Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬
সুরভী আক্তার

পড়াশোনা থেকে মুক্তি ।
এক্সাম শেষ হওয়ার পর থেকেই হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে মেঘা আর শাফাহ্ । ছুটি আছে হাতে পনেরো – বিশ দিন । ওদের আর পায় কে ?
দিন বিশেকের এই পরীক্ষার চক্করে রমনী নাজেহাল হয়ে পড়েছে । ঘুম হয় নি ঠিকমতো । বিকেল থেকেই পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিলো একাধারে । এখন সন্ধ্যা সাতটা । গা ম্যাজ ম্যাজ করছে । ঘুম ছুটেছে আচমকাই । ভার লাগছে শরীরটা । গা মুড়িয়ে উঠে বসলো রমনী । মাথার দীঘল কেশরাশী পুরো বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এলোমেলো । ঝট বেঁধেছে পেঁচিয়ে ।
মেঘা হাই তুললো । সদ্য ঘুম ভাঙ্গায় মস্তিষ্ক এখনো শূন্য । এলোমেলো কিছুটা ।
আন্দাজে কোনো এক পাশে দৃষ্টি একস্থির করে মিনিট কয়েক থম মেরে বসে রইলো । অতঃপর ধীরে নামলো বিছানা থেকে ।
ফ্রেশ হয়ে বেরোলো সময় নিয়ে । শাফাহ্ ঘরে নেই । মেঘা নিচে নামে ওকে খুঁজতে খুঁজতে । নিচেও নেই । মাথা চুলকে এপাশ ওপাশ তাকায় মেঘা । সিরাত সোফায় বসে রামিশা কে ফিডিং করাচ্ছে । কাউকে না পেয়ে ওর পাশে গিয়ে বসলো সে । বাচ্চাটাকে বেশ বড় দেখায় । বয়স তিন মাস হয়ে দিন দুয়েক পেরিয়েছে । ছটফটে হবে বেশ ।
মেঘা মুচকি হেসে জানতে চাইলো….

” আচ্ছা আপু , বাচ্চারা কথা বলতে শেখে কবে ?
” উমম , বছর একের মাথায় । এক বছর বয়স হতে হতেই ‘বাবা-মা’ এসব ছোট খাটো ওয়ার্ড শিখে যায় ।
” তার মানে বাবু কথা বলতে বলতে এখনো প্রায় নয় থেকে দশ মাস ? আমি ওর কথা শুনতে পারবো না তাহলে ?
” কেনো পারবি না ?
” বাহ্ রে , আমি কি থাকবো নাকি ? তোমার বাবুর জবান ফুটতে ফুটতে আমি পগারপার । সামনাসামনি হয়তো আর দেখাও হবে না কোনো দিন । আচ্ছা শোনো , আমি কিন্তু রোজ তোমায় ভিডিও কল দেবো । তুমি বাবুকে দেখাবে আমায় । ভুলে যাবে না তো তখন ?
সিরাত চোখ সরু করে তাকালো । খানিক চুপ রইলো । মেঘার নিশ্চল আঁখি দ্বয়ের পানে তাকিয়ে বললো শান্ত কন্ঠে….

” চুপ করবি ? কোথায় যাবি তুই ?
” কেনো ? দেশের বাইরে ! আমার আর এখানে সেকেন্ড সেমিস্টারে ওঠাও হবে না বোধহয় । বোধহয় বলছি কেনো , হবেই না । ট্রান্সফার নিতে হবে । ওখানে গিয়ে নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হবো । উফফফ , আ’ম এক্সাইটেড !
আপু শোনো , তুমি কিন্তু মনে রাখবে আমায় । মানুষ কাছ ছাড়া হলে মন থেকে তার শূন্যতা মুছে যেতে সময় লাগে না । তোমরা কিন্তু আমার শূন্যতা টা মুছে যেতে দেবে না , হ্যাঁ ?
” মানুষের শূন্যতা কখনো মুছে যায় না । শূন্যস্থান শূন্যই থাকে । পূর্ণ হয় না সহজে । তুই আমাদের পূর্নতায় আছিস । শূন্য তো ছিলো তখন , যখন তোর আগমন ঘটে নি । এখন শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে । পূর্নতায় শূন্যতা আসে না ।
মেঘা হা বনে তাকিয়ে এক মুহুর্ত পর ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । এতো ভারী ভারী কথা মগজে ঢুকলো না এই মুহূর্তে । চোখ নামিয়ে নিলো সে ।
বাড়ির আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না । মেঘা শুধোয়..
” টুকটুকি কোথায় আপু ?
” ছাদে হয়তো ।

” আচ্ছা তুমি বসো , ও ডেকেছিলো আমায় । ছাদে ওঠা হয় নি আজ । এখন ছাদে যাই একটু….
সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠলো মেঘা ‌। করিডোর পেরিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গেলে পথিমধ্যে রুবিনা কাবিরের সাথে দেখা । তিনিও ছাদে ছিলেন । এই আঁধারে তার ছাদে ওঠার হেতু আন্দাজ করতে পারলো না মেঘা । এসময় তার কিচেনে ব্যস্ত থাকার কথা । মেঘা কে আকস্মিক দেখে বোধহয় থতমত খেলেন ভদ্রমহিলা । দ্রুত চোখ নামিয়ে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে আসলেন । ছাদে মেহের সহ শাফাহ্ দাঁড়িয়ে । দুটো মাথা একসাথে করে রেখেছে । রিনরিনে হাসি শোনা যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । মেঘা দরজা পেরিয়ে ডাকলো….
” মেহের আপু , এই সময় ছাদে কি করছো ?
আকস্মিক মেঘার কন্ঠ শোনা মাত্রই দুই রমনী দুদিকে ছিটকে সরে দাঁড়ালো । ধড়ফড় করে উঠলো দুটোতে ‌। যেনো ভুত দেখার ন্যায় চমকালো ওরা । পিছু ফিরে মেঘা কে দেখে বুকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস ফেললো । অবাক হলো মেঘা । এগিয়ে বললো…..

” ভয় পেলে নাকি ?
মেহের ঠোঁট ভিজিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে হাসে , উত্তর করে….
” তেমন কিছু না মেঘা । হঠাৎ তোমার কন্ঠে ঘাবড়ে গেছিলাম । বাই দ্যা ওয়ে , ঘুম হলো তোমার ?
” হুম । গল্প করছিলে তোমরা ? মামনি কে দেখলাম নেমে যেতে ! কি নিয়ে গল্প করছিলে ? আমায় ডাকো নি কেনো ?
শাফাহ্ ভয়ে ভয়ে অধর ভেজায় । এক হাত বাঁকা করে কোমরের পিছনে লুকায় । সাফাই গেয়ে তড়িঘড়ি করে বলে…..
” ঘুমোচ্ছিলি তো , তাই ডাকি নি । আর আমরা গল্প করছিলাম না । ঐ মেহের আপুর ফোনে আপুর বিয়ের ফটো গুলো দেখছিলাম ।
মেঘা দুটোকে পরখ করলো সরু চোখে । দুটোই কেমন চোরের ন্যায় নজর চোরাচ্ছে । থতমত খেয়ে আছে বোধহয় । মেঘা ওদের অস্বস্তি বুঝে বেশি কিছু ঘাটলো না আর ।

” মা , মাথা গরম করিও না আমার । একটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দেবো না আমি । তোমার ছোট ছেলে ভালো নয় । ওর মতো উশৃঙ্খলের সাথে কিছুতেই শিশিরের বিয়ে হতে দেবো না আমি ।
আবিদের এহেন কথায় থমথমে গলায় মুখ খুললেন মার্জিয়া বেগম…..
” উশৃঙ্খল কাকে বলছিস তুই ? ছোট ভাই ও তোর !
শিশির , ঐ মেয়েটার হয়ে,ভালো চেয়ে সাফাই গাইতে এসেছিস ? একবার মেনে নিয়েছি বলে বারবার মেনে নেবো ! তুই যদি ইকরা কে বিয়ে করে এ বাড়ি ছাড়তে চাস , তাহলে শিশির কে আমার বাড়ির বউ বানিয়ে এনে দিতে হবে তোকে ।
” কিছুতেই না । শিশিরের জীবন নষ্ট করতে পারবো না আমি । এতে ইকরা ক্ষমা করবে না আমায় । তোমার বখাটে ছেলে শিশিরের যোগ্য নয় ‌।
” সে তো ঐ ইকরাও তোর যোগ্য নয় । তবুও মেনে নিয়েছি আমরা । তোকেও হারাচ্ছি । আমাদের ফ্যামিলির বড় ছেলে তুই । আর তুই কিনা একটা সাধারণ বস্তির মেয়েকে ভালোবেসে ঘরজামাই থাকবি ?
” খবরদার মা , ইকরার বিষয়ে একটা খারাপ মন্তব্য ও বরদাস্ত করবো না আমি । ঐ যে বললে ভালোবাসি , এর জন্যই । তোমাদের বড় ছেলে হওয়ার দায়িত্ব যথাযথ পালন করবো আমি । কিন্তু ইকরা কে সাথে নিয়েই । ওর জন্য সব করতে পারি আমি ।
মার্জিয়া বেগম কটমট করলেন । ইকরা নামটাও সহ্য হয় না তার । তিক্ত হয়ে গেছেন তিনি । ছেলের সামনে তিক্ততা ঢেকে বললেন….
” তাহলে ওর বোনকে আয়ানের বউ করে নিয়ে আয় এ বাড়িতে । তোর ভাইয়ের একটা গতি হোক এতে । এই সুযোগ , বিয়ের পর ও নিশ্চয়ই বদলাবে । শিশির মেয়েটা বেশ শান্ত , আয়ান কে ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে ও ।

” যদি না বদলায় ? একটা মেয়ের জীবনের দায়ভার নেবে তোমরা ?
মার্জিয়া বেগম চুপ রইলেন ।
আবিদ রাগারাগী করবে এখন ।
কি পেয়েছে ও ঐ ইকরার মাঝে ? যার জন্য পাগল হয়ে গেছে এই ছেলে !
বেরিয়ে গেছে আবিদ । সোফায় থম মেরে বসে আছেন মার্জিয়া বেগম । তারা বেশ স্বনামধন্য । কিন্তু ওরা , ওরা তো মেডেল ক্লাস । তারও নিচে । কোনো ক্লাস ও নেই ওদের । বস্তিতে বাড়ি । বাড়ি ঘরের শ্রী নে ‌। সেখানে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো তার । আর তার বড় ছেলে কিনা ঐ মেডেল ক্লাস মেয়ের পাল্লায় পড়ে সব ছেড়ে ওখানে গিয়ে ঘরজামাই থাকবে ? নিজের বাপ মাকেও ছাড়বে ?
ঐ মেয়ের জন্য নিজেদের বিজনেস ছেড়ে অন্যের গোলামি খাটছে আবিদ । চাকরি করছে ছোটখাটো । কেবলই ঐ মেয়ের পাশাপাশি , কাছাকাছি থাকার জন্য । কি জাদুটোনা করেছে সে ? হাজার চেষ্টা করেও ছেলেকে ওর থেকে বিমুখ করতে পারেন নি ভদ্রমহিলা ।
শেষে মেনে নিয়েছেন সবটা । ভীষণ রাগ আছে ইকরার প্রতি । আজ তো গিয়ে সম্বন্ধ দিয়ে আসলো । আজমিরা বেগম ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত জানাতে চেয়েছেন । এভাবে হুট হাট করে তো আর সব ভাবা যায় না ।
তবে তাকে দেখে মনে হয়েছে তিনি রাজি হবেন বিয়েতে । লোভে পড়ে হলেও রাজি হবেন , এটা মার্জিয়া বেগমের ধারনা ।

মনে মনে ফুঁসছেন তিনি । হাত মুঠো করে দম খিচলেন । যদি কোনো ভাবে বিয়েটা হয় , তাহলে ঐ ইকরা কে ছাড়বেন না তিনি । কান টানলেই মাথা ঠিক আসবে । শিশির যদি এ বাড়িতে থাকে , তাহলে ইকরাও আসবে । ছেলেও ফিরে আসবে তার ।
সব রাগ বর্তাবেন শিশিরের উপর দিয়ে । তার ছোট ছেলে ভালো নয় । বখাটে, উশৃঙ্খল । নেশায় টাল থাকে সবসময় । ওরা কি জানবে নাকি ? হোক একবার বিয়েটা । মার্জিয়া বেগমের শর্ত , বিয়ে হলে দুটো হবে । এক আসরে দুই ভাইয়ের সাথে দুই বোনের বিয়ে ।

মাঝে পুরো একটা দিন কেটেছে ।
তখন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে পুরো কাবির ম্যানসন । রাত্রি একটার কোঠা পেরিয়ে দেড়টার দোরে ।
গুমোট নিস্তব্ধ পুরো বাড়ি । ঘর ভরাট দুই ঘুমন্ত রমনীর ভারী নিঃশ্বাসে । ঘুমের গভীরতা অনেক দূর । থেমে থেমে শ্বাস পড়ছে বুক চিরে । চার দেয়ালের মাঝে হলদে ক্ষিণ আলো জ্বলছে নিভু নিভু । নিস্তব্ধতার রেশে আকস্মিক কিছু কম্পিত হওয়ার শব্দ হলো ।
ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে । প্রথম বার কেঁপে কেঁপে কেটে গেলো । কেউ ফোন করছে । দ্বিতীয় বার আবার করলো । ঘুমের ঘোরে বুঝলো না মেঘা । মস্তিষ্ক সজাগ হলো না সম্পুর্ন । দ্বিতীয় বারও গভীর ঘুমের বশে ওভাবেই কেঁটে গেলো ফোনটা । তৃতীয় বার পূণরাবৃত্তি ঘটতেই ঘুমের আচ্ছন্নতায় বিরক্ত হয় একবিংশী । মস্তিষ্ক জেগেছে হালকা । কপালে ঘন ভাঁজ পড়েছে ।‌ মুখ বিকৃত হয়ে এসেছে আপনা আপনি । চোখ মেলার শক্তি পেলো না । মাঝরাত , ঘুম এখন বড্ড গভীর । বোধশক্তি নেই চোখ খোলার মতো ।
কোন রকমে শক্তি জোগালো রমনী । হাতড়ে বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করলো । কম্পন থামিয়ে রিসিভ করলো , আবার ডুবলো ঘুমের গভীরে । ফোনের ওপাশে কে , দেখার শক্তি নেই ।
কিয়ৎ কাল চললো নীরবতা । অবশেষে ওপাশের‌ জন আধো ভেজা কন্ঠে ধীরে ডেকে নীরবতা ভাঙলো….

” ইভারা ?
রমনীর সাঁড়া নেই । ধ্যানে থাকলে হয়তো এই সম্বোধনে ছলকে উঠতো । শিউরে উঠতো লোমকূপ । অবাধ্য আবেশে চোখ বুজে আসতো আপনা আপনি ।
তবে আজ আগে থেকেই জমাট বেঁধে বুজে আছে পাপড়ি যুগল‌‌‌ । কানে ডাক পৌঁছালো না । লোকটা দীর্ঘ নীরবতা পালন করলো । নীরবে থেকে কান খাড়া করে নিভৃতে খুব সন্তর্পণে অনুভব করার চেষ্টা করলো একবিংশী গুমোট ভারী শ্বাসের স্পন্দন । কিয়ৎ কাল বাদ ডাকলো দ্বিতীয় বার….
” সুইটহার্ট….
” হু !
এবার বেঘোরেই সহসা উত্তর আসে । হেসে ফেলে রৌদ্র । শুধোয় মোলায়েম কন্ঠে….
” ঘুমাচ্ছো ?
” হু !
দ্বিতীয় উত্তর অক্ষরে অক্ষরে । যেনো এ পর্যায়ে রমনী বাধ্যতা দেখাচ্ছে । সজ্ঞানে এই বাধ্যতা কোথায় উবে যায় ?
রৌদ্র বলে….
” একটু ওঠো !
” ……
” কি হলো ? উঠছো ? আমি অপেক্ষা করছি !
“……..
” ইভারা ?

এ বেলায় একটু চড়া হলো কন্ঠ । অগত্যা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে একবিংশী । কান হতে ফোনটা ছিটকে পড়ে যায় খাট ছাপিয়ে মেঝেতে । এলোমেলো হয়ে যায় রমনী । আকস্মিক ঝটকায় চক্কর দিয়ে ওঠে দূর্বল মাথাটা । চোখ খিচে দুহাতে মাথা চেপে ধরে সে । নিজেকে শান্ত করে সময় নিয়ে । চোখের পাপড়ি ভার , যেনো চিপকে আসছে আঠার ন্যায় । কোনো রকমে চোখ খুললো টেনে টুনে ।
সবটা কেমন গুলিয়ে গেলো । কি হলো একটু আগে ! ও এভাবে উঠে বসলো কেনো ? ভাবতে গিয়ে ধক্ করে উঠলো ‌। ঘোর ভাঙলো ! ঐ বেপরোয়া লোকটা ডেকেছে ওকে ! ফোন কোথায় ?
ধড়ফড়িয়ে ফোন খুঁজলো রমনী । মেঝেতে ক্রিনের আলো দেখে নিচে নেমে ফোন হাতে তুললো । কল এসেছে ফোনে । আট মিটিন পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড চলে । বিডি নাম্বার । যা দেখে পূনরায় ছলকে ওঠে একবিংশী । কেমন কম্পন বয় পুরো অঙ্গে ‌। চেনা নাম্বার ।
তালগোল পাকিয়ে যায় অধৈর্য চিত্তে । ঠোঁট শুকিয়ে আসে মেয়েটার ‌। তড়িঘড়ি করে জিভে অধর ভিজিয়ে কানে ফোন ঠেকায় কেঁপে কেঁপে….

” হ্যালো ?
” বাইরের দরজা খুলে দে । চাবি নেই আমার কাছে ।
” মা..মানে ? আ…আপনি কোথায় ?
” দরজা খুলে দে । কোথায় আছি স্বচোক্ষে দেখতে পারবি ।
এই বলে মেয়েটাকে হতভম্ব করে ফোন কাটলো লোকটা । তাজ্জব বনে পাথরের ন্যায় জমে রইলো রমনী । সেকেন্ড কয়েক বাদ দূর্বল পদ যুগল উদ্যত করলো ।
ছটফট করে ঘরের দরজা খুলে ছুটলো অন্ধকার করিডোরে । আলো জ্বালানোর চিন্তা জাগলো না উৎকণ্ঠিত মস্তিষ্কে ।
গাঢ় অন্ধকার ছাপিয়েই এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো রমনী । ড্রইং রুমেও ঘুটঘুটে অন্ধকার । সব আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন সবাই ।
এ বাড়ির প্রতিটা কোণা মেঘার নখদর্পণে । সেই অন্ধকারেই আন্দাজে ছুটে গিয়ে দরজা খুললো সদরের ।
সদরের বাইরে আর প্রধান গেটের কাছে আলো জ্বলছে । সদর খোলা মাত্রই চিকচিক করে উঠলো রমনীর দুচোখ । হাঁপানি রোগীর ন্যায় বড় বড় শ্বাস ফেলতে লাগলো সে ‌। ঠিক সামন বরাবর দাঁড়িয়ে বেপরোয়া লোকটা । রমনী খট করে দরজা খোলা মাত্রই চট করে দৃষ্টি তুলেছে । বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার । মেঘা কে দেখতে পেলো না তার তৃষ্ণায় পীড়িত নয়ন জোড়া ।

এতেই যেনো ছটফটানি বাড়লো ‌। মরিয়া হয়ে উঠলো সে । বেপরোয়া লোকটা দ্রুত হাতে ফোনের ফ্লাশ জ্বালালো । ফোন উঁচিয়ে আলো তাক করলো রমনীর পানে । আচমকা তীর্যক আলো পেতেই মুখের উপর হাত ঠেকিয়ে চোখ আড়াল করলো রমনী । ফ্লাশের সাদাটে আলো রোধের সাথে সাথে রোধ করলো বেপরোয়া যুবকের আকুল দৃষ্টি যুগল ।
ভেতরে ঢুকে আসলো রৌদ্র । মেঘা পিছিয়ে যায় । মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে পিটপিট করে তাকায় ।
আলো আঁধারের মিলেমিশে চোখাচোখি হয় দু জোড়া ব্যাকুল অক্ষি যুগলের ।
এতেই পেরোয় সেকেন্ড কয়েক । রমনী এলোমেলো । যুবকের দৃষ্টি স্থির । দেখলো আজ কতদিন বাদ । অস্থিরতা রুখে চেয়ে রয়েছে স্থির দৃষ্টিতে ।
সেভাবে তাকিয়ে থেকেই সদরের দরজা ঠেলে বন্ধ করলো এক হাতে । চোখে পলক ফেলে মুখ খুললো নীরবতা ছেদ করে….

” ডিস্টার্ব করলাম ?
রমনী নিশ্চুপ । বাক্ হারিয়েছে সে । আকস্মিক লোকটা ফিরে আসলো , এখনো অবিশ্বাস আছে এতে ! সেই অবিশ্বাসেই সন্দিহান হয়ে শুধালো….
” আপনি ? ফিরে এসেছেন ?
রৌদ্র সোজাসুজি ফ্লাশ তাক করে….
” হু , সন্দেহ আছে ? সত্যিই ফিরে এসেছি । ছুঁয়ে দেখ আমায় , সন্দেহ কেটে যাবে !
হাত বাড়িয়ে দেয় রৌদ্র । চোখ নামিয়ে পিছিয়ে যায় মেঘা । রৌদ্র হাত সরিয়ে নিয়ে বলে….
” বলেছিলাম না , #আসবো_ফিরে_আবারো । তোর টানে ,, তোর কাছে , তোর জন্য শুধু । তুই বললেই ফিরবো সব ছেড়ে । বলেছিস , ফিরেছি !
” মানে ?
” মানে,, এই মুহূর্তে বাড়ি অন্ধকার হলেও আমার ফিউচার উজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছি আমি । হোয়াটসঅ্যাপ সানি ? মাথায় কি চলছে তোমার ? হঠাৎ এতো খেয়ালি হলে কবে থেকে ? মিস করছিলে ভীষণ ?
” হোয়াট রাবিশ ! আমি মিস করবো কেনো আপনাকে ? বেকার বেকার মাঝরাতে ঘুম ভাঙালেন আমার । যত্তসব….
মেঘা ভেতরকার উচাটন সামলায় । জোরালো হৃৎস্পন্দনের বিপরীতে নিজেকে আড়াল করে পা বাড়াতে গেলে খপ করে ওর হাত টেনে ধরে রৌদ্র….

” এই ইডিয়ট, আমাকে বেসামাল করে পালাতে চাইছিস ? তোর জন্য এমার্জেন্সি ছুটে আসলাম । আর তুই উল্টো পথে ছুটছিস ?
” আমার জন্য ছুটে এসেছেন মানে ? আমি কি করলাম ?
” মিস করলি আমায় , তাইতো ছুটে আসলাম । মনে পড়ছে না ?
মেঘা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো । অন্ধকারে ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না চেহারা । এখানে থাকাটা ঠিক হবে না ।
খিটখিটে স্বরে বলল….
” আপনাকে মিস করতে বয়েই গেছে আমার ।
অন্ধকারে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উঠতে লাগলো মেঘা । রৌদ্র ওকে সহসা আটকাতে না পেরে পিছু পিছু পা মেলালো । ফ্লাইট থেকে নেমেছে সাড়ে বারোটার দিকে । বাড়ি আসতে আসতে দেড়টা । এখন প্রায় দুটোর কাছাকাছি ।
নিস্তব্ধ পুরো বাড়ি । করিডোর পেরিয়ে ঘরে ঢোকার আগেই আবারো ওকে টেনে ধরলো রৌদ্র । এবার টেনে নিয়ে ঠেসে ধরলো দেয়ালের সাথে । সুইচ টিপে অন্ধকার ঘুচে একখানা লাইট জ্বালালো তড়িতে ‌। আলোর ঝলকানিতে চমকালো মেঘা ।
রৌদ্র সহসা ঝুঁকে আসলো ওর দিকে । লম্বাটে শরীর ঝুঁকিয়ে মেয়েটার সম্মুখ বরাবর দাঁড়ালো । ভড়কালো রমনী ।

” কি করছেন ?
” কিছু না ! একটা কথা রাখবি ?
” ছাড়ুন আগে !
” ছাড়লে তো হবে না । জড়াবো একটু ….
” দেখুন রাইনো মুখো , ডিস্টার্ব করবেন না ।
মেঘা উশখুশ করে । ছাড়ানোর চেষ্টা করে নিজেকে । চুল খোপা করা । মেয়েটা চুলের যত্ন নেয় না মোটেও । রৌদ্র আরেকটু ঝুঁকে আসলো । মধ্যকার ইঞ্চি কয়েক দূরত্ব টুকুও ঘুচে নিলো । দেয়ালে সিটিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা । ঠকঠক করে কম্পিত হচ্ছে পুরো শরীর । লোকটার এতোটা সংস্পর্শ সামলে নিতে পারলো না নমনীয় মেয়েটা ।
ভয়ে চোখ জোড়া বড় করে তাকানো মাত্রই রৌদ্র ওর খোঁপা থেকে কাঁটা খুলে নেয় । ঘাড় গলিয়ে চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে দেয় বহুদিন বাদ । এই জিনিসকে খুব মিস করেছে সে । এই মন মাতানো ঘ্রাণ টার দিশা মেলে নি কোথাও । ছটফট লাগছিলো এতদিন । এখন ছটফটানি কমে আসলো ক্ষণিকেই । বুক ভরে শ্বাস টানলো বেপরোয়া লোকটা । তৃপ্ত হাসি মিললো ওষ্ঠপূটে ।
শিরশির করে উঠলো সটান দেহ খানা । যেনো অনুভুতির জোয়ারে গুড়িয়ে আসলো । মেয়েটার কোমরে হাত উঠিয়ে নেয় রৌদ্র । চুলের গোছায় নাক ঘষে আলতো করে বলে….

” ইউ নো জান পাখি , তোর মাঝে একটা প্রশান্তি আছে । যেটা আমার সমস্ত অশান্তি দূর করতে সক্ষম । ইউর হেয়ার ফ্রেগ্রেন্স ইজ মাই স্যাটিসফ্যাকশন !
একবিংশী নড়েচড়ে ওঠে । খুইয়ে আসে শক্তি । উচ্চারণ করে রোধ ঠেলে….
” রৌদ্র ,,,
” ইয়েস সুইটহার্ট । দ্যাট’স মাই এনোদার স্যাটিসফ্যাকশন !
খুব মিস করেছি তোকে । কেনো আগে ডাকলি না ? তোর ডাকের অপেক্ষায় ছিলাম আমি । এখন যখন নিজে থেকে ডেকে এনেছিস, তখন একটা অঘটন সামলাতে হবে তোকে । এই আঁধারে একটা অঘটন ঘটাবো এখন , ডোন্ট ওয়ারি কেউ দেখবে না ।
মেঘা আঁতকে ওঠে । হাত উদ্যত করে রৌদ্রের বুকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে ।
” কি করবেন আপনি ?
রৌদ্র হেসে ফেলে শব্দহীন । মুখোমুখি হয় । চোখে চোখ রেখে বলে….
” ডেকে এনেছিস যা করার জন্য,তাই করবো । ডোন্ট ট্রাই টু স্টপ মি…..
” কিসব আজেবাজে কথা বলছেন ? আমি কখন ডাকলাম আপনাকে । ছাড়ুন আমায় । অসভ্যতা করবেন না ।

” সভ্যতা দেখানোর মতো সভ্য হতে গেলে আমার লস । যেটা আমি চাইছি না । অসভ্যতাই সই । এই ইডিয়ট , একটা বার জড়িয়ে ধরি তোকে ! প্লিজ অবাধ্য হবি না…
অনেক সহ্য করেছি । রাইট নাউ , আর পারছি না….। শুধু জড়িয়ে ধরবো । একটু শক্ত করে…! প্লিজ !!
মেঘা ঢোক গিলে কন্ঠনালি ভেজায় ‌।
” খবরদার না , দূরে সরুন । আই ফিল আনকম্ফোর্টেবল…
” অভ্যাস হলে তবেই কম্ফোর্ট আসবে । তুই তো…..
মেঘা এবার শক্তি খাটালো । ঠেলে দূরে সরালো রৌদ্র কে । গজগজ করে বললো….
” চুপ করুন রাইনো মুখো , অসভ্য নির্লজ্জ লোক । আপনার ডাক শোনাই উচিত হয় নি আমার ।
মেঘা ওকে সময় না দিয়ে এক ছুটে রুমে ঢুকতেই রৌদ্র আহম্মক বনে বললো…..
” ইডিয়ট , তোর ডাকে ছুটে আসলাম । আর তুই আমার ডাকে আমাকেই উপেক্ষা করছিস !

সকাল সকাল ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসেছে কাবির পরিবার । আদ্র অফিস মুখো হয় নি আর ।
খাওয়ার মাঝে বারবার আড়চোখে ছেলেকে পরখ করে নিচ্ছেন তোফায়েল কাবির ।
বাকিরা চুপচাপ খাচ্ছে মাথা নুইয়ে । কিচেন থেকে মেঘার জন্য অমলেট নিয়ে আসতে গিয়ে পা জড়িয়ে হোচট খেলেন শাহিনা কাবির । অমলেট সহ হাতে থাকা ছোট্ট কাঁচের বাটিটা ঝংকার তুলে মেঝেতে পড়ে গুড়ো গুড়ো হতে সময় লাগলো না । চকিতে সবার আঁতকানো দৃষ্টি পড়লো তার দিকে । মেহের ছুটে যায় খাওয়া ফেলে….

” মা, কি হলো ? ঠিক আছো ? বাটিটা হাত থেকে পড়লো কি করে ?
হাত পিছলে পড়ে গেছে । আশ্বস্ত করলেন শাহিনা কাবির….
” আমি ঠিক আছি । পা বাড়াস না , কাঁচ আছে এদিকে । তুই খেতে বস । আমি কাঁচ তুলে নিচ্ছি ।
” তুমি যাও , আমি তুলে নিচ্ছি ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫

শাহিনা কাবির ওকে বাঁধা দিতে গেলেন । তার আগেই হুট করে দৃষ্টি পড়লো সিঁড়ির দিকে । অমনি আঁতকে চোখ বড় হয়ে আসলো তার । মুখ ফাঁক করে অবিলম্বে চোখ জোড়া বৃহৎ হয়ে আসলো ।
রৌদ্রের আসার খবর এখনো অজানা । অজ্ঞাত সকলে । সেই রৌদ্রই নিচে নেমে আসছে টলতে টলতে । সবার আগে শাহিনা কাবিরের চোখে পড়লো সে । অমনি অবাক স্বরে উচ্চারণ করলেন শাহিনা কাবির…
” রৌদ্র !!

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here