন ছুটাছুটি করতে লাগলো। স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইল অনামিকার ধ্বং’সা’ত্ম’ক মুখপানে। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো,,

“অ..না..মিকা, বো.ন আ.আমার!”
দু’চোখ ফেঁটে নোনাজল গড়ালো। হঠাৎ-ই ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে অনামিকার দু’গাল নেড়েচেড়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
“এ্যাই অনামিকা, কি হয়েছে রে তোর? অনামিকা? এ্যাই অনামিকা তোর এ্যই অবস্থা কে করেছে? একবার তোর ভাইয়াকে বল, আমি ওকে বাঁচতে দিব না। শুধু একবার বল? কথা বল? অনামিকা?”

জেডির অহায়ত্বে ঘেরা কণ্ঠে, নিঃশ্বাস থেমে যাওয়া অনামিকা সাড়া দিল না। যে কিছুক্ষণ আগে তার জেডি ভাইয়াকে চিৎকার করে ডেকেছিল, খুব করে চাইছিল, তার জেডি নামে বড় ভাইয়া তার কাছে এসে তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাক, এইতো জেডি এসেছে, জেডি ডাকছে অনামিকাকে। কিন্তু ততক্ষণে সময় ফুরিয়েছে। মেয়েটি যে আর সাড়া দিচ্ছে না। জেডি ডাকছে, খুব ডাকছে, কিন্তু অনামিকা একবারের জন্যও শুনতে পাচ্ছে না। জেডি সময় ন’ষ্ট করল না। সে তার চোখজোড়া মুছে দ্রুত অনামিকাকে কোলে করে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে শুইয়ে দেয়। অনামিকার গলায় পেঁচানো ওড়ানা খুলে অনামিকার পায়ের দিকটা ঢেকে দেয়। এটুকু কাজ করতে কতফটা যে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল সে হদিশ নেই। জেডি বিড়বিড় করল,

“কিচ্ছু হবে না তোর। তোর জেডি ভাইয়া আছি। শুধু একটু অপেক্ষা কর।”
এরপর সে দৌড়ে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। হাই স্পিডে গাড়ি চালিয়ে কাছেপিঠের এক হসপিটালের সামনে এসে গাড়ি থামায়। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসে, গাড়ির সিটে পড়ে থাকা নিথর অনামিকাকে কোলে তুলে নিয়ে একপ্রকার দৌড় লাগায় হসপিটালের ভেতর। হসপিটালের নিচতলাতর ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকিয়ে চিৎকার করে ডাকে,
“এ্যাই কেউ স্ট্র্যাচার নিয়ে এসো। আমার বোনের কি যেন হয়েছে। ও কথা বলছে না। কেউ আমার বোনকে একটু দেখে দাও! ওকে সুস্থ করে দাও।”

জেডির কথায় কতশত অসহায়ত্ব মিশে! সবাই জেডিকে চিনতে না পারলেও বেশিরভাগ মানুষ-ই জেডিকে চিনতে পারছে। বিশেষ করে নার্স, ডক্টর। দু’জন নার্স দ্রুত একটি স্ট্রেচার নিয়ে আসে অনামিকাকে জরুরি বিভাগে নেওয়ার জন্য। জেডি সাথে অনামিকাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিয়ে এলোমেলো ওড়না দ্বারা অনামিকাকে ভালেভাবে ঢেকে দিয়ে তার চোখজোড়া মুছে নার্সগুলোর দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“ওকে নিয়ে যাও। ফার্স্ট।”
নার্স দু’জন স্ট্রেচার টানে সামনের দিকে। অনামিকার ডান হাত স্ট্রেচার থেকে নিচের দিকে ঝুলে আছে। একজন ডক্টর এগিয়ে অনামিকার হাত ধরে পাল্’স চেক করে নার্স দু’টোকে থেমে যেতে বলে৷ স্যারের নির্দেশ পেয়ে নার্স দু’জন থেমে যায়। ডক্টরি জেডির দিকে চেয়ে বলে,

“সি ইজ্‌ ডেড।”
কথাটা শুনতেই জেডি বোধয় আগের চেয়েও বড়সড় একটা ঝটকা খেল। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকালো ডক্টরের দিকে। ডেড মানে? ও তো কিছুক্ষণ আগেই তাকে জেডি ভাইয়া, জেডি ভাইয়া বলে ডাকছিল। ও কিভাবে ম’রে যেতে পারে? জেডি তেড়ে গিয়ে ডক্টরের নাক বরাবর ঘু’ষি মে’রে দেয়। চিৎকার করে বলে,
“ডেড মানে? ওকে মৃ’ত বলার সাহস কোথায় পেয়েছিস তুই? জানিস ও কে? ও এই জ্যাক ডাল্টনের একমাত্র বোন। আর তুই ওকে মৃ’ত বলছিস?”

কথাটা বলতে বলতে জেডি ডক্টরের মুখে আরেকটি ঘু’ষি মে’রে দেয়। আরও কয়েকজন ডক্টর এগিয়ে এসে জেডির থেকে তাদের সহকর্মীকে সরিয়ে নেয়। জেডি’র মাথা কাজ করে না। সে দৌড়ে গিয়ে অনামিকার স্ট্রেচারের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। অনামিকার বা হাত তার দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“অনামিকা? এ্যাই অনামিকা? উঠে পড়। তুই জিজ্ঞেস করছিলি না, আমি মিথ্যে বলছি কি-না! আমি স্বীকার করে নিলাম, আমি সব মিথ্যে বলেছি। এবার তুই-ও উঠে ওই বে’য়া’দ’ব ডক্টরকে বল না, ও তোর নামে মিথ্যে বলছে। স্বীকার কর, তুই বেঁচে আছিস। এ্যাই অনামিকা?”

জেডি কথাগুলো বলতে বলতে অনামিকাকে কয়েকবার ঝাঁকালো। কিন্তু নিথর দেহটা নিজে থেকে এক চুল পরিমাণ নড়লো না। জেডি অনামিকার পাশ থেকে উঠে এসে আবারো সেই ডক্টরের কাছে এসে দু’হাত জোর করে বলল,
“আমি স্যরি! আর মা’র’বো না আপনাকে। আমার বোনটাকে বাঁচিয়ে দিন না! আমার আর কেউ নেই। আমাকে ভালোবাসার কেউ নেই। শুধু ওই একটু ভালোবাসতো। ও আমার পিছু আসতে গিয়েই কি যেন হয়ে গেল! ওকে একটু বাঁচিয়ে দিন। আমার সবকিছু আপনাকে দিয়ে দিব। শুধু ওকে একবার বাঁচিয়ে দিন।”

প্রত্যেকে অবাক চোখে জেডির দিকে চেয়ে আছে। মনে হচ্ছে, কোনো বাচ্চার খেলনা হারিয়ে যাওয়ার সে আবারও সেই খেলনা ফিরে পাবার আবদার করছে। জেডি কারো সাড়া না পেয়ে আবারো দৌড়ে অনামিকার কাছে এসে বসে। এইবার হঠাৎ চোখে পড়ে অনামিকার ফর্সা গলা বরাবর লাল দাগ। ব্য’থাযুক্ত বুকে আরও তীব্র ব্য’থায় চিনচিন করে উঠল। সে খুব উপলব্ধি করল, কিছুক্ষণ আগে যে আদুরে বোনটা তার পিছু পিছু ছুটছিল ভাইয়া ভাইয়া বলে, সে আর তাদের মতো নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। যে তার কাছে ছুটে আসছিল, তার বলা কথাগুলোকে মিথ্যে প্রমাণ করতে, সে আর আসবে না। কখনো চোখ মেলে তাকাবে না। জেডি ভাইয়া বলেও ডাকবে না। ছেলেটা কেমন বাচ্চাদের মতো শব্দহীন কেঁদে উঠল। অনামিকার হাত তার দু’হাতের মাঝে নিয়ে অনামিকার হাতে কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,

“একটা থা’প্প’ড়-ই তো মে’রেছিলাম। এর জন্য একেবারে ছেড়েই চলে গেলি? মিথ্যে মিথ্যে বলেছিলাম, আর জেডি ভাইয়া বলে কানের বারোটা না বাজাতে। আর তুই সত্যি সত্যিই সেই ডাক মুখে না নিতে, একেবারে হারিয়ে গেলি?
আমাকে তোর মতো করে কেউ বিশ্বাস করে না অনামিকা। কেউ তোর মতো করে বোঝে না। কেউ আর আমাকে ভালোবাসে না। শুধু তুই এতোকিছুর পরও আমার কাছে আসছিলি। কেন এসেছিলি? জানতিস না আমার ভাগ্য কেমন? পোড়া ভাগ্য আমার। তাই দূরে ঠেলে দিলাম। তুই সেই ভাগ্যে কেন পা রাখতে ছুটে এলি? কেন এতো দুঃখ নিয়ে এই দুনিয়া ছাড়লি?”

এটুকু বলে জেডির কথা জড়িয়ে আসে। যে ছেলেটা কিছুক্ষণ আগেই অনামিকাকে বলল, সে না-কি নিজের স্বা’র্থের জন্য অনামিকাকে মা’র’তেও পারবে। যার ভাইয়া ডাক শুনে কত বিরক্তি প্রকাশ করেছিল! সে নেই বলে এখন তার কত আহাজারি! জেডির মনে পড়ে, কিছুক্ষণ আগে অনামিকা তার পিছু পিছু ছুটছিল বলে সে মেয়েটিকে উল্টাপাল্টা কথা বলে থা’প্প’ড় মে’রেছিল। কথাটা ভাবতেই জেডির আরও দমবন্ধ লাগলো। অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,

“আমি আর মা’র’বো না তোকে অনামিকা। এবার তোর সব কথা শুনবো। তোর পাশে বসব। তোকে একটি সুখের সংসার গিফট করব। আমি তোর বিয়ের জন্য কতকিছু কিনে রেখেছি, দেখবি না সেসব? অরুণ তোকে বিয়ে করার জন্য অপেক্ষা করছে। তুই না অরুণকে অনেক ভালোবাসিস? প্লিজ ফিরে আয়!”
কথাগুলো বলতে বলতে জেডির দু’চোখ বেয়ে অজস্র অশ্র গড়ায়। জেডির একটি কথাও চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে যাওয়া স্ট্রেচারে পড়ে থাকা অনামিকার কানে গেল না। সে তো নিশ্চিতে ঘুমিয়ে। যে ঘুমে, ঘুমন্ত ব্যক্তি কখনো বিরক্ত হয় না৷ আর না তো ভাঙে ঘুম। কেবল তার ঘুম সবাইকে কাঁদিয়ে ছাড়ে।

দুপুরের পর পর,
আকাশ একটি ফাঁকা রাস্তার পাশে এসে বসে। সে মূলত নিয়াজের বাড়ি থেকে ফিরলো। সে, সৌম্য, সন্ধ্যা, সৃজন সবাই গিয়েছিল নিয়াজের দা’ফ’ন কার্য সম্পন্ন করতে। নিয়াজের ক’ব’র দেয়া শেষে আকাশ সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। বারবার নিয়াজের হাসিমুখটা ভেসে উঠছে। যে ছেলেটার মুখে কখনো দুঃখের ছাপ দেখেনি, যাকে দেখেছে সবসময় দুঃখ চাপা দিয়ে হাসতে। সে আজ একটাবার চোখ মেলে তাকায়নি। একটাবারও কারো সাথে কথা বলেনি। নিয়াজের খাঁটিয়ার মাথার কাছে বসে সৃজনের সেই ডাক, সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। ছোট্ট সৃজন নিয়াজের খাঁটিয়ার উপর ঝুঁকে তার ডান হাত নিয়াজের মুখে বুলাচ্ছিল আর বলছিল,

“খিয়াজ মামা উটো। খিয়াজ মাম উটো বলচি। ছবাই শুদু কাঁদে৷ তুমি উটো। তায়লে আল কেউ কাঁদবে না। উটো খিয়াজ মামা। তুমি শুদু গুমাচ্চো কেনু? আমাকি জেলি কিনে দিবানা? উটো খিয়াজ মামা। উটো উটো।”
এভাবে কতশতবার ডাকতে ডাকতে এক পর্যায়ে ছোট্ট সৃজন ক্লান্ত হয়ে, হতাশ হয়ে কেঁদে দিয়েছিল। যে নিয়াজ সৃজনকে দেখলে দূর থেকে ছুটে আসতো। দেখা হলেই দু’হাত ভর্তি সৃজনের দু’হাত জেলি দিয়ে ভরে দিত। সে আজ সৃজনের এতো এতো ডাক উপেক্ষা করে কেবল শুয়ে রইল। সৃজনের কান্নার আওয়াজও তাকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারলো না।
আকাশ ডান হাত দিয়ে ঝাপসা চোখ মুছে নিল।

তখনই সেখানে জেডি অনামিকাকে তার কোলে করে নিয়ে আসে। আকাশের পাশ বরাবর হাঁটু গেড়ে বসে মৃ’ত অনামিকাকে শুইয়ে দেয় রাস্তার পাশে। মৃদু শব্দ পেয়ে আকাশ বাদিকে ঘাড় ফেরায়। চোখে পড়ে, জেডি হাঁটুগেড়ে বসে তার দিকে মলিন মুখে চেয়ে আছে। আকাশ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে চাইলে, চোখ পড়ে মাটিতে কাউকে শুইয়ে রেখেছে। পুরো শরীর একদম সোজা। যেন কোনো মৃ’ত মানুষ। মুখ থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখায় আকাশ দেখতে পায় না। আকাশ দৃষ্টি উঠিয়ে জেডির দিকে তাকালো। জেডির নির্জীব দৃষ্টি এখনো আকাশের দিকে। আকাশ ঢোক গিলল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে বা হাতে মাথা থেকে ঢেকে রাখা ওড়না টান মে’রে সরিয়ে দেয়। দৃশ্যমান হয় অনামিকার বিধ্বস্ত মুখখানা। মেয়েটির মুখের চারপাশে অসংখ্যা জায়গায় ক্ষ’ত। ক্ষ’ত গলার দিকে। আকাশের বুকটা ধ্বক করে উঠল। এ তো আনিকার বোন। হয়ত আনিকার বোনের সাথে তার দহরম সখ্যতা ছিল না। কিন্তু মেয়েটি তার বান্ধবীর ছোট বোন। সম্পর্কে তারও ছোট বোন। শিমুর থেকে কমভাবে দেখে না সে মেয়েটিকে। সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েটির সাথে আর ক’দিন পর অরুণের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। বান্ধবীর বোনের পাশাপাশি বন্ধুর বউ বলা যায়। মেয়েটির বয়স কি খুব বেশি? শিমুর চেয়ে বড়জোর এক-দেড় বছর বড় হতে পারে। সেই মেয়েটির অবস্থা এমন কেন? আকাশ কাঁপা ডান হাত এগিয়ে নিয়ে অনামিকার নাকের কাছে ধরলে বুঝল নিঃশ্বাস পড়ছে না। আকাশ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটির সাথে অনেক খারাপ কিছু হয়েছে। আকাশ দৃষ্টি উঠিয়ে জেডির দিকে তাকালো। ঢোক গিলে বলে,

“ওর এই অবস্থা…..
মাঝখান থেকে জেডি বলে ওঠে,
“আমি করেছি।”
কথাটা শুনে আকাশের মনে হলো, তার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে এক ধরনের চিনচিনে ব্য’থা ছড়িয়ে পড়ল। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকালো জেডি’র পানে। আকাশের দৃষ্টি দেখে জেডি হঠাৎ-ই শব্দ করে হেসে ফেলল। প্রাণখোলা হাসিতে মেতে উঠল, যেন সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। আকাশ নির্বাক। অপলক চেয়ে রইল জেডি’র পানে। মিনিট দুই পর জেডি নিজেকে সামলে রাস্তায় পা ছড়িয়ে বসল৷ এরপর বলে,
“এতো অবাক হওয়ার কি আছে এভিজান, অরুণ আর আমি একে অপরের শ’ত্রু। আর শ’ত্রুর উডবি তো আমার শ’ত্রুই হবে। বন্ধু তো হবে না। তাই এই কাজ করে ফেললাম আর কি! এবার অরুণ অনেক দুঃখ পাবে। আমি ঠিক করিনি এভিজান?”

জেডি বলা কথাগুলো শুনে আকাশের বুকে চিনচিনে ব্য’থা বাড়লো। চোখের কোণ দু’টো ভিজে উঠল। এই একটা মানুষ কতগুলো মানুষকে মে’রে’ছে! তাদের প্রত্যেকের থেকে সুখ কাড়তে কাড়তে এ কোথায় এসে ঠেকেছে? আকাশ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। ঢোক গিলে থেমে থেমে বলে,
“তুই না ওকে বোন ভাব…..
মাঝ থেকে জেডি হেসে বলে,
“মিথ্যে মিথ্যে বোন ভাবতাম। এটুকুও বুঝিসনি?”
আকাশের ভীষণ দমবন্ধ লাগলো। মনে হচ্ছে, কোনো এক অদৃশ্য শ’ক্তি তার গলা চেপে ধরেছে। আকাশ হাসফাস করে ওঠে। এটা সেই জ্যাক যে তাদের কাউকে দুঃখ দেয়ার কথা কল্পনাও করত না? এটা সেই জ্যাক, কি করে হয়? আকাশ ঝাপসা চোখে চেয়ে বলে,

“তুই এতোটা অ’মানুষ কবে হয়ে গেলি জ্যাক?”
জেডি হাসল। হাস্যজ্জ্বল মুখের চাপা পড়া বিধ্বস্ত মুখে একবার হাত বুলিয়ে বলে,
“আমি মানুষ কবে ছিলাম এভি? তোর মা যে আমাকে পছন্দ করত না, এর পিছনে কিন্তু খুবই সুন্দর আর যুক্তিগত একটি কারণ ছিল। যে ছেলে একটা মাছি মা’র’তে পারতো না। তাকে আমি মানুষ মা’র’তে শিখিয়েছি। কোনো মা-ই এটা মানতে পারবে না। তোর মা-ও পারেনি। আর আমিও তোর সো কোল্ড এতো ভালো মাকে মানতে পারিনি।”
আকাশ কম্পিত কণ্ঠে বলে,
“এজন্য আমার মাকে সত্যি সত্যিই মে’রে দিলি?”
জেডি ঘাড় চুলকায় আর হেসে বলে,
“হুম দিলাম।”

মুহূর্তেই আকাশের র’ক্ত গরম হয়ে উঠল। সে অপর পাশ থেকে উঠে এসে জেডিকে টেনে ধাক্কা দিয়ে জেডির উপর উঠে, তার দিকে সামান্য ঝুঁকে, আকাশের দু’হাতে যত শক্তি ছিল, সর্বশক্তি দিয়ে জেডির গলা চেপে ধরে। জেডির চোখ দু’টো বড় হয়ে যায়। তবে তার বাঁচার তাড়া দেখা গেল না। আকাশের ভাবটা এমন যেন, আজ এক্ষুনি সে জেডিকে গলা টিপেই মে’রে ফেলবে। এতোটাই শ’ক্তি খাঁটিয়ে জেডির গলা চেপে ধরেছে। অথচ আকাশের টকটকে লালিত দু’চোখ বেয়ে অশ্রকণা ঝরে জেডির মুখের উপর পড়ে। জেডি স্থির দৃষ্টিতে কেবল আকাশের দিকে চেয়ে রইল। একপর্যায়ে এসে হঠাৎ-ই আকাশের হুশ ফিরে। সে দ্রুত জেডির গলা থেকে হাত সরিয়ে নেয়। বিলচিত কণ্ঠে বলে,

“ঠিক আছিস? জ্যাক?”
জেডি চোখ বুজে সমানে কাশছে। ব্য’থায় বাম চোখের কোণ ঘেঁষে একফোঁটা নোনাপানি রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে। আকাশ কথা শুনে একটু হাসল বোধয়, যা অতি সূক্ষ্ম।
জেডির সূক্ষ্ম হাসি আকাশের চোখে পড়ে। সে জেডির দিকে চেয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“মৃ’ত্যু দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালে, মানুষের বুঝি এতোটাই অধঃপতন হয়?”
জেডি চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলে,
“হয়ত!”
আকাশের পুরো শরীরে কি যেন ছুটোছুটি করতে লাগে৷ যার ফলে তার রা’গ তড়তড় করে বাড়লো। অতঃপর রাগান্বিত স্বরে বলে,
“জীবনে অনেক খু’ন করেছি। কিন্তু ততটা বীভৎসভাবে কখনো করিনি, যতটা বীভৎসভাবে তোকে খু’ন করব। বি রেডি।”

কথাটা বলে আকাশ উঠে দাঁড়ালো। এরপর গটগট পায়ে উল্টোদিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কাউকে কল করে এখানকার লোকেশন দিয়ে একটি এম্বুলেন্স পাঠাতে বলে।
পাঁচমিনিটের মাথায় একটি এম্বুলেন্স এসে এখানে থামে। অনামিকার বডি এম্বুলেন্সলে উঠানো হলে আকাশ এম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে যায়। পিছু ফিরে তাকায় জেডির দিকে।
জেডি এতোক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে মলিন মুখে অনামিকাকে দেখছিল। মাত্র আকাশের দিকে তাকালে দু’জনের চোখাচোখি হয়। আকাশ পুরোপুরি জেডির দিকে ফিরে তাকালো। গলায় ঝুলানো চেইন, আর ডান হাতে বিদ্যমান চেইন দু’হাতে দু’টো টেনে ছিঁড়ে ফেলে। হাত আর দু’জায়গায়-ই একটি চিঁড়ে গেল বোধয়, তবে আকাশের সেদিকে খেয়াল নেই। সে জেডির দিকে চেয়ে ছেঁড়া চেইন দু’টো জেডির মুখে ছুড়ে মা’রে। চেইনের ছেঁড়া অংশগুলো জেডি’র মুখে এসে লেগে, সেগুলো চারিদিকে ছিটিয়ে যায়।
আকাশ জেডির দিকে চেয়ে বেঁধে আসা গলায় বলে,

“এর চেয়েও জ’ঘ’ণ্যভাবে আমাদের বন্ধুত্ব তুই নিজ হাতে ভেঙেছিস। তোর কোনো ক্ষমা নেই। এসব জঙ্গল আমাকে আর সেকেন্ড টাইম দিবিনা। অবশ্য দিতে পারবিও না। কারণ তোর মৃ’ত্যু নিশ্চিত।
এটুকু বলে আকাশ একটু থামলো। এরপর ঝাপসা চোখে চেয়ে ডান হাতের এক আঙুল দ্বারা বুকে তাক করে দেখায় আর ভাঙা গলায় বলে,
যে হাতে একদিন তোকে এই বুকে আগলে নিয়েছিলাম, সেই হাতেই তোকে আজ খু’ন করতে হবে। আল্লাহ্ এমন দিন আমার শ’ত্রুকেও না দিক।”

কথাগুলো বলে আকাশ আর দাঁড়ালো না। উল্টো ঘুরে শার্টের ডান হাতা দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে বড় বড় পায়ে এগিয়ে গিয়ে এম্বুলেন্স এর ভিতর উঠে বসে। একজন লোক এম্বুলেন্স এর দরজা বন্ধ করে দিলে, এম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়।
জেডি’র দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। যতক্ষণ এম্বুলেন্সটি দেখা গেল, ততক্ষণ শুধু সেদিকেই চেয়ে রইল। একসময় এম্বুলেন্সটি মিলিয়ে গেলে জেডি ধীরে ধীরে বসে পড়ে। রাস্তায় ছিটিয়ে থাকা চার টুকটো হয়ে যাওয়া চেইন কুড়িয়ে একসাথে করে দু’হাতের মুঠোয় নিল। সেইম দু’টো চেইন তার গলায় আর হাতে আছে। প্রতিটি চেইনের মাঝখানে দু’টো করে অক্ষর লেখা – ‘AJ’। যেটা আকাশ আর জেডি নামের প্রথম দু’টো অক্ষর। সেইম ডিজাইনের চেইন চারটে জেডি বানিয়ে নিয়েছিল। দু’টো নিজের জন্য, আর দু’টো আকাশের জন্য। এর আগে যতবার ঝামেলা হয়েছে, আকাশ এগুলো খুলে ফেলত। আজ একেবারে ছিঁড়ে ফেলল। আকাশ বলা সেই কথা বারবার কানে বাজলো,

‘এর চেয়েও জ’ঘ’ণ্যভাবে আমাদের বন্ধুত্ব তুই নিজ হাতে ভেঙেছিস।’
জেডি বাচ্চাদের মতো চেইনগুলো জোড়া লাগাতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। বারবার ঝাপসা চোখজোড়া মুছল আর চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু সে বরাবরই ব্যর্থ হলো। খন্ডিত হওয়া চেইনগুলোর দিকে চেয়ে ক’ফোঁটা চোখের পানি ফেলে ধরা গলায় বলে,
“তুই আরেকটি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিস। এই চেইনগুলোর মতোই আর বোধয় কখনো আমাদের বন্ধুত্ব জোড়া লাগবে না রে এভিজান। কারণ আমার মৃ’ত্যু নিশ্চিত। জানি, আমাকে মা’র’তে তোর ভীষণ ক’ষ্ট হবে। তবে এই শেষবার তোকে সেই ক’ষ্টটুকু দিতে চাই।”

কথাগুলো বলে জেডি তার অসহায়ত্বে ঘেরা দৃষ্টি চারিদিকে ঘোরালো। মনে হলো, একপাশে তার হাস্যজ্জ্বল সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে আছে, আরেকপাশে তার প্রিয় এভিজান। আরেকপাশে তার বোন অনামিকা। সবার মুখে খুশির ঝিলিক। সবাই হাসছে তার দিকে। এককালে জেডির জীবন ঠিক এমনটাই ছিল। তাকে তার সন্ধ্যাপ্রাণ খুব চাইতো। ভীষণ ভালোবাসতো তার এভিজান। আর অনামিকা করত দুষ্টুমি। কিন্তু আজ সবাই হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। জেডি’র ছটফট লাগলো। ঝাপসা চোখদু’টো তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির ন্যায় ছোটাছুটি করছে। খুঁজছে তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো, খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে। কিন্তু কেউ কোথাও নেই৷ সব কেমন নিস্তব্ধ হয়ে রইল। জেডি ঝাপসা মলিন দৃষ্টিজোড়া নিচু করে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। এলোমেলো পায়ে উল্টোপথে হাঁটতে লাগলো। মাথা তুলে একবার তাকালো মেঘলা আকাশপানে। ঠোঁটের কোণায় বিষাদে ঘেরা একটি সূক্ষ্ম হাসি ফুটায়। অথচ দু’চোখ দুঃখের অশ্রুতে ভরপুর। সেই দৃষ্টি আকাশপানে রেখেই হঠাৎ-ই বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৫

“সব দিয়ে যার, সব কেড়ে নাও।
সব দিয়ে যার, সব কেড়ে নাও।
তার তো প্রাণে সয় না।
তোমার দিল-এ কি দয়া হয় না?
তোমার দিল-এ কি দয়া হয় না?”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৭