Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৪৬

উন্মাদনা পর্ব ৪৬

উন্মাদনা পর্ব ৪৬
কায়নাত খান কবিতা

চোখ বাঁধা অবস্থাতেই অভীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অজানার অতল গহ্বরে। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা, যেন শব্দ পর্যন্ত এখানে প্রবেশের অনুমতি পায় না। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল স্যাঁতসেঁতে কংক্রিটের গন্ধ, আর প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিধ্বনি যেন অসীম অন্ধকারের বুক চিরে ফিরে আসছিলো।হঠাৎ করেই চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয় অভীর।

তীব্র অন্ধকারে কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টিশক্তি যেন বিদ্রোহ করে বসল। অভী একের পর এক পলক ফেলতে থাকে। চোখ ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই তার ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠে। চারদিকে শুধু অন্ধকার গভীর, ভারী, দমবন্ধ করা অন্ধকার। যেন পৃথিবীর সমস্ত আলো গ্রাস করে নিয়েছে এই ভূগর্ভস্থ দানব।
‘এটা কোথায়…?’ প্রশ্নটা মনে জাগলেও ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছাল না।কৃষ্ণ দাস নির্বিকার ভঙ্গিতে অভীর কবজি চেপে ধরে তাকে আরও ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অজানা কোনো সত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।কয়েক কদম এগোতেই দূরে এক ফালি আলো জ্বলে উঠল। তারপর আরেকটি। তারপর আরও কয়েকটি। একে একে আলোর রেখাগুলো দীর্ঘ করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, যেন অন্ধকার নিজেই ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে নিজের গোপন সাম্রাজ্য উন্মোচন করছে।আলোর তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভীর বিস্ময়ও বাড়তে লাগল। সামনে যা অপেক্ষা করছিলো, তা কল্পনারও বহু গুণ ঊর্ধ্বে।
আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তেই অভীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠে।এ যেন কোনো বাঙ্কার নয় মানুষের নির্মমতার জ্যান্ত জাদুঘর।বিশাল এক ভূগর্ভস্থ হলঘর। মাথার ওপর উঁচু কংক্রিটের ছাদ, চারদিকে স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। মৃদু আলোয় সবকিছুই যেন আরও বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। হলঘরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে অল্পবয়সী কিশোররা। কারও বয়স দশ, কারও বারো, আবার কেউ হয়তো সবে ষোলো ছুঁয়েছে।

কিন্তু তাদের শরীরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, জীবন তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর এক খেলা খেলেছে।কারও একটি চোখ চিরতরে হারিয়ে গেছে। ফাঁকা চোখের কোটর যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে অমানবিক নির্যাতনের। কারও ডান হাত অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে আছে, যেন ভুলভাবে জোড়া লেগেছে ভাঙা হাড়। কারও একটি পা হাঁটুর নিচ থেকে বিকল, তবুও সে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। কারও শরীরজুড়ে পুরোনো ক্ষতের কালচে দাগ, আর কারও চোখে এমন এক শূন্যতা, যেন বহু আগেই তার ভেতরের মানুষটা মারা গেছে। কেউ কথা বলে না।শুধু অপলক তাকিয়ে থাকে।সেই দৃষ্টিতে নেই কোনো প্রশ্ন, নেই কোনো অভিযোগ, নেই বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও। যেন তারা মানুষ নয়!নিঃশব্দে শ্বাস নেওয়া কয়েকটি জীবন্ত ছায়া।
অভীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।চোখ সরাতে চাইলেও পারল না। প্রতিটি মুখ যেন তার বুকের ভেতর পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।ঠিক তখনই কৃষ্ণ দাস ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি টেনে কিছু বলতে উদ্যত হলেন।কিন্তু তার আগেই
অন্ধকারের গভীর থেকে ভেসে এলো এক অসহ্য আর্তনাদ।
একটি কিশোর কণ্ঠ।

যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সেই চিৎকার মুহূর্তেই বাঙ্কারের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। শব্দটা এতটাই করুণ যে অভীর বুকের ভেতর কেঁপে উঠে।সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। দ্রুত শব্দের উৎসের দিকে পা বাড়াতেই কৃষ্ণ দাস তার কবজি শক্ত করে ধরে ফেললেন।
‘ওদিকে যাওনের দরকার নাই, বাজান। ট্রেনিং চলতাছে।’
অভী বিস্ময়ে তাকায়।
‘ট্রেনিং?’
‘হ।’
‘কীসের ট্রেনিং?’
কৃষ্ণ দাস এবার ধীরে ধীরে অভীর চোখের দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণের হাসিটা অদ্ভুতভাবে গাঢ় হয়ে উঠল।
‘যুদ্ধের।’
একটি মাত্র শব্দ।কিন্তু শব্দটি যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আছড়ে পড়ল অভীর কানে।
‘মানে?’

কৃষ্ণ দাস কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আলতো করে অভীর কাঁধে হাত রাখলেন।
‘তুমি এই সিন্ডিকেটের জন্য অনেক কিছু করছো, বাজান। তাই কিছু সত্য জানার অধিকার তোমার আছে।’
অভী নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল।
‘কী সত্য?’
কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে একটি লোহার চেয়ারে বসলেন। তারপর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কিশোরগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
‘তোমার কী মনে হয়, এই পোলাপানগুলার শেষ ঠিকানা কোথায়?’
অভী চারদিকে একবার তাকিয়ে বলল,
‘জানি না…’
কৃষ্ণ দাস মৃদু হেসে বললেন,
‘আ’ই*এস… কিংবা পৃথিবীর এমন আরও অনেক উগ্রপন্থী সংগঠন। এদের জন্যই তৈরি করা হচ্ছে ওদের।’
কথাটা শুনে অভীর শরীর যেন মুহূর্তেই অবশ হয়ে গেল।
চোখ দুটো বিস্ফারিত।
‘আ’ই এ*স?’
কৃষ্ণ দাস এবার গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।

‘দুনিয়া বড় নিষ্ঠুর, বাজান। এখানে যুদ্ধ শুধু ব:ন্দুক দিয়ে হয় না।মানুষ দিয়েও হয়। আর সবচেয়ে সস্তা অস্ত্র হলো অনাথ, অসহায় আর হারিয়ে যাওয়া শিশুরা। তাদের ভাঙা শরীর জোড়া লাগে, কিন্তু ভাঙা শৈশব আর কোনোদিন জোড়া লাগে না। তারপর একদিন কারও হাতে বন্দু:ক ধরিয়ে দেওয়া হয়, কারও হাতে বিস্ফোরক। আর পৃথিবী তাদের নাম দেয় সন্ত্রা’সী।’
কৃষ্ণ দাস থামলেন।চারদিকে আবার নেমে এলো সেই অস্বস্তিকর নীরবতা।দূরে কোথাও আবার একটি শিশুর চাপা আর্তনাদ ভেসে এলো।অভীর মনে হলো, এই বাঙ্কারের দেয়ালগুলো ইট-পাথরের নয় শত শত হারিয়ে যাওয়া শৈশবের চাপা কান্না দিয়ে গড়ে তোলা।কৃষ্ণ দাস কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে অভীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
‘তোমার কী মনে হয়, বাজান? এই ছোট্ট সিন্ডিকে:টটার ওপর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এত নজর কেন?’
অভী কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির চোখে কৃষ্ণ দাসের দিকে তাকিয়ে রইল।কৃষ্ণ দাস কপালে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আর*ডিএ*ক্সের জন্য।’
অভীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘মানে?’
কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
‘ ১৯৭২ সালের কথা! মুক্তিযুদ্ধের পরের সময়। চারদিকে অস্থিরতা, অভাব আর বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ আসত, সাহায্য আসত। সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগেই একটি চালান হারিয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখলে সেটি ছিল সাধারণ মালবাহী কার্গো। কিন্তু ভেতরে ছিল বিপুল পরিমাণ আ*রডি*এক্স। এমন পরিমাণ, যা ভুল মানুষের হাতে পড়লে একটি দেশের মানচিত্র পর্যন্ত বদলে দিতে পারে।’
তিনি একটু থামলেন।তারপর নিচু স্বরে বললেন,
‘চালানটা কোথায় লুকানো হয়েছিল, কেউ জানত না। বছরের পর বছর কেটে গেছে। অসংখ্য গোয়েন্দা সংস্থা, ভাড়াটে বাহিনী, অ’স্ত্র ব্যব’সায়ী,।সবার একটাই লক্ষ্য ছিল সেই ভাণ্ডারের সন্ধান। কিন্তু কেউ সফল হয়নি।’

‘কেউ জানতো না ?’
কৃষ্ণ দাস মাথা নাড়লেন।
‘একজন জানতেন।’
‘কে?’
‘উসমান সাহেব।’
নামটা উচ্চারণ করতেই কণ্ঠে অদ্ভুত এক ভার নেমে এলো।
উসমান সাহেবের মৃত্যু নিয়ে আজ ও পুরান ঢাকায় নানা গল্পকথা শোনা যায়। তবে তার মৃত্যুর আসল কারো কেউ জানে না। কেউ বলতো হিন্দু মুসলিম দা*ঙ্গার ফলে সে মরে’ছে। কেউ বলতো নিজ শ’ত্রু দাড়া। তবে কেউ জানতো না তার আসল মৃ’ত্যুর কারণ। কৃষ্ণ দাস একটু থমে তারপর বলেন,
“যতদিন উসমান সাহেব ছিলো, তিনি বৈদেশিক কাউকে এই সিন্ডিকেটে ঢুকতে দেননি। আর না নিজে কখনো আর ডি এ’ক্সের কথা কাউকে বলেছেন। কিন্তু সব সময় প্রশ্ন ছিলো তিনি কীভাবে জানতেন? তখন জানা যায় তাজ উদ্দিন সরকারের কথা!, আশির দশ’কের ত্রা:স নব্বই দশকের সাবেক প্রধান মন্ত্রী সব জানতো। তার স্ত্রীকে হ’ত্যা করা হয়। তবু ও তিনি দেশের সাথে গাদ্দারি করেন না। কিন্তু একদিন নিজেই শহীদ হন। তারপর আসলো তার একমাত্র ছেলে তানভীর সরকার। সরকার ভাই নামে এখনো আন্ডারও’য়ার্ল্ড কাপে।”

কৃষ্ণ দাস নিজের হাতের দিকে তাকালেন।ভয়ে লোম কোষ গুলো খাড়া হয়ে গেছে। কারণ তানভীর সরকার কেমন লোক।ঠিক কতটা ভয়াংকর সেটা তিনি ভালো মতোই জানেন। এখন কেন এতোটা শান্ত সেটা ও তিনি ভালো মতোই জানেন। হাতে আলতো করে আরেক হাত দিয়ে ছুঁইয়ে একটি বড় নিঃশ্বাস ফেলে কৃষ্ণ দাস।
” তাজ সরকার সব সময় নিজের ছেলের থেকে দূরে থাকতেন। কেন থাকতেন সেটা তার মৃত্যুর পর তানভীর সরকার জানতে পারে। তার মা-বাবা, চাচা কেন মা-রা গেছিলো পুরাটাই তানভীর সরকার জেনে যায়। কিন্তু তানভীর সরকার হয়ে যায় একা তখন উসমান সাহেব তাকে সার্পোট দেয়। উসমান সাহেব এবং তানভীর সরকার ছিলো দোস্ত মানুষ। কিন্তু উসমান সাহেব ম’রার পর তানভীর সরকার আবার ও এক হয়ে যায় । একা মানুষ আর কী করতো? কিন্তু সে এবং উসমান সাহেব ছাড়া আর কেউ জানে না এই আর:ডিএ:ক্স গুলো কোথায় লুকানো। কিন্তু তানভীর সরকার কখনো মুখ খুলবে না। ভয় তো সবার আছে! ‘
গত বিশ বছর ধরে তানভীর সরকার এদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাহলে তার ভয়ের কারণটি কী? ইতিহাস ঘাটলে এখনো সরকার ভাইয়ের ত্রা’শের কথা তার কর্মকান্ডের কথা জানা যায়। তাহলে তার ভয়টি আসলে কোথায়? অভী কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

‘তানভীর সরকার তো দেশের প্রধানমন্ত্রী। তার আবার কিসের ভয়?’
কৃষ্ণ দাসের ঠোঁটের কোণে ধীর এক হাসি ফুটে উঠল। তারপর অভীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তামিম সরকারের।’
নামটি উচ্চারিত হতেই চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।অভী আর কোনো প্রশ্ন করল না।কারণ, তামিম সরকার শুধু একটি নাম নয়। সে এক জীবন্ত আতঙ্ক। আন্ডার:ওয়ার্ল্ডে তাকে ঘিরে যত গল্প প্রচলিত, তার বেশির ভাগই রক্তে লেখা। অনেকে বলে, তার বয়সের চেয়েও তার নামে জড়িয়ে থাকা খুনের সংখ্যা বেশি। সেই নাম উচ্চারণ করতেও মানুষ দু’বার ভাবে। তার ওপর সে প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র ছেলে।ক্ষমতা আর ভয়ের এমন সংমিশ্রণ খুব কমই দেখা যায়।কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে অভীর দিকে তাকালেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন,

‘তামিম সরকার হইলো তানভীর সরকারের জান। ছেলে জন্ম নেওয়ার পর থেকে তানভীর সরকার হয়ে যায় ভীতু।২০১৪ সালে তামিম সরকারকে জেলে নেওয়া হয়েছিলো। ওইটার আসল ক নিউজ কেনো মিডিয়াতে নেই। ২০১৪ সালে তানভীর সরকারের গাড়িতে হামলা, তামিম সরকারকে জেলে নিয়ে অত্যা’চার করা। সবটাই এই সিন্ডিকেটের জন্য। তানভীর সরকার চুপসে যায় শুধু মাত্র ছেলের জন্য। ছেলে বলতে তানভীর সরকার পাগল। সেই ছেলেকে করা হয়েছিলো অত্যা’চার। বুঝতে পারছো তো বিষয়টা।
অভী আর কোনো কথা বললো না। কারণ তামিম সরকার কেমন এটা মোটামুটি আট-আশি সকলের জানা।তবে প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে মুখ কে খুলবে?কৃষ্ণ দাস অভীকে কাছে ডাকেন। তারপর তার হাতে চুমু দিয়ে বলে,

‘তোমার আর তামিম সরকারের মধ্যে একটা মিল আছে বাজান। দু-জনেই বাপ ভক্ত। এই যে তুমি আমার ভক্ত। আর তামিম সরকার তানভীর সরকারের। তানভীর সরকার যখন শান্ত হয়ে যায়, ঠিক তখনই তামিম সরকার হয়ে যায় বাঘ।বাপের জন্য তার পাগলামি ইতিহাস হয়ে রয়েছে। এই ছেলের জন্যই তিনি চুপ। বহুবার তাকে অফার করা হয়, এটার সন্ধান দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি মুখে তালা মেরে রেখেছেন।’
অভী কৃষ্ণ দাসের থেকে নিজের হাত সরিয়ে বলেন,
‘ পুরা বাংলাদেশের মানুষ জানে তামিম সরকার কেমন! আমার নিজেরই গায়ের পশম দাঁড়াই গেছে । তাইলে তার বাবাকে সে প্রটেকশন দিতে পারবে না?’
‘ এই জন্য তো তানভীর সরকার চুপ।সে মুখলে তামিম সরকার মর’বে। তাই সিন্ডিকেট এখন আমাগো দখলে। কিন্তু আফসোস হইলো আর ডি এক্স কোথায় এটাই আমরা জানতে পারলাম না।’
তানভীর সরকার আর তামিম সরকার, ক্ষমতা আর উত্তরাধিকারের এমন এক জুটি, যাদের গল্প রাজনীতির করিডোর পেরিয়ে আন্ডার’ওয়ার্ল্ডের অন্ধকার গলিতেও সমানভাবে উচ্চারিত হয়। একজনের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, অন্যজনের নামে ছড়িয়ে আছে ভয়ের সাম্রাজ্য। দু’জনকে আলাদা করে ভাবা যায় না। একজনের ছায়া যেখানে শেষ হয়, অন্যজনের উপস্থিতি সেখান থেকেই শুরু হয়।
অভীর দৃষ্টি আবারও ছড়িয়ে থাকা কিশোরগুলোর ওপর গিয়ে থামল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল

‘এই বাচ্চাগুলোর কী করবেন?’
কৃষ্ণ দাসের কণ্ঠে কোনো আবেগের ছাপ ছিল না।
‘ওদের চালান আছে। আগামী ঊনত্রিশে ডিসেম্বর। আর পাঁচ মাস পরই সবাইকে পাঠাইয়া দেওয়া হইবো।’
অভী ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
‘এখানে… মোট কতজন আছে?’
কৃষ্ণ দাস নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন,
‘একাত্তর জন। একজন বাদ আছে, তারে ও আনা হইবো। সময় হইলেই সবাই চালান হইয়া যাইবো।’
একাত্তর!সংখ্যাটা অভীর কানে এসে যেন ধাতব শব্দের মতো আঘাত করল।সে আর কিছু বলল না। নিঃশব্দে একে একে প্রতিটি মুখের দিকে তাকাতে লাগল।কোথাও শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, কোথাও চাবুকের পুরোনো ক্ষত, কোথাও ভাঙা হাড়ের বিকৃত আকৃতি। অথচ তাদের চোখে কোনো কান্না নেই। যেন দীর্ঘদিনের নির্যাতন তাদের অশ্রু কেড়ে নিয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট মুখগুলোতে শৈশবের কোনো রং অবশিষ্ট নেই। সেখানে কেবল জমাট বেঁধে আছে ভয়, যন্ত্রণা আর নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ।
মুহূর্তের জন্য অভীর মনে হলো, এরা শিশু নয় অসমাপ্ত কয়েকটি জীবন। সময়ের আগেই যাদের শৈশব কবর দেওয়া হয়েছে এই অন্ধকার বাঙ্কারের দেয়ালের ভেতর।

‘আমার কী কাম এখানে?’
অভীর কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, সঙ্গে একরাশ অস্বস্তি। কথাটি শেষ হতেই কৃষ্ণ দাস এগিয়ে এসে তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। কণ্ঠে স্নেহের আবরণ থাকলেও ভেতরে ছিল অদৃশ্য এক নির্দেশের কঠোরতা।
‘বাজান, এই সিন্ডিকেটে তুমি অনেক টাকা আইনা দিছো। তোমার একটা চালানও কেউ কোনোদিন আটকাইতে পারে নাই। এই চালানটাও তোমার হাত দিয়াই যাইতে হইবো।’
অভী নির্বাক দৃষ্টিতে কৃষ্ণ দাসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কথাগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছে, অথচ মন সেগুলো মানতে পারছে না। এ কেমন দাবি? এ কেমন ঋণ শোধের হিসাব?ধীরে ধীরে সে বলল,
‘আপনে তো জানেন, আমি কখনো মানুষ খুন করি নাই। ইচ্ছা কইরা কারও গায়ে হাত তুলি নাই। সেখানে এই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলারে…’
শেষের শব্দগুলো আর মুখ দিয়ে বেরোল না। গলায় এসে আটকে গেল।কৃষ্ণ দাস মৃদু হেসে অভীর কাঁধে হাত রাখলেন।

‘তুমি আমার বাজান। বাপের কথা শুনবা না? যখন পুরো দুনিয়া তোমার বিপক্ষে আছিল, তখন কে তোমার পাশে দাঁড়াইছিল? আমি। তোমারে আশ্রয় দিছি, পরিচয় দিছি, বাঁচার রাস্তা দিছি। এহন আমার সময় আইছে। তুমি আমার পাশে থাকবা না, বাজান?’
কথাগুলো অভীর বুকের ভেতর পাথরের মতো আছড়ে পড়ল।তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ ফুটে উঠল। জীবনে সে বহু অপরাধীর সঙ্গে পথ চলেছে, কিন্তু নিজের হাতে কখনো কারও প্রাণ নেয়নি। কাউকে অকারণে অপমান করেনি, কোনো নারীর সম্মানহানি করেনি। নিজের ভেতরের মানুষটুকু এতদিন অন্তত বাঁচিয়ে রেখেছিল।কিন্তু আজ?আজ সেই মানুষটার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষা।
একদিকে কৃষ্ণ দাস, যে মানুষটি সবাই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, নতুন পরিচয় দিয়েছিল, বেঁচে থাকার কারণ হয়েছিল। অন্যদিকে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুগুলো, যাদের চোখে এখনও পৃথিবীকে বিশ্বাস করার সরলতা রয়ে গেছে।ঋণ শোধ করবে, নাকি বিবেককে বাঁচাবে?এই এক প্রশ্নই মুহূর্তের মধ্যে অভীর সমগ্র অস্তিত্বকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে লাগল।কিছুক্ষণ নীরব থেকে অভী ধীরস্বরে বলল,
‘ঠিক আছে… আমি যাব।’

কথাটি শোনামাত্র কৃষ্ণ দাসের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্নেহভরে অভীর কপালে একটি চুমু এঁকে দিলেন। সেই স্পর্শে ছিল পিতৃসুলভ মমতা, অথচ তার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর দায়িত্বের ভার।
পরক্ষণেই একটি কালো কাপড় দিয়ে অভীর চোখ শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো। চারদিকের আলো মুহূর্তেই অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল। কৃষ্ণ দাস তাকে সঙ্গে নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে পড়লেন অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে।
বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই অভীর কানে ভেসে এলো আজান। শব্দটি যেন মাটি ভেদ করে উঠে আসছিল। স্বচ্ছ, গভীর, হৃদয়স্পর্শী। সে মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু তার ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই দূর কোথাও থেকে ভেসে এলো মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। একের পর এক ধ্বনি নিস্তব্ধ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।অভীর ভ্রু কুঁচকে উঠল।এ কেমন জায়গা?একদিকে আজান, অন্যদিকে মন্দিরের ঘণ্টা। দুটি ভিন্ন ধর্মে:র ধ্বনি যেন একই আকাশের নিচে মিলেমিশে এক অদ্ভুত রহস্যের জন্ম দিচ্ছে।
চোখ বাঁধা থাকায় সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। শুধু শব্দগুলো আঁকড়ে ধরে বোঝার চেষ্টা করছিল সে ঠিক কোথায় আছে? কোন অচেনা ভূখণ্ডে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তর আরও অধরাই হয়ে উঠছিল।

বেশ কিছুক্ষণ পর অভীকে নিয়ে ভূগর্ভস্থ সেই বাঙ্কার থেকে বাইরে আনা হলো। চোখের বাঁধন খুলতেই অস্তগামী সূর্যের শেষ আলো তার চোখে এসে লাগল। বিকেল তখন প্রায় সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়েছে। চারদিক ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, যেন পৃথিবীও দিনের সমস্ত ক্লান্তি গুটিয়ে নিচ্ছে।
কৃষ্ণ দাস নিজেই তাকে তার আস্তানার কাছে নামিয়ে দিলেন। গাড়ি চলে যেতেই অভী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গ্যারেজে নয়, বাসাতেও নয় নীরবে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল বুড়িগঙ্গার তীরে।
একটি ছোট্ট নৌকা ভাড়া করে সে নদীর একেবারে মাঝ বরাবর গিয়ে দাঁড় টানা থামিয়ে দিল। চারদিকে শুধু কালচে জল, নিস্তব্ধতা আর দূরের শহরের ম্লান আলো। নদী যেন তার সমস্ত গোপন কান্না নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছে।

অভী ধীরে ধীরে নিজের দুই হাতের দিকে তাকাল।
ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটি আলতো করে খুলে ফেলল। ওটা আসলে আঙুল ছিলো না। ছিলো নিখুঁতভাবে তৈরি একটি কৃত্রিম আঙুল। সেটি খুলে ফেলতেই তার বাম হাতে চারটি আঙুলের নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ সে হাতটা আকাশের দিকে তুলে নির্বাক তাকিয়ে রইল। যেন নিজের শরীরের ক্ষত নয়, নিজের ভাগ্যটাই দেখছে।এরপর ধীরে ধীরে মুন্ডুর কাপড় একটু সরালো।
পায়ের একাংশ দগ্ধ চামড়ার বিকৃত দাগে ভরা। আগুনের নিষ্ঠুর স্মৃতি এখনও সেখানে জীবন্ত। সেই পোড়া জায়গায় কাপড় বেশিক্ষণ সহ্য হতো না। তাই ইচ্ছে না থাকলেও তাকে বারবার কাপড় সরিয়ে স্বস্তি নিতে হতো। সে চাইলে ও প্যান্ট পড়ে থাকতো পারতো না। মেডিকেল চলাকালীন সময়ে ও অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে তাকে।

নদীর হাওয়া তার ক্ষত ছুঁয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই শীতল স্পর্শও বছরের পর বছর জমে থাকা দহনকে এক মুহূর্তের জন্যও প্রশমিত করতে পারল না।অভী ধীরে মাথা তুলে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একরাশ তিক্ত হাসি।তারপর সমস্ত ঘৃণা, অপমান আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এক নিঃশ্বাসে উগরে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
” যখন দুনিয়া আমার বিপক্ষে ছিলো, আপনি ছিলেন পক্ষে। আপনার কথায় শেষ কথা দাদা সাহেব। অভী আপনের লাইগ্গা মানুষ ও খু*ন করবো! ”
একদিকে অভী যখন কৃষ্ণ দাসের জন্য নিজের চিরচেনা ধারা পাল্টাতে প্রস্তুত! অপরদিকে রেহমান দেশের জন্য নিজের জান ও দিতে প্রস্তুত।

‘টেরো*রিস্ট কোনো জাত ধ*র্ম বর্নের হয় না স্যার! এরা দেশের শ’ত্রু!’
রেহমানের কণ্ঠে ছিলো অটল দৃঢ়তা। কথাগুলো উচ্চারণ করার সময় তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না।বরং জ্বলছিল দায়িত্ববোধের তীব্র আগুন।রেহমানের কথা শুনে কর্নেল ওসমানী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন,
‘আমি কে জানো তো রেহমান?’
‘জ্বি!’
‘একজন কর্নেল হয়ে তোমার মতো অফিসারের সাথে বৈঠকে এসেছি, কত খারাপ দিন আমার এলো ভাবো একবার!’
কথাগুলো শুনেও রেহমানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠল না। সে চোয়াল শক্ত করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। কর্নেল ওসমানীর ক্ষমতার কাছে একজন সাধারণ অফিসারের অবস্থান কতটা ক্ষুদ্র, তা সে ভালো করেই জানে। কিন্তু বুকভরা সাহস আর দেশপ্রেম কোনো পদমর্যাদা কিংবা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে শেখেনি।
কর্নেল ওসমানী এবার এসপি আমজাদের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।
”উপর মহল থেকে চাপ নেওয়া যাচ্ছে না এসপি। তুমি বন্ধু মানুষ তাই সাবধান করছি। তোমার অফিসারকে বোঝাও।”

এসপি আমজাদ হোসেন গম্ভীর মুখে রেহমানকে কক্ষ ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন।রেহমান কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে স্যালুট ঠুকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজের অফিসে চলে এল।দরজাটা বন্ধ করতেই তার ভেতরে এতক্ষণ জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো। সমস্ত শক্তি দিয়ে কাঠের টেবিলের ওপর একটি ঘুষি বসিয়ে দিল সে। প্রচণ্ড শব্দে টেবিল কেঁপে উঠল, সঙ্গে কেঁপে উঠল তার বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায় ক্রোধও।
রোমিও তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে রেহমানের হাত চেপে ধরল। কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।রেহমান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমাদের দেশ কেন উন্নত নয় জানো রোমিও?’
রোমিও কিছু বলল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে রেহমানের দিকে তাকিয়ে রইল। রাগে আর হতাশায় রেহমানের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে।

‘কারণ উপরে মহলে এক একটা শুয়ে** বাচ্চা বসে রয়েছে। এদের নিজেদের মা-বোন যতক্ষণ সুরক্ষিত, দেশ ততক্ষণ সুরক্ষিত। অন্যের মা-বাবা গোল্লা যাক। কিছু যায় আসে না এই জানো*য়ার গুলোর। প্রেস ব্রিফিং করে শুধু দেখানো জন্য। এরা আছে। কিন্তু না! এরা নেই। এরা ছিলো না।দেশকে এরা ভালোবাসে না!’
রোমিও শান্ত কণ্ঠে বলল,
‘স্যার একটু শান্ত হন!’

উন্মাদনা পর্ব ৪৫

রেহমান তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল।
‘কীভাবে রোমিও? প্রতি পাঁচ বছর পর পর ৭২ টি করে বাচ্চা হারাচ্ছে। ১৬-২০ বছর বয়সী মেয়ে গুলো কিডন্যাপ করা হচ্ছে। দেশে এতো ড্রাগ সাপ্লাই হচ্ছে। ধুন, গুম, ধর্ষণ বেড়ে গেছে। পাচ বছরের বাচ্চা মেয়েটি ও নিরাপদ নয়। আর এই কুকুর গুলো বলছে দেশ ঠিক আছে। ঠিক আছে মাই ফুট।

উন্মাদনা পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here