উন্মাদনা পর্ব ৩৫
কায়নাত খান কবিতা
‘বান্দী লাগবো রে..বান্দী রে লাগবো!’
অভীর বুকের ভেতর দিয়ে হঠাৎ করেই যেন এক শীতল হাওয়া বয়ে যায়। রাত তখন গভীর। পুরান ঢাকার আকাশে কুয়াশার মতো ধোঁয়া জমে আছে। দূরে কোথাও হারমোনিয়ামের সুর, কোথাও মাতা’লদের চিৎকার, কোথাও আবার পুরোনো গলির ভাঙা বাতির হলুদ আলো। তবু এই কোলাহলের মাঝেও অভীর ভেতরটা অদ্ভুত নরম হয়ে আসে।যেন বহুদিন পরে তার ভিতরের হিং’স্র মানুষটা একটু থেমেছে।ঠিক তখনই কানে ভেসে আসে।
“অভী?”
অভী ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকায়।আনন্দী দাঁড়িয়ে আছে।চোখে গাঢ় কাজল। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি। বাতাসে উড়তে থাকা চুলগুলো বারবার মুখে এসে পড়ছে। সেই মুহূর্তে মেয়েটাকে বাস্তবের কেউ মনে হচ্ছিল না। বরং এমন লাগতে থাকে , যেন বহু পুরোনো কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে।অভী স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে।তারপর হঠাৎই খেয়াল করে।আনন্দীর ঠোঁটের নিচে ছোট্ট একটা তিল।অদ্ভুত সুন্দর।কিন্তু এই তিল তো আগে ছিল না।তাহলে এখন কেন এত পরিচিত লাগছে?
অভী ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আনন্দীর থুতনিতে ছোঁয়ায়। আঙুলের স্পর্শে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার। জীবনে সে অসংখ্য মানুষের গায়ে হাত তুলেছে, র’ক্ত ছুঁয়েছে, ভয় দেখিয়েছে।কিন্তু এত নরমভাবে কাউকে কোনোদিন ও ছোঁয়া হয়নি। আনন্দীকে ও সে পশু’র মতোই ছুঁয়েছে। তবে আজ কেন এতো মায়া?
“কী হলো অভী?”
আনন্দীর গলায় মায়া মেশানো বিস্ময়।অভীর গলা শুকিয়ে আসে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে বলে ওঠে।
“ আমার তোরেই লাগবো…”
কথাটা বলার পর নিজেই যেন থমকে যায় সে।এটা কি ভালোবাসা?নাকি বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনো অজানা ক্ষুধা?অভী উত্তর খুঁজে পায় না। শুধু চোখ বন্ধ করে আনন্দীর দিকে ঝুঁকে আসে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত যু:দ্ধ, র’ক্ত, হিংসা।সবকিছু থেমে গেছে এই এক মুহূর্তের কাছে।কিন্তু কিছু অনুভূতি মানুষের কপালে বেশিক্ষণ টেকে না।হঠাৎ করেই কানে ভেসে আসে আতঙ্কিত চিৎকার,
“ছাড়েন ভাই! ছাড়েন! আল্লাহ গো!”
অভী চোখ খুলে ফেলে।আর পরের মুহূর্তেই তার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।সামনে আনন্দী না।কবি।ভয়ে আধমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।চারপাশে নোবেল, শহিদুল আর বাকিরা খিলখিল করে হাসছে। কেউ হাঁটু চাপড়াচ্ছে, কেউ আবার হাসতে হাসতে দম ফেলতে পারছে না।কয়েক সেকেন্ড স্থির তাকিয়ে থাকে অভী।তারপর বিরক্তিতে কবিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।মুহূর্ত আগেও বুকের ভেতর যে নরম অনুভূতিটা জন্ম নিচ্ছিল, সেটা আবার ধীরে ধীরে রাগের আড়ালে লুকিয়ে যায়।অভী কিছু না বলে সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।তারপর নিচু গলায় নিজেকেই গালি দেয়
‘বান্দী তোর খবর আছে।’
অভী তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে। রাত তখন অনেক গভীর।জীপের আলো অন্ধকার গলি কেটে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। নোবেল, শহিদুল, কবিরা নিজেদের মাঝে কথা বলছে, কিন্তু অভী চুপ। মাথা সিটে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে ছিলো সে। তার ভিতরে কী চলছিলো, সেটা বোঝার ক্ষমতা কারও নেই।আর রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিলকিস।
মাচার রঙিন আলো অনেক আগেই নিভে গেছে। ঠোঁটের গাঢ় লিপস্টিক কিছুটা মুছে গেছে। চোখের কাজলও ঝাপসা। তবু সে দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু একবার অভীর গাড়িটা দেখবে বলে।গাড়িটা চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। একবারও পিছনে তাকায় না অভী।বিলকিসের বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে ওঠে।সে কি সত্যিই কিছুই বোঝে না? নাকি বুঝেও না বোঝার অভিনয় করে?একটা মানুষকে কতটা ভালোবাসলে তার আসার শব্দ শুনেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে? কতটা ভালোবাসলে প্রতিরাত সাজতে বসে মনে হয়।আজ হয়তো সে একটু বেশি সময় তাকাবে?কিন্তু সমস্যা হলো।এই সমাজ ভালোবাসার আগে পরিচয় দেখে। আর বিলকিসের পরিচয়?রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে।যে মেয়েদের শরীরের দাম আছে, কিন্তু অনুভূতির না। যাদের ঘরে সবাই আসে, কিন্তু কেউ তাদের ঘর দিতে চায় না।
মনে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে রাস্তার পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে বিলকিস। চোখের কোণে জমে থাকা পানি সে বারবার লুকানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই কাঁধে হালকা একটা শীতল স্পর্শ পড়ে।চমকে পিছনে তাকায় সে।ময়না দাঁড়িয়ে আছে।চোখে ক্লান্তি। মুখে মায়া। এই মেয়েটাও একই অন্ধকারে বেঁচে থাকা মানুষ। তাই হয়তো না বললেও সব বুঝে যায়।বিলকিস কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বলে,
“ সবাই তো শরীর ছুইছে। কিন্তু ও ছুঁইল মন?”
কথাটা বলেই হেসে ফেলে সে। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে এত কষ্ট ছিল যে শুনলে বুক ভার হয়ে আসে।
“ আমাগো মতো নিন্ম জাতরে কী কেউ ঘরের বউ বানাইবো?”
ময়না কোনো উত্তর দিতে পারে না।কারণ কিছু সত্য এতটাই নিষ্ঠুর, সেগুলোর উত্তর শব্দে হয় না।রাতের বাতাস ধীরে ধীরে তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছিলো। দূরে অভীর জীপের আলো ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে।আর বিলকিস দাঁড়িয়ে থাকে সেই একই জায়গায়।একজন নর্তকী হয়ে নয়। একজন প্রেমে হেরে যাওয়া নারী হয়ে।
সকালের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পুরান ঢাকার আকাশ জুড়ে নিজের তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাতের উন্মাদনা শেষ হলেও তার রেশ এখনো কাটেনি কারও চোখে। কেরানীগঞ্জের সেই পুরোনো গোডাউনের সামনে সকাল থেকেই মানুষের ভিড় জমে গেছে।সিন্ডিকেটের ছোট বড় সব সদস্য, দালাল, চালান বাহক, রাইডার সকলেই অপেক্ষা করছে একটাই জিনিসের জন্য।কাল রাতের রেসের ফলাফল।
কারণ এই ফলাফলের উপর নির্ভর করছে পুরো এক বছরের আধিপত্য।গোডাউনের মাঝখানে বিশাল একটি এলইডি মনিটর বসানো হয়। তার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে কৃষ্ণ দাস, চন্দ্র দাস, বাতাসি বেগম এবং আবুল বাশার। চারপাশে টানটান উত্তেজনা। কেউ নিচু গলায় বাজির হিসাব করছে, কেউ আবার এখনো তর্ক করছে আসলে কে আগে ফিনিশিং লাইন পার হয়েছিল।অভী একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে । হাতের কাটা জায়গাগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কাল রাতের দুর্ঘটনার পরও সে কোনো ডাক্তার দেখায়নি। পেটের পাশে ছড়ে যাওয়া অংশে কালচে রক্ত জমে আছে। তবুও তার মুখে সেই একই তেজ। যেন শরীরের ব্যথা তাকে স্পর্শই করতে পারে না।
অন্যদিকে জুলফিকার ঠান্ডা চোখে মনিটরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। যেন ফলাফল যাই হোক, সে আগে থেকেই প্রস্তুত।গরমে চারপাশ হাঁসফাঁস করে উঠতে থাকে । মাথার উপর সূর্য দাঁত কেলিয়ে আগুন ঢালতে থাকে। ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।মনিটরের স্ক্রিন জ্বলে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এক অন্ধকার রুম। পুরো মুখ দেখা যায় না। শুধু ধোঁয়ার আড়াল থেকে ভারী একটা অবয়ব। আর তারপর শোনা যায় সেই কণ্ঠস্বর। অদ্ভুত আধিপত্যে ভরা।খান সাহেব।সকলেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে।খান সাহেব কোনো কথা বলেন না। শুধু ধীরে ধীরে দুই আঙুল তুলে ইশারা করেন।
“দুই।”
এক মুহূর্তের জন্য কেউ বুঝতে পারে না। তারপর পুরো জায়গায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।দু-জনেই জয়ী।অর্থাৎ হাফ গোডাউন সমানভাবে ভাগ হবে কৃষ্ণ দাস আর চন্দ্র দাসের মধ্যে।কৃষ্ণ দাস প্রথমে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে । চন্দ্র দাসের চোখেও জমে ছিল বিরক্তি। কারণ তারা দুজনেই পুরো আধিপত্য চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ কিছু না পাওয়ার চেয়ে অর্ধেক পাওয়াকে ভালো মনে করে।খান সাহেব আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করেন না। স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে যায়।যেন তিনি কখনো এসেছিলেনই না।তারপর ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমে আসে। কেউ হতাশ, কেউ স্বস্তিতে। বাজির টাকা হাতবদল হতে থাকে। বাতাসি বেগম বিরক্ত মুখে পানের পিক ফেলে নিজের লোকজন নিয়ে চলে যায়। আবুল বাশার লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে। তার চোখে তখনও হিসাব।অভী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভিতরে এখনো রাতের অসমাপ্ত রেস ঘুরছে। ট্রাকের নিচ দিয়ে বাইক চালিয়ে যাওয়া, রক্ত, ধোঁয়া, জুলফিকারের সমান হয়ে ওঠা। সব যেন মাথার ভিতরে আটকে আছে।
ঠিক তখনই কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে আসে।লোকটার চোখে আজ অদ্ভুত এক তৃপ্তি। যেন অভীর মধ্যে সে নিজের হারানো যৌবন দেখতে পায়।সে অভীর কাঁধে হাত রাখে।
“চাঁদ… আজ তোরে একটা জায়গা দেখামু বাপ।”
অভী তাকায় তার দিকে।কৃষ্ণ দাস নিচু গলায় বলে,
“আমার সবচেয়ে গোপন জায়গা।”
কথাটা শুনে অভীর চোখে প্রথমবারের মতো সামান্য পরিবর্তন আসে। কারণ এই জায়গার কথা সে শুধু লোক মুখে শুনেছে।কিন্তু বাস্তবে সেখানে যাওয়া কারো সাধ্যি নেই। এর প্রধান কারণ হচ্ছে কলুষিত লোকের পাপাচারের জায়গা। কে কথা বলবে এটা নিয়ে? আর কার এতো সাহস ওখানে কী হয় তার বর্ননা করবে? সেই জায়গাটি পুরান ঢাকার অন্ধকার জগতের এমন এক আস্তানা, যেখানে প্রবেশাধিকার খুব কম মানুষের।হাজী, মানিক, এমপি, আর্মি কর্নেল ওসমানী আর কৃষ্ণ দাস নিজে।মাত্র এই কয়েকজন মানুষ সেখানে যেতে পারে।আর আজ সেই তালিকায় যোগ হচ্ছে অভী চাঁদ।কৃষ্ণ দাসের চোখে তখন এক ধরনের পিতৃত্ব মিশে ছিলো। রক্তের সম্পর্ক না
থাকলেও, এই অন্ধকার দুনিয়ায় সে অভীকেই নিজের উত্তরসূরি বানিয়েছে।কিন্তু কিছুক্ষণ পরই খবর আসে, জরুরি চালানের কাজ পড়েছে। আজ যাওয়া সম্ভব না।কৃষ্ণ দাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“কাল যামু।”
অভী কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়ে।কিন্তু তার মাথায় চলছিলো সেই জায়গার কথা। লোক মুখে শোনা যায়, এই জায়গাটি কোথায় এটা পুলিশ ও খুজে বের করতে পারেনি। আজ অভীর কপাল ভালো।সে সেই জায়গাতে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
অভীর মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা ঘুরছে। ঠিক তখনই নোবেল এসে জানায়, গাড়ি রেডি। অভী সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে আনন্দীর কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে। শহরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন চললেও কোচিং সেন্টারগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অদ্ভুত নিয়ম।যেই স্যার ক্লাসে গরম, সেই স্যারই কোচিংয়ে সবচেয়ে নরম। আর সেই ভিড়ের মাঝেই কোথাও আছে আনন্দী।
কোচিংয়ের ভেতর তখন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতে থাকে আনন্দী। তার স্বপ্ন খুব বড় কিছু না।শুধু একটা ভালো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, একটা ভালো সাবজেক্ট, আর নিজের পরিচয়ে বাঁচা। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই তার পছন্দের শীর্ষে। ছোটোবেলায় কয়েকবার ঘুরতেও গিয়েছিলো সেখানে। তার বাবা-মায়ের পরিচয়, প্রেম, বিয়ে।সবকিছুর শুরু হয়েছিল সেই ক্যাম্পাস থেকেই। তাই আনন্দীও ঠিক করে রেখেছে, মায়ের মতো সেখানেই পড়বে। নিজের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বে।
ক্লাস শেষ হতেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। দূর থেকে তাকিয়েই আনন্দীকে দেখে সিগা’রেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দেয় অভী। ঠিক তখনই যুবক বয়সী এক ছেলে আনন্দীকে ডেকে কিছু একটা বলে হাতে একটা কলম এগিয়ে দেয়। হয়তো কোচিংয়ের কোনো সিনিয়র ভাই। এই কোচিং সেন্টারগুলোরও আজব অবস্থা।স্কুল কলেজের মতো না, যেন ছোটখাটো বিশ্ববিদ্যালয়। কত ব্যাচ, কত সেকশন।
আনন্দী ছেলেটার সাথে হেঁসে হেঁসেই কথা বলতে থাকে। তারপর ছেলেটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা রিকশাও ডেকে দেয় তাকে। দৃশ্যটা দেখেই অভীর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
“ ছোটোবেলা থাইক্কা পাইলা-পুইশা বড়ো করলাম আমি! আর মাঝ খান দিয়া ছক্ক মারবো অন্য কেউ। কাবি নেহিহহহ!”
অভীর কথা শুনে নোবেল, শহিদুল, কবিরা একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। ভাইয়ের মাথায় আবার কী উন্মাদনা চাপলো, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলো সবাই। কিন্তু অভীর চোখ দেখেই তারা বুঝে যায় এখন কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না।অভী ধীরে ধীরে জীপের সামনে এগিয়ে যায়। তারপর এক পা বাম্পারের উপর তুলে লুঙ্গির মুন্ডুটা এক হাতে শক্ত করে টেনে কাছা বাঁধে। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক জেদ। যেন যুদ্ধ করতে যাচ্ছে সে।পরের মুহূর্তেই ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ে সে। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে মিররে একবার নিজের চোখের দিকে তাকায়। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু গলায় বলে ওঠে,
“এবারের সংগ্রাম… বান্দীরে ছিনাইয়া আনার সংগ্রাম।”
অভী গাড়ি স্টার্ট দিয়েই ধীরে ধীরে আনন্দীর রিক্সার পিছু নেয়। দূরত্ব ঠিক রেখে ড্রাইভ করছিলো সে। খুব কাছে না, আবার চোখের আড়ালেও না। তার মাথা গরম ছিল ঠিকই, কিন্তু মাথা খারাপ না। এতো মানুষের সামনে কিছু করলে মাম’লা হবেই। আর রেহমান তো সুযোগের অপেক্ষাতেই বসে আছে।তাই অভী তাড়াহুড়ো করে না। বরং শিকারির মতো ধৈর্য ধরে এগোতে থাকে।
রিক্সাটি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে ধীরে ধীরে নির্জন দিকের গলিতে ঢুকে পড়ে। আশপাশে দোকান কমে আসে। মানুষের শব্দও মিলিয়ে যেতে থাকে। শুধু রিক্সার চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ আর দূরে কুকুরের ডাক।অভীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে।
“এইবার পাইছি…”
পরের মুহূর্তেই সে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দেয়। জীপটা গর্জন তুলে সামনে ছুটে যায়। তারপর এক ঝটকায় রিক্সাকে ওভারটেক করে একদম সামনে আড়াআড়ি করে দাঁড় করিয়ে দেয় গাড়ি।ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যে রিক্সাওয়ালার প্রায় পিলে চমকে ওঠে।
“আল্লাহ!”
চিৎকার করে কোনো রকমে ব্রেক কষে সে। রিক্সা কেঁপে ওঠে। আনন্দী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রায়। হাত দিয়ে শক্ত করে সিট আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলায়। বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে যায় তার।ঠিক তখনই জীপের দরজা খুলে নামে অভী।চোখেমুখে ভয়ংকর রাগ। হাঁটার ভঙ্গিতেও আগ্রাসন।সে সোজা আনন্দীর দিকে তেড়ে আসে। যেন অনেকক্ষণ ধরে জমে থাকা কিছু এবার ছিঁড়ে বের হবে।
অভীকে দেখামাত্র আনন্দীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। পিলে চমকে যাওয়া সেই মুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায় থাপ্পড়ের কথা।সে যে অভীকে চড় মেরেছিল, তার হিসেব কি এখনই চুকাতে এসেছে? ভয়ে তার গলা শুকিয়ে যায় ।অভী কোনো কথা না বলে সোজা তার হাত ধরে টেনে নিচে নামায়।
উন্মাদনা পর্ব ৩৪
“চল, জ্বলদি!”
আনন্দী ছিটকে হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
“কোথাও যাবো না আমি!”
কিন্তু তার প্রতিবাদকে যেন একবারও গুরুত্ব দিলো না অভী। পরম নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে তাকে কোলে তুলে নেয় সে, যেন এই প্রতিরোধ তার কাছে নেহাতই তুচ্ছ।
” পারমিশন চাই নাই বা’ন্দী! যাবি মানে যাবি। তোরে মন খুলে দেখবো কিছুক্ষণ! ”
