আমির হাওলাদার পর্ব ৩
ইলমা বেহরোজ
মিরাজের কপাল বরাবর একটা ছিদ্র হয়ে গেল। কোনো শব্দ করার সুযোগ পেল না। জড় পদার্থের মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। হাতের বন্দুকটা মেঝেতে ঘষা খেয়ে ছিটকে গেল দূরে।
সালাহউদ্দিন পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেলেন। তার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে মিরাজের রক্তের কয়েকটা ছিটা এসে লেগেছে। তিনি চোখ বড় বড় করে একবার মেঝেতে লুটিয়ে পড়া লাশের দিকে, আরেকবার শান্ত ভঙ্গিতে পিস্তল নামিয়ে রাখা আমিরের দিকে তাকাচ্ছেন। দুটো দৃশ্যের কোনোটাই তার মাথা ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারছে না।
আমির পকেট থেকে সিল্কের রুমাল বের করে ধীরেসুস্থে পিস্তলের নলটা মুছল। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলল, ‘চমকে গেলেন মন্ত্রী সাহেব? শালার জন্য মায়া হচ্ছে? নাকি পিএস-এর জন্য?’
সালাহউদ্দিন এবার উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কত বড় দুঃসাহস তোমার! তুমি আমার সামনে আমার বাসায় কাকে খুন করেছ? ও আমার শ্যালক! ও এই সরকারের…’
‘ও একটা ইঁদুর ছিল। যে ইঁদুর আপনার গোডাউনের তলা ফুটো করে সব ধান অন্যকে পাচার করছিল। আপনার ফাঁসির দড়ি বুনছিল।’
সালাহউদ্দিন থমকে গেলেন। রাগের দাউদাউ আগুনটা নিভে গিয়ে জায়গা করে নিল তীব্র সংশয়।
আমির কাউকে ডাকল। সঙ্গে সঙ্গে দরজার বাইরে থেকে পনেরো বছরের এক কিশোর ঘরে প্রবেশ করল। পরনে ঢিলেঢালা শার্ট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটা জীর্ণ চামড়ার ব্যাগ। বয়স কম হলেও তার চোখ দুটো বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত!
নবাব ব্যাগ থেকে কিছু কাগজ আর একটা অডিও ক্যাসেট বের করে সালাহউদ্দিনের সামনে টেবিলের ওপর রাখল। নিচু কণ্ঠে বলল, ‘গত তিন মাস ধরে মিরাজ সাহেব আপনার বিপক্ষ দলের নেতার সাথে প্রতি বুধবার রাতে গোপনে দেখা করছেন। এই যে দেখুন, আপনার ব্যক্তিগত লকারের ডুপ্লিকেট চাবি বানানোর রসিদ। আর এই ক্যাসেটটা একবার শুনুন।’
আমির ইশারায় পাশের ক্যাসেট প্লেয়ারটা দেখাল। সালাহউদ্দিন দ্বিধাগ্রস্ত হাতে প্লে বোতাম টিপলেন। ফিতার ঘড়ঘড় শব্দের পর মিরাজের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘চিন্তা করবেন না, দুলাভাইয়ের সব গোপন নথিপত্র আমি সময়মতো পৌঁছে দেব। ওনার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
সবগুলো নথি দেখে সালাহউদ্দিনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি যেন নিজের চোখের সামনে নিজের রাজনৈতিক মৃত্যু দেখতে পেলেন। দেশের এই উত্তাল সময়ে এই ধরনের নথি ফাঁস হওয়ার অর্থ কেবল একটাই… নিশ্চিত পতন। বহু বছরের পরিশ্রমে গড়া রাজত্ব, একটা কাপুরুষের বিশ্বাসঘাতকতায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারত।
সালাহউদ্দিন ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। আমির শিরদাঁড়া টানটান করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দুঃসাহস দেখানোর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী মন্ত্রী সাহেব৷ মিরাজকে তো আপনি নিজেই খুন করতেন, যদি এই প্রমাণগুলো আগে দেখতেন। আমি শুধু নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আপনার কাজটা একটু এগিয়ে দিলাম। এখন আপনার কাজ এই আবর্জনা পরিষ্কার করা। আর আমার পাওনা টাকাটা কাল বিকেলের মধ্যে পৌঁছে দেয়া। আজ আসি, আসসালামু আলাইকুম।’
আমির আর নবাব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সালাহউদ্দিন প্রায় পাঁচ মিনিট পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে রইলেন। তার ভেতরে কোনো শোক নেই, বেইমানদের জন্য শোক জন্মায় না। বরং ধীরে ধীরে তার ধমনীতে প্রবাহিত হতে শুরু করল অপমানের স্রোত।
মিরাজ বিশ্বাসঘাতক ছিল, সত্য। মিরাজ তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, সেটাও সত্য। কিন্তু আমিরের মতো একজন পেশাদার অপরাধী, একটা নিকৃষ্ট সন্ত্রাসী তার ড্রয়িংরুমে ঢুকে তার আত্মীয়কে গুলি করবে, আর যাওয়ার বেলায় স্বয়ং মন্ত্রীকে হুকুম দিয়ে যাবে কাল বিকেলের মধ্যে টাকা পৌঁছে দিতে? এই ঔদ্ধত্য সালাহউদ্দিন তারিকের অহংবোধে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধতে লাগল।
তিনি রাগে-ক্ষোভে টেবিলের ওপর রাখা দামী ক্রিস্টালের অ্যাশট্রেটা তুলে সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারলেন। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। ওই বান্দির বাচ্চা কি নিজেকে খোদা ভাবতে শুরু করেছে?
ওর অহংকার আর ওর ব্যবসার ভিত্তিপ্রস্তর উপড়ে ফেলা দরকার। আমিরকে আঘাত করতে হলে তার প্রতিপক্ষর হাত ধরতে হবে।
সালাহউদ্দিন টেলিফোনের ডায়াল ঘোরালেন। ওপাশে এমপি বজলুল হক ফোন ধরতেই তিনি কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি কাজের কথায় এলেন। বজলুলের প্রশাসনিক যোগাযোগ আর সীমান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ আমিরের ব্যবসার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। সেই হিসেবেই তাকে এই ষড়যন্ত্রের অংশীদার হবার প্রস্তাব দেন।
তারপর মন্ত্রীর নির্দেশে রাতেই এক গোপন দূতের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলো আমিরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত, আঁধারের ভেতরে অদৃশ্য সাম্রাজ্য গড়ে তোলা মাফিয়া ডন, কালা জাহাঙ্গীর। সালাহউদ্দিন সিদ্ধান্ত নিলেন এখন থেকে আমিরের বদলে কালা জাহাঙ্গীরের কাছ থেকেই অস্ত্র নেবেন। এতে দুটি কাজ একসাথে হবে। প্রথমত, আমিরের চার চালানের বকেয়া টাকা সে আর কোনোদিন পাবে না; দ্বিতীয়ত, কালা জাহাঙ্গীরের শক্তি বৃদ্ধি করে আমিরকে চিরতরে মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়া যাবে৷
ঘরের কোণে মিরাজের লাশ তখনও পড়ে আছে। সালাহউদ্দিন একবারও সেদিকে তাকালেন না। মৃতের জন্য সময় নষ্ট করার বিলাসিতা তার নেই। দাবার বোর্ডে এবার রাজা বদলানোর সময় এসেছে। সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।
নবাব বাইরে এসে চশমাটা আঙুল দিয়ে ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘টাইটান, মন্ত্রী কি চার চালানের বকেয়া টাকাটা ফেরত দেবে? লোকটার চোখমুখ কিন্তু ভালো ঠেকছিল না।’
আমির তখন গাড়ির পেছনের সিটে গা এলিয়ে দিচ্ছিল। সে আলস্যভরা চোখে নবাবের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, ‘তোর কী মনে হয়?’
নবাব তার বিশ্লেষণ শুরু করল, ‘না। টাকা উনি দেবেন না। সালাহউদ্দিন তারিক অনেক পুরনো খেলোয়াড় হতে পারেন কিন্তু তার অহংকার হিমালয়ের চেয়েও বড়। নিজের বাসায়, নিজের চোখের সামনে শ্যালককে খুন হতে দেখা…গলার নলি কাটার চেয়েও বড় অপমান। টাকা দেওয়ার বদলে উনি এখন অন্য চাল চালবেন।’
আমির হাসল। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। নবাবকে একদিন এক ভয়াবহ বলাৎকারের হাত থেকে উদ্ধার করে নিজের আস্তানায় ঠাঁই দিয়েছিল। রাস্তার ধুলোবালি থেকে সে অনেককেই তুলে এনেছে নিজের স্বার্থে, নিজের শক্তিবৃদ্ধির জন্য। সাধারণ নিয়ম হলো, যার কেউ নেই সে তার আশ্রয়দাতার অন্ধ গোলাম হয়ে ওঠে। কিন্তু নবাব আলাদা। এই অল্প বয়সে ওর দূরদর্শিতা আর পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা আমিরের মতো দুর্ধর্ষ মানুষকেও অবাক করে। নবাব শান্ত, বুদ্ধিমান, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সে পশুর মতো হিংস্র হতে পারে।
আমির বলল, ‘কী চাল চালবে বলে তোর ধারণা?’
‘উনি কালা জাহাঙ্গীরের সাথে হাত মেলাবেন। আপনার কাছ থেকে অস্ত্র নেওয়া মানে প্রতিটা চালানে আপনার দাপটকে কুর্নিশ জানানো। সালাহউদ্দিন আর সেটা সইবেন না। উনি এখন কালা জাহাঙ্গীরকে মাঠে নামাবেন আমাদের পাল্টা শক্তি হিসেবে। সস্তা দরে অস্ত্র নিয়ে জাহাঙ্গীরকে দিয়ে আমাদের রুটগুলো চারদিক থেকে চেপে ধরার চেষ্টা করবেন।’
আমির নবাবের পিঠ চাপড়ে দিল। একটা পনেরো বছর বয়সী ছেলের মাথায় এতটা হিসাব কষার ক্ষমতা বিরল।
নবাব বলল, ‘আমরা এখন কী করব, টাইটান? কালা জাহাঙ্গীর এমনিতেই আমাদের রুটগুলো দখল করার সুযোগ খুঁজছে।’
আমির কোনো জবাব দিল না। তার দৃষ্টি চলে গেল জানালার বাইরে দ্রুতবেগে মিলিয়ে যাওয়া গাছপালার দিকে।
পথে অফিসের সামনে গাড়ি থামাতেই আমির নেমে পড়ল। আলমগীরকে দেখা মাত্রই সরাসরি কাজের কথায় চলে গেল, ‘শেখের জন্য যে দুটো মেয়েকে আনা হয়েছে, তাদের মধ্যে কারো নাম কি নিলুফার?’
আলমগীর একটু অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিল, ‘নাম তো এখনো জানা হয়নি। আমি এখনই লোক পাঠিয়ে জেনে নিচ্ছি।’
‘জেনে দ্রুত আমাকে জানাও।’
আলমগীরের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ নাম জানতে চাইছিস কেন?’
‘আমার সন্দেহ হচ্ছে, ওই মেয়ে দুটোর মধ্যে পদ্মজার কলেজ বন্ধুটা থাকতে পারে।’
আলমগীর চমকে উঠে বলল, ‘সেকি! নাকের ডগায় একটা তিল যে ওই মেয়েটা?’
আলমগীরের চোখেও দুশ্চিন্তা ঘনীভূত হতে লাগল। যে গোডাউনে মেয়ে দুটোকে খাঁচাবন্দি করে রাখা হয়েছে, আমির সেখানে কিছুক্ষণের জন্য গিয়েছিল। লোহার গ্রিলের ছিদ্র দিয়ে তারা কি আমিরকে দেখে ফেলেছে? যদি ওখানে সত্যিই নিলুফার থেকে থাকে আর সে যদি আমিরকে না দেখে থাকে, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হলেও হতে পারে। কিন্তু যদি দেখে থাকে?
মাথার ওপর সূর্য তখন ঠিক মাঝ আকাশে। বারান্দায় পা রাখতেই এক ঝলক তপ্ত বাতাস হু হু করে এসে পদ্মজার অবাধ্য আঁচলটা উড়িয়ে নিল। বাইরের খা খাঁ রোদে দূরে কোনো একটা ঘুঘু একঘেয়ে সুরে ডেকে চলেছে।
হানি খালা রেলিং ধরে সামান্য ঝুঁকে নিচের দিকে তাকালেন। কাঠফাটা রোদে গ্যারেজে রাখা আমিরের দুটো দামি গাড়ি আয়নার মতো চকচক করছে। রোদ ঠিকরে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিচ্ছে। সেই উজ্জ্বলতার দিকে তাকিয়েই তিনি হুট করে গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, ‘হা রে পদ্মজা, জামাই তোকে ভালোবাসে তো? ঠিকঠাক যত্ন করে? বড়লোকদের কিন্তু চরিত্র ভালো হয় না।’
পদ্মজা শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথায় তুলে জবাব দিল, ‘জি খালামণি, বাসে।’
হানি পদ্মজার কাছে এগিয়ে এসে গলার স্বর নামিয়ে অভিজ্ঞ মানুষের মতো বললেন, ‘শোন মা, প্রথম কয়েক বছর সবাই মাথায় তুলে রাখে। রূপ যতই থাকুক, জামাই যতই চোখে হারাক পুরুষ মানুষের মন কিন্তু বেশিদিন এক জায়গায় থিতু হয় না। এদের মন হলো চৈত্র মাসের বাতাসের মতো। অন্য কোনো ফুলের সুবাস পেলেই হঠাৎ দিক পাল্টে ফেলে।’
পদ্মজার দুচোখে অস্বস্তির ছায়া পড়ল। হানি বলতে থাকলেন, ‘তাবিজ টাবিজ আছে তো ঘরে? শকুনিরা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ঘর সামলাতে শুধু ভালোবাসা দিয়ে কুলায় না। আমি তোকে দুটো তাবিজ এনে দেব, বিছানার নিচে কিংবা আলমারির কোণে লুকিয়ে রাখিস। যেন জামাইয়ের মন কোনোদিন অন্যদিকে না ঘোরে, আর কোনো বাইরের কুদৃষ্টি যেন তোর সাজানো সংসার তছনছ করতে না পারে।’
পদ্মজা মাথা নাড়ল, যদিও তার মন এসব মানতে সায় দিচ্ছিল না। ভেতরে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে দিলেন হানি। পানদানিটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে দক্ষ হাতে সুপুরি কাটতে কাটতে বললেন, ‘আমার কথাগুলো আজ তোর কাছে তেতো মনে হতে পারে, কিন্তু দুনিয়াটা আমি তোর চেয়ে বেশি দেখেছি। পুরুষ মানুষ হলো খোলা আকাশের চিল। এরা বাড়িতে ফেরে শুধু ডানা জিরোতে, কিন্তু এদের শিকারি নজর সবসময় থাকে দূরের কোনো ক্ষেতের দিকে।’
পদ্মজা এবার প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, ‘সবাই তো আর এক রকম হয় না খালামণি। আপনাদের জামাই অফিস শেষ করে এক মুহূর্ত দেরি করে না, সোজা বাড়ি চলে আসে।’
হানি এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। পানের পিচকিরি ফেলার আগে বললেন, ‘ওইটাই তো ওদের কৌশল রে পাগলী! যখন দেখবি হঠাৎ বেশি বেশি সোহাগ দেখাচ্ছে, তখনই বুঝবি মনের ভেতর কোনো চোর লুকিয়ে আছে। আমার পাড়ার মোতালেবকে দেখতিস যদি! দিনরাত বউয়ের জন্য শাড়ি-গয়না আনতে আনতে ঘর ভরে ফেলত, অথচ তলে তলে পাশের গ্রামের এক বিধবার সাথে তার ঠিকই রসের পিরিত চলছিল।’
তিনি পানের বাটা থেকে চুন নিয়ে পানে মাখতে মাখতে আবার শুরু করলেন, ‘এখন তোর রূপ আছে, শরীরে যৌবন আছে। যেদিন একটু ভাটা পড়বে, সেদিন বুঝবি। পুরুষ মানুষ মৌমাছির মতো। যতক্ষণ ফুলে মধু আছে ততক্ষণই ভনভন করবে। মধু ফুরালে অন্য বাগানে উড়াল দিতে এদের এক মুহূর্ত সময় লাগে না। এই যে এত সুন্দর বাড়ি, এই বাড়িতে অন্য কেউ এসে আস্তানা গাড়বে না, তার গ্যারান্টি কী?’
পদ্মজা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপনি একটু বেশিই ভাবেন খালামনি। উনি আমাকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন।’
‘সম্মান!’ হানি একটু হেসে দ্বিতীয় পানটা মুখে পুরলেন। বললেন, ‘পুরুষ মানুষের সম্মানের দাম বাজারের পচা পটলের চেয়েও কম। ওসব হলো ওপরের প্রলেপ। তলে তলে কী পলিটিক্স চলে তা তুই বুঝবি না। এজন্যই বলছি, সাবধানে থাকিস। বেশি বিশ্বাস করিস না। সবসময় হাতে কিছু টাকা জমিয়ে রাখবি, জামাইকে না জানিয়ে। আর ওই যে তাবিজের কথা বললাম, সেটা হলো আগাম বাঁধ। বাঁধ না দিলে বন্যায় ঘর ভেসে গেলে কান্নাকাটি করে আর লাভ হবে না।’
পদ্মজা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল। হানি খালার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি এদিকে। মেয়ের বাসায় এলেই এই বাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য উঠেন। উঠেই শুরু হয় যত কথার ঢল, পুরুষ মানুষ নিয়ে নানা রকম হিসাবনিকাশ।
‘তুই ছেড়ি সহজ-সরল, ঘরের কোণে পড়ে থাকিস। তোর জামাইয়ের যে এত বড় অফিস, সেখানে তো আর শুধু পুরুষরা কাজ করে না। এখন তো দিনকাল পাল্টাচ্ছে, কত ঢঙি মেয়ে অফিস-আদালত করে। প্যান্ট-শার্ট পরা মেমসাহেব সেজে চোখের সামনে দিয়ে যখন তারা ঘুরঘুর করবে, তখন কি আর ঘরে থাকা বউয়ের কথা মনে থাকে? চোখে চোখ পড়লে শয়তান মনে কুমন্ত্রণা দিতে কতক্ষণ!’
‘উনি অন্যরকম।’
‘ছেড়ি, অন্ধবিশ্বাস করবি না। বুদ্ধি খাটাবি। জামাই অফিস থেকে ফিরলে শার্টের কলার একটু শুঁকে দেখবি, অন্য কোনো সুগন্ধি পাওয়া যায় কি না। রুমালটা দেখবি। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে নজর রাখবি, জামাই যখন গেট দিয়ে ঢোকে, পাড়ার কোনো মেয়ের দিকে একটু বেশি হেসে তাকায় কি না। হাসি থেকেই তো কাশির শুরু রে মা! মানুষের মন হলো মাটির হাঁড়ি, টোকা লাগলেই ফেটে যায়।’
পদ্মজার কপালে চিন্তার রেখা দেখে হানি খালা তৃপ্তির হাসি হাসলেন। বললেন, ‘ভয় দেখাচ্ছি না রে পদ্ম, বুদ্ধি দিচ্ছি। আগাম সাবধান থাকা ভালো। আর শুধু নজরদারি করলেই হবে না। পুরুষ মানুষকে হাতের মুঠোয় রাখার আসল জাদু হলো সোহাগ। তার শরীর আর মন দুটোই তোর দখলে রাখতে হবে। দেখিস যেন সে কোনোদিন অতৃপ্ত মনে ঘর থেকে না বেরোয়।’
পদ্মজা এবার লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রইল। হানি শাসনের সুরে বললেন, ‘লজ্জা পেলে চলবে না পাগল। তোর মা নাই, খালা হয়ে আমাকেই তো তোকে বোঝাতে হবে। দিনের বেলা জামাই অফিসের বস হতে পারে, কিন্তু রাতে যেন শুধু তোর গোলাম হয়েই থাকে। এমন আদর দিয়ে ভরিয়ে রাখবি।’
মনা ঘর থেকে উঁকি দিচ্ছে দেখে পদ্মজা মিনমিন করে বলল, ‘বাদ দেন না খালামনি।’
‘বাদ দেব কেন? আমি কি ভুল কিছু বলছি? বেশি বেশি আদর দিবি। আদরের চোটে এমন পাগল করে রাখবি যেন অন্য কোনো নারী তার সামনে এসে দাঁড়ালেও সে তোকে ছাড়া আর কিছু চোখে না দেখে। পুরুষকে ভোলাতে হয় রূপ আর সোহাগ দিয়ে। রূপ তোর আছে, তাতে সন্দেহ নাই। সোহাগটা লাগবে। ওই যে বললাম তাবিজের কথা, ওইটা হলো বাইরের ঢাল, আর তোর আদর হলো ভেতরের শেকল। এই দুটো ঠিক থাকলে কোনো শকুনি নজর তোর সংসারে ছিদ্র করতে পারবে না।’
পদ্মজা আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল।
আরও কতক্ষণ সন্দেহ আর আদর-সোহাগের ফিরিস্তি দিয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে অবশেষে বেরিয়ে গেলেন হানি। পদ্মজা সদর দরজাটা আটকে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাঁচা গেল!
তারপর গোসলখানায় ঢুকে নিচু কাঠের পিঁড়িটায় বসল। শরীরে প্রথম মগ পানিটা ঢালতেই সর্বাঙ্গে শীতল শিহরণ বয়ে গেল। তার মেঘের আস্তরণের মতো ঘন, কোমর সমান কৃষ্ণবর্ণের চুল। একা হাতে এই বিপুল কেশরাশির যত্ন নেওয়া দুঃসাধ্য লড়াইয়ের মতো। কেউ একটু সাহায্য করলে শরীর ও মন দুই-ই জুড়ায়। মনাকে অনেকক্ষণ আগে বলে রেখেছে আসার জন্য, কিন্তু ফাঁকিবাজ মেয়েটার এখনো দেখা নেই। নিশ্চয়ই বসার ঘরে টিভির নেশায় মজেছে। বিরক্তি নিয়ে পদ্মজা গলা উঁচিয়ে ডাকল, ‘মনা! মনা, কোথায় তুই?’
খানিক বাদেই দরজার ওপাশে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। পদ্মজা ভাবল আপদটা এলো বুঝি। কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য মুখটা ফেরাতেই তার কথা আটকে গেল গলার কাছে। এ তো মনা নয়, আমির!
আমির খালি গায়ে, কাঁধে একটা ধবধবে সাদা তোয়ালে ঝোলানো। সে দরজার চৌকাঠে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের সাথে শরীরটা সঁপে দিয়ে বিমোহিত নয়নে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর দিকে। কয়েক বছরেও এই দৃশ্যটা আমিরের কাছে একটুও পুরনো হয়নি; বরং প্রতিবারই নতুন নেশার মতো হানা দেয়।
পদ্মজার দুধে-আলতা শরীরে পানির কণাগুলো মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে, ভোরের স্নিগ্ধ শিশিরে ভেজা কোনো এক রাজকীয় শ্বেতপদ্ম তার পাপড়ি মেলে বসে আছে।
আমির দুচোখে মুগ্ধতা নিয়ে উচ্চারণ করল, ‘সুবহানাল্লাহ!’
পদ্মজা অভ্যাসবশত অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে ভেজা শাড়ির আঁচলটা টেনে কাঁধ ঢেকে নিল। জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কখন এলেন?’
আমির পদ্মজার একদম কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এমন করে নিজেকে লুকাচ্ছ যেন আমি তোমার বর নই, পরপুরুষ।’
আমিরের তপ্ত নিশ্বাস পদ্মজার ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়তেই সে ঘাড় ফিরিয়ে চোখ তুলে তাকাল। বলল, ‘পরপুরুষের মতোই তো তাকান।’
আমির হেসে ফেলল। পদ্মজার ঠিক পেছনে রাখা অন্য একটা পিঁড়িতে বসল। তার শক্তপোক্ত হাত দুটো আলতো করে এগিয়ে গেল পদ্মজার মাথায় বাঁধা বিশাল খোঁপাটার দিকে। শান্ত গলায় বলল, ‘এই তো মাত্রই ফিরলাম। মনার মুখে শুনলাম তুমি গোসলে ঢুকেছ, সুযোগটা হাতছাড়া করি কী করে? চলে এলাম।’
পদ্মজা প্রতিবাদ করে বলল, ‘আপনি যান তো! মনাকে পাঠিয়ে দিন, ও-ই পারবে।’
আমির উত্তর না দিয়ে খুব সাবধানে খোঁপার কাঁটাগুলো একে একে খুলে ফেলল। মুহূর্তেই ঘন কৃষ্ণবর্ণের চুলের গোছা ঝরনার অবাধ্য স্রোতের মতো পদ্মজার পিঠ ছাপিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। আমির এক মগ পানি নিয়ে পদ্মজার মাথায় ঢালল। শীতল জলের ছোঁয়া তালুতে লাগতেই পদ্মজার ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমির হাতের তালুতে শ্যাম্পু নিয়ে চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, ‘মনে মনে তো চাইছো আমি থাকি।’
‘আপনি একটু বেশিই জানেন!’
‘ভয় পেও না, বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছি, কিছু চাইব না।’
‘আমি বিনিময় দিতে ভয় পাই না।’
‘তাই নাকি? চাইব?’
পদ্মজা আর কথাই বলল না। আমির খুব যত্ন নিয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে পদ্মজার মাথার তালুতে ম্যাসাজ করে দিতে লাগল। পদ্মজা একসময় নরম স্বরে বলল, ‘অনেক সময় লাগবে, আপনার হাত ব্যথা করবে। ছেড়ে দিন।’
‘ওতো জলদি আমির ক্লান্ত হয় না ম্যাডাম।’
পদ্মজা ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে নিথর হয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ আগেই যার হাত দুটো এক পশলা তপ্ত রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই হাতগুলোই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল মমতায় প্রিয়তমার চুলে বিলি কাটছে। কী অদ্ভুত এই বৈপরীত্য! এক হাতে ধ্বংসের তান্ডব, অন্য হাতে সৃষ্টির সেরা সৌন্দর্যকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। আমিরের ভেতরকার হিংস্র নেকড়েটা পদ্মজার সান্নিধ্যে এসে যেন এক শান্ত পোষা হরিণে পরিণত হয়েছে। যদি সময়টা থমকে যেত!
হঠাৎ একটা আতঙ্ক আমিরের হৃদপিণ্ডকে খামচে ধরল। পদ্মজাকে হারানোর ভয়টা ইদানীং তাকে ছায়ার মতো তাড়া করে ফেরে। কাস্টমস কমিশনার তার নারী পাচারের গোপন নথিগুলো গুছিয়ে ফেলেছে; যেকোনো মুহূর্তে সব সত্য সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে সামনে আসবে। যদি এই ঝড় সে থামাতে না পারে? পদ্মজার চোখে নিজের বীভৎস রূপটা আড়াল করতে সে এ পর্যন্ত কত অভিনয় করেছে, কত লাশ ফেলেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কেবল এই একটি মানুষকে হারানোর ভয়ে আমির একাই এক নরক গুলজার করে রেখেছে।
চুলের ফেনাগুলো স্বচ্ছ জলের ধারায় ধুয়ে পরিষ্কার হতেই আমির হঠাৎ পদ্মজার ভেজা মাথাটা নিজের একটা বলিষ্ঠ বাহুতে সজোরে চেপে ধরল। পদ্মজা খানিক অবাক হলেও নিজেকে সরিয়ে নিল না। আমিরের আকস্মিক অস্থিরতা তাকে বিচলিত করল। সে ঘুরে বসে আমিরের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে শুধাল, ‘কী হয়েছে আপনার?’
আমির কোনো উত্তর দিল না। পদ্মজার ভেজা চুলে চুমু খেয়ে বিড়বিড় করল, ‘কিছু না। কিছুক্ষণ এভাবেই থাকো।’
পদ্মজা আমিরের বাহুডোরে নিশ্চুপ হয়ে রইল। আমিরের খালি গায়ের তপ্ত উষ্ণতা তার ভেজা শাড়ির শীতলতাকে ছাপিয়ে অদ্ভুত আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীরে। এই আগুন বড় পবিত্র, বড় কাঙ্খিত। পদ্মজা এক হাত আমিরের প্রশস্ত বুকে রাখল। হাতের তালুতে অনুভব করল হৃৎস্পন্দনের অস্থির ধুকপুকানি।
আমির বলল,‘আমার ভালোবাসায় কোনো মিথ্যে নেই পদ্মবতী।’
পদ্মজা কৌতূহলী চোখে তাকাল। সংশয় নিয়ে বলল, ‘হঠাৎ এসব কেন বলছেন? কী হয়েছে?’
‘ভয় হচ্ছে।’
‘কিসের ভয়?’
‘তোমাকে হারানোর।’’
‘আপনাকে ছেড়ে আমি কোথায় হারাব?’
আমির পদ্মজার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কসম খোদার, হাজারটা পাপের ভিড়ে তোমাকে পাওয়াটাই আমার জীবনের একমাত্র পুণ্য। আমার আর কোনো পূণ্য নেই।’
পদ্মজা আমিরের উষ্ণ, প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে একটু দুষ্টুমির ছলে বলল, ‘মাঝেমধ্যে যে আপনার কী হয়! এই যে এতো গদগদ প্রেম দেখাচ্ছেন, এসব কিন্তু বেশিদিন থাকে না।’
আমির এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ‘কী বললে?’
‘গদগদ প্রেম!’ পদ্মজা মিটিমিটি হেসে বলল।
‘আমার প্রেম ফুরিয়ে যাবে বলছ?’
‘হু, অফিসে অত সুন্দর সুন্দর মেয়ে মানুষ থাকলে ঘরের বউয়ের প্রতি টান একসময় কমেই।’
আমির তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল। পদ্মজা বলল, ‘আপনার তো দুপুর দুটোয় ফেরার কথা ছিল, এখন তো তিনটে বাজে। রাস্তায় কি খুব জ্যাম ছিল, নাকি অন্য কোথাও থেমেছিলেন?’
‘জ্যাম কোথায়! অফিসের নিচে মোতালেব চাচার দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম।’
পদ্মজা আমিরের বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে প্রশ্ন করল, ‘সেই দোকানে কি শুধু পুরুষরাই চা খায়? নাকি অন্য কেউও আসে? আপনার অফিসের সুন্দরী নতুন মেয়েটা, সেও কি ওখানেই চা খেতে আসে?’
আমির একটু অবাক হয়ে ভাবল, তারপর বলল, ‘কার কথা বলছ? নীলিমা? ও তো চা-ই খায় না।’
পদ্মজা বুক থেকে মাথা তুলে ঈর্ষায় ফুলেফেঁপে উঠে বলল, ‘ও যে চা খায় না, সেটাও আপনার জানা?’
আমির এবার উচ্চস্বরে হেসে ফেলল।
পদ্মজার নাক টেনে দিয়ে বলল, ‘মিটিংয়ের সময় ও নিজেই বলেছে, আমি আর দশজনের মতো শুধু শুনেছি।’
পদ্মজা দায়সারা উত্তর দিল, ‘ওহ, আচ্ছা। বিশ্বাস করলাম না।’
আমির এবার পদ্মজার থুতনি ধরে মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ কি হানি খালা এসেছিল?’
পদ্মজা উত্তর দিল না। মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। তাহলে সত্যি ওই কুটনীতিবিদ হানি খালা এসেছিল! এই মহিলা যেদিনই আসে, পদ্মজার সহজ-সরল মনে সংসারের বিষাক্ত কূটনীতি আর সন্দেহের বীজ বুনে দিয়ে যায়। মনে মনে গালি দিল আমির, ‘বজ্জাত মহিলা।’
সে পদ্মজার চিবুকটা নাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার কি হিংসে হচ্ছে? আচ্ছা, তুমি চাইলে কালই মেয়েটাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেব।’
পদ্মজা একটু থমকাল, তারপর আমিরের ভেজা বুকে আঙুল বোলাতে বোলাতে নরম স্বরে বলল, ‘থাক, লাগবে না। মিছেমিছি মেয়েটার চাকরি যাবে, কত ভোগান্তিতে পড়বে কে জানে!’
আমির দরাজ গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তা তোমার সেই মহাজ্ঞানী হানি খালা আর কী কী বিষ ঢালল কানে? শুনি একটু।’
‘বলল যে দুটো তাবিজ এনে দেবে। বিছানার নিচে আর আলমারিতে লুকিয়ে রাখতে। যেন আপনার ওপর কোনো শকুনি নজর না পড়ে, আর আমাদের এই সাজানো সুখের সংসারে যেন কেউ আগুন দিতে না পারে।’
আমির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। পদ্মজাও নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে ওঠল। শত চেষ্টা করেও সে নিজের মুখে কৃত্রিম অভিমান ধরে রাখতে পারল না।
আমির হাসি থামিয়ে পদ্মজার দুই গালে নিজের বড় বড় হাত দুটো রেখে নাকে নাক ঘষে গাঢ় স্বরে বলল, ‘কোনো তাবিজ লাগবে না৷ তাবিজ ছাড়াই আমার এই হৃদয়, আমার হাসি, আমার অনুভব তোমার নামে প্রথম কেঁপে উঠেছিল। ঠিক যেভাবে তোমার প্রথম লজ্জা, প্রথম শিহরণ আর প্রথম হৃদস্পন্দন শুধু আমার নামেই হয়েছিল।’
বলতে বলতে আমিরের হাসিটা আচমকা মিলিয়ে গেল। তার কপাল কুঁচকে উঠল, চোখের মণি দুটো হয়ে উঠল তীক্ষ্ণ। সে হঠাৎ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, ‘আমিই প্রথম পুরুষ যার জন্য তুমি প্রথম লজ্জায় লাল হয়েছিলে?’
প্রশ্নের এমন অতর্কিত ধরনে পদ্মজা থমকে গেল। সে আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে বলতে যাচ্ছিল, ‘আর কে হবে…’
বাক্যটা শেষ করার আগেই তার অবচেতন মন তাকে টেনে নিয়ে গেল কয়েক বছর আগের এক ধূসর অতীতে। চোখের সামনে ভেসে উঠল সুদর্শন লিখন শাহ। মনে পড়ে গেল সেই প্রথম পাওয়া নিষিদ্ধ চিঠির কথা!
পদ্মজার কথার মাঝপথে আকস্মিক থমকে যাওয়াটা আমিরের চোখ এড়াল না। সে শীতল কণ্ঠে বলল, ‘থামলে কেন পদ্মজা? ‘আর কে হবে’ বলে কার কথা মনে পড়ল তোমার? গলার ভেতর তো একটা নাম আটকে গেল মনে হচ্ছে। নামটা বেরোচ্ছে না কেন?’
পদ্মজা একরাশ ব্যথা আর আর্তি নিয়ে আমিরের দিকে তাকাল। অতীতে কোনো প্রেম ছিল না, কোনো গভীর অনুরাগও ছিল না। ছিল কেবল এক কিশোরী মনের সামান্য কৌতূহল। যে মেয়েটির ত্রিসীমানায় কোনো পুরুষ কোনোদিন পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে সুদর্শন লিখন শাহের প্রেমের চিঠিটা কিশোরী পদ্মজাকে অদ্ভুত শিহরণ দিয়েছিল। সে বারবার চিঠিটা পড়েছিল, আনমনে হেসেছিল। সেখানে কোনো পাপ ছিল না, ভালোবাসা তো বহুদূর! কিন্তু আজ আমিরের সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সেই ছোট্ট স্মৃতিটাই যেন এক বিশাল অপরাধ হয়ে ধরা দিল।
আমিরের বুকের ভেতরটা তখন রাগে, যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠছে।
আমির হাওলাদার পর্ব ২
পদ্মজার চোখের অস্বস্তি…স্মৃতির গভীরে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তাকে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। লিখন শাহ পদ্মজার হৃদয়ে থাক বা না থাক, সে যে পদ্মজার স্মৃতির একটা অংশে ভাগ বসিয়ে রেখেছে, তার প্রথম লজ্জার ভাগিদার হয়েছে এই সত্যিটা আমিরকে কুরে কুরে খেতে লাগল৷ মুহূর্তেই আমিরের মেজাজটা সপ্তমে চড়ে গেল। তার ভেতরে হিংস্র পুরুষটা জেগে উঠল, যে তার প্রিয়তমার সামান্যতম অংশও অন্য কারো সাথে ভাগ করে নিতে রাজি নয়।
সে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। রূঢ় স্বরে বলল, ‘শাড়ি পাল্টে ভালো করে চুল মুছে নাও, ঠান্ডা লেগে যাবে।’
বলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।
