Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯ (২)
DRM Shohag

পেরিয়েছে এক সপ্তাহ। গত ছয়দিন আকাশ আইসিইউতে ছিল। একেবারেই জ্ঞান ছিল না তার। প্রিয় বন্ধুকে নিজ হাতে এই দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে নিজেই মৃ’ত্যুর সাথে ল’ড়ে’ছে।
‘নিজ হাতে প্রিয় বন্ধুর মৃ’ত্যু’ এই একটি বাক্য অনুভব করার ক্ষমতা আকাশের হয়নি। ফলস্বরূপ গত ছয়দিন হসপিটালের এক কোণায় মৃ’ত্যু-পথযাত্রীদের ন্যায় পড়ে ছিল আকাশের জ্ঞানহীন নিথর দেহ। আল্লাহ’র অশেষ রহমতে ছয়দিন পর আকাশের জ্ঞান ফিরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা হয় থানা-হা’জতে। প্রিয় বন্ধুকে নিজ হাতে হ’ত্যার দায়ে আকাশ ভিরাজ নওয়ান এর জায়গা আর বাইরে হয়নি। পরিবার, পরিজন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে চারদেয়ালের মাঝে বন্দি করে রাখা হয়।

জেডি মা’রা যাওয়ার আজ সপ্তম দিন চলমান। গতকাল আকাশকে থানায় নিয়ে রাখা হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টার মাঝে যেকোনো আ’সামীকে আদালতে উপস্থিত করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী আকাশকে আজ আদালতে আনা হয়েছে।
এজলাস কক্ষের চারিদিকে থমথমে পরিবেশ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’। দু’হাতে হাতকড়া পরানো। মাথা নিচু তার। বাদিকে সারিবদ্ধভাবে বসা অনেক অনেক অপরিচিত মানুষ। যাদের মাঝে কিছু পরিচিত মুখ দৃশ্যমান হয়েছে। যারা প্রত্যেকে আকাশের কেউ না কেউ। আকাশের স্ত্রী, সন্তান, খালা, বোন, ভাই, বন্ধু, বন্ধুর মতো ডক্টর নিয়াজ।

সন্ধ্যা ছেলেকে বুকের মাঝে সাপ্টে ধরে রেখেছে। টলমলে চোখদু’টো আকাশের পানে নিবদ্ধ।
আকাশের পক্ষে কোনো উকিল নেই। উকিল আছে কেবল বিপক্ষে। যে সামনে দাঁড়িয়ে অনবরত আকাশের বিরুদ্ধে কথা বলতে ব্যস্ত হয়েছে।
নিয়াজ দু’হাত একসাথে শক্ত করে জমা করে রেখেছে। মাথা নিচু তার। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধু অসহায়ত্বে ঘেরা। হুট করেই প্রতিটি মানুষ আকাশের বিরুদ্ধে হয়ে গেল। গত এক সপ্তাহ আকাশের জন্য একটি ছোটোখাটো উকিল ম্যানেজ করতে কোথায় না কোথায় ছুটেছে তার ঠিক নেই। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছে। আকাশের পক্ষে ল’ড়ার জন্য কোনো উকিল পায়নি। আজ এখানে তারা আকাশের নামে ক’টু’ক্তি শুনতে আসেনি। এসেছে আকাশকে নিয়ে আদালতের রায় শুনতে।
ইতোমধ্যে জাজ সাহেব কথা বলতে শুরু করেছে। আকাশের পরিচিত প্রতিটি মানুষের মুখজুড়ে শুধু অসহায়ত্ব আর অসহায়ত্ব।
হঠাৎ-ই জজ সাহেব গমগমে স্বরে কঠিন দু’টো বাক্য আওড়িয়ে থেমে যায়,

“সকল সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের নিকট স্পষ্ট যে, ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ ‘জ্যাক ডাল্টন’ এর খু’নি। অতএব, আদালত অভিযুক্ত আসামী ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ কে বাংলাদেশ দন্ড-বিধি ১৮৬০ এর ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যা’ব’জ্জী’বন কা’রা’দ’ন্ডে দন্ডিত করল।”

মুহূর্তেই এজলাস কক্ষে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। স্তব্ধ হলো ছয়জন মানুষ। সন্ধ্যা, সৌম্য, আকাশের খালা, খালাতো বোন শিমু, অরুণ, নিয়াজ। সকলের দৃষ্টি কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আকাশের দিকে। কিন্তু আকাশের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। আর না তো সে এ পর্যন্ত একবারো মাথা তুলেছে। চোখ দু’টো অসম্ভব লাল। দুর্বল শরীরটা নিয়ে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে জজ সাহেবের আওড়ানো কথাগুলো শুনতে পেয়ে সে সামান্য ঠোঁট বাঁকালো। তখন-ই দু’জন পু’লি’শ এগিয়ে এসে কাঠগড়ার ভেতর থেকে আকাশকে টেনে বের করতে লাগলো। আকাশের দুর্বল, বি’ধ্ব’স্ত শরীরটা একদিকে হেলে পড়ে যেতে নিলে পু’লি’শ দু’জন আকাশকে সামলে নেয়। আকাশের ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া এলোমেলো হলো। সে ঠিক বুঝতে পারছে না, কোথায় পা ফেলবে। কারণ চোখের সামনে সবকিছু একেবারে সাদা লাগছে। ঝাপসা চোখের ফলাফল এটা। হঠাৎ-ই আকাশের কানের কাছে জোর শব্দে পরিচিত কণ্ঠে একটি ডাক ভেসে আসে, “এভিজান?”

আকাশ কেঁপে ওঠে। ব্যস্ত ডান হাতে দু’চোখ ডলে ডানদিকে তাকায়। চোখে পড়ে হাস্যজ্জল জেডি। আকাশের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “জ্যাক?”
নিজের বলা শব্দটি নিজের কানে আসতেই আকাশের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায়। ততক্ষণে এতো এতো মানুষের ভিড়ে জ্যাক হারিয়ে গিয়েছে। আকাশেরও মনে পড়েছে সে যাকে কিছুক্ষণ আগে দেখেছে সে নিজ হাতে তাকে এই দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়েছে। আর সেই অ’প’রা’ধে, এখন থেকে তার বাড়িঘর হয়ে গিয়েছে জে’ল’খা’না। আকাশকে পু’লি’শ দু’জন টেনে নিয়ে যেতে থাকে। আকাশের করুণ দৃষ্টিজোড়া তখনো আনাগোনা করছে এজলাস কক্ষের চারপাশে। মিথ্যে খুঁজছে মৃ’ত জ্যাককে। হাতে অতিরিক্ত টান পড়ায় আকাশ ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। দৃষ্টি আটকায় সামনে দাঁড়ানো বি’ধ্ব’স্ত সন্ধ্যার পানে। যার কোলে ছোট্ট সৃজন। বাচ্চা ছেলেটি দু’হাতে মায়ের গলা সাপ্টে ধরে রেখেছে। আকাশের দিকে ভাবুক হয়ে চেয়ে আছে। বি’ধ্ব’স্ত আকাশকে চিনতে অসুবিধা হচ্ছে বোধয়।

সন্ধ্যার মুখে রা নেই। শুধু দু’চোখ বেয়ে নিরব অশ্রু ঝরছে। তার করুণ দু’চোখের ভাষা যতটা দৃঢ়, সেখানে তার মুখের ভাষার হয়ত আর কোনো প্রয়োজন নেই। আকাশ শুকনো ঢোক গিলল। বেশিক্ষণ সন্ধ্যাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে পারলো না। সে আস্তে করে সন্ধ্যার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। সন্ধ্যার ভেজা চোখ বেয়ে আরও কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। সৃজনকে আরেকটু শ’ক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে। গতকাল যখন আকাশের জ্ঞান ফিরেছিল, তখন সে-ই সর্বপ্রথম আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আকাশ তার সাথে কথা বলা তো দূর, তার দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। আর আজ একবার চোখ পড়েছে বলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। সন্ধ্যা আপাতত আকাশের এটুকু কর্মকান্ডের দিকে খুব বেশি মন দিল না। সে শুধু ভাবছে তার স্বামীর সারাজীবন জে’লেই কে’টে যাবে। এটা সে কি করে মানবে?
আকাশ সন্ধ্যার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একেকজন বি’ধ্ব’স্ত মানুষের দিকে। যারা প্রত্যেকেই তার আপন। ভীষণ আপন। আকাশ বিদ্রূপ স্বরে ভাঙা গলায় বলে, “জানি, আমার শা’স্তি কম হয়ে গেছে।”

নিয়াজ ঢোক গিলে বলে,
“অনেক চেষ্টা করেছিলাম একটা উকিল যোগার করার!”
আকাশ এ নিয়ে কিছু বলল না। সে তার খালা তারা বেগমেরর দিকে চেয়ে বলে,
“মায়ের ক’ব’র দেখে রেখো খালা।”

তারা বেগম নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। সে তো আকাশকে নিজের ছেলে থেকে কমকিছু দেখেনি। আজ সেই ছেলেটার এ কি হাল হলো? তার বোন বেঁচে থাকলে আকাশের এই পরিণতি মেনে নিতে পারতো না। পারতো না এতো যত্নে গড়া ভালোবাসার ফসলের এই পরিণতি। আল্লাহ বোধয় মানুষটাকে আর ক’ষ্ট দিতে চায়নি, এজন্যই হয়ত ছেলের পরিণতি দেখার আগে আল্লাহ্ আসমানী নওয়ানের ভাগ্যে মৃ’ত্যু লিখেছিল। তারা বেগম শিমুকে আঁকড়ে ধরে কাঁদছে তো কাঁদছেই। তাদের পরিবার শেষ হয়ে গেছে। তার ছোট বোনটাও কত দুঃখ নিয়ে এই দুনিয়া ছেড়েছে। আর তার বড় বোনের কথা তো বাদ-ই দিল। এখন আবার বড় বোনের ছেলের এই পরিণতি। তাদের আর কেউ রইল না। সবার জীবন ভীষণ দু’র্বি’ষ’হ হয়ে উঠেছে।
আকাশ অরুণের দিকে চেয়ে মলিন গলায় বলে,

“জ্যাকের ক’ব’রের খেয়াল রাখিস।”
কথাটা বলার সাথে সাথে অরুণ এগিয়ে এসে আকাশকে সাপ্টে ধরে। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠে বলে,
“আমার ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে আকাশ। তুই আমাদের জেডিকে কেন মা’র’লি? আমাদের বন্ধু এই দুনিয়ার বুক থেকে হারিয়ে গেছে। আর এখন তুই-ও এক অন্ধকার ঘরে চলে যাচ্ছিস। আন্টি, আমার অনামিকা….
অরুণের কথা জড়িয়ে আসে। অস্পষ্টস্বরে বলে,
এতো মানুষ হারিয়ে আমি কিভাবে বাঁচবো?”

আকাশ শ’ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি নিচু তার। দুর্বল শরীরটা মনে হচ্ছে দুলছে। থেকে থেকে বুকে ব্য’থা উঠছে। জ্যাক হারিয়ে গেছে। একেবারে হারিয়ে গেছে। সে জ্যাককে বিদায় দিয়েছে। যাকে একদিন খুব যত্ন করে তার বুকে ঠাই দিয়েছিল, তাকে সে নিজেই মে’রে ফেলেছে। আকাশের বুকের য’ন্ত্র’ণা বাড়লো। দু’হাতে কম্পন তৈরী হলো। তখনই হঠাৎ সৃজনের অস্ফুটস্বরে বলা দু’টি শব্দ কানে আসে আকাশের, ‘বাতাচ বাবু।’

সাথে সাথে আকাশের দৃষ্টি উঠে আসে সৃজনের পানে। কি হলো কে জানে, মুহূর্তেই তার লালিত চোখদু’টো পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে আসলো। তার বাচ্চা এটা। কিন্তু তার বাচ্চার সাথে সে কখনো একদিনও ঠিক করে কাটাতে পারেনি। আর পাঁচজন বাবার মতো সে তার সন্তানকে কখনো সামনে থেকে আগলে নিতে পারেনি। পারেনি আর পাঁচজন বাবার মতো সন্তানের সাথে দু’দন্ড বাঁচতে। কখনো বলতে পারেনি, সে-ই সৃজনের বাবা। আর আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার সারাজীবন জে’ল হয়ে গেল। ভাগ্যে থাকলে হয়তো আবারো কোনো একদিন তার ছেলের সাথে দেখা হবে। আর ভাগ্যে না থাকলে হয়ত হবে না। আর যদি দেখা হয়-ও ততদিনে হয়তো সৃজন অনেক বড় হয়ে যাবে। জানবেও না, তার এক বাবা ছিল বা আছে। টলমলে দৃষ্টি জোড়া একবার সন্ধ্যার দিকে রাখতে চাইলো। চাইলো একটা আবদার করতে। কিন্তু আকাশের সাহসে কুলালো না। সে ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া নিচে নামিয়ে নিল।
তখনই হঠাৎ জেডির র’ক্তা’ক্ত দেহ আকাশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আকাশের শরীর শিউরে ওঠে। দু’হাতে কম্পন সৃষ্টি হয়। তার হাতে তার বন্ধুর মৃ’ত্যু হয়েছে। নাহ্, সে এসব সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সে বাঁচতে চায় না। তার বাঁচার অধিকার সে নিজেই কে’ড়ে নিয়েছে। আকাশ ছটফট করে উঠল।

এদিকে পু’লি’শ দু’জন আর দাঁড়ালেন না। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার তাড়া দিয়েছে আকাশকে। এবার আকাশের ইচ্ছেকে প্রাধান্য না দিয়ে তারা আকাশকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। আকাশ আস্তে আস্তে এগোলো সামনের দিকে।
সন্ধ্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সন্ধ্যা কান্নামাখা চোখে তাকায় আকাশের দিকে। কিন্তু আকাশ আর মাথা তুললো না। য’ন্ত্র’ণা’য় ঘেরা দেহখানা নিয়ে সামনের দিকে এগোলো। এদিকে আকাশকে নিজের দিকে একবারো তাকাতে না দেখে সন্ধ্যার কান্নার বেগ বাড়লো। অ’সহ্য য’ন্ত্র’ণা’য় ছটফটে কণ্ঠে ডেকে উঠল সে,
“আকাশ?”

আকাশের বুক কাঁপলো সামান্য। ঝাপসা চোখজোড়া আরও খানিক ঝাপসা হলো। কিন্তু সে থামলো না। দুর্বল শরীরটা টেনে নিয়ে গেল সামনের দিকে। আকাশের অগ্রাহ্য সাথে জে’লের দিকে এগিয়ে চলা সন্ধ্যার সহ্য হলো না। মেয়েটা সৃজনকে নিয়ে সেখানেই বসে পড়তে নিলে সৌম্য এগিয়ে এসে তার বোনুকে বুকে জড়িয়ে নেয়। সন্ধ্যা ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে দু’চোখের পানি ছেড়ে দেয়। মৃদু শব্দ হয় যা আকাশের কানে এসে বারি খায়। কিন্তু সে নিরুপায় এক পথিক হারা পথিকের ন্যায় এগিয়ে যায়। বুকের অ’সহ্য ব্য’থায় মনে হলো এখনি এখানে পড়ে যাবে।
এদিকে মায়ের কান্না দেখে সৃজন কান্নামাখা চোখে মায়ের দিকে চেয়ে আছে। ভাঙা গলায় বলে,
“মা কাদচ কেনু? মা মা? কাদে না মা।”
ছোট্ট ছেলের আবদার সন্ধ্যা রাখতে পারল না। তার কান্না কমার বদলে বাড়লো। সৌম্য, নিয়াজসহ সকলে ঝাপসা দৃষ্টিতে আকাশের পানে চেয়ে রইল। আর আকাশ, সে তার দুর্বল শরীরটা নিয়ে কেবল পালালো।

“সৌম্য? কি অবস্থা তোমার? ভালো নয় তাই না? আরে জানি জানি। ভালো নেই এখন তুমি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর এই তুমিই সবচেয়ে বেশি ভালো থাকবে। তোমার কল্পনার চেয়েও বেশি ভালো থাকতে পারবে। কারণ শুনতে চাও সৌম্য? জানি শুনতে চাও। অবশ্যই বলব। এইতো বলছি, কারণ তোমাকে দুঃখ দেয়া অধীর ভাইয়া আর তোমাদের ছায়া মাড়াতে আসবে না। ওই বিদায় নেয়ার সময় হয়ে গেল আর কি!

ওহ হ্যাঁ, তোমাকে যে ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলতে চাইছি। তোমার বন্ধু রিহান আছে না? ও সবসময় আমার সন্ধ্যাপ্রাণের পিছু পিছু ঘুরঘুর করত, বুঝলে? যেটা আমার সহ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল। আমার প্রাণের পিছনে কেউ অযথা ঘুরঘুর করলে তাকে ছেড়ে দেয়ার মতো ভালো মানুষ আমি নই সৌম্য। এভি আমার ফ্রেন্ড। ওকে আমি কোনো একভাবে টলারেট করেছি বন্ধুত্বের কাছে হে’রে গিয়ে। কিন্তু তোমার ফ্রেন্ড আমার কেউ না। আমি তাকে কেন ছেঁড়ে দিব বলো তো? তাই ধরে নিলাম ওকে। ওকে আমার আস্তানায় এনেছিলাম গত এক থেকে দু’সপ্তাহ আগে। আমার টার্গেট ছিল ওকে মে’রে তোমাকে বলা কথাটি বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ তোমার ফ্রেন্ডকে মে’রে কে’টে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া। মা’র’বো মা’র’বো করে দিন পিছিয়ে গেল। আমি মেন্টালি ভীষণ ডিস্টার্ব ছিলাম। আর যখন সত্যিই তোমার ফ্রেন্ডকে মা’রা’র ডিসিশন নিলাম, আদেশ করলাম আমার প্রাণের দিকে এতো নিগূঢ়ভাবে নজর দেয়া তোমার ফ্রেন্ড রিহানকে মে’রে ফেলার।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার সামনে শতশত মি’থ্যের বেড়াজাল ভে’ঙে গেল। সত্য সূর্যের ন্যায় জ্বলজ্বল করে উঠল। আমি স্তব্ধ হলাম, দুঃখ পেলাম আর সবশেষে অনুতাপের দ’হ’নে পু’ড়’তে শুরু করলাম। আমার একলা হীন জীবনে ছোট্ট ভাইয়ের মতো সৌম্য’র সাথে করা প্রতিটি অ’ন্যা’য়ের অনুতাপ। কি করব কি করব ভেবে দিশেহারা লাগছিল। অ’স’হনীয় এক য’ন্ত্র’ণা’য় ছটফট শুরু করলাম। আমার স্নেহের ভাই সৌম্যকে আমি অধীর দিনের পর দিন শুধু আ’ঘা’ত করে গেছি। আমার বুক থেকে আমার প্রাণকে কে’ড়ে নিয়েছে ভেবে তার প্রিয় স্ত্রীকে তার জীবন থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছি। মনে হচ্ছিল, যার জন্য আমি আমার প্রাণকে পাইনি সেই সৌম্য কেন সুখে সংসার করবে? সব জ্বা’লি’য়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। এই এক ভাবনা নিয়ে আমি তোমার ইরাবতীর মুখে এ’সি’ড মে’রে, তোমার সামনে তোমার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে ভ’য়া’ন’ক য’ন্ত্র’ণা দিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় দিতে চেয়েছিলাম।

তুমি যখন তোমার বাঁচা-ম’রা ইরাবতীকে নিয়ে দৌড়ে ডক্টরের কাছে যাচ্ছিলে, তখন আমার খুশি হওয়া উচিৎ ছিল, তাইনা সৌম্য? কিন্তু জানো, আমি না একটুও খুশি হতে পারিনি। কারণ যে তার স্ত্রীকে বাঁচাতে পা’গ’লের মতো হসপিটালে ছুটছিল, সে অন্যকেউ নয়,, আমার ছোট্ট ভাই সৌম্য। সেদিন মনে হলো, তোমাকে ম’র’ণ য’ন্ত্র’ণায় ফেলতে গিয়ে আমি নিজেই যেন ম’র’ণ য’ন্ত্র’ণার মাঝে হাবুডুবু খেতে লাগলাম।

তুমি ক’ষ্ট পাচ্ছিলে। আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। সব ভুলে সেদিন তোমার আগে আমি হসপিটালে পৌঁছে গেলাম। আড়াল থেকে সবকিছুর ব্যবস্থা আমিই করে দিলাম। যেন তোমার ইরাবতী অন্তত বেঁচে থাকে। তুমি একবার প্রশান্তির শ্বাস নাও। সেসময় আমি অ’স’হা’য় তুমিকে একদমই দেখতে চাইনি। তোমার স্ত্রী সুস্থ হয়ে গিয়েছিল, তাই না সৌম্য? তুমি কি জানো, তোমার ইরাবতীর সেদিন দু’ব্যাগ র’ক্ত লেগেছিল। কিন্তু সেই খবর তোমার কাছে পৌঁছানোর আগে র’ক্ত ডক্টরের কাছে পৌঁছে গেছিল। কারণ তোমার স্ত্রীর র’ক্তের গ্রুপ, আমার প্রাণের র’ক্তের গ্রুপ, আমার র’ক্তের গ্রুপ ছিল সেইম। দিয়ে দিলাম তোমার স্ত্রীকে দু’ব্যাগ র’ক্ত। সেসময় আমার মাথায় কিছুই ছিল না। তোমার মাঝ থেকে সামান্য বি’ষা’দ মুছে দিতে এটুকু কেন যেন করে ফেললাম আমি। নিজের প্রিয় মানুষ হা’রা’নোর য’ন্ত্র’ণা আমার চেয়ে আর কে বেশি বুঝবে, বলো? এমন ভাগ্য তো কারো হয়-ই নি। শুধু আমার হয়েছে। পো’ড়া কপাল আমার।

যাক সেসব কথা, সেদিনের পর থেকে আমি আর চাইলাম না তোমার বুক থেকে তোমার প্রিয় মানুষটাকে কে’ড়ে নিতে। এরপর আমি আর কখনো তোমার ইরাবতীর দিকে হাত বাড়াইনি। কিন্তু দূর থেকে তোমাকে দেখতাম। ভাবতাম, তুমি নিজের প্রিয় মানুষকে বুকে আগলে রাখার জন্য কত পা’গ’লা’মি কর, অথচ তোমার অধীর ভাইয়ার বুক থেকে তার প্রাণকে কে’ড়ে নিয়ে কি সুন্দর আরেকজনের হাতে তুলে দিয়েছো! খুব দুঃখ পেতাম জানো তো? ভীষণ রা’গ হতো তোমার উপর। বারবার শুধু একটি শব্দ-ই মস্তিষ্কে বা’জ’তো। ‘কেন আমার প্রাণকে আমার বুক থেকে কে’ড়ে নিলে সৌম্য?’ এই একটি লাইন বারবার ভাবতে গিয়ে তোমার প্রতি আমার স্নেহশীল হৃদয়ে আবারো ক্রো’ধ চাপতো। তোমার শখের বাড়ি কে’ড়ে নিলাম। তোমার চাকরি না হওয়ার হাজারটা ব্যবস্থা করলাম। তোমার টিউশনগুলোতে বিভিন্নভাবে বাঁধা প্রদান করলাম।

তোমার জীবন দুঃখে ভরে দিলাম। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করত, তোমাকে একেবারেই মে’রে ফেলি। বি’শ্বা’স’ঘা’ত’কদের আবার কে বাঁচিয়ে রাখে? কেউ রাখেনা। আমিও তোমার মতো বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ককে বাঁচিয়ে রাখবো না। সে ভাবনা নিয়ে আমি যতবার তোমাকে মা’র’তে এগিয়েছি, ততবার ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে এসেছি। কেন এমন হতো বলো তো? আমার তো তোমাকে মে’রে ফেলা উচিৎ ছিল তাইনা? অথচ আমি অধীর তোমাকে বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ক জেনেও তোমায় মে’রে ফেলতে পারিনি। কতশতবার সহ্যের সীমা ভেঙে তোমাকে মা’র’তে গিয়ে নিজের আবেগ-অনুভূতির কাছে হে’রে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি তার হিসাব নেই। অনেক চেষ্টা করেও সর্বশেষে তোমার হাতে শু’ট করতে পেরেছি। তোমার বুকে শু’ট করার ক্ষমতা আমার ছিল না সৌম্য। আহা মায়া! তোমাকে বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ক জেনেও তোমার অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারিনি।

সবশেষে জানলাম, গত ১৬ বছর যাবৎ আমি তোমাকে নিয়ে নিজের মাঝে যেসব ধারণা পুষেছিলাম সব মি’থ্যে। আমি দিনের পর দিন যার জীবন দু’র্বি’ষ’হ করে দিয়েছি, দিয়েছি একটার পর পর দুঃখ, যার জীবন থেকে সকল সুখ কে’ড়ে নিয়েছি, একসময় সেই মানুষটাই আমার জন্য হাউমাউ করে কেঁ’ললকলদে’ছে। কেঁ’দে’ছে আমার মি’থ্যে মৃ’ত্যুর খবর পেয়ে।

আমার মনে হলো, আসমান-জমীন সব যেন দু’ভাগ হয়ে গেল। তোমার অধীর ভাইয়া তোমাকে দুঃখ দিতে পারেনা, বরং তোমার অধীর ভাইয়া বেঁচে থাকলে তোমার আর তোমার বোনুকে দুঃখ ছুঁতে পারতো না বলে বিশ্বাস কর তুমি, অথচ তোমার অধীর ভাইয়াই তোমাদের জীবন দুঃ’খে ভরিয়ে দিয়েছে। কথাগুলো জানার পর আমার নিজেকেই খু’ন করে ফেলতে ইচ্ছে করছিল৷ চিন্তা করলাম, তোমাকে দেয়া আগের দুঃখগুলো হয়তো মুছতে পারবো না। কিন্তু নতুন করে আর দুঃখ দিলাম না। সেদিন রাস্তার ধারে তোমার সাথে কথা বলে বুঝেছিলাম, তুমি তোমার বন্ধুকে বেশ ভালোবাসো। যদিও তোমার বন্ধু তোমাকে কতটুকু কদর করে জানিনা। কারণ গত একবছর তোমার বন্ধু তোমার দুঃখের দিনের কথা জেনেও ইচ্ছে করে তোমার খোঁজ নেয়নি। নাহ্, তোমাদের মাঝে ঝামেলা সৃষ্টি করতে কথাটা বলিনি। শুধু অবাক লেগেছিল। কারণ আমি অধীর আমার বন্ধুর জন্য নিজের জান’টাই দিতে যাচ্ছি। আমার প্রাণপ্রিয় প্রাণকেও দিয়ে দিয়েছি। আর তোমার বন্ধু তোমার খোঁজটুকুই নেয়নি ইচ্ছে করে। আসলে সবসময় তার খোঁজ রাখতাম তো, তাই এটুকু খবর আমি জানতাম। তবে আমার কাছে বন্দি হওয়ার পর তোমার নাম-ই সবচেয়ে বেশি জপেছে তোমার বন্ধু। বিপদের সময় মনে করছিল আর কি!

যাক সেসব কথা,
তোমার প্রতি হওয়া অ’বিচার আমি আর বাড়ালাম না। তোমার বন্ধুকে বাঁচাতে আমি ছুটে গেলাম, যাকে আমি আমার গার্ডদের মে’রে নির্দেশ দিয়েছিলাম। আমি বুঝেছিলাম, তোমার জীবনে তোমার বন্ধুর গুরুত্ব অনেক। আমারও তো বন্ধু আছে৷ আমার এভিজান। যাকে দুঃখ দিতে না চেয়ে, যার জীবন ধ্বং’স করতে না চেয়ে আমার প্রাণকে পাওয়ার জন্য একটি শেষ চেষ্টা করেছিলাম মাত্র। আমি শুধুমাত্র তোমার কারণেই তোমার বন্ধুকে বাঁচিয়ে দিলাম। কিন্তু তোমাকে যখন বললাম, আমি তোমার বন্ধুকে মে’রে ফেলেছি তখন তুমি আমায় মা’র’লে। সৌম্য আমায় মা’রলো। যেই সৌম্য আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সংকোচবোধ করত সম্মানের জন্য। সেই সৌম্য আমার গায়ে হাত তুলল। আমি যা করেছি, এটুকু আমার প্রাপ্য আমি জানি। কিন্তু আমার ভীষণ ব্য’থা লেগেছিল, জানো সৌম্য? কারণ আমি মিথ্যে কারণে আমার ছোট ভাই সৌম্য’র হাতে মা’র খেয়েছিলাম। ভাবছ, মিথ্যে কেন বললাম? কি করব বলো? মিথ্যে না বললে তোমরা আমায় দয়া করে বাঁচতে দিতে। কিন্তু এর ফলে আমার প্রতি তোমাদের ঘৃ’ণা যে পাহাড় ছুঁয়ে যাবে। আমি তোমাদের এতো ঘৃ’ণার ভার কিভাবে সইতাম বলো? আমার যে আর শ’ক্তি অবশিষ্ট নেই সৌম্য। বেঁচে থাকতে কম তো দুঃখ পেলাম না! ম’রে গিয়ে যদি তেমাদের একটু করুণা পাই, সেটাই আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া হবে। হাজারটা না পাওয়া, অপূর্ণতার মাঝে তোমাদের করুণাটুকুই আমার সব পাওয়া হবে।

বাবার কাছে মিথ্যে খবর শুনেও আমি তাকে বিশ্বাস করিনি। আমি ভেবেছিলাম, আমার ছেট ভাই সৌম্য কখনোই আমাকে না বলে অন্যকোথাও চলে যাবে না। এভাবে আমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে না। আমাকে দেয়া কথা ভুলে যাবেনা। সে অবশ্যই আমার প্রাণকে আমার বুকে স্থান দিবে। কিন্তু আমি সেদিন ইংল্যান্ড থেকে সেই গ্রামে ফিরে সত্যিই আর তোমাদের পাইনি সৌম্য, গ্রামের সবার মুখে শুনেছিলাম, তুমি আমাকে পছন্দ কর না বলে বোনকে নিয়ে এই গ্রাম ছেড়েছ। আমি সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম, জানো সৌম্য? আমি এতো এতো মানুষের থেকে মিথ্যে কথা শুনে তখনো তোমাকে কোথাও একটা বিশ্বাস করতাম। তোমাকে কোথায় না কোথায় খুঁজে বেড়াতাম। বছরের পর বছর তৃষ্ণার্ত কাকের ন্যায় আমার প্রাণকে দেখার জন্য ছুটতাম। কিন্তু আমি পায়নি সৌম্য। যখন পেয়েছি ততদিনে আমি সবাইকে হারিয়ে ফেলেছি। খুব বাজেভাবে হারিয়ে ফেলেছি।

অনিচ্ছাকৃতভাবে বাবাকে মে’রে বাবার খু’নের দায়ে জে’ল খাটলাম। জে’ল থেকে বেরিয়ে দেখলাম, যাকে ছোট থেকে ভালোবেসে গেলাম, সে আমার প্রিয় বন্ধুর বউ প্লাস বাচ্চার মা। আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারিনা সৌম্য। আমার খুব ক’ষ্ট হয়, জানো? আল্লাহ কেন আমায় এতো বড় শা’স্তি দিল বলতে পারো? আমার এভিজানের ভাগ্যে কেন আমার প্রাণকে লিখল? আমি আমার প্রাণকে খুব চেয়েছিলাম আল্লাহ্’র কাছে। আল্লাহ্ কেন আমার ডাক শুনলো না সৌম্য?

যেসব কাজে সবচেয়ে বেশি দুঃখ, আল্লাহ্ বোধয় সেসব কাজ বেছে বেছে আমার ভাগ্যে লিখেছিল, আর তাই আমি বছরের পর বছর আমার প্রাণকে চাওয়ার পর, ফলাফলস্বরূপ দেখেছি, আমার প্রাণ আমার প্রিয় বন্ধুর বউ।
‘আমার এভিজানের বউ আমার প্রাণ। আমার এভিজানের বাচ্চার মা আমার প্রাণ।’
এই দু’টো বাক্য আমাকে এই দুনিয়াতেই কতশতবার যে জা’হা’ন্না’মে’র শা’স্তি ভোগ করিয়েছে তা আমি কাকে বোঝাবো? এভিজানকে দুঃখ না দিয়ে আমার প্রাণকে আমার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমার ১৬ বছরের ভালোবাসা হে’রে গিয়ে, এভিজানের পাঁচ বছরের ভালোবাসা জিতে গিয়েছে। ওদের এক করে এবার আমি এই য’ন্ত্র’ণা থেকে একেবারে মু’ক্তি চাই। শেষ এই ইচ্ছে, এই পৃথিবী থেকে মু’ক্ত হওয়ার আগে তোমাদের করুণাটুকু কুড়িয়ে নিতে চাই। আমি মা’রা যাওয়ার পর তোমরা কেউ আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না সৌম্য। আমি জীবনে কিছুই পাইনি জানো? এই একটি শেষ চাওয়া। তোমরা আমায় ফিরিয়ে দিওনা৷

অনুতাপের কারণে আমরা যে দুঃ’খটা পাই, সেই দুঃ’খ সব ক’ষ্টকে হাড় মানায়, জানো সৌম্য? আমার বাবা আমার সাথে মি’থ্যে মি’থ্যে খেলা খেলেছে জেনেও আমার যতটা ক’ষ্ট হয়নি, তার চেয়ে কয়েকহাজারগুণ বেশি ক’ষ্ট হয়েছে, যখন জেনেছি আমি অ’কারণে আমার প্রিয় ভাই সৌম্যকে আ’ঘা’ত করেছি। আমার ভাই সৌম্য’র জীবন দু’র্বি’ষ’হ করে তুলেছি। তার প্রিয় ইরাবতীকে তার থেকে কে’ড়ে নিতে চেয়েছি। আমার এসব কাজ আমাকে ভ’য়া’ন’ক অনুতাপের জ্ব’ল’ন্ত শিখায় ফেলে দিয়েছে সৌম্য। আমি তোমাকে আ’ঘা’ত করার সময় যতটা ক’ষ্ট পেতাম, তার চেয়ে হাজারকোটিগুণ বেশি ক’ষ্ট এখন পাচ্ছি। ক্ষমা আমি তোমার কাছে চাইবো না সৌম্য। কারণ আমি জানি আমি এসবের যেগ্য নই। আমি চাইবো, তুমি আমার প্রতি ঘৃ’ণার পরিমাণটুকু শুধু কমাও। আর করুণার পরিমাণটুকু বাড়াও। আর কিছু চাইনা আমার।

চিন্তা কর না, তোমার ইরাবতীর কিছুই হবে না। আমি জানি সে কন্সিভ করায়, তার লাইফ রিস্কে আছে৷ তবুও বলছি, চিন্তার কারণ নেই। আসলে যার হারায় তার শুধু হারায়-ই। এই যেমন দেখ, আমি। কিচ্ছু পাইনি জীবনে। মা, বাবা, ভাই, বোন, ভালোবাসার মানুষ, বন্ধু। কাউকে পাইনি। ভাগ্যের খাতায় যেটুকু দুঃখ, না পাওয়া অবশিষ্ট ছিল, সেটাও একভাবে ১৬ কলা পূর্ণ করে দিয়েছে আল্লাহ, আমার প্রতি তোমাদের প্রত্যেকের ঘৃ’ণার মাধ্যামে।
কিন্তু তুমি যখন তোমার ইরাবতীকে পেয়েছ, তখন আরও অনেক কিছু পাবে। আর হারাবে না। আমার কারণে যা হারিয়েছো। তা ফিরিয়ে দিচ্ছি আমি। তোমার গ্রামে গেলে দেখতে পাবে, তোমার জায়গায়, গত চার বছর আগে যে বাড়ি ছিল, আজ নতুন করে হুবহু সেই বাড়ি আবারো উঠেছে। তোমার ইরাবতীর জন্য ডেলিভারি প্লাস মুখের সার্জারীর ডক্টর ঠিক করে রেখেছি।

সময়মতো তারা তোমাদের কাছে পৌঁছে যাবে। তোমার জন্য গড়া ব্যবসা আবারো দাঁড় করিয়েছি। আর আমার প্রোপার্টির অর্ধেকটা তোমার অনাগত সন্তানের নামে লিখে দিয়েছি। তার বয়স ১৮ বছর হলে সে আইনগতভাবে সবকিছুর মালিক হয়ে যাবে৷ ভাবছ এসব কেন করলাম? তোমাকে যত দুঃখ দিয়েছি, সবকিছুর কাছে এসব তুচ্ছ। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি সৌম্য। আমি ভালোবাসা থেকে সব করেছি। জানি বিশ্বাস করবেনা। কারণ আমার দেয়া দুঃখ, আমার দেয়া আ’ঘা’ত তোমার মনে গেঁথে আছে। তবুও বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি সৌম্য। তোমাকে দুঃখ দিয়ে আমি কখনো ভালো ছিলাম না বিশ্বাস কর। তুমি আমার দেয়া জিনিসগুলো ফিরিয়ে দিওনা সৌম্য। আমার এই শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করে দিও। তোমরা দিনশেষে সবকিছুই পেয়ে যাচ্ছো, কিন্তু আমি অভাগা সব হারিয়েছি। তার এই শেষ ইচ্ছেগুলো পূরণ করবেনা সৌম্য? জানি করবে।

সেই ছোটবেলায় যেভাবে আদর আর ভালোবাসা মিশিয়ে আমাকে অধীর ভাইয়া ডাকতে, সেই একই সুরে তোমার মুখে একবার অধীর ভাইয়া ডাক শোনার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমার ভাগ্য আমাকে সাথ দিল না। পরিস্থিতি এমন হলো যে, তোমার গা’লি শুনতে হলো আমাকে, তোমার হাতে মা’র খেতে হলো, দেখতে হলো, তুমি আমাকে থুতু ছুঁড়ে দিচ্ছো। দুঃখ নেই। ম’রে গেলে তোমাদের করুণা পাবার আশায় এসব দুঃখ ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছি।
তোমার অনাগত সন্তানের জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। আমি আর থাকছি না। এবার তোমরা সবাই ভালো থেকো সৌম্য। আমার প্রাণ, আর আমার এভিজানের সংসার সাজাতে ওদের হেল্প করো। আমাকে করুণা করে হলেও মনে রেখো।
ইতি
তোমার অপছন্দের অধীর ভাইয়া
একপাতা ভর্তি কালো কালিতে লেখাগুলো পড়তে গিয়ে সৌম্য’র শ্বাস আটকে আসে। দু’চোখের পানি দ্বারা হাতের পাতা ভিজে একাকার। সৌম্য ছটফট করে উঠল। বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে বসল। বা হাতে বিছানার উপর রেখে ডান হাতে ধরে রাখা কাগজটিসহ হাত মেঝেতে ছেড়ে রাখলো।
আদালত থেকে বাড়ি ফিরলে ইরা তার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দেয়। জানায়, একজন লোক দিয়ে গিয়েছে। বলেছে, সৌম্য’র নামে চিঠি। আর কিছু বলেনি।

সৌম্য প্রথমে বুঝতে পারেনি চিঠি কোথা থেকে আসলো। কিন্তু যখন পড়তে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে তার দমবন্ধ হয়ে আসে। কারণ যে মানুষটার চিঠি সে পড়ছিল, সেই মানুষটা যে আর বেঁচে নেই। কত পাহাড়সম দুঃখ নিয়ে তাদের অধীর ভাইয়া এই দুনিয়া ছেড়েছে, এখন সে বুঝতে পারছে। কি করবে সে? কিচ্ছু করার নেই। সে অধীর ভাইয়ার দুঃখ না বুঝে উল্টে ভুল বুঝেছে। তাকে দেয়া দুঃখগুলো যে সব ফিকে হয়ে গেছে অধীরের দুঃখের কাছে। অধীর ভাইয়া তার মুখে আবারো ভালোবাসা দিয়ে সেই ডাক শুনতে চেয়েছিল। কিন্তু সৌম্য তার অধীর ভাইয়াকে আর কোথায় পাবে? সে যে এই দুনিয়ার বুকে আর নেই। চিরতরে হারিয়ে গেছে সে। তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ আজীবনের জন্য বন্ধ করে দিয়ে গেছে।
কথাগুলো ভাবতে গিয়ে হঠাৎ-ই সৌম্য ছটফট করে উঠলো। বড় করে শ্বাস ফেলতে লাগলো, যেন এখানটায় অক্সিজেনের বড্ড অভাব।

সৌম্য চিঠিটা যখন পড়ছিল, তখনই সৌম্যকে অস্বাভাবিক লাগছিল। এজন্য ইরা আস্তে আস্তে সৌম্য’র পাশ থেকে উঠে সৌম্য’র জন্য পানি আনতে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে এসে সৌম্যকে এমন করতে দেখে ইরা দ্রুত পা চালায়। ছয় মাসের পেট নিয়ে মেয়েটার চলাফেরা করতে ভীষণ অসুবিধা হয়, কিন্তু সৌম্য’র অবস্থা তার কাছে মোটেও ভালো লাগলো না। কাঁপতে কাঁপতে একপ্রকার দৌড়ে এসে সৌম্য’র পাশে বসে। হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“সৌম্য কি হয়েছে তোমার?”
সৌম্য বা হাতে বুক ডলে। চোখ দু’টো লাল হয়ে এসেছে। ঠিক করে শ্বাস নেওয়ার জন্য মোচড়ায় ছেলেটা। ইরা সৌম্যকে কোনোরকমে সামান্য একটু পানি খাইয়ে, সৌম্য’র বুকের বা পাশে ডলে আর অসহায় কণ্ঠে বলে,
“কি হয়েছে সৌম্য? সৌম্য?”

সন্ধ্যা আদালত থেকে সৌম্য’র সাথে সৌম্য’র বাড়ি ফিরেছিল। বিছানায় এক কোণায় চুপ করে শুয়ে ছিল। কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে গেছে মেয়েটা। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। ইরার কণ্ঠ পেয়ে তার ধ্যান ভাঙে। ব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে ভাইয়ের অপর পাশে এসে বসে। সৌম্যকে ছটফট করতে দেখে সন্ধ্যা সৌম্য ডান হাত ধরে কান্নামাখা গলায় ডাকে, “ভাইয়া?”

সৌম্য অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বিড়বিড় করে। যা পুরোপুরি ইরা, সন্ধ্যার কানে যায় না। ইরা কেঁদে দিয়ে বলে,
“সৌম্য? কোথাও যেও না আমাকে রেখে। আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই। তোমার রাজকন্যা না দেখে পালিয়ে যেও না। সন্ধ্যা দেখো না তোমার ভাইয়া এমন করছে কেন!”
সন্ধ্যা সৌম্য’র হাতে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে করুণ কণ্ঠে বলে,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯

“আল্লাহ্ আর একটি অঘটন ঘটালে, প্রথমে আমি আমার সৃজনকে মে’রে ফেলবো, আর তারপর নিজে ম’রে যাবো। আমি বোধয় এই জীবনযুদ্ধে হে’রে গেলাম ভাইয়া। আমাকে তোমরা সবাই ক্ষমা কর।”
সৌম্য’র বন্ধ বাম চোখের কোণ ঘেঁষে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। বুকের ব্য’থায়

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০