ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৭
মেহজাবিন নাদিয়া
সকালের রোদের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ঢাকা শহরের চেনা কোলাহল যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল। পিচঢালা পথ থেকে ওঠা তপ্ত ভাপ আর গাড়ির হর্নের আওয়াজে চারপাশটা মুখরিত। তবে মৃধা নিবাসের দোতলার পড়ার ঘরে তখনো এক অদ্ভুত, থমথমে অস্থিরতা বিরাজ করছিল।
অরি সোফায় বসে নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে মাথাটা চেপে ধরেছিল। ওর ফর্সা গাল দুটোতে এখনো রাগের সেই রক্তিম আভা স্পষ্ট, যা জেবার তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারছিল না। জেবা বাংলা দ্বিতীয় পএ বইটা একপাশে রেখে অরির একদম মুখোমুখি এসে বসল। ও অরির কাঁধে একটা হাত রেখে বেশ কৌতূহলী ও সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“অরি, তুই কি কিছু লুকচ্ছিস আমার কাছে? নিচে পানি আনতে গেলি, আর ফিরে এসে বলছিস কোন কুত্তা নাকি তোর জীবন চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে! এই ভরা সকালে মৃধা নিবাসের ভেতরে তো কোনো রাস্তার কুত্তা ঢোকার সাহস পাবে না। তাহলে ব্যাপারটা কী? কাকে কুত্তা বললি তুই?”
অরি এক ঝটকায় মাথা তুলে জেবার দিকে তাকাল। ওর চোখের মনিতে তখনো সারিমের সেই চতুর, বাঁকা হাসির উদ্ধত চেহারাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, জেবাকে যদি এখন সত্যটা বলা হয়-যে সারিম আসলে ওর স্বামী, এবং সে এই বাড়ির পালিত মেয়ে নয় বরং আরিশান মৃধার একমাত্র ছেলের বউ-তবে জেবা আর এক সেকেন্ডও শান্ত থাকবে না। ও বকবক করতে করতে অরির পুরো মাথাটাই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
তাছাড়া সারিমের সেই মারাত্মক ব্ল্যাকমেলের কথা মনে পড়তেই অরির বুকের ভেতরটা আবার ভয়ে ও অপমানে কেঁপে উঠল। বাবা যদি কোনোভাবে অরির পরীক্ষার হলের সেই অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা জানতে পারেন, তবে ওনার আজীবনের সততা আর অরিকে নিয়ে গর্ব এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। অরি নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের গলার স্বরকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ও একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ধুর বোকা! কিছু না। আসলে সারারাত এক ফোঁটা না ঘুমিয়ে টানা পড়ার কারণে আমার মগজের কোষগুলো মনে হয় ঠিকঠাক কাজ করছে না। ক্লান্তি থেকে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে রে। তাই কি বলতে কি বলে ফেলছি, তা নিজেও জানি না। তুই শুধু শুধু চিন্তা করছিস, জেবা।”
জেবা অরির মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ও অরিকে চেনে। ও স্পষ্ট বুঝতে পারছিল অরি কিছু একটা লুকাচ্ছে, কিন্তু পরীক্ষার এই মোক্ষম সময়ে ও আর বান্ধবীকে বেশি ঘাঁটাতে চাইল না জেবা। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা হাই তুলে বলল,
“আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। তোর এই কুত্তা-কাহিনীর রহস্য না হয় পরেই শুনব। এখন তাড়াতাড়ি কর। ঘড়িতে নয়টা বাজতে চলল। সাড়ে নয়টার মধ্যে আমাদের কলেজে পৌঁছাতে হবে। সময়মতো পরীক্ষার হলে না ঢুকতে পারলে কিন্তু ইনভিজিলেটর স্যাররা আর গেট গলে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। তখন ইতিহাস পরীক্ষাটা ইতিহাসেই রয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ। চল, তৈরি হয়ে নিই,”
অরি টেবিল থেকে নিজের হ্যান্ডনোট আর কলমের ব্যাগটা তুলে নিতে নিতে বলল।
ওরা দুজনে খুব দ্রুত নিজেদের কলেজের আকাশী রঙের ইউনিফর্মটা পরে নিল। অরি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবাধ্য চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে শক্ত করে আটকে নিল। চোখের ওপর সেই গোল রিডিং গ্লাসটা ভালো করে চেপে ধরে ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, আজকের পরীক্ষাটা যেন অন্তত কোনো ঝামেলা ছাড়াই শান্তিতে শেষ হয়।
ওরা দুজনে যখন দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল, অরির চোখ তখন অবচেতনভাবেই ড্রয়িংরুমের সোফাগুলোর দিকে চলে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করছিল। কিন্তু সেখানে এখন আর কেউ ছিল না। সারিম বা ওর পিএ আলভি—কারও কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। পুরো ড্রয়িংরুমটা একদম শান্ত, পরিচ্ছন্ন। অরি মনে মনে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, লোকটা তাহলে চলে গেছে! ও জেবাকে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির মেইন গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
মৃধা নিবাসের বাইরে সবসময়ই আরিশান মৃধার স্পেশাল গার্ডরা সাধারণ পোশাকে ডিউটি করে। আজকেও তারা গেটের বাইরে প্রস্তুত ছিলেন। গার্ডদের মধ্যে থেকে একজন প্রবীণ গার্ড অরিকে দেখামাত্রই এগিয়ে এসে বিনীতভাবে বললেন,
“ম্যাম, আজকে গাড়ি বের করি? স্যার বলে গেছেন আপনাদের যেন সাবধানে পৌঁছে দেওয়া হয়।”
অরি নম্রতার সাথে মৃদু হেসে বারণ করে বলল,
“না আঙ্কেল, আজকে গাড়ি লাগবে না। কলেজের দূরত্ব তো এখান থেকে বেশি নয়। রিকশায় করে খোলা বাতাসে গেলে মাথার ভেতরের ক্লান্তিটা একটু দূর হবে। আপনারা শুধু দূর থেকে আমাদের ফলো করুন, ওটুকুই যথেষ্ট।”
“ঠিক আছে, ম্যাম। আপনারা যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন,” গার্ডটি মাথা নিচু করে সমীহ জানাল।
অরি আর জেবা দুজনে মিলে ধীর গতিতে এগিয়ে একটা খালি রিকশা ডেকে নিল। রিকশাটি মেইন রোড ধরে কলেজের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করল। সকালের বাতাসটা একটু গরম হলেও বেশ ফুরফুরে ছিল। জেবা ওর স্বভাবসুলভ বকবকানি শুরু করে দিল। ও রাস্তার ধারের দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
“দোস্ত, আজকে পরীক্ষাটা শেষ হলেই কিন্তু আমার মাথা থেকে এক মস্ত বড় বোঝা নেমে যাবে।এই কঠিন কঠিন ব্যাকারন গুলো আমার মাথাকে পুরো লন্ডভন্ড করে দিছে।
অরি শুধু মৃদু হাসল। ও জেবার কথার পিঠে কোনো মন্তব্য করল না। ওর মন তখনো আজকের পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন আর সকালের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল।
মেইন রোডের এক নির্জন কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল একটি কুচকুচে কালো জিপ গাড়ি। গাড়ির চালকের আসনে বসা ছিল রাফান, যার একদিকের গাল তখনো সামান্য ফোলা। আর পেছনের সিটে দুই পা ছড়িয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে আফিম। ওর চোখে সেই চিরচেনা লম্পট, হিংস্র ও মাদকতাময় চাউনি।আফিম নিজের হাতের সিগারেট অনবরত টানছিল আর ধোঁয়াগুলো জানলা দিয়ে বাইরে ছাড়ছিল।
রাফান হঠাৎ করেই রোডের দিকে এগিয়ে আসা একটা রিকশা দেখতে পেল। রিকশার ভিতরে বসা দুই তরুণীকে চেনা মাত্রই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে উত্তেজিত গলায় পেছনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“আফিম ভাই! ওই যে দেখুন! ওই শালিরাই রিকশায় করে এদিকেই আসছে। এদের মধ্যে ডান পাশের ওই চশমা পরা মা*গিটাই কালকে সবার সামনে আমার গায়ে হাত তুলেছিল, আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল! পাশের মেয়েটা ওর বান্ধবী হবে হয়তো।”
আফিম হাতের সিগারেট একপাশে সরিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। সকালের কড়া রোদের আলোয় অরির সেই শান্ত, স্নিগ্ধ অবয়বটা দেখা মাত্রই আফিমের চোখের মনিতে যেন এক পৈশাচিক লালসার দাবানল জ্বলে উঠল! আফিমের জীবনে সে বহু খোলামেলা, আধুনিক ও আবেদনময়ী সুন্দর নারী দেখেছে। তবে অরির সেই আকাশী রঙের কলেজের ড্রেসে থাকা নিষ্পাপ, মার্জিত ও সাধারণ রূপ যেন সেসবের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্মোহনী।
অরির সেই পিঠ সমান লম্বা বাদামী চুল, যা বাতাসের দোলায় আলতো করে ওর ফর্সা গালে এসে পড়ছিল, চোখে রিডিং গ্লাসের আড়ালের সেই হরিণীর মতো টানা টানা চোখ—সবকিছু দেখে আফিম এক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর ভেতরের কামনার রাক্ষসটা এক সেকেন্ডে জেগে উঠল। ও নিজের শুকনো ঠোঁটটা জিব দিয়ে চাটতে চাটতে কামুক গলায় বলল,
“উফফফ! রাফাইন্না, তুই তো এই মালটার রূপের কিছুই বর্ণনা করতে পারিসনি রে! এটা তো আস্ত একটা অপার্থিব হুরপরি! এর শরীরের এই নিষ্পাপ পবিত্র সুবাস তো দূর থেকেই আমার ভেতরের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েটাকে আমার চাই-ই চাই। এর এই তেজী রূপটা আমি নিজের বিছানায় পিষে ফেলব।”
আফিম এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ও জিপের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে নিচে নামল। ওর পেছনে রাফান এবং ওর দলের আরও চার-পাঁচজন সশস্ত্র গুণ্ডা দলবল নিয়ে অরিদের রিকশাটার দিকে এগিয়ে গেল এবং মাঝরাস্তায় রিকশার গতিপথ রোধ করে দাঁড়াল।
আফিম এবং ওর সন্ত্রাসী সাঙ্গোপাঙ্গদের দেখা মাত্রই রিকশাওয়ালা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রিকশা ব্রেক করল। আফিম অরির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ওর পরনে কালো রঙের শার্ট, বুকের তিনটে বোতাম খোলা, গলায় সোনার মোটা চেইন আর চোখে এক নোংরা, কুৎসিত চাউনি। আফিমকে এলাকার সবাই চেনে। ওকে দেখামাত্রই রিকশাওয়ালা সিট থেকে নেমে ভয়ে রিকশা ফেলেই এক দৌড়ে সেখান থেকে চম্পট দিল।
জেবা আফিমকে দেখামাত্রই আতঙ্কে শিউরে উঠল। ও অরির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ও কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিসিয়ে বলল,
“অরি! সর্বনাশ হয়েছে! এই লোকটা এই এলাকার সবচেয়ে বড় কুখ্যাত খুনি আর মাস্তান, আফিম খন্দকার! ও বড্ড খতরনাক রে অরি, পুলিশও ওর কিছু করতে পারে না। চল আমরা রিকশা থেকে নেমে উল্টো দিকে পালাই!”
অরি জেবাকে শান্ত করার জন্য ওর হাতটা একটু চাপ দিল। ওর নিজের ভেতরের রাগটা তখন ফুটন্ত লাভার মতো ফুটছিল। কালকের সেই রাফানের ঘটনার পর আজ আবার ওর দলের প্রধান খোদ এখানে এসে পথ আটকেছে! অরি রিকশা থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ও নিজের চোখ দুটো শক্ত করে আফিমের চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র ছিল না, ছিল কেবল তীব্র, জমাটবদ্ধ বিরক্ত আর ঘৃণা।
আফিম অরির আরও এক কদম কাছাকাছি এসে ওর শরীরের সুবাস নেওয়ার ভঙ্গি করল।সে অরির আপাদমস্তক নিজের নোংরা দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত গলায় হেসে বলল,
“কী অবস্থা, সুন্দরী? কালকে আমার দলের ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস দেখিয়েছ! তোমার এই নরম ফর্সা হাত দুটোর তেজ তো বড্ড বেশি দেখছি! তা, আফিম খন্দকারের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছ, নাকি শোননি? এই শহরের লিখিত রাজা আমি। রাজার প্রজাদের সাথে এমন বেয়াদবি করতে নেই,মণি।”
রাফান পাশ থেকে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আফিম ভাই, কালকে এই মা*গিটা বড্ড লাফাইছিল। আজকে ওর সব তেজ একদম জল বানায় দ্যান!”
অরি চিবুক শক্ত করে রাফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি লম্পটের দল! রাস্তার জঞ্জাল রাস্তায় থাক, আমাদের পথ ছাড়!”
আফিম শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক পৈশাচিক উল্লাস। ও অরির গ্লাসের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আহা, রাগলে তো তোমাকে আরও সুন্দর লাগে, হুরপরি! শোনো মেয়ে, আমার বিছানায় একবার এলে তোমার এই রূপের তেজ আমি এক রাতেই এমনভাবে ঠাণ্ডা করে দেব যে, তুমি নিজেই সারাজীবন আমার দাসী হয়ে থাকার ভিক্ষা চাইবে জান।
আফিমের এই চরম নোংরা, অশ্লীল ও কুৎসিত কথাগুলো অরির কান দিয়ে মগজে পৌঁছাতেই ওর ভেতরের সমস্ত ধৈর্য, ভদ্রতা আর সংস্কারের বাঁধ এক সেকেন্ডে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল! ও নিজের বাবার সেই শান্তির উপদেশের কথা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভুলে গেল। এই ধরণের পৈশাচিক জানোয়ারের সামনে ভদ্রতা দেখানো মানে নিজের আত্মসম্মানকে জ্যান্ত কবর দেওয়া।
জেবা অতিরিক্ত ভয়ে পেয়ে বলল,
“ভাইয়া, প্লিজ আমাদের যেতে দিন। আমাদের পরীক্ষা আছে। আমাদের ছেড়ে দিন!”
“চুপ কর জেবা! এদের মতো জানোয়ারদের কাছে অনুমতি চাচ্ছিস কেন?” অরি সিংহের মতো গর্জে উঠল।
আফিম বাঁকা হেসে বলল,
“বাহ্! খাঁচার পাখি তো দেখি ভালোই ডাকতে পারে। তা আমার ডেরায় চলবা, নাকি এখানেই…”
আফিম ওর নোংরা কথাটি শেষ করার সুযোগ পেল না। পুরো রাস্তাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়ে, সমস্ত চরাচর কাঁপিয়ে একটা বিকট ‘চটাশ’ শব্দ হলো!অরি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। ও কোনো কথা না বলে, এক ঝটকায় নিজের ডান পায়ের শক্ত চামড়ার কলেজ জুতোটা পা থেকে খুলে ফেলেছিল এবং নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে ওটা দিয়ে আফিমের গালে এক মস্ত বড় থাপ্পড় কষিয়ে দিল!
জুতোর জোর এতটাই তীব্র আর আকস্মিক ছিল যে, আফিমের মাথাটা এক ঝটকায় বাম দিকে ঘুরে গেল। ও দুই কদম পিছিয়ে গেল। জুতোর শক্ত সোল-এর আঘাতে ওর ঠোঁটের কোণ ফেটে ফিনকি দিয়ে তাজা লাল রক্ত বের হয়ে এলো। ওর সেই শ্যামলা গালে জুতোর সোল-এর নিখুঁত, দাগটা স্পষ্ট বসে গেল।
চারপাশের সাধারণ পথচারী, অন্যান্য রিকশাচালক আর রাস্তার ধারের দোকানের মানুষজন এই দৃশ্য দেখে আক্ষরিক অর্থেই চোখ বড় বড় করে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ একটা টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছিল না। এই শহরে আফিম খন্দকারের মতো সন্ত্রাসীর গালে একটা কমবয়সী মেয়ে জুতো দিয়ে থাপ্পড় মেরেছে—এই অলৌকিক, অকল্পনীয় দৃশ্য দেখার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। রাফান আর ওর দলের চামচারা তো হতভম্ব হয়ে রেগে একদম ফায়ার হয়ে গেল। তারা চট করে পকেট থেকে ছুরি বের করতে চাইল।
অরি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে জুতোটা আবার পায়ে গলিয়ে নিল। ও আফিমের দিকে তীব্র, বজ্রকঠিন ও ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত শুদ্ধ ও কড়া ভাষায় বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি, কুৎসিত জানোয়ার! মানুষ হতে পারিসনি, অন্তত ভদ্র হতে শিখ! নয়তো এই জুতো দিয়ে তোর মতো লম্পটদের নোংরা মুখ আমি প্রতিনিয়ত থেঁতলে দিতে পারি! নিজের নোংরা লালসা নিজের নোংরা ডেরায় গিয়ে দেখাবি।রাস্তায় মেয়েদের দিকে চোখ তোলার আগে নিজের কাফনের কাপড় কিনে রাখিস! আমাদের পথ থেকে সর!”
কথাটা শেষ করেই অরি আর এক সেকেন্ডও আফিমের বা ওর দলের কোনো প্রতিক্রিয়ার জন্য দাঁড়াল না। ও জেবার হাতটা শক্ত করে ধরে, ওকে টেনে নিয়ে ঝড়ের গতিতে মেইন রোড পার হয়ে কলেজের গেটের দিকে এগিয়ে চলে গেল। জেবা তো তখনো ভয়ে, বিস্ময়ে আর আতঙ্কে কাঁপছিল; ও শুধু বান্ধবীর এই রুদ্রচণ্ডী, ভয়ংকর রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে জাদুমন্ত্রের মতো ওর পেছনে পেছনে ছুটছিল।
এদিকে, মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা আফিম কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। ওর দলের ছেলেরা ‘ভাই ভাই’ করে চিৎকার করে উঠলে,আফিম হাত তুলে ওদের থামিয়ে দিল। ও নিজের ডান হাতটা আলতো করে নিজের রক্তাক্ত গালে ছোঁয়াল। আঙুলের ডগায় ঠোঁটের কোণের সেই তাজা, গরম রক্ত লেগে আসতেই ওর চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওর মুখে কোনো রাগের বা হিংস্রতার চিৎকার ফুটে উঠল না; কোনো গালি বের হলো না। বরং ও একদৃষ্টিতে, পলকহীনভাবে অরির চলে যাওয়ার দূরন্ত অবয়বটার দিকে তাকিয়ে রইল।
অরির সেই তীব্র তেজ, জুতোর বাড়ির সেই অভূতপূর্ব অপমান আর ওর মুখের সেই কড়া ধমক—সবকিছু আফিমের অপরাধী মগজে এক ভিন্ন ধরণের উগ্র উন্মাদনার সৃষ্টি করল।সে নিজের জীবনে কোনোদিন কোনো মানুষের কাছ থেকে, বিশেষ করে কোনো মেয়ের কাছ থেকে এমন অবহেলা, আঘাত বা প্রত্যাখ্যান পায়নি। সবাই ওর নামে কাঁপে। আর এই মেয়েটা ওকে জুতো পেটা করল!
অরির এই অসম্ভব আর তীব্র তেজ দেখে মনে মনে ওর প্রেমে সম্পূর্ণ অন্ধ ও পাগল হয়ে গেল আফিম।সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটা অন্য দশটা মেয়ের মতো সস্তা বা সাধারণ নয়—ও এক অপার্থিব, পবিত্র অগ্নিকন্যা, যাকে শুধু ভোগ করা নয়, বরং নিজের জীবনে চিরতরে বন্দি করাই এখন ওর একমাত্র পৈশাচিক নেশা ও সাধনা।
ঠিক তখনই রাফান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এবং আফিমের এই চরম অপমান দেখে নিজের দাপট ও আনুগত্য দেখাতে চাইল। সে আফিমের পাশে এসে অত্যন্ত নোংরা ও বাজে ভাষায় অরিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল,
“আফিম ভাই! এই শালি মা*গির এত বড় সাহস! ও আপনাকে জুতো দিয়ে মারল? এই মা*গিটাকে আমি আজ রাতেই তুলে নিয়ে আসব আপনার ডেরায়! ওর এই ফর্সা শরীরের চামড়া আমি নিজের হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলব! আপনি শুধু হুকুম দ্যান ভাই…”
রাফানের মুখ থেকে অরি সম্পর্কে সেই নোংরা ও অপবিত্র শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই, যেন এক বন্য, রক্তাক্ত চিতাবাঘ রাফানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল!
আফিম এক ঝটকায় রাফানের শার্টের কলার আর গলাটা নিজের দুই হাত দিয়ে খপ করে ধরে ফেলল! ওর চোখের মনিতে তখন এক পৈশাচিক, খুনে হিংস্রতা। আফিম রাফানের গলা চেপে ধরে, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে পিচঢালা রাস্তার মাঝখানে সশব্দে আছাড় মেরে মাটিতে শুইয়ে দিল!
“আহ্! ভাই… মারছেন কেন?! আমি তো ওই শালির…” রাফান ব্যথায় আর তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু আফিম থামল না। ও নিজের জুতো পরা ভারী পা-টা সরাসরি রাফানের মুখের ওপর এবং মাথায় চেপে ধরল! নিজের পায়ের তলায় রাফানের মাথাটা শক্ত করে পিষে দিতে দিতে রাগান্বিত কণ্ঠে চিৎকার করে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি, শুয়োরের বাচ্চা! ও পবিত্র! ও আমার হুরপরি! ওর সম্পর্কে যদি আর একটাও অপবিত্র, নোংরা বা সস্তা শব্দ তোর এই নোংরা মুখ থেকে বের হয়, তবে তোকে আমি এই রাস্তার মাঝখানেই জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! মনে রাখিস,ও শুধু আফিম খন্দকারের! ও আমার রানী!”
আফিমের এই আচমকা, উগ্র ও ভয়ংকর রূপ দেখে ওর দলের বাকি চামচারা ভয়ে তিন ফুট পিছিয়ে গেল। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, আফিম ভাই নিজে জুতোর বাড়ি খাওয়ার পর কেন নিজের বিশ্বস্ত লোকের ওপরই এমন বন্য পৈশাচিকতায় মেতে উঠেছে! রাফান মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল, ওর মুখ দিয়ে তখন লালা আর রক্ত বের হচ্ছিল।
আফিম ওর মাথা থেকে পা-টা সরিয়ে নিল। নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটি সাদা রুমাল বের করে ঠোঁটের কোণের রক্তটা আলতো করে মুছল। ও আবার অরির চলে যাওয়ার সেই দূর সীমানার দিকে তাকাল, যেখানে অরি ততক্ষণে কলেজের গেটের ভেতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আফিমের ঠোঁটের কোণে এবার এক তীব্র, উন্মাদ ও পাগল প্রেমিকের হাসি ফুটে উঠল। ও নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“তীব্র তেজ… মারাত্মক সৌন্দর্য! তোমার এই জুতোর বাড়ির দাগ আমি আমার গালে সারাজীবন যত্ন করে রেখে দেব, আমার হুরপরি। তোমাকে আমার চাই-ই চাই। তবে এবার কোনো জোর-জুলুম বা খাটানো নয়… তোমাকে আমি আমার এই পৈশাচিক প্রেমের সাগরে ডুবিয়ে, ভালোবেসে নিজের করে নেব। তুমি শুধু আমার।”
আফিম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ও নিজের জিপ গাড়ির দিকে ধীর, দর্পিত পায়ে হেঁটে গেল। আর ওর দলের লোকেরা তখন কাঁপতে কাঁপতে রাফানকে মাটি থেকে টেনে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরো এলাকা জুড়ে তখনো এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল।
মৃধা নিবাসের সুপরিসর এবং রাজকীয় শয়নকক্ষে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। জানালার ভারী সিল্কের পর্দাগুলো আংশিক টানা, যার আড়াল থেকে আসা দুপুরের তপ্ত আলো ঘরে আসবাবপত্রের ওপর এক ধরনের মায়াবী ছায়ার সৃষ্টি করেছে। বিশাল কিং-সাইজ বেডের একপাশে হেলান দিয়ে বসে ছিল সারিম।ডান হাতটি সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো, যা ওর সুঠাম অবয়বে এক ধরনের ক্লান্ত অথচ ধারালো আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে। ওর বাঁহাতে থাকা কাঁচের গ্লাসে বরফকুচি দেওয়া ঠাণ্ডা পানি, যা ও অলস ভঙ্গিতে নাড়ছিল। বরফের টুংটাং শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙার চেষ্টা করছিল বারবার।
সোফার এক কোণে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল আলভি। আলভির পরনে ফরমাল শার্ট, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ঘরের ভেতরের এয়ার কন্ডিশনারের ঠাণ্ডা বাতাসও ওর ভেতরের ভয় এবং উত্তেজনাকে প্রশমিত করতে পারছিল না। ও খুব ভালো করেই চেনে ওর এই ক্ষ্যাপাটে বসকে। কখন যে কার কপালে কোন শনি ডেকে আনেন, তা স্বয়ং বিধাতাই ভালো জানেন।
সারিম গ্লাসের শেষ চুমুকটা দিয়ে ওটা ধপ করে পাশের সাইড টেবিলে রাখল। ওর সেই তীক্ষ্ণ, গাঢ় চোখের মণি দুটো এবার সরাসরি আলভির মুখের ওপর স্থির হলো। ও নিজের অবাধ্য চুলগুলো বাম হাত দিয়ে একটু পেছনের দিকে ঠেলে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল,
“আলভি।”
আলভি এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“জি… জি বস! বলুন। কোনো আদেশ?”
সারিম বিছানা থেকে নিজের দীর্ঘ ও সুঠাম শরীরটা নিয়ে অত্যন্ত চটপটে ভঙ্গিতে নেমে দাঁড়াল। ওর পরনে নেভি ব্লু কালারের লিনেন শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। ও আলভির দিকে এক কদম এগিয়ে এসে সোজা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর বারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ছুঁইছুঁই করছে। সারিমের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা চতুর ও বাঁকা হাসিটা আবার ফুটে উঠল। ও অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“গাড়ি বের করো। চন্দ্রিমার পরীক্ষা কেন্দ্রে যাব। আমার বউকে রিসিভ করে নিয়ে আসার দায়িত্বটা তো আইনত এবং নৈতিকভাবে আমারই, তাই না?”
সারিমের মুখে এই কথাটি শোনামাত্রই আলভির চোখ দুটো আক্ষরিক অর্থেই কপালে উঠে গেল! ও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও হাঁ করে বসের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ও এইমাত্র শুনল যে স্বর্গের কোনো দেবতা মর্ত্যে এসে রিকশা চালাবেন! আলভি নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“অ্যাঁ! বস… আপনি এই অবস্থায়… এই ভাঙা হাত আর অসুস্থ শরীর নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবেন? তাও আবার ম্যামকে রিসিভ করতে? আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন আপনি দেশের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী! আপনার একটা আলাদা প্রটোকল আছে, আপনার একটা বিশাল সম্মান আছে। আপনি যদি হুট করে কোনো গার্লস কলেজের সামনে গিয়ে নিজের বউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করেন, তবে তো মিডিয়া আর আমজনতা আপনাকে প্রশ্ন করে গিলে খাবে! তাছাড়া…”
সারিম আলভিকে ওর কথা শেষ করার সুযোগ দিল না। ও নিজের জ্বলজ্বল করা চোখ দুটো আলভির মুখের ওপর এনে অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ বিপজ্জনক গলায় বলল,
“চুপ করো, আলভি! তোমার এই অতিরিক্ত জ্ঞান বিতরণ আমার একদম পছন্দ হচ্ছে না। আমি খুব ভালো করেই জানি আমি কে। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো, আমি আরিশান মৃধার ছেলে এবং চন্দ্রিমা ওরফে অরির বিবাহিত স্বামী। তুমি কি সকালের ওই দৃশ্যটা খেয়াল করোনি? আমার ওই দুগ্ধশুভ্র হরিণীটার রূপ কতটা মারাত্মক সুন্দর!এই জগতসংসারে লম্পট আর শকুনদের তো অভাব নেই। আমার ওমন সুন্দর বউটার ওপর যদি বাইরের কোনো ছোটলোকের বা ফালতু মানুষের নজর চলে যায়, তবে সেই চোখ দুটো আমি নিজের হাতে উপড়ে ফেলব! তার চেয়ে অনেক ভালো, নিজের সম্পত্তি আগে থেকেই নিজেই পাহারায় রাখা।আমার বউকে আমি গিয়ে নিয়ে আসব, এতে লজ্জার কী আছে?”
আলভি নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“হায় রে খবিশ বেটা! নিজের বিয়ের কথা দুনিয়ার কাছ থেকে লুকায় রাখছে, আবার এখন মজনুর মতো প্রেম উথলাইয়া উঠছে! কপাল আমার ভাঙা, নাইলে এই পরির পাশে আজকে আমি থাকতাম!’ তবে মুখে অত্যন্ত বিনীত হয়ে বলল,
“কিন্তু স্যার, আপনার সিকিউরিটি?আপনার বাবা ওরফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় যদি জানতে পারেন আপনি এই অবস্থায় প্রটোকল ছাড়া বাইরে গেছেন, তবে ওনি ওনার স্পেশাল ফোর্স দিয়ে আমার চামড়া তুলে নেবে! আপনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। আপনার ডান হাতের ক্ষতটা…”
“আলভি, আমি তোমাকে গাড়ি বের করতে বলেছি, তর্ক করতে বলিনি!”
সারিমের গলার স্বর এবার এক ধাক্কায় বেশ কয়েক ধাপ উঁচুতে উঠে গেল। ঘরের বাতাস যেন ওর সেই পুরুষালি কণ্ঠের ভারে থমকে গেল।
“আমার সুস্থতা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।সো, ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম। জাস্ট গেট দ্য কার রেডি!”
বসের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সামনে আলভির আর কোনো কথা বলার সাহস রইল না। ও দ্রুত মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল গাড়ি প্রস্তুত করতে। সারিম আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের বাঁহাত দিয়ে শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে ও আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। ওর চোখে প্রেমিকের চাউনি।নিজের মনে নিজেই বিড়বিড় করে বলছে,
“আজকে তোমাকে আমি আমার এই ভালোবাসার জালে বন্দি করেই ছাড়ব, চন্দ্রিমা। তুমি যতই পালাও, এই সারিম মৃধার বুক ছাড়া তোমার আর কোনো আশ্রয় নেই।”
দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট।গার্লস কলেজের মেইন গেটের সামনে তখন উপচে পড়া ভিড়। অভিভাবক, সাধারণ পথচারী আর হরেক রকমের যানবাহনের কোলাহলে চারপাশটা একদম মুখরিত। ঠিক তখনই কলেজের ঠিক সামনের রাস্তার এক কোণায় এসে থামল সেই কুচকুচে কালো প্রাডো গাড়িটি। গাড়ির কালো কাঁচের আড়ালে বসে সারিম বাইরে তাকিয়ে ছিল। ও লক্ষ্য করল, ঠিক কলেজের মেইন গেটের সামনের রাস্তার একটা মস্ত বড় অংশ জুড়ে কাদা পানি এক হয়ে আছে। আসলে মেইন রোডের পাশে থাকা ওয়াসার একটি বড় মোটরের পাইপ ফেটে সকাল থেকেই অনবরত নোংরা পানি বের হচ্ছিল, যার ফলে পুরো পিচঢালা রাস্তাটা এখন ঘোলাটে, নোংরা কাদা পানিতে তলিয়ে গেছে।
পরীক্ষার্থীরা একে একে হল থেকে বের হতে শুরু করেছে। সবার মুখেই পরীক্ষা শেষের ক্লান্তি আর বাড়ি ফেরার তাড়া। কিন্তু গেটের সামনের ওই বিশাল কাদা পানির হ্রদ দেখে অনেক মেয়েই বিরক্ত হয়ে ড্রেস কুঁচকে, স্যান্ডেল হাতে নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই সারিমের চোখ গেল গেটের ঠিক মাঝখানে। আকাশী রঙের ইউনিফর্ম পরা অরি আর ওর পাশে থাকা জেবা ধীর পায়ে হেঁটে গেটের দিকে আসছিল। অরির চোখে সেই গোল রিডিং গ্লাস, হাতে ফাইল। রোদ থেকে বাঁচার জন্য ও নিজের বাঁহাতটা কপালের ওপর আলতো করে ধরে রেখেছে। রোদ লেগে ওর ফর্সা মুখটা সামান্য লালচে হয়ে আছে, যা দূর থেকে দেখতে কোনো রক্তিম গোলাপের মতো লাগছিল।
সারিম চট করে গাড়ির দরজা খুলতে গেল। আলভি পাশ থেকে চিৎকার করে উঠল,
“বস! বস! করছেন কী? বাইরে তাকিয়ে দেখুন, পুরো রাস্তা কাদায় মাখামাখি। আর ওই দেখুন, কিছু স্থানীয় সাংবাদিক আর মিডিয়া লাইভ কভারেজের জন্য ঘোরাঘুরি করছে। আপনাকে এই অবস্থায় দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!”
সারিম আলভির কথার কোনো উত্তর দিল না। ওর চোখ তখন শুধু চন্দ্রিমার ওই ফর্সা, সুন্দর পা দুটোর দিকে। সারিম মনে মনে ভাবল,
“আমার ওই পবিত্র পরীটা এই নোংরা কাদা পানির ওপর দিয়ে হেঁটে আসবে? ওর ওই সুন্দর পায়ে এই পৃথিবীর কোনো নোংরা ধূলিকণা লাগুক, তা আমি বেঁচে থাকতে কখনোই হতে দেব না!’
সারিম এক মুহূর্তও চিন্তা করল না। ও নিজের পায়ের দামি চামড়ার জুতো জোড়া গাড়ির ফ্লোরেই খুলে রেখে দিল। সম্পূর্ণ খালি পায়ে, নিজের পরনের দামি লিনেন প্যান্টটা সামান্য ওপরে গুটিয়ে ও গাড়ি থেকে নিচে নেমে পড়ল। ওর এই আকস্মিক কাণ্ড দেখে আলভি নিজের গালে একটা চড় মেরে গাড়ি থেকে নামল।
শিক্ষামন্ত্রী আবরার সারিমকে এভাবে প্রটোকল ছাড়া, খালি পায়ে কাদা পানির মধ্যে নামতে দেখে আশেপাশের আমজনতা, অভিভাবক এবং কলেজের সিকিউরিটি গার্ডরা আক্ষরিক অর্থেই শকড হয়ে গেল! সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল আর ফিসফিস করছিল,
“আরে! ওটা কি শিক্ষামন্ত্রী সারিম মৃধা না? ওনার এখানে কী কাজ? তাও আবার খালি পায়ে কাদার মধ্যে!”
এদিকে অরি আর জেবা গেটের সামনে এসে ওই নোংরা কাদা পানি দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। জেবা বেশ বিরক্ত হয়ে বলল,
“ধুর শালা! এই আমাদের দেশের অবস্থা! একটা কলেজের সামনে এই অবস্থা করে রাখছে। এখন এই কাদা পানি পার হবো কেমনে? ইউনিফর্ম তো সব শেষ!”
অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের জুতো পরা পায়ের দিকে তাকাল।এরপর যেইমাত্র এক পা কাদার দিকে বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের মানুষের গুঞ্জন আর কোলাহল ভেদ করে এক অত্যন্ত পরিচিত, গম্ভীর ও অতিশয় পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“একদম এক পা-ও সামনে বাড়াবে না, চন্দ্রিমা!”
কণ্ঠস্বরটি শোনামাত্রই অরির পুরো শরীরটা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। ও অত্যন্ত অবাক হয়ে, নিজের চশমাটা নাকের ওপর ভালো করে চেপে ধরে সামনে তাকাল। সামনে তাকানো মাত্রই ওর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল,হাতের থাকা ফাইলটি প্রায় পড়ে যাওয়ার দশা হলো!
সোজা কাদা পানি মাড়িয়ে, নিজের ডান হাতের ব্যান্ডেজটা বুকের সাথে আগলে রেখে, অত্যন্ত দর্পিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে স্বয়ং মৃধা আবরার সারিম! ওর চোখ দুটো সরাসরি অরির চোখের ওপর স্থির। চারপাশের পুরো পৃথিবী যেন অরির কাছে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
জেবা সারিমকে এই অবস্থায় দেখে নিজের চোখ দুটো গোল গোল করে অরিকে কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে বলে উঠল,
” অরি, তুই একটু দেখ! তোর সেই ভাই, মানে আমাদের দেশের ইয়াং অ্যান্ড ড্যাশিং শিক্ষামন্ত্রী স্যার এখানে কেন? উনি কাদার মধ্যে খালি পায়ে হেটে তোর দিকেই আসছে কেন রে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি রে অরি?!”
অরি কোনো উত্তর দিতে পারল না। ওর কপালে তীব্র চিন্তার আর রাগের ভাঁজ পড়ল।
সারিম অরির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কাদার ছিটেফোঁটা ওর দামি প্যান্টে লাগলেও ওর সেই ব্যক্তিত্বে কোনো কমতি ছিল না। ও অরির দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা মাদকতাভরা বাঁকা হাসিটা হাসল। অরি নিজের রাগ সামলাতে না পেরে নিচু স্বরে অত্যন্ত কড়া গলায় বলল,
“মিস্টার সারিম মৃধা! আপনি এখানে এই অবস্থায় কী করছেন? আপনার লজ্জা করে না? এত মানুষের সামনে…”
সারিম ওর কোনো কথার তোয়াক্কা করল না। ও অরিকে আরও এক দফা চরম অবাক করে দিয়ে, নিজের বাঁহাত দিয়ে এক ঝটকায় অরির পা থেকে কলেজ জুতো দুটো খুলে ফেলল! অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সারিম নিজের ব্যান্ডেজ করা ডান হাতটাতে কোনোমতে অরির জুতো দুটো শক্ত করে ধরে, ওর সেই শক্তিশালী ও সুঠাম বাঁহাতটা অরির কোমর আর পায়ের নিচে গলিয়ে দিল।
এবং এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে, পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ আর রাস্তাবাসীকে তীব্র ধাক্কা দিয়ে সারিম অরিকে নিজের পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল!
“আঁক…!” অরি লজ্জায় আর চরম বিস্ময়ে একটা ছোট চিৎকার দিয়ে উঠল। নিজের ভারসাম্য সামলাতে ও অবচেতনভাবেই সারিমের চওড়া কাঁধ আর গলাটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
“কী করছেন আপনি?! ছাড়ুন আমাকে! সবাই দেখছে! মরে যাব আমি লজ্জায়! ছাড়ুন বলছি!”
অরি সারিমের বুকের মধ্যে ছটফট করতে করতে অত্যন্ত নিচু কিন্তু রাগত গলায় ফিসফিসিয়ে বলল। ওর ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর চরম রাগে এক মুহূর্তে টকটকে লাল জবা ফুলের মতো হয়ে গেল। ওর হার্টবিট প্রতি মিনিটে দুশো বার কাঁপছিল।
সারিম অরিকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ওর ফর্সা কপালে অরির চুলের সুবাস লাগতেই ও এক পরম তৃপ্তির শ্বাস নিল। ও অরির কানের কাছে নিজের মুখটা এনে অত্যন্ত নিচু, গভীর গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“একদম চুপচাপ শান্ত হয়ে থাকো, বউ! আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো। তোমার এই সুন্দর, নিষ্পাপ পা দুটোতে এই নোংরা পৃথিবীর কাদা লাগুক, তা আমি সইতে পারব না। তুমি শুধু আমার বুকে মুখ লুকিয়ে রাখো, বাকিটা আমি দেখছি।”
এদিকে এই অভূতপূর্ব, অলৌকিক আর চরম রোমান্টিক দৃশ্য দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেবা যেন আক্ষরিক অর্থেই একটা জীবন্ত পাথরের মূর্তি হয়ে গেল! ওর মুখটা হাঁ হয়ে এত বড় হলো যে ওটার ভেতর একটা আস্ত একটা পল্টি মুরগি ঢুকে যেতে পারত।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আলভি নিজের কপালে বাম হাত দিয়ে থাপ্পড় মেরে বলল,
“সব শেষ! বসের এই উথলানো প্রেমের চক্করে আজকে মিডিয়ায়, আমার চাকরি আর সম্মান দুইটাই কয়লা হয়ে যাবে!”
সারিম অত্যন্ত দর্পিত পায়ে অরিকে কোলে নিয়ে কাদা পানি পার হতে শুরু করল। অরি লজ্জায় নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সারিমের চওড়া বুকে নিজের মুখটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলল। সারিমের বুকের পুরুষালি সুবাস আর ওর হৃদপিণ্ডের তীব্র ধকধক শব্দটা অরিকে কেমন যেন এক অদ্ভুত মায়ায় অবশ করে দিচ্ছিল। ও কিছুতেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারছিল না।
ঠিক তখনই, এই ঐতিহাসিক কাণ্ড দেখে দূর থেকে একদল স্থানীয় সাংবাদিক তাদের ক্যামেরা আর বুম নিয়ে ঝড়ের গতিতে কাদা পানি মাড়িয়েই সারিমের পথ আটকে দাঁড়াল! ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটগুলো অনবরত অরি আর সারিমের মুখের ওপর জ্বলতে আর নিভতে লাগল।
একজন অতি-উৎসুক সাংবাদিক নিজের বুমটা সারিমের মুখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়! আপনার কোলে থাকা এই সাধারণ কলেজের ইউনিফর্ম পরা মেয়েটি আসলে কে হয় আপনার? ওনার সাথে আপনার সম্পর্কটা কী? অনুগ্রহ করে দেশবাসীকে কিছু বলুন!”
সাংবাদিকদের এই আকস্মিক ও ফালতু চিল্লানি শুনে সারিমের এতক্ষণের রোমান্টিক ও শান্ত মুডটা এক সেকেন্ডে এক ভয়ংকর, রক্তাক্ত চিতার মতো রূপ ধারণ করল! ওর চোখের মনিতে এক খুনে চাউনি ফুটে উঠল। ও বুঝতে পারল এই বেয়াদব মিডিয়াগুলো ওর চন্দ্রিমার নিষ্পাপ ছবি তুলে পুরো দেশের সামনে নিয়ে আসবে।
সারিম চট করে অরিকে নিজের বুকের সাথে আরও একটু উঁচিয়ে ধরল, যাতে ক্যামেরার লেন্সে অরির মুখটা কোনোভাবেই স্পষ্ট না আসে। ও অরির কানের কাছে অত্যন্ত কড়া কিন্তু সতর্ক গলায় বলল,
“চন্দ্রিমা! একদম মুখ তুলবে না! আমার বুকে নিজের মুখটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখো। এই বেয়াদব শালার সাংবাদিকরা তোমার ছবি তুলে আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরো দেশের সামনে দেখিয়ে দিতে চাইছে। জাস্ট হাইড ইওর ফেস!”
অরি লোকটার এমন অদ্ভুত ও মালিকানাসূচক কথা শুনে আর রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চাপল। কিন্তু সাংবাদিকদের ক্যামেরার হাত থেকে বাঁচতে ও নিজের মুখটা সারিমের শার্টের কাপড়ের ভেতরে আরও শক্ত করে গুঁজে দিল।
সারিম এবার নিজের সেই তীব্র, বজ্রকঠিন চোখ দুটো সরাসরি ওই প্রশ্ন করা সাংবাদিকের চোখের ওপর স্থির করল। ওর ভেতরের সেই মন্ত্রীর রূপটা এক সেকেন্ডে জেগে উঠল। ও অত্যন্ত কর্কশ, রাগান্বিত ও কড়া ভাষায় সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলুন! চোখ নামিয়ে কথা বলুন! আপনারা কি অন্ধ? দেখতে পাচ্ছেন না ও আমার কে হয়? একজন পুরুষ নিজের সমস্ত সম্মান আর শক্তি দিয়ে নিজের হাতঘায়েল অবস্থায় কাকে এভাবে বুকে আগলে রাখে? ও আমার বিবাহিত স্ত্রী! আমার আইনত বউ! বউ ছাড়া আর কে হবে, শুনি?!”
সারিমের মুখ থেকে এই ‘বউ’ শব্দটা শোনামাত্রই যেন পুরো আকাশটা এক ধাক্কায় ওই সাংবাদিকদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ল! শুধু সাংবাদিকরা নয়, পাশে থাকা জেবা তো এই কথা শুনে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় আলভির গায়ের ওপর পড়ে যাওয়ার দশা হলো! জেবা কাঁপতে কাঁপতে আলভিকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই… ভাইয়া! ওই বেটা কী বলল? অরি ওনার বউ?! মানে শিক্ষামন্ত্রীর বউ আমাদের অরি?!”
আলভি অত্যন্ত করুণ একখানা হাসি দিয়ে বলল,
“জি বোন, আপনি একদম ঠিক শুনেছেন। ওই খবিশ বস আর আপনার ওই বান্ধবী পাচঁ বছর আগে থেকেই বিবাহিত। এখন আমাদের কপাল পোড়ার পালা!”
এদিকে ওই সাংবাদিকটি সারিমের এই রুদ্ররূপ দেখে সামান্য থতমত খেয়েও নিজের টিআরপি বাড়ানোর জন্য আবার আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু… কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়, আপনি তো কখনো নিজের বিয়ের কথা দেশবাসীকে জানাননি। এভাবে হুট করে একটা কলেজের সামনে…”
সারিম এবার চরম মেজাজ হারিয়ে অত্যন্ত কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“আমার ব্যক্তিগত জীবন আমি দেশবাসীকে ঢোল পিটিয়ে জানাবো কি না, তা আমার ব্যাপার! আপনাদের মতো ফালতু মিডিয়াকে জবাবদিহি করতে আমি বাধ্য নই। শোন বেটা সাংবাদিক! আমার বউয়ের একটা ছবিও যদি আজকে কোনো নিউজ পোর্টাল বা টিভিতে পাবলিশ হয়েছে, তবে তোদের ওই ক্যামেরা সহ তোদের পাছায় আমি নিজের হাতে বাঁশ ঢুকিয়ে দেব! মৃধা আবরার সারিমের ক্ষমতা তোরা এখনো ভালো করে দেখিসনি। একদম আমার পথ থেকে সর! নয়তো এখানেই তোদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেব!”
মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন চরম ও ভয়ংকর হুমকি শুনে সাংবাদিকদের দল ভয়ে তিন ফুট পিছিয়ে গেল। ক্যামেরাম্যানরা চট করে নিজেদের ক্যামেরার লেন্স নিচের দিকে নামিয়ে ফেলল। কেউ আর একটা শব্দ করার সাহস পেল না। সারিমের সেই খুনে চাউনি দেখে সবাই বুঝতে পারল, এই লোকটা যা বলেছে তা সত্যি সত্যি করে ছাড়বে।
সারিম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ও অত্যন্ত দর্পিত, দীর্ঘ পায়ে কাদা পানি মাড়িয়ে সোজা গিয়ে নিজের প্রাডো গাড়ির সামনে দাঁড়াল। আলভি দ্রুত এগিয়ে এসে গাড়ির পেছনের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে দিল।
সারিম অত্যন্ত সাবধানে, যেন কোনো কাঁচের তৈরি দামি পুতুল রাখছে, ওমন ভঙ্গিতে অরিকে গাড়ির নরম পেছনের সিটের ওপর বসিয়ে দিল। অরি সিটে বসামাত্রই এক ঝটকায় সারিমের কাঁধ থেকে নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিল। ওর বুকটা তখনো রাগে আর লজ্জায় অনবরত কাঁপছিল। ও নিজের গ্লাসটা ঠিক করতে করতে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল।
সারিম নিজে গাড়ির ভেতরে ঢোকার আগে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জেবার দিকে তাকাল। জেবা তখনো ওই ‘বউ’ শব্দের ঘোরের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, ওর মাথা কাজ করছিল না। সারিম অত্যন্ত গম্ভীর গলায় জেবাকে বলল,
“জেবা, গাড়ির ভেতরে এসো।
জেবা জাদুমন্ত্রের মতো মাথা নেড়ে বলল,
“জি… জি ভাইয়া!”
আলভি পাশ থেকে জেবাকে উদ্দেশ্য করে বেশ রসালো ভঙ্গিতে বলল,
“আসুন ভাবির বান্ধবী শায়েরা বানু! বসের এই প্রেমের ঘোরের মধ্যে আপনিও গাড়িতে এসে বসুন। আমাদের কপালে আজকে আরও অনেক নাটক আছে!”
জেবা আর কোনো কথা না বলে দ্রুত গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে অরির পাশে বসল। আলভি ড্রাইভিং সিটে বসে এক ঝটকায় গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। কালো প্রাডো গাড়িটি তীব্র গতিতে কলেজের সেই কাদা পানি আর মানুষের ভিড় মাড়িয়ে মেইন রোডের দিকে ছুটে চলল।
গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা তখন এক অদ্ভুত, থমথমে উত্তেজনায় রূপ নিয়েছিল। সারিম পেছনের সিটে অরির একদম মুখোমুখি বসে নিজের বাম হাত দিয়ে চিবুক ঠেকিয়ে একদৃষ্টিতে অরির সেই রাগী, ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর ঠোঁটের কোণে তখনো সেই চতুর, বিজয়ীর হাসি স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলছিল। আর অরি শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজের অবাধ্য চোখের রাগটাকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।
গাড়ির পেছনের সিটে শুরু হওয়া সেই অখণ্ড নীরবতা গেট পার হয়ে মৃধা নিবাসের এসে থামা পর্যন্ত এক চুলও নড়ল না। পুরোটা পথ অরি জানালার বাইরে চোখ রেখে বসে ছিল, যেন বাইরের ছুটে চলা চেনা শহরটা এখন এই ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য। সারিম অবশ্য সে সুযোগ খুব একটা দেয়নি। ও নিজের বাম হাত দিয়ে চিবুকটা ছুঁয়ে অত্যন্ত অলস কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরোটা সময় অরির ফর্সা, রাগে থমথম করা মুখটার ওপর চোখ বুলিয়ে গেছে।
মাঝখানে শুধু জেবা কয়েকবার আড়চোখে অরি আর সারিমের দিকে তাকিয়ে নিজের ঢোক গিলেছে। তার চঞ্চল মুখটা যে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছটফট করছে, তা ওর কুঁচকানো কপাল দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আলভি রিয়ার-ভিউ মিররে বসের সেই মজনু মার্কা চাউনি দেখে মনে মনে কয়েকবার’লা হাওলা’ পড়েছে, কিন্তু মুখে টু শব্দ করার সাহস পায়নি।
গাড়ি এসে থামতেই অরি কারো জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই ঝটকা দিয়ে দরজা খুলে নেমে গেল।অরির দীর্ঘ বাদামী চুলগুলো পিঠে দোল খাচ্ছে। ও সোজা দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরের প্রধান লিভিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ওর পেছনে জেবা আর তারও কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে নিজের সেই ব্যান্ডেজ করা হাতটা বুকের কাছে আগলে নিয়ে ধীরস্থির ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল সারিম।
লিভিং রুমে পা রাখামাত্রই অরির পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায় কালো রঙের একটা জর্জেটের শাড়ি পরে বসে আছে নওমি। নওমির চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে আরিশান মৃধার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরাসরি মন্ত্রীর অন্দরমহলে এসে ঢুকে বসে আছে সারিমের খোঁজে।
সারিম লবি পার হয়ে লিভিং রুমে ঢুকতেই, নওমি সোফা ছেড়ে একপ্রকার ঝড়ের গতিতে উঠে দাঁড়াল।
সারিম কে দেখামাত্রই নওমির ভেতরের সমস্ত পাগলামি যেন এক নিমেষে চাড়া দিয়ে উঠল। ও কোনো দিকে না তাকিয়ে, নিজের আত্মসম্মান পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে সারিমের দিকে ছুটে এলো,
”সারিম! তুই এসেছিস? আমি জানতাম তুই আমার ওপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবি না! প্লিজ সারিম, আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিস না…”
নওমি সারিমকে জড়িয়ে ধরার জন্য একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়তে চাইল। কিন্তু সারিম তো অন্য ধাতুতে গড়া। ও নওমির এই নির্লজ্জ ধেয়ে আসা দেখেই এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের দীর্ঘ শরীরটাকে ডানে সরিয়ে নিল এবং সোজা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অরির পেছনের অংশে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল! আঠারো বছরের অরি, যার উচ্চতা সারিমের চওড়া ছাতির সমান, সে হঠাৎ করেই নিজের সামনে সারিমের মতো ছয়-ফুট-দুই ইঞ্চির এক বিশাল পুরুষকে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে চরম থতমত খেয়ে গেল।
সারিম অরির দুই কাঁধ নিজের বাম হাত দিয়ে আলতো করে ধরে ওর পেছনে পুরোপুরি আত্মগোপন করার ভান করল। ওর মুখটা অরির কানের একদম কাছে নিয়ে এসে, অত্যন্ত ভীতু ও অসহায় বাচ্চাদের মতো সুর করে, কিন্তু লিভিং রুমে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে শোনানোর মতো পরিষ্কার গলায় বলে উঠল,
”দেখো বউ, দেখো! এই নির্লজ্জ বেডি কীভাবে তোমার জোয়ান-মরদ জামাইকে মাঝ দুপুরে সবার সামনে খপ করে ধরতে আসে! এই হেতি একটা আস্ত ডাইনি রে বউ! এর আগেও একবার আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার টাই ধইরা টান মেরে ঠোঁটে কামড় বসায় দিছে! একদম জবরদস্তি কইরা আমার ঠোঁটের পবিত্র কিস খায়া নিছে! অথচ ওই কিসটা তো আইনত এবং নৈতিকভাবে তোমার খাওয়ার কথা ছিল, চন্দ্রিমা! তুমি থাকতে এই বেদুইন বেডি আমার ঠোঁটের কুমারিত্ব নষ্ট কইরা দিছে! তুমি এর একটা বিচার করো বউ!”
সারিমের মুখে অদ্ভুত কথা শোনা মাত্রই অরির ফর্সা মুখের চামড়া যেন বিরক্ত আর রাগে রি-অ্যাক্ট করে উঠল। ও নিজের ঘাড় ঘুরিয়ে সারিমের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সারিম ওকে শক্ত করে ধরে রেখে নওমির দিকে আঙুল উঁচিয়ে রইল।
জেবা এক কোণে দাঁড়িয়ে এসব মেলোড্রামা দেখতে লাগলো। ওর মনে হলো, সে কোনো দামী মাল্টিপ্লেক্সে বসে লাইভ ‘পারিবারিক কমেডি প্লাস রোমান্টিক থ্রিলার’ সিনেমা দেখছে।
আর আলভি যে মাত্র লিভিং রুমে পা রেখেছিল, সে সারিমের এই ‘কুমারিত্ব নষ্টের’ ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে দরজার চৌকাঠে ধাক্কা খেয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। তবে আলভির চোখ তখন সোজা গিয়ে পড়ল কালো শাড়ি পরা, জেদী চেহারার নওমির ওপর, আলভির বুকের বাঁ পাশে কেমন যেন একটা ওলটপালট হয়ে গেল। ও নিজের শার্টের পকেটে হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরল। মনে মনে বলল,
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৬
“আহা !কী মারাত্মক ভালুপাশা! এই মেয়েরে যে নিজের করতে পারবে, তার জীবন তো তেজপাতা হইলেও সার্থক!’ আলভি প্রথম দেখাতেই নওমির ওই জিদ্দি রূপের প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করল।
এদিকে নওমি তো সারিমের কথা শুনে এবং সারিমকে একটা পিচ্ছি মেয়ের পেছনে ওভাবে লুতুপুতু করে লুকিয়ে থাকতে দেখে রাগে অন্ধ হয়ে গেল। ও অরির দিকে নিজের তর্জনী উঁচিয়ে তীব্র কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
”সারিম! তুই এই বাচ্চার পেছনে লুকিয়ে কী ফালতু তামাশা করছিস? আর তুই একে বারবার ‘বউ’ ‘বউ’ বলে কী নাটক করেছিস হ্যাঁ?
