আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৯
সুরভী আক্তার
স্তম্ভিত হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেঘা । রৌদ্র বাঁকা হাসি প্রগাঢ় করে এক পা দু পা করে এগিয়ে আসে । দূরত্ব কমিয়ে কাছাকাছি আসে মেঘার । পাঁচ ফুট উচ্চতার মেঘার তুলনায় পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির রৌদ্র অনেক টা লম্বা । ও কাছাকাছি আসতেই মেঘা মাথা উঁচিয়ে চোখ তুললো । এক রাশ তিতিবিরক্তি নিয়ে চাইলো রৌদ্রের চোখ বরাবর । রৌদ্র একটু আগে নিজের বলা কথা টাকে ঢাকতে ঝুঁকে বললো মৃদু স্বরে….
” গুড মর্নিং এর পরিবর্তে গুড মর্নিং বলে উইশ করতে হয়, জানিস না ? নাকি এই ওয়ার্ড টা আদ্র শেখায় নি তোকে !
বিব্রত হলো মেঘা । পিছিয়ে আসলো ছিটকে । বললো তিরিক্ষি হয়ে…
” গুড মর্নিং না ছাই , এই রাইনো (গন্ডার বোঝাতে) মুখো ফেস দর্শনে ঘুম ভাঙল আজ আমার । না জানি দিনটা কেমন যায় ! যত্তসব ! সকালের শুরুটাই বিগড়ে দিলো…
” হোয়াট ? হু রিজ রাইনো মুখো ? রাইনো কাকে বলছিস তুই ?
রেগে বললো রৌদ্র । মেঘা হেলাফেলা করে বললো…
” আপনাকে ! ঘুম থেকে উঠে তো আর কাউকে দেখি নি ।
তেড়ে এগোলো রৌদ্র….
” ইডিয়ট , একটা থাপ্পর খেয়েও শিক্ষা হয় নি ? মা’র খেতে চাইছিস সকাল সকাল ? দুটো থাপ্পর মেরে গুড মর্নিং টাকে ব্যাড মর্নিং করে দেই ? এমনিতেও এখনো আমার হাতে উনপঞ্চাশ টা থাপ্পর খাওয়া বাকি আছে তোর । শোধ করতে হবে তো । থাকবো না আমি বেশিদিন । আর দশটা দিন আছি শুধু । তারপর তো চলেই যাবো আবার । এই দশ দিনে উনপঞ্চাশ টা থাপ্পর মিটিয়ে তবেই যাবো । এক কাজ করি , রোজ রোজ পাঁচ বেলা পাঁচটা করে সপাটে থাপ্পর মারি তোকে । তাহলে দিন শেষে হিসেব মিলে যাবে ঠিক । খাবি আমার হাতের থাপ্পর ? এক থাপ্পড়ে কাল সারাদিন কিছু খাস নি ? এভাবে রোজ রোজ থাপ্পর খেলে অন্ন বেঁচে যাবে এ বাড়ির ।
কথা গুলো বোধগম্য হলো না মেঘার । কিসের থাপ্পর , আর কিসের হিসেব ? মুখ বাঁকালো মেঘা । অতোটা গুরুত্ব দিলো না । গা ম্যাজ ম্যাজ করছে । নিচে নেমে শাওয়ার নেবে আগে । রৌদ্রের কথার পরিপ্রেক্ষিতে আর প্রতিক্রিয়া দেখালো না মেঘা ।
মুখ বাঁকিয়ে রৌদ্র কে উপেক্ষা করে ছাদের দরজার দিকে পা বাড়ালো । দরজা পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রেখে পিছু ফিরে রৌদ্র কে আরো একবার দেখে মুখ গোল করে বিড়বিড় করে বোঝালো….
” রাইনো মুখো…
অতঃপর দ্রুত বেগে এক ছুট লাগালো দোতলায় । এদিকে আক্রোশে ফুসে উঠলো রৌদ্র । এই মেয়েটা আবার ওকে গন্ডার মুখো বললো ? তার মানে ও গন্ডারের মতো দেখতে ?
নিজের সৌন্দর্যে কুৎসিত তকমা লাগতেই বিভৎস ক্ষেপে যায় রৌদ্র । তীব্র রাগ সমেত দাঁত খিচে মেঘা কে পেছন থেকে ডেকে ওঠে ক্রোধে…..
” ইভারা…
মেঘা তড়তড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমেছে । করিডোরে এক ছুটে নিজের ঘরের দিকে এগোলো । সাড়ে সাতটা বাজে এতক্ষণে । শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হতে হবে । আজ নিশ্চিত দেরি করবে ও । ওদিকে টুকটুকি উঠেছে কি না কে জানে ? উঠলে তো এতক্ষণে মেঘার খোঁজ করতো । খোঁজ করে নি , তার মানে ঐ কুম্ভকর্ন এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে । ছটফটিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোতেই আদ্রের মুখোমুখি হলো মেঘা । ছাদ বেয়ে নামতে গেলে শুরুতেই আদ্রের ঘর পড়ে , তারপর ওদের ঘর । আকস্মিক আদ্রের সম্মুখবর্তী হতেই ছটফটে মেঘা কুঁকড়ে গেলো ।
চিবুক নামিয়ে ঢোক গিললো । আদ্র ফিটফাট হয়ে সবে ঘর থেকে বেরোচ্ছিলো শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে । মেঘা কে এমতাবস্থায় দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো ও । এই মেয়ে এসময় ছাদে উঠেছিলো ? সন্দেহ কাটাতে রাশভারী গলায় প্রশ্ন করলো আদ্র….
” ছাদে উঠেছিলি ?
মেঘা ছাদে ঘুমানোর ব্যাপারটা পুরোটা চেপে গেলো । মুখ খুললেই বকা খাবে আদ্রের কাছে । চিবুক খানিক তুলে হাতের ফ্রেম টাকে পেছনে লুকিয়ে নিলো । আমতা আমতা করলো …
” না মানে , হ্যাঁ ? একটু হাওয়া খেতে উঠেছিলাম ।
” কটা বাজে দেখেছিস ? টাইমিং সেন্স আছে ? চটপট তৈরি হয়ে নিচে আসবি ।
” আচ্ছা ।
এটুকুনি বলেই ঘরে ঢুকলো মেঘা । আদ্র ডান হাতাটা গোটাতে গোটাতে ওর থেকে দৃষ্টি সরালো । সামনে তাকাতেই বিষ্ময়ে চোখ জোড়া সূক্ষ্ম হয়ে আসলো ওর । ছাদের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে নামছে রৌদ্র । নেমেই করিডোরে থামলো ও । চোখাচোখি হলো দুই ভাইয়ের । আদ্র হতবাক হতে ভুললো না । প্রশ্ন জাগলো মনে । রৌদ্র ও ছাদে ছিলো ? আর মেঘাও ? একসাথে ছিলো এ দুটোতে ?
চোখের সূক্ষ্যতা বাড়ে আদ্রের । রৌদ্র ওকে দেখে হন্তদন্ত অবস্থার পরিবর্তন আনলো । স্বাভাবিক হলো ।
নীরবে শ্বাস ফেলে মেঘার পিছু ছেড়ে উল্টো পথে নিজের ঘরে ঢুকলো । বেশ কিছুক্ষণ হতচকিত হয়ে তাকিয়েই রইলো আদ্র ।
মেঘা ঘরে ঢুকে দেখে শাফাহ্ এখনো হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমোচ্ছে । এই মেয়ের ঘুমের অভ্যাস একদম ভালো না । ফাঁকা খাট পেয়ে মাড়াই চালিয়েছে পুরো খাটে । ঘুমের ঘোরে হামাগুড়ি দিয়ে ঠিক খাটের কর্নারে এসে থেমেছে । আর একটু হলেই পড়ে যাবে এমন দশা ।
মেঘা দুদিকে মাথা নাড়ালো । হাতের ফ্রেম টা আগের জায়গায় রেখে চেঁচিয়ে ডাকলো শাফাহ্ কে । শাফাহ্ ডাক শুনে নড়েচড়ে উঠলো । মেঘা ড্রয়ার থেকে কাপড় বের করে ওয়াশ রুমের দিকে এগোতে এগোতে আবার ডাকলো ওকে । এই মেয়ে ডাক শুনে উমম উমম করে নড়েচড়ে আবার ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে । ওঠার নাম নেই । মেঘা ওয়াশ রুমে ঢোকার আগে থামলো ।
ফিরে এসে এসি অফ করে দিয়ে ঢুকলো ওয়াশ রুমে । সময় নেই । গরমের দাপটে ঠিক ওঠে যাবে এই মেয়ে ।
যা ভাবলো , হিতে বিপরীত । শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েও এই মেয়েকে ঠিক একই অবস্থায় দেখলো পড়ে পড়ে ঘুমাতে । অথচ ভার্সিটির দেরি হয়ে যাচ্ছে । বিরক্ত হলো মেঘা । চটপট এগিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকলো শাফাহ্ কে….
” এই টুকটুকি , উঠবি এখন ? আর কত ঘুমাবি ? দেরি হয়ে যাচ্ছে ! এই গরমেও হেরফের নেই তোর ? আজব তো , গরম লাগছে না ? ওঠ…
শাফাহ্ নড়েচড়ে মুখ খুললো কাতর কন্ঠে….
” গরম লাগছে , এসিটা একটু অন করে দে না মেঘা । আর এক ঘন্টা ঘুমিয়েই তারপর উঠবো শিওর ।
মেঘা হতভম্ব হয় । কি বলে এই মেয়ে ?
হাতে সময় নেই , আর ও নাকি আরো এক ঘন্টা ঘুমাবে ? ফোঁস করে শ্বাস ফেলে গলা উঁচিয়ে বললো মেঘা….
” সাড়ে আটটা বেজে গেছে , এখনো উঠবি না ? থাক তুই , আমি গেলাম । আদ্র ভাইয়া তৈরি ! গাড়িতে উঠে পড়েছে ইতোমধ্যে । আমি আর ভাইয়া চলে গেলাম । তুই থাক…। মনে রাখিস , ভাইয়ার ক্লাস অযথা মিস করলে কিন্তু ভাইয়া ছাড়বে না তোকে । ক্লাসের সবার সামনে ঝাড়ি খেতে চাইলে ঘুমা , এক ঘন্টা কেনো ? সারাদিন ঘুমা , আমি গেলাম….
মেঘা মিছামিছি ভয় দেখালো ওকে । ভাবলো এবার হয়তো লাফিয়ে উঠবে ঘুম ছুটিয়ে । কিন্তু না । এই কুম্ভকর্নের হেলদোল নেই । বরং হাত উঁচিয়ে বললো আধো গলায়….
” যা , গুড নাইট ….
মেঘা আশ্চর্য বনে যায় । এখন নাইট এই মেয়ের কাছে ? মেঘা কোমরে এক হাত ঠেসে মুখ গোল করে তাকায় শাফাহ্’র দিকে ।
কপাল চাপড়ে বলে….
” ওরে রাক্ষস রাজ রাবনের ভাই কুম্ভর্নের মেয়ে ভার্সন , ঘুমা তুই । আমি আর ডাকতে পারবো না তোকে ।
বলেই গিজগিজ করে ঘর ছাড়লো মেঘা ।
ব্রেকফাস্ট করে তারপর তৈরি হবে ।
সকাল এখন দশটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । লেকচারার আদ্রিয়ান কাবির আদ্র গুরুভার হয়ে লেকচার ঝাড়ছে ক্লাসে । সবার গহীন মনযোগ ওর দিকে । লেকচারের সাথে সাথে সবটা নোটস করছে সকলে । একমাত্র নোটস করা থেকে বিরত শাফাহ্ । মেঘা ওর পাশের সিটে বসে সুন্দর করে নোটস করছে । মেঘা যেহেতু করছে , সেহেতু ওর করে লাভ কি ? শাফাহ্ পিট পিট করে এক বার ডানে তো আরেক বার বামে তাকাচ্ছে । দুই ব্রিলিয়ান্ট ওর দুই পাশে । ডানে মেঘা আর বামে শিশির । আর মাঝখানে ও একলা নির্বোধ । জোর পূর্বক আদ্রের কথা গুলো মাথায় ঢোকাচ্ছে এই অনেক । খাতায় তুলতে গেলে গুলিয়ে যাবে সব । একসাথে এতো ভারী ভারী লেকচার দুই জায়গায় ধরানো যায় নাকি ? মাথায় ধরছে , এই বিরাট ব্যাপার । মেঘা খাতায় ধরছে , পরে ওর থেকে নিয়ে নেওয়া যাবে ।
শাফাহ্ নিরিহ মুখে পিটপিট করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে । আদ্র একটু থেমে বোর্ডের কাছ থেকে সরে এসে নিজের চেয়ারে বসলো । সবার মনযোগ এখন খাতার দিকে । বোর্ডের সবটা নোট করে নিচ্ছে সকলে । পিনপতন নীরবতা পুরো ক্লাস রুমে । এতক্ষণ আদ্র বকবক করলো হাত চালানোর সাথে সাথে । এখন বিরতি নিয়ে সে নিজেও চুপ ।
চোখ তুলে তাকায় আদ্র । ক্লাসের সব স্টুডেন্ট কে দেখে নেয় এক পলক করে । সবাই লিখছে । এক পর্যায়ে দৃষ্টি আটকায় আদ্রের । সবাই লিখছে না । শাফাহ্ লিখছে না ।
কপাল কুঁচকে ফেলে আদ্র । এই মেয়ে লিখছে না কেনো ? বুক ডেস্কে কনুই ঠেসে গালে হাত রেখে মেঘার লেখা দেখছে শাফাহ্ ।
আদ্র উঠে দাঁড়ালো । নিঃশব্দে এগোলো ওদিকে । বাম দিক দিয়ে আলগোছে ওদের সারির ডেস্কের পাশে দাঁড়ালো । ঠিক শিশিরের পাশে । পাশে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে লেখা ছেড়ে চোখ তুললো শিশির । আকস্মিক আদ্র কে দেখে খানিক চমকালো । তবে আদ্রের দৃষ্টি ওর নিজের দিকে নেই , এটা দেখেই স্বস্তিতে স্থির হলো মেয়েটা । বুকে আড়াআড়ি হাত গুটিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে অমনযোগী শাফাহ্’র দিকে চেয়ে আছে আদ্র । অথচ শাফাহ্ ওর আবির্ভাব টের পেলো না ।
শিশির পরিস্থিতি বুঝে কনুই দিয়ে আলতো করে খোঁচালো ওকে । দুবার খোঁচা খেয়ে মেঘার দিক থেকে শিশিরের দিকে বলতে বলতে ফিরলো শাফাহ্….
” কি হয়েছে ?
কথা শেষ হতে না হতেই নজর পড়লো সুঠাম দেহি আদ্রের উপর । অমনি পিলে চমকালো মেয়েটার । চোখাচোখি হতেই হেঁচকি তুললো তৎক্ষণাৎ । দাঁত কেলিয়ে ঠোঁট আলগা করলো ।
রাশভারী গলায় ধমকের সুরে বলে উঠলো আদ্র….
” হোয়াট হ্যাপেন্ড ? এদিক ওদিক কি দেখছো ? নোটস কোথায় তোমার ?
ভদ্রতার সহিত উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করলো শাফাহ্…..
” না , স্যার !
” হোয়াট ? নোটস কোথায় ? লেট মি সি…
” নোট তো করিই নি আমি !
জড়ানো গলায় মিনমিন করলো শাফাহ্ । করুন চোখে তাকালো । ইশারায় বোঝালো , এতো সবার সামনে যেনো ছাড় দেয় ওকে ! ধমকালে আদ্রের সাথে আড়ি করবে সে । বিপরীতে আদ্র মুখো ভঙ্গিমা আরো কঠোর করে শক্ত কন্ঠে বলল…
” নোট করো নি কেনো ?
” স্যার….
” হোয়াট স্যার ? অ্যান্সার মি , নোট করো নি কেনো ?
ঠোঁট উল্টায় শাফাহ্ ।
” মেঘা তো নোট করছে , এতেই হবে আমার । বেকার বেকার দুটো পৃষ্ঠা আর কলমের কালি নষ্ট করবো কেনো ? আমরা সেম সেম… একজনের হলেই দুজনের হয়ে যাবে ।
আদ্র কথা না বাড়িয়ে পানিশমেন্ট দিলো….
” পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকবে । একে তো ক্লাসে অমনোযোগী , তার উপর উল্টো পাল্টা লজিকে মুখে মুখে তর্ক করেছো । ইটস ইউর পানিশমেন্ট ।
বলেই হনহনিয়ে ওদের পাশ থেকে সরে আসলো আদ্র । ক্লাসের সবাই লেখার ফাঁকে দৃশ্য টুকু দেখলো । মুখ কালো করে ওষ্ঠ উল্টে ছলছল চোখে আদ্রের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল শাফাহ্ । কেউ কেউ ঠোঁট চেপে হাসছে ওকে দেখে ।
বিকেলে অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন তোফায়েল কাবির । ব্যালকনিতে ইজি চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছেন তিনি । চোখ লেগে আসছে তার । শরীর অবসন্ন লাগছে । শরীরের ভার টেনে ঘরে নিতেও দূর্বলতা আসছে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে জোর কমে আসছে ইদানিং ।
চোখের পাপড়ি নিভিয়ে নীরবে বসে আছেন তিনি । রুবিনা কাবির ঘরে ঢুকলেন । ঘর থেকে সোজা বারান্দায় উপস্থিত হলেন । এসময়ে এক কাপ চা নিয়ে আসতে ভুলে যান নি । চায়ের কাপ খানা স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গলা পরিষ্কার করে ডাকলেন তিনি….
” শুনছেন ?
চোখ মেললেন তোফায়েল কাবির । নড়চড় না করে উত্তর করলেন….
” হুম ,বলো !
” চা এনেছি । নিন আগে ।
চায়ের কাপ হাতে নিলেন তোফায়েল কাবির । রুবিনা কাবির খানিক সময় চুপ থেকে কথা গুছিয়ে নিলেন মনে মনে । অতঃপর মুখ খুললেন….
” আমি যা বলেছিলাম , তা কি মনে আছে আপনার ?
” কি ?
” রৌদ্রের বিষয়ে !
” ভুলে গেছি । আবার বলো ….
রৌদ্রের প্রতি তোফায়েল কাবিরের উদাসীনতা দেখে কেবলই দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন রুবিনা কাবির । বললেন….
” রৌদ্র কে আর ফিরতে দেবো না আমি । যে করেই হোক ওর যাওয়া টা আটকান । দিন গুলো চোখের পলকে পেরিয়ে যাচ্ছে । ওর চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে । আপনি যা খুশি করে আটকান আমার ছেলেকে ।
” তোমার বেপরোয়া ছেলে কে আজ অবধি কখনো আটকাতে পেরেছি ? যে এবার পারবো ?
” চেষ্টা করলেই পারবেন । চেষ্টা তো করে দেখুন ।
” তোমার ছেলের হালচাল কিছুই বোধগম্য হয় না আমার । কিভাবে চেষ্টা করবো ? চেষ্টার জন্য একটা খুঁটি প্রয়োজন । সেই খুঁটি কে কেন্দ্র করে না হয় চেষ্টা করতাম । কিন্তু কি করবো ?
” শুভ্রের বিয়েটা দিয়ে দিন এই সময়ে । এতে করে রৌদ্র আটকে যাবে । শুভ্রের দিকটা ফেলতে পারবে না ও ? এমনিতেও আংটি বদল তো হয়েই আছে । বিয়েটা বেকার বেকার আটকে রেখে লাভ কি ? এখনো হাতে দশদিন সময় আছে । এই দশ দিনের মাথায় ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করুন । বিয়েতে রৌদ্র কে একবার আটকানো গেলে , পরে আরো কোনো ছলে ঠিক আটকানো যাবে ওকে । আগে একবার আটকাই । পরের টা পরে ভাবা যাবে ।
” পরের টা পরে নয় । এখনই ভেবে রাখো । আর শুভ্রর বিয়েতে আমাদের কোনো হাত নেই । ওর মা বাবা আছে । আমরা বললেই সবটা হয়ে যাবে না ।
” কেনো হবে না ? ঠিক হবে ! রৌদ্র কে আটকানোর একমাত্র সুযোগ এটা । এমনিতেই মেঘা কে এ বাড়িতে দেখার পর রৌদ্র আরো বেশি রেগে আছে হয়তো । দেখলেন না , কাল চড় মারলো কিভাবে ? রৌদ্র কে আটকান , আর তারপর মেঘা কে তাড়ান এ বাড়ি থেকে । ঐ মেয়ে এ বাড়িতে থাকলে আমার ছেলে থাকবে না । আর কতদিন থাকবে ঐ মেয়েটা আমাদের কাছে ? অনেক তো হলো….
” রুবিনা , মুখ সামলে কথা বলো ।
আকস্মিক ধমকে চমকে উঠলেন রুবিনা কাবির । তোফায়েল কাবির ধমকেই তিক্ত স্বরে বললেন….
” মেঘা এমনি এমনি আমাদের বাড়িতে নেই । কেনো আছে,তা তোমার অজানা নয় । আর কতদিন আছে , বা থাকবে সেটাও তোমার অজানা নয় । ওকে তাড়াবো মানে ? মাথা ঠিক আছে তোমার ? আরে ঐ মেয়েটাকে তো তোমার ছেলেই এনে ফেলেছিলো এ বাড়িতে ! আর এখন তাড়াতে বলছো ওকে ? কোথায় তাড়াবো ? কোথায় যাবে ও ?
” কোথায় যাবে সেটা আমি কি করে জানবো ? রৌদ্র একটা ভুল করে ওকে এ বাড়িতে এনে ফেলেছিলো , কিন্তু ও তো আর রৌদ্রের জন্য এ বাড়িতে পড়ে নেই । আর আপনার কি মনে হয় , রৌদ্র ওকে মানে ? আর নাকি মানবে কখনো ?
” ও এবাড়িতে কেনো পড়ে আছে সেটা তোমার অজানা নয় । সময় আসলে ও নিজেই চলে যাবে । এভাবে তোমার কাছে ক্ষুণ্ন হতে হবে না ওকে । আর বাকি রইলো তোমার ঐ বেপরোয়া ছেলের কথা । ওর মানা না মানাতে কোনো যায় আসে না । তোমার ছেলের জন্য এ বাড়িতে পড়ে নেই ও । যদি বিয়ে হয়েই থাকে , তাহলে ও এসে একেবারের জন্য ডিভোর্সের মাধ্যমে মেঘা কে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে তোমার ছেলের থেকে ।
” আমার ছেলে নিজেই ছাড়বে ওকে । ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে না কাউকে ।
” সেটা সময়ই বলবে । ছেলে কে নিয়ে এতো দাপট মানাচ্ছে না । একটু কমন সেন্স থেকে ভাবনা চিন্তা করো । তাহলে খুশি হবো ।
” হয়েছে , আমাকে আর কমন সেন্স শেখাতে হবে না আপনার । আপনি শুধু এখন ভাইজানের সাথে কথা বলুন । শুভ্রের বিয়েটা দিয়ে দিন এবার । গাফিলতি করে আমি আমার ছেলেকে আর হারাবো না ।
” ভেবে দেখবো , এখন যাও এখান থেকে ।
” ভেবে দেখবো নয় । করতেই হবে । সময় নেই…
” আচ্ছা , ভাইজান কে বলি আগে । এখন যাও তুমি ।
সন্ধ্যা গড়িয়েছে । পশ্চিমাকাশ এখনো সিঁদুর রাঙা ।
মেঘা আর শাফাহ্ উঠেছিল ছাদে । আজান পড়তেই নিচে নামার জন্য হামলে পড়লো শাফাহ্ । বরাবরের ন্যায় আজও নিজের সাথে নিজেই চ্যালেঞ্জ ধরে ওকে মেঘার আগে নামতেই হবে । ছাদের দরজা পর্যন্ত একসাথে এসে মেঘা কে পাশ কাটিয়ে এক ছুট লাগালো শাফাহ্ । নিজে হুড়মুড়িয়ে পা চালিয়ে মেঘা কে সাবধান করে চেঁচালো….
” ধীরে নাম মেঘা , নয়তো পড়ে যাবি ।
মেঘা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে শ্বাস ফেললো । এই মেয়েটা ভীষণ বাচ্চামো করে । খানিক হাসলো মেঘা ।
তিন তলা থেকে দোতলায় সেভাবে হুড়মুড়িয়ে নামতে গিয়ে সিঁড়ির ধাপে পা এলোমেলো হতে দেরি হলো না শাফাহ্’র । অসাবধানতাবশত পা উঁচু নিচু হতেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা হলো না , ভারসাম্য হারিয়ে এলোমেলো হয়ে পা পেঁচিয়ে এলো ওর । নিমিষেই শরীর টা হেলে পড়লো সামনের দিকে । রেলিং ধরতে গিয়েও টাল সামলাতে পারলো না শাফাহ্ । পড়ার আগেই আহ্ সূচক তীব্র আর্তনাদে চেঁচিয়ে উঠলো । ঝংকার উঠলো সিঁড়ির চারপাশে । চেঁচানো শেষ হতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো আশপাশ । পুরো সিঁড়িটা হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়লো শাফাহ্ । দ্বিতীয় বার আর চিৎকারের জন্য মুখ খুলতে পারলো না ।
মেয়েটার কোমর সমান চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর ঝাপটে পড়লো । তীব্র ব্যথায় মুখ সমেত কুঁচকে এলো ভ্রু । ঝমঝমিয়ে উঠলো কোমল অবয়ব । কয়েক সেকেন্ডের জন্য জড়বুদ্ধি হয়ে গেলো মেয়েটা ।
মস্তিষ্ক সজাগ হতে বিলম্ব ঘটলো । ভারী শ্বাস পড়লো দীর্ঘক্ষণ বাদ । শাফাহ্ নিজে চেতনায় ফেরার আগে মেঘার বিচলিত ভড়কানো কন্ঠ ভেসে আসলো সিঁড়ির উপর থেকে….
” টুকটুকি….
মেয়েটা সোজা সিঁড়ি গলিয়ে দোতলায় এসে উল্টে পড়েছে । মেঘার ডাকে সম্বিত ফিরতেই ব্যাথায় ঠোঁট কামড়ে ধরলো শাফাহ্ । চোখ খিচে ফেলেছে সেই কবেই । কোমর আর পায়ে টনটনে ব্যাথা অনুভব করতেই কুকিয়ে উঠলো । মেঘা ওকে সামলাতে হুড়মুড়িয়ে নিচে নামার আগেই শাফাহ্ গলা চিরে চিৎকার করে উঠলো ব্যথাতুর বেদনায়….
” ও আমার মা’গো……
বিছানায় বসে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছে শাফাহ্ । নাকের জল চোখের জল মিলেমিশে একাকার । পায়ের গোড়ালি মচকে বেঁকে গেছে । একটু আগে ডাক্তার এসেছিলেন , ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছে । বেশি ইনজুরি না হলেও একেবারে কম কিছুও হয় নি ।
সেই থেকে এই মেয়ে কাঁদছে এভাবে ফ্যাচ ফ্যাচ করে । শাহিনা কাবির চরম রেগে গেছেন ওর উপর । এই মেয়ের ছটফটে পনা আর চঞ্চলতার জন্য তো কম বিপত্তি হয় না ! যা হয় , ওর নিজেরই ক্ষতি হয় । এই যেমন আজ পা মচকে বিছানায় পড়লো । না জানি কতদিন এভাবে পড়ে থাকবে । তার উপর বাড়ির সবার আদুরে রাজকন্যা । সবার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে ওর এই অবস্থা দেখে ।
পুরো বাড়ির সবাই শাফাহ্’র ঘরে ভিড় জমিয়েছে । ঐ মেয়ে কাঁদছে । আর সবাই এটা ওটা বলে কয়ে শান্তনা দিচ্ছে ওকে । আহ্লাদে মাথায় তুলে ফেলেছে মেয়েকে । সবার এতো এতো আহ্লাদে আটখানা শাফাহ্ । এখন ব্যাথা না করলেও চোখ টিপে টিপে কান্না করছে ও ।
শাহিনা কাবির মেয়ে কে বকতে বকতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন । শাফাহ্ কান্নার বেগে ফোপাচ্ছে । তৌসিফ কাবির উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েকে শান্ত স্বরে বললেন….
” আর কাঁদতে হবে না । ব্যাথা সেরে যাবে । চুপচাপ রেস্ট নাও এখন ।
বলেই বেরিয়ে গেলেন তিনিও ।
একে একে ঘর ছাড়লো সকলে । মেঘা শাফাহ্’র পাশে বসে । আদ্র বসে খাট বরাবর সামনের সোফাটায় । সামনের দিকে ঝুঁকে সরু চোখে পরখ করছে শাফাহ্ কে । শুভ্র এখনো বাড়ি ফেরে নি । আকস্মিক দরজা ঠেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো সে, হন্তদন্ত হয়ে ডাকলো বোনকে….
” টুকটুকি ।
ওর হকচকিত স্বরে মেঘা , আদ্র আর শাফাহ্ চকিতে তাকালো দরজার দিকে । শুভ্র দ্রুত বেগে বোনের পাশে এসে বসলো । উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো….
” কি হয়েছে ? শুনলাম সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছিলি ! পা মচকেছে ? পড়লি কি করে তুই ? ব্যান্ডেজ করেছে , কতটা ফ্র্যাকচার হয়েছে ? ব্যাথা করছে খুব ? ঠিক আছিস তুই ? তোকে কত বলি লাফালাফি করবি না । শুনিস কারো কথা ? এখন দেখ তো কি অবস্থা করলি নিজের ! ডাক্তার কি বলেছে বনু ? সেরে যাবে তো পা ?
ওষ্ঠ উল্টায় শাফাহ্ । শুভ্রের এতো এতো সব প্রশ্নের উত্তর করে আদ্র । উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে বলে….
” তোমার বোন ঢং করছে ভাইয়া । তিলকে তাল করো না তো ! কিচ্ছু হয় নি ওর । জাস্ট একটু পায়ে লেগেছে । এতেই এই ঢংগি পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে । সবাই ওকে এমন ভাবে ট্রিট করছে , যেন আরো কতো বড় সড় কিছু হয়ে গেছে ! বাদ দাও ওর কথা , ওকে যতো আশকারা দেবে , তত মাথায় উঠবে ও । তুমি যাও , গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও ।
শুভ্র তবুও বিচলিত হয়ে বললো….
” আদ্র , মজা নিস না । এক্সাটলি বল , কি হয়েছে ওর ?
” তেমন কিছু না , ওর চপল গিরির জন্য শুধু একটু পা মচকেছে । এর বেশি কিছু হয় নি । ডোন্ট ওয়ারি…
” এহহ্ , বেশি কিছু হয় নি , বলেছে তোমায় ? ওটা ভুয়া হাতুড়ি ডাক্তার এনেছো , তাই আমার ফ্র্যাকচার ধরতে পারে নি । পা ভেঙেছে আমার , আর ঐ বেটা বলছে মচকেছে আমার পা । ব্যাথায় মরে যাচ্ছি , আর তুমি বলছো ঢং করছি আমি ?
” তোকে চেনা আছে আমার । চুপচাপ বসে থাক । আরো কর উড়নচণ্ডী গিরি । পড়ালেখায় ডাব্বা , ক্লাসে মনযোগ নেই । আর সারাদিন ধেই ধেই করে বেড়াবে । এবার বসে থাক পা ভেঙ্গে । পেয়ে গেলি তো একটা সুযোগ , এই সুযোগে মাস কয়েক ভার্সিটি মুখো হবি না আর । স্টুপিড কোথাকার….
ভার্সিটির কথা উঠতেই নেকি কান্না ছেড়ে ফোঁস করে বলে উঠলো শাফাহ্….
” হায় আল্লাহ , আমি তো ভুলেই গেছি । আমি না তোমার সাথে কথা বলবো না বলে প্রমিস করেছিলাম । তুমি পাক্কা পঁচিশ মিনিট ক্লাসের সবার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলে আমায় । আ’ম এংগ্রি উইথ ইউ । বেরোও আমার ঘর থেকে…
আদ্র বেরিয়ে যেতে যেতে বললো…
” তোর ঘরে থাকতে আসি নি আমি , টুকটুকির বাচ্চা…
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চা ! তোমার সাথে কোনো দিন কথা বলবো না আমি ।
মেঘা গালে হাত ঠেকিয়ে দুটোর বকবক শুনলো ।
শুভ্র থামালো শাফাহ্ কে…
” উফ্ থামবি , নিজের ভুলের জন্য আজ তোর এই দশা । এখন এভাবে পা ভেঙ্গে কতদিন পড়ে থাকবি ? রেস্ট কর এখন , আমি রুমে যাচ্ছি ।
শুভ্র উঠে দাঁড়াতেই শাফাহ্ হাত টেনে ধরলো, বাচ্চাদের ন্যায় পিটপিট করে ভেজা চোখে তাকিয়ে বললো…
” চকলেট আনো নি ?
” না , তাড়াহুড়ো করে এসেছি । মনে ছিলো না । কাল এনে দেবো ।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো শুভ্র ।
এগারোটা পেরিয়েছে । বাড়ির ছোট ছেলের নীড়ে ফেরার নাম নেই । বাড়ির চাবি আছে ওর কাছে । আজ আর অপেক্ষা করেন নি রুবিনা কাবির । ছেলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমে টলে পড়েছেন ড্রইং রুমের সোফায় । রৌদ্র সবে ফিরলো । চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । সোজা উপরে যেতে গিয়েও থামলো একটু । সোফায় রুবিনা কাবির আধশোয়া হয়ে ঘুমিয়ে আছেন । রৌদ্র বিপরীতে পা চালিয়ে তাকে ডাকলো….
” মম ,
এক ডাকেই সজাগ রুবিনা কাবির ধড়ফড়িয়ে উঠলেন ।
” হ্যাঁ , রৌদ্র ? এসেছিস ? চোখ লেগে এসেছিলো একটু । কখন আসলি ? খাবি না আজও ? বেড়ে দেবো খাবার ?
” না , খিদে নেই ।
ঘরে গিয়ে ঘুমাও । আর হ্যাঁ , নেক্সট টাইম থেকে আমার অপেক্ষায় থাকবে না আর । আমি কখন ফিরবো না ফিরবো , তোমায় এর অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে না । সবাই আমার ধার ধারা ছেড়ে দিয়েছে , তুমিও ছেড়ে দাও । আমায় নিয়ে ভাবতে গিয়ে নিজের আরাম কে হারাম করো না । ঘুমাও গিয়ে….
কথা শেষ করেই ধুপধাপ পা ফেলে উঠতে লাগলো রৌদ্র । রুবিনা কাবির নিঃশব্দে হতাশ শ্বাস ফেললেন কেবলই । ছেলে কে ডাকলেন না আজ আর । ডাকলেও এই বেপরোয়া ছেলে সাঁড়া দেবে না ।
রৌদ্র নিজের ঘরে ঢুকে লম্বা শাওয়ার নিয়েছে । এখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটার ঘর ছুঁই ছুঁই । শাওয়ার শেষে একখানা কালো টিশার্ট জড়িয়েছে গায়ে । ভেজা চুল গুলো মোছার চেষ্টা করে নি । সেভাবেই টুপটাপ পানি ঝড়ছে চুল থেকে । ভেজা চুল লেপ্টে কপালে । নিজ ঘর হতে বেরিয়ে টুকটুকির ঘরের সামনে এসে থামলো রৌদ্র । ঘুমানোর আগে শুভ্র ফোন করেছিল ওকে । তখন টুকটুকির অবস্থা জানতে পেরেছে রৌদ্র । শোয়ার আগে একবার মেয়েটা কে দেখে গেলে মন্দ হয় না । এই রাতেই আগ পিছ না ভেবে দরজায় টোকা মারে রৌদ্র । ভেতর থেকে দরজা লাগানো । বেশ কবার ধৈর্য নিয়ে টোকা মারলো রৌদ্র । খুললো না দরজা । এবার সে চরম বিরক্ত হলো । জোরে শব্দ করে নক করলো দরজায় । তিন বারের বেলায় খুললো দরজা খানা….
রৌদ্র আবার টোকা মারতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিলো । দরজা খুললো মেঘা । খুলেই ঘুম কাতর আধো চোখে রৌদ্র কে দেখে খ্যাক খ্যাক করে উঠলো…..
” প্রবলেম কি ? এতো রাতে ডিস্টার্ব করছেন কেনো ?
প্রত্যুত্তরে সরু চোখে চেয়ে রৌদ্রের স্বাভাবিক কন্ঠ….
” টুকটুকি কোথায় ?
” ঘুমিয়েছে !
মেঘার চোখ নিভু । ঠিকঠাক চোখ মেলে তাকায় নি এখনো । ঘুমের মধ্যে আকস্মিক ব্যাঘাত ঘটেছে । মাথা টলছে কেমন । রৌদ্র স্থির দৃষ্টি তাক করে বললো কঠিন স্বরে…..
” তুই ঘুমাস নি কেনো ?
খেকিয়ে উঠলো মেঘা….
” আজব তো , ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলছেন আমি ঘুমাই নি কেনো ?
” কখন ঘুমাস তুই ?
ঘুমের ঘোরে হাই তুলে সোজাসুজি জবাব দিলো মেঘা….
” এগারোটা ।
ঘুমের মাঝে স্বল্প এলোমেলো মস্তিষ্ক । সম্পুর্ন সজাগ নয় মেঘা । তাইতো ভনিতা ছাড়াই এভাবে সোজাসাপ্টা উত্তর করলো । রৌদ্র বুঝলো , বললো আকস্মিক…..
” শোন , কাল থেকে দরজা খুলে ঘুমাবি !
আমি ফেরার পর যেনো এ ঘরের দরজা খোলা পাই । বুঝেছিস কি বললাম ?
মুখ কুঁচকে ফেললো মেঘা । ভ্রু জড়ো করে নিভু চোখে তাকালো । রৌদ্র আবার শুধালো…..
” কি বলেছি মাথায় ঢুকেছে ?
” ডিজগাস্টিং লোক , আপনার কথা কেনো শুনবো আমি ?
” তুই শুনবি না তোর ঘাড় শুনবে । রোজ রাতে বাড়ি ফেরার পর ঘুমানোর আগে তোকে দেখা চাই আমার । যদি আমার কথার হেরফের করিস , তাহলে উনপঞ্চাশ টা থাপ্পরের জায়গায় দ্বিগুণ থাপ্পর খাবি আমার হাতে । দরজা খুলে ঘুমাবি । এটাই ফাইনাল…
মেঘা ঘুমের টালে কি বুঝলো কে জানে ? হাই তুলতে তুলতে মুখের উপর দরজা আটকাতে গেলে রৌদ্র বাঁধ সাধলো । দুহাতে ঠেস দিয়ে দরজার কপাট আটকে ধরলো । দরজা মারিয়ে ঘরে ঢুকলো তড়িতে ।
ঝট করে পেছালো মেঘা । মেঘার দিকে এগিয়ে কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই ওর মাথার কাঁটা টা এক টানে খুলে নিলো রৌদ্র । নিমিষেই পিঠ ঝাঁপিয়ে আছড়ে পড়লো ঘনকৃষ্ণ কেশদল ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮
মাথা হতে চোখে মুখে আছড়ে পড়তে বিলম্ব হলো না । মেঘা ঘুমের ঘোরে হতবাক হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চাইলো । হলদে ডিম লাইটের আলোয় মেঘার উপর ঝুঁকে এলো রৌদ্র । পেছাতে গিয়েও পারলো না মেঘা । সূক্ষ্ম নেত্রে রৌদ্র পরখ করলো ওকে । মেঘার চুলের কাঁটা টা এখন ওর হাতে । রৌদ্র কাঁটা টা তুলে মেঘার মুখের সামনে ধরল , ক্ষিণ স্বরে হিসহিসিয়ে বললো…
“ ইউ লুক ব্রেথটেকিং লাইক দিস …
আমার সামনে আসলে এভাবেই আসবি, প্লিজ । মারাত্মক লাগে তোকে দেখতে…
