উন্মাদনা পর্ব ৪১
কায়নাত খান কবিতা
‘ বিয়ে কীভাবে হয় সেটা তুই ও জেনে নিস জানো’য়ার! তুই না ডাক্তার ছিলি? কেমন ডাক্তার ছিলি তুই?’
‘আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙিস না, শেখের বেটি।’
কথাগুলো দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করেই হাতে ধরা পানির গ্লাসটি মেঝেতে নামিয়ে রাখে অভী। তারপর এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগে সে। তবে সদর দরজার কাছে পৌঁছে হঠাৎ থেমে যায় অভী। কাঁধের ওপর দিয়ে একবার ফিরে তাকায় আনন্দীর দিকে। তার চোখেমুখে তখন কঠোরতার ছাপ স্পষ্ট।
‘বাড়ির বাইরে বের হলে খবর আছে!’
হুঁশিয়ারিটুকু ছুড়ে দিয়ে সজোরে দরজাটি বন্ধ করে বেরিয়ে যায় সে। দরজা বন্ধ হওয়ার বিকট শব্দে যেন পুরো ঘর কেঁপে উঠে। অথচ সেই শব্দের চেয়েও বেশি তোলপাড় চলছিলো আনন্দীর ভেতরে।
মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়তে লাগে চোখের পানিতে। বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায়তা আর কষ্টগুলো যেন একে একে বেরিয়ে আসতে লাগে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে।
একসময় তার মনে হয়, ফুলের পাপড়ির মতো কোমল যে জীবন একদিন রঙিন স্বপ্নে ভরা ছিল, সেই জীবন আজ কীভাবে এমন নির্জন, বিবর্ণ আর যন্ত্রণাময় পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়াল? কোথায় হারিয়ে গেল তার হাসি, তার নিশ্চিন্ত দিনগুলো?
শরীরজুড়ে তখন প্রচণ্ড ক্লান্তি। সকাল থেকে না খাওয়া পেটটাও ক্ষুধায় মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ক্ষুধা মেটানোর শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট ছিলো না তার মধ্যে। চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে থাকে ।অবশেষে ঠান্ডা মেঝেকেই আশ্রয় করে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ে আনন্দী। চোখের কোণে শুকিয়ে না যাওয়া অশ্রুর দাগ নিয়েই ধীরে ধীরে তলিয়ে যায় ঘুমের অতল দেশে। সেখানে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য হলেও বাস্তবের নির্মমতা তাকে খুঁজে পাবে না।
অপর প্রান্তে অভী ছুটে চলে যায় শহরের সেই পুরোনো আড্ডাখানায়, যেখানে রাত নামলেই জড়ো হয় একদল পথহারা মানুষ। কেউ তাসের টেবিলে ভাগ্য পরীক্ষা করে, কেউ বেসুরো গলায় গান ধরে, আবার কেউ নিজের জীবনের দুঃখগাথা বলতে বলতে হঠাৎ অকারণেই হেসে ওঠে। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে শত না-বলা বেদনা।নিজের সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে অভীও গিয়ে বসে সেখানে।
রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে ভিড়। চারপাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, ম*দের গন্ধ আর মাতালদের উচ্চস্বরে হাসাহাসিতে জায়গাটা ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠে। কেউ গলা ছেড়ে গান ধরেছে, কেউ টেবিলে হাত ঠুকে তাল দিচ্ছে। পুরো পরিবেশটাই যেন এক বি*শৃঙ্খল উৎসব।
ঘরের এক কোণের টেবিলে বসে ছিলো অভী। এক হাতে ম*দের বোতল, অন্য হাতে ফোন। স্ক্রিনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন দেখছিলো সে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, অথচ চোখের গভীরে জমে ছিলো অদ্ভুত এক শূন্যতা।
কিছুক্ষণ পর পাশে বসা নোবেল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— “কী হইছে ভাই?”
কোনো উত্তর দেয় না অভী।হঠাৎ করেই সে চেয়ার সরিয়ে টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়ায়। তাকে এভাবে দাঁড়াতে দেখে আশপাশের মাতা’লরাও হইচই শুরু করে দেয়। কেউ হাততালি দিতে থাকে, কেউ শিস বাজাতে থাকে। আদৌ কেন উল্লাস করছে, সেটাও বোধহয় তাদের নিজেদের জানা নেই।অভী ফোনটা সবার সামনে তুলে ধরে। তারপর জড়ানো কণ্ঠে গুনগুন করে উঠে,
“White skin-u girl-a… girl-a… girl heart-u black-u…
Eyes-u eyes-u meet-u meet-u… my future dark-u…
Why this Kolaveri… Kolaveri di?”
গান শেষ হতেই চারপাশে হাসি আর উল্লাসের রোল পড়ে যায় । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কষ্টের গান শুনেও সেখানে উপস্থিত কেউ কষ্ট পেলো না। বরং হইহুল্লোড় যেন আরও বেড়ে গেলো কয়েক গুণ।অভী বোতলটা ঠোঁটে তুলে। কয়েক ফোঁটা বের হওয়ার আশায় উল্টে ধরে সে, কিন্তু বোতল ইতোমধ্যেই খালি। বিরক্ত হয়ে সেটি একপাশে ছুড়ে ফেলে টেবিল থেকে নেমে আসে অভী।পাশের এক মা’তালের হাত থেকে গ্লাসভর্তি মদ নিয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকে তরলটির দিকে। যেন স্বচ্ছ সেই পানীয়ের ভেতর কোনো হারিয়ে যাওয়া উত্তর খুঁজছে।
তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার গেয়ে উঠল,
“Hand-la glass-u… glass-la scotch-u…
Eyes-u full-a tear-u…
Empty life-u… girl you come-u… life reverse gear-u…
Haa love-u… love-u… oh my love-u…
You should me power-u…
I want you here now-u…
God, I’m dying now-u…
She is happy, how-u…?
Why this Kolaveri… Kolaveri di…?”
শেষের লাইনগুলো গাওয়ার সময় তার ঠোঁটে হাসি থাকলেও চোখদুটো ছিলো সম্পূর্ণ নিস্তেজ। চারপাশের হৈচৈ, তালি আর মাতালদের উল্লাসের ভিড়ে কেউ খেয়াল করে না গানটা আসলে মজা করে গাওয়া হলেও, গানের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো একজন মানুষের গভীর একাকীত্ব আর অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস।
সারারাত নেশা আর উচ্ছৃঙ্খল আড্ডায় ডুবে থাকার পর ভোর গড়িয়ে সকাল হয়ে এলে বাড়ির পথ ধরে অভী। এত দীর্ঘ রাত কাটানোর পরও তার মনে একবারের জন্যও ঘরে থাকা নতুন বউটির কথা আসেনি।সকাল প্রায় নয়টার দিকে বাড়িতে ফিরে সে। সিঁড়ি বেয়ে সোজা দোতলায় উঠে যায়। ডাইনিং রুম পেরিয়ে নিজের কক্ষের দিকে যেতেই তার চোখে পড়ে ঘরের দরজা খোলা।মুহূর্তেই কপালে ভাঁজ পড়ে যায় ।
দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে চারদিকে তাকাতেই দেখতে পায়, আনন্দী সেখানে নেই। এক অদ্ভুত অস্বস্তি চেপে বসে তার বুকে। গলা যেন হঠাৎ শুকিয়ে আসে ।ঠিক তখনই বারান্দার দিক থেকে কিছু একটা পড়ার শব্দ ভেসে আসতেই সেদিকে ফিরে তাকায় অভী।অভী আর দেরি করে না। দ্রুত পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখে, তাতে তার দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে ওঠে ।
মেরুন রঙের একটি শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী। সদ্য গোসল করে এসেছে বোধহয়। ভেজা চুল গামছা দিয়ে মুছছে ধীরেসুস্থে। সকালের কোমল আলো এসে পড়েছে তার ওপর।অভী চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। কেউ দেখছে কি না।কাউকে না দেখে বুক ভরে নিঃশ্বাস ফেলে সে।তারপর পেছন থেকে আঁচলের কোণা ধরে বলে,
“শাড়ি কই পাইলি?”
পেছনে না ফিরেই আনন্দী উত্তর দিল,
“আলমারি থেকে।”
অভী ভ্রু উঁচু করে বলে,,
“কীভাবে বুঝলি, ওইটা তোর জন্য আনা হইছিলো? অন্য কারও জন্যও তো হইতে পারত। আমার আরেক বউয়ের জন্য ধর।”
দড়িতে ভেজা গামছাটা মেলতে মেলতে আনন্দী নির্বিকার গলায় বলে,,
“আপনাকে মেয়ে দেবে কে?”
কথাটা শুনে অভীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে ।
“দিতে হয় না, সোনামনি। আমরা কেড়ে নিয়ে আসার লোক।”
আনন্দী কোনো জবাব দেয় না। এমন ভঙ্গিতে ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করে যেন কথাগুলো তার কানে পৌঁছায়ইনি।
অভীও তার পিছু নেয়।ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে,
উন্মাদনা পর্ব ৪০
“রান্না শেষ?”
আনন্দী ঘুরে তাকায়,”আমি রান্না করতে পারি না।”
“খাইতে পারোস?”
“এ্যাঁ?”
“বলতেছি, খাইতে পারোস?”
