আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৯
সুরভী আক্তার
দুপুরের পর থেকে অ্যান্সার স্ক্রিপ্ট ঘাটতে ঘাটতে ক্লান্ত আদ্র । ঘাড় , কোমর , গলায় টান ধরেছে । মাথাটাও ধরে এসেছে । একটানা কতগুলো উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলো । এখন আর পারা যাচ্ছে না । হেইড এ্যাক হচ্ছে ভীষণ । ঘরে পানি নেই । ওয়াটার পট সহ মেডিসিন হাতে নিয়ে নিচে নামলো সে । নামতে নামতে সিঁড়ি থেকেই রৌদ্র আর মেঘা কে গিজগিজ করে কথা বলতে শুনলো । মেঘা যেনো আঙ্গুল তুলে শাশ্বাচ্ছে রৌদ্র কে । রৌদ্র বেশ আয়েশি হয়ে বসে এক ধ্যানে মেঘার পকর পকর শুনছে চুপচাপ । চোখ সরু করে আদ্র ।
ওর উপস্থিতির আভাস পাওয়া মাত্রই থামলো মেঘা । নড়েচড়ে একপাশ হয়ে দাঁড়ালো । শক্ত মুখশ্রী স্বাভাবিক করলো নিমিষেই । আদ্র একটা চেয়ার টেনে বসেছে । এক গ্লাস পানি ঢেলে চুমুক বসিয়ে একখানা পেইন কিলার খেয়ে নিলো সে । মেঘা ওকে ঔষধ খেতে দেখে ভড়কায় । তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে জানতে চায়….
” ভাইয়া , কি হয়েছে তোমার ? ঔষধ নিচ্ছো কেনো ? কিসের ঔষধ ?
স্বাভাবিকের ন্যায় রাশভারী গলায় উত্তর করে আদ্র….
” মাথা ধরেছে একটু । আর কিছু না ।
মেঘার মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ।
তবে রৌদ্রের এটা মোটেও পছন্দ হলো না । এই সময়ে আদ্রের উপস্থিতিও পছন্দ হলো না এই খানটায় । তার উপর এই ইডিয়টের ওর দিকে এগোনো তো আরোও সহ্য হলো না । ও কিসের মেডিসিন খাবে খাক , তোকে জানতে হবে কেনো ? চোয়াল শক্ত করে খিচে নেয় রৌদ্র । রেগে তাকায় ।
আদ্র মেঘার দিকে তাকিয়ে কন্ঠ নরম করে বলে…
” বস ,,
সহসা সামনের চেয়ারটা টেনে বসে মেঘা ।
এতে আরো বেশি তেঁতে ওঠে রৌদ্র । হাত মুঠিয়ে নেয় । আদ্র ওদিকে চোখ না দিয়ে জানতে চায়…..
” পরীক্ষা খারাপ হয়েছে কেনো ? পেপার দেখলাম ! খুব একটা ভালো মার্ক পাস নি ! কেনো ?
চোখ নামায় মেঘা । হাত কচলাতে থাকে ।
আদ্র দৃষ্টি গাঢ় করে আবার বলে….
” কি হলো মেঘ ? পরীক্ষা খারাপ দিয়েছিস কেনো ? খারাপ তো হওয়ার কথা নয় । যথেষ্ট ইজি ছিলো কোয়েচশন পেপার । তবুও খারাপ হয় কি করে ?
মেঘা আমতা আমতা করে । উত্তর জানা নেই । আন্দাজে থাকলেও বলা বারন । ওকে এভাবে ইতস্তত দেখে আদ্র কিছুক্ষণ চুপ থাকে । পরক্ষনে বলে….
” শুধু কি আমার কোর্সের এক্সাম খারাপ হয়েছে , নাকি বাকি গুলোও ?
” সবগুলো খারাপ হয় নি । তোমার টা প্রথম ছিলো , ওটা বেশি খারাপ হয়েছে ।
” ইটস্ ওকে । ডোন্ট ওয়ারি । একটা এক্সাম খারাপ হলে কিছু হবে না । খুব একটা খারাপ হয় নি । তবে এক্সপেক্টেশন অনুযায়ী ভালোও হয় নি । নেক্সট টাইম যেনো এমনটা না হয় , গটইট ?
মাথা ঝাঁকায় মেঘা । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে….
” খুব বেশি মাথা ধরেছে ?
সে উত্তর করার আগেই পেছন থেকে তপ্ত ডাক ভেসে আসে….
” এই ইডিয়ট ,, ওঠ ওখান থেকে ? কি এতো কথা বলছিস ওর সাথে ? থাপ্পর খেতে চাইছিস আমার হাতে ?
মেঘা চমকালো । দু’জনে চকিতে তাকালো ওর দিকে । রুবিনা কাবির বেরিয়ে এসেছেন । টেবিলের কাছে মেঘা আর আদ্র কে দেখে সেদিকেই এগোলেন । দু কাপ কফি দুজনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন ।
আড়চোখে দেখলেন রৌদ্র কে । তিন কাপ নিয়ে এসেছেন । ছেলেকে না দিয়ে আরেক কাপ রাখলেন নিজের জন্য ।
রৌদ্র চড়াও কন্ঠে বলে..
” আমার কফি কোথায় মম ?
রুবিনা কাবির উত্তর করলেন না । রৌদ্রের কোনো মূল্যই নেই । কেউ পাত্তা দিচ্ছে না ওকে । রাগে গজগজ করলো । জ্যাকেট খুলে আছাড় মেরে দপাদপ পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে থামলো আবার । ঘুরে এসে আচমকা মেঘার কনুই চেপে এক টানে দাঁড় করালো ওকে । অন্য হাতে তুলে নিলো ওর কফির মগটা । রমনী আকস্মিক এহেন আচরনে বিব্রত হয়ে রেগে মেগে তাকায় ।
রুবিনা কাবির আর আদ্র আঁখি লতা সরু করে ফেলে । রৌদ্র ওকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে যেতে গেলে মেঘা চিবিয়ে বলে….
” ইউ রাইনো , কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? ছাড়ুন আমায় ।
” আমার রুমে পরে নেবো তোকে । আপাতত নিজের রুমেই যাচ্ছিস । এখানে থাকা হবে না তোর । চল , ইডিয়ট ।
একই ভাবে চিবিয়ে উত্তর করলো রৌদ্র । ওকে টেনে হিচড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে পিছন ফিরে বাকি দুজনের উদ্দেশ্যে বললো….
” উল্টো পাল্টা ভাববে না মোটেও । ওকে ওর ঘরের পথ চেনাচ্ছি । আমি ভালো ছেলে ।
বলেই মেঘা কে টেনে নিয়ে উঠে গেলো উপরে । তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন রুবিনা কাবির । এ কি ছেলেরে বাবা ! দিনে দিনে আর কত রুপ দেখাবে । আদ্র মনে মনে হাসলো । ঐ যে মেঘা ওর সাথে কথা বলেছে , রৌদ্রের সহ্য হয় নি এটা । তাই মেঘা কে টেনে টুনে নিয়ে গেলো দূরে সরিয়ে ।
মাঝে দিন কয়েক কেটেছে । এ কদিন পুরো পুরি ঘরবন্দি ছিলো শাফাহ্ মেঘা । আজ রবিবার , দুটোতে একলা বেরিয়েছে বাইরে । শুভ্র , আদ্র কেউই জানে না । জানলে বেরোতে দিতো না । বাড়িতে অনেক কষ্টে মানিয়ে , রাজি করিয়ে তবেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ওরা । এর একটা বড় সড় কারন আছে । লাস্ট কদিন ধরে, সেই পরীক্ষার পর থেকেই শিশিরের সাথে কথা হয় নি । যোগাযোগ হয় নি চেষ্টার পরও । ভার্সিটি খুলবে কদিন পর । মেয়েটার হঠাৎ করে কি হয় কে জানে । মাঝে মাঝে উবে যায় ।
এই কতদিন পর আজ সকালে ও নিজে থেকেই ফোন করেছিলো । বাইরে দেখা করতে বলেছে একটু । কারনটা বলে নি । সেটা সিক্রেট , একেবারে সামনাসামনি বলবে । সেই তাগিদেই আজ শাফাহ্ আর মেঘার একলা বেরোনো বাড়ি থেকে । বেরিয়েছে দুপুর দুটোর দিকে । এখন তিনটে । খোলামেলা একটা জায়গা ।
শিশিরের পরিচিত এদিকটা । ব্যস্ত শহরের ভেতরে নয় । বাইরের শুনশান নীরবতায় । মানুষের কোলাহল , ভিড়ভাট্টা নেই এদিকটায় । নির্জনে গুটিকয়েক মানুষের আনাগোনা চলে কেবল । শিশির এদিকটায় টিউশনি পড়াতে আসতো , তখন থেকেই জায়গাটা চেনা । ওদের বাড়ির পাশেই ।
মেইন রোডের পাশ দিয়ে একটা ছোট রাস্তা নেমে গেছে । সেই মোড়েই গুটি কয়েক দোকান আছে । চায়ের দোকান একটা । ওদিকে রাস্তার ওপারে ফুসকা ও আছে । রাস্তার একপাশে ঝিল । সদ্য হওয়া বৃষ্টির পানিতে ঝিকঝিক করছে পুরো । বসার জায়গাও আছে ধারের কাছে ।
তিন শালিক বসেছে সেখানেই । শিশির তিনটে চা অর্ডার করেছিলো । আজ ওর পক্ষ থেকে ট্রিট ।
চা খাওয়া শেষ এর মধ্যেই । সেই কখন থেকে বসে আছে ওরা । আজকের এই হঠাৎ সাক্ষাৎকারের মেইন আলোচনা শেষ । তিনজনেই চুপ মেরে বসে আছে । নীরবতা চলছে । বাতাসের শা শা শব্দ আর রাস্তায় চলা দু একটা মোটর বাইকের হর্ণের শব্দ ব্যাতীত কিছুই শোনা যাচ্ছে না আর । দূরে চায়ের দোকানে কথা হচ্ছে , তবে সেসব রমনী দের মাঝে প্রভাব ফেলছে না ।
পবনের উত্তাল ঝাপটায় চোখ কুঁচকে এসেছে । শাফাহ্ আর চুপ করে থাকতে পারলো না । শিশিরের সব কথা মুখে কুলুপ এঁটে শুনেছে এতক্ষণ । এখন ওর বাম হাতটা টেনে নিলো নিজের দিকে । অনামিকা আঙ্গুলে একখানা আংটি চিকচিক করছে । শাফাহ্ কপাল গুটিয়ে সেটাকে সূক্ষ্ম নেত্রে পরখ করে গমগমে স্বরে বলল….
” এটা তাহলে এনগেজমেন্টট রিং ?
শিশির মাথা ঝাঁকায় । কাল ইকরার সাথে সাথে ওকেও এই আংটি টা আঙুলে পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । একদম হুটহাট বলা চলে ।
কোমল উত্তর করে মেয়েটা…
” হু ।
” ছেলেটা নিজে পড়িয়েছে ?
” নাহ , ওনার মা পড়িয়েছেন !
” ছেলেটা কেমন দেখতে ?
” সেভাবে দেখিনি !
” ওওও তেরি ,, তাহলে যদি এখন বিয়ের আগে হুটহাট রাস্তা ঘাটে দেখা হয়ে যায় । তাহলে চিনবি কি করে ?
” এক পলক দেখেছি , চিনতে অসুবিধা হবে না । এতোটাও দূর্বল নয় আমার স্মৃতিশক্তি ।
মেঘা চুপ ছিলো । বললো দীর্ঘক্ষণ পর…..
” এভাবে হুটহাট এনগেজমেন্ট হয়ে গেলো । তাহলে তোর বিয়ে টা হয়েই যাবে ?
” হবে ।
” তোকে কেমন একটা দেখাচ্ছে শিশির । তুই সত্যিই এই বিয়েতে রাজি ?
” হু । রাজি না হলে কি কারোর নামের আংটি হাতে পড়ি ?
মেঘার দিকে তাকিয়ে কেমন শুকনো হাসলো মেয়েটা । বরাবর ও মলিন । আজ একটু বেশিই শুকনো লাগছে । চোখ মুখ কেমন নেতিয়ে গেছে এই কদিনে । কন্ঠ উঁচু হয় না । খুব ধীরে কথা বলছে । মেঘা ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হেসে বললো….
” খুব সুখি হবি দেখিস ! তোদের দুই বোনের বিয়ে এক বাড়িতে এক সাথে হচ্ছে । খুব আনন্দ হবে নিশ্চয়ই ? দেখবি , ভাইয়া তোকে খুব ভালোবাসবে । আচ্ছা, ভাইয়া কি করেন ?
” ফ্যামিলি বিজনেসে যুক্ত আছে হয়তো !
” হয়তো কেনো , জানিস না ?
শাফাহ্’র প্রশ্নে হাঁফ ছেড়ে উত্তর করলো শিশির ….
” তার বিষয়ে জানা হয় নি ।
” না জেনেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেছিস ? কবে বিয়ে ?
” বললাম তো , জানোয়ারির তেইশ তারিখ ।
দুদিন পর নতুন বছর । সেদিনটা পেরোক , তার পর তোদের বাড়িতে যাবো একবার । সবাইকে ইনভাইট করে আসবো । আমাদের তো তেমন কেউ নেই । তোরা অনেক কাছের আমার । আগে থেকেই জানানোর জন্য আজ ডেকেছি তোদের । কদিন পর দাওয়াত পাবি । খুব ছোট পরিসরে ঘরোয়া একটা বিয়ে হবে । তোদের সবার আসা চাই কিন্তু ।
” যাবো তো । এখনো অনেক সময় আছে । কিন্তু তার আগে বল , বিয়ের পর পড়াশোনার কি হবে তোর ?
মেঘার প্রশ্ন । শিশিরের আনমনা উত্তর….
” বলেছে তো পড়াবেন । বাকিটা বিয়ের পর দেখা যাবে ।
তিন জন বসে এসব নিয়ে টুকটাক গল্প করলো আরো । শিশির কেমন ঝিমিয়ে গেছে ।
বিকেল গড়াতেই বাড়ি থেকে মাঝে একবার আদ্র ফোন করেছিলো । লোকেশন নিয়েছে । নিতে আসবে হয়তো । মেঘা আর শাফাহ্ যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে , তখন ও বাড়িতে ছিলো না । এরা দুটো ভেবেছিলো আদ্র ফেরার আগেই বাড়িতে ফিরে যাবে । কিন্তু তা আর হলো না । দেরি হয়ে গেছে । নিশ্চয়ই ঝাড়ি খাবে আদ্রের থেকে । একলা একলা মাতব্বরি করা পছন্দ করে না ও ।
নির্জনে বসে বসে গল্প করছিলো ওরা ।
পেছনে গাড়ির শব্দ শুনে চকিতে ঘাড় ঘোরালো মেঘা আর শাফাহ্ । শিশির খানিক বাদ ফিরলো । আদ্র মুখ নিরেট করে গাড়িতে বসে । দুই রমনী ভয়ে ভয়ে একে অপরের দিকে তাকায় । ঝিলের ধারের ব্রেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায় । রাস্তার উপর উঠে আসে । ততক্ষণে আদ্র গাড়ি থেকে নেমেছে । ডিকির কাছে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে নিলো । চোখ সরু করে তাকালো দুজনের দিকে । মেঘা, শাফাহ্ মুখোমুখি দাঁড়ায় । আদ্রের ক্ষিপ্ত চাহনি দেখে ফ্যাল ফ্যাল হেসে বলে শাফাহ্….
” হায় ভাইয়া , এভাবে কি দেখছো ? ঝাড়ি দেওয়ার মতলব আটছো ? খবরদার না , আমরা কিন্তু পারমিশন নিয়ে তবেই বেরিয়েছি বাড়ি থেকে !
” কে পারমিশন দিয়েছে তোদের ?
” আব্বু দিয়েছে । বকবে না কিন্তু । নয়তো নালিশ করবো আব্বুর কাছে ।
” টুকটুকির বাচ্চাাাাা , ভয় দেখাচ্ছিস আমায় ? তোর বাপকে ভয় পাই আমি ?
” ভয় পাও না ?
” না পাই না । এবার বল , এভাবে দুজনে মাতব্বরি করে একলা বেরিয়েছিস কেনো বাড়ি থেকে ?
” শিশিরের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম ।
রাস্তার নিচে বসে থাকা শিশিরের দিকে ইশারা করে বললো মেঘা । অমনি আদ্র ওর দিকে তাকায় । মেয়েটা এখনও পিছু ফিরে বসে আছে । মেঘা গলা বাড়িয়ে ডাকলো…..
” এই শিশির , এখনো বসে আছিস কেনো ওখানে । চলে আয়….
সময় নিয়ে উঠলো মেয়েটা । উঠে আসলো রাস্তার উপর । চোখ তুললো কিয়ৎ কাল বাদ । সোজাসুজি আদ্রের দিকে । আদ্র নিজেও তাকিয়ে ছিলো । চোখাচোখি হলো । শুকনো নরম হাসলো মেয়েটা । যে হাসিতে প্রাণ নেই । চোখ নামিয়ে নিলো আবার । আদ্র বাড়িতে যেভাবে থাকে , সেভাবেই বেরিয়েছে । নরমাল টিশার্ট আর ট্রাউজার পড়নে । এলোমেলো লাগছে । শিশির ওকে এভাবে দেখে অভ্যস্ত নয় । দেখাটাও বেমানান । তাই তাকিয়ে থাকলো না । দৃষ্টি নামিয়ে নিলো ।
শাফাহ্ গদগদ হয়ে বললো….
” ভাইয়া , ইউ নো একটা খুশির খবর আছে ।
” কি ?
” আগে ফুসকা খাওয়াও , তারপর বলবো । উফফফ , কখন থেকে লোভ লাগছে ফুসকা খাওয়ার জন্য । চলো ফুসকা খাবো ।
আদ্র দ্বিমত করলো না । বেকার বেকার দ্বিমত করে লাভ হতো না । এই মেয়ে শুনতো না । ও যখন বলেছে ফুসকা খাবে , তখন খাবেই ।
রাস্তা পার হয়ে ওদিকে গেলো ওরা । বসার জন্য চেয়ার পেতে রাখা । মেঘা আর শাফাহ্ তড়িঘড়ি করে বসলো । পিটপিট করে দাঁড়িয়ে থেকে বললো শিশির…..
” আমি তাহলে আসি ! দেরি হয়ে যাচ্ছে !
” কোথায় যাবি ? ফুসকা খাবি না ? খেয়ে দেয়ে একসাথে যাবো ! ভাইয়া পৌঁছে দেবে তোকে ।
” প্রয়োজন নেই । এই রাস্তার বাক পেরোলেই আমার বাড়ির গলি , আমি হেঁটে যেতে পারবো । আর এসব বাইরের খাবার খাই না আমি ।
শাফাহ্ আবার বাঁধ সাধলো….
” চুপচাপ বসবি , বড্ড কথা বলিস তুই । ভাইয়া ফুসকা অর্ডার করতে গেছে । বস তো….
টেনে বসালো মেয়েটাকে । ততক্ষণে অর্ডার করে চলে এসেছে আদ্র । শাফাহ্’র পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো । জানতে চাইলো আগ্রহী হয়ে….
” কি যেনো বলবি ?
” ওও হ্যাঁ , ভাইয়া কনগ্রাচুলেট করো শিশির কে , ওর বিয়ে সামনে !
আদ্রের মুখখানা হাসি হাসি ছিলো । রমনীর কথা কর্নপাত হওয়া মাত্রই হাসি টুকু বোধহয় গায়েব হলো । সহসা তাকালো শিশিরের দিকে । মেয়েটা চোখ নামিয়ে বসে আছে । খচখচ করছে নিজের মাঝে ।
আদ্রের দৃষ্টি পূর্ণ । অস্ফুটে প্রশ্নাত্মক উচ্চারণ করলো….
” বিয়ে ?
” হুম , আগামী বছরের তেইশ তারিখ ওর বিয়ে । হাতে সময় আছে । তবে খুব বেশি সময় নেই । এর জন্যই তো ওর সাথে দেখা করতে এসেছি আজ । জানো, অলরেডি এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে । এই দেখো , এটা ওর এনগেজমেন্ট রিং ! সুন্দর না ?
শিশিরের হাত টেনে আদ্রের সামনে ধরলো শাফাহ্ । আদ্র তাকানো মাত্রই দেখতে পেলো , একটা চিকন আংটি জ্বলজ্বল করছে অনামিকা আঙুলের গোড়ে । চোখ কুঁচকে আসলো ওর । বিস্তর ভাঁজ পড়লো মসৃণ ললাটে । কেমন থমকালো এক দন্ড । তাকিয়েই রইলো হাতের দিকে । শিশির নিজের হাত টেনে সরিয়ে নিতেই সম্বিত ফিরলো । নিচের দিকে তাকিয়ে কয়েক পলক ঝাপটে আবারো সোজাসুজি তাকালো মেয়েটার শ্যামলা মুখ পানে । বাতাসের ঝাপটায় হিজাব উড়ছে । চোখ নামানো ।
এ রুপে আদ্রের দৃষ্টি থমকালো আবার । কেনো যেনো শাফাহ্’র বলা কথাটা হজম হলো না । ভালো লাগলো না একটুও ।
কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা হলো । তবে কোথায় হলো ঠাহর করতে পারলো না ।
আদ্র কে নিস্তব্ধ দেখে শাফাহ্ ওকে ঝাঁকায়….
” কি হলো ভাইয়া ? কোথায় হারিয়ে গেলে ? কি দেখছো এভাবে ওকে ? সত্যিই বলছি , জানুয়ারির তেইশ তারিখ ওর বিয়ে । কনগ্রাচুলেট করো …
আদ্র মুখ খুললো না তবুও । অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে কেমন উদ্ভট বনে তাকিয়ে রইল । চোখ নামিয়ে ঘন পলক ফেলে আবারো তাকালো । সেভাবেই ঠোঁট নাড়িয়ে বলার চেষ্টা করলো….
” ক..কনগ্রাচুলেশনস !
শিশির চোখ তোলে । যত যাই হোক , আদ্র কে সে শিক্ষক হিসেবেই দেখে এসেছে । ওর সামনে এভাবে নিজের বিয়ের প্রসঙ্গে ইতস্তত সে । তবুও মুচকি হেসে বলে প্রত্যুত্তরে…
” থ্যাংক ইউ স্যার !
ফুসকা এসে গেছে । তিন প্লেট । ওদের তিনজনের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো । আদ্র হঠাৎই উঠে দাঁড়ায় । সে তো এসব খাবে না । এখানে বসে থেকে লাভ কি ? একটু দূরে সরে দাঁড়ালো বুকে হাত ভাঁজ করে । কেমন অদ্ভুত লাগতে শুরু করেছে আচানক । কিরকম লাগছে , নিজেও বুঝতে পারছে না । দূরে দাঁড়িয়েই অদ্ভুত ভাবে চোরা চোখ তাক করলো এদিকে । তিন জনের মধ্য থেকে এক জনের দিকে ! এই মেয়েটার বিয়ে ? কিন্তু কেনো ?
আবার উত্তর খুঁজে নিলো — কেনো আবার বিয়ে হবে ! বিয়ে হওয়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু নাকি ?
স্বাভাবিক হলেও ওর বিয়ের কথা শুনে এতোটা অবিশ্বাস্য লাগছে কেনো ? মন মানতে নারাজ হচ্ছে । সন্দিহান লাগছে নিজের কাছে । অনুভুতি টা অদ্ভুত । বোধহয় খারাপ লাগছে । অস্থির লাগছে । চোখের সামনে ভাসলো মেয়েটার হাতের আংটিটা ।
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে আদ্র…..
” হোয়াট ননসেন্স ,, আমার এমন লাগছে কেনো ?
মাথা ঝাঁকায় সে । চুল গুলো ব্যাক ব্লাশ করে অপর পাশের ঝিলের দিকে তাকায় । শিরশির বাতাস শরীর নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে । বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো সে । আবারো চোখ জোড়া আপনা আপনি রমনীদের পানে ফিরে আসে । টেনে হিচড়েও চোখ সামলাতে পারে না সে । এবার নিজের এই উদ্ভট কর্মকান্ডের জন্য চরম বিরক্তির মাত্রা ছাড়ালো ।
দাঁত পিষে মাড়ি খিচলো । হাত মুঠিয়ে কন্ঠ তুঙ্গে তুলে ধমকালো নিজেকে….
” ডিজাস্টিং !! আমার খারাপ লাগছে কেনো এভাবে ? হোয়াই ? এ কেমন এলোমেলো লাগছে আমার ? বেয়াদব গার্ল , সি ইজ জাস্ট মাই স্টুডেন্ট অর নাথিং ইলস্ ।
আর থামলো না । বিল দিয়ে ফিরে আসলো রমনীদের কাছে । শাফাহ্ গপাগপ ওর প্লেটের ফুসকা গুলো ফিনিস করেছে । মেঘা শেষটা মুখে পুরে নিলো । শিশিরের খাওয়া হয় নি এখনো । আজগুবি চিন্তা করতে করতে ধীরে ধীরে খাচ্ছে । আরো তিনটে ফুসকা আছে এখনো ।
আদ্র এসেই চড়া গলায় বললো…..
” হয়েছে খাওয়া ? চল , দেরি হয়ে যাচ্ছে !
শাফাহ্ তাকালো….
” হয়েছে তো । শিশিরের খাওয়া হোক । একসাথে যাই !
শিশির তৎক্ষণাৎ মুখ খোলে নরম গলায়…..
” আমি আর খাবো না ।
উঠে দাঁড়ালো প্লেট রেখে । আদ্র না তাকিয়ে ধীরে বললো….
” শেষ করো । অপেক্ষা করছি ।
” না স্যার , খাবো না আর । পেট ভরে গেছে । আমার ও দেরি হয়ে যাচ্ছে । ফিরতে হবে ।
তড়িঘড়ি করে আবারো রাস্তার এপাশে গাড়ির কাছে ফিরতে গেলে শিশির থামলো । ওদিকে ওর পথ উল্টো । থেমে বললো…..
” তোরা যা । আমি চলে যেতে পারবো । হাঁটার পথেই আমার বাড়ি । ওদিকে গেলে উল্টো হয়ে যাবে ।
আদ্র কথা টুকু শুনেছে । পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বললো না । আর একবারও তাকালো না । দৃঢ়ভাবে কদম বাড়িয়ে গমগমে স্বরে বলল শাফাহ্ আর মেঘার উদ্দেশ্যে….
” কোনো কথা বলার থাকলে তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে আয় । আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি !
এই বলে রাস্তা পার হলো সে । উঠে বসলো গাড়িতে । সিটে মাথা এলিয়ে ঠোঁট ফাঁক করে শ্বাস ফেললো ।
মাঝে একটা রাত কেটেছে । নতুন বছর আগামীকাল । রাত্রি পেরোলেই সাল পরিবর্তন হবে ।
শহর জুড়ে নতুন বছরকে সাদরে গ্রহণের জন্য বিস্তর আয়োজন চলছে । পুরো শহর সেজে উঠেছে রং বেরঙের আলোয় । হইহুল্লোড়, মাতামাতি হবে বেশ । প্রত্যেক বছরই হয় । একটা বছরের বিষন্নতা গুলো ধুয়ে মুছে সম্পুর্ন নতুন একটা বছরের আবির্ভাব ঘটবে । এ বছরের ক্লান্তি বয়ে বেরাবে কেউ , আবার কেউবা উড়িয়ে দেবে ।
মেঘার ক্ষেত্রে দোটানা । সে তার জীবনের একটা কঠিন ঘটনাকে উড়িয়ে দিতে পারে না সহজে । আবার সেটাকে সাথে করে নতুন বছরেও পা রাখতে পারে না । সে মূলত বিভ্রান্ত ।
কাল পহেলা জানুয়ারি । আজ রাতটাই আছে এ বছর শেষ হতে । এখন বিকেল । শহরের আনাচে কানাচে বাজি ফুটছে । মেঘা আর শাফাহ্ উঠেছে ছাদে ।
কাবির ম্যানসনে নতুন অথিতির আগমন ঘটেছে আজ । কাবির গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির নতুন শেয়ার হোল্ডার । পুরো একটা ফ্যামিলি এসেছে ।
নতুন বছরে কাবির গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির সাথে তাদের একটা বিজনেস ডিল হতে চলেছে ।
তৌসিফ কাবিরের ইনভাইটেশনে এসেছেন তারা । যদিও বা আসার কথা ছিলো না । লাস্ট মোমেন্টে চলে এসেছেন । একজন ভদ্রলোক, তার স্ত্রী আর ছোট মেয়ে ।
ড্রইং রুমে বেশ রমরমা আড্ডা জমেছে । বাড়িতে বাহিরের কেউ আসলে মেঘা আর শাফাহ্ কে নিচে নামতে দেওয়া হয় না । ওরা নামে নি তাই । ছাদেই আছে ।
মেহমানদের সাথে যে মেয়েটা এসেছে , সে প্রায় মেঘা আর শাফাহ্’র বয়সী হবে । চুপচাপ একপাশে গুটিয়ে বসে আছে মেয়েটা ।
বড়দের কথার মাঝে বিরক্ত হচ্ছে, প্রকাশ করছে না । ও তো আসতে চায় নি । ওর বাবা জোর করে নিয়ে এসেছেন । তোফায়েল কাবির মেয়েটার বিরক্তি বুঝে রুবিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বললো , যেনো মেঘা আর শাফাহ্ কে নিচে ডেকে আনা হয় ।
তাই করলেন তিনি । মেহের কে দিয়ে ডাক পাঠাতেই ক্ষণিকের ব্যবধানে নিচে নেমে আসলো দুই রমনী । ছাদ হতে ছটফটিয়ে নামলেও, পরমুহুর্তে শালীন ধীর পায়ে নিচে নেমে আসলো ।
জড়োসড়ো হয়ে সিঁড়ির একপাশে গুটিয়ে দাঁড়ালো । অতিথি ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা চকিতে তাকাতেই সালাম দিলো মেঘা ।
তোফায়েল কাবির বললেন মেয়েটা কে দেখিয়ে….
” মেঘা , ওকে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও । ও বোর হচ্ছে আমাদের মাঝে । তোমাদের সাথে থাকলে ফ্রি হবে । যাও…
মেঘা মুচকি হাসে । মেয়েটার দিকে তাকায় । তোফায়েল কাবির এবার মেয়েটাকে বলেন….
” যাও মা ,, ওদের সাথে ওদের রুমে যাও । এখানে থাকতে হবে না তোমায় ।
মেয়েটা উঠে দাঁড়ালো জোর পূর্বক হেসে ।
ভদ্রলোক মেঘা আর শাফাহ্ কে দেখে জানতে চাইলেন….
” এরা বুঝি আপনাদের মেয়ে ?
উত্তর করলেন তৌসিফ কাবির !
” জি , আমার বড় মেয়ে মেঘা আর ছোট মেয়ে শাফাহ্ ।
বাড়িতে নতুন কোনো অতিথি আসলে মেঘা কে এ বাড়ির মেয়ে হিসেবেই পরিচয় দেওয়া হয় । তৌসিফ কাবিরের বড় মেয়ে হিসেবে পরিচয় করানো হয় ওকে । এটা নতুন কিছু নয় ।
ভদ্রলোক দুই মেয়েকে ভালো ভাবে দেখলেন । হেসে শুধালেন…..
” মেয়েরা বড় হয়েছে ভাই , দুটো দায়িত্ব আপনাদের কাঁধে । আমার মেয়ের বয়সীই হবে তো ওরা । ভাবেন নি ওদের নিয়ে ?
মেঘা আর শাফাহ্ এদিকে কান না দিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে মেয়েটাকে নিয়ে । তোফায়েল কাবির কথা এড়াতে বললেন…..
” সেসবে ভাবা হয় নি এখনো । সময় হোক ঠিক ভাববো ।
” সময় আর কবে হবে ? দুটো মেয়ে , এক এক করে ভাবুন । আপনাদের মেয়ে দুটো ভারী মিষ্টি । কি নাম বললেন, মেঘা আর শাফাহ্ । বড় জন তো মেঘা ? বেশ মিষ্টি মেয়ে । ওকে আগে বিয়ে দেবেন না ?
সিঁড়ির মাঝামাঝি মেঘার পা থমকায় । তোফায়েল কাবির পড়েন বিপাকে । প্রসঙ্গ বেগতিক ঘুরে যাচ্ছে । তৌসিফ কাবিরের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করেন তিনি । আমতা আমতা এসে যায় জিভে । মুখ খোলার আগেই ভদ্রলোক আবার বলেন ….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮
” যদি বলেন তাহলে একটা প্রস্তাব রাখতে পারি ! নতুন বিজনেস পার্টনারের সাথে সাথে নতুন একটা সম্পর্ক গড়া যেতেই পারে । ছোট মেয়ের আগে বড় মেয়েকে নিয়ে ভাবুন । আমার মিসেস এর ভাইয়ের ছেলে আছে । ইন্জিনিয়ার ! প্যারিসে সেটল । বেশ ভালো ছেলে । আপনার বড় মেয়ের সাথে একদম পারফেক্ট মানাবে ! জানি এসব হুটহাট বলাটা ভালো দেখাচ্ছে না । তবুও প্রস্তাব রাখছি । আপনাদের আলাদা কোনো চিন্তা ভাবনা না থাকলে সম্পর্ক এগোনো যেতেই পারে । কি বলেন ?
