Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮
সুরভী আক্তার

মেঘা কপালে বিস্তর ভাঁজ ফেলে চোখ সরু করে তাকায় । একবার রৌদ্রের দিকে , তো আরেকবার জুসের গ্লাস টার দিকে ‌। না বুঝে নির্বোধের ন্যায় অস্পষ্ট বলে….
” করলার জুস ?
” জানিস না , সিলি গার্ল । মুখের টেস্ট টাই বিগড়ে দিলি আমার । ইয়াককক্ , কি বাজে ঝাল !
” কি বলছেন ? করলার জুস কেনো হতে যাবে ? মামনি তো নিজে আমাকে এটা আপনাকে দিতে বললো । উনি আপনাকে করলার জুস খাওয়াবেন কেনো ? চুপ চাপ খেয়ে নিন তো । গ্লাস ফাঁকা করুন..
রৌদ্র রেগে যায়….

” হোয়াট ননসেন্স … মম দিয়েছে এটা ? ইডিয়ট , মজা পেয়েছিস ? আমি ঝাল খেতে পারি না , মম ভালো করেই জানে । আর এই করলা ? ছ্যাহহ্ !!
মেঘাও দাঁত কিড়মিড়িয়ে পূর্ণ চোখে তাকিয়ে বললো গমগমে স্বরে…
” তো পারেন না তো আমি কি করবো ? আমি খেতে বলেছি আপনি খাবেন , ব্যাসস ! তাড়াতাড়ি ফিনিস করুন । ঘুম পাচ্ছে আমার , আমি ঘুমাবো গিয়ে । ফাঁকা গ্লাস নিয়ে বেরোবো ঘর থেকে ।
” ফাঁকা গ্লাস চাইলে আজ আর বেরোতে হবে না , থেকে যা । এই যে বিছানা , বাম পাশে উঠে শুয়ে পড় ‌।
মেঘা বিরক্তি নিয়ে চোখ কুঁচকালো । জিদ্দি খেয়ে বললো….
” রাইনো মুখো , সবসময় বাজে কথা বলবেন না । খেয়ে নিন না ! মামনি খেতে বলেছে আপনাকে ।
রৌদ্র চোখ সরু করে । পরখ করে একবিংশীকে । মেঘার চোখ নিভিয়ে আসছে । ঘুমোনোর সময় হয়ে এসেছে ওর । বুকের কাছে দুহাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে মেঝের দিকে চিবুক নামিয়েছে রমনী । রৌদ্রের এমন উদ্যম শরীর দেখতে অনাগ্রহী সে ।
পড়নে কালো টপস্ আর খয়েরী স্কার্ট । ওরনা পেঁচিয়েছে গলায় । রৌদ্রের সেদিনের ধমক আর থাপ্পরের পর থেকে ওরনা গায়ে জড়াতে ভোলে না মেয়েটা ।
রৌদ্র আনমনে মুচকি হাসলো । মেঘা প্রথম বার জেদ ধরে কিছু একটা করতে বলেছে ওকে । নিজে থেকে উবে এসেছে ওর ঘরে । তেতো স্বাদই সই । তবুও মেয়েটার মন রক্ষা করলে মন্দ কিসে ? রৌদ্র আর ভাবলো না । গ্লাস টা হাতে তুলে নিয়ে মুখ সিটকে তাকালো । কেমন গা গুলিয়ে আসছে দেখেই । বড্ড তেতো আর ঝাল । ও তো ঝাল খেতে পারে না ।
শেষ বার মেঘা কে দেখে বললো….

” আমি যদি এটা খাই তাহলে তুই খুশি হবি ?
মেঘা বেঘোরে দাঁত কেলিয়ে বলে….
” ভীষণ ,, খেয়ে নিন না তাড়াতাড়ি ।
রৌদ্র ওর দিকে দৃষ্টি রোপণ করে । ঘৃণা ছুড়ে ফেলে অদূরে । এক মুহুর্ত বিলম্ব না করে এক নিঃশ্বাসে এক চুমুকেই ঢকঢক করে খালি করে পুরো গ্লাস । সবটা গলাধঃকরণ হলেও শেষের ঢোক যেনো আটকালো গলায় । গলা পিছলে নিচে নামতে চাইলো না আর ।
কোনো রকমে শ্বাস রুখে জোর পূর্বক গিললো সেটুকু । অতিরিক্ত ঝালে মস্তিষ্ক সুদ্ধ দপদপ করে জ্বলে উঠলো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ন্যায় ।
সহসা হা করে মুখ কুঁচকে নিলো রৌদ্র । ঝুলে আসলো শক্ত চোয়াল । পুরো মুখ সহ গলাটা তেতো স্বাদের চোটে রি রি করে উঠলো । উল্টে আসলো ভেতর থেকে ।
তামাটে হয়ে আসলো পুরো চেহারা । গ্লাস রেখে পিছিয়ে যায় রৌদ্র । ভেতর থেকে উগলে বেরিয়ে আসতে চায় সবটা । চোখ মুখ উল্টে বুকে হাত রেখে শ্বাস টানে । তেতো স্বাদ টা অতিরিক্ত প্রভাব না ফেললেও ঝাল টা বেশ জোরছে লেগেছে । হাঁসফাঁস করলো সে । ঝালে মস্তিষ্ক দিক দিশা খুইয়ে সম্পুর্ন চিত্ত ছটফট করে উঠলো । তিক্ত স্বরে ধমকে উচ্চারণ করলো বেখেয়ালে….

” ইডিয়ট , পানি নিয়ে আয় ।
মেঘা অবাক । চোখ উঁচিয়ে হতভম্ব হয়ে দেখলো এ বেলায় । সত্যিই করলা আর কাঁচা মরিচের জুস ছিলো ওটা ? সে তো এখনো সন্দিহান । রুবিনা কাবির কেনো এসব খাওয়াতে যাবেন তার ছেলেকে ?
মেঘা রৌদ্রের নাটক ভেবে পাত্তা দিলো না । ওরনা উড়িয়ে গা ছাড়া ভাবে এক কদম এগিয়ে ফাঁকা গ্লাস টা হাতে নিলো । চলে আসতে চাইলো খপ করে টেনে ধরলো রৌদ্র । চোখ মুখ লালচে হয়ে উঠেছে ওর । কান দিয়ে যেনো গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে ।
কপালের পাশের শিরা উপশিরা ফুলে ফেপে দৃশ্যমান ।
” কোথায় যাচ্ছিস , পানি চাইছি না ? নিয়ে আয় প্লিজ ! আমি ঝাল খেতে পারি না । ঝাল লেগেছে খুব ।
মেঘা এবার নিছক চিন্তা দূরে সরালো । লোকটার বেগতিক অবস্থা বুঝে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো…
” এমন করছেন কেনো ? সত্যিই এটা করলার জুস ছিলো ?
” উফফফ, ইডিয়ট ! মিথ্যে বলবো কেনো তোকে ?
হাত ছেড়ে পিছিয়ে খাটে বসেছে রৌদ্র । ঘামছে দড়দড় করে । উন্মুক্ত শরীর কেমন ঠিকড়ে লাল হয়ে উঠেছে । মেঘা ভয় পেলো । তড়িঘড়ি করে টেবিলের উপর থেকে জগ সহ গ্লাস নিয়ে এসে বাড়িয়ে দিলো রৌদ্রের দিকে । পর পর কয়েক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেলো রৌদ্র । তেতো ভাবটা কমে আসলেও ঝালের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমলো না । মুখ জ্বলছে ভীষণ । চোখ রক্তিম হয়ে উঠেছে । পানির দেখা মিললো কার্নিশে ।
ওষ্ঠদ্বয় ফাঁক করে এলোমেলো শ্বাস ফেলছে হাঁসফাঁস করে ।
একটু শান্ত হতেই মেঘা ভীত নয়নে তাকিয়ে বললো….

” ঠিক আছেন ? ঝাল কমলো ?
রৌদ্রের প্রত্যুত্তর না পেয়ে থেমে আবারো বললো….
” আমি সত্যিই জানতাম না এটা করলার জুস ছিলো । মামনি তো বললো এটা আপনাকে খাওয়াতে । আমার দোষ নেই বিশ্বাস করুন । এতো ঝাল খেতে গেলেন কেনো আপনি ?
রৌদ্র একস্থির দৃষ্টিতে চেয়ে । ফোঁস ফোঁস করে অস্থিরতা সংবরনের চেষ্টা করছে ।
মেঘা ওকে স্থির দেখে আর ঘাটলো না । সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো নিচু স্বরে….
” আপনি বসুন , আমি মামনি কে গিয়ে বলছি । খিদে পেয়েছে তো ? খাওয়ার নিয়ে আসবে মামনি !
মেঘা সরে দাঁড়ানোর আগেই রৌদ্র ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালো । এতক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ করতে পারলেও আর পারলো না । এক মুহুর্তের ব্যবধানে একবিংশীর অনুচ্চ দেহ খানা এক টানে আছড়ে ফেললো নিজের প্রসস্থ বুকের মাঝ বরাবর । মেঘা ভড়কায় । চোখ তুলে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই ঘটে যায় আরেক বিপর্যয় । যাতে একেবারেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে জমে যায় রমনী ।
আকস্মিকই আলতো করে রমনীর ওষ্ঠাধরে আপন খড়খড়ে ওষ্ঠ যুগল চেপে ধরে রৌদ্র । চোখ গোল গোল করে ফেলে মেঘা । আজ খুব কাছ থেকে অনুভব করে রৌদ্র কে । লোকটা চোখ বুজে নিয়েছে । মেঘা পাথরের ন্যায় জমে যায় আলতো স্পর্শেই ।

পরক্ষনে রৌদ্রের কর্তৃক বাড়ে । বেসামাল হয়ে ওষ্ঠাধরের অতলে তলাতে গেলে ছটফট করে ওঠে একবিংশী । দুহাতে ঠেলে ধরে রৌদ্র কে । এতেও কাজ হয় না । গুড়িয়ে আসে মেয়েটা । রৌদ্র ওর কোমর চেপে ধরেছে এক হাতে । অন্য হাতে মেঘার হাত দুখানা আটকে নিয়ে চেপে ধরলো নিজের বুকের নিকট । উন্মত্তের ন্যায় আধিপত্য জোরালো করলো । প্রথম দিকের সামান্য পরশ টুকুর গভীরতা বাড়লো আপনা আপনি । খেই হারিয়েছে যুবক । মেয়েটার কোমর জড়িয়ে নেওয়া বাঁধন শক্ত থেকে শক্ততর হলো নিমিষেই । প্রথম পরশেই একবিংশীর ওষ্ঠাধরের মিঠে নির্যাস শুষে নিতে মরিয়া হয়ে উঠলো সে । ঝালের তোপে নাজেহাল , এই অবস্থা সামলাতে গিয়ে আরো নাজেহাল হয়ে পড়লো । হাত ছেড়ে চেপে ধরলো রমনীর কাঁধের কাছটায় ‌। আরো বেশি আঁকড়ে নিতে চাইলো নিজের অন্তরালে ।

মেঘার শ্বাস কমে আসে । ছাড় পায় না মেয়েটা । এক পর্যায়ে সহ্য করতে না পেরে সুপ্ত অনুভূতির বিশালতায় আপনা আপনি আঁখি দ্বয়ের দীঘল পাপড়ি নিভিয়ে নেয় ।
তার চোখের কিনারে উঁকি দিয়েছে চিকচিকে জল কনা । অক্ষি লতা একেক বার কুঁচকে আসছে , তো একেক বার অনুভুতির জোয়ারে শিথিল হচ্ছে । এই যেনো হৃদয় ধড়ফড় করছে , আবার এই যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছে । প্রথম কোনো পুরুষের এমন স্পর্শ পেলো সে । পুরুষ টা হালাল হলেও, এটা ছিলো অপ্রত্যাশিত । রমনীর সর্বশক্তি খুইয়ে আসে । গুড়িয়ে যায় পুরো কোমলাঙ্গ । নিথর হয়ে পড়ে সে । রৌদ্র আপন শক্তিতে রমনীর কোমর জড়িয়ে না রাখলে এক্ষুনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়তো একবিংশী । হাত পায়ে কাঁটা দিয়েছে । অনুভূতির মাপদন্ডে হৃৎস্পন্দন বাড়ার কথা হলেও থেমে গেছে এ বেলায় ।
রৌদ্র কে রুখতে নারাজ তার শক্তি । নিজের সাথেই বেইমানি করলো ওর হাত দুটো । কিছুতেই এক ধাক্কায় লোকটাকে দূরে সরাতে পারলো না । বরং খামচে ধরে আঁকড়ে নিলো আরো বেশি । এতেই সায় পেলো লোকটা । কর্তৃক বেড়েই চললো ।

সময় পেরোলো মিনিট কয়েক । রমনীর সর্বাঙ্গ রক্তিম হয়ে ওঠে । টুকটুকে ফর্সা চেহারা ধারন করে রক্ত বর্ন । শ্বাস নেই বুকে । একটু খানি শ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করে এবার । চোখ খোলে তড়াক করে । রৌদ্র তখনো মত্ত । এ দুনিয়ায় তার বিচরণ নেই । তার বিচরণ রমনীর তুলতুলে গোলাপ বর্ন অধরের অন্তরে ।
মেঘা ছটফট করে । পূণরায় শক্তি জুগিয়ে ছোটাছুটি করে দুহাত । বিঘ্নিত হয় রৌদ্রের কর্মকাণ্ড । গাঢ় ভাঁজ ফেলে চোখ মেলে সে । মেঘার অনুনয় সূচক ভেজা ভেজা চোখ দেখে ধক্ করে ওঠে । সম্বিত ফিরতেই দ্রুত মেঘার ওষ্ঠাধর ছাড়ে সে । ইঞ্চি কয়েক দূরত্ব বাড়ায় ‌। ছাড় পেতেই চিবুক নামিয়ে বুক ফুলিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগলো মেঘা । আর একটু হলেই দম ফুরিয়ে আসছিলো । মরে যাচ্ছিলো যেনো ।
কতটুকু কি অনুভুত হলো কে জানে ? বুক কাঁপছে তার । হৃৎপিণ্ড ওঠানামা করছে তীব্র গতিতে । রৌদ্রের উদ্যম বুকের কাছটায় নখ চেপে চোখ বুজে দীর্ঘ কয়েক দম টানলো ।
ততক্ষণ সরু চোখে রৌদ্র পরখ করলো ওকে । নিজেও ডুবেছিল মায়াজালে । হঠাৎ করে কি করে বসলো , নিজেও বুঝে উঠতে পারে নি । হয়ে গেছে হুট করে ।

এবার তো এই ইডিয়ট ক্ষেপে যাবে ! কি বলে সামলাবে রৌদ্র ? ওর সুডৌল কাঁধ ছাড়লো সে । কোমরের বাঁধন আলগা করলো । মেঘা এখনো হাঁসফাঁস করছে । সর্বাঙ্গ কাঁপছে তিরতির করে । রৌদ্র বেশ অনুভব করছে তার আপন নারীর উন্মাতাল ছন্দের কম্পন । চোখে এখনো ঘোর ‌। উষ্ণ আবেশে নিমজ্জিত ।
সামলালো নিজেকে । মেঘার দম টানার মাঝেই বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো….
” সরি সুইটহার্ট , ঝাল একটু বেশিই ছিলো । মিষ্টি কিছু প্রয়োজন ছিলো ঝাল কমানোর জন্য ।
ব্যস ,,, সম্বিত ফিরে পায় রমনী নিজেও । ঝট করে চোখ তুললেই দু জোড়া ঘনীভূত দৃষ্টির মিলন ঘটে । ছলকে ওঠে রমনী । চোখ বৃহৎ করে এক ধাক্কা দেয় সজোরে । পিছিয়ে যায় রৌদ্র । মেঘা আরো কয়েক কদম ছিটকে পিছিয়ে চিৎকার করে ওঠে…..

” ইউ রাইনো ,,, এটা কি করলেন আপনি ?
” কিস ! ফার্স্ট কিস ! উমমম , নাইস টেস্ট । নট ব্যাড ! লোকে ভুল বলে না । বরং কম বলে !
নিচের অধরে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে স্লাইড করে ফিচেল হাসে রৌদ্র । কিড়মিড় করে মেঘা । জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গেলা মাত্রই অদ্ভুত তিক্ত স্বাদে মুখ বিকৃত হয়ে আসে । ওষ্ঠ ভেঙে উল্টে ফেলে । হাত উঠে যায় অধরের উপর । কেমন তিতকুটে ঝাল স্বাদ পেলো জিভে । গা গুলিয়ে আসলো মেঘার । তিক্ততা গলায় নামা মাত্রই শরীর খিচে ইয়াক্ করে উঠলো….
” ছিঃ , কি তেঁতো !
” কোথায় তেঁতো ? মিষ্টিই তো আছে ! তিক্ত , ঝাল , এন্ড লাস্ট সুইট । উমম , কম্বিনেশন টা জোস ছিলো । বাট,, লাস্টের মিঠে স্বাদ টা একটু বেশিই সুইট ছিলো । আরেকটু টেস্ট করে দেখি..?
যেনো আবদার করলো । ভ্যাট ভ্যাট করে তাকালো মেঘা । পরক্ষনে কটমট করলো । চোখ মুখ পাকিয়ে ঝাই ঝাই করে উঠলো….

” অসভ্য , নির্লজ্জ , বেহায়া, ইরিটেটিং ম্যান…..
নিজের সীমা ছাড়াচ্ছেন আপনি !
ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে হাসে রৌদ্র । এক কদম বাড়িয়ে ফিচেল কন্ঠে বলে….
” আমার সীমা আমাকে শেখাতে আসিস না জান পাখি । আমি আমার সীমার মাঝেই পা বাড়াই নি এখনো । অতিক্রম করা তো অনেক দূর । তোর মাঝে থেকেই আমার সীমান্ত বহুদুর বিস্তৃত । সারাজীবন সেই সীমান্ত ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও হোদিশ মিলবে না ।
মেঘা ফোঁস করে ওঠে ।
ধীরে ধীরে দরজা বরাবর পেছায় । লোকটার উদ্দেশ্য ভালো নয় । এগোচ্ছে আবার । জড়িয়ে যায় মেঘা । ঘন ঘন ঢোক গেলে । রাগ স্পষ্ট চেহারায় , ভেতরে ভয় জড়তা । লোকটার চাহনিও কেমন এলোমেলো ঘোলাটে । কোন কুক্ষনে যে মেঘা এ ঘরে আসতে গেলো ! আর জীবনেও আসবে না ।
ওকে ভড়কে দিয়ে শব্দ করে গা দুলিয়ে হাসে রৌদ্র । আজ মদ খায় নি । মেঘা কে কন্ট্রোলে নিতে বাহানা দেখিয়ে হাসি থামিয়ে বলে কেমন মাতাল স্বরে….

” ওওও সানি ,,, সরি ! আ’ম ড্রাংক । মদ খেয়েছি তো , তাই কিছু মাথায় নেই ! কি করলাম একটু আগে ? ওও হ্যাঁ , চুমু খেলাম ! মদ খেয়ে এসে ভুল করে চুমু খেয়েছি তোকে । তবে তুই আমার বউ , এটুকুর অধিকার রাখি আমি । বউকে চুমু খেলে ভুল কিছু হয় না । ভুল করে আরো সঠিক কিছু করে ফেলার আগেই এখান থেকে যা , নয়তো সঠিক কিছু করে ফেলবো এক্ষুনি ।
মেঘার কান মাথা রি রি করে ওঠে । পুরো শরীর ঝি ঝি ধরার ন্যায় ঝমঝমিয়ে ওঠে । লোকটা খুব বাজে । আসলেই ঠোঁট কাটা নির্লজ্জ । আর জীবনেও ও এই লোকের সামনে আসতে পারবে না । পিছু ফিরে পা উদ্যত করে কিড়মিড়িয়ে চেঁচায় রমনী…..

” আআআআআআ রাইনো মুখো ।
আপনাকে ছাড়বো না আমি ।
সে দৌড়ে বেরিয়ে যেতেই আবারো শব্দ করে হাসলো রৌদ্র । চোখ নামিয়ে মেঝেতে রাখলো । তর্জনী দিয়ে অধরের উপর আলতো করে আঙ্গুল বুলিয়ে আনমনে হাসলো একাধিক বার । এবার নীরব মৃদুমন্দ হাসি ।
অতৃপ্ত সে আজ কিছুটা তৃপ্ত । হুট করে ঘটানো নিজের কর্মকাণ্ডের উপর প্রসন্ন । এভাবে হুটহাট অযাচিত কিছুর মাধ্যমে প্রশান্তি পেলে মন্দ হবে না ।

আজ অফিসের কাজের ফাঁকে লাঞ্চ ব্রেকে ক্যান্টিনে বসেছে ইকরা । মুখোমুখি আবিদ । মেয়েটা একটুও ইতস্তত নয় । বরং রেগে আছে মনে হচ্ছে । আবিদ শুল্ক ঢোক গিললো । এই মেয়ের মতিগতি বোঝা যায় না । গত কদিনে চোখ তুলেও তাকায় নি ওর দিকে । কত বার পথ রোধ করে কথা বলার চেষ্টা করেছে আবিদ , এড়িয়ে গেছে ইকরা । মুখ গম্ভীর সেদিন থেকেই । কি হলো , কি সিদ্ধান্ত নিলো , কে জানে !
আজ এই মেয়ে নিজে আবিদ কে ডেকেছে । মিনিট পাঁচেক ধরে এভাবেই মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে আছে দুজনায় । ইকরা চোখ তুলে তাকায় নি এখনো । এতে আবিদের সুবিধার কমতি নেই , সে বরং চোখ ভরে নিষ্পলক দেখতে পারছে এই গুরুগম্ভীর রমনীকে । বড্ড মায়া দিয়ে বানানো হয়েছে এই নারীকে । নতুবা এতোটা আকর্ষণ থাকতে পারে কিভাবে ?
হঠাতই চোখ তুললো ইকরা । অমনি চোখাচোখি হলো দুজনের । তড়িতে থতমত খেলো লোকটা । চোখ নামিয়ে নিলো সহসা । রমনী পূরু কন্ঠে জানতে চাইলো সোজাসুজি….

” কি দেখছিলেন ?
” আপনাকে !
” আমাকে এভাবে দেখার মতো কিছু নেই !
” উহু , অনেক কিছু আছে । যা আপনার কল্পনাতেও নেই । আমার চোখ অনেক কিছুই দেখে আপনার মাঝে ।
” যেমন ?
” আপনার এই মায়াভরা মুখটাই ধরুন । সেটা মারাত্মক ।
ইকরা পাশ ফিরে চায় । আসল কথায় আসে….
” আপনাদের তো নিজস্ব বিজনেস আছে । এখানে চাকরি করার মানে কি ?
” মানে নেই , স্বার্থ আছে । যেটা আপনার সাথে জড়িত । নিহিত আপনার মাঝে ।
” কবে থেকে চেনেন আমায় ?
” বছর দুয়েক !
ইকরা অবাক হলো । দৃষ্টি পূরু করে বললো….
” দেখেছেন কোথায় ?
” রাস্তায় !
” কখন ? কিভাবে ?

” সন্ধায় , রাস্তা পার হচ্ছিলেন বোধহয় । মনে করুন , আজ থেকে এক বছর নয় মাস তেরো দিন আগে কোনো এক গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়েছিলেন । সৌভাগ্যবশত সেই গাড়ির মালিক আমি ছিলাম ।
ইকরা মনে করে । আসলেই মনে পড়ে যায় । একদিন তাড়াহুড়োয় রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা গাড়ির মুখোমুখি পড়েছিল । সময় সংকুলানে গুরুত্ব দিতে পারে নি সেদিন । মনে পড়তেই তৎক্ষণাৎ বলে….
” সৌভাগ্যবশত বলছেন এটাকে ?
” সৌভাগ্য নয় কি ? আপনাকে দেখেছি তো সেভাবেই । ভাগ্যিস ধাক্কা খেয়েছিলেন । আর খেয়েছিলাম প্রেমের ধাক্কা । বিশ্বাস করুন, এক ধাক্কায় প্রেমে পড়েছিলাম আপনার ! ইন্টারেস্টিং না ?
” হাস্যকর !
” সে যাই হোক । আমার বলতে দ্বিধা নেই , আই লাভ ইউ ইকরা । আমি সেদিন হতেই ভালোবাসি আপনাকে ! কখনো সেভাবে প্রকাশের সুযোগ পাই নি । যখন আপনাদের বিষয়ে জানলাম , তখন বাঁধা পড়ে গেছে সব অনুভূতি । ফেরানো বড্ড দায় হয়ে পড়েছে । আর ছাড়তে পারবো না আপনাকে ।
” আমাকে ধরতে গিয়ে পরিবার ছাড়বেন ? এতোটা সোজা ?

” একেবারে তো পরিবার ছাড়ছি না । আচ্ছা বলুন তো , একটা মেয়ে যখন বিয়ে করে শশুর বাড়িতে যায় , তখন কি সে তার পরিবার পুরোপুরি ছেড়ে দেয় ? আমিও তো ছাড়বো না । উল্টোটাই হোক আমাদের ক্ষেত্রে । এবার না হয় একজন পুরুষ পরিবার ছাড়লো । আপনাদের বাড়িতে জায়গা হবে না আমার ? মাসে পঁচিশ দিন আপনার সাথে থাকবো । সপ্তাহে একবার করে না হয় বাপের বাড়িতে যাবো ! না মানে রাত্রি যাপন করার জন্য । সেদিন কিন্তু আমার ছুটি চাই ।
আনমনে হাসি আসে ইকরার । বেশ মজার লাগলো শেষের কথাটা । ঠোঁটের কোণে ভিড় জমায় হাসি টুকু । নিমিষেই তা মুছে ফেলে । লোকটা রসিক বটে ।
আবিদ বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলো ওর হাসি টুকু । অবাক স্বরে বলল….
” ইকরা , আপনি হাসছেন ?
” না….
” কি সিদ্ধান্ত নিলেন ?

” আমার সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তা নেই আবিদ । আমি চাই না কোনো মায়ের কোল খালি হোক । আমার জীবন টা কেমন হবে , না হবে – সেটা আমি অনেক আগেই গুছিয়ে রেখেছি ।
” নতুন করে গোছাই চলুন । সাহায্য করবো আপনাকে । আপনি বললে সব হবে । প্লিজ ফেরাবেন না আমায় !
ভীষণ অনুনয় মাখা কন্ঠ । ইকরা পুরো চোখে তাকায় লোকটার চোখের দিকে ।
কাল আজমিরা বেগম ওকে কসম দিলেন , যার বিপরীতে যেনো এই বিয়েটা করে ও । শিশির ও নাকি রাজি । ইকরা কথা বলেছে ওর সাথে । রাগারাগীও করেছে । শিশির কিচ্ছুটি বলে নি । ওর এই বিয়েতে আপত্তি নেই । আজমিরা বেগম ওকে বুঝিয়েছেন , তা ইকরার বুঝতে বাকি নেই । ওর জন্য ওর বোনটা নিজের জীবন বলি দেবে ?
” আচ্ছা , আপনার ভাই কেমন ? তাকে তো জানা নেই ।
ভড়কায় আবিদ ! পাল্টা শুধোয়…

” কেনো ?
” আপনার মা তো শর্ত দিয়েছেন , শিশির কে তিনি নিজের ঘরে রাখতে চান । তবেই তিনি এই বিয়েতে রাজি হবেন !
” আমি কি ধরে নেবো আপনি এই বিয়েতে রাজি ! আপনি রাজি হলে আর কারোর পরোয়া নেই আমার । শিশির কে জড়াতে হবে না । কেবল আমাদের বিয়েটাই হবে ।
” কিন্তু আপনার মা ?
” তাকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার ।
ইকরা একটু ভাবুক ভঙ্গিতে মুখ মলিন করলো । আবিদ থেমে ডাকলো ….
” ইকরা ?
” হু ।
চকিতে উত্তর । লোকটা সন্দিহান হয়ে জানতে চায় ।
” তার মানে আমাদের বিয়েটা হচ্ছে ? বউ হচ্ছেন আপনি আমার ?
প্রশ্ন শুনে চোখ নামায় মেয়েটা । একটু লাজুক আভার দেখা মেলে মুখশ্রী জুড়ে । এতেই বুক ভরে যায় আবিদের । নীরব উত্তর বুঝতে বাকি রয় না । হেসে ওঠে উৎকণ্ঠায় ।

বিকেল গড়িয়েছে । মেঘা কাল থেকে রৌদ্রের মুখোমুখি হয় নি আর । সকালে নিচে নামে নি । ঘর ছাড়ে নি । ঘরে থাকলেও দরজা আটকে রেখেছিল । রৌদ্র চোরের মতো উঁকি ঝুঁকি দিয়েছিলো । একবিংশীর ইতস্ততা বুঝে ওকে জ্বালাতন করে নি আর ।
কাল ঘোরের কবলে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে । যদিও খুব বেশিই নয় ‌। যা করেছে , তার অধিকার হলফ করে অর্জন করেছে সে । কিন্তু এক বারেই ডাবল ডোজ হয়ে গেছে । হবে নাই বা কেনো ? সেদিন যদি ঐ ইডিয়ট জড়িয়ে ধরতে দিতো , তাহলে কাল দ্বিতীয় বার এতো বড় ঝটকা খেতো না ‌। এক বারেই দুটো ডোজ পড়ে গেছে ।

রৌদ্র বাড়ি ছেড়েছে সেই সকালে । মেঘা ছিলো না বিধায় ব্রেকফাস্ট করে নি ।
এখন বিকেল গড়াতেই ছাদে একলা উঠেছিলো মেঘা । কিছু একটা মনে পড়তেই ঝটপট নিচে নামলো । বিকেলের সময় । কেউ কেউ ঘুমোচ্ছে । রুবিনা কাবির জেগে । ড্রইং রুমে বসে সোফার কুশনে কভার লাগাচ্ছেন তিনি । টিভি চলছে সামনে । ক্ষণে ক্ষণে নজর দিচ্ছেন টিভির স্ক্রিনে । মেঘা ধড়ফড় করে পাশে বসলো । একটা কুশন কোলে তুলে নিয়ে বললো চঞ্চলা হয়ে…..
” মামনি , তুমি যে আমাকে রান্না শেখাতে চেয়েছিলে ? শেখাবে না ?
” শিখে কি করবি ?
” শিখতে হবে না ?
” হবে না । রান্না না শিখলেও চলবে তোর !
” চলবে না । আমি তো টুকটাক পারি । তুমি কিছু স্পেশাল ডিস শিখিয়ে দাও আমায় । যখন ইউএসএ চলে যাবো , তখন কাজে আসবে । রান্নার মাধ্যমে তোমায় মনে করবো তখন ।
রুবিনা কাবিরের মুখখানা থমথমে হয়ে চুপসে আসলো । দাঁড়িয়ে কুশন রেখে চোখ সরু করে তাকালেন তিনি । রাগি গলায় বললেন….

” এই বিকেলে জ্বালাতে আসিস না তো । সবাই ঘুমোচ্ছে , যা গিয়ে ঘুমা !
” তুমি তো ঘুমোচ্ছে না । আর এমনিতেও আমার ঘুম পাচ্ছে না । তোমার সাথে গল্প করি ?
” জমবে না আমার সাথে !
” কেনো জমবে না ? এখানে বসো তো…
মেঘা ভদ্র মহিলার হাত টেনে পাশে বসালো । আজ সাহস করেছে সে নিজেও । কাঁপছিলো হাত খানা । রুবিনা কাবির বরাবর এভাবে নরম কন্ঠে কথা বলেন না ওর সাথে । যখন বলেন , তখন মেঘার খুব খুশি লাগে । এই যেমন এখন লাগছে ।
রুবিনা কাবির কে টেনে পাশে বসিয়ে ওনার বাহু জড়িয়ে ধরলো মেঘা । এটার সাহস ও আজ প্রথম । কাঁধে মাথা রেখে বললো…
” আচ্ছা মামনি , আমি যদি চলে যাই তাহলে মনে করবে আমায় ?
উত্তর পেলো না । আবার বললো আনমনে….
” এসব দুঃখের কথা না বলি ।

আচ্ছা শোনো , তুমি ঐ স্পেশাল ভুনা খিচুড়ি কিভাবে রাধো , সেটা শেখাবে আমায় কেমন ? আমি একদিন তোমাদের সবাইকে রান্না করে খাওয়াবো ? এখন তো আরো বৃষ্টির সিজন । আজ শেখাবে ? সবাই ঘুমোচ্ছে , আমি বানিয়ে সবাইকে সারপ্রাইজ দেই ।
ঘাড় কাত করে অবাক লোচনে তাকিয়ে ধীরে মোলায়েম উত্তর করলেন রুবিনা কাবির….
” আজ না । কাল রাধিস !
” আচ্ছা ! মামনি , তুমি আর বাবা….
মেঘার কথার সমাপ্তি ঘটলো না । ভদ্রমহিলা আচানক বলে বসলেন…
” মামনি বলিস কেনো ,, মা বলতে পারিস না আমায় ?
অতর্কিতে ছ্যাঁত করে ওঠে রমনী । তাৎক্ষণিক বাহু ছেড়ে মাথা তুলে তাকায় সচকিতে । উচ্চারণ করে অস্ফুটে….
” মা ?
” হু , ওনাকে বাবা ডাকিস আর আমার ক্ষেত্রে বৈষম্য করে মামনি ডাকিস কেনো ? বাবার বউকে মা ডাকতে হয় , জানা নেই ?
মেয়েটা হাসার চেষ্টা করলো । কেমন কষ্ট লাগলো কোথাও একটা । ভদ্রমহিলার মুখ পানে তাকিয়ে চোখ ঘোলাটে হতে না হতেই ঘন পলক ফেলে চোখ নামিয়ে বললো…

” সবাই তো মামনি ডাকে তোমায় ! মানছি আমার দিকটা সবার থেকে আলাদা , বাইরের জন আমি । তবুও মামনি ডাকি , এই অনেক নয় কি ? মা ডাকার অধিকার তো দাও নি কোনদিন ! তাই ডাকিনি । নয়তো মা ডাকার সাধ কম ছিলো না আমার । আম্মু কে কাছে পাই নি তো কখনো । কাউকে মা বলে ডাকতে পারিনি । জবান থেকে ঐ ডাকটাই মুছে গেছে ।
” আমার ব্যাবহারে কষ্ট পাস ? কষ্ট কমিয়ে আজ থেকে মা ডাকবি আমায় !
মেঘার গলা কাঁপে । সেভাবেই কেঁপে কেঁপে বলে….
” আমি চলে যাওয়ার আগে এভাবে মায়া বাড়াচ্ছো মামনি ? এতো দিন এই অধিকার টা দিলে কি হতো ?
” আজ থেকে দিলাম । মামনি নয় , মা বলে ডাকবি আমায় । মনে থাকবে ?
ছলছল চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসে মেঘা । রুদ্ধ জবানে কথা ফোটাতে না পেরে মাথা ঝাঁকায় হ্যাঁ বোধক । আজ হঠাৎ কি হলো ভদ্রমহিলার ?
মেঘা আবারো তার কাঁধে মাথা এলিয়ে রাখে । চোখ বুজতেই বাঁ চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ে রুবিনা কাবিরের কাঁধে । ধক্ করে শ্বাস টানে মেয়েটা । কি ভীষণ যন্ত্রণা । এই মানুষ গুলোকে ছেড়ে যেতে হবে একদিন । ছেড়ে যাওয়ার আগে এতো মায়া কাটাবে কি করে ও ?

রৌদ্র ফিরেছে । টলতে টলতে চাবি ঘুরিয়ে সদর খুলে ভেতরে ঢুকলো । গুনগুন গান বাজছে কন্ঠে । ফ্রেশ হয়ে আবার বেরোবে । সকাল থেকে মেঘা কে দেখা হয় নি । এক পলক দেখার উদ্দেশ্যেই আসা এই অসময়ে ।
দরজা লাগিয়ে পিছু ফেরা মাত্রই পিছন ফিরে বসে থাকা রুবিনা কাবির কে দেখতে পেলো । তার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে আরেকজন । চিনতে একটুও অসুবিধে হলো না । মায়ের পাশে এভাবে বউকে দেখে অনেকটা অবাক হলো রৌদ্র । চোখ সরু করে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে অবলোকন করলো দুজনকে । অতঃপর দৃঢ় পায়ে এগোতে এগোতে হাঁক ছাড়লো ভরাট কন্ঠে….

” মম , কি করছো এখানে একলা বসে ?
চমকালো মেঘা । তবে প্রতিক্রিয়া দেখালো না ! চোখ খিচে বন্ধ করলো । হাত আঁকড়ে ধরলো রুবিনা কাবিরের ।
রুবিনা কাবির ও নিরুদ্বেগ । রৌদ্র এগিয়ে পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় বসেছে । পিছনের দিকে পিঠ এলিয়ে পায়ে পা তুলে আবার বললো ক্লান্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে….
” কি করছো মম একলা বসে ?
এমন ভাব , যেনো সে মেঘা কে দেখে নি । মনে মনে ভেংচি কাটলো মেঘা । গুটিয়ে বসে রুবিনা কাবিরের গায়ের আড়াল করলো নিজেকে । একই ভাবে ভেংচি কাটলেন রুবিনা কাবির নিজেও । ভ্রু জড়ো করে নিলেন । রৌদ্র পর পর দু’বার উত্তর না পেয়ে হতাশ হলো ।
রুবিনা কাবির এপর্যন্ত ওর সাথে কথা বলে নি টু শব্দেও । রৌদ্র এবার বাগে পেলো, মায়ের অপর পাশে বসে বললো….
” কি হয়েছে মম , কথা বলছো না কেনো ? এসে থেকেই দেখছি , ইগনোর করছো আমায় । এক বারও কথা বলো নি আমার সাথে ।
রুবিনা কাবির এবারো উপেক্ষা করেন । আলগোছে মেঘার মাথাটা সরিয়ে দেন নিজের কাঁধ থেকে । উঠে দাঁড়িয়ে বলেন….
” কফি খাবি মেঘা ? বস , টিভি দেখ আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি !
উত্তর না শুনেই বড় বড় ধাপে প্রস্থান করে কিচেনে ঢুকলেন ভদ্রমহিলা । মেঘা ভ্যাবাচ্যাকা খায় । ওকে একলা এই বাঘের সামনে ফেলে রেখে চলে গেলেন উনি ! পাশেই রৌদ্র বসে । মাঝে একজন বসার জায়গা । দূরত্ব ইঞ্চি কয়েক ।

রৌদ্র মায়ের দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে । কেমন অদ্ভুত লাগছে ভদ্রমহিলার আচরণ । মেঘার সাথেই বা এমন চিপকে ছিলো কেনো ? রৌদ্র আড়চোখে তাকালো নিজের বাম পাশে বসে থাকা রমনীর পানে । গলা বাড়িয়ে খাঁকারি দিয়ে বললো….
” কফির সাথে সাথে এক গ্লাস করলার জুস ও নিয়ে এসো মম , আমার মিষ্টি খাওয়ার ক্রেভিং উঠেছে !
মেঘা ছলাৎ করে ওঠে । দ্রুত বেগে চোখ বড় বড় করে চোয়াল ঝুলিয়ে রৌদ্রের দিকে তাকায় । রৌদ্রের দৃষ্টি অন্যদিকে । ঠোঁট কামড়ে আবারো চেঁচিয়ে বললো ফিচেল স্বরে….
” ওওও মম , ইউ নো ? কালকে তোমার বানানো করলার জুস টা একটু বেশিই মিষ্টি ছিলো । আজ থেকে রোজ রাতে তোমার বউমার হাত দিয়ে এক গ্লাস করে করলার জুস পাঠাবে আমার রুমে ! ওক্কে !?
সবটা মেঘা কে শুনিয়ে শুনিয়ে নির্লজ্জের মতো বললো বেহায়া লোকটা । কিচেনে রুবিনা কাবিরের কানে পৌঁছেছে , তিনি বোঝেন নি । গুরুত্ব দেন নি ।
এদিকে ঝুলে যাওয়া চোয়াল শক্ত করে খিচে নেয় মেঘা । চোখ মুখ টাটিয়ে ফেলে সহসা । লোকটা ওর দিকে তাকায় নি । অথচ কেমন শয়তানি হাসি হাসছে দেখো ! তিতিবিরক্তিতে তেঁতে উঠলো একবিংশী..
কোলের কুশন টা রৌদ্রের উপর সজোরে ছুড়ে মেরে খ্যাট খ্যাট করে উচ্চারণ করলো…..

” ইরিটেটিং রাইনো মুখো…..
” হোয়াট সুইটহার্ট ?
এবার তাকালো পূর্ণ চোখে । চোখাচোখি হলো । মেঘা রাগে গজগজ করছে । সেটা নজরে পড়লো না । তীক্ষ্ণ নজরে পড়লো রমনীর বাম চোখের কার্নিশের চিকচিকে ক্ষুদে জল কণা টুকু । অমনি ছটফটিয়ে উঠলো বেপরোয়া হৃদয় । রমনীর কনুই চেপে নিজের দিকে সম্পুর্ন ঘুরিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো….
” ইভারা , কি হয়েছে ? কেঁদেছিস কেনো ?
মেঘা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে ।
” ছোঁয়ার বাহানা খুঁজবেন না ! ছাড়ুন আমায় । দূরে যান…
” তোকে ছোঁয়ার বাহানা প্রয়োজন নেই । কেঁদেছিস কেনো এটা বল ? পানি কেনো চোখের কোণে ? কে কি বলেছে তোকে ?
মেঘা আঙ্গুল তুলে চোখ ডলে মুছে নেয় । উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭

” যখন আপনার জন্য চোখে পানি আসে, তখন কেনো জিজ্ঞেস করেন না , কাঁদছি কেনো ? তখন কোথায় থাকে এই নিছক উদ্বিগ্নতা ?
” স্বামীর জন্য চোখে পানি আসাটা স্ত্রীর স্ত্রী গত অধিকার । উঁহু , ভুল বললাম কি ? নাহ , ঠিকি আছে । আর স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর চোখের পানি মুছিয়ে দেওয়া । আয় বউ , মুছিয়ে দেই তোর চোখের পানি ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here