উপসংহারে তুমি পর্ব ১৩
রুহানিয়া ইমরোজ
সময় প্রবাহমান। মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নেওয়ার মাঝেই কেটে গেছে বহুদিন। এরমধ্যে অনেকগুলো পাবলিক পরীক্ষা হয়ে গেছে। দুঃখজনক বিষয় হল কোথাও চান্স পায়নি চিত্রা। পাবে কিভাবে? মানুষ দিনরাত এক করে পড়ে সেখানে ওর দিন-রাত কাটে রান্নাঘরে এবং সংসারের কাজে। নাওয়াফের কখনো কিছু বলেনি কিন্তু শাশুড়ির বিষদৃষ্টি আর খোঁটার হাত থেকে বাঁচতে চিত্রা নিজেই সংসারী হয়ে ওঠার সিধান্ত নেয়।
দিনশেষে সংসার তো হলো কিন্তু স্বপ্ন হাতছাড়া হয়ে গেল। এটার জন্য কাউকে দোষারোপ করে না চিত্রা৷ দোষ তার নিজেরই। মানসিক শান্তিটাকে প্রায়োরিটি দিয়েছিল ও। সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়তে বসতে মন চাইত না। যা-ও বা একটু বসতো, নাওয়াফ বাসায় ফিরলে ওর ঘুমকাতুরে চোখদুটো আর কোনো বাঁধা মানতো না। নাওয়াফের বাহু ঘেঁষে শোয়ার লোভে পড়াশুনাকে চাঙ্গে উঠিয়েছিল চিত্রা। ব্যস্, রেজাল্টও তাকে গাঙ্গে ভাসিয়ে চলে গেছে।
এখন আর কোনোকিছুতে সহজে কান্না পায় না চিত্রার। সময়ের তালে মনটা শক্ত হয়েছে কিঞ্চিৎ। চেষ্টা করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে সবকিছু সমাধান করতে। বাসা বয়ে কেউ কিছু বলতে আসলেও সেসব গায়ে মাখে না। নাওয়াফের বলা কথাগুলো স্মরণ করে কেবল। বলা বাহুল্য, নাওয়াফের সাথে থেকে থেকে কিছুটা সাহসী হয়ে উঠেছে চিত্রা।
কেউ লিমিট ক্রস করলে নরম সুরে চরম মাত্রায় প্রতিবাদ করে। এই তো সেদিনকারই ঘটনা। উপর তলার ভাড়াটিয়া এসেছিলেন তার মেয়েকে নিয়ে। আগে আসলেও পরিচয় হয়নি। এই প্রথম তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় হলো। চিত্রা জানতে পারল, প্রায় নয় বছর ধরে আছেন উনারা। চিত্রার শাশুড়ি বেশ আমুদে গলায় কথা বলছিলেন উনাদের সাথে। শুনে বোঝা যাচ্ছিল, বেশ ভালোই সম্পর্ক আছে তাদের মাঝে। প্রৌঢ়া মহিলাকে একটু-আধটু ভালো লাগলেও তার মেয়েকে একদমই পছন্দ হয়নি।
মেয়েটা অদ্ভুত এক আক্রোশ নিয়ে তাকাচ্ছিল তার দিকে। চিত্রা প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি।পরে জানতে পারল, চৈত্রিকা মারা যাওয়ার পর নাওয়াফকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল এই মেয়ে। বাড়ির সবাই রাজিও হয়ে গিয়েছিল কিন্তু নাওয়াফ নাকচ করে দেয়। তবুও মেয়েটা বিয়ে করেনি। ভেবেছিল নাফিম এর ক্লোজ এসে নাওয়াফকে রাজি করাবে কিন্তু সে পথও বন্ধ করে দেয় নাওয়াফ।
শেষ পর্যায়ে অপেক্ষা কে বেছে নেয় কিন্তু এখানেও আশাভঙ্গ হয় তার৷ সুতরাং, চিত্রার উপর ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়। চিত্রা অবশ্য পাত্তা দেয় না এসব কারণ দুদিন পরই মেয়েটার বিয়ে। তবে ওই মেয়ে তো চুপ থাকার পাত্র না। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে রান্নাঘরে এসে চিত্রাকে বলে,
–” ভালোবাসা পেতে ভাগ্য লাগে বুঝছ। মানুষটাকে পেয়ে যাওয়ায় সবকিছু নয়।
চিত্রার হাত থেমে যায়। খানিকটা অবিশ্বাস্য নজরেই তাকায় মেয়েটার দিকে। এমন ভদ্র ঘরের মেয়ের এহেন নোং রা আচরণ দেখে কিছুটা বিস্মিতই হয় পরক্ষণে নিজেকে সামলে নরম গলায় বলে,
–” আমি যা পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট। অনেকের ভাগ্যে এইটুকুও জুটে না, শত তপস্যা করার পরেও৷ তাই এসব নিয়ে ভাবি না আপু।
মেয়েটা হতবাক হয়ে চেয়ে রয়৷ মেয়েটাকে মাটির পুতুল ভেবেছিল। তার ধারণা এভাবে ভুল প্রমাণিত হবে ভাবেনি উপরন্তু চিত্রার দেওয়া খোঁচাটা জায়গা মতো গিয়ে আঘাত হানে। মেয়েটা আর কিছু বলতে পারে না অবশ্য চিত্রাই তাকে সে সুযোগ দেয়নি। পাশ কাটিয়ে গিয়ে নাওয়াফের বেডরুমে ঢুকে শব্দ করে দরজা আঁটকে দেয়। কাজকর্মে বোঝাতে চায়, ওই এক ভালোবাসা বাদে দুনিয়ার সমস্ত কিছু আছে তার আর এতেই সে খুশি। মেয়েটার মন ভাঙে;কান্না পায় কিন্তু এসব অর্থহীন কারণ মানুষটা অন্যকারো।
চিত্রা ইনসিকিউরড ফিল করে না কারণ নাওয়াফ ভিন্ন। নিজের বিয়ে করা স্ত্রীর সাথে সংযতচিত্তে থাকা মানুষকে সন্দেহ করা মহাপাপ নয় কি? ইদানীং তো আরও বদলেছে নাওয়াফ। কোথাও চান্স না পেয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল চিত্রার। বাইরে প্রকাশ না করলে-ও ভেতরে ভেতরে বেশ ভেঙে পড়েছিল।
সবকিছু নিয়মমাফিক চললেও মনের উচাটন কমছিল না কিছুতেই। তার তো কেউই নেই বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো তাই বাধ্য হয়ে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে চিত্রা। কবে যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। এরমধ্যে নাওয়াফ বাসায় ফেরে।
এমনিতে প্রতিদিন চিত্রাই দরজা খুলে। দু’বার নক করেও চিত্রার খোঁজ না পেয়ে নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে ঘরে ঢোকে। ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল অথচ অন্যান্য দিন টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে রয় চিত্রা। আজকে খাবার সাজানো থাকলেও স্বয়ং সেই অনুপস্থিত। খটকা লাগে নাওয়াফের। অযথা ডাক না দিয়ে সরাসরি রুমে যায়। দেখে, মেয়েটা কম্বল মুড়ি দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নাওয়াপ সাতপাঁচ ভেবে আর ডাক দেয় না। ফ্রেশ হয়ে এসে চিত্রার মুখের চাদরটা সরিয়ে দেখে, কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েছে তার বউ। মুখখানা শুকিয়ে আছে। শরীরে অল্পবিস্তর তাপ বিদ্যমান। কান্নার কারণ অজানা নয় নাওয়াফের কিন্তু কিছু বিষয় চাইলেও ঠিক করা যায় না।
লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমস্ত খাবার ফ্রিজে তুলে রাখে। পেটে ক্ষুধা থাকলেও খাওয়ার রুচি চলে গেছে। রান্নাঘরে গিয়ে জুস বানিয়ে এনে বেহুঁশ চিত্রাকে কোনোমতে একটু খাইয়ে বাকিটুকু নিজে খায় অতঃপর চিত্রাকে বুকে টেনে নেয়। চিত্রা জেগে থাকলে অবশ্য ধরার দরকার পড়তো না। সে নিজেই নাওয়াফের বাহু ঘেঁষে ঘুমায়। কথাটা মনে হতেই মৃদু হাসে নাওয়াফ।
চিত্রার হুঁশ ফেরে সকালে। চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করে নাওয়াফের বাহুডোরে। আনমনে তার চুলে আঙ্গুল বুলাচ্ছিল নাওয়াফ। চিত্রা ঘুম থেকে উঠে বিশ্বাসই করতে পারে না প্রথমে। এই লোক সহজে তার কাছে আসে না। হুঁশে থাকলে তো জীবনেও না। আজ কি হলো?
মনে হাজারটা প্রশ্ন আসলেও চিত্রা মুখ খুলল না। মুহুর্তটুকু উপভোগ করার লোভে চুপটি করে পড়ে রইল। নাওয়াফ অবশ্য টের পায় তার নড়াচড়া কিন্তু তৎক্ষণাৎ কিছু বলে না। সময় নিয়ে শুধায়,
–” মানসিক চাপ তোমার ঘোর শত্রু তাই না?
চিত্রা চমকে যায়। প্রথমে বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে। পরক্ষণে নিজেকে শান্ত করে বলে,
–” ওই আরকি। নিতে পারি না..
নাওয়াফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–” এজন্যই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে গতকাল। রাতে ভীষণ জ্বর এসেছিল তোমার। উল্টাপাল্টাও বকেছ অনেক্ক্ষণ। যেটা পারো না সেটা নিতে যাও কেনো? ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টরা অলওয়েজ চান্স পাবে এমন নীতি আছে না-কি?
চিত্রা জবাব দেয় না। গলায় কাছটায় দলা পাকিয়ে আসে কান্নারা৷ নাওয়াফকে কিভাবে বোঝাবে? সে নিজেকে তার স্বামীর যোগ্য স্ত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল৷ নিজের ভুলের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। ভাবতে ভাবতেই কান্নার বেগ বাড়ে চিত্রার৷ নাওয়াফ তাকে থামায় না। সান্ত্বনা নামক জ্ঞানও দেয় না৷ সে কেবল আলতো করে জড়িয়ে ধরে চিত্রাকে৷ মেয়েটা শান্ত হয়ে আসে একটা পর্যায়ে। নাওয়াফও স্বস্তি পায়। এরপর বলে,
–” ইচ্ছে থাকলে সেকেন্ড টাইম ট্রায় করে দেখতে পারো নতুবা কাছের একটা ইউনিতে ভর্তি করে দিব। ডোন্ট গেট স্ট্রেসড্ ওকে?
চিত্রা মাথা নাড়ায়। সিধান্ত নেয়, সেকেন্ড টাইম ট্রায় করে দেখবে। যথারিতি সেভাবেই প্রিপারেশন নেওয়া স্টার্ট করে। এবার নাওয়াফ নিজে তদারকি করছে। অফিস থেকে ফিরে সময় দিচ্ছে চিত্রাকে। ভোরে টেনে উঠিয়ে পড়তে বসাচ্ছে। এই চক্করে তাদের সম্পর্কটা একটুখানি আগিয়েছে। এখন চিত্রাকে অবাধে টুকটাক স্পর্শ করে নাওয়াফ। যদি-ওবা স্বামী সুলভ কতৃিত্ব খাটায় না তবে আগের চাইতে সহজ হয়েছে সম্পর্কটা। চিত্রাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরতেও বের হয় নাওয়াফ।
কোনোকিছুই অবশ্য চোখ এড়ায়নি নাজনীন বেগমের৷ সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা নাওয়াফ সম্বলরূপে চিত্রা কে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এটা বুঝতে আর বাকি নেই নাজনীন বেগমের। তিনি নিজেও পরখ করে দেখেছেন, মেয়েটা যেমনই হোক অন্তত বড় বোনের মতো নিমকহারাম নয়। সবমিলিয়ে তিনি সন্তুষ্ট চিত্রার উপর।
আর কী হবে এত লড়ে? উল্টো ছেলেটাকেই হারিয়ে ফেলবেন চিরতরে। গতরাতে আশরাফ সাহেব তাকে বুঝিয়েছেন অনেক কিছু। নিজেও ভেবে দেখলেন, আসলেই তো! চিত্রা তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং ছেলের সুখময় জীবনের চাবিকাঠি। তাই সিধান্ত নিয়েছেন, চিত্রাকে আর দূরছাই করবেন না বরং নিজ হাতে তাকে সংসারী বানাবেন। এজন্যই এসেছেন চিত্রার কাছে৷
ভাবনা মোতাবেক রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত চিত্রাকে হাঁক ছেড়ে ডাকলেন নাজনীন বেগম। এই প্রথম বোধহয় এমনটা হলো। আকস্মিক শাশুড়ির ডাকে চিত্রা বেশ হকচকালো। ভয়ার্ত গলায় বলল,
–” জি?
নাজনীন বেগম যথাসম্ভব নরম সুরে বললেন,
–” এদিকে আসো তো..
সবে তরকারি তেলে দিয়েছে চিত্রা। এখন গেলে রান্নাটা স্বাদমতো হবে না তবুও সবকিছু ফেলে প্রায় দৌড়ে উপস্থিত হলো ড্রয়িংরুমে। নাজনীন বেগম নীরব চোখে দেখলেন চিত্রার উৎকন্ঠা। ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো তার মন। কম তো অপদস্ত করেননি এরপরও কি ভীষণ সমীহ করে চলে। সত্যি মেয়েটা চমৎকার।
কিঞ্চিৎ হাঁপাচ্ছে চিত্রা। চেয়ে আছে প্রশ্নাত্মক চোখে। জড়তার কারণে হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারছে না কিছু। নাজনীন বেগম নিজেই বললেন,
–” বসো আমার পাশে।
খানিকটা দ্বিধান্বিত হলো চিত্রা। কিয়ৎকাল দাঁড়িয়ে থেকে ধীর লয়ে হেঁটে শাশুড়ির পাশ ঘেঁষে বসলো। নাজনীন বেগম তাকে আগাগোড়া পরখ করে গম্ভীর গলায় শুধালেন,
–” এখন কেমন আছো?
কদিন আগে অতিরিক্ত মানসিক চাপের জন্য ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল চিত্রা। নাজনীন বেগম বোধহয় সেজন্যই এত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করছেন। চিত্রা লজ্জামাখা গলায় বলল,
–” আলহামদুলিল্লাহ। এখন পুরোপুরি সুস্থ।
নাজনীন বেগম কি বলবেন বুঝে পাচ্ছেন না। সব কথা তো আর অনায়াসে বলে দেওয়া যায় না। উনি খানিকটা উশখুশ করে ইঙ্গিতপূর্ণ গলায় বললেন,
–” তা তোমার সংসার কেমন যাচ্ছে? স্বামীর মন যুগিয়ে চলছো তো? সুখবর কবে পাব?
একসাথে এতগুলো প্রশ্ন শুনে থমকাল চিত্রা। মানেটা বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল টমেটো হয়ে গেল পুরো। নাজনীন বেগম তার অবস্থা দেখে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন এরপর সাফাই গাওয়ার মতো করে বললেন,
–” তুমি ছোটো মানুষ। অভিজ্ঞতা কম। সমস্যা হলে সমাধান দেওয়ার কেউ নেই। ছেলেমানুষ কি আর ওসব বোঝে ? এজন্যই ভাবলাম আমি জিজ্ঞেস করি। তোমার তো আর বড় জা কিংবা ননদ নেই যে হাতে ধরে শিখিয়ে দিবে। সবই আমার করে দেওয়া লাগবে।
চিত্রা গুটিয়ে গেলো কিছুটা। বুঝে উঠল না কীভাবে রিয়েক্ট করবে। শাশুড়িকে নিয়ে অভিজ্ঞতা তার বড়ই তিক্ত। সম্মানের জায়গাটা অক্ষুণ্ণ থাকলেও বিন্দুমাত্র ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। সে মেনে নিয়েছিল নিয়তি কিন্তু হুট করে নাজনীন বেগমের এত নরম আচরণ নানাবিধ প্রশ্নের উদ্রেক ঘটাচ্ছে মস্তিষ্কে।
বিভ্রান্ত চিত্রার মুখপানে চেয়ে নাজনীন বেগম একটু মিছে হম্বিতম্বি দেখিয়ে বললেন,
–” তোমাদের আজকালকার মেয়েদের কিছু বলাও যায় না বাবা। আমাদের শাশুড়িরা তো উনিশ থেকে কুড়ি হলেই পিঠে চ্যালাকাঠ ভাঙতো। তোমার ওই উড়নচণ্ডী বোনের জন্যই একটু অশান্তি সহ্য করতে হয়েছে তোমায়৷ পরে ভেবে দেখলাম, তুমি মেয়েটা খারাপ নয়।
কথাগুলো শুনে মলিন হাসলো চিত্রা। অন্যের পাপের বোঝা বহন করা বুঝি তার দায়িত্ব? প্রশ্নটা মনে এলো কিন্তু মুখে ফুটল না। অহেতুক অভিযোগ করে কি হবে? যেখানে নিয়তি নিষ্ঠুর। নাজনীন বেগম তার মলিন মুখটা দেখে গলা খাঁকারি দিলেন। আমতা আমতা করে বললেন,
–” বললে না তো..
চিত্রা পড়ল বিপাকে। কি বলবে ও? একান্ত ব্যক্তিগত ব্যপার গুলো খোলসা করে বলা যায়? তাও আবার গুরুজনের কাছে? চিত্রাকে অস্বস্তিতে মিইয়ে যেতে দেখে নাজনীন বেগম ভরসা দিলেন,
–” আহা! লজ্জা পাচ্ছো কেনো? তোমার ভালোর জন্যই জিজ্ঞেস করছি আমি। ভয় পেয়ো না। আদি যুগের শাশুড়িদের মতো তোমাদের সংসার ভাঙতে আসিনি। আমার ছেলেটাকে তো চিনি। তাই তোমায় সাবধান করতে এসেছি।
শেষোক্ত কথাটা তীরের মতো বিঁধে চিত্রার কানে। সাবধান করতে এসেছে মানে? বুক কাঁপে আশঙ্কায়। নাওয়াফ ছাড়া কোনো গতি নেই তার ৷ ভালো না বাসুক, সংসার না হোক ; ওই বুকটাতে একটুখানি ঠাঁই পেলেই হবে। গোটা একটা জীবন অনায়াসে কেটে যাবে চিত্রার। শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা গলায় শুধাল চিত্রা,
–” ক্ কি হয়েছে?
অভিজ্ঞ নাজনীন বেগমের চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি চিত্রার অস্থিরতা। মেয়েটার চোখে হারানোর ভয়টা স্পষ্ট। ভেতরে ভেতরে বেশ প্রশান্তি অনুভব করলেন নাজনীন বেগম। বাইরে প্রকাশ করলেন না বরং মুখ খানা আরও গম্ভীর করে মোক্ষম কথাটা বললেন,
–” সদ্য সন্তান হারিয়েছে নাওয়াফ। শোক কাটেনি বিধায় তোমাকে কাছে টেনেছে। এমনিতে ও কেমন তা তো জানোই। যদি নিজের ভালো চাও তবে এখুনি বাচ্চা নিয়ে নাও। পড়াশোনা পরেও করতে পারবা। স্বামী হাতছাড়া হইলে সংসার টিকবে?
কথাটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। চিত্রার মনে হলো কেউ ওকে স্বপ্ন ছেড়ে বাস্তবতায় এনে আছড়ে ফেলেছে। তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলো বুকে। মস্তিষ্কে দানা বাঁধল চিন্তারা। এক ঝটকায় নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। ও কে চিন্তায় অস্থির হতে দেখে নাজনীন বেগম বললেন,
–” কি হয়েছে? ভয় পাচ্ছো? চিন্তা করো না। একটু সাহস করে মেডিসিন মিস দিও৷ ছেলেমানুষ অত নজর রাখে না এসবে। সুখবর আসার আগে সেও কিছু টের পাবে না। একবার যদি জানতে পারে, তার অস্তিত্ব আসছে তাহলে রাজ রাণী করে রাখবে তোমায়। মিলিয়ে নিও।
চিত্রা পর পর ঢোক গিলল কত গুলো। শাশুড়িকে কীভাবে বলবে, মেডিসিন খাওয়ার মতো কিছুই ঘটেনি তাদের মধ্যে। অপারগতায় অসহায় লাগলো চিত্রার। ঝাপসা হয়ে এলো চোখ। অসহনীয় যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিরবে ফুঁপিয়ে উঠল৷ তার অবস্থা দেখে নাজনীন বেগম চমকে গেলেন। বিস্ময় নিয়ে বললেন,
–” কি হয়েছে? কাঁদছ কেনো?
কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না চিত্রা। সাহস করে শাশুড়ির হাত ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল৷ থরথর করে কাঁপছে চিত্রা৷ নাজনীন বেগম ঘাবড়ে গেলেন। ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
–” কি হলো? বলবে তো?
নাওয়াফকে হারানোর ভয় সম্পূর্ণ রুপে গ্রাস করে ফেলেছে চিত্রাকে। মস্তিষ্ক হারিয়েছে বিবেচনা। ও অস্পষ্ট স্বরে বলল,
–” আমাকে কখনোই কাছে টানেননি উনি।
নাজনীন বেগম বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে পড়লেন। প্রায় চেঁচিয়েই বললেন,
–” তোমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি?
চিত্রা মাথা দুলিয়ে বলল,
–” না।
মাথায় হাত দেওয়ার মতো অবস্থা হলো নাজনীন বেগমের। তিনি চিত্রার পানে চেয়ে বলেই বসলেন,
–” কেমন মেয়ে মানুষ তুমি? এতকাল এক বিছানায় থাকা সত্ত্বেও স্বামীকে কাছে টানতে পারোনি। কপাল পোড়াতে চাও নাকি ?
চিত্রা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আঁটকাল। অস্ফুটে না বোধহয় মাথা নাড়ল। নাজনীন বেগম বুঝলেন তার অসহায়ত্ব তাই বকাঝকা ছেড়ে সরাসরি বললেন,
উপসংহারে তুমি পর্ব ১২
–” আজ একটু পরিপাটি হয়ে থেকো। তোমাকে একটা জুসের গ্লাস দিব। নাওয়াফ ফিরলে সেটা খাওয়াবে ওকে। এরপর বাধ্য মেয়ের মতো স্বামীর সব আদেশ পালন করবে কেমন?
চিত্রার ছোট্ট মস্তিষ্ক বুঝল না অতকিছু। ও প্রশ্ন করল বোকার মতো। নাজনীন বেগম কপাল চাপড়ে সবটা খুলে বললেন। চিত্রা আঁতকে উঠে বলল,
–” অসম্ভব! উনি মেরে ফেলবেন আমায়।
নাজনীন বেগম রাগান্বিত স্বরে বললেন,
–” দু চারটা থাপ্পড় খাওয়ার ভয়ে স্বামী সংসার হারাতে চাও?
অতঃপর…

Ooo appi Next part taratari din