আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৭
DRM Shohag
অরুণ সকালের দিকে অনামিকাকে নিয়ে বেরিয়েছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার দেখা করেছিল তারা। তবে আজ দেখা করে মন খুলে অনেক কথা বলেছে একে-অপরে। অরুণ অনামিকাকে কথা দিয়েছে, সে খুব তাড়াতাড়ি অনামিকাকে বিয়ে করবে। কথাটা বলার পর, অনামিকার লাজুক দৃষ্টি, মেয়েটির মুখে লেগে থাকা উচ্ছ্বাসটা চোখে পড়ার মতো ছিল। অরুণ অনামিকাকে অনামিকাদের বাড়িতে রেখে তার কিছু কাজে বেরিয়েছিল। ফেরার পথে অনামিকার জন্য বেশকিছু জিনিসপত্র কিনেছে। শাড়ি, চুড়ি, ফুল আরও বেশ কিছু জিনিস। মূলত তাদের বিয়ের জন্যই কিনেছে এসব।
এখন অনামিকার বাসায় এসেছে, এই জিনিসগুলো অনামিকাকে দিতে। এরপর অনামিকা যদি রাজি হয়, তবে অনামিকাকে নিয়ে সে আবারও মার্কেটে যাবে। এবার অনামিকার যা যা পছন্দ হয়, সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অনামিকাকে সব কিনে দিবে। মেয়েটা বোধয় এখনো সংকোচবোধ করবে। কথাটা ভেবে অরুণ সামান্য হাসলো। অনামিকাদের বাড়ির একদম গেটের সামনে এসে দাঁড়ালে অরুণের কপালে ভাঁজ পড়ে। অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। ভেতর থেকে শোরোগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। অরুণ বুঝতে পারলো না, হঠাৎ অনামিকাদের বাড়িতে এতো মানুষ কেন এসেছে! সে ব্যস্ত পায়ে এগোলো। মেইন গেইট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে, হাতের ডানদিকে বাড়ির ফাঁকা জায়গা জুড়ে মানুষ গিজগিজ করছে। এবার অরুণের কানে এতো শোরগোলের সাথে সাথে কান্নার আওয়াজও ভেসে আসলো। অরুণের চোখেমুখে চিন্তারা এসে ভিড় করল৷ মনে প্রশ্ন জাগলো, আঙ্কেল-আন্টির কিছু হয়নি তো? অরুণ এবার আর সময় ন’ষ্ট করল না। সে ব্যস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে যায়, যেখানে এতো এতো মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝ থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। অরুণ ভিড় সরাতে শব্দ করে বলে,
“এক্সকিউজ মি! একটু সাইড দিন প্লিজ!”
অরুণের কথায় অনেকেই সাইড হয়ে দাঁড়ালো। বেশিরভাগ মহিলা মানুষ। তারা সাইড দিলে অরুণ সামনে আরও দু’পা এগোয়। সর্বপ্রথম চোখ পড়ে আনিকার দিকে, যে মাটিতে পা ছড়িয়ে শব্দ করে কাঁদছে। পাশে আনিকার বাবা, মাও আছে। আনিকার মা আনিকার মতো শব্দ করে কাঁদলেও তার বাবা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে।
অরুণ চিন্তিত মুখখানা ডানদিকে সামান্য ঘোরায়। চোখজোড়া আনিকার থেকে সরিয়ে বেখেয়ালে ডানদিকে নিলে, দৃষ্টি আটকায় অনামিকার ফ্যাকাশে মুখের দিকে। যাকে খাঁটিয়ায় শুইয়ে পুরো সাদা কা’ফ’নের কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। শুধু মুখটুকু বেরিয়ে আছে।
দৃশ্যটি চোখে ভাসতেই অরুণ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। দৃষ্টিজোড়া একেবারে স্থির হয়ে যায়। মস্তিষ্ক একেবারে অকেজ লাগলো। এটা অনামিকা? অনামিকা এভাবে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে শুয়ে আছে কেন? আর কোনো কথাও তো বলছে না। এতো এতো কান্নার আওয়াজে অনামিকা উঠে বসছে না কেন? এটা অনামিকা কি করে হয়? অনামিকা তো তাকে দেখলে ল’জ্জায় মাথা নত করে নেয়। লাজুক হাসে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। তবে তার দিকে তাকাতে ভুলে যায় না। এইতো আজ সকালেই হাস্যজ্জ্বল অনামিকার সাথে তার দেখা হলো, কতশত কথা হলো। তাহলে…..? কান্নার মাঝ থেকে অরুণের কানে কিছু কথাও ভেসে আসে,
‘শুনলাম মেয়েটারে না-কি জেডি নামের এক উদ্ভট লোক, এভাবে ধ’র্ষ’ণ করে মে’রে ফেলেছে। কম ক’ষ্ট পেয়ে মেয়েটা ম’রে’নি! আল্লাহ এমন ম’র’ণ কাউকে না দিক।’
কথাগুলো কানে আসতেই অরুণের মনে হলো, তার হৃদয়টা তীব্র আ’ঘা’তে একেবারে খন্ড খন্ড হয়ে গেল। মনে হলো, কান দু’টোয় কেউ গরম শিসা ঢেলে দিয়েছে। হাত থেকে শপিং ব্যাগটি অবহেলে মাটির উপর পড়ে যায়। ছেলেটির মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটি অস্বাভাবিক কাঁপছে। স্থির দৃষ্টি এখনো অনামিকার মুখে। যে মুখের চতুর্পাশে কা’টা কা’টা অংশগুলো বড্ড চোখে লাগলো অরুণের। বুকের সাথে সাথে চোখ দু’টোও বড্ড জ্বা’লা করে উঠল ছেলেটার।
একপাশে সন্ধ্যা দাঁড়িয়েছে আছে, কোলে সৃজন। সন্ধ্যা ঝাপসা চোখে অরুণের দিকে চেয়ে আছে। সৃজন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে৷ এখানের সিচুয়েশন দেখে বাচ্চাটি ভ’য়ে গুটিয়ে আছে মায়ের কোলে। সন্ধ্যার পাশে সৌম্য দাঁড়িয়ে। আরেকপাশে আকাশ। যার লালিত দৃষ্টিজোড়া অরুণের দিকে। সে দু’কদম অরুণের দিকে এগিয়ে আসতেই অরুণ ধপ করে মাটিতে পড়ে যায়। আকাশ আর সৌম্য একপ্রকার দৌড়ে এসে অরুণের দু’পাশে বসে। সৌম্য ভাঙা গলায় ডাকে, “অরুণ ভাইয়া?”
আকাশ অরুণের পাশে বসে বা হাতে অরুণের বাহু শ’ক্ত করে রেখেছে। মাথা নিচু তার। চোখজোড়া বুজে নেয়।
অরুণের চোখদু’টো ভরে উঠেছে। অনামিকার মুখ থেকে দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও এদিক-ওদিক হয়নি। কম্পিত কণ্ঠে আওড়ায়, ‘অ.না.মি.কা!’
ডান চোখ ফেটে জলকণা গড়িয়ে পড়ে ছেলেটার। পুরো শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। তার অনামিকাকে কেউ ধ’র্ষ’ণ করেছে? ছিঁড়ে খেয়েছে তার অনামিকাকে? আর তারপর এই দুনিয়া থেকে বিদায়ও দিয়ে দিয়েছে? অরুণের মনে হলো, তার কলিজায় খুব শ’ক্ত একটা কাঁটা বিঁধল। যার জন্য বছরের পর বছর মিথ্যে অপেক্ষা করে গেছে, যার জন্য মেয়েদের সাথে দরকারেও কথা বলতে ভুলে গেছে। যাকে নিয়ে দিনের পর দিন শুধু স্বপ্ন বুনেছে। আর তারপর একদিন সারপ্রাইজ হিসেবে অনামিকাকে পেয়ে গেছে। এইতো তাদের বিয়ের ডেট ফিক্সড হওয়ার পথে ছিল। সেই অনামিকাকে অন্যকেউ ছিঁ’ড়ে খেয়েছে? সেই অনামিকা আর নিঃশ্বাস নিচ্ছে না? অরুণের দম আটকে আসে। সে তার দু’হাতে তার গলা চেপে ধরে। হঠাৎ-ই বাচ্চাদের মতো করে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। শব্দ করে বলতে থাকে,
“এ্যাই অনামিকা, অনামিকা। তুমি আমাকে বিয়ে করবে না অনামিকা? দেখো আমি তোমার জন্য শাড়ি কিনে এনেছি। চুড়ি কিনে এনেছি।
এটুকু বলতে বলতে কেমন পা’গ’লের মতো মাটি হাতালো অরুণ। হাতিয়ে হাতিয়ে তার আনা শপিং ব্যাগটি নিয়ে অনামিকার লা’শের উপর ঢেলে দেয়। এরপর শাড়ি, চুড়ি ফুলগুলো উঠিয়ে অনামিকাকে দেখানোর মতো করে বলে,
“অনামিকা দেখো, আমি তোমার জন্য তোমার পছন্দের জিনিস কিনে এনেছি। অনামিকা ওঠো না! তুমি বলেছিলে, তোমার সর্বপ্রথম ইচ্ছে, খুব দ্রুত আমার বউ হওয়া। আমি তোমাকে আজকেই বিয়ে করব অনামিকা। ওঠো তুমি। তোমাকে কেউ ছুঁয়েছে বলে তুমি কি ভ’য় পাচ্ছো অনামিকা? বিশ্বাস কর, আমি ওসব ভুলে যাবো। তোমাকে মাথায় তুলে রাখবো। তোমার সব ব্য’থা ভুলিয়ে দিব। ওঠ না অনামিকা?”
কথাগুলো বলতে বলতে অরুণ অনামিকার দিকে ঝুঁকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ডান হাত বাড়িয়ে অনামিকার মুখ এদিক-ওদিক নাড়িয়ে বলে,
“একবার ওঠো অনামিকা। একবার আমার সাথে কথা বলো। আমার জীবনে অনামিকা নামে তুমির খুব তৃষ্ণা, জানো? তুমি আমাকে কথা দিয়েছিল, তুমি আমার বউ হবে। এবার তুমি আর পালাতে পারবে না। আমি তোমাকে আর পালাতে দিব না।”
কথাগুলো বলে কোনোরকমে আকাশের দিকে ফিরে আকাশের দু’হাত ধরে হাঁপানি রোগীর মতো বলতে থাকে,
“আকাশ? ওকে উঠতে বল না! তুই তো জানতি, ওর আর আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। আমার এই বুকে অনেক স্বপ্ন বোনা আছে ওকে নিয়ে। ও আমার বোনা স্বপ্নগুলো দেখবে না, বল? আমি ওসব স্বপ্ন এবার কার সাথে বাস্তবায়ন করব, বল? ওকে বল না, আমি আর সময় নিব না। আজকেই বিয়ে করব ওকে। আজকেই ওকে আমার বউ বানাবো।”
আকাশ মাথা নিচু করে রইল। একটা কিছুই বলল না। অরুণ উত্তর না পেয়ে সৌম্য’র দিকে ফিরে কান্নামাখা গলায় বলে,
“সৌম্য তুমি একটু বল না, ওকে উঠে বসতে। তুমি তো খুব ভালো মানুষ। ও তোমার খুব প্রশংসা করত। তুমি ওকে ডাকলে, ও মনে হয় উঠবে। আসলে আমি ওর অভিমান এখনো পুরোপুরি ভাঙাতে পারিনি। ভেবেছিলাম, বিয়ের পর সব ধীরে ধীরে ভাঙাবো৷ কিন্তু ও অভিমান করে কিভাবে শুয়ে আছে দেখ। ওকে একবার ডেকে বল, আমার খুব ক’ষ্ট হয় ও এভাবে থাকলে। ও তোমার কথা নিশ্চয়ই শুনবে।”
সৌম্য’র কেমন যেন দমবন্ধ লাগলো। সে পাথরের মতো চুপ করে রইল। সৌম্য’কেও এভাবে চুপ দেখে অরুণ সৌম্যকে একটা ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বলে,
“আরে তেমরা কেউ আমার কথা কেন শুনছ না? আমাকে কেউ কোনো হেল্প-ই করছ না।”
এটুকু বলে অরুণ আবারো অনামিকার লা’শের উপর ঝুঁকে অনামিকার গালে হাত দিয়ে কান্নামাখা গলায় বলে,
“অনামিকা একটিবার ওঠো। একটিবার আমার সাথে কথা বলো। আমার বুকটা খুব জ্ব’ল’ছে। একবার দেখো। আমাকে আর শা’স্তি দিও না অনামিকা। আমি গত কয়েকটাবছরে অনেক দুঃখ নিয়ে বেঁচেছি, জানো?
এটুকু বলতে বলতে একপর্যায়ে অরুণ অনামিকার গালে জোরে জোরে থা’প্প’ড় দেয় আর শব্দ করে বলে,
এ্যাই তুই উঠবি? বলছি না, আমার ক’ষ্ট হচ্ছে? আমাকে স্বপ্ন দেখিয়ে আবারো কোথায় পালাতে চাইছিস তুই? তোর এতো সাহস কেন? বারবার আমাকে ভেঙে দিয়ে পালাতে চাস কেন? এতো স্বা’র্থ’প’র কেন তুই? আমাকে আর ভাঙিস না। আমি আর নিতে পারবো না। উঠে পড় অনামিকা। একটু শান্তি চাই আমার। আমার বউ বানাবো তোকে। এক্ষুনি কবুল বলব। আমি তোকে আমার নামে কবুল করব, তুই শুনবি না অনামিকা?”
কথাগুলো বলতে বলতে অরুণ খাটিয়ার সাথে বুক ঠেকিয়ে দিয়ে অনামিকার দিকে ঝুঁকে বাচ্চাদের মতো করে কাঁদে। শেষ কবে এভাবে কেঁদেছে সে জানেনা।
প্রত্যেকে ঝাপসা চোখে চেয়ে আছে অরুণের দিকে। আনিকার বাবা, মা অরুণের ব্যাপারে সবই জানতো। যার ফলে অরুণের বুকফাটা আ’র্ত’না’দে তাদের বুকের দহন বাড়লো বই কমলো না। সন্ধ্যা বা হাতে সৃজনকে ধরে রেখে, ডান হাতে মুখ চেপে রেখেছে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে এসব দৃশ্য সহ্য করতে পারছে না।
কোলে থাকা সৃজন অরুণকে এভাবে কাঁদতে দেখে নিজেও কেঁদে দিবে দিবে ভাব। সন্ধ্যা ভিড় ঠেলে একটি গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ডান হাতে গাছটি আঁকড়ে ধরে। শ্বাস নিতে ক’ষ্ট হচ্ছে তার। গত প্রায় চারটে বছর অরুণ তাদের সাথে থেকেছে, হাজারটা দুঃখ লুকিয়ে সবসময় হেসেখেলে বেড়িয়েছে। সৃজনকে নিয়ে বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। আজ তাকে এভাবে দেখে কে সহ্য করবে?
সৃজন মায়ের দিকে ভেজা চোখে কান্নামাখা গলায় বলে,
“মা মা, ওলুণ কাঁদে কেনু মা? ওলুণ কালি কাঁদে কেনু?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলে ছেলের দিকে তাকায়। ডান হাতে সৃজনের ঝাপসা চোখ মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলে,
“তার প্রিয় মানুষ অনেক দূর হারিয়ে গেছে, তাই।”
সৃজন এদিক-ওদিক তাকিয়ে অরুণকে খোঁজে আর আওড়ায়,
“ওলুণ পিও মানুচ অনেক দুলে হালিয়ে গেচে। ওলুণ কাঁদে না। পিও মানুচ আবাল আচবে।”
সৃজনের কথা শুনে সন্ধ্যার কান্না দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। সে সৃজনকে তার বুকে শ’ক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। তাদের জীবনের সকল সুখ হারিয়ে গেছে। আর কিচ্ছু বাকি নেই। তার আম্মা, নিয়াজ ভাইয়া, তাদের দুর্সময়ে পাশা থাকা রিহান ভাইয়া সবাই হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে শুধু বুক ভরা দুঃখ।
আকাশ অরুণকে টেনে সরিয়ে নিতে চায়। খাঁটিয়ে উঠাবে বলে। অরুণ গায়ের জোরে আকাশকে একটা ধাক্কা দেয়। এগিয়ে এসে দু’হাতে আকাশের শার্টের কলার ধরে র’ক্তলাল চোখে আকাশের দিকে চেয়ে চিৎকার করে বলে,
“এ্যাই আমার অনামিকা ওঠে না কেন? ও নিঃশ্বাস নেয়না কেন বল? তোর প্রিয় বন্ধু এই কাজ করেছে, তাইনা? ওই কু’ত্তার বাচ্চা আমার অনামিকার সাথে ন’ষ্টা’মি করেছে। আমার অনামিকার প্রাণ কে’ড়ে নিয়েছে। তোর বন্ধু ও? ওর জন্য একটা সময়, আমাকে তুই অনেক মে’রেছিস। ওকে নিয়ে কিছু বললে তুই আমাকে মে’রে আধম’রা করে ফেলতি। তোর সেই বন্ধু আমার অনামিকাকে আমার থেকে কে’ড়ে নিয়েছে। ছাড়বো না তোর ওই কু’ত্তার বাচ্চা বন্ধুকে। ওকে ছাড়বো না আমি। তুই যদি আবারো তোর বন্ধুকে বাঁচাতে আসিস, তবে তোকেও খু’ন করে ফেলবো আমি। তোর বন্ধু একটা প’শু। শুনতে পাচ্ছিস তুই? তোর ওই জানের বন্ধু একটা অ’মানুষ।তোর বন্ধুকে ছাড়বো না আমি।”
আকাশ নির্জীব চোখে অরুণের দিকে কেবল চেয়ে রইল। যেন সে এক য’ন্ত্রমানব। কোনো অনুভূতি নেই তার মাঝে।
অরুণ হঠাৎ-ই শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে ডান হাতের আঙুল তাক করে বলে,
“একটা প’শু, অ’মানুষের জন্য আকাশ ক’ষ্ট পাচ্ছে। এই সবাই দেখ, একটা প’শুকে আকাশ কিভাবে সাপোর্ট করে। চিনে রাখো সবাই। আল্লাহ তোদের বিচার করবে। আমার অনামিকার সাথে হওয়া অ’ন্যা’য়ের বিচার করবে। তোরা দুই বন্ধু ধ্বং’স হয়ে যাবি। মিলিয়ে নিস।”
আকাশ হ্যাঁ না কিছুই বলে না। সে মাথা নিচু করে পাথরের মূ’র্তির ন্যায় বসে থাকে। ডান চোখ ফেটে একফোঁটা নোনাজল ডান পায়ের সাদা প্যান্টের উপর পড়ে।
আশেপাশের অনেকেই আকাশের দিকে অদ্ভুদভাবে চেয়ে আছে। সৌম্য, সন্ধ্যা ঝাপসা চোখে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। তাদের কথা ফুরিয়েছে।
সামান্য দূরত্বে মাস্ক পরিহিত দন্ডায়মান জেডি এতোক্ষণ অরুণের দিকে করুণ চোখে চেয়ে ছিল। কিন্তু এখন অরুণের রিয়েকশনে তার দৃষ্টি ঘুরে আকাশের দিকে আসে। আকাশকে একেবারে স্ট্যাচু হয়ে বসে থাকতে সে দু’পা বাড়িয়েও থেমে যায়। ঢোক গিলল। তার জন্য এভিকে অ’প’মানিত হতে হচ্ছে? ব্যাপারটি সে মানতে পারলো না। কিন্তু সমানে এগোনোর সাহস পেল না। জলঘোলা ছাড়া আর কিছুই হবে না। বুকে পাথর চেপে আবারও সেখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে।
এদিকে অরুণ আকাশকে কথাগুলো হাসতে হাসতে বলতে গিয়ে হঠাৎ-ই আবারও বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে ওঠে। দু’হাতের মাঝে মুখ লুকিয়ে আওড়ায়,
“আমার অনামিকাকে আমার কাছে এনে দাও। আমি ওকে কথা দিয়েছি, ওকে আমার বউ বানাবো। ও আমাকে আমার কথা রাখতে দিচ্ছে না৷ কেউ আমাকে হেল্প কর, প্লিজ!”
কথাগুলো বলতে বলতে আবারো অনামিকার দিকে ফিরে বসে। কয়েকজন লোক অনামিকার খাঁটিয়া তুলতে নিলে অরুণ দু’হাতে খাঁটিয়া সাপ্টে ধরে চেঁচিয়ে বলে,
“ওকে কোথাও নিয়ে যেতে দিব না আমি। খবরদার ওকে কেউ নিয়ে যাবে না। আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। শুনতে পাওনি তোমরা? ওর সবচেয়ে বড় ইচ্ছে, আমার বউ হওয়া। ওর ইচ্ছে পূরণ না করে ওকে কোথাও নিয়ে যেতে দিব না আমি।”
অরুণের কথায় সকলে থেমে যায়। অরুণ বা পাশে বসা আনিকার দিকে চেয়ে বলে,
“আনিকা, তুই তো জানতি আমি তোর বোনকে কত ভালোবাসি। তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি, ওকে শুধু আমার সাথে বিয়ে দিবি। দিয়ে দে বিয়ে। আমি অনেক অপেক্ষা করেছি শুধু ওর জন্য। আজ তোরা আমার থেকে ওকে কেড়ে নিস না, প্লিজ আনিকা!”
আনিকা অরুণের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। অরুণের চোখমুখের অবস্থা বি’ধ্ব’স্ত। সে দু’হাতে অনামিকার খাঁটিয়ে এমনভাবে ধরে রেখেছে, যেন অনামিকাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আনিকার দিকে। আনিকা ভাঙা গলায় বলে,
“অনামিকা আমাদের মাঝে আর নেই। ও তো ম’রে গেছে অরুণ।”
কথাটা শুনতেই অরুণ হঠাৎ-ই একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথাটা ঘুরিয়ে অনামিকার দিকে করল। বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
‘ও ম’রে গেছে? তাহলে তো আমারও ম’রে যাওয়া উচিৎ।’
র’ক্তলাল চোখ থেকে জলকণা গড়ায়। দৃষ্টি এখনো অনামিকার বি’ধ্ব’স্ত মুখপানে। তার অনামিকার মনে অনেক দুঃখ জমা ছিল। তাকে ফিরে পেয়ে মেয়েটা অশ্রুভরা চোখে শুধু তাকে দেখছিল। অরুণ দেখেছিল, তার অনামিকার সেই চোখে ছিল শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন। কিন্তু এক জা’নো’য়া’র তার অনামিকার সব স্বপ্ন চিরকালের জন্য মুছে দিয়েছে। ছিঁড়ে খেয়েছে তার অনামিকাকে। অরুণ ফুঁপিয়ে উঠল। খুব ক’ষ্ট হচ্ছে। খুব। অনামিকার দিকে ঝুঁকে বাচ্চাদের মতো ফোঁপায় আর বলে,
“তুমি একদম চিন্তা কর না অনামিকা। আমি তোমাকে একা একা কোথাও যেতে দিব না। দেখে নিও, আমিও ম’রে যাবো। তোমার অ’প’রা’ধী’কে শা’স্তি দিয়েই আমি ম’রে যাবো। আর তারপর ওপারে গিয়ে সবার আগে তোমাকে আমার বউ বানাবো। অনামিকা শুধু অরুণের বউ হবে।”
পরদিন সকাল ১০ টার কাছাকাছি সময়। সন্ধ্যা সারাবাড়ি দৌড়াচ্ছে আর সৃজনকে ডাকছে। গত এক ঘণ্টা যাবৎ সন্ধ্যা ধীরেসুস্থে সৃজনকে সারাবাড়ি খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও না পেয়ে তার মাথা ঠিক নেই। এক পর্যায়ে এসে পা’গ’লের মতো দৌড়াচ্ছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। কোথায় গেল তার ছেলেটা? সন্ধ্যা ব্যস্ত পায়ে বাগানের দিকে গেল। সারা বাগান তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু কোথাও পেল না। সন্ধ্যার মনে হলো, তার শরীরে বোধ নেই। দু’হাত মুখের কাছে নিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল,
“সৃজন? আব্বা তুমি কোথায়?”
কোনো সাড়া নেই। সন্ধ্যার মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগে। এখন কি করবে সে? এতোক্ষণে বুঝে গেছে, তার জান সৃজন এই বাড়ির কোথাও নেই। মেয়েটার দিশেহারা লাগে। গতকাল থেকে আকাশ তো এই বাড়িতে ফেরেইনি৷ তার সৌম্য ভাইয়াও ইরা আপুর কাছে। সে সৃজনকে নিয়ে এই বাড়ি একাই ছিল। একা ছিল বললে ভুল হবে। সাথে আরও অনেক পুরনো কাজের লেকজন এই বাড়িতেই থাকে। সৃজনকে সে সকালেও বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছে। টুকটাক কাজের জন্য অল্প সময়ের জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছিল, এরপর ঘরে এসে আর সৃজনকে পায় না। আগে সৃজন ঘুম থেকে সবার আগে তাকে ডাক দিত। আজ তাকে একটা ডাক পর্যন্ত দেয়নি। উল্টে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছেলেটার টিকিটিও পায়না।
সন্ধ্যার চোখদু’টো ভরে উঠেছে। বাচ্চাদের মতো কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কোথায় হারালো তার বাচ্চা? সন্ধ্যা এখানে আর দাঁড়ালো না। একপ্রকার দৌড়ে বাসার ভেতর যায়। আসমানী নওয়ানের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে,
“আম্মা আম্মা আমার সৃজন……
এটুকু বলতেই থেমে যায় সন্ধ্যার কণ্ঠ। সাথে থেমে যায় তার পা আসমানী নওয়ানের ঘরের দরজার সামনে এসে। বুকটা কেমন যেন ধ্বক করে উঠল। হালকা আলোকিত রুমের কোথাও আসমানী নওয়ান নেই। ঘরটি একদম ফাঁকা পড়ে আছে। সন্ধ্যা ডান পা বাড়িয়েছিল ঘরের ভেতর যাওয়ার জন্য, সেই পা আবারও পিছিয়ে আনে। কাকে ডাকছে সে? যাকে ডাকছে, সে তো আর এই দুনিয়ার বুকে নেই। আর কোনোদিন তার আম্মা তাদের ডাকে সাড়া দিবে না। তার সৃজনের আর খোঁজ করবে না। এই যে আজ যেমন করছে না। অন্যদিন হলে, আসমানী নওয়ান নিজেই তার আগে এই বাড়ি মাথায় তুলতো তার কলিজার টুকরো নাতি সৃজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। কিন্তু সেসব স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে গেছে। সেসব আর কখনো বাস্তবায়ন হবে না। মেয়েটার ডান চোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। দ’ম’বন্ধকর অনুভূতি নিয়ে সন্ধ্যা উল্টো ঘুরে এগোয়। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে পা চালায় দ্রুত। আসমানী নওয়ানের ঘরের পাশের ঘরে যায়, যেখানে সে আর সৃজন গত ক’বছর যাবৎ থাকে।
সন্ধ্যা ঘরে এসে বিছানার উপর তার ফোন নিয়ে ডায়াল নাম্বারে সর্বপ্রথম নিয়াজের নাম্বারটি দেখে নিয়াজের নাম্বারে কল করে। ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘নিয়াজের নাম্বার বন্ধ।’ সন্ধ্যা আবারও ডায়াল করতে গিয়ে থেমে যায়। কাকে কল দিচ্ছে সে? এই মানুষটাও তো আর এই পৃথিবীতে নেই৷ আকাশ চলে যাবার পর, সৃজন হওয়ার পর, সন্ধ্যার যখনই প্রয়োজন পড়ত, তখনই সে হয় আসমানী নওয়ানের থেকে হেল্প পেত, নয়তো নিয়াজের থেকে। কিন্তু সে তার এই আপন মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলেছে। তাদের আর কখনো ফিরে পাবে না। সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। চারিদিকটা কেমন শূণ্যতায় ঘেরা। যেন কেউ কোথাও নেই। সন্ধ্যা মুখ চেপে কান্না আটকালো। আকাশকে কল করতে চাইলো। কিন্তু আকাশের নাম্বার তার কাছে নেই। গত ক’বছরে কত নাম্বার বদলেছে কে জানে! সে তো ওসব জানেনা। এরপর সন্ধ্যা তার সৌম্য ভাইয়াকে কল করতে নেয়, তখনই তার ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। সন্ধ্যা কি মনে করে ব্যস্ত হয়ে কল রিসিভ করে। সাথে সাথে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে, সৃজনের গলা ফাঁটিয়ে কান্নার আওয়াজ। সন্ধ্যার কলিজা লাফিয়ে উঠল মনে হলো। মেয়েটা হাসফাস কণ্ঠে ডাকে,
“সৃজন? আব্বা? কি হয়েছে তোমার?”
মুহূর্তেই সৃজনের কান্নার আওয়াজ কমে এলো। মনে হলো, সৃজনের থেকে ফোন দূরে নেয়া হয়েছে। সাথে অধীরের রসিক কণ্ঠ ভেসে আসে,
“সৃজন তো আমার কাছে প্রাণ। দেখবি না-কি নিয়ে নিবি কোনটা?”
সন্ধ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ঢোক গিলে বলে, “আমার বাচ্চা কোথায়?”
অধীর হেসে বলে,
“আছে আমার কাছেই। আপ্যায়ণ করছিলাম আর কি! অতি আপ্যায়ণে কান্না করছে। শুনলি তো! বিশ্বাস কর, তোদের বাচ্চার প্রতি একটুও মায়া লাগে না আমার। কখন না জানি ঠুসঠাস মে’রে দিই!”
সন্ধ্যার গলায় কান্নারা দলা পাকিয়ে আসে। গতদিনও যার মৃ’ত্যুর কথা ভেবে কান্না করছিল, সেই মানুষটা বেঁচে থেকে দিনের পর পর তাদের জীবন ধ্বং’স তো করেছেই। আর এখন তাদেরকে একেবারে ধ্বং’স করতে তার ছোট্ট বাচ্চাটাকেও ছাড়ছে না। সন্ধ্যা চোখ বুজে শ’ক্ত গলায় বলে,
“আমার বাচ্চাকে ছেড়ে দাও।”
কথাটা শুনে অধীর সামান্য হাসে। বলে, “তোর মুখের কথায় ছেড়ে দিলে ওকে কি আমার কাছে এনে এতো ক’ষ্ট করে আপ্যায়ণ করতাম, বল তো প্রাণ?”
সন্ধ্যার অ’সহ্য লাগলো অধীরের মুখে প্রাণ শব্দটি শুনে। কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলল না। উল্টে শ’ক্ত করে বলে,
“কি চাইছো তুমি?”
অধীরের সহজ স্বীকারোক্তি,
“শুধু তোকে প্রাণ।
এটুকু বলে অধীর একবার শ্বাস নেয়। আবারও হাসফাস কণ্ঠে বলে,
শুধু তোকে পাওয়ার জন্য অনেক কিছু করেছি। অনেক কিছু। তুই আমার হবি না প্রাণ?”
সন্ধ্যা কাটকাট গলায় উত্তর করে,
“ম’রে গেলেও তোমার এই স্বপ্ন যে পূরণ হবে না, এ কথা কি তুমি জানো অধীর ভাইয়া?”
অধীর ছটফটে কণ্ঠ,
“সৃজনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও তুই আমার হবি না প্রাণ? তুই আমার হলে তোর বাচ্চাকে একটা ফুলের টোকাও দিব না। আর তুই আমার না হলে, তোর বাচ্চাকে রো’স্ট বানিয়ে কু’কু’রকে খাওয়াবো।”
অধীরের শেষ কথাটা খুব শ’ক্ত শোনালো। সন্ধ্যা কাঁপা কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে,
“নাআআআআ। আমার সৃজনের কিচ্ছু করবে না তুমি। ওর গায়ে হাত দিলে ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।”
অধীর আগ্রহী কণ্ঠে বলে,
“তাহলে তুই আমার হয়ে যা প্রাণ। আর কোনোদিন কিচ্ছু চাইবো না, বিশ্বাস কর।”
সন্ধ্যার দম আটকে আসে। বা হাতে গলা চেপে ধরে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আমি তোমাকে সৌম্য ভাইয়ার মতোই আমার আরেকটা ভাইয়া ভাবি অধীর ভাইয়া।”
অধীর রাগান্বিত স্বরে বলে,
“বে’ঈ’মা’ন তুই। তুই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়ে আজ বলছিস, আমাকে সৌম্য’র মতো ভাই ভাবিস? তোর জি’ভ টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলব আমি। তুই এতো মি’থ্যে’বাদী কবে হয়ে গেলি প্রাণ?”
শেষ কথাটায় রাগান্বিত ভাবটা কমে এসেছে। সন্ধ্যা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। অধীর অসহায় কণ্ঠে বলে,
“তুই হা’রিয়ে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত আমার বউ হবি বলে আমার মাথা খেয়ে ফেলতি। আর এখন সব কেন অ’স্বীকার করছিস প্রাণ?”
এটুকু বলতে গিয়ে অধীরের গলা বেঁধে আসে। চোখের কোণ ভিজে ওঠে। মনে পড়ে পুরোনো দিনের কথা।
“অধীর ভাইয়া তুমি আমাকে কবে বিয়ে করবে?”
সন্ধ্যার কথা শুনে অধীর সন্ধ্যার দিকে সামান্য ঝুঁকে হেসে বলে,
“কেন? তুই চাইছিস আমি তোকে বিয়ে করি?”
ছোট্ট সন্ধ্যা মাথা উপর-নীচ ঝাঁকিয়ে বলে, “হু হু চাই। চলো বিয়ে করি।”
অধীর চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“সত্যি আমায় বিয়ে করবি?”
সন্ধ্যা আবারো মাথা উপর-নীচ ঝাঁকিয়ে সম্মতি দেয়। অধীর দু’হাতে সন্ধ্যার গাল টেনে হেসে বলে,
“বিয়ে করতে হলে তো তোকে বড় হতে হবে প্রাণ।”
সন্ধ্যা মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আমি বড় হয়ে গেছি। ভালো করে দেখ আমাকে।”
অধীর ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে বলে,
“বুঝেছি তুই খুব বড় হয়ে গিয়েছিস। কিন্তু হঠাৎ বিয়ে করতে চাইছিস কেন?”
সন্ধ্যা উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“মা বলেছে, বিয়ে করলে অনেক কিছু পাওয়া যায়। ভালো জামা, তারপর অনেক অনেক সোনা পাওয়া যায়। এখন চলো বিয়ে করি।”
সন্ধ্যার কথা শুনে অধীর শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে মাটিতে লুকিয়ে পড়ায় উপক্রম হয়। সন্ধ্যার মাথায় চাটি মে’রে বলে,
“তোর কি সোনার জিনিস অনেক ভালো লাগে?”
সন্ধ্যা ছোট করে বলে,
“হু, খুব ভালো লাগে।”
অধীর নিজেকে সামলে সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“আমার বউ হওয়ার আগেও আমি তোর ইচ্ছে পূরণ করব প্রাণ। আর বউ হওয়ার পর তো ভুলেও কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখবো না। তোর এসব ইচ্ছে আমি এক্ষুনি পূরণ করে দিব। তারপর তুই আরেকটু বড় হলেই তোকে বিয়ে করে ফেলব।
এটুকু বলার পরও সন্ধ্যার মন খারাপ বুঝতে পেরে অধীর বিচলিত কণ্ঠে বলে, “কি হয়েছে প্রাণ? মন খারাপ করলি কেন? আমি তোর শখের জিনিস বানিয়ে দিব তো।”
সন্ধ্যা মুখ ফুলিয়ে বলে,
“তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাওনা কেন?”
অধীর মৃদুহেসে বলে,
“অধীর তার প্রাণকে বিয়ে করতে চাইবে না, এমন দিন কখনো আসবে না, বুঝলি প্রাণ?”
অবুঝ সন্ধ্যা অতশত বুঝল না। সে চুপ রইল। অধীর আবারো বলে,
“তুই তোর ইচ্ছে পূরণ হওয়ার পরও আমাকে বিয়ে করতে চাইছিস কেন?”
সন্ধ্যা এবারও কিছু বলতে পারলো না। সে তো কিছু বুঝতেই পারছে না। তবুও অবুঝ মনে দুষ্টুমির স্বরে বলে,
“কারণ আমি তোমার এই মিল্কক্যান্ডি চোখ দু’টো গপাগপ খাবো।”
কথাটা বলেই সন্ধ্যা হাসতে হাসতে উল্টোপথে দৌড় লাগায়। অধীর সন্ধ্যার কোমর সমান চুল ধরতে গিয়েও ধরতে পারেনা। সন্ধ্যার বোকাসোকা উত্তরে হেসে ফেলে।
এরপর অধীর সন্ধ্যাকে বানিয়ে দিয়েছিল, গলার চেইন, গলার হার, পায়ের নুপুর, দু’হাতে হাতের দু’টো ব্রেসলেট, হাতের দু’টো আঙটি, মাথার টিকলি, একটি নাকফুল, একটি কোমরে পরা বিছা৷ সবগুলো ছিল সোনার। সব একসাথে পেয়ে ছোট্ট সন্ধ্যার সে কি খুশি!
পুরোনো দিনের কথা ভেবে অধীরের চোখদুটো একেবারেই ঝাপসা হয়ে আসে। বুকটা ব্য’থা করছে খুব। ঢোক গিলে বলে,
“আমার দেয়া সোনার অলংকারগুলো কি ফেলে দিয়েছিস প্রাণ?”
সন্ধ্যা বিদ্রূপ স্বরে বলে,
“তোমার বাবা পুরো গ্রামের সামনে আমাকে চো’রের অ’প’বা’দ দিয়ে সব জিনিসপত্র কে’ড়ে নিয়ে গিয়েছে।”
কথাটা শুনে অধীর চোখ বুজে নিল। বাবা নামক মানুষটার জন্য ভেতর থেকে এক ভ’য়া’ন’ক আ’র্ত’না’দ বেরিয়ে এলো। সন্ধ্যা বা হাতে চোখ মুছে আবারো বলে,
“আমি চো’র নই। লো’ভীও নই। আর তাই পছন্দের জিনিস পরতেই ভুলে গেছি।”
অধীরের বুক চিনচিন করে ওঠে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে আবারো শ’ক্ত গলায় বলে,
“আমার বাচ্চাকে ছেড়ে দাও।”
অধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিজেকে সামলে হেসে বলে,
“এভাবে দিতে পারবো না প্রাণ। তুই আমার হয়ে যা। আমি তোর বাচ্চাকে তোর কোলে ফিরিয়ে দিব।”
সন্ধ্যার রা’গ লাগলো। তেজী কণ্ঠে বলে, “আর কত অ’মানুষ হবে তুমি?”
অধীর এবার কিছুটা শব্দ করে হেসে ওঠে। বলে,
“আমি তো অ’মানুষ-ই। মানুষ নই তো আমি। যার জন্য অ’মানুষ হয়েছি। তার কাছেও আমার এক পয়সা মূল্য নেই। দেখলি তো, আমার কত দুঃখ? তুই আমার হয়ে যা। আমার দুঃখগুলো মিটিয়ে দে প্রাণ।”
সন্ধ্যা অ’সহ্য কণ্ঠে বলে,
“তুমি যা চাইছো তা কখনো সম্ভব নয়।”
অধীরের শ’ক্ত কণ্ঠ,
“তবে সৃজনকে ভুলে যা।”
সন্ধ্যার বুকটা হু হু করে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“কেন এমন করছ? আমি যখন ছোট ছিলাম। এসব ভালোবাসার ব্যাপারে কিচ্ছু বুঝতাম না, তখনকার বলা দু’টো কথা কেন ধরে আছো?
বড় ভাইয়া ছাড়া তোমার প্রতি আমার মাঝে আর কোনো অনুভূতি নেই। আমার স্বামী আছে, সন্তান আছে। একটা সংসার আছে। আমি আমার স্বামী আকাশকে ভালোবাসি অধীর ভাইয়া। তার জায়গা শুধু তার-ই। প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর। আমার সৃজনকে ছেড়ে দাও।”
অধীরের দম আটকে আসলো। কান থেকে ফোন সরিয়ে নিল। সন্ধ্যার কি সহজ স্বীকারোক্তি! আর অধীরের জন্য এক ভ’য়া’ন’ক বাণী, যে বাণীতে মিশে আছে ‘সন্ধ্যা তাকে নয়, তার প্রিয় বন্ধুকে ভালোবাসে।’
অধীর কল কে’টে দেয়। ফোনে ক’সেকেন্ড কি যেন টাইপ করে ফোন পকেটে রেখে দেয়। সেখানেই পেতে রাখা একটি চেয়ারে বসে। দু’পা ছড়িয়ে দিয়ে, দু’হাতসহ পুরো শরীরটা একেবারে ছেড়ে দেয়। ভাঙা বেসুরা গলায় গুণগুণিয়ে গেসে ওঠে,
“তবু তোমার প্রেমে আমি পড়েছি।
বেঁচে থেকেও যেন ম’রে’ছি।
তোমার নামে বাজি ধরেছি…ধরেছি…”
ডান চোখের কোণে একফোঁটা নোনাজল এসে ঠেকেছে। অধীর নড়চড় বিহীন হয়ে আছে। সৃজনের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। বিরক্ত হয় খানিক। তবে সেদিকে পাত্তা দিল না।
ঘড়ির কাটা ১০ টা ৩০ এর কাছাকাছি। আকাশ একটি ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসে গাড়ি থেকে। পায়ে জুতো নেই, পরনে কুচকানো সাদা শার্ট-প্যান্ট, চোখমুখের অবস্থা বি’ধ্ব’স্ত। ডান হাতে পি’স্ত’ল। গাড়ি থেকে নেমে হতদন্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। সামনে ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ। আকাশের পায়ের গতি থেমে নেই।
এদিকে আকাশের পর পর-ই এখানে স্কুটি এনে থেমেছে সন্ধ্যা। তখন অধীর তার কল কে’টে দিয়ে সৃজনের একটি পিক পাঠিয়েছিল। সাথে এই ঠিকানা দিয়েছিল। মেয়েটা বেশ কসরত করে চিনে চিনে এখানে এসেছে। যেভাবে ছিল সেভাবেই বেরিয়ে এসেছে। তার ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে তো! তার সৃজন ম’রে গেলে তার কি করে চলবে? সন্ধ্যা একটু পর পর ঝাপসা চোখজোড়া মুছে ফাঁকা মাঠের দিকে ছোটে।
আকাশ কিছুদূর হাঁটার পর কারো পায়ের শব্দ পেয়ে থেমে যায়। দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়াতেই সন্ধ্যার কপাল আকাশের বুকে ধাক্কা খায়। সে পড়তে গিয়েও বা হাতে আকাশের শার্ট টেনে ধরে নিজেকে সামলায়। মাথা উঁচু করে তাকায়। আকাশকে এখানে দেখে অবাকও হয় খানিক।
আকাশ একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে৷ সন্ধ্যা নিজেকে সামলেছে দেখে সে আর হাত বাড়ায় না। তার চোখদু’টো অসম্ভব লাল। দৃষ্টি সন্ধ্যার কান্নামাখা মুখে আনাগোনা করে ক’সেকেন্ড। এরই মাঝে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে আরও দু’ফোঁটা জল গড়ায়। আকাশ বোধয় বুঝল সন্ধ্যার মনোভাব। বা হাত উঠিয়ে আলতো হাতে সন্ধ্যার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। ছোট করে বলে,
“আমাদের সৃজনের কিচ্ছু হবে না। আমি আছি।”
সন্ধ্যার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কানের কাছে কয়েকবার বেজে উঠল, ‘আমাদের সৃজন’।
আকাশ কথাটা বলে বা হাতের মুঠোয় সন্ধ্যার ডান হাতের কব্জি নিয়ে বড় বড় পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যা আকাশের পিছু পিছু এগোয়। দৃষ্টি পিঠ ফিরিয়ে রাখা আকাশের দিকে। যে ছেলেকে আগলে নিতে ব্যস্ত পায়ে ছুটছে।
একটি ফাঁকা জায়গায় নির্দিষ্ট কিছু জায়গাজুড়ে বড়সড় একটি গোডাউন। যার ভেতর আকাশ আর সন্ধ্যা মাত্র প্রবেশ করেছে। প্রবেশ করা মাত্র-ই তাদের কানে সৃজনের গলা ফাঁটিয়ে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে, সাথে দৃষ্টটিগোচর হয় কাঁচের মতো একটি বড়সড় পাত্রের ভেতর সৃজনের ছটফটানির দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখে আকাশ, সন্ধ্যার বুক কেঁপে ওঠে। সন্ধ্যা চিৎকার করে ডেকে ওঠে,
“সৃজন????”
আকাশের হাত থেকে নিজের হাত ছুটিয়ে একপ্রকার দৌড়ে যায় সেই কাঁচের পাত্রের কাছে। ছেলেকে এভাবে ছটফট করতে দেখে সন্ধ্যার মস্তিষ্ক অকেজ লাগে। সে শ’ক্ত কাঁচের ভেতর ছটফট করতে থাকা সৃজনকে দেখে সেখানে থা’প্প’ড় দেয় আর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে,
“আব্বা? আমার আব্বা? এদিক তাকাও। এইতো আমি এসেছি। মা এসেছি। তাকাও আব্বা। তাকাও আমার দিকে। কিচ্ছু হবে না তোমার।”
সৃজন কি মায়ের ডাক শুনতে পায়? মায়ের আকুতি শুনতে পায় না বোধয়। বাচ্চা ছেলেটির চোখমুখ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে, যে কেউ দেখলে ভ’য় পাবে। চোখদু’টো বড় বড় হয়ে আছে। দু’হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে অনবরত ছটফট করছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে তার নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে।
আকাশের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ড ছেলের পানে ছিল। আর শ’ক্তি হয়নি সেখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে রাখার। দৃষ্টি ঘুরে এসেছে সামনে পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে বসা জেডির দিকে। যে আরামসে বসে একটার পর একটা সিগারেট ফুঁকছে। সামনে একটি ছোট্ট টেবিলের উপর সিগারেটের পোড়া শেষ অংশগুলো জমিয়ে রেখেছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। মুখে হাসি লেপ্টে। ডান হাতের দু’আঙুলের মাঝে সিগারেট, যা ঠোঁটের মাঝে রেখে দু’বার ধোঁয়া ছাড়লো। আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখেই দু’আঙুলের সাহায্যে সিগারেটে দু’বার টোকা মে’রে বাঁকা হেসে বলে,
“কেমন লাগছে এভিজান? অনুভূতি বল। শুনতে ইচ্ছা করছে।”
আকাশ নির্জীব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জেডির দিকে। বলে,
“যাকে তার আপনজনরা পিছন থেকে কখনো ছু’রি চালায়নি, সে কি করে আমার ব্য’থা বুঝবে?”
জেডি বেশ অনেকক্ষণ এক ধ্যানে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। এক পর্যায়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো। আকাশ ঝাপসা দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“নিজের ভালো চাইলে আমার ছেলেকে ছেড়ে দে।”
জেডির হাসির মাত্রা গাঢ় হয়। বা পায়ের উপর রাখা ডান পা নাড়ায় আর বলে,
“তোর বউকে শর্ত দিলাম তো৷ মানলো না। আমি কি করব? এবার তোরা দুই হাসবেন্ড-ওয়াইফ মিলে ছেলের নিথর দেহ দেখ।”
আকাশ তার হাতের পি’স্ত’ল জেডির দিকে তাক করে হুংকার ছেড়ে বলে,
“তোকে আমি আরেকটু সময় দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝলাম, তোর অনেক তাড়া আমার হাতে ম’রা’র। তাহলে ম’র।”
কথাটা শুনে জেডি শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বা হাতে একটি রিমোট দেখিয়ে বলে,
“এটা কি জানিস? তোর ছেলের পিঠে ওই যে পাওয়ারফুল বো’ম সেট করা দেখতে পাচ্ছিস, সেটার-ই রিমোট। আর ১০ মিনিট পর ওই বো’ম একা একাই ফেটে তোদের জীবন সৃজন রো’স্ট হয়ে যাবে। যদি আমার মুড চেঞ্জ হয়। জীবন্ত সৃজনকে আর ১০ মিনিটও দেখতে ইচ্ছে না করে, তাহলে এখানে যাস্ট একটা ক্লিক করে তোর এতো সাধের বাচ্চাটাকে রো’স্ট বানাবো। আর তারপর ওকে কি করব জানিস? তোর বউকে বলেছি অবশ্য। এখন তোকেও বলছি, তারপর তোর বাচ্চার রো’স্টটা একটা কু’কু’রকে খেতে দিব। পরে হাড্ডিগুলো থাকলে ওগুলো ক’ব’র দিস। আর না থাকলে তো নাই।”
আকাশ স্তব্ধ চোখে তাকায় জেডির দিকে। জেডির মুখে হাসি লেপ্টে। আকাশের দৃষ্টি ঘুরে ছটফটানো কান্নারত বো’মা সেট করে রাখা সৃজনের দিকে চোখ পড়ে। জেডি যা বলল সব সত্যিই? ওইতো সৃজনের পিঠে বো’মা সেট করা। যেখানে সময়টাও দেখা যাচ্ছে। আকাশের মনে হলো, তার শরীর ভেঙে আসছে। জেডির দিকে তাক করে রাখা পি’স্ত’লটি ধীরে ধীরে নামিয়ে নেয়।
ওদিকে এতোক্ষণ সন্ধ্যা তার ছেলেটাকে একবার ধরার জন্য যেমনি ছটফট করছিল, তেমনি অধীরের কথাগুলো শুনে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। বিস্ময় দৃষ্টি ঘুরে যায় অধীরের দিকে। সৃজনকে আটকে রাখা কাঁচের সাথে নেতিয়ে আসা শরীরটা কোনোরকমে ঠেকিয়ে রেখেছে। তার সৃজন বেঁচে না থাকলে, আল্লাহ যেন তাকে এই দুনিয়ায় আর সেকেন্ড-ও বেঁচে না রাখে। শেষ এই আর্জিটুকুই আল্লাহর দরবারে খুব যত্নে তুলে রাখলো মেয়েটা।
জেডি আকাশকে একেবারে চুপ হয়ে যেতে দেখে এগিয়ে এসে আকাশের সামনে দাঁড়ায়। রিমোটটি উপর দিকে ছুড়ে আবারো কেচ ধরে হেসে বলে,
“তোর বাচ্চা ওভাবে ছটফট করছে কেন জানিস? ও ঠিক করে অক্সিজেন পাচ্ছে না। বেচারা নিষ্পাপ সৃজন। বাপ-মায়ের ভুলের শা’স্তি সে দিচ্ছে। অনেকক্ষণ থেকে এভাবে ক’ষ্ট পাচ্ছে। আমার অবশ্য তোদের বাচ্চাকে এভাবে দেখতে ভালোই লাগছে। কি সুন্দর ছটফট করছে দেখ!”
আকাশ চোখ বুজে নিল। কাঁপা গলায় বলে, “কি চাইছিস তুই?”
জেডির সহজ উত্তর,
“তুই তো জানিস এভিজান, আমার প্রাণকে ছাড়া আর কিছুই চাইনা আমি।”
আকাশ তাকায় জেডির দিকে। শ’ক্ত কণ্ঠে বলে, “জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা বাদ দে। তোর মতো নোং’রা মস্তিষ্কের মানুষ আমার সন্ধ্যামালতীর ছায়াও মাড়াতে পারবি না।”
জেডি আকাশের দিকে চেয়ে রইল। একসময় যে মেয়ের গল্প করে করে সে এভির কান ঝালাপালা করে ফেলত। যে মেয়েকে সে শুধু তার প্রাণ ডাকতো। আকাশও তার সাথে মিলিয়ে জ্যাকের প্রাণ বলত। আজ সেই মেয়েকেই এভি কি সুন্দর করে, ‘আমার সন্ধ্যামালতী’ বলে সম্মোধন করছে। জেডি মৃদুহেসে বলে,
“ভালো মস্তিষ্কের মানুষ হলে আমার প্রাণকে আমি পেতাম এভিজান?”
আকাশের দৃঢ় কণ্ঠ, “নো।”
জেডি হাসে। বলে, “কেন পেতাম না? তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি তুই নিজ দায়িত্বে আমার প্রাণকে খুঁজে আমার হাতে ওকে তুলে দিবি।”
আকাশের সহজ উত্তর,
“কারণ সন্ধ্যামালতী আমার বিবাহিত স্ত্রী। আর আমি কা’পুরুষ নই যে, আমি আমার স্ত্রীকে আরেক পুরুষের হাতে তুলে দিব।”
আকাশের কণ্ঠে তীব্র অধিকারবোধ। জেডি’র মুখ মলিন হয়। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সামান্য হেসে বলে,
“জানিস এভিজান, আমার প্রাণের পেটের বা পাশে একটা ছোট্ট বাদামি রঙের জন্মদাগ আছে। ওই জন্মদাগে নিয়ম করে ঠোঁট ছোয়ানোর স্বপ্ন দেখেছি আমি। এখনও সে ইচ্ছে আগের মতোই আছে। দিয়ে দে আমার প্রাণকে। আমি আমার ইচ্ছেটা পূরণ করি। দিবি?”
কথাটা শুনতেই আকাশের চোখমুখ শ’ক্ত হয়ে যায়। বা হাতে জেডির কলার ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“জ্যাক আমার সন্ধ্যামালতীকে নিয়ে এসব মন্তব্য করা থেকে বিরত থাক। নয়তো তোর মুখ আমি ভেঙে দিব।”
জেডি প্রাণহীন হাসে। বলে,
“এটুকুতেই এতো জ্ব’ল’ছে এভিজান? আর তুই যে আমার প্রাণকে গভীরভাবে ছুয়েছিস। বাচ্চার মা পর্যন্ত বানিয়ে দিয়েছিস। এটা আমার ঠিক কোথায় গিয়ে লাগে জানিস?”
আকাশ চোখ বুজল। শ’ক্ত গলায় বলে, “আমার বাচ্চাকে ছেড়ে দে।”
জেডি হাতের আধখাওয়া সিগারেটটি ছুড়ে ফেলে আকাশকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে, “তোরা আমার কথা না মানলে আমি কি করে তোদের কথা মানবো? এর চেয়ে তোরা আর কিছুক্ষণ ওয়েট কর। তারপর তোদের বাচ্চা…..
এটুকু বলতেই আকাশ জেডির দিকে এগিয়ে এসে অনুনয়ের সুরে বলে,
“আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আমি সন্ধ্যামালতীর সাথে থাকবো না। আমি ওর থেকে সবসময় ডিস্টেন্স মেইনটেইন করে চলব। তুই আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দে জ্যাক। প্লিজ!”
জ্যাক হেসে বলে,
“ডিভোর্স দিয়ে আমার হাতে তুলে দিবি?”
আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ইম্পসিবল। আমি বলেছি, ডিস্টেন্স মেইনটেইন করব। নট সেপারেশন। ওকেই?”
জেডি হাতের রিমোটটি ঘোরাতে ঘোরাতে শব্দ করে হেসে বলে,
“তাহলে তো হবে না এভিজান। হয় আমার প্রাণকে একেবারে ছেড়ে দিয়ে আমার হাতে তুলে দে। নয়তো ছেলের লা’শ নিয়ে বাড়ি ফিরে যা।”
আকাশ রে’গে দু’হাতে জেডির কলার চেপে ধরে। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। গলা বেঁধে আসছে। সৃজনের কান্নার আওয়াজ কানে সুঁচের ন্যায় ফুটছে। বুকটায় বড্ড ব্য’থা করছে। বাবা হিসেবে নিজেকে বরাবই ব্যর্থ আর অসহায় লেগেছে। যার পরিধি আজ কয়েকহাজারগুণ বেড়ে গিয়েছে। আকাশ অসহায় দৃষ্টিজোড়া জেডির দিকে রেখে কণ্ঠে তীব্র অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলে,
“আমার ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই। ওকে ছেড়ে দে জ্যাক। তুই আমাকে মে’রে ফেল না! আমি নিজে সারেন্ডার করছি তোর কাছে। বিলিভ মি, আমি তোকে ভুল করেও প্রতিহত করব না।”
জেডি’র মাঝে তেমন কোনো প্রভাব পড়ল বলে মনে হলো না৷ সে ঘাড় চুলকে উপহাস মূলক কণ্ঠে বলে,
“স্যরি রে এভি! তোর কাছে দু’টো-ই অপশন। হয়, আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে আমার হাতে তুলে দে। নয়ত সৃজনের লা’শ উপহার নে।”
আকাশের মলিন মুখ আরও মলিন হয়। কি করবে সে? কোথায় যাবে? কার কাছে হেল্প চাইবে? হেল্প চাওয়ার মানুষটাই তো বে’ঈ’মা’নী করছে। আকাশ জেডির কলার ছেড়ে দেয়। নির্জীব গলায় বলে,
“তোর জন্য আমি কতকিছু করেছি জ্যাক। আর তুই তার প্রতিদান এভাবে দিচ্ছিস? তোর এসব বি’শ্বা’স’ঘা’ত’কা অনেক আগেই আমাকে মে’রে ফেলেছে, জানিস? শুধু আমার সন্ধ্যামালতী আর আমার বাচ্চাটাই বাকি ছিল।”
এ পর্যায়ে জেডিকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখা গেল। দৃষ্টি সরিয়ে নেয় আকাশের থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সৃজনের দিকে। যে ছেলেটা এখনো সেই একইভাবে ছটফট করছে। ঠিক যেভাবে মাছেরা স্থলে এসে বাঁচার জন্য ছটফট করে। অথচ জেডির মাঝে সৃজনের জন্য বিন্দুমাত্র খারাপ লাগা দেখা গেল না। তার দৃষ্টি ঘুরে আসে সন্ধ্যার উপর। মেয়েটা কেমন করুণ চোখে জেডির দিকে চেয়ে আছে। মনে হচ্ছে কোনো পাথর৷ চোখদু’টো টকটকে লাল। জেডি ঢোক গিলল।
সন্ধ্যা সৃজনের দিকে তাকালো। কাঁচের উপর দু’হাত রেখে, ছেলের পানে অসহায় চোখে চেয়ে করুণ স্বরে আওড়ায়,
“মা তোমাকে একা একা কোথাও যেতে দিব না। আমার আব্বাজান তুমি। আর একটু অপেক্ষা কর। মা তোমাকে ঠিক বাঁচিয়ে নিব। কিচ্ছু হবে না তোমার।”
কথাগুলো বলে সন্ধ্যা একপর্যায়ে ফুঁপিয়ে উঠল। এই কাঁচের ভেতরে তার সৃজন ম’র’ণয’ন্ত্র’ণা’য় ছটফট করছে। সে আর পারছে না ছেলের এই আ’হা’জা’রি দেখতে। আর সহ্য হয় না। সন্ধ্যা খুব ক’ষ্টে নিজেকে সামলায়। কাঁচের উপরেই ছেলেকে কয়েকটা চুমু আঁকে। এরপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। দুর্বল পা দু’টো টেনে জেডির দিকে এগিয়ে আসে। পা থেমে যায় আকাশের পাশাপাশি এসে। ভাঙা গলায় বলে,
“আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দাও, অধীর ভাইয়া, প্লিজ!”
জেডি জিভ দ্বারা শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“তবে আমার শর্ত মেনে নে।
এটুকু বলে জেডি প্যান্টের পকেট থেকে একটি কাগজ আর কলম বের করে আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদুহেসে বলে,
ডিভোর্স পেপার। দু’জন সাইন করে দে। আমিও তোদের বাচ্চাকে ছেড়ে দিচ্ছি।”
আকাশ, সন্ধ্যা দু’জনেই বিস্ময় চোখে চেয়ে আছে জেডির ধরে রাখা ডিভোর্স পেপারটির দিকে। তখনো কানে ভেসে আসছে সৃজনের বাঁচার জন্য চিৎকার করা কান্নার আওয়াজ। বুকের অ’স’হনীয় ব্য’থা, কানে বি’ষের ন্যায় সৃজনের কা’ন্নার আওয়াজ, নিজেদের বাচ্চাকে বাঁচাতে নিজেদের বি’চ্ছে’দ সবমিলিয়ে আকাশ, সন্ধ্যার শরীর মন দু’টোই ভেঙে আসে। সন্ধ্যার দু’চোখ ফেটে নোনাজল গড়ায়। মা হয়ে সৃজনকে নিজের চোখের সামনে কিভাবে ম’র’তে দেখবে? আর আকাশ? সৃজন যার অংশ, সেই মানুষ টার সাথে একেবারে বি’চ্ছে’দ নিয়েই বা কি করে বাঁচাবে? গত কয়েকটা বছর, যত ক’ষ্ট-ই করুক, দিনশেষে একটি সত্য কথা জ্বলজ্বল করত,
‘আকাশ সন্ধ্যার স্বামী।’
কিন্তু আজ সেই পরিচয়টুকুও তার জীবন থেকে মুছে ফেলতে হবে? কান্নারা সন্ধ্যার গলায় দলা পাকিয়ে আসে।
আকাশ জেডির দিকে কেমন করে চেয়ে আছে। সন্ধ্যামালতীর সাথে বি’চ্ছে’দ? এর চেয়ে তো সারাজীবন দূরত্ব-ই বেশ ভালো ছিল। সে কেন লোভী হতে গেল? কেন লোভী হয়ে সন্ধ্যামালতীর সাথে দূরত্ব মেটাতে চাইলো?
জেডি আকাশ আর সন্ধ্যার দিকে বেশ কয়েকবার তাকালো। এরপর এপাশ-ওপাশ হাঁটতে হাঁটতে তাড়া দিয়ে বলে,
“খুব বেশি সময় নেই। আর মাত্র ক’মিনিট। ফাস্ট ভেবে কাজ সেরে ফেল। ব্যাপারটা তোদের সৃজনের জন্যই ভালো হবে।”
আকাশ আর সন্ধ্যা দু’জনেই কান্নারত সৃজনের দিকে তাকালো। যে সেই একইভাবে ছটফট করছে। শ্বাসক’ষ্টের রোগীর মতো বারবার হা করছে একটু শ্বাস নেয়ার আশায়। বাচ্চাটির চোখমুখ অসম্ভব লাল। আর ক’মিনিট এভাবে থাকলে তাদের সৃজন এমনিই ম’রে যাবে। বো’মার আর প্রয়োজন পড়বে না। ছেলের অবস্থায় আকাশ, সন্ধ্যার বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে বর্ষণের ন্যায় অশ্রুকণা ঝরে।
আকাশ দ’ম’ব’ন্ধ অনুভূতি নিয়ে জেডির দিকে ফিরে তাকায়। ঢোক গিলে বলে,
“আমি সন্ধ্যামালতীকে তোর জন্য ছেড়ে দিলে, ওপারেও ওকে পাবো না। এটা আমি করতে পারবো না। মে’রে ফেল আমার বাচ্চাকে। দুনিয়ার জীবন তো শেষ নয়। আমি আর আমার সন্ধ্যামালতী দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবন পেরিয়ে ইহজীবনে আমাদের বাচ্চার সাথে মিলিত হওয়ার অপেক্ষা করব। সাথে তোর হিসাব-নিকাশ। এই সংক্ষিপ্ত জীবনের জন্য হয়ে গেলাম এক স্বা’র্থ’প’র বাবা।”
কথাটা শুনতেই আকাশের পাশে দাঁড়ানো সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলে,
“আমি আমার বাচ্চাকে….
বাকিটুকু বলার আগেই আকাশ ডানহাতে সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরে। সন্ধ্যা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করে। সে তার বাচ্চাকে ছাড়া কি করে থাকবে? কখনো পারবে না সে। গলা ফাঁটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। মেয়েটির ছলছল দৃষ্টি অধীরের দিকে। যে চোখে কতশত আর্জি, আ’হা’জা’রি মিশে আছে।
সন্ধ্যার দৃষ্টিতে জেডি’র দৃষ্টি মিললেও জেডির মনে দয়া হলো না। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশের এটুকু রিয়েকশন সে বোধয় আশা করেনি। আরও কিছু আশা করেছে। আকাশ জেডির চঞ্চল দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে ধরা গলায় বলে,
“আমি তোকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না জ্যাক।”
অরুণ অনামিকার কবর পাড়ে বসে আছে। সেই যে গতকাল তার থেকে অনামিকাকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে ক’ব’র দিয়ে দিল। সেই থেকে তার আর নড়চড় নেই। একবারের জন্যও দু’চোখের পাতা বন্ধ হয়নি। গতকাল সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে। রাত পেরিয়ে সকাল এসেছে। বেলা বেড়েছে। অরুণ এখনো সেই একইভাবে এখানে বসে আছে। দৃষ্টি অনামিকাকে চাপা দেয়া মাটির উপর। হাত-পায়ে মাটি দিয়ে পুরো মেখে আছে। হঠাৎ-ই অরুণ ক’ব’রের দিকে ঝুঁকে কান পাতে। কিছু শুনতে চাইছে বোধয়। কিন্তু কোনো আওয়াজ না পেয়ে অরুণ করুণ সুরে ডাকে,
“অনামিকা? অনামিকা? অনামিকা??”
কোনো সাড়া না পেয়ে অরুণের বুকটা কেমন হা’হা’কা’র করে উঠল। আনিকার হাসবেন্ড সকালে একবার অরুণকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য টেনে গিয়েছে। কিন্তু নিয়ে যেতে পারেনি। এখন আবার এসে অরুণকে ক’ব’রে এভাবে কান পাততে দেখে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। ছেলেটা এক রাতেই একেবারে নি’স্ত’ব্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে অনামিকা, অরুণ দু’জনেই হারিয়ে গেছে। পার্থক্য শুধু অনামিকা দেহ নিয়ে হারিয়েছে, আর অরুণের কেবল দেহটা রয়ে গেছে। আনিকার হাসবেন্ড এগিয়ে এসে অরুণের পাশে দাঁড়ায়। হাঁটু গেড়ে বসতে নিলে পায়ের সাথে একটি বড়সড় বক্স বেঁধে যায়। লোকটির কপালে ভাঁজ পড়ে। মনে হচ্ছে মোটামুটি বড় সাইজের একটি ট্রাংক এটা। সে কৌতূহল বশত ট্রাংকের ছিটকিনি খুলে, ঢাকনা উঁচু করলে দৃশ্যমান হয়, একটি মানুষের কা’টা মাথাসহ, শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। যেগুলো একটার পর একটা সাজিয়ে রাখা। আনিকার হাসবেন্ড ভ’য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। কারেন্ট শক খাওয়ার মতো দু’হাত পিছিয়ে যায়।
এদিকে কারো চেঁচানোর শব্দে অরুণের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে বাদিক ফিরলে তার চোখেও একই দৃশ্য ধরা দেয়। অরুণের মাঝে তেমন ভাবান্তর দেখা গেল না। অনামিকাকে হারানোর শোক কোনোকিছু দাবিয়ে যেতে পারছে না। অরুণের চোখে পড়ে, কা’টা মা’থার উপর একটি সাদা কাগজ। সে তার বা হাত বাড়িয়ে কাগজটি নিয়ে মেলে ধরলে সর্বপ্রথম চোখে পড়ে দু’লাইন,
“যাওয়ার আগে, আমার তরফ থেকে তোর জন্য ছোট্ট একটি উপহার। হি রেইপ্‘ড অনামিকা।
মাঝে পাতা ভর্তি অনেক লেখা। যার একেবারে শেষ লাইন,
এভি আমায় ঘৃ’ণা করে। ভীষণ ঘৃ’ণা করে। ওর ঘৃ’ণার তালিকায় আমার স্থান শীর্ষে। আজ তুই খুব খুশি হয়েছিস, তাইনা অরুণ?”
অরুণের হাত কাঁপছে। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়, “জে..ডি?”
হাতের কাগজটি ছুঁড়ে ফেলে অতি ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া শরীরটা টেনে তুলে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে যায়। শার্টের হাতা দিয়ে ক’বার চোখের জল মুছে নেয়। আনিকার হাসবেন্ড বেশকয়েকবার ডাকলো অরুণকে। অরুণ শুনলো না। বিড়বিড় করল,
“ওকে আকাশ মে’রে ফেলবে।”
মিটিমিটি আলোয় ঘেরা একটি ঘরে একজন লোক হাতপা, মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। ছটফট করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। তবে আশেপাশে কেউ না থাকায় বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ চেষ্টা করায় হাত-পায়ের বাঁধনগুলো ঢিলে হয়ে এসেছে। লোকটি সুযোগ বুঝে থেমে থেমে বারবার চেষ্টা করতে থাকে। অনেকটা সময় পর সে হাতের বাঁধন পুরোপুরি ছুটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। লোকটির চোখেমুখে উৎফুল্লতা ঘিরে ধরে। সে ব্যস্ত হাতে পায়ের বাঁধসহ মুখের বাঁধন খুলে ফেলে।
ঘরের এক কোণায় একটি ল্যাপটপ রাখা। যেখান থেকে একটি পেনড্রাইভ খুলে পকেটে ভরে একপ্রকার দৌড়ে দরজার কাছে দরজা টানলে দেখল দরজা খোলাই আছে। সে দ্রুত ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তখনই পাশের রুম থেকে আরেকটি ছেলে বেরিয়ে আসে। দু’জনের চোখাচোখি হয়। দু’জনেই দু’জনের পরিচিত হওয়ায় তাদের মাঝে তেমন ভাবান্তর হলো না। ক’সেকেন্ডের জন্য দু’জন দু’জনের দিকে চেয়ে থাকে। এরপর প্রথম ছেলেটি অপর ছেলের কাঁধে হাত রেখে ছোট্ট করে বলে,
“সাবধানে বাসায় যাও।”
কথাটা বলে সে আর এখানে দাঁড়ায় না। একপ্রকার দৌড়ে বেরিয়ে যায় এই জায়গা থেকে। পিছু পিছু সেই ছেলেটিও যায়। তবে তার মাঝে তেমন তাড়া দেখা গেল না।
যে ছেলে পকেটে পেনড্রাইভ ভরে বেরিয়ে এসেছে। সে রাস্তায় দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। পায়ে জুতো নেই। শার্ট-প্যান্টের অবস্থা শোচনীয়। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখমুখ শুকনো। চোখ দু’টো লাল। বড্ড তাড়া তার। পকেটে এক টাকা নেই। ফলস্বরূপ চাইলেও একটি গাড়ি নিতে পারলো না। তার পা দু’টো থেমে নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় এক মেইন রোড থেকে আরেক মেইন রোডে এসে পৌঁছেছে। পা জোড়া এখনো থেমে নেই তার৷ বারবার শুকনো ঢোক গিলছে। রাস্তার এপার থেকে ওপারে যায় চলন্ত গাড়ির মাঝ দিয়েই। কয়েকজন বোধয় ছেলেটাকে দু’চারটে গা’লিও ছুঁড়লো। আজ যদি কোনো এক্সিডেন্ট হতো, তখন তো পাবলিক সবার আগে ড্রাইভারকেই ধরতে আসতো। কিন্তু ছেলেটির এদিকে মন নেই। সে তার মতো ছুটছে। আরও অনেকটা পথ দৌড়ে একটু সময়ের জন্য থেমে যায়। হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপায়। বুক ধুকধুক করছে। আশেপাশে তাকিয়ে কিছু খুঁজল। একজন লোককে পাশ দিয়ে যেতে দেখে ছেলেটি হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“আঙ্কেল আপনার ফোনটা দেয়া যাবে? প্লিজ আঙ্কেল!”
লোকটি এমন উষ্কখুষ্ক ছেলের দিকে কেমন করে যেন তাকালো। দেখে ভালো ঘরের ছেলে মনে হচ্ছে। কথাবার্তাও ভালো। কিন্তু এভাবে পা’গ’লের মতো করছে কেন বুঝল না। পা দু’টোও খালি। আবার ফোন চাইছে। ভদ্রলোক এতো না ভেবে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে ছেলেটির দিকে দিলে ছেলেটি দ্রুত ফোনটি নিয়ে আকাশের নাম্বারে ডায়াল করে ফোন কানে ধরে। আকাশের ফোন রিসিভ হয় না। ছেলেটি বেশ কয়েকবার কল করেও আকাশকে ফোনে না পেয়ে তীব্র হতাশার শ্বাস ফেলে ভদ্রলোককে ফোনটি ফিরিয়ে দিয়ে আবারো দৌড় লাগায় একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে। বিড়বিড় করে,
“প্লিজ জেডি! স্টপ দ্য গেইম।”
সৌম্য রাতটুকু ইরার সাথে থেকে সকাল সকাল সন্ধ্যাদের বাড়ি আসছিল, সন্ধ্যার খোঁজ নিতে। আজকাল মেয়েটাকে একবার ফোনে না পেলেই টেনশনে কিচ্ছু ভালে লাগে না। তাদের জীবনে তো দুঃখের শেষ নেই। বিপদের শেষ নেই। আর তাই সে নিজ বাড়িতে মন টিকাতে পারেনা। বোন, বোনের ছেলেকে সুস্থ না দেখে তার মন শান্ত হবে না। এজন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে। অর্ধেকটা পথ আসার পর, হঠাৎ সৌম্য’র পা থেমে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে দেখে। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় তার সামনে দন্ডায়মান রিহানের দিকে। রিহানের মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলায়। রিহানের পরনে একটি পুরনো কুচকানো শার্ট-প্যান্ট। চোখমুখসহ চুলগুলো উষ্কখুষ্ক।
গত এক বছর আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেকটা শুকিয়ে গেছে। পায়ে জুতো-ও নেই। মলিন মুখে চেয়ে আছে সৌম্য’র দিকে। কিছুক্ষণ আগে যে দু’জন ছেলে এক বদ্ধ কুটির থেকে ছাড়া পেয়েছে। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ছেলেটি-ই রিহান। যার মাঝে তেমন কোনো তাড়া ছিল না। ছিল বোধয়। মনে বড্ড তাড়া ছিল। কিন্তু শরীর অত্যধিক দুর্বল হওয়ায় পা চালাতে পারছিল না। তাই ধীরেসুস্থেই বাড়ির পথে হাঁটছিল। টাকা নেই, রাস্তা চেনে না। সবমিলিয়ে একটু একটু করে, অনেককে জিজ্ঞেস করে করে এগোচ্ছিল। পথিমধ্যে সৌম্য’র দেখা পেয়ে গেল।
সৌম্য রিহানের দিকে চেয়ে অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “রিহান?”
রিহান দুর্বল পায়ে এগিয়ে এসে সৌম্যকে জড়িয়ে ধরে। ভাঙা গলায় বলে, “তোরা কি কেউ আমায় খুঁজিস নি সৌম্য? আমার তোদেরকে খুব মনে পড়ত।”
সৌম্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রিহানের কথা ঠিক বুঝতে পারছে না। রিহান বেঁচে থাকলে গতকাল অধীর তাকে কেন বলল, সে রিহানকে মে’রে ফেলেছে। শুধু এটুকুই নয়৷ বলেছে, কে’টে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। অধীর তাকে মিথ্যে কেন বলল? সৌম্য’র মস্তিষ্ক কাজ করে না। কিচ্ছু বুঝতে পারে না।
জেডি এপাশ-ওপাশ হাঁটতে হাঁটতে আকাশ আর সন্ধ্যার দিকে চেয়ে হেসে বলে, “তোরা কি এই ডিভোর্স পেপারে সাইন করবি না-কি তোদের বাচ্চার করুণ অবস্থা নিজ চোখেই দেখবি বল তো? আর মাত্র দু’মিনিট টাইম আছে। মিছেমিছি বাচ্চাটাকে ক’ষ্ট দিচ্ছিস।”
আকাশ সন্ধ্যার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে। চোখমুখ শ’ক্ত করে তাকিয়ে আছে জেডির দিকে। সন্ধ্যা আকাশের থেকে ছাড় পেয়ে ভেজা চোখে আরেকবার কান্নারত সৃজনের দিকে তাকায়। ছেলেকে এখন আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায় দেখে দম আটকে আসে মেয়েটার। মনে মনে খুব করে আল্লাহ্কে ডাকে।
এদিকে জেডি নিজের মতো হাসতে হাসতে আবারো বলে,
“মিসেস আসমানী নওয়ানকে মা’র’লা’ম, নিয়াজকে মা’র’লা’ম আরও কতজনকে মা’র’লাম, গত একবছরে হাজারবার তোদের বাচ্চাকে মা’র’তে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে আজ সফল হতে যাচ্ছি।”
কথাগুলো শুনে আকাশ চোখ বুজে নিল। দমবন্ধ হয়ে আসছে। আর সইতে পারছেনা ছেলের আ’র্ত’না’দ। আর পারছে না প্রিয় বন্ধুর এই রূপ সহ্য করতে। বুকটা ফেটে যাবে বোধয়।
এদিকে সন্ধ্যা ভস্ম করা দৃষ্টিতে তাকায় জেডির দিকে। এতোগুলো মানুষের খু’নি শুধুমাত্র এই অধীর নামের জা’নো’য়া’র। একে বাঁচিয়ে রাখলে তার আম্মা, তার বিপদের বড় ভাই নিয়াজ ভাইয়া ওদের সাথে বে’ঈ’মা’নী করা হবে। সন্ধ্যা এদিক-ওদিক তাকিয়ে আশেপাশে কিছু খুঁজল। সামান্য পিছনদিকে দেয়ালের সাথে একটি ত’লো’য়া’রের মতো কিছু একটা দেখতে পায়। সন্ধ্যা যদিও ঠিক করে বুঝল না, এটা কি। তবে হাত বাড়িয়ে, জিনিসটির মাথা ধরে সামান্য টান দিতেই বেরিয়ে আসে চকচকে ধা’রা’লো ত’লো’য়া’র। সন্ধ্যা জিনিসটি দেখে ঢোক গিলল। নিজেকে শ’ক্ত করে জেডির দিকে চেয়ে সামান্য এগিয়ে এসে রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে,
“অনেক মানুষ মে’রে’ছিস। এবার নিজে ম’র।”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যা তার হাতের ত’লো’য়া’রটি অধীরের বুক বরাবর তাক করে, তখনই আকাশ মাঝপথে তার ডানহাত উঠিয়ে সন্ধ্যার বাড়িয়ে দেয়া ত’লো’য়া’রের মাঝ বরাবর শ’ক্তহাতে চেপে ধরে। সন্ধ্যার রাগান্বিত দৃষ্টি অধীরের পানে। ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে,
“আমাকে ছাড়ুন। আমি ছাড়বো না এই জা’নো’য়া’র’কে। ওর কোনো অধিকার নেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার।”
অধীর বিস্ময় দৃষ্টিতে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। সন্ধ্যার চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে। মুখাবয়বে তার প্রতি তীব্র ক্রো’ধ ঝরে পড়ছে। অধীর ঢোক গিলল। দৃষ্টি নামিয়ে সন্ধ্যার বাড়িয়ে দেয়া ত’লো’য়া’রটির দিকে তাকায়। দৃষ্টি আটকায় ত’লো’য়া’রে’র মাঝ বরাবর আকাশের চেপে রাখা শ’ক্তহাত। আকাশের হাত বেয়ে টপটপ করে তাজা র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অধীর ব্য’থাতুর নয়নে তাকায় আকাশের হাতের দিকে। কিন্তু সে এগোলো না আকাশের দিকে। ঢোক গিলল দু’বার। এরপর দৃষ্টি উঠিয়ে আকাশের চোখের দিকে তাকায়।
আকাশের চোখদু’টো এতোটাই লাল, যেন মনে হচ্ছে টোকা দিলেই এই দু’চোখ বেয়ে র’ক্তের বৃষ্টি ঝরতে শুরু করবে। আকাশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়ের আদুরে আব্বা ডাক। মনে পড়ে মায়ের আদুরে হাত মাথায় বুলানোর দৃশ্য। মনে পড়ে, যেকোনো বিপদের মায়ের কাছে ছুটে গেলে মা তাকে কত যত্ন করে আগলে নিত। এতো এতো ভালোবাসার দিনশেষে আকাশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, শেষবার মায়ের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দৃশ্য। আর তারপর মায়ের ম’রা মুখটা দেখার সৌভাগ্যটুকুও তার হয়নি। যার পিছনে কেবল আর কেবলমাত্র তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, তার নামে প্রিয় বন্ধু জ্যাক দায়ী। সেদিন নিয়াজের শেষসময়ের দৃশ্যগুলোও স্মৃতির পাতায় উঁকি দিতে ভুললো না। সবশেষে তার কলিজার টুকরো সৃজনকেও বাদ রাখলো না তার সেই নামের প্রিয় বন্ধু।
জেডি আকাশকে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৃদুহেসে বলে,
“এতো মানুষকে মা’র’লাম। তবুও আমার প্রতি আমার এভিজানের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমলো ন…….
বাকিটুকু বলার সুযোগটুকু আর হয় না অধীরের। আকাশ ত’লো’য়া’রটির মাঝ বরাবর ধরে রাখা অবস্থাতেই তার র’ক্তমাখা হাতে ত’লো’য়া’রটি জেডির বুকের একদম বা পাশে গেঁথে দেয় সর্বশক্তি দিয়ে। ত’লো’য়া’রের যেখানে আকাশ ধরে রেখেছিল, অর্থাৎ ত’লো’য়া’রের পুরো অর্ধেকটুকু অংশ পুরোটাই জেডির বুকে গেঁথে দিয়েছে আকাশ। যার ফলে আকাশ হাত গিয়ে ঠেকেছে জডির বুকে।
আকাশের হঠাৎ আ’ক্র’ম’ণ জেডি বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারেনি। চোখদু’টো আপনাআপনি বড় হয়ে যায়। ন এর পর আকার টুকু অধীরের জিভেয় আটকে যায়। চোখদু’টো একেবারে স্থির করে আকাশের চোখে রাখা। টলমলে দু’চোখে বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। একই সময় আকাশের র’ক্তলাল দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়ায়। দু’বন্ধুর দৃষ্টি দু’বন্ধুর দিকে। আকাশ জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে আওড়ায়,
“জানি, আমি তোর প্রিয় তালিকা থেকে অনেক আগেই কে’টে গিয়েছি। কিন্তু তুই হাজারটা অ’ন্যা’য় করার পরও আমি আমার প্রিয় তালিকা থেকে তোকে মুছতে পারিনি। আর আজ তুই আমায় আমার সেই প্রিয় মানুষের বুকে ছু’রি চালাতে বাধ্য করলি। এতো ক’ষ্ট না দিলেও পারতি জ্যাক। আমি তোকে কখনো ক্ষমা করবনা আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাইকে আমার হাত দিয়ে এতো নি’র্ম’মভাবে কে,’ড়ে নেয়ার অ’প’রা’ধে।”
অধীরের দৃষ্টি নিভুনিভু হয়ে আসে। সে ত’লো’য়া’র কিনে এনেছে। তার প্রাণ ত’লো’য়া’রটি এগিয়ে দিয়েছে। আর তার জানবন্ধু তার বুকে সেই ত’লো’য়া’র গেঁথে দিয়েছে। কথাটা ভেবে অধীর তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য ব্য’থাতুর একখানা হাসি ফোটায়। খুব ক’ষ্টে ডান হাতের দু’আঙুল দিয়ে তার গার্ডদের উদ্দেশ্যে কিছু ইশারা করতেই, তারা দ্রুত দৃজনকে কাঁচের ভেতর থেকে সৃজনকে বের করে আনে। এতোক্ষণে সৃজনের সব শ’ক্তি ফুরিয়েছে। যার ফলে কান্নার আওয়াজও আর বের হয়না। কিন্তু এতোক্ষণ শ্বাস নেওয়ার জন্য যেভাবে ছটফট করছিল, এখন শ্বাস নিতে পেরে একটু শান্ত হয় বাচ্চাটি। একজন গার্ড সৃজনের বেঁধে রাখা ফেইক টাইম বো’মা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এরপর এগিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার দিকে নেতিয়ে পড়া সৃজনকে বাড়িয়ে দিয়ে ভদ্রতাসূচক বলে,
“ম্যাম আপনার বাচ্চা।”
সন্ধ্যার বিস্ময় দৃষ্টি সেই বো’মাটির দিকে, যেখানে ১০ মিনিটের জায়গায় আরও কয়শ মিনিট পেরিয়েছে কে জানে, অথচ জিনিসটির কোনো রিয়েকশন নেই। সন্ধ্যা সৃজনকে কোলে নিয়ে শ’ক্ত করে তার বুকে চেপে ধরে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায় অধীরের দিকে। যার টলমলে ব্য’থাযুক্ত হাস্যজ্জ্বল মুখটা তার পানে। সন্ধ্যার বুক ধুকধুক করছে।
জেডির হাত থেকে রিমোট পড়ে যায়। ততক্ষণে সে দাঁড়িয়ে থাকার শ’ক্তিটুকুও হারায়। ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া সন্ধ্যার থেকে সরিয়ে আকাশের দিকে রাখে। তখনই ধপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। দু’হাত ছেড়ে দেয়।
জেডি পড়ে যেতেই আকাশের হুশ ফিরল যেন। জেডিকে পড়ে যেতে দেখে আকাশের বুক ধ্বক করে ওঠে। সে জেডির সাথে সাথে দ্রুত বসে পড়ে। চোখের পলকে জেডির বুক থেকে ত’লো’য়া’রটি টেনে বের করে। জেডি মৃদু আ’র্ত’না’দ করে ওঠে। আকাশের দিশেহারা লাগে। সে জেডির র’ক্তমাখা বুকে দু’হাতে বুলায় ঝাপসা চোখে জেডির দিকে চেয়ে অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,
“জ্যাক, জ্যাক? তুই ঠিক আছিস?
বলতে বলতে আকাশ র’ক্তে মাখা দু’হাত জেডির দু’গালে রেখে ভাঙা গলায় ডাকে,
“জ্যাক? কথা বল? এ্যাই জ্যাক?”
জেডি নিভু নিভু টলমলে চোখে আকাশের দিকে চেয়ে রয়। খুব করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল,
‘এবার আমাকে তোরা ভালো না বাসলেও করুণা করে হলেও মনে রাখবি তো এভিজান?’
কিন্তু জেডির মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। এতো কথা বলার দম এখন আর নেই তার। বারবার চোখদু’টো বুজে আসছে। আকাশ তার দু’হাত জেডির গালে রেখে জেডিকে ঝাঁকিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“জ্যাক তাকা। চোখ বন্ধ করিস না। তাকা আমার দিকে। আ’ম স্যরি জ্যাক! চল তোকে এক্ষুনি ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো। কিচ্ছু হবে না তোর।”
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৬
এই বলে আকাশ জেডির শক্তপোক্ত শরীরটা টানতে লাগলো।
জেডি’র টলমলে দু’চোখ বেয়ে আবারো টুপ করে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। মুখ নাড়িয়ে কিছু বলতে চাইলো বোধয়। কিন্তু উচ্চারণ করার শ’ক্তি পেল না। মনে মনেই কথাগুলো আওড়িয়ে নেয়,
“ফাইনালি, আই সাকসিডেড।
আল্লাহ্ তবে আমার সকল ক্লান্তির ইতি ঘটিয়ে দিল! বিদায় এভিজা….”
