Home উপসংহারে তুমি উপসংহারে তুমি পর্ব ১৪

উপসংহারে তুমি পর্ব ১৪

উপসংহারে তুমি পর্ব ১৪
রুহানিয়া ইমরোজ

ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাতটা বাজে। শাশুড়ির কথা মোতাবেক সেজেগুজে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে চিত্রা। নাওয়াফ এলে তাকে খেতে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জুসটা সার্ভ করতে হবে।
অত্যন্ত সাংঘাতিক কাজ; বুক ঢিপঢিপ করছে রীতিমতো কিন্তু সে নিরুপায়। তাছাড়াও স্বামীর মন পেতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে। এসব ভেবে নিজেকে সাহস দিতে থাকে চিত্রা।
পরিশেষে অপেক্ষার প্রহর ফুরায়। কিয়ৎকাল পরেই বেজে উঠল মেইন ডোরের কলিং বেল। সাথে সাথেই আতঙ্কে লাফিয়ে উঠে চিত্রা। মনে হয়, এই বুঝি হৃদপিণ্ডটা বেরিয়ে আসবে তার। বুকে থুতু ছিটিয়ে, লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মূল ফটকের দিকে৷ বেচারি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, নিজের ধব্বংসকে বরণ করতে যাচ্ছে সে৷

দরজা খুলতেই নাওয়াফের ক্লান্ত মুখশ্রী ভেসে উঠে। চিত্রা স্থির হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। মানুষটাকে দেখলে অন্যরকম শান্তি কাজ করে। মনোরম অনুভূতিতে ছেয়ে যায় মানসপট। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ওদিকে, চিত্রাকে দেখে অবাক হয়ে গেল নাওয়াফ৷ মেয়েটা অন্যরুপে সেজেছে। সিল্কের পাতলা শাড়ি, সাথে হাফ স্লিভ ফিটিং ব্লাউজ, খোলা চুল, হালকা সাজ সব মিলিয়ে আবেদনময়ী লাগছে চিত্রাকে।
নাওয়াফ চালাক পুরুষ। চিত্রার সাজসজ্জার মানে তার অজানা নয়। জেনেও কেনো যেন চোখ ফেরাতে মন চাইল না। হয়তো সম্পর্কটা সহজ হয়েছে বলে। ভিন্ন নজরে চিত্রাকে আপাদমস্তক স্ক্যান করে ধীর গলায় শুধাল,
— ” কি ব্যপার? হঠাৎ এই সাজ?
চিত্রা আমতা আমতা করে জবাব দেয়,
–” ম্ মন চাইছিল তাই।

জবাব শুনে নিশ্চুপ থাকে নাওয়াফ। তার হাতের ব্যাগটা সেন্ট্রাল টেবিলে রেখে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। মস্তিষ্ক শান্ত হলেও মনটা অশান্ত। হঠাৎ কি যেন একটা হচ্ছে ভেতরে। এত বছরের সংযম, শর্ত, প্রতিশ্রুতি, নিয়মনীতি ; সবটা জাস্ট ভেঙে গুড়িয়ে দিতে মন চাইছে।
বলা বাহুল্য,ভুবন ভুলানো রুপ নেই চিত্রার৷ অত্যন্ত আকর্ষণীয় নয় তার শরীরের ভাঁজ। সহজে কারও চোখ আঁটকাবে নাকিন্তু নাওয়াফের গোটা পৃথিবীটাই থমকে বসে আছে। আজ বহু বছর পর ধ্বংসাত্মক এক অনুভূতি টের পাচ্ছে নিজের ভেতর। চিত্রার মায়াবী আদল আদরে ভরিয়ে দিতে মন চাইছে।
হুড়োহুড়ি করল না নাওয়াফ। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা নেশাটাকে অবাধ্য হতে দিল। কোনো বিধিনিষেধে বাঁধল না নিজেকে। গলার টা-ই ঢিলে করতে করতে আদেশ ছুঁড়ল চিত্রার উদ্দেশ্যে,

–” এক্সট্রা আইস কিউব দেওয়া ঠান্ডা পানি নিয়ে এসো৷
নাওয়াফের পলকহীন দৃষ্টি দেখে সিঁটিয়ে গেছে চিত্রা। যতটুকু সাহস যুগিয়েছিল তাও ফুড়ুৎ। আচমকা এক মোক্ষম সুযোগ পেয়ে একমুহূর্তও অপেক্ষা করল না। একছুটে দৌড়ে গেল রান্নাঘরে।কিয়ৎকাল সময় নিয়ে নিজেকে স্টেবল করে ফিরল এক গ্লাস পানি হাতে।
লজ্জায় চোখ নামিয়ে রেখেছিল চিত্রা। গ্লাস বাড়িয়ে দেওয়ার সময় অনিচ্ছায় তার দৃষ্টি যায় সামনের দিকে। সাথে সাথেই জোরালো এক কম্পন বয়ে যায় তার শরীর জুড়ে। উদোম গায়ে বসে আছে নাওয়াফ৷ কোমরে শুধুই একটা টাওয়েল জড়ানো।
হুট করে চিত্রার মনে পড়ে, বাড়ি ফেরার পর পরই শাওয়ার নেয় নাওয়াফ। সেজন্যই বোধহয় চেঞ্জ করে ছে কিন্তু এমতবস্থায় তার সামনে আসার কারণটা বুঝল না। নাওয়াফ তো এমন বেশরম না তাহলে আজ হঠাৎ কি হলো ?
গ্লাসের ট্রে হাতে বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা চিত্রাকে দেখে গলা খাঁকারি দেয় নাওয়াফ। ঠান্ডা গলায় বলে,

–” ট্রে-টা রেখে চলো আমার সাথে।
চিত্রা হকচকিয়ে উঠে আমতা আমতা করে বলে,
–” প্ পানি খাবেন না?
নাওয়াফ শান্ত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করলেও আদতে সে অস্থিরতার শীর্ষে অবস্থান করছে। সবকিছু তো আর বলে কয়ে বোঝানো যায় না। এরকম পিচ্চির সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা বোকামি বৈ কিছুই না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে খানিকটা গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
–” তেষ্টা মিটে গেছে।
চিত্রা ভ্রু কুঁচকে বলল,
–” কিন্তু আপনাকে দেখে তৃষ্ণার্ত লাগছে।
বোকা বউয়ের অহেতুক প্রশ্ন শুনে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাওয়াফ। চিত্রার চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
–” এক্স্যাক্টলি! তেষ্টা মিটেছে ; তৃষ্ণা নয়।
নাওয়াফের গভীর দৃষ্টি দেখে যা বোঝার বুঝে গেল চিত্রা। লজ্জা, শরম আর অদ্ভুত অনুভূতির মিশেলে পাথরের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গেল। নাওয়াফ তাড়া দিল না বরং উপভোগ করল তার ভীত হরিণীর লজ্জামাখা মুখশ্রী। মেয়েটাকে ফাঁকা ঢোক গিলতে দেখে শেষ ধৈর্য্যের বাঁধটা ভাঙল নাওয়াফের।
হাত বাড়িয়ে ধীর লয়ে কাছে টানল চিত্রাকে। মেয়েটা অবিরত কাঁপছে। নাওয়াফ সরাসরি তার অনাবৃত মসৃণ কোমরে হাত ছোঁয়াল। চিত্রা বেচারি শিউরে উঠে অস্ফুটস্বরে আওয়াজ তুলল। নাওয়াফ স্মিত হেসে তার গালে গাল ঠেকিয়ে ধীর গলায় বলল,

–” যার জন্য এই সাজসজ্জা তাকে রাজত্ব কায়েম করার অনুমতি দিবে না?
সোজাসাপ্টা জবাব দিতে পারল না চিত্রা। আড়ষ্ট হয়ে মুখ লুকালো নাওয়াফের বাহুতে। নিরবতাকে সম্মতির লক্ষ্মণ ভেবে নাওয়াফ আলতো করে তাকে কোলে তুলে পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। এতক্ষণ সবকিছু স্মুথলি চললেও এপর্যায়ে এসে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হলো ঘটনাক্রম।
সিলিং শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিবিড়ভাবে চিত্রাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল নাওয়াফ। উপরের ঝর্ণা থেকে গড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রিত শীতল পানির ফোয়ারা ভিজিয়ে দিতে থাকল দু’জনকে। চিত্রাকে সামলে উঠতে সময় দিচ্ছিল নাওয়াফ কিন্তু রমণীর সিক্ত কায়া দেখে শেষপর্যন্ত তা আর সম্ভব হলো না।
চিত্রার কোমর জড়িয়ে রাখা হাত দু’টো শাড়ির আব্রু সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চিত্রা একটুও বাঁধা দেয়নি।যা হচ্ছে তা তার বহু অপেক্ষা এবং ত্যাগ তিতিক্ষার ফল। লম্বা একটা শ্বাস টেনে ভয়টুকু ঝেড়ে ফেলে সে। ওই পাথর মানবের নিকট নিজেকে সোপর্দ করে চোখ বুঁজে ফেলে চিত্রা৷
ততক্ষণে নাওয়াফ এগিয়েছে বহু দূর। তাদের মধ্যে আবরণ বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। নাওয়াফের হাত দু’টো অবাধ্য ভাবে বিচরণ করছে চিত্রার উন্মুক্ত কায়ায়। যন্ত্রণাময় সুখে তিরতির করে কাঁপছে চিত্রার দুর্বল চিত্ত। আবেশের ঘোরে নাওয়াফের হাতের পৃষ্ঠে দগদগে চিহ্ন বসিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।
এরপর অনেকটা সময় পেরোল। সময়ের সাথে শান্ত হলো আগত ঝড়। তবে চিত্রার নিজের বলতে আর কিছুই রইল না। সবটুকুতে পূর্ণাঙ্গ দখলদারিত্ব চালিয়ে নিজের নামে বরাদ্দকৃত হক অত্যন্ত নিবিড় ভাবে আদায় করেছে। ফলস্বরূপ চিত্রা আজ নিঃশেষ।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত বারোটার ঘরে। দরজা খোলার শব্দে শুনে সেদিকে তাকাল নাওয়াফ। দেখল, তার লাজে রাঙা রমণী ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। এটাই স্বাভাবিক কিন্তু ব্যপারটাকে বাড়াতে চাইল না নাওয়াফ। মন তৃপ্ত হলেও পেট ক্ষুধার্ত। এমুহূর্তে খেয়েদেয়ে ঘুমানো দরকার।
মাথার ভেজা চুলে আঙুল চালিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নাওয়াফ শুধাল,
–” ডিনার করেছিলে?
হঠাৎ প্রশ্নে খানিকটা চমকায় চিত্রা। দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বোঝায়, সে খায়নি। নাওয়াফ পরপরই বলে,
–” ঠিকাছে। এখন চলো, খেয়ে নিবে।
খাওয়ার বিন্দুমাত্র রুচি নেই চিত্রার। ক্লান্তি আর ঘুমে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে। সে বলতে চাইল,
–” আমি খাব ন্..

বলতে গিয়েই থমকে গেল। গলা বসে গেছে । কেমন যেন ফ্যাসফ্যাসে শোনাচ্ছে কন্ঠস্বর। চিত্রা হতবিহ্বল হয়ে তাকাল৷ নাওয়াফ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ এমন কিছু দেখে ঠোঁট কামড়ে ধরে চুপ হয়ে গেল ও। টানা আড়াই ঘন্টা শাওয়ার নেওয়ার ফল পাচ্ছে বেচারি। আহা রে কোমলপ্রাণ বউ। তার নিজের অবস্থাও একটু শোচনীয়। এক কাপ চা না নিলেই নয়।
নাওয়াফ পরিস্থিতি সামলাতে গম্ভীর গলায় বলল,
–” চা খেলেই ঠিক হয়ে যাবে৷ তাছাড়াও ওষুধ আছে বাসায়। ডিনার সেরে নিয়ে নিবে। চলো..
চিত্রা আর না করতে পারল না। নাওয়াফের পিছু পিছু গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল। হুট করে কিছু একটা নজরে আসতেই বুক ধড়ফড়িয়ে উঠল তার৷ অসাবধানতা বশত জুসের গ্লাসটা টেবিলেই রয়ে গেছে। চিত্রা এমতবস্থায় কি করবে ভেবে পায় না। নাওয়াফের ডান হাতের কাছেই আছে ওটা। ক্রমশ ধুকপুকানি বাড়তে থাকে বেচারির।
চিত্রা ক্লান্ত মুখটা দেখে মায়া হয় নাওয়াফের। যদিও সে রাক্ষুসে আচরণ করেনি স্টিল মেয়েটা ছোটো। ও ভাবে, পরেরবার থেকে এত লং টাইম আঁটকে রাখবে না তাকে। আপনমনে ভাবতে ভাবতেই নিজের প্লেটে খাবার তুলে নেয়। সামনে তাকিয়ে দেখে,চিত্রা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আছে৷ নাওয়াফ ভাবে, হয়তো খেতে ইচ্ছে করছে না একদমই তাই জোরাজোরি না করে ধীর গলায় বলে,

–” আজকের মতো ছেড়ে দিলাম তবে নেক্সট টাইম থেকে যেন আটটার মধ্যে ডিনার কমপ্লিট হয়ে যায়।
ফ্রন্ট কেবিনেটে কেক রাখা আছে। খেয়েদেয়ে কড়া লিকার দেওয়া দুইকাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো।
চিত্রার মনে হয় মোক্ষম একটা সুযোগ পেয়েছে। ও ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে জুসের গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে নিলে নাওয়াফ বিরক্তি মাখা গলায় বলে,
–” একটা জিনিসও স্পর্শ করবে না তুমি। এসব আমি গুছিয়ে নিব। যতটুকু বলা হয়েছে ততটুকু করো।
চিত্রা কেঁপে উঠে হাত গুটিয়ে নেয়। কি বলবে ভেবে পায় না। অলরেডি যা হওয়ার হয়ে গেছে তবুও.. দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে বাধ্য হয়ে আমতা আমতা করে বলে,
–” সেই কবে বানিয়েছি । এতক্ষণে হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। যদি গন্ধ ছড়ায় তাই..
নাওয়াফ চোখমুখ কুঁচকে বলল,

উপসংহারে তুমি পর্ব ১৩

–” নো মোর ওয়ার্ডস। গো এহেড।
চিত্রা আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। ধীর পায়ে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে গেল। দুরুদুরু বুকে চা বসাল। নাওয়াফ তখনও ধীরে সুস্থে খাচ্ছে। চিত্রা ঝটপট চা বানিয়ে দু’টো কাপে ঢালতে লাগলো। এরমধ্যেই হুট করে নাওয়াফের বিষম খাওয়ার শব্দ শোনা গেল। চিত্রা চটজলদি গ্লাসের পানি হাতে ছুটতে নিতেই দেখল সবথেকে ভয়াবহ দৃশ্য।
টেবিলের জগে পানি ছিল না। হাতের কাছেই রাখা ছিল পুদিনা পাতার জুস। নাওয়াফের ফেব্রেট বিধায় কোনোদিক না ভেবে ওটাতেই চুমুক বসিয়েছে সে। দৃশ্যখানা দেখে চিত্রার কলিজা হাতে চলে আসে। কি ঘটে গেল ভেবেই মাথায় হাত দিয়ে বসল ও। বেচারি জানতেও পারল না, ওটাতো কেবল ট্রেলার ; সিনেমা এখনও বাকি আছে।

উপসংহারে তুমি শেষ পর্ব