Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫০
মেহজাবিন নাদিয়া

জেবা আর অরির এমন নির্লজ্জ ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে আনতারা মৃধার রাগে পিত্তি জ্বলে গেল। তাঁর ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তেই মেয়ে দুটোকে কষে দুটো থাপ্পড় মারতে। তাঁর মতো এত সিনিয়র একজন ব্যক্তিত্বের সামনে বসে কীভাবে এরা এমন ফাজিল প্রশ্ন করতে পারে? বুকের ভেতর ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠলেও তিনি মুখে চরম ধৈর্য ধরে রাখলেন। হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে নিলেন, নখগুলো যেন হাতের তালুতে দেবে গেল। তবে দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতায় নিজেকে সামলে নেওয়াটা তাঁর জন্য কঠিন কিছু ছিল না।
ঠিক তখনই অরি খুব কৌতূহলী ভঙ্গিতে আনতারা মৃধার দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছা আন্টি, সারিম কি নগ্ন হয়েই জন্মেছিল?”
আনতারা মৃধা মুখ খোলার আগেই জেবা অরির মাথায় হালকা একটা গাট্টা মেরে বলে উঠল,
“আরে গাধা, বাচ্চারা তো জন্ম নেওয়ার সময় নগ্ন হয়েই জন্মায়! তুই কি ভেবেছিলি সারিম ভাই থ্রি-পিস পরে দুনিয়াতে এসেছে নাকি?”
জেবার কথা শুনে অরি জিভ কেটে হেসে উঠল। আনতারা মৃধার রাগ তখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মাথায় একটা কুটিল বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলেন, এই মেয়ে দুটোকে এখন যত অবহেলা বা হালকা ভাবা যাবে, তাঁর কাজের পথ ততটাই সহজ হবে। এরা এখন যা খুশি বলুক, এতে তাঁর আসল উদ্দেশ্য থেকে এদের ধ্যান সরে থাকছে। মুখাবয়বের রাগ মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে আনতারা মৃধার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, বাঁকা হাসি।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন বাড়ির শাহীন মিয়া। হাতে একটা ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে বললেন,
“অরি ম্যাম, নিচে আপনার সাথে দেখা করার জন্য একজন এসেছে।”
অরি কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

“কে এসেছে আঙ্কেল?”
শাহীন মিয়া বিনীত ভঙ্গিতে বললেন,
“বাইরে একটা ছেলে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলল উনি নাকি আপনার ফ্রেন্ড। আপনাকে একটু ডেকে দিতে বললেন।”
ফ্রেন্ডের কথা শুনে অরি একটু ভাবলো।এই অসময়ে কে আসবে?তার ফ্রেন্ড বলতে তো জেবা ছাড়া তেমন কেউ নেই।কৌতুহল নিয়ে অরি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নিচে গিয়ে দেখার জন্য। অরিকে একা উঠতে দেখে আনতারা মৃধা চটজলদি জেবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“জেবা, তুমিও অরির সাথে যাও! অরির এখন যা শারীরিক অবস্থা, একা একা নিচে নামা একদম ঠিক হবে না। তুমি পাশে থাকলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হব।”
আনতারা মৃধার মুখে এমন দরদি কথা শুনে জেবা মনে মনে অবাক হলেও মুখে কিছু বলল না। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে অরিকে ধরে বলল,

“চল, আমি তোকে সাহায্য করছি।”
অরি জেবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আরে না, আমি ঠিক আছি। তুই কষ্ট করে নিচে যাস না, একটু বিশ্রাম নে।”
কিন্তু জেবা শুনল না। সে অরির হাত ধরে সাবধানে বলল,
“একদম বেশি কথা বলবি না! আন্টি ঠিকই বলেছে, এই অবস্থায় তোকে একা ছাড়া যাবে না। চল আমার সাথে।”
দুজনে একসাথে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। আনতারা মৃধা আড়াল থেকে তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে হেসে উঠলেন।
বাড়ির সীমানা প্রাচীরের বাইরে গেটের কাছে আসতেই অরি ও জেবা দেখতে পেল, রাস্তার এক পাশে একটা ধবধবে সাদা গাড়ি থামিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাফ। অরি তাকে দেখে কিছুটা অবাক ও আনন্দিত হয়ে এগিয়ে গেল।

“আরাফ! তুই এখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে চল, ভেতরে এসে বস।”
আরাফ শুকনো মুখটা একটু ঘষে নিয়ে বলল,
“না রে অরি, ভেতরে যাওয়ার সময় একদম নেই। ভীষণ জরুরি একটা কাজে বের হয়েছিলাম, তোর সাথে খুব দরকার ছিল বলেই এত সকালে এখানে আসা।”
কথাটা বলেই আরাফ কিছুটা বিরক্ত চোখে জেবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“জেবা, তুই এখানে? তোকে যে কতবার কল দিয়েছি তার কোনো হিসাব আছে? তোর ফোন সব সময় বন্ধ দেখায় কেন রে? কোথায় হারিয়ে যাস তুই?”
জেবা একটু বিষণ্ণ মুখে জবাব দিল,
“আসলে আমার হাত থেকে পড়ে ফোনটা ভেঙে গেছে। তাই কারও সাথেই যোগাযোগ করতে পারছি না।”
“ওহ, তা-ই বল!” আরাফ একটু থমকে গিয়ে মাথা নাড়ল।
অরি এবার অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল,

“আরাফ, এত সকালে কী এমন জরুরি দরকার পড়ল যে তুই এভাবে ছুটে এলি?”
আরাফ অরির দিকে তাকাল, তারপর কিছুটা ইতস্তত করে জেবার দিকে নজর দিল। গম্ভীর গলায় বলল,
“জেবা, তুই একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়া তো। অরির সাথে আমার খুব গোপন আর একান্ত কিছু কথা আছে।”
জেবা কিছুটা অবাক হলেও বেশি প্রশ্ন না করে কয়েক কদম দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
আরাফ অরির আরও কাছে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে কিছু কথা বলতে শুরু করল। আরাফের কথা শুনে অরির চেহারার রঙ মুহূর্তে বদলে গেল, তার চোখে-মুখে একধরনের অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল। জেবা দূর থেকে তাদের এই অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল, কিন্তু গাড়ি আর তাদের দূরত্বের কারণে একটি শব্দও শুনতে পাচ্ছিল না।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই কথাবার্তা শেষ করে আরাফ আর অরি জেবার দিকে হেঁটে এল। অরিকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। সে জেবার হাত দুটো ধরে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,

“জেবা… প্লিজ, তুই একটা ঘণ্টা একটু ম্যানেজ করে নে। আমি আরাফের সাথে জরুরি একটা জায়গায় যাচ্ছি। বাড়িতে কাউকে কিছু বলিস না, বিশেষ করে সারিমকে তো একদম না!”
জেবা আঁতকে উঠে বলল,
“কী বলছিস তুই অরি? এই অবস্থায় তুই কোথায় যাচ্ছিস? সারিম ভাই বা আরিশান মৃধা যদি জানতে পারেন, তবে কিন্তু মহামারী হয়ে যাবে! আমাকে অন্তত বল কী হয়েছে?”
অরি দ্রুত আরাফের গাড়ির দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“আমি এসে তোকে সব বিস্তারিত বলছি বাদামনী। তুই প্লিজ শুধু একটা ঘণ্টা সামলে নে!”
কথাটি বলেই অরি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। আরাফও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।জেবা মাথায় হাত দিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। স্বগতোক্তি করে বলল,
“উফ! এই মেয়েটা আমাকে কী মহাফ্যাঁসাদে ফেলে গেল! কোথায় গেল, কেন গেল-কিছু বলেও গেল না! এখন যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে আমি কী জবাব দেব?”

বিরক্ত আর চিন্তিত মনে জেবা ধীর পায়ে গেটের ভেতর ঢুকে লন পেরিয়ে ভেতরের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছিলেন আরিশান মৃধা। পরনে তাঁর একদম নিখুঁত স্যুট, হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছেন-হয়তো অফিসের উদ্দেশ্যেই বের হচ্ছেন।
হঠাৎ আরিশান মৃধাকে এভাবে সামনে দেখে জেবার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তার হাত-পা যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল! মনে মনে চরম আতঙ্কে ভেবে উঠল
সর্বনাশ! লোকটা কি তাহলে অরি আর আরাফের গাড়িতে উঠতে দেখে ফেলেছে? এখন যদি তাকে চেপে ধরে তবে তো জেবা শেষ!’

জেবা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, ভয়ে তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আরিশান মৃধা নিজের ফোন বের করে কারও সাথে কথা বলতে বলতে জেবার পাশ কাটিয়ে সোজা নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে চলে গেলেন। জেবার দিকে তিনি একটা নজরও দিলেন না!
গাড়িটি স্টার্ট নিয়ে গেট পার হয়ে বেরিয়ে যেতেই জেবা বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, বাবা! ভাগ্য ভালো যে লোকটার নজর তার দিকে পড়েনি। আপাতত বেঁচে গেলেও, আগামী এক ঘণ্টা অরিকে কীভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে গায়েব রাখবে-সেই চিন্তায় জেবার মাথায় আবার দুশ্চিন্তার পাহাড় চেপে বসল।বিশেষ করে সবচেয়ে বড় চিন্তা ঐ আনতারা মৃধা না জানি আবার অরির ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে। জেবা এসব ভাবতে ভাবতেই হেটে হেটে রুমে চলে আরিশান মৃধার রুমে চলে আসে।

অন্যদিনের তুলনায় আজ সারিমের মেজাজ ও চালচলন বেশ গম্ভীর। পুরো অফিসে এক ধরনের থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। আর তার এই অতিরিক্ত গাম্ভীর্যের কারণে আলভি ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আগে সারিম কত অজাইরা কাজ আলভিকে দিয়ে করাত, টুকটাক আড্ডাও দিত; অথচ আজ সামান্য ভুল হলেই যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হচ্ছে! একের পর এক ধমকের ওপর ধমক সহ্য করতে হচ্ছে আলভিকে।
কিছুক্ষণ আগে সংসদ থেকে পেশ হওয়া কিছু নতুন বিল পাস হয়েছে, সেগুলো নিয়েই একটা উচ্চপর্যায়ের জরুরি মিটিং শেষ করে এল সারিম। দেশের আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও উন্নতির লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা। সারিম অত্যন্ত কড়া নজরে ফাইলগুলোর ওপর একের পর এক চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ফাইলগুলো আলভির হাতের ওপর সজোরে ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিল,
“এগুলো শিক্ষাসচিবের কাছে এখনই পৌঁছে দাও। সামনেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন পরীক্ষা, তাই প্রস্তুতি যেন একদম কড়া হয়। কাজের ক্ষেত্রে আমি কোনো প্রকার গাফিলতি দেখতে চাই না, মনে থাকে যেন!”

আলভি ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল,
“জি… জি, স্যার! আমি এখনই ব্যবস্থা করছি।”
সারিম আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবিটা হাতে তুলে নিয়ে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আজ পুরোটা সময় কাজের ভেতরে থাকলেও সারিমের মন-প্রাণ পড়ে ছিল শুধুই অরির কাছে। অরির শরীরের যে অবস্থা, আর কাল রাতের ঘটনার পর থেকে তাকে একা ফেলে রাখা সারিমের জন্য চরম যন্ত্রণাদায়ক ছিল। বাধ্য হয়েই সকালের জরুরি মিটিংটার জন্য তাকে আসতে হয়েছিল। আজ বিকেলে অরিকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়ার কথা, তাই সে তড়িঘড়ি করেই অফিস থেকে বেরিয়ে আসছিল।
ঠিক তখনই টুং করে সারিমের মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন এল। প্রচণ্ড ব্যস্ততা ও উদ্বেগের কারণে সারিম ভাবল মেসেজটা এখন দেখবে না। সে পার্কিংয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। আজ আর সাথে কোনো ড্রাইভার নেয়নি, নিজেই ড্রাইভ করছে। গাড়িটা প্রধান ফটক পেরোতেই তার ফোনে আবারও একটা টুং করে নোটিফিকেশনের শব্দ হলো।

একপ্রকার চরম বিরক্তি নিয়ে সারিম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ফোনটা লক খুলে সামনে আনল। কিন্তু ডিসপ্লেতে চোখ পড়তেই তার ভেতরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল! সেখানে ভেসে উঠেছে একটি অচেনা নম্বর থেকে আসা সংক্ষিপ্ত ভিডিও ফুটেজ এবং একটি বার্তা।
ভিডিওটি অন করতেই সারিমের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে চেপে বসল, চোখের দৃষ্টিতে নেমে এল এক হিংস্র অন্ধকার। যে পথ পাড়ি দিতে স্বাভাবিক ড্রাইভিংয়ে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগে, চরম উন্মাদনায় গাড়ি চালিয়ে সেই দূরত্বের পথ সারিম মাত্র বিশ মিনিটে পৌঁছে গেল!
বাড়িতে পৌঁছেই সে সজোরে গাড়ির দরজা বন্ধ করে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে সোজা অরির রুমের দিকে ধেয়ে গেল। কিন্তু রুমে ঢুকেই তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল-পুরো রুম ফাঁকা! অরি সেখানে নেই। বিছানার একপাশে অযত্নে পড়ে আছে অরির মোবাইল ফোনটা।
সারিম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে নিল। ফোনের লক খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই একই মেসেজ! রাগের চরম কান্না আর ক্ষোভ একসঙ্গে মাথায় চেপে বসল সারিমের। সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তীব্র আক্রোশে অরির ফোনটা দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারল। মুহূর্তেই ফোনটা চুরমার হয়ে ভাঙা টুকরোয় পরিণত হলো।

উন্মত্তের মতো সারিম এবার সোজা হেঁটে গেল আরিশান মৃধার রুমের দিকে। দরজার কাছে পৌঁছাতেই সে দেখতে পেল, জেবা বিছানায় একদম চুপচাপ বসে আছে। বিষণ্ণ ও অস্থির দেখায় তাকে। সারিমকে এভাবে ভেতরে ঢুকতে দেখে জেবার বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সেই সকালবেলা অরি বের হয়েছে, আর এখন দুপুর দুটো বাজে! এক ঘণ্টার কথা বলে মেয়েটা চার-চারটি ঘণ্টা ধরে উধাও, ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। জেবা মনে মনে চরম আতঙ্কে ছিল, আর ঠিক তখনই সারিমের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে সে আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। অরি যে কোথায় গেল, আর সারিমকেই বা সে কী জবাব দেবে-ভেবে কূল পাচ্ছিল না।
সারিম ঘরে ঢুকেই জেবার একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখের রাগের আগুন যেন জেবাকে ভস্ম করে দেবে। দাঁতে দাঁত চেপে সারিম গর্জনে বলল,

“অরি কোথায়?”
জেবার শরীর ভয়ে শিউরে উঠল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“না… মানে… সারিম ভাই…”
সারিম চিৎকার করে উঠল,
“আন্সার মি, ড্যাম ইট! আমার অরিকে তুমি কোথায় পাঠিয়েছ?”
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে জেবা বাধ্য হয়ে সকালের ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি খোলাসা করল। কীভাবে আরাফ এল, কীভাবে অরিকে ডেকে এক ঘণ্টার জন্য নিয়ে গেল-সবটাই বলল সে।
কিন্তু জেবার এই কথা শুনে সারিমের রাগ কমাল তো দূরের কথা, সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। জেবার কথা এক বর্ণও তার বিশ্বাস হলো না। পরিস্থিতি আরও নিশ্চিত করতে সারিম তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে শাহীন মিয়াকে ডেকে পাঠাল। এদিকে সারিমের এমন প্রচণ্ড চিল্লাচিল্লি শব্দ শুনে করিডোর পেরিয়ে ঘরে এসে হাজির হলেন আনতারা মৃধাও।
জেবা শাহীন মিয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখে কিছুটা আশার আলো পেল। সে দ্রুত শাহীন মিয়ার দিকে তাকিয়ে কাকুতি-মিনতি করে বলল,

“আঙ্কেল, আপনিই বলুন না! অরিকে ডাকতে একটা ছেলে এসেছিল আর আপনিই তো রুমে এসে আমাদের খবর দিলেন, তাই না? বলুন সারিম ভাইকে!”
সারিম রক্তচক্ষু নিয়ে শাহীন মিয়ার দিকে তাকিয়ে একদম থমথমে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কি সত্যি? জেবা যা বলছে তা-ই কি হয়েছে?”
কিন্তু শাহীন মিয়া একদম স্বাভাবিক ও শান্ত গলায়, বিন্দুমাত্র তোতলামি ছাড়া জবাব দিলেন,
“না, স্যার। ম্যামকে ডাকতে বাইরে থেকে কোনো ছেলে আসেনি। আমি কাউকেই আসতে দেখিনি। বরং অরি ম্যাম আর জেবা ম্যাম-দুজনে হাসিমুখে একসাথে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।”
শাহীন মিয়ার এমন প্রকাশ্য মিথ্যা কথা শুনে জেবা যেন আকাশ থেকে পড়ল! তার চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে বলল,

“আপনি এ কী মিথ্যা কথা বলছেন আঙ্কেল? সত্যিটা বলুন!”
শাহীন মিয়া কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই মাথা নিচু করে বলল,
“আমি কোনো মিথ্যা বলছি না ম্যাম। নিজের চোখে যা দেখেছি, একদম সত্যিটাই বলছি।”
জেবা এবার চরম অসহায় হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনতারা মৃধার দিকে তাকাল। আর্তনাদ করে বলল,
“আন্টি! আপনি তো সবকিছুর সাক্ষী, তাই না? বলুন না ওনি মিথ্যা বলছেন! আপনিই তো অরির অসুস্থতার কথা ভেবে আমাকে ওর সাথে নিচে পাঠালেন, তাই না আন্টি?”
আনতারা মৃধার মুখাবয়বে অচেনা ভাব। তিনি একদম অস্বীকারের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে ঠান্ডা গলায় বললেন,
“জেবা, তুমি এসব কী আবল-তাবল বলছ? আমি তোমাকে কখন অরির সাথে পাঠালাম? আমি তো নিজের রুমেই ছিলাম!”
চারপাশের দৃশ্যপট আর সবার প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই জেবার পুরোপুরি বিরুদ্ধে চলে গেল। সবাই যেন তাকে ফাঁদে ফেলে দিয়েছে! এটা দেখে সারিমের রাগের শেষ সীমা অতিক্রান্ত হলো। সে তীব্র হিংস্রতায় জেবার দিকে তেড়ে এসে বলল,

“এখনও নিজের বানানো মিথ্যা দিয়ে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছ? সত্যি করে বলো, আমার চন্দ্রিমাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ? কোথায় পাঠালে ওকে?”
জেবা কান্নাভেজা গলায় দুহাত জোর করে বলল,
“আমি সত্যিই কিচ্ছু জানি না, সারিম ভাই! অরি কেবল বলল ও আরাফের সাথে জরুরি একটা কাজে যাচ্ছে আর এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবে। আমি তো ওকে বারবার বারারণ করেছিলাম, কিন্তু ও শুনল না!”
সারিম আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। রাগের মাথায় আরিশান মৃধার ঘরের সাইড টেবিল, কাচের শো-পিস, টেবিল ল্যাম্প যা হাতের কাছে পেল-সব মাটিতে আছড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। তার এই তাণ্ডবরূপ রক্তচক্ষু দেখে আনতারা মৃধা আর শাহীন মিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না, তড়িঘড়ি করে রুম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
সারিম ভাঙচুর চালাতে চালাতে আক্রোশে বলে উঠল,

“অরি পালিয়েছে! ওই ছেলের সাথে পালিয়েছে অরি! আর তুমি… তুমি তাকে এভাবে আমার কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছ, তাই না?”
অরি পালিয়েছে-কথাটা সারিমের মুখে শোনামাত্রই জেবার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। অবিশ্বাস্য চোখে সে তাকিয়ে রইল। তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে অরি অন্য কারও সাথে পালিয়ে যেতে পারে! অরি সারিমকে কতটা ভালোবাসে, তা জেবার চেয়ে ভালো আর কে জানে?
সারিম তখনও ঘরের জিনিষপত্র ভাঙচুর করছে আর জেবার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। জেবা ভয়ে দুহাত জোড় করে মিনতি করতে করতে কেঁদে ফেলল,
“বিশ্বাস করুন সারিম ভাই! আমি কিচ্ছু করিনি, আমি কিচ্ছু জানি না! আরাফ যে অরিকে নিয়ে আর ফিরে আসবে না, অরি যে আর ফিরবে না-তা আমি সত্যি জানতাম না! আমাকে বিশ্বাস করুন!”
সারিম জেবার কোনো কথায় কান দিল না।ক্রোধ তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। সে জেবার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বিষাক্ত গলায় বলে উঠল,

“সব মিথ্যে! তুমি ইচ্ছে করেই অরিকে ওই ছেলের সাথে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছ। কাজটা তুমি একদম ঠিক করোনি জেবা! আমার কাছ থেকে অরিকে কাড়লে? আমার অরিকে দূরে সরিয়ে তুমি কখনোই আমার বাবার সাথে শান্তিতে সংসার করতে পারবে না… মাইন্ড ইট!”
কথাটি বলেই সারিম ক্ষোভ নিয়ে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে এল।
বাইরে এসে সে সজোরে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসল এবং বিকট শব্দে ইঞ্জিনের স্টার্ট দিল। টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়িটা দ্রুত গতিতে গেট পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, আর পেছনে ফেলে রেখে গেল এক ছাইভস্ম ধোঁয়াশা ভাঙচুরের বীভৎস চিহ্ন।
সারিম বেরিয়ে যেতেই জেবা দুই হাত মাথায় দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল। তার পুরো শরীর ভয়ে ও উদ্বেগে থরথর করে কাঁপছিল। অরি সারিমকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে পালিয়ে যাবে-এমন কথা সে কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করতে করবে না। অরি সারিমকে কতটা ভালোবাসে, সে ভালোবাসা কতটা গভীর, তা জেবার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। জেবার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে মুহূর্তেই পরিষ্কার হয়ে গেল, এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে ওই বিষাক্ত মহিলা আনতারা মৃধারই কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে! তাকে এবং অরিকে ফাঁদে ফেলতেই এই নিখুঁত চাল চেলেছেন তিনি।
ঠিক তখনই দরজার মুখে এসে দাঁড়ালেন আনতারা মৃধা। তাঁর থমথমে মুখে ফুটে উঠেছে এক কুটিল বাঁকা হাসি। জেবা রক্তচক্ষু ঘৃণায় তাঁর দিকে তাকাল।যেন আগ্নেয়গিরির ক্ষোভ ঠিকরে বের হচ্ছিল।
আনতারা মৃধা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে অত্যন্ত উপহাসের সুর টেনে বললেন,

“আহা! ভীষণ কষ্ট হয়, তাই না? যখন নিজে নির্দোষ হয়েও অন্যের চোখে সবচেয়ে বড় দোষী সাব্যস্ত হতে হয়!”
কথাটি বলেই তিনি ঢং করে বিছানার ওপর বসে পড়লেন। জেবা ফ্লোরে বসে দাঁতে দাঁত চেপে শুধু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল। তার ভেতরের রাগটা যেন ফুটন্ত জলের মতো টগবগ করছিল।
জেবাকে চুপ থাকতে দেখে আনতারা মৃধা আরো নিচু গলায় জেবার কানে ফিসফিস করে বলে উঠলেন,
“বেচারা অরি… এতক্ষণে নিশ্চই ভুক্তভোগী হয়ে গেছে”
ব্যাস, এই একটি বাক্য জেবার সহ্যশক্তির শেষ বাঁধ ভেঙে দিল। নিজের গর্ভবতী বোনের মতো বান্ধবীকে নিয়ে এমন জঘন্য কথা শুনে জেবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক লহমায় বাঘিনীর মতো লাফিয়ে উঠে সে আনতারা মৃধার চুল শক্ত মুঠোয় টেনে ধরল। তার গালে ও মুখে নখ বসিয়ে দিয়ে তীব্র ক্রোধে চিৎকার করে উঠল,
“জানোয়ারের বাচ্চা! তোর নোংরা মুখ দিয়ে অরিকে নিয়ে আর একটা শব্দও বের করবি না! তুই আমার বাবাকে খুন করেছিস, এবার যদি আমার অরির একটা আঁচড়ও লাগে, তবে তোকে আমি নিজের হাতে খুন করব!”

আনতারা মৃধাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। হঠাৎ এমন আক্রমণে তিনি চমকে গেলেও পরমুহূর্তেই জেবার চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। দুজনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল তুমুল মারামারি ও হাতাহাতি। আনতারা মৃধা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, তাঁর গায়ের শক্তির সাথে জেবা পেরে উঠছিল না। চুল টানাটানি আর ধাক্কাধাক্কির মাঝেই আনতারা মৃধা জেবাকে টানতে টানতে ঘরের বাইরে করিডোর পেরিয়ে দোতলার সিঁড়ির একদম মাথায় নিয়ে এলেন।
জেবা হাঁপাতে হাঁপাতে নিজেকে তাঁর নোংরা গ্রাস থেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু আনতারা মৃধা আক্রোশে জেবার পেটের দিকে লক্ষ্য করে সজোরে কিল-ঘুসি মারতে শুরু করলেন!
পেটে আঘাত লাগতেই জেবা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তার মনে পড়ে গেল নিজের গর্ভের নিষ্পাপ সন্তানটির কথা! বাচ্চার প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আশঙ্কায় জেবা তার সমস্ত শক্তি একত্র করল। আনতারা মৃধার কাছ থেকে পেটে আর কোনো আঘাত আসার আগেই জেবা দুই হাতে প্রচণ্ড গায়ে জোরে ধাক্কা দিল তাঁকে।
সেই অতর্কিত ধাক্কায় আনতারা মৃধা সিঁড়ির শেষ ধাপে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন।

“আহহহ!”
একটা ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে আনতারা মৃধা সোজা দোতলার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে নিচতলার ফ্লোরে গিয়ে পড়লেন।সিঁড়ির ধাপে ধাপে সজোরে আঘাত খেতে খেতে নিচে পড়ার পর বিকট একটা শব্দ হলো। নিচে আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই আনতারা মৃধার নাক-মুখ ফেটে তাজা রক্ত গড়িয়ে ফ্লোর ভেসে যেতে লাগল। তিনি যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলেন।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৯ (২)

ঠিক সেই পরম মুহূর্তেই-বাইরের প্রধান ফটক ঠেলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন আরিশান মৃধা।
সিঁড়ি থেকে আনতারা মৃধার রক্তসংক্রান্ত দেহটা গড়িয়ে পড়া, জেবার ধাক্কা দেওয়া এবং ওপর থেকে জেবার হাঁপাতে থাকা-এই ভয়াবহ নৃশংস দৃশ্যের পুরোপুরি প্রত্যক্ষদর্শী হলেন আরিশান মৃধা! নিজের চোখের সামনে ঘটা এই দৃশ্য দেখে তিনি দরজার কাছেই একদম স্তব্ধ হয়ে জমে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫১