Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১২

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১২

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১২
লাইরা আয়নাত

রিকুর ম্যানশনের পার্টি হলটা ঝলমল করছে গোল্ডেন শ্যান্ডেলিয়ারের আলোয়। মার্বেল ফ্লোরে গেস্টদের হিল ঠোকার শব্দ, ক্রিস্টাল ঝাড়বাতির আলো প্রতিফলিত হয়ে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ছে, আর হালকা পারফিউমের সুবাস বাতাসে মিশে আছে। ঠিক এই ভাইবের মাঝখানে এন্ট্রি নেয় ইনায়াত আর আয়াজ, পারফেক্ট গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড সেজে। ইনায়াত পরেছে একটা মডেস্ট ফ্লোই ব্ল্যাক গাউন। গাউনটার সফট ফ্যাব্রিকটা ওর প্রতিটা স্টেপে আলতো ভাবে দুলছে, ওকে দেখে মনে হচ্ছে হাওয়ায় ভেসে চলেছে কোনো ব্ল্যাক রোজ। গাউনের নেকলাইনটা ডিসেন্ট, স্লিভস ফুল, তাও ইনায়াতের ফিগারটা এমন এলিগ্যান্টলি ফুটে উঠছে যে হলে ঢুকতেই বহু চোখ ওর দিকে ঘুরে যাচ্ছে। ওর চুলগুলো সফট কার্লে ছেড়ে রাখা, কানে ছোট্ট ডায়মন্ড স্টাড, ঠোঁটে ন্যুড শেডের লিপস্টিক।অসম্ভব সুন্দর লাগছে ইনায়াতকে।

আর আয়াজ পরেছে জেট ব্ল্যাক সুট কোট, ভেতরে ব্ল্যাক শার্ট, কোনো টাই নেই, প্রথম দুটো বোতাম আনফরমালি খোলা। হাতে সিলভার রিস্টওয়াচ, চুলগুলো সাইডে সেট করা, চোয়ালটা শক্ত, চোখে একটা মিসচিভাস স্পার্ক। প্রিন্স আয়াজকে আজ দেখতে এমন লাগছে যে কোনো ডার্ক ফেয়ারিটেলের ভিলেন প্রিন্স এসেছে পার্টিতে, যাকে দেখলে ভয়ও লাগে আবার চোখও সরানো যায় না। তার পারসোনালিটি থেকে একটা ডেঞ্জারাস চার্ম ছড়াচ্ছে, যেটা পুরো হলটার অ্যাটেনশন কেড়ে নিয়েছে।
পার্টি শুরু হয় রিকু তো মহা খুশি পছন্দের প্রিন্স কে দেখে। সে গেস্ট দের ছেড়ে আয়াজ ইনায়াত কে নিয়ে পড়ে যায়। বিভিন্ন গল্প গুজবে মেতে ওঠে সবাই। আয়াজ তো ইনায়াতের হাতে চিপকে ধরে আছে। কথায় কথায় ওর চিকন কোমরে হাত রাখছে, আলতো করে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। মানে আয়াজ ইনায়াতকে কাছে টানার একটা সুযোগও ছাড় দিচ্ছে না। ইনায়াত মনে মনে রাগে ফাটছে, ভেতরটা পুরো জ্বলে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে এক্টিং করতে হচ্ছে। ঠোঁটে একটা সুইট স্মাইল ঝুলিয়ে রেখেছে, চোখে ভালোবাসার একটা ফেক গ্লো ও এমন দেখাচ্ছে যে আয়াজের প্রতিটা টাচ ওর কাছে স্বর্গ। বাইরে থেকে দেখলে যে কেউ বলবে ওরা একে অপরের প্রতি ম্যাডলি ইন লাভ, অথচ ভেতরের গল্পটা পুরো আলাদা।

লিওনার্দো আর নাভিদের টিমের কিছু লোক ওয়েটার সেজে এসেছে। ট্রে হাতে এদিক ওদিক ঘুরছে, ড্রিংকস সার্ভ করছে, আর সেই ফাঁকে রিকুর হাউসের বিভিন্ন কর্নারে ছোট্ট ছোট্ট হিডেন ক্যামেরা ফিট করে দিচ্ছে। কেউ পর্দার পেছনে, কেউ ফুলদানির আড়ালে, কেউ আবার পেইন্টিংয়ের ফ্রেমের কোণায়। সবকিছু এত স্মুথলি হচ্ছে যে রিকুর কোনো গার্ড এক সেকেন্ডের জন্যও সন্দেহ করতে পারছে না।
লিওনার্দো আর নাভিদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে এদেরকে দেখছে। যেখানে আয়াজ ইনায়াতের কোমর চেপে ধরে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে বাঁ হাতে, আর ডান হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রিকুর সাথে কথা বলছে। তার চোখে মুখে এমন একটা ক্যাজুয়াল কনফিডেন্স, মনে হচ্ছে তো এই হলটাই তার রাজ্য। প্রতিটা শব্দ এত স্মুথলি বলছে যে রিকু মুগ্ধ হয়ে শুনছে।
লিওনার্দোর আয়াজের এমন ঘনিষ্ঠতা একদম সহ্য হচ্ছে না। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে, হাতের গ্লাসটা একটু জোরেই চেপে ধরছে। সে নাভিদকে ফিসফিসিয়ে বলে, “দেখো কি পরিমাণ ক্যারেক্টারলেস এই প্রিন্স। শুনেছি ও নাকি ম্যারেড। ম্যারেড হয়ে সুযোগ পেয়ে দেখো বাজেভাবে ইনায়াতকে টাচ করছে।”
নাভিদ এটা শুনে কোলাকুলি ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “আরে বাজেভাবে কই, নরমালি তো।”

“নরমাল মানে? ইনায়াতকে কি করে ধরে রেখেছে তুমি দেখছো? কি বাজেভাবে ধরতেছে, তাও ম্যারেড হয়ে, ওর ওয়াইফ রেখে।”
নাভিদ এটা শুনে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “স্যার, একটা সিক্রেট বলি। কাউকে বলবেন না কিন্তু।”
লিওনার্দো ভ্রু কুঁচকে বলে, “বলো।”
নাভিদ গলা আরো নিচু করে বলে, “ক্রাউনের যে ওয়াইফ আছে না?”
“হ্যাঁ, আছে তো।”
“সেটাই ইনায়াত। আই মিন, আমার বোন ইনায়াত। আর ক্রাউন তার ওয়াইফের সাথে লটকালটি করছে, তবে হ্যাঁ, সে যে MI6 এ কাজ করে সেটা কিন্তু কেউ জানে না, আর না বাইরের কেউ জানে সে ক্রাউনের ওয়াইফ।”
লিওনার্দোর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কথাটা শুনে ওর মাথার ভেতরে একটা বোম্ব ফাটে। সে তো ইনায়াতকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল। ইনায়াতের চুপচাপ এলিগ্যান্স, শার্প আইজ, মিস্টেরিয়াস অরা পুরো ওকে টানতে শুরু করেছিল। আর আজ জানতে পারল ইনায়াত ম্যারেড, তাও কার সাথে? প্রিন্স আয়াজ। ছ্যাকা খেয়ে যাচ্ছে বেচারা পুরো। হতাশ হয়ে কাঁধ ঝুলিয়ে অন্যদিকে চলে যায় সে। বিরহে হাতের শ্যাম্পেনের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে দেয়।

এদিকে আয়াজ তো ইনায়াতকে কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলতে দিচ্ছে না। একজন ইনায়াতের সাথে ড্রিংকস শেয়ার করতে চায়, সেটাও করতে দিচ্ছে না। কেউ একটু স্মাইল দিয়ে এগিয়ে এলেই আয়াজ এমন একটা লুক দিচ্ছে যে সামনের জন আর দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। ইনায়াতের মন চাচ্ছে আয়াজকে মেরে ফেলতে। সুট করে ফেলে দিতে এই হলের মাঝখানেই। আয়াজ তো ইনায়াতের সাথে যা পারছে তাই করছে। ডিনারে বসে ইনায়াতকে নিজের হাতে খাবার তুলে দিয়েছে, ইনায়াতের প্লেটে নিজের পছন্দের আইটেম তুলে দিয়েছে, ইনায়াতের গালে আলতো কিস করছে মানে একদম পারফেক্ট বয়ফ্রেন্ডের রোলপ্লে করছে। যে কেউ দেখলেই বলবে, “ওয়াও, হোয়াট আ কাপল।”

ইনায়াতের গাল লজ্জায় না, রাগে লাল হয়ে গেছে। প্রতিবার আয়াজের ঠোঁট ওর গালে ছোঁয়ার সাথে সাথে ভেতরে একটা ইলেকট্রিক শক খাচ্ছে ও। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখছে নিজেকে। ভেতরে ভেতরে শতবার আয়াজকে অভিশাপ দিচ্ছে, কিন্তু বাইরে সেই ফেক স্মাইলটা ধরে রাখতেই হচ্ছে তার মিশনের খাতিরে।
যাই হোক, পার্টি ধীরে ধীরে শেষের দিকে গড়ায়। এই পার্টির মাধ্যমে ওরা সবাই রিকুর হাউসে ক্যামেরা ফিট করে অনেক ইনফরমেশন কালেক্ট করে ফেলেছে। মিশনের ফার্স্ট ফেজ সাকসেসফুল।
পার্টি শেষে ইনায়াত আর আয়াজের লাক্সারি ব্লাক লা ভোয়াত্যুর নোয়ারে উঠে বাড়ি যাওয়ার জন্য। ইনায়াত আয়াজের এত লাক্সারি গাড়িতে উঠতে চাচ্ছিল না কিন্তু এখন উপায়ও নেই। এসব লাক্সারি গাড়ি বাড়ির শখ ইনায়াতের নেই এগুলো বিরক্ত লাগে তার। আয়াজ গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইনায়াত দাঁত চেপে বলে, “এই, আপনি এত ক্যারেক্টারলেস কেন? সুযোগ পেয়েছেন বলে এভাবে এত বাজে কাজ করবেন? আপনি আমায় সাতটা কিস করবেন বলেছিলেন, ছয়টা বাকি ছিল আর পুরো পার্টিতে আপনি দশটা করেছেন, তাই হিসেব শেষ।”

আয়াজ বাঁকা হেসে স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলে, “ঐটা এক্টিং মজবুত করতে করেছি। আমার সাথে এসব দু নাম্বারি কথাবার্তা বলবে না। আমার সাত দিন ডেটে যাওয়া আর ছয়টা কিস বাকি।”
ইনায়াত বিরক্ত হচ্ছে প্রচুর। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে রাগে। কিন্তু তারপরও কোনো কথা বলে না, চুপ হয়ে সিটে গা এলিয়ে বসে থাকে। জানালার বাইরে শহরের নিয়ন লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। আয়াজ ড্রাইভ করছে আর হাসছে। তার আজ ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। সারা পার্টি ইনায়াতকে নিজের পাশে রাখতে পেরেছে, এর চেয়ে বড় পাওয়া তার কাছে আর কী হতে পারে?
আয়াজ ইনায়াতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে, “বাই দ্য ওয়ে, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে আজকে। মডেস্ট ফ্লোই গাউনটায়।”

ইনায়াত আয়াজের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দেয়, “জানি।”
আয়াজ ধীরে ধীরে ড্রাইভ করতে করতে আবারো বলে, “এত নাইস ফিগার তোমার, আজকে আমি খেয়াল করলাম। ট্রাস্ট মি, তোমায় দেখে তোমার সাথে বাসর করার ফিল উঠে গেছে আমার। তুমি খুবই সুন্দর, না সুন্দর না, বিউটি উইথ অরা। সিরিয়াসলি, ইউ আর দ্য ডেফিনিশন অব ব্রেথটেকিং।”
ইনায়াতের গা জ্বলে ওঠে এসব শুনে। ও আয়াজের দিকে রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “যা মন চায় তা বলবেন না। হিসেব করে কথা বলুন। আমি রাস্তার মেয়ে নই যে আপনার বলা অশ্লীল ফ্লার্টে আপনার বেডে চলে যাব।”
আয়াজ এ শুনে হালকা হেসে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “আমার সাথে তো তোমার বেড শেয়ার করতেই হবে। আমরা হাসবেন্ড ওয়াইফ। আমাদের ভালোবাসার জায়গাই তো বেড। তোমাকে এগুলো বলে একটু কোম্পানি দিলাম, বেড শেয়ার করার হলে এই মুহূর্তে এইতেই করতে পারি, সুইটহার্ট। এই রাইট, আমার আছে।”

ইনায়াত ঠান্ডা গলায় বলে, “আপনি না আমাকে ক্লাসলেস বলেন? আসলে ক্লাসলেস হলেন আপনি। আপনার কথা ঠিক নেই। যে মুখ দিয়ে আমাকে অস্বীকার করেছিলেন, সেই মুখ দিয়ে ওয়াইফ বলছেন, লজ্জা করে না?”
আয়াজ আলতো হেসে ওঠে, “নাহ, লজ্জা করে না। আমার যা ইচ্ছে আমি তাই বলব। তুমি আমার বিয়ে করা বউ, আর বউয়ের সাথে বেড শেয়ারের কথা বলতে লজ্জা কেন করবে?”
ইনায়াত আয়াজের দিকে একবার গাঢ় চোখে তাকায়। সেই চোখে আগুন আর রাগ মিশে আছে। তারপর বিরক্তি নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় বাইরের দিকে। আয়াজের সাথে কথা বলার রুচি তার নেই। আয়াজ এটা দেখে গাড়ির স্পিকারে একটা সং প্লে করে। তারপর আয়াজ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে মাথাটা আলতো দোলাতে দোলাতে চিল মুডে চওড়া গলায় গেয়ে ওঠে, ”

𝐇𝐞𝐲, 𝐥𝐚𝐝𝐢𝐞𝐬 𝐝𝐫𝐨𝐩 𝐢𝐭 𝐝𝐨𝐰𝐧
𝐉𝐮𝐬𝐭 𝐰𝐚𝐧𝐧𝐚 𝐬𝐞𝐞 𝐲𝐨𝐮 𝐭𝐨𝐮𝐜𝐡 𝐭𝐡𝐞 𝐠𝐫𝐨𝐮𝐧𝐝
𝐃𝐨𝐧’𝐭 𝐛𝐞 𝐬𝐡𝐲, 𝐠𝐢𝐫𝐥, 𝐠𝐨 𝐛𝐚𝐧𝐚𝐧𝐳𝐚
𝐒𝐡𝐚𝐤𝐞 𝐲𝐚 𝐛𝐨𝐝𝐲 𝐥𝐢𝐤𝐞 𝐚 𝐛𝐞𝐥𝐥𝐲 𝐝𝐚𝐧𝐜𝐞𝐫
𝐇𝐞𝐲, 𝐥𝐚𝐝𝐢𝐞𝐬 𝐝𝐫𝐨𝐩 𝐢𝐭 𝐝𝐨𝐰𝐧
𝐉𝐮𝐬𝐭 𝐰𝐚𝐧𝐧𝐚 𝐬𝐞𝐞 𝐲𝐨𝐮 𝐭𝐨𝐮𝐜𝐡 𝐭𝐡𝐞 𝐠𝐫𝐨𝐮𝐧𝐝
𝐃𝐨𝐧’𝐭 𝐛𝐞 𝐬𝐡𝐲, 𝐠𝐢𝐫𝐥, 𝐠𝐨 𝐛𝐚𝐧𝐚𝐧𝐳𝐚
𝐒𝐡𝐚𝐤𝐞 𝐲𝐚 𝐛𝐨𝐝𝐲 𝐥𝐢𝐤𝐞 𝐚 𝐛𝐞𝐥𝐥𝐲 𝐝𝐚𝐧𝐜𝐞𝐫
ইনায়াত কিছু বলে না, চুপচাপ দাঁত চেপে বসে থাকে। মন তো চাচ্ছে আয়াজ কে আছাড় মারতে, মাথায় তুলে। আয়াজ যে একটা ইতর, তা ইনায়াত ভালো করেই বুঝতে পারল। কিন্তু এই ইতরটার সাথেই ওর কপাল বাঁধা, এই সত্যিটা মেনে নিতে ওর ভেতরটা আরো বেশি ছটফট করে ওঠে। আয়াজ চিল মুডে গান গাইতেই থাকে আর ইনায়াত তাকে ইগনোর করে চুপ করে বসে থাকে।
বাড়ি ফেরে আয়াজ আর ইনায়াত। ফিরেই ইনায়াত কোনো কথা না বলে সোজা নিজের রুমে চলে যায়। পেছনে আয়াজও আসছিল, ঠিক তখনই তার ফোনে একটা আর্জেন্ট মিটিংয়ের কল ঢোকে। রুমে যাওয়ার প্ল্যানটা বদলে সে সোজা অফিসের দিকে রওনা দেয়।
ওপরে নিজের রুমে এসে ইনায়াত একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। ফ্রেশ হয়ে, আধভেজা চুলেই ল্যাপটপটা কোলের ওপর টেনে নেয়। আজকের প্রজেক্ট আপডেট, সিনিয়রদের ফিডব্যাক আর টিমের প্রোগ্রেস রিপোর্টগুলো একে একে চেক করতে থাকে সে। স্ক্রিনজুড়ে নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

“ব্রিলিয়ান্ট এক্সিকিউশন, ইনায়াত!”
“ইউ নেইলড ইট এগেইন।”
“কুডন্ট হ্যাভ ডান ইট উইদাউট ইউ।”
মেসেজগুলো স্ক্রল করতে করতে ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে, তবে সেটা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। চোখের কোণে জমে থাকা টায়ার্ডনেসের সাথে মিশে যায় একরাশ তিক্ততা। প্রচণ্ড ইরিটেশনে সে ধপ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দেয়। টিমের লোকজন ভাবছে কাজটা কত সহজে হয়ে গেল! অথচ এই একটাও সাকসেসের পেছনে তাকে কী ভয়ংকর প্রাইস পে করতে হচ্ছে, সেটা শুধু সে-ই জানে। আয়াজকে টলারেট করা, ওই লোকটার পজেসিভনেসে মাখানো টাচ আর আনএক্সপেক্টেড নৈকট্য ইনায়াতের ভেতরটাকে বিষিয়ে তুলছে। আয়াজের আঙুলের ছোঁয়াটুকুও তার ভেতর এক তীব্র ডিসগাস্ট আর বমিভাব তৈরি করে দেয়। অনেকক্ষণ এভাবেই চুপচাপ ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকে ইনায়াত, তারপর একটা ডিপ ব্রিদ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শরীর আর মনের এই অবস্থায় কিছু স্ন্যাক্স দরকার, পেটে কিছু না পড়লে মাথাটা আরও হেভি হয়ে উঠবে।
ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তার চোখ আটকে যায়। মেইন ডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকছে আয়াজ আর এভা। এভা তো গা ঘেঁষে, প্রায় লেপ্টে আছে আয়াজের সাথে। তার হাত আয়াজের বাহুতে জড়ানো, আর ঠোঁটের হাসিটা বড্ড বেশি ইন্টিমেট।

ইনায়াত এক পলক তাকায় সেদিকে, কিন্তু জাস্ট এক মুহূর্তের জন্য। তার মুখে কোনো এক্সপ্রেশন ফুটে ওঠে না, চোখেও জাগে না কোনো ঝড়। নিঃশব্দে, ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে সে চোখ ফিরিয়ে নেয় আর সোজা হেঁটে চলে যায় কিচেনের দিকে। যেনো সে কিচ্ছু দেখেনি। তার এটিটিউড এমন, যে আয়াজ কার সাথে কোথায় গেল-এল তাতে তার বিন্দুমাত্র কিছু যায়-আসে না আর সত্যিকার অর্থেও কিছু যায়-আসে না তার এসবে। সে নিজের মতো। ইনায়াত কিচেনে যায়, তখনই তার পেছন পেছন ফেইথও কিচেনে চলে আসে। ফেইথ ইদানীং ইনায়াতকে বেশ পছন্দ করছে। কেন করছে, সেটা বোধহয় সে নিজেও জানে না। ইনায়াত ফ্রিজ খুলে একটা চিল্ড কোল্ড ড্রিংকের ক্যান হাতে নিতেই ফেইথ এসে এক্সাইটেড গলায় বলে ওঠে, “আরে, তুমি কেমন ওয়াইফ বলো তো? তোমার হাজব্যান্ডের সাথে এভা ওভাবে লেপ্টে আছে, আর তুমি একটুও প্যানিক করছ না? এক্কেবারে ডোন্ট-কেয়ার অ্যাটিটিউড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ! আমার ফিয়াঁসে এমন কিছু করলে তো আমি ওকে কবর দিয়ে দিতাম, আই সোয়্যার!”
কথাগুলো শুনে ইনায়াত হালকা হাসে। ক্যানটা হাতে নিয়ে ফ্রিজের দরজা ক্লোজ করতে করতে সে শান্ত গলায় বলে, “তোমার ফিয়াঁসে তোমাকে ভালোবাসে, তাই না ফেইথ? তার ওপর তোমার রাইটস আছে। কিন্তু যে মানুষটার ওপর আমার কোনো অধিকারই নেই, যে মানুষটা আমার নিজেরই নয়, সে কার সাথে লেপ্টে থাকছে বা কার সাথে কোথায় হ্যাং আউট করছে, এসব ডিটেইলস নিয়ে আমি কেন মাথা ঘামাব বলো?”
ফেইথ এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে যায়। তারপর ইনায়াতের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার বলে, “তার মানে কী? আয়াজ ভাই তোমার হাজব্যান্ড, আর তুমি তার ব্যাপারে এতটুকুও পজেসিভ হবে না? সে যদি এভার সাথে রুম ডেটেও যায়, তাতেও তোমার কিছু যায়-আসে না?”

ইনায়াত নিজের যুক্তিতে অটল থাকে। তার ভয়েসে যেন বরফের ঠান্ডা ছোঁয়া। সে বলে, “যে আমাকে ওয়াইফ হিসেবে রেসপেক্টই দেয় না, সে আমার আবার কিসের হাজব্যান্ড? সে জাহান্নামে যাক! এভা কেন, সে চাইলে সারা দেশের মেয়েদের সাথে বেড শেয়ার করুক, তাতে আমার বিন্দুমাত্র কিছু আসে-যায় না।”
কথা বলতে বলতে ততক্ষণে ওরা লিভিং রুমে পৌঁছে যায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ইউনিভার্সের সবচেয়ে ক্রুয়েল টাইমিং মিলিয়ে, ফেইথ চরম শকড হয়ে চিৎকার করে ওঠে, “হোয়াট?! আয়াজ ভাই তোমার হাজব্যান্ড, আর তোমার কিছু যায়-আসে না?! তুমি একটুও জেলাস ফিল করো না?!”

লিভিং রুম এখন ঘরভর্তি মানুষ নিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সোফায় বসে আছেন আয়াজের মা আর ফেইথের মা, হাতে কফির মগ। থিয়া এক কোণে বসে ফোন স্ক্রল করছে। এভা নিজের হিলস খুলছে। আর আয়াজ সিঁড়ির ফার্স্ট স্টেপে পা রাখতেই ফেইথের চিৎকারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। পুরো ঘরে তখন পিনপতন সাইলেন্স নেমে আসে।
ইনায়াত তো থতমত খেয়ে যায়। ফেইথ মেয়েটা আজ সবার সামনে তার সম্মানের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ল! ও দ্রুত ফেইথের কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আমি জেলাস হই না, কারণ তোমার ভাই আমার কেউ হয় না। আর প্লিজ, সবার সামনে এসব সিন ক্রিয়েট কোরো না। আমি গেলাম, সিচুয়েশন এখন তুমি হ্যান্ডেল করো।”
এই বলে ইনায়াত আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। আয়াজকে ক্রস করার সময় সে একবারের জন্যও তার চোখের দিকে তাকায় না, যেন আয়াজ পুরোপুরি ইনভিজিবল। কিন্তু আয়াজ তো ইনভিজিবল নয়। সে এক মুহূর্তও ওয়েট করে না, ইনায়াতের পেছন পেছন ওপরে উঠে আসে।
রুমের ভেতরে ঢুকে ইনায়াত স্ন্যাক্স আর ড্রিংকটা টেবিলের ওপর রাখে। ঠিক তখনই ‘ক্লিক’ করে একটা শব্দ হয়, পেছনে দরজা লক হওয়ার আওয়াজ।

আয়াজ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণ ধার। ভয়েস শান্ত হলেও সেই শান্তির নিচে বইছে একটা ডেঞ্জারাস স্রোত। সে ইনায়াতকে প্রশ্ন করে, “এই, তুমি ওকে কী বলেছ যে ও ওভাবে রিঅ্যাক্ট করল?”
ইনায়াত এই প্রশ্নটার জন্যই প্রিপেয়ার্ড ছিল। ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে আয়াজের চোখে চোখ রাখে। তার গলার স্বরে কোনো কাঁপুনি নেই, নেই কোনো গিল্ট। সে অবলীলায় বলে, “আপনি এভার সাথে আছেন, আর এতে আমি কেন রিঅ্যাক্ট করি না, ফেইথ সেটাই জানতে চাইছিল। আমি জাস্ট বলেছি যে আমরা একে অপরের কেউ নই। ব্যাস, এইটুকুই।”

কথাটা আয়াজের কানে ঠিক একটা চড়ের মতো বাজে। সে চুপ হয়ে যায়, একদম নিথর। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। চোখের পাতা পড়ছে না, ব্রিদিং হেভি হয়ে আসছে। আর ঠিক তখনই হঠাৎ একটা ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল জেগে ওঠে আয়াজের ভেতরে। সে ইনায়াতের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। শক্ত করে বুকে আঁকড়ে ধরে সোজা ছুড়ে ফেলে বিছানায়। ওকে জাপটে ধরে ওর ঠোঁটে, গলায়, ঘাড়ের ভাঁজে উন্মাদের মতো নিজের ঠোঁট ঘষতে থাকে। প্রতিটা চুম্বনে এতদিনের জমে থাকা সমস্ত অস্বীকার আর ফ্রাস্ট্রেশন উগরে দিচ্ছে সে। ইনায়াতের কোমর শক্ত হাতে চেপে ধরে সে কিস করতে থাকে এক বন্য, পজেসিভ, ডেস্পারেট ভঙ্গিতে। ইনায়াত রেজিস্ট করতে চাইলেও আয়াজের পাশবিক শক্তির কাছে হার মানছে। আয়াজ ওর কাঁধ থেকে টিশার্টটা সরিয়ে সেখানে নিজের দাঁত আর ঠোঁটের গভীর ছাপ বসাতে শুরু করে। ইনায়াত চিৎকার করে আয়াজকে সরাতে চায়, কিন্তু আয়াজ সরে না উল্টো সে ইনায়াতের টিশার্টের ভেতরে নিজের হাত বুলিয়ে দিতে থাকে আর ইনায়াতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে।
ওয়েট ওয়েট, এসব কিছুই ঘটছে শুধু আয়াজের সাবকনশাসে, তার ইম্যাজিনেশনে। রিয়েলিটিতে সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে, স্থির হয়ে। তার চোখজোড়া ইনায়াতের মুখে নিবদ্ধ থাকলেও হাত দুটো শরীরের দুপাশে ঝুলছে। এত বড় রিস্ক নেওয়ার সাহস এখনো তার হয়ে ওঠেনি। নিজের ওয়াইল্ড থটস থেকে বেরিয়ে এসে আয়াজ দুকদম এগিয়ে যায় ইনায়াতের দিকে।

আয়াজ কাছে আসতেই তার শরীর থেকে ভেসে আসা ‘ক্রিড অ্যাভেন্টাস’-এর কড়া, স্মোকি সুবাসটা একটা ইনভিজিবল ঢেউয়ের মতো ধাক্কা মারে ইনায়াতের নাকে। ইরিটেশনে সে অজান্তেই নাকমুখ কুঁচকে ফেলে।
আয়াজ ইনায়াতের চোখে চোখ রাখে। গলার স্বর নামিয়ে এনে এক গভীর, রাফ টোনে বলে, “আমার একটা কিস দরকার। বাকি ছয়টার একটা। কাম ক্লোজার।”
ইনায়াত একটা বরফশীতল দৃষ্টি ছুড়ে দেয় আয়াজের দিকে। দাঁত চেপে বলে, “আমি যেতে পারব না। আপনার দরকার হলে আপনি আসুন, এসে নিয়ে যান।”
কথাটা শুনে আয়াজের ঠোঁটে একটা ডেভিলিশ হাসি ফুটে ওঠে। আইব্রো কিছুটা কুঁচকে বলে, “আসব?”
“আমি জানি না।”
“আসি যদি, সামাল দিতে পারবে তো, সুইটহার্ট?”

ইনায়াত দাঁত কামড়ে বলে, “সামাল দিতে পারব মানে? আপনি জাস্ট কিস করবেন, আমার কোলে তো আর উঠবেন না! এত ড্রামা না করে বাকি ছ’টা শেষ করে আমাকে মুক্তি দিন।”
আয়াজ এবার পুরোপুরি ইনায়াতের কাছে এসে দাঁড়ায়। কোনো ওয়ার্নিং নেই, কোনো হেজিটেশন নেই। এক হাত রাখে ইনায়াতের কোমরে, অন্য হাত রাখে ঘাড়ের পেছনে, চুলের ভাঁজে। আর ঠিক তখনই সে শুরু করে নিজের সমস্ত ডার্ক ডিজায়ার পূরণ করতে। ইনায়াতের ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরে নিজের সমস্ত ক্রেভিং ঢেলে দেয় সে। প্রতিটা ছোঁয়ায় এক ডেস্পারেট ক্ষুধা, এক আদিম দাবি তুমি আমার, শুধুই আমার।
ইনায়াত কোনো রেসপন্স দেয় না, বিন্দুমাত্র না। সে শুধু আয়াজের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটজোড়া ছেড়ে দেয় আয়াজের দখলে, কিন্তু চোখ দুটো থাকে বরফের মতো ঠান্ডা। ভেতরে ভেতরে তার তীব্র ইচ্ছে জাগে আয়াজকে সায়ানাইড খাইয়ে শেষ করে দিতে।

আয়াজের চোখে চোখ রেখেই ইনায়াত মনে মনে একটা প্রমিস করে ‘অনেক সহ্য করেছি তোর টর্চার। এবার তোর পানিশমেন্টের পালা। খুব মজা লাগছে না আমার ঠোঁটের স্বাদ নিতে? কসম খেয়ে বলছি, এই কাজের জন্য তোকে সাফার করতে হবে। ভীষণ রকম রিগ্রেট করাব তোকে আমি, মিস্টার ক্রাউন।’
কিছুক্ষণ পর আয়াজ ইনায়াতকে ছেড়ে দেয়। ইনায়াত এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না, সোজা দৌড়ে ঢুকে যায় ওয়াশরুমে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে মুখে পানির ঝাপটা মারে একবার, দুবার, তিনবার। তবুও তার মনে হচ্ছে আয়াজের সেই আনহোলি ছোঁয়াটা মুছে যাচ্ছে না। তীব্র ঘেন্নায় গলা উগরে বমি করে দেয় সে।
ওদিকে রুমে দাঁড়িয়ে আয়াজ নিঃশব্দে হাসছে। ইনায়াতের এই রিঅ্যাকশন দেখে তার ভেতরে এক ক্রুয়েল স্যাটিসফেকশন ছড়িয়ে পড়ে। মনে মনে সে এক মিস্টেরিয়াস হাসি হেসে বলে, ‘ডার্লিং, এই সামান্য টাচেই তোমার এই হাল? যখন আমি আমার রিয়েল ফর্মে আসব, তখন তোমার কী অবস্থা হবে ভাবতেই পারছ?’ একটা সাউন্ডলেস, ভয়ংকর হাসি খেলে যায় আয়াজের ঠোঁটে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১১

আর ওয়াশরুমে দাঁড়িয়ে বেসিনের ঠান্ডা মার্বেলে দুহাতে ভর দিয়ে ইনায়াতও নিজের কাছে একটা প্রমিস করে। এই চান্সটার প্রপার ইউজ সে করবেই। ‘তোকে আমি এমন এক ডেডলি ট্র্যাপে ফেলব, সারা জীবন মনে রাখবি, আয়াজ ক্রাউন। সারা জীবন।’
দুজনের ঠোঁটেই এখন একই রকম হাসির রেখা শান্ত, ঠান্ডা আর মারাত্মক ডেঞ্জারাস। দুজনের কেউই জানে না, তাদের এই তীব্র নার্ভ-ওয়ারের শেষ পরিণতি ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here