এই অবেলায় পর্ব ৩৯
সুমনা সাথী
কাব্য প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলের আর কোনোদিনও সুবুদ্ধি ফিরবে না! ওটি টেবিল থেকে ঘুরে এসেও ফাজলামো করার এনার্জি ও কোথা থেকে পায়। তা কাব্যর বুদ্ধিতেও ধরছে না। কলরবের হাতের স্যালাইনটা প্রায় শেষের পথে। কাব্য কথা না বাড়িয়ে সেটা বদলানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে ওদের দিকে আড়চোখে তাকাল। অভিক আর শান্তর মুখ ততক্ষণে একদম আমসি হয়ে গেছে।দুজনের চোখেমুখে এক আকাশ বিস্ময় আর আতঙ্ক। কলরব ওদের চেহারা দেখে মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে। ভেতর-ভেতর হাসিতে ফেটে পড়ার অবস্থা ওর। অভিক একেবারে কাতর গলায় বিছানার পাশে বসে বলল,
“দোস্ত, তুই আসলেই আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি অভিক। তোর জানের বন্ধু! তুই আর আমি মিলে যে কলেজ গেটে মেয়ে পটানোর বাজি ধরতাম। মনে নেই? তুই যদিও একদিনও জিততে পারতিস না। কারণ তোর চেয়ে আমি দেখতে অনেক বেশি সুন্দর ছিলাম। সেই তুই আমাদের এভাবে ভুলে গেলি?”
অভিকের এই মিথ্যা শুনে কলরব আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। তড়িৎ গতিতে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে প্রতিবাদ করে উঠল,
“কী বাজে বকছিস তুই? বাজি সবসময় আমি জিততাম! যেই দেখেছিস আমার স্মৃতি চলে গেছে। অমনি সুযোগ বুঝে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে বসে গেছিস? বেইমান কোথাকার!”
কথাটা মুখ দিয়ে ছুড়ে দিয়েই কলরব নিজের দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল। ইশ! বড্ড বড় গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আবেগের চোটে নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিয়ে ফেলেছে সে। শান্ত এতক্ষণ আসলেই ভয়ে ছিলো কিন্তু এখন তার চোখ দুটো রাগে কটমট করে উঠল। এক পা এগিয়ে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“শালা! আমরা এখানে চিন্তায় মরে যাচ্ছি। আর তুই ওটি থেকে বের হয়েই নাটক মারাচ্ছিস? তোকে যে আজ আমি কী করব…!”
কথাটা বলতে বলতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্যর দিকে চোখ পড়ায় চট করে চুপ করে গেল শান্ত। যতই হোক। কাব্য তো কলরবের বড় ভাই। অভিক বলল,
“আমি ভালো করেই বুঝেছিলাম তুই নাটক করছিস। শোন, তোর থোতমা আমার চেয়ে সুন্দর হলেও। ব্রেনের দিক থেকে কিন্তু আমার বুদ্ধি তোর চেয়ে অনেক বেশি।”
কলরব বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে বলল, “চুপ থাক শালা। নিজের ঢোল নিজে পেটানো বন্ধ কর। কিন্তু একটা জিনিস তোরা আমায় বুঝিয়ে বল তো। তোদের হঠাৎ কেন মনে হলো যে আমার স্মৃতিশক্তি চলে গেছে?”
শান্ত এবার একটু শান্ত হয়ে বলল, “ঐ যে ওটি থেকে বের হওয়ার পর ডাক্তার বলেছিলো। মাথায় চোট গুরুতর হওয়ায় এমনটা হতে পারে।”
ডাক্তারের এমন অনুমানের কথা শুনে কলরবের চোখ দুটো উৎসাহে চকচক করে উঠল। সে বেশ আফসোসের সুরে বলল,
“ডাক্তার আসলেই এমন বলেছিল? এই ঐতিহাসিক তথ্যটা তোরা আমাকে আগে বলবি না? জানলে আমি সত্যিই আজ সব ভুলে যেতাম! বিশেষ করে আমার ওই হিটলার বাপকে। একদম বেমালুম চিনেও অস্বীকার করতাম।”
কথাটা বলতে বলতেই কলরব হঠাৎ কপালে হাত দিয়ে একটু চোখ বন্ধ করল। কপাল কুঁচকে বলল,
“তবে সত্যি বলতে। মাথায় একটু-আধটু কেমন যেন চিনচিন করে ব্যথা হচ্ছে রে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে। আমি আসলেই কিছু কিছু জিনিস ভুলে যাচ্ছি।”
ওকে আর পাত্তা দিল না কেউ। কাব্য কড়া গলায় বলল,
“তোকে চুপ থাকতে বলেছি না? আল্লাহর দোহাই লাগে মুখটা একটু বন্ধ করে রাখ। নয়তো মাথায় যতগুলো সেলাই পড়েছে। তোর এই অনবরত চিল্লানিতে সব কটা খুলে আসবে।”
কাব্যর ধমক খেয়ে কলরব একটু সময়ের জন্য থমকে গেল। কিন্তু সেই নীরবতা স্থায়ী হলো বড়জোর কয়েক সেকেন্ড। কাব্য কেবিনের দরজা খুলে বের হতে যাবে। ঠিক তখনই কলরব আচমকা এক প্রকার চিৎকার করে উঠল। তার সেই আকুল আর্তনাদ শুনে কাব্য দরজার হাতল ধরা অবস্থাতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কলরব বিছানায় শুয়েই উত্তেজিত হয়ে বলল,
“এই কাব্য! আমার চুল কই? তুই আমার চুল কেটেছিস কেন হ্যাঁ? এই তো… এই সপ্তাহেই আমি পুরো তিন হাজার টাকা খরচ করে চুলের পেছনে ট্রিটমেন্ট করিয়েছি! তোর সাহস হলো কী করে আমার সাধের চুল কাটার?”
কাব্য বিরক্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সেটা ওইভাবে মাঝরাতে পাগলের মতো বাইক চালানোর আগে ভাবা উচিত ছিল। ভাগ্যিস মাথাটা আস্ত আছে। তাই চুল নিয়ে বিলাপ করার সুযোগ পাচ্ছিস। চিন্তা করিস না। এক মাসের মধ্যে মোটামুটি একটা পর্যায়ে চলে আসবে।”
কলরব এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, “তাই বলে তুই আমার মাথা পুরো ন্যাড়া করে দিবি? একটু তো রাখতিস অন্তত! তুই ইচ্ছা করে করেছিস তাই না? আমি সব বুঝি! তোর নিজের মাথায় তো অলরেডি টাক পড়ার উপক্রম হয়েছে। এইজন্য হিংসেয় আমার এই সর্বনাশটা করলি!”
কাব্য ওর এই উদ্ভট যুক্তিতে আর বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে গটগট পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। অভিক আর শান্ত এতক্ষণ চুপচাপ এই দৃশ্য দেখছিল। প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসল ওরা। অভিক শান্ত করার জন্য বলল,
“তুই এত চিল্লাইস না তো ভাই। মাথায় আসলেই জোর লাগবে। ব্যাথা বাড়বে।”
কলরবের মন তখনো চুলে আটকে আছে। সে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,
“ব্যান্ডেজ খোলার পর আমাকে কেমন লাগবে দেখতে? আমার ওই টাক মাথা শ্বশুরের মতো নিশ্চয়ই? ইয়াক, নো! আল্লাহ? তুমি আমার সাথে এটা কীভাবে করলে? আরে, এক মিনিট!”
শান্ত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“আমার শ্বশুর দেখতে আসেনি আমাকে?”
“না তো। আমরা যখন থেকে ছিলাম তখন তো উনাকে আসতে দেখিনি।”
“আর। আর আমার শাশুড়ি?”
“উনাকেও দেখিনি।”
“আর… আর অন্য কেউ?”
অভিক বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “সরাসরি বল না যে তুই নিযানার কথা জানতে চাইছিস! এতক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাটক করছিস কেন? যতটুকু জানি নিযানাও আসেনি। আমরা তো এখানে আসার পর থেকে ওর বাড়ির কাউকেই দেখিনি।”
বন্ধুর মুখে কথাটা শুনে কলরব মুহূর্তের মধ্যে থতমত খেয়ে গেল। হ্যাঁ, সে আসলেই নিযানার কথাই ভাবছিল। এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেল তার ওপর দিয়ে আর নিযানা একবারের জন্যও তাকে দেখতে এলো না? কেনো যেন একটা তীব্র অভিমান আর প্রচণ্ড রাগ এসে জমা হলো কলরবের বুকে। সে কাল রাতে মরতে বসেছিল আর মেয়েটা তখন দিব্যি হাসছিল! যদি সে সত্যিই কাল রাতে মরে যেত? এতক্ষণে নিশ্চয়ই তাকে কবর-টবর দেওয়া হয়ে যেত। আর নিযানা হয়তো এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। একবারের জন্যও দেখতে আসলো না! আসবেই বা কেন। ও তো আর তাকে ভালোবাসে না। ঘৃণা করে। আর অপছন্দের মানুষের বড় কোনো ক্ষতি হলে তো লোকে খুশিই হয়। হওয়ারই কথা!
কলরব চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বলল,
“তোরা এক কাজ কর। ইরাকে একটা কল করে বল ও যেন আমাকে হাসপাতালে দেখতে আসে। আর শোন… আমার এই মুমূর্ষু অবস্থার কয়েকটা সুন্দর সুন্দর দেখে ছবি তোল তো ফোন দিয়ে। ফেসবুকে ইমোশনাল ক্যাপশন দিয়ে পোস্ট করতে হবে। অবশ্য মাথা থেকে ব্যান্ডেজ খোলার পরের ছবি আর পোস্ট করতে পারবো না। তাহলে মেয়েরা আনফলো করে দিবে। ইশ!”
অভিক আর শান্ত দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠল। কলরব তখনো চোখ বন্ধ করেই রইল। মেজাজটা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে তার। এভাবে আর কতদিন এই হাসপাতালের সাদা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে থাকতে হবে? ভাবতেই কেমন দমবন্ধ লাগছে। আর সবকিছুর ওপর। আবারও যখনই নিজের সাধের চুলগুলোর কথা মাথায় আসছে। বুকটা যেন ধক করে উঠছে তার। কী করবে সে এখন?
সামনে চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা নকীবের মধ্যে কোনো প্রকার ভাবান্তর দেখা গেল না। এত বড় একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল অথচ সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই ঘরে এসে প্রবেশ করেছে দিব্য তালুকদার। ভোরের আবছা আলোয় চেয়ারে বাঁধা লোকটার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখ দুটোকে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মানুষ যেভাবে নিজেকে দেখে। ঠিক হুবহু এক অবয়ব বসে আছে সামনে। দিব্য অবিশ্বাস্য গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমার নাম কী?”
নকীব ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “জানি না।”
“আমি তোমার আসল নাম জিজ্ঞেস করেছি!”
দিব্যর গলার স্বর কিছুটা চড়ল। নকীবের মুখে সেই একই তাচ্ছিল্যের হাসি,
“আমার আসল-নকল যা-ই বলো না কেন। সবটাই ওই একটাই।”
“আমার ক্ষতি কেন করতে চাইছ? কী শত্রুতা তোমার আমার সাথে?”
“সবই টাকার খেলা ভাই। টাকার জন্য করছি।”
“তোমার পেছনে কে আছে? তোমার বস কে?”
চরম বিরক্তিতে ধমকে উঠল নকীব, “এই এই, একদম চুপ! আর একটাও ফালতু প্রশ্ন করবি না আমাকে। আমি প্রশ্নের উত্তর দিতে একদম পছন্দ করি না। ধরে ফেলেছিস তো আমাকে? ব্যাস, পারলে এখানেই মেরে পুতে দে। পুলিশের হাতে দিয়ে কিন্তু কোনো লাভ হবে না। পুলিশ আমাকে চব্বিশ ঘণ্টাও আটকে রাখতে পারবে না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল নবনী। কায়েফ এগিয়ে এসে দিব্যর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, একে এখানে রেখে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একে বরং সোজা পুলিশের হাতে তুলে দাও। থানা হেফাজতে নিয়ে থার্ড ডিগ্রি দিলে মুখ দিয়ে সব সত্যি গড়গড় করে বের হবে। আমি বরং এখন একটু হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি। কাব্য ভাই একটু আগে মেসেজ দিয়ে জানাল কলরবের নাকি জ্ঞান ফিরেছে। ওকে একবার দেখে আসি।”
কায়েফের যাওয়ার কথা শুনতেই নকীবের চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো চকচক করে উঠল। সে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“পরের বার তোকে দেখতে আমি নিজে হাসপাতালে যাব রে খোকা! তবে কোনো কেবিনে নয়। সোজা মর্গে। শালা কলিকালের মীরজাফর কোথাকার!”
কায়েফ দরজার দিকে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়াল। ঘুরে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুই নিজে কোনো সিরাজউদ্দৌলা নস যে তোর সাথে মীরজাফরির গল্প আসবে। হলি তো একটা সস্তা গুন্ডা-মাস্তান!”
নকীব চেয়ারে বাঁধা অবস্থাতেই শরীরটা ঝাঁকিয়ে গর্জে উঠল,
“এই! গুন্ডা কাকে বলছিস হ্যাঁ? আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তোর কোনো ধারণাই নেই। দুই দিনের বৈরাগী কোথাকার!”
কায়েফ আর রাগ করল না বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আসলে তোর নিজের ঘরে মা-বোন বলে কেউ নেই। তাই না? থাকলে অন্তত মানুষের প্রতি একটু মায়া-দয়া থাকত। ঠিকঠাক শিক্ষা থাকতো। এই জন্যই তুই সমাজ ও পরিবারের বাইরে এক আস্ত অমানুষ হিসেবে তৈরি হয়েছিস।”
দাঁত বের করে পৈশাচিক এক হাসি হাসল নকীব, “নাহ নেই। তোর তো অনেক আছে। ভাবছি তোর থেকে ধার নেব। তোর একটা বোন আছে দেখছিলাম। ভাবি গুলাও জোস। বিশেষ করে সামনের টা।”
তার সেই হাসির রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই দিব্যর শক্তপোক্ত একখানা হাতের প্রচণ্ড ঘুষি এসে পড়ল নকীবের বাঁ গালে। সেই আঘাতে নকীবের মুখটা একদিকে মচকে গেল। ঠোঁটের কোণ ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো। দিব্য এগিয়ে গিয়ে নকীবের শার্টের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে মুচড়ে ধরল। দাঁতে দাঁত পিষে। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি। তোর বস কে?”
মার খাওয়ার পরেও নকীবের গায়ে যেন বিন্দুমাত্র লাগল না। সে নিজের মুখের রক্তটুকু থুতু করে মেঝেতে ফেলে উল্টো দিব্যকে একটা চোখ টিপে দিল। তারপর অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের গলায় বলল,
“আমার বস আমি নিজেই রে ভাই। নকীব নওরোজ কারও কথায় চলে না। এই দুনিয়ায় না আছে আমার কিছু পাওয়ার লোভ আর না আছে কিছু হারানোর ভয়। তোদের মতো মা, বাবা, ভাই, বোন, বউ কিংবা ফুটফুটে বাচ্চা কিচ্ছু নেই আমার। আমি একা। এই দুনিয়ায় বরাবরই আমি একা। থাকার মধ্যে কেবল এই একটা প্রাণ আছে। তাও আমি ওটার পরোয়া করি না। নিজের প্রয়োজনে আমি যেমন হাসিমুখে কারও জান নিতে পারি। তেমনই কোনো ক্ষোভ ছাড়া নিজের জানটা বিলিয়েও দিতে পারি। তাই তোদের যা খুশি করে নে আমার সাথে। তবে শুধু একটা কথা মনে রাখিস কোনোভাবে যদি আমি একবার এই বাঁধন ছিঁড়ে ছাড়া পাই। তবে এর প্রতিটা ঘা-এর হিসেব আমি একদম উসুল করে ছাড়ব। আমি তোদের সাথে কোনো শত্রুতা করতে আসিনি। তোরাই নিজেরা যেচে এই খেলাটা শুরু করেছিস।”
ঠিক তখনই থমথমে বাতাস কাঁপিয়ে দরজার ওপাশ থেকে একটা অতি চেনা, ঘুম-জড়ানো ছোট্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“মাম্মা, তোমরা এখানে কী করছ?”
দরজায় চোখ পড়তেই ঘরের সবার বুকটা ধক করে উঠল। সেখানে চোখ ডলতে ডলতে এসে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট দিয়া। দিব্য এক ঝটকায় নকীবের কলার ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সে চাইলেও দিয়ার দৃষ্টি থেকে চেয়ারে বাঁধা নকীবকে আড়াল করতে পারল না। উপায় না দেখে সে নিজেই দিয়ার সামনে নিজের চওড়া পিঠ দিয়ে আড়াল তৈরি করে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু দিয়াকে আটকে রাখা গেল না। সে বাবার পাশ কাটিয়ে গুটিগুটি পায়ে ছুটে গিয়ে সোজা নকীবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চেয়ারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবিকল তার পাপ্পার মতো দেখতে লোকটাকে দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত আর ব্যথিত গলায় বলে উঠল,
“মাম্মা! তোমরা ওকে এভাবে দড়ি দিয়ে কেন বেঁধে রেখেছ? ইশ! ও তো অনেক ব্যথা পেয়েছে। দেখো মাম্মা, ওর ঠোঁট দিয়ে কেমন রক্ত বের হচ্ছে!”
নবনী নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু জোর করে চেপে রেখে দিয়াকে শান্ত করার সুরে বলল,
“উনি অনেক বড় একটা দুষ্টুমি করেছেন তো সোনা। তাই মাম্মা আর তোমার পাপ্পা মিলে উনাকে একটু পানিশমেন্ট দিচ্ছে।”
দিয়া নকীবের রক্তাক্ত ঠোঁট আর গালের দিকে তাকিয়ে বড্ড মায়ায় পড়ে গেল। সে তার ছোট্ট, নরম হাতটা আলতো করে ছোঁয়ালো নকীবের গালে। অবুঝ গলায় বলল,
“মাম্মা, ও তো এখন গুড বয় হয়ে গেছে। ও এখনই সবাইকে ‘সরি’ বলে দেবে। ওকে প্লিজ খুলে দাও না মাম্মা। দেখো ও আর আমার পাপ্পা তো দেখতে একদম সেম সেম! আচ্ছা তুমি কে বলো তো?”
কাল মাঝরাতে যখন দিয়া তার পাপ্পার আচমকা বদলে যাওয়া আচরণ নিয়ে বারবার নবনীর কাছে নালিশ করছিল। তখনই নবনী ওকে অনেক বুঝিয়েছিল যে এই লোকটা আসলে তার পাপ্পা নয়। তবুও বাচ্চা মন তো। অবিকল বাবার মতো প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারছে না। নকীব দিয়ার সেই হাতের ছোঁয়া পেয়ে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পাথুরে ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত মৃদু, এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু গলায় বলল,
“আমি তোমার চাচ্চু হই।”
দিয়া নিজের বড় বড় চোখ দুটো আরও ছোট ছোট করে সন্দিহান গলায় বলল,
“চাচ্চু? কিন্তু তুমি তো খুব দুষ্টু। অনেক পঁচা! চাচ্চু তো মজার হয়। অনেক আদর করে। যেমন বড় চাচ্চু, ছোট চাচ্চু, কায়েফ আংকেল। তাও… তাও তোমাকে আমি আর পানিশমেন্ট দিতে চাই না। মাম্মা, খুলে দাও না ওকে প্লিজ। তুমি এখন সবাইকে সরি বলবে তো?”
নকীব অত্যন্ত ঠান্ডা, নিস্পৃহ গলায় বলল, “আমি কোনো সাধারণ দুষ্টু মানুষ নই। আমি একটা আস্ত শয়তান।”
দিব্য নবনীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “নবনী, দিয়াকে এখনই এখান থেকে নিয়ে নিজের ঘরে যাও। আমি একটু পরেই আসছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশও এই বাড়িতে এসে পৌঁছাবে।”
পাপ্পাকে দেখে দিয়ার গোলগাল চোখ-মুখ এক নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আনন্দিত হয়ে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু নবনী তাকে আর সেই সুযোগ দিল না। লোকটার হিংস্র সান্নিধ্য থেকে মেয়েকে আড়াল করতে সে জোর করেই দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দিব্য যখন নিজের শোবার ঘরে ফিরে এলো। ততক্ষণে সকালের নরম রোদ পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। দিয়া তখন বিছানা ছেড়ে ড্রয়িং রুমের সোফাটায় এসে একদম মুখ ফুলিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। দিব্য ভেতরে আসতেই নবনী তাকে দিয়ার দিকে ইশারা করে ঠোঁট টিপে একটু হাসল। মেয়ের এই মিষ্টি অভিমানের কারণটা দিব্যর বুঝতে বাকি রইল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সোফার সামনে দিয়ার মুখোমুখি মেঝেতে হাঁটুমুড়ে বসল। অত্যন্ত আদুরে আর নরম গলায় বলল,
“দিয়া সোনা… দেখো। তোমার পাপ্পা এসেছে। পাপ্পাকে একটা শক্ত করে হাগ করবে না, সোনা?”
দিয়া এক ঝটকায় নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। ছোট্ট বুকের ওপর দুটো হাত শক্ত করে বেঁধে। অভিমানের পাহাড় জমিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল সে। দিব্য এবার নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের দুটো কান ধরল। একদম অপরাধীর মতো মুখ করে বলল,
“এই দেখো, পাপ্পা একদম কান ধরে নিয়েছে। আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি সোনা। প্লিজ, পাপ্পাকে এবার ক্ষমা করে দাও।”
দিয়া মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে বাবার দিকে চাইল। তার চোখের কোণায় তখনো ক্ষোভের আভাস। সে নালিশের সুরে বলল,
“পাপ্পা, তুমি এবার বড্ড দেরি করেছ। একে তো তুমি প্রমিজ করে আমার জন্য বড় ডল আনোনি। তারপর বাড়িতে এসে আমাকে এতক্ষণ একটা ‘স্যরি’ পর্যন্ত বলোনি! আমাকে দেখেই কোল তুলোনি। একটু আদরও করোনি। তুমি আসলেই অনেক পঁচা হয়ে গেছো!”
“আর কখনো এমন হবে না, প্রমিজ। আজকে তোমাকে এই শহরের সবচেয়ে বড় ডলটা এনে দেব, কেমন? এবার তো অন্তত মাফ করে দাও, প্লিজ!”
দিয়ার কোমল মনটা এবার একটু নরম হলো। সে তার ডাগর চোখ দুটো নাচিয়ে, বেশ বিচারকের ভঙ্গিতে বলল,
“উহুঁ, এত সহজে হবে না। তাহলে কান ধরে ওঠবস করো!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নবনী শব্দ করে হেসে ফেলল। দিব্য আজ মেয়ের এই কঠিন আদেশ অমান্য করার কোনো চেষ্টাই করল না। সে দুই হাতে কান ধরে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর নবনীর সেই হাস্যোজ্জ্বল, রূপসী মুখের পানে চেয়ে কৃত্রিম রাগে চোখ রাঙাল। যার অর্থ ‘তুমি হাসছ? মনে রেখো এর শোধ কিন্তু আমি পরে তুলব!’ নবনী অবশ্য বরের সেই চোখ রাঙানোকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। উল্টো মুচকি হেসে উপভোগ করতে লাগল দৃশ্যটা। দিয়ার কড়া নজরদারিতে গুনে গুনে পুরো দশবার কান ধরে ওঠবস শেষ করতেই দিয়া নিজের দুটো ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিল। এক লাফে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার চওড়া কোলে। দিব্য এক বুক স্বস্তি আর গভীর ভালোবাসায় মেয়েকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। এতক্ষণের সব ক্লান্তি আর আতঙ্ক যেন এই এক ছোঁয়ায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে দিয়ার নরম গাল, কপাল আর ললাটের সর্বত্র ঘন ঘন চুমু আর আদুরে স্পর্শে ভরিয়ে দিতে লাগল। বাবার সেই চেনা আদরের সুড়সুড়িতে খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটা। একপাশে দাঁড়িয়ে নবনী এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইল তার জীবনের এই শ্রেষ্ঠ, প্রিয় দুটো মানুষের দিকে।
“এই কাব্য! কাব্য। আমার বড্ড খিদে পেয়েছে। কায়েফ, ওকে একটু ডাক না ভাই! আমার সত্যি ভীষণ খিদে পেয়েছে। বল যে আমার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ডাক ওকে! কোথায় গিয়ে মরেছে ও?”
সবেমাত্র এসে বসেছে কায়েফ। প্রচন্ড বিরক্ত চোখে কলরবের দিকে তাকাল সে। বাড়ির বাকি সবাই এসে দেখা করে চলে গেছে একটু আগেই। আপাতত কেবিনে অনন্ত, শান্ত আর অভিকদের সাথে সে বসে আছে। যদিও কাব্য ওদের এই ঘর থেকে বের হয়ে যেতে কড়া নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল। কারণ জ্ঞান ফেরার পর থেকেই কলরব অনবরত কথা বলে চলেছে। মাথায় এত বড় একটা চোট নিয়ে ওর নিজের একটু ভয় পাওয়া উচিত অথচ এই ছেলেকে কোনোভাবেই শান্ত রাখা যাচ্ছে না। সে আসলেই অযথা বকবক করে চলেছে। তবে এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বেশি চিন্তা নিজের সাধের চুলগুলো নিয়ে। যা ইতোমধ্যে সে কয়েক বার বলে ফেলেছে। কায়েফকে অবশ্য আর কষ্ট করে কাব্যকে ডাকতে হলো না। তার আগেই দরজার ওপাশ থেকে কাব্য নিজে এসে কেবিনে প্রবেশ করল। তার মেজাজ এখন সপ্তম আকাশে চড়ে আছে। সারারাত এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারেনি। ভেবেছিল ভোরবেলা সব চুকিয়ে একটু ঘুমাবে। তাও আর কপালে জুটল না। ঘুম তো দূর। ওদিকে বাড়ি যাওয়ার আগে আরেকটা নতুন আপদ এসে হাজির। সিরিয়াস পেশেন্ট। কাব্য বিরক্ত মুখেই কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে শান্তদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোদের না একটু আগে বললাম এখান থেকে চলে যেতে? রুগীর সামনে এভাবে ভিড় করে আছিস কেন?”
কলরব অত্যন্ত কাতর গলায় ডাকল, “কাব্য…!”
“কী?”
“আমার না প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে ভাই! আমার এই মুহূর্তে গরম গরম খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করছে।”
কাব্য একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোকে আপাতত স্যালাইনের পানি ছাড়া আর কিচ্ছু দেওয়া সম্ভব না। দুপুরের পর বড়জোর হালকা কিছু তরল দেওয়া যেতে পারে। তাও খিচুড়ি তো কখনোই না। এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে একটা ঘুম দে।”
“ভাই, তুই আমার বিশ্বাস কর। আমি এবার মাথায় চোট পেয়ে নয়। না খেতে পেয়েই নির্ঘাত মরে যাব। আমি এক্সিডেন্ট হওয়ার আগেও পুরো দুই বেলা কিচ্ছু খাইনি। বিশ্বাস না হলে ওই অনন্তকে জিজ্ঞেস কর। শুধু সিগারেট খেয়েছিলাম। তাও মাত্র দুটো।”
কাব্যর ভ্রু দুটো কুঁচকে এক হয়ে গেল, “তুই আজকাল সিগারেটও খাস? আর কোনো কুকর্ম করতে তোর বাকি আছে শুনি? নাকি জীবনের সব কয়টা কোটা ইতোমধ্যে পূরণ করে ফেলেছিস?”
কলরব নিজের বালিশে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“শুধু একটা খু*ন করা বাকি আছে। আর সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটা তোকে দিয়েই পূরণ করব। আমাকে শুধু একবার সুস্থ হয়ে এই বিছানা থেকে নামতে দে খালি! আমার এই অবশ শরীরের ওপর করা তোর প্রতিটা অত্যাচারের চরম মূল্য দিতে হবে তোকে। দেখে নিস।”
আচমকা কেবিনের দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকল নিযানা। কিন্তু ভেতরে একসাথে এতগুলো মানুষের ভিড় দেখে সে দরজার মুখেই কিছুটা থমত খেয়ে গেল। থমকে গেল তার পায়ের গতি। সারারাত এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি মেয়েটার। সকাল সকালই হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চেয়েছিল ও। কিন্তু নওয়াজ চৌধুরী আর আনতাসা ছাড়া একা একা তো আর আসা সম্ভব ছিল না। তাই ওনাদের তৈরি হওয়ার অপেক্ষাতেই মূলত এতখানি দেরি হয়ে গেল। নিযানা একরাশ জড়তা নিয়ে দরজার এককোণে চুপচাপ জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো অবাধ্যের মতো বিছানায় শুয়ে থাকা কলরবকে খুঁজছিল। ঠিক তখনই নিযানার পেছন থেকে নওয়াজ চৌধুরীকে কেবিনে প্রবেশ করতে দেখে কাব্য বিনীতভাবে এগিয়ে গেল। মৃদু হেসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, ফুপা। কেমন আছেন আপনি?”
নওয়াজ চৌধুরী অত্যন্ত গম্ভীর ও ধীরস্থির মুখে সালামের জবাব দিলেন। তারপর ভারী কদমে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করলেন। নওয়াজ চৌধুরীর চেনা কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছানো মাত্রই ওদিকে বিছানায় শুয়ে থাকা কলরব এক মুহুর্তেই নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। মনে হলো, সে যেন এক্কেবারে অচেতন। গভীর কোমায় তলিয়ে থাকা কোনো রুগী! তার এই গিরগিটির মতো রঙ বদলানো আর নিখুঁত অভিনয়ের কায়দা দেখে এককোণে থাকা কায়েফ নিজের ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল। তার হাতে তখনো মোবাইল ফোনটা ধরা। নওয়াজ চৌধুরীকে জায়গা করে দিতে অভিক, শান্ত আর অনন্তরা একে একে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। আনতাসা কিছুটা চিন্তিত মুখে কাব্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ও এখন কেমন আছে?”
কাব্য আশ্বস্ত করে মাথা নেড়ে বলল, “আগের চেয়ে এখন অনেকটাই ভালো, ফুপি। আলহামদুলিল্লাহ। ভয়ের কিছু নেই। আপনারা বসুন। কথা বলুন। আমি একটু আসছি। একটু বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হওয়া দরকার।”
কাব্য কেবিন থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াল। দরজার মুখে নিযানাকে ওভাবে পাথরের মতো থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে যাওয়ার আগে নিচু স্বরে অভয় দিয়ে বলল,
“এত চিন্তার কিছু নেই রে। ভেতরে যা। ও ঠিক আছে।”
কাব্য করিডোর ধরে চলে গেল। নিযানা তখন এক বুক দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে ধীর পায়ে কেবিনের ভেতরে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। নওয়াজ চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে কলরবের বিছানার পাশের খালি চেয়ারটায় বসলেন। কলরবের জ্ঞান আছে বুঝতে পেরে তিনি ডাকলেন,
“কলরব, শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?”
সোজা হয়ে বসা নওয়াজ চৌধুরীর ডাক শুনে কলরব মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো। তবে এই লোকটা অন্তত তার ফুপি অলেখার মতো অতটা তপ্ত বা কড়া মেজাজের নয়। স্বভাবটা বেশ মার্জিত। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলরব খুব ধীরে ধীরে। যেন বড্ড কষ্ট হচ্ছে এমন একটা ভান করে চোখ মেলল। অত্যন্ত দুর্বল ও মৃদু গলায় বলল,
“জি… আসসালামু আলাইকুম, ফুপা।”
নওয়াজ চৌধুরী ভদ্রতার সাথে সালামের জবাব দিলেন। এর মাঝেই আনতাসা এগিয়ে গিয়ে কলরবের মাথার কাছে বসলেন। কায়েফও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন মনে করল না। সেও আলতো পায়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কায়েফকে চলে যেতে দেখে কলরবের মনে মনে ইচ্ছা করল এক চিৎকার দিয়ে ওকে আটকে রাখতে। এই চরম অস্বস্তিকর নাটকের মঞ্চে তাকে এভাবে একা ফেলে সবাই কোন সাহসে কেটে পড়ছে। তা ভেবে তার মেজাজটা চড়তে লাগল। আনতাসা কলরবের ব্যান্ডেজ করা মাথার একপাশে আলতো করে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত মায়াবী গলায় বললেন,
“মাথায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো, আব্বু?”
“জি না ফুপি। এখন ঠিক আছে।”
“যাক আলহামদুলিল্লাহ! ভাগ্য সত্যিই বড্ড ভালো যে আল্লাহ সহায় ছিলেন। এত বড় অ্যাক্সিডেন্ট। ভাবা যায় না!”
কলরব কৃত্রিমভাবে ঠোঁট দুটো সামান্য প্রসারিত করে জোরপূর্বক একটু হাসার চেষ্টা করল। তবে এতক্ষণের পুরো কথোপকথনের মাঝে সে কিন্তু একবারের জন্যও নিযানার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। মেয়েটার উপস্থিতি সে লক্ষ্যই করেনি। অথচ নিযানা দরজার এককোণে দাঁড়িয়ে নিখুঁতভাবে দেখছিল তাকে। সেই এলোমেলো চুলে ভরা কলরবের সাথে আজকের এই ব্যান্ডেজ জড়ানো। অসহায় কলরবের রূপটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছিল ওর চোখে। কাল দুপুর থেকে এই সামান্য দৃশ্যটুকু দেখার জন্যই তো তার অবুঝ মনটা অস্থিরতায় ছটফট করছিল! আজ চোখের সামনে ওকে জ্যান্ত, সুস্থ দেখে বুকের ভেতরের শান্ত হলো। একটা স্বস্তি নেমে এলো তার মনে। নিযানা নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা এক ফোঁটা নোনা জল সবার অলক্ষ্যে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে ফেলল। আনতাসা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে নিযানাকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন,
“নিযানা! তুই ওইখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আয়। কলরবের কাছে এসে বোস। হাসপাতালে আসার জন্য তো সকাল থেকে তুই-ই সবচেয়ে বেশি অস্থির হচ্ছিস। এমনকি কাল রাতেও তো এখান থেকে কোনোভাবেই বাসায় যেতে চাইছিলি না!”
মায়ের এই আকস্মিক ফাসঁ করে দেওয়া সত্যটুকু শুনে নিযানা যেন লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় এক নিমেষে মাটির সাথে মিশে গেল। ওদিকে বিছানায় শুয়ে থাকা কলরবের বন্ধ হতে যাওয়া চোখ দুটো চট করে আবার পুরোপুরি খুলে গেল। কলরব ব্যান্ডেজ জড়ানো মাথাটা অনেক কষ্টে সামান্য ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে নিযানা তখনো নত মস্তকে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে আনতাসা আর নওয়াজ চৌধুরীর কেবিন থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। যাওয়ার সময় নিযানার পিঠে আলতো হাত রেখে আনতাসা বললেন,
“তুই ওর সাথে কথা বলে আয়। আমরা আছি। একসাথেই বাড়ি ফিরব।”
নিযানা কোনো শব্দ না করে কেবল মাথা নাড়ল। এই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা দড়দড় করে কাঁপছে। ও কী বলবে, কীভাবে কথা শুরু করবে, কিছুই মাথা খাটানো যাচ্ছে না। কাল রাত থেকে জমে থাকা সবটুকু ব্যাকুলতা ছাপিয়ে আজকে কেন যেন বড্ড লজ্জা আর আড়ষ্টতা এসে ভর করেছে তার ওপর। হালকা চোখ তুলতেই দেখল। কলরব তার দিকেই একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কিন্তু নিযানা তাকাতেই কলরব ঝট করে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। অত্যন্ত উদাসীন গলায় বলল,
“কারও যদি এখানে কিছু বলার না থাকে। তবে সে সসম্মানে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। দরজা ওইদিকে খোলা আছে। আমার ক্লান্তি লাগছে। আমি এখন ঘুমাব।”
নিযানা চকিত চোখে তাকাল তার দিকে। ছেলেটার রুক্ষ কণ্ঠটা বুকে গিয়ে বিঁধল ওর। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। তারপর কলরবের বিছানার পাশে রাখা খালি চেয়ারটায় সশব্দে বসল। নিজের ভেতরের উদগ্রীব ভাবটা আড়াল করতে উল্টো খোঁচা দিয়ে বলল,
“মরতে চাইলে তো দুনিয়ায় আরও অনেক সহজ উপায় ছিল। এই মাঝরাতে বাইক নিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করাটা কি একটু বেশিই কষ্টকর হয়ে গেল না? আর এত কষ্ট করে কাজের কাজ তো কিছুই হলো না!”
কলরব এবার পুরো চোখ ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে চাইল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুই যে মনে মনে আমার মরার অপেক্ষা করছিলিস। তা আমি খুব ভালো করেই জানি। এই জন্য তো মৃত্যুর একদম অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত গিয়েও আবার ফিরে এসেছি। তোর মতো মানুষদের একটা চরম সারপ্রাইজ দিতে!”
“তুমি এক আস্ত সবজান্তা। তাই না?”
“অবশ্যই! অন্তত তোর চেয়ে তো বেশিই জানি।”
“কচু জানো তুমি!”
নিযানা রাগ দেখানোর চেষ্টা করলেও তার কণ্ঠস্বর বুজে এলো। এরপর বেশ কিছুক্ষণ কেবিনের ভেতর এক জমাট নীরবতা নেমে এলো। অনেক কথা, অনেক জমাট অভিমান আর অনুশোচনা দুজনেরই ঠোঁটের আগায় এসে থমকে যাচ্ছে কিন্তু কেউই তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারছে না। অবশেষে এই নিস্তব্ধতার দেওয়ালটা ভাঙল কলরব নিজেই। সে চোখ না ফিরিয়েই নিচু স্বরে সুধাল,
“তুই… তুই কালকে সত্যি এসেছিলিস?”
নিযানা আলতো করে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। কলরব পুনরায় ক্ষোভের সুরে বলে উঠল,
“এসেছিলিস আবার চলেও গেলি? আমাকে ওভাবে মরণ-যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেও? সারারাত বাড়িতে গিয়ে শান্তির ঘুম দিয়ে। এখন সকাল নয়টা বাজে হেলতে-দুলতে আসার তো কোনো দরকার ছিল না! একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ওভাবে হাসপাতালের ওটি বেডে ফেলে তুই কীভাবে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারলি নিযানা? হৃদয় বলতে কিচ্ছু নেই তোর মাঝে?”
নিযানার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান ও ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। খুব নরম গলায় বলল,
“তুমি কি সত্যিই আশা করেছিলে যে আমি কাল রাতে সব ছেড়ে এখানে তোমার পাশে বসে থাকি?”
“এখানে আশা-নিরাশার কী আছে? যদি কোনো রাস্তার সাধারণ পথচারীও আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে হাসপাতালে আনত। সেও কি ওভাবে ফেলে চলে যেতে পারত? মানবতা বা সহানুভূতি বলেও তো একটা জিনিস দুনিয়ায় আছে, নাকি?”
নিযানা দেখল কলরবের ফ্যাকাশে কপালে হালকা ঘাম জমছে। সে পরিস্থিতি শান্ত করতে বলল,
“ঝগড়া করার জন্য কিন্তু এটা একদম ঠিক জায়গা নয়। আর বেশি কথা বোলো না তো। মাথায় আবার যন্ত্রণা শুরু হবে।”
“আসলেই আর কথা বলার বিন্দুমাত্র এনার্জি নেই আমার। কাব্য কে একটু ডাক তো। আমি ডান পা নাড়াতে পারছি না কেনো? অবশ হয়ে আছে।”
কলরবকে আসলেই চিন্তিত দেখালো। ওর অসহায়ত্ব দেখে নিযানার বুকের ভেতরটা মায়ায় একদম আর্দ্র হয়ে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আলতো গলায় বলল,
“আমি বাইরে গিয়ে ভাইয়ার সাথে কথা বলে দেখছি। তুমি একটু অপেক্ষা করো।”
নিযানা কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। বাইরের করিডোর থেকে যেন এক ঝড় বয়ে এনে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকল শান্ত আর অভিক। ওদের দুজনের চোখ-মুখের বিধ্বস্ত আর আতঙ্কিত অবস্থা দেখে কলরব বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“কী সমস্যা তোদের? বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো এমন মুখ করে ঘরে ঢুকছিস কেন?”
শান্ত কাচুমাচু মুখ করে বলল, “ভাই…!বড্ড বড় একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে! ওই ইরা আসছে হাসপাতালে। তোকে দেখতে!”
কথাটা শোনামাত্র কলরব বিছানায় শুয়েই যেন এক বৈদ্যুতিক শক খেল। তার এতক্ষণের অবশ শরীরেও যেন আতঙ্কের এক তীব্র স্রোত বয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে বলল,
“কী! ওরে খবর দিল কে? কোন শালা এই কাজটা করেছে?”
অভিক নিজের দুই হাত তুলে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলল,
এই অবেলায় পর্ব ৩৮
“বিশ্বাস কর দোস্ত। আমি এক ফোঁটাও মুখ খুলিনি। এই শান্ত হাভাতেটা বলেছে কি না, আমি জানি না!”
“কে বলেছে আর কে বলেনি। সেই হিসেব আমি পরে কড়ায়-গণ্ডায় চুকাব! তোরা আগে গিয়ে যেভাবে পারিস ওই ইরাকে আটকা! ও আমার অশান্তির সংসারে অলরেডি পেট্রোল ঢেলে দিয়েছে। এখন আগুন জ্বেলে ভস্ম করে দেবে! যা আটকা ওকে।”

গল্পটা খুব ভালো লাগছে ।
প্রথম প্রথম যখন পড়া শুরু করি তখন দেখতাম আপনি দিনে অনেক গুলো করে পর্ব দিচ্ছেন , কিন্তু এখন আর দিচ্ছেন না। তাই আপনার ওপর কিছুটা রাগ হচ্ছে । তো অনুরোধ রইলো যদি প্রতিদিন একটা করে পর্ব দেন । 🙏