Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২
লিজা মনি

গার্ডদের ফোন পেয়ে নিক পাগলের মত ছুঁটে আসে মিনারে। ত্রিশ কোটি টাকার মিটিং ক্যান্সেল করে দেয় যাস্ট একটা কথায়,
” বস, আপনার বোন গেইডের বাহিরে গিয়েছে আপনার মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু এখনও ফিরে আসছে না।
মিনারে এসে পাগল হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। আশে – পাশে রিদ্ধিমার কোনো চিহ্ন নেই । কিছু একটা ভেবে ভেতরে যায়। এনি বাচ্চাদের শরীর মুছে দিচ্ছে। এমন বেপোরোয়া আগমনে ঘাবরে যায় এনি। নিক কোনো দিকে না তাকিয়ে পাগলের মত খুঁজতে থাকে রুমের প্রতিটা কোণা। নিকের এমন পাগলাটা আচরন দেখে এনি জিজ্ঞাসা করে,
” কি হয়েছে? এমন রেগে আছেন কেনো? বলুন না কি হয়েছে? এরিকের পাপা, প্লিজ কিছু তো বলুন!
নিক এনির দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে উঠে,

” আমার মেয়ে কোথায়? আমার নিভ্রিতা কোথায়?ওকে রুমে নিয়ে আসে নি?
এনির পেট মুচড় দিয়ে উঠে ভয়ে। পুরো শরীর কেমন অসাড় হয়ে আসতে চাইছে অজানা আতঙ্কে। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,
” ক.. কি হয়েছে আমাদের মেয়ের? আপনি এমন করে কেনো বলছেন? ওকে তো রিদ্ধিমা নিয়ে গিয়েছে, পরে আর আসে নি। কি হয়েছে? কেনো এমন করছেন?
নিক আর দাঁড়ালো না এক মুহূর্তের জন্যে ও। রুম থেকে ছুটে বের হয়ে যায়। গার্ডের উদ্দেশ্যে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” কুত্তার বাচ্চারা, যেতে দিলি কেনো ওদের বাহিরে?
প্রতিটা গার্ড আতঙ্কে বরফের মত জমে যায়। সবার এক এক করে গর্দান যাবে তা সিউর। একজন কাঁপা গলায় কোনোরকম বলে,
” আমরা দিতে চাই নি বস। বললো আপনি সামনে আছেন, উনার বাবার সাথে দেখা করতে যাবে। আপনি আছেন ভেবে আমরা আটকানোর সাহস করতে পারিনি।
নিক ভাবলো না এতকিছু। খামছে ধরে নিজের চুল। হাতের রিভলভারটা সবার দিকে এক এক করে তাক করে গর্জে উঠে,

” পুরো শহর ব্লক করে দে। একটা গাড়িও যাতে বাহিরে যেতে না পারে। জঙ্গল, সমুদ্রে, স্থলপথ – আকাশ পথ সব জায়গায় লোক পাঠা।
ইফ এনিথিং হ্যাপেন্স টু দেম, দি এনটাইয়ার ফা*কিং সিটি উইল বি ডেস্ট্রয়েড। আমি আমার মেয়ে – বোনকে চাই।
আরিশ নিজেও দিশেহারা চিন্তায়। অধিরাজ গাড়িতে উঠতে উঠতে আরিশের উদ্দেশ্যে বলে,
” বস, রিদ্ধিমা ম্যাম মিথ্যে বলে কেনো বাহিরে গিয়েছে? শত্রুর হাত নিভ্রিতা মামুনিকে তুলে দেওয়ার পিছনে রিদ্ধিমার হাত নেই তো আবার? কেমন যেন ঘেটে যাচ্ছে!
” জানা নেই অধিরাজ। সব কেমন ধোঁয়াশা লাগছে। এই কয়দিনে রিদ্ধিমাকে দেখেছি আমরা। যথেষ্ট ভালো একটা মেয়ে। আমি যেন আমার ছোট মেহেরকে দেখেছি। এই মেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করবে কেমন যেন অবিশ্বাস লাগছে।
” ক্ষমতার জন্য মায়ের পেটে ও ছুঁরি চালানো যায় স্যার। আর এইটা তো ভাইয়ের মেয়ে।
আরিশ স্পূর্ণ নাঁখোজ করে বলে,
” না অধিরাজ, এমন কিছুই না। অনেক বড় চাল চালা হয়েছে। রিদ্ধিমাকে এই চালের গুঁটি করেছে। তার আগে গন্তব্যে পৌঁছায় আমরা।

আন্ডারগ্রাউন্ডের বেতাজ বাদশার কলিজায় হাত দিয়েছে শত্রুপক্ষ। সিংহকে খাঁচায় পুরে রাখার সাহস যারা দেখিয়েছে, তারা হয়তো ভুলে গেছে এই শহরের আসল মালিক কে। গ্যাংস্টার বসের একমাত্র আদুরে পুতুল, তার রাজকন্যাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবরটা ছড়াতেই পুরো শহরের বাতাস যেন এক লহমায় বিষাক্ত হয়ে উঠল। বসের এক লাইনের হুকুম ধেয়ে গেল আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে মূল শহরের বুকে,
“শহর ব্লক করে দাও। আমার মেয়েকে না পাওয়া পর্যন্ত একটা মাছিও যেন সীমানা পার হতে না পারে।”
আকাশপথ অবরুদ্ধ করা হয়।

​শহরের সাধারণ রাডার ব্যবস্থাকে এক ঝটকায় হ্যাক করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় বসের টেকনিক্যাল উইং। সাধারণ সমস্ত কমার্শিয়াল ফ্লাইটের উড্ডয়ন মাঝ আকাশেই থামিয়ে নিকটস্থ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়। আকাশ জুড়ে ডানা মেলে গ্যাংস্টার বসের নিজস্ব কালো রঙের প্রাইভেট জেট ও অত্যাধুনিক ড্রোন স্কোয়াড। রাতের আকাশ চিরে সার্চলাইটের তীব্র আলো প্রতিটি বহুতল ভবনের ছাদ, গলির মোড় আর ফাঁকা মাঠগুলোকে স্ক্যান করতে থাকে। কোনো জরুরি মেডিকেল হেলিকপ্টারও বসের এয়ার-পারমিট ছাড়া ওড়ার সাহস পাচ্ছিল না।
রাজপথ একদম নিথর। লেটপ্রুফ গাড়ির প্রাচীর।
​মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল লাল করে দেওয়া হয়। সমস্ত রাস্তা, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার আর টোল প্লাজা ব্লক করে দেয় বসের নিজস্ব প্রাইভেট আর্মি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে আড়াআড়িভাবে এসে দাঁড়ায় শত শত কালো রঙের বুলেটপ্রুফ সুভ (SUV)। প্রতিটি চেকপোস্টে ভারী অস্ত্র হাতে পাহারায় বসে যায় বসের বিশ্বস্ত শার্পশুটাররা। শহরের কোটি কোটি মানুষ গাড়ির ভেতরেই জিম্মি হয়ে পড়ে। রোগীর গাড়ি ছাড়া কোনো বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি বা ট্যাক্সি এক ইঞ্চি নড়ার ক্ষমতা হারায়। প্রতিটি গাড়ির কাচ নামিয়ে, বুট খুলে তল্লাশি চালানো হতে থাকে অবর্ণনীয় নির্মমতায়।

জলপথ অবরুদ্ধ করা হয়। হাউজবোট ও জাহাজের ওপর থাবা পড়ে। ​শত্রুরা যাতে জলপথ ব্যবহার করে সীমানা পার হতে না পারে সেজন্য নদী ও সমুদ্র বন্দরগুলোতে এক অভূতপূর্ব লকডাউন জারি করা হয়। নিকের নির্দেশে মাঝনদীতে নোঙর করা বিশাল বিশাল কার্গো জাহাজ এবং বিলাসবহুল ক্রুজ শিপগুলোর ইঞ্জিন রুম সিল করে দেওয়া হয়। স্পিডবোটে করে বসের সশস্ত্র ক্যাডাররা জল চিরে ছুটে বেড়াতে থাকে। নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রতিটি হাউজবোট, মাঝিদের সাধারণ নৌকা, এমনকি মাছ ধরার ট্রলারগুলোতেও চালানো হয় লঙ্কাকাণ্ড। অভিযান চালাতে না দিলে প্রতিটি কেবিনের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায় তল্লাশিকারীরা।

দৃশ্যমান যানবহনই নয়, ক্ষমতার দাপটে বন্ধ হয়ে যায় শহরের লোকাল ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে শুরু করে প্রতি বর্গকিলোমিটারের সিসিটিভি ফুটেজ লাইভ অ্যানালাইসিস করা হতে থাকে। বসের হাজার হাজার ইনফরমার, যারা সাধারণ মানুষের বেশে শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিল, তারা সশরীরে রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিটি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাং, ছোটখাটো মাফিয়া ডেরা আর চোরাকারবারিদের ডেরায় হানা দিয়ে নিকের লোকেরা স্পষ্ট বার্তা দেয়—”তথ্য দাও, নয়তো চিরতরে মুছে যাও।”
​পুরো শহরটা কেমন একটা বিশাল লোহার খাঁচায় পরিণত হয়ে যায়। যার চাবিটা এখন সেই উন্মাদ গ্যাংস্টার বসের হাতে। নিজের মেয়ের খোঁজে জল, স্থল আর আকাশ এক করে দেওয়া এই তাণ্ডব শহরের ইতিহাসে এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। নিক হিংস্র, নরপিশাচ, সবজির মত মানুষ কাটে সেটা সবাই শুনে এসেছে। কিন্তু প্রকাশ্যে এমন উন্মাদ গ্যাংস্টার বসকে কেউ কখনো দেখে নি। পুরো শহর আতঙ্কে জমে উঠেছে।
হিংস্রতার চরম মুহূর্তে নিকের ভেতরে এক অদ্ভুত পাগলামো ভর করে উঠে। হঠাৎ করেই সে নিজের ওয়ালেট বের করে। এখানে তাদের ফ্যামিলি ফটো রাখা। যেখানে সে আর এনি, সাথে তিন টা পৃথিবী। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিক নিস্তেজ হয়ে শরীর ছেড়ে দেয়।। নাক দিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়। আরিশ রুমাল দিয়ে নিককে শান্তনা দিয়ে বলে,

” নিক শান্ত হ। কায়াতের আস্তানা দ্রুত খুঁজে বের করব আমরা। তর মেয়েকে কিছু করতে পারবে না।
নিক শান্ত হওয়ার বদলে আরও হিংস্র আর ধ্বংসাত্নক হয়ে উঠছে। ইচ্ছে করছিলো সব ধ্বংস করে দিতে। বেপোরোয়া হয়ে উচ্চারন করে,
” কুত্তার বাচ্চাদের সহ্য হলো না আমার সুখ। আমাকে হারাতে আমার কলিজাকে গুঁটি বানিয়েছে। এনি ঠিক এই বলত আমি ওদের প্রটেক্ট করতে পারব না আজীবন। ঠিক তাই হলো, পারিনি। আমি পারিনি ওদের আগলে রাখতে। ঠিক হয় নি এক পাপিষ্ঠ ব্যাক্তির বাবা হওয়াটা। কারন পাপীরা নরকে বড় হয়, পবিত্র কিছু আসলে নরকের অপবিত্রতায় ঝলসে যায় সব কিছু। আমার মেয়েটা ঝলসে যাচ্ছে। পাপীরা কখনো সন্তান সুখ লাভ করতে পারে না। আমার মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে।
চুল খামছে ধরে গ্যাংস্টার বস। আরিশ মলিন গলায় বলে,
” তুই বেস্ট বাবা নিক! আমরা ছোট সোনাকে পেয়ে যাব। গ্যাংস্টার বস তো ভেঙ্গে পড়ে না। তকে আজ অনেক বিধ্বস্ত লাগছে। কাম ডাউন অ্যান্ড রিটার্ন টু ইয়োর ফেরোশাস ফর্ম, ফেস দ্য এনিমিজ।
নিক হিংস্রতার মধ্যেও অদ্ভুত গলায় বলে,

” কিছু ঘন্টা আগেও ওর কপালে চুমু খেয়েছি আরিশ। আমি পাপ করেছি জীবনে, অনেক শিশুকে বলি দিয়েছি। খোদাকে বল না সমস্ত পাপের শাস্তি যাতে আমাকে দেয়। আমাকে একদম ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমার ফুলটাকে যাতে কষ্ট না দেয়। আমার তো এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ নেই। একটু
বাঁচতে চাই। ওদেরকে নিয়ে জীবন পার করতে চাই। নিশ্চই অনেক কান্না করছে, অন্ধকারে রেখে দিয়েছে!
কিন্তু পরক্ষণেই তার চাউনি আরও দশগুণ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। নিজের বডিগার্ডের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে,
“শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দাও। পুরো শহর অন্ধকারে ডুবিয়ে দাও। শহর আলোতে লুকিয়ে থাকবে আর আমার মেয়ে অন্ধকারে কষ্ট পাবে, তা হবে না। অন্ধকারে খুঁজে বের করো ওদের!”

গার্ড, অধিরাজ অসহায় চোখে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশ ইশারা দিয়ে বলে তাই করতে। আপাতত গ্যাংস্টার বস পাষন্ড খেলায় নেমেছে। যা বলা হয়েছে তাই করো, নয়ত জীবন হারাবে।
গার্ড অত্যন্ত অসহায় ও দ্বিধাগ্রস্ত চোখে তাকায় আরিশের দিকে। তার সেই চাউনিতে ছিল এক নীরব আকুতি। আরিশ তখন সামান্য ইশারায় তাকে নির্দেশ দিল আদেশটি মেনে নিতেই। এই মুহূর্তে সেই নিষ্ঠুর গ্যাংস্টার প্রধান এক ভয়ানক ও নির্মম খেলায় মেতে উঠেছে, যেখানে দয়া বা সহানুভূতির কোনো স্থান নেই। এখন যুক্তি বা প্রতিবাদের সময় নয়; যা বলা হয়েছে, ঠিক তা-ই পালন করা একমাত্র পথ। এই আদেশের সামান্যতম অবাধ্যতা বা বিচ্যুতির অর্থই হলো নিশ্চিত মৃত্যু। বেঁচে থাকার আর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প তাদের সামনে খোলা নেই। নিক গাড়িতে উঠতেই একটা মেসেজ আসে,
” বস কায়াতের লোকেশন পাওয়া গিয়েছে। পুরাতন সেই বাগান বাড়ির পাশে।
নিকের পুরো শরীর আচমকা কেঁপে উঠল। তার হাত-পা তখন অসম্ভব রকম কাঁপছে। এত বড় ক্ষমতাধর একজন গ্যাংস্টার বসের গলা যেন ভয়ে আর আতঙ্কে পুরোপুরি শুকিয়ে এসেছে। নিজের ভেতরের চরম দুর্বলতাটুকু আড়াল করার নিষ্ফল চেষ্টা করে, কোনো রকমে ভাঙা ও জড়ানো গলায় ভয়েস দেয়,
” কায়াতের ছেলেকে তুলে নিয়ে আয়। আ লাইফ উইল বি টেকেন ফর আ লাইফ, অ্যান্ড আ উন্ড ফর আ উন্ড।

একটা কাচের বক্সের ভেতরে বন্ধী এক অবরুদ্ধ রাজকন্যা,। যার ধমনীতে বইছে আন্ডারগ্রাউন্ডের সবচেয়ে ক্ষমতাধর টেরোরিস্টের রক্ত। যাদের স্পর্শে এক মনস্টারের শরীর কাঁপে প্রতিবার। সাম্রাজ্যের অহংকার আজ এক সংকীর্ণ কাচের বাক্সে বন্দি,।
​যাকে আগলে রাখার জন্য পুরো শহর ধ্বংস করে দিতে পারত গ্যাংস্টার বস। সেই আদুরে পুতুলটি আজ কাচের দেয়ালের ওপারে নিষ্প্রাণ, নিস্তেজ। কোনো এক অদৃশ্য ঝড়ের আঘাতে ডানা ভেঙে পড়ে থাকা পাখির মতো। দবদববে ফর্সা শরীর, কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছ্ব। ক্ষমতা আর রক্তের উপার্জনে তৈরি রাজপ্রাসাদও আজ তাকে আড়াল করতে পারল না। কাচের বাক্সে বন্দি পুতুলটার দিকে তাকালে বুকটা মুচড়ে ওঠে।কেমন নিথর, কেমন অসহায়! যেন এক জীবন্ত পুতুলকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নির্মম কোনো প্রদর্শনীর জন্য। চলবে ভয়ানক এক পাশবিক নির্যাতন!

মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রিদ্ধিমা। চারপাশের নোংরা আর জমাট বাঁধা রক্তের দাগ তার শরীরের চামড়ায় মিশে গেছে। গায়ের ওড়নাটা কোথায় অবহেলার মতো ছিটকে পড়েছে, তার কোনো হদিস নেই। বিবসনা প্রায় সেই শরীরে ফুটে উঠেছে নারীত্বের প্রতিটি ভাঁজ। যা এই নরকের অন্ধকারে আরও বেশি স্পষ্ট।আরও বেশি অরক্ষিত।
​চারপাশে ক্ষুধার্ত শকুনের মতো একদল হিংস্র চোখ অপলক তাকিয়ে আছে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে পবিত্রতকে জীবন্ত গিলে খাচ্ছে তার অসাড় অবয়ব। হাত-পা শক্ত দড়িতে বাঁধা।নড়ার কোনো উপায় নেই। তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও রিদ্ধিমা কোনোরকম চোখের পাতা দুটো একটু ফাঁক করে পিটপিট করে তাকায়। কিন্তু সেই আধবোজা দৃষ্টিতে এখন কেবলই এক দিশেহারা অসহায়ত্ব আর নিস্তেজ আত্মসমর্পণ।
চোখের পাতা দুটো একটু নড়তেই চারপাশের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তিরের মতো এসে বিঁধে রিদ্ধিমার মগজে। মুহূর্তেই অবশ শরীরটা তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠে। মনে পড়ে যায় সেই অভিশপ্ত মুহূর্তের কথা—যে এড্রিকে সে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিল, সে-ই কেমন অবলীলায় তাকে নরকের দরজায় এনে দাঁড় করাল। ছলনা করে বাইরে বের করে এনেই রিদ্ধিমার মুখে স্প্রে করে দিয়েছিল কিছু একটা। তারপর… তারপর চারপাশটা যখন আঁধার হয়ে এসেছিলো। ঠিক তখনই কেউ একজন তার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার কলিজার টুকরোটাকে, নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে!

​কথাটা মনে হতেই রিদ্ধিমার বুকটা এক তীব্র আতঙ্কে কেঁপে উঠে । এক অবর্ণনীয় হাহাকার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠতেই সে দিশেহারা হয়ে চারপাশে তাকায়।হাতের বাঁধনটা খোলার জন্য নোংরা, রক্তমাখা মেঝেতেই ছটফট করতে থাকে। বুক চেরা আর্তনাদগুলো গোঙানি হয়ে আসে।
​রিদ্ধিমা ভয় নিয়ে চারপাশে তাকায়। একঝাঁক বিশালদেহী লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। তখন ভয়ে হাড় পর্যন্ত জমে হিম হয়ে যায় রিদ্ধিমার। ওই রক্তপিপাসু দানবদের লোলুপ চাউনি গা ছমছম করে উঠে।
রিদ্ধিমা চোখ ঘুরিয়ে সামনে তালাতেই আত্না কেঁপে উঠে। ছোট্ট প্রানটাকে কেমন অবহেলার মত করে কাচের ভেতরে রাখা হয়েছে।
কায়াত এতক্ষন সিগারেট খাচ্ছিলো আর রিদ্ধিমাকে পরখ করছিলো। সে জানতে পেরেছে এই মেয়ে নিকের আপন বোন। কায়াত যেন আজ খুব উত্তেজিত।।তার পৌরুষ আজ নিকের বোনের উপর ঢালবে ভাবতেই বাঁকা হাসে। একদিকে মেয়ে অন্যদিকে বোন, দুইজনকে হারিয়ে গ্যাংস্টার বস দিশেহারা হয়ে উঠবে। তিলে – তিলে মারব কুত্তার বাচ্চাকে!

কায়াত সিগারেট ফেলে ছটফট আর চেঁচাতে থাকা রিদ্ধিমার দিকে যায়। রিদ্ধিমা কায়াতকে দেখে ভয় পেলো না। তবে এতটুকু বুঝেছে এই লোক এই মাষ্টার মাইন্ডের গুরু!
রিদ্ধিমা কায়াতের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে,
” কে তুমি? কেনো নিয়ে এসেছো আমাদের? কিসের শত্রুতা আমাদের সাথে?
কায়াত কান চেপে ধরার মিথ্যে অভিনয় করে বলে,
” মেয়ে মানুষের গলার এত পাওয়ার না জানি শরীর কত পাওয়ার হবে!
কথাটা বলে কায়াত বাঁকা হাসে। রিদ্ধিকা ঘৃনায় ইচ্ছে করছিলো কায়াতের নাকে- মুখে থুঁ -থু দিতে। কায়াত নিশ্বাস ছেড়ে রিদ্ধিমার মুখোমুখী হয়ে বসে। কেমন জঘন্য দৃষ্টি দিয়ে বলে,
” সুন্দরী মেয়েদের কথার উত্তর দিতে হয়। তাই আমি ও দিচ্ছি। আমি কায়াত আর্ণি ! গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের জন্মের শত্রু। আর শত্রুর কাজ শত্রুকে পরাজিত করা। কি হবে যখন তোমাকে ছিঁড়ে খাব? আর তার মেয়েকে ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করব?
রিদ্ধিমার শরীর কাটা দিয়ে উঠে। নিজের কথা ভুলে যায় এক মুহূর্তের জন্য। নিজের ভাইয়ের প্রানটাকে বাঁচানোর জন্য কেঁদে উঠে,

” প্লিজ ওকে কিছু করো না। যা করার আমার সাথে করো। আমার জীবন – ইজ্জত সব বিলিয়ে দিলাম তোমাদের কাছে। মেরে দাও আমাকে। ওই নিষ্পাপ ফুলটাকে কিছু করো না। ওর কিছু হলে আমার ভাই বাঁচবে না। একটা পশুকে আঘাত করে আর পশু হতে দিও। রহম করো, প্লিজ ছেড়ে দাও!
রিদ্ধিমার আকুতি আর আহাজারি যেন কায়াতের মনের প্রশান্তি। কায়াত রিদ্ধিমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হুট করে পৈশাচিক ভাবে হেসে উঠে। বসা থেকে উঠে সব গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলে,
” সবাই তাকিয়ে দেখ, গ্যাংস্টার বসের একমাত্র বোন তার শত্রুর কাছে প্রান ভিক্ষে চাইছে। নিজের ইজ্জত বিলিয়ে দিতে চাইছে। এত সুন্দর দৃশ্য তরা ভুলে ও যেন কেউ মিস করিস না। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখ এই শালীকে!
হাসির মধ্যেই কায়াতের কন্ঠ শক্ত হয়ে আসে। চেপে ধরে রিদ্ধিমার চুলের মুঠি। রিদ্ধিমার চোখে অশ্রু। কায়াত মুঠি শক্তভাবে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে
” তকে তো অবশ্যই খাব, আমার পর এখানে থাকা প্রতিটা পুরুষ ভোগ করবে। যদি তাও না মরিস তবে ছুঁড়ি দিয়ে কেটে টুকরো- টুকরো করব। তর ভাই আসছে। তার আগে তর ভইয়ের মেয়েটাকে একটু জ্বালিয়ে আসি। আঘাত করতে মজা পাব বেশ।
রিদ্ধিমার চুলের মুঠে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় কায়াত। রিদ্ধিমা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠে,

” আল্লাহক ভয় কর কায়াত। ওই নিষ্পাপ ফুলটাকে আঘাত করলে ধ্বংস হয়ে পড়বি।
কায়াত ঘাড় ঘুরায়। সামান্য বাঁকা হেসে বলে,
” যেখানে আল্লাহকে মানি না সেখানে ভয় পাব কিভাবে? আমি হলাম বাদশাহ! আর আমাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা কারোর নেই।
রিদ্ধিমা স্তব্দ হয়ে যায়। এই তো কাফিরের থেকেও জঘন্য। কায়াত এগিয়ে গিয়ে কাচের ঢাকনা খুলে ফেলে। পকেট থেকে ছোট্ট একটা নাইফ বের করে। রিদ্ধিমা এইটা দেখে পাগলের মত কান্না করে উঠে,
” প্লিজ না, এমন করো না। ও অনেক ব্যাথা পাবে। কায়াত এমন করিস না। আমাকে আঘাত কর বেশি করে। ওর শরীরে আঘাত লাগলে তুই বাঁচতে পারবি না।
কায়াত এতেও থেমে যায় নি। রিদ্ধিমা পাগলের মত ছটফট করে যাচ্ছে। বাঁধা স্থান গুলো কেটে গিয়ে
রক্ত বের হচ্ছে টগবগিয়ে। কিন্তু এইদিকে তার খেয়াল নেই। রমনী দিশেহারা হয়ে না করে যাচ্ছে। হুট করেই বলে উঠে,

” কুত্তার বাচ্চা, ভুলে যাচ্ছিস তুই আন্ডারগ্রাউন্ডের সব থেকে ক্ষমতাধর হিংস্র পুরুষটার ছোট্ট ফুলকে তুলে এনেছিস। সে আসতে পারলে তকে কাচা চিবিয়ে খাবে। সামনা – সামনি লড়াই করার ক্ষমতা নেই তাই আড়ালে করছিস? সাহস থাকলে আমার ভাই আসার অপেক্ষা কর। লুজার!
কায়াত রক্তলাল অশুভ দৃষ্টিতে তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। রিদ্ধিমার চোখ- মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। কায়াত ছুঁরিটা ফেলে দিয়ে পশুর মত ছুঁটে আসে রিদ্ধিমার দিকে। নিজের সব শক্তি দিয়ে থাপ্পর মেরে বসে এর গালে। একের পর এক শক্ত থাপ্পরে রিদ্ধিমার জীবন বের হয়ে আসার উপক্রম। কেউ কোনোদিন ফুলের টুকা অব্দি দেয় নি শরীরে। আজ এক পিশাচের হাতে এইভাবে নির্যাতিত হবে কল্পনা ও করে নি। সব ওর দোষ। ইচ্ছে করছে প্রান ত্যাগ করতে। জীবন নিয়ে নিকের সামনে দাড়ানোর মত সাহস তার নেই। কায়াত না মারলেও নিক মেরে ফেলবে এইটা সিউর। জেনে হোক বা না জেনে, আজ এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী একমাত্র সে। যদি এড্রিকে বিশ্বাস করে বের না হত তবে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হত না। সব তার দোষ! মৃত্যু এমনিতেও তার ভাগ্যে লেখা হয়ে গিয়েছে হয়ত। কিন্তু সব কিছুর উর্ধ্বে নিজের জীবন দিয়ে হলেও বাচ্চাটাকে বাঁচাতে চায় সে।
প্রায় দশটা থাপ্পর মেরে কায়াত থামে। রিদ্ধিমার নাক- মুখ ফেঁটে রক্ত বের হচ্ছে। তাকাতে পারছে না মেয়েটা। ও ইচ্ছে করেই কায়াতকে লুজার বলে রাগিয়েছে। এতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও কায়াতের মনযোগ তার দিকে থাকবে। কায়াত চিৎকার করে গর্জে উঠে,

” মাগী তর ভাইকে চ******! সামনে লড়াই করব, তর সামনে। তর ভাইয়ের সামনে তকে ছিঁড়ে খাব। বাচ্চাটাকে ফুটন্ত তেলে ভাজব। দেখব তর ভাইয়ের কত ক্ষমতা! ওই শুয়রের বাচ্চা আমার পায়ের কাছে বসে মিনতি করবে দেখে নিস।
রিদ্ধিমা নিভু – নিভু চোখে তাকায়। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” তর ধ্বংস দেখব এইটা বললি না কেনো?
কায়াতের মেজাজ আরও বেড়ে যায়। পাশে থাকা চাবুকটা দিয়ে রিদ্ধিমার নরম শরীরে আঘাত করে। রিদ্ধিমা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার দিয়ে উঠে। এতে যেন কায়াত আর ও পৈশাচিক আনন্দ পায়। রিদ্ধিমার হাতের বাঁধন খুলে দেয় যাতে ভালোভাবে আঘাত করতে পারে। পরের আঘাতটা একদম রিদ্ধিমার বুক বরাবর দেয়। মনে হচ্ছিলো মৃত্যু ও এর থেকে সুখকর, আরামদায়ক! কায়াত একের পর এক চাবুক দিয়ে আঘাত করেই যাচ্ছে। রিদ্ধিমার গলা ফাটানো চিৎকারে কেঁপে উঠছে প্রতিটা দেয়াল। শরীরে জামাটা ছিঁড়ে যায় আঘাতের কারনে। ফর্সা শরীরটা রক্তে লাল হয়ে উঠে। নাক- মুখ কেমন বিকৃত হয়ে গিয়েছে আঘাতের জন্য। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে বিরবির করে কেঁদে উঠে,

” প্লিজ গ্যাংস্টার বস কাম ব্যাক কুইকলি। প্লিজ কাম লাইক সুপারম্যান ফাস্ট। নিজের প্রানকে বাঁচাও ভাইয়া। তোমার নিভ্রিতা তোমার অপেক্ষায় কাঁদছে। ওরা বাজে কিছু করার আগে চলে আসো। শত্রুদের এমন আঘাত করো যেন কেউ দেখলে ভয়ে শিউরে উঠে।
রিদ্ধিমা কথাগুলো বিরবির করতে করতে নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ে। কায়াত এরপর ও থেমে যায়। নি। চাবুক দিয়ে রাগে উন্মাদের মত আঘাত করে আছে। মরে গিয়েছে নাকি বেঁচে আছে জানা নেই।
কায়াতের এসিস্ট্যান্ট পিকো এসে বলে,
” বস হয়ত মরে গিয়েছে। নয়ত অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। ছেড়ে দিন এইটাকে।
কায়াত থেমে কপালের ঘাম মুছে চাবুকটাকে মেঝেতে আছড়ে ফেলে। রিদ্ধিমাকে লাথি মেরে দাঁত পিষে বিশ্রি গালি দিয়ে বলে,
” মরে গেলে হবে না। এই শালী তরতাজা মাল। যত খাব তত তৃপ্তি আসবে। রেখে দে এইটাকে। আগে ওই নিকের মোকাবেলা করি।

সব গার্ড যখন নিভৃতাকে খুঁজে বের করার তীব্র ব্যস্ততায় চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিল ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তেই মিনারের চারপাশে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। নিকের ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা সবাই। নিকের এক – একটা হুংকার আর হিংস্রতায় কাঁপছে. মেয়ে হারিয়ে এই যেন আন্ডারগ্রাউন্ডের আলাদা এক মনস্টার। মিনারের চারপাশ নিস্তব্দ। সেই নীরবতার আড়ালেই সবার দৃষ্টি এড়িয়ে মিনারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কালো পোশাকে আবৃত দুই বিশালদেহী সন্ত্রাসী। একদম আচমকা ঘটে যায় এই ঘটনা। সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবছে। ঘাতকদের পদচারণা ছিল নিঃশব্দ। ভয়াবহ উপস্থিতিতে চারপাশ কেমন ছমছমে হয়ে উঠেছে।দুইজনের হাতে ঝলসে উঠছিল ধারালো ছুরি। ক্ষীণ আলোয় যার শীতল ফলক মৃত্যুর অশুভ বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। দুইজনের চেহারায় রুক্ষ মুখাবয়ব। কেমন হিংস্র দৃষ্টি দিয়ে চোখ বুলাচ্ছে চারদিকে। জিতে যাওয়ার এক বিকৃত হাসি। হাসি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, এক ঝলক দেখলেই যে কারও শরীর শীতল আতঙ্কে কেঁপে উঠতে বাধ্য। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের গভীর অতল থেকে উঠে আসা কোনো নির্মম দুঃস্বপ্ন।

মেয়ের শোকে এনি যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। । মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেউ ধারালো ছুরি চালিয়ে প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়টাকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। বিকেল পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে অথচ কোনো সংবাদ আসে নি। কাঁদতে- কাঁদতে চারবার জ্ঞান হারিয়েছে৷ শরীর একদম নাজুক হয়ে পড়েছে৷ বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ানোর মত পরিস্থিতি নেই তার কাছে। অপারক হয়ে নাজলী বহু কষ্টে ফিডিং করিয়েছে। এনি ইচ্ছে করছে বাহিরে গিয়ে নিজে খুঁজে আনতে৷ কোনো কিছু না ভেবে দরজার দিকে দৌঁড় লাগায়। এনিকে বাহিরে যেতে দেখে নাজলী ভয়ে আতকে উঠে। দ্রুত এনির বাহু ধরে আটকায়,
” এমন সময় কোথায় যাচ্ছিস তুই?
নাজলী জোর করে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,

” বাহিরে যাব আপা। প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে৷ আমি আমার মেয়েকে ঠিক খুঁজে আনব।
নাজলী এনির নিস্তেজ মুখের দিকে তাকিয়ে শান্তনা দিয়ে বলে,
” এত রাতে বের হয়ে নিজে আবার বিপদে পড়বি। ওরা সবাই খুঁজছে৷ নিক থাকতে তর ভয় কিসের এনি? ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ঠিক এনে দিবে তর বুকে।
এনি নাজলীর দিকে তাকিয়ে রেগে চেঁচিয়ে উঠে,
” এইসব ফা*কিং ক্ষমতা আমার প্রয়োজন নেই৷ এতক্ষন হয়ে গেলো অথচ কেউ খুঁজে পেলো না। কেমন ক্ষমতা এইটা? প্রয়োজন নেই আমার এইসব ক্ষমতার। যে ক্ষমতা আমার মেয়েটাকে এনে দিতে পারছে না।
কথা গুলো বলতে বলতে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠে,
” ভয়! শুধু ভয় নয় আমি মরণ যন্তনা অনুভব করছি৷ কত ঘন্টা হয়ে গেলো আমার মেয়েটা আমার বুকে নেই। কতক্ষণ হয়ে গেলো খিদার যন্ত্রনাতে নিশ্চই কেঁদে যাচ্ছে। ওকে খাইয়ে দিবে কে? কুত্তার বাচ্চারা নিশ্চই অভুক্ত রেখে দিয়েছে৷ ও তো দুধের বাচ্চা আপা। কিভাবে থাকবে?
নাজলীর বুকে মাথা এলিয়ে দেয়৷ নাজলী আগলে নিয়ে চোখের পানি মুছে বলে,

” স্টে কাম অ্যান্ড ট্রাস্ট নিক। প্রে টু গড মোর অফেন।
কিন্তু মায়ের মন কি আর মানে? মাতৃহৃদয়ের সেই অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। চোখের পানি শুকানোর নামই নিচ্ছে না এতক্ষণ ধরে কাঁদতে কাঁদতে তার চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ করেই এনি নাজলীর বুক থেকে মুখ তুলে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলে,
—“আমার মেয়ে…! আমার বাচ্চাটা কোথায়? কেউ আমাকে বলছে না কেন? কেউ কিছু লুকাচ্ছে না তো? আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও! ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না…!”
কান্না আর চিৎকারে এনির শরীর কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা সব যন্ত্রণা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে আসছে।
নাজলী নিজেও কেঁদে যাচ্ছে। বোনকে শান্তনা দিয়ে বলে,

” শান্ত হ। ভুলে যাবি না নিভ্রিতা কোনো সাধারন বাচ্চা নয়। যে গুন্ডারা তাকে গুম করে ফেলবে আর সেটা সহজে সবাই মেনে নিবে৷ সে আন্ডারগ্রাউন্ডের সব থেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তির অস্তিত্ব। তার ক্ষতি করা মানে শহরকে ধ্বংস করা।
এনির মন গললো না। কেনো জানি মনে হচ্ছে তার মেয়েটাকে ওরা খুব টর্চার করছে। কেমন উন্মাদের মত হয়ে বলে,
—“ অনেক সময় ক্ষমতা ও অসহায় হয়ে পড়ে বাস্তবতার কাছে। আপা, আমার বুকটা জ্বলে যাচ্ছে! আমার মনে হচ্ছে আমার কলিজাটা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে! আমি আর পারছি না আপা! আমি আর পারছি না! আমার মেয়েটা ভয় পাচ্ছে না তো আপা? ও কি আমাকে খুঁজছে? ও কি কাঁদছে? ও কি ‘মা’ বলে ডাকছে? আমি কেন ওর কাছে যেতে পারছি না? কেন?”
এনি পাগলের মত নিজের চুল খামছে ধরে। প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না তার কাছে। আর উত্তরহীন সেই শূন্যতাই যেন তাকে আরও বেশি পুড়িয়ে মারছিল।
এনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে৷ কান্নার মধ্যে এমন এক অসহায়তা ছিল, যা শুনলে যে কারও বুক কেঁপে উঠত।

—“আল্লাহ, আমার মেয়ের বদলে আমাকে নিয়ে যাও! আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও! আমি আমার জীবন দিয়ে দেব, তবু আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও! আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না…!”
চিৎকার করতে করতে হঠাৎ তার নিঃশ্বাস আটকে আসতে থাকে। বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। কান্নার চাপে তার পুরো শরীর কাঁপছিল। নাজলীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলতে লাগল,
—“আপা, আমার খুব ভয় করছে। আমার মনে হচ্ছে আমার মেয়ের কিছু হয়ে গেছে। কেন কেউ খবর দিচ্ছে না? কেন সবাই চুপ? আমি পাগল হয়ে যাব আপা! আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাব!”
নএমনভাবে কাঁদতে লাগল যেন তার বুকের ভেতরের সমস্ত ব্যথা, সমস্ত ভয়, সমস্ত মমতা অশ্রুর সঙ্গে বেরিয়ে আসছে। নাজলী নিরুপায় হয়ে বার বার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে৷ কেউ একজন ফোন করে বলুক বাচ্চাকে পেয়ে গিয়েছি। একদম সুস্থ, আমাদের সাথে আছে। এনির গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে।

—“আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও… শুধু একবার আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও…
নাজলী কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়া এনির মুখের অশ্রু মুছে দেওয়ার জন্য ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়৷ ঘরজুড়ে তখন এক বিষণ্ণ, ভারী নীরবতা৷ বাইরে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ পাথুরে তীরে আছড়ে পড়ে গম্ভীর গর্জন তুলছিল।
এনির বুক তখনও হাহাকারে কাঁপছে। সন্তানের চিন্তায় তার চোখ দুটি কান্নায় রক্তিম হয়ে উঠেছে। তার এলোমেলো চুল, ভেজা চোখ, এবং অসহায় মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যেন এসে তার হৃদয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
ঠিক সেই সময় একটি বিকট শব্দ পুরো মিনার কাঁপিয়ে দেয়।
ধাম!
প্রধান দরজাটি প্রচণ্ড শক্তিতে ভেতরের দিকে খুলে যায়। শব্দটি এত আকস্মিক ছিল যে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারে নি৷ নাজলী এবং এনি একসঙ্গে চমকে মাথা তুলে তাকায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন মুখোশধারী অচেনা মানুষ।
তাদের সমগ্র শরীর কালো পোশাকে আবৃত।

মুখ ঢেকে রাখা ভয়ংকর মুখোশের ফাঁক দিয়ে কেবল চোখ দুটো দেখা যায়। সেই চোখে ছিল এমন এক শীতল নিষ্ঠুরতা, যা মানুষের নয়—শিকার খুঁজতে বের হওয়া কোনো হিংস্র জন্তুর। হাতে ধরা আগ্নেয়াস্ত্র! এনি ছটফটিয়ে উঠে। দুই ঘাতকের মধ্যে একজন ধীরে ধীরে অস্ত্র তুলে ধরে
সরাসরি এনির দিকে। আঙুল একদম ট্রিগারের উপর স্থির। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে গুলি ছোড়ে না। বরং স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড…সময় যেন দীর্ঘ হতে থাকে। এনির চোখ তখনও অশ্রুসিক্ত। বেদনার ছাপ তার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট। কিন্তু সেই ভাঙাচোরা অবস্থাতেও তার সৌন্দর্য ছিল অস্বাভাবিক মোহময়।
কান্নাভেজা চোখের গভীরতা, কষ্টে কাঁপতে থাকা ঠোঁট, আর মাতৃত্বের অসহায় আর্তি মিশে তার চেহারাকে এমন এক মায়াময় রূপ দিয়েছিল, যা দেখে মুহূর্তের জন্য মানুষ নিজের বাস্তবতা ভুলে যেতে পারে। ঘাতকটির চোখে বিস্ময়ের ছায়া নেমে আসে। তারা যেন নিজেদের উদ্দেশ্যই ভুলে যায়।
মনে হয়েছিল তাদের সামনে কোনো সাধারণ নারী নয়, বরং অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অলৌকিক সৌন্দর্য। যার নাম উচ্চারণ করলেই ক্ষমতাবানদের হৃদয়ে আলোড়ন ওঠে।
যার জন্য এক ভয়ংকর গ্যাংস্টার বস উন্মাদের মতো পৃথিবী তছনছ করে বেড়াচ্ছে।যার রূপের গল্প ছড়িয়ে আছে সমুদ্র পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত।

ঘাতক দুইজন অন্যমনস্কের মতো তাকিয়ে থাকে।তাদের চোখের পলক পড়ে না। কোনো স্বপ্ন দেখছে।
এইদিকে এনি আর নাজলীর মনে তখন অন্য আতঙ্ক। ঘাতকদের দেখে তারা দুইজন এই হতভম্ভ। এই মিনারে সহজে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এইটা সৃষ্টি হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কেউ পারে নি। তবে আজ এই দুই ঘাতক কিভাবে প্রবেশ করলো? বাহিরের গার্ডরা কি করছে? এনি ফিসফিস করে কঁপা – কাঁপা গলায় আওড়ায়,
” কারা এরা আপা? কিভাবে প্রবেশ করলো এখানে? কি করব আমরা?
নাজলী নিজেও স্তব্দ। এক বিপদ সামাল দিতে না পেরে আরেক বিপদ হাজির!
” জানা নেই৷ কিন্তু ওরা শত্রুপক্ষের এইটা সিউর।ভয়ের কিছু নেই। শুধু বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে৷ নয়ত সবাইকে মরতে হবে।।

এনি শিউরে উঠে ভয়ে। হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকা প্রানদের কথা।
মুহূর্তের মধ্যে এনির বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে যায়।
মাতৃত্ব সমস্ত ভয়কে ছাপিয়ে ওঠে। সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়। তারপর প্রায় ছুটে যায় বারান্দার দিকে। দোলনায় শুয়ে থাকা শিশুরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুদ্রের বাতাসে দোলনাটি ধীরে ধীরে দুলছে। তাদের নিষ্পাপ মুখে শান্তির ছাপ।
তারা জানেই না, মৃত্যুর ছায়া কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শান্ত আর ঘুমন্ত দৃশ্য দেখে এনির বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখে নতুন করে অশ্রু জমে ওঠে। দুই – ছেলে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে কাঁপা গলায় উচ্চারন করে,
” বাবা – মা আমার। মাম্মাম প্রটেক্ট করব তোমাদের। ভয় নেই, একদম কাঁদবে না। মায়ের লক্ষী বাচ্চা হয়ে থাকবে কলিজা!

এনি কাঁপতে কাঁপতে বারান্দার দরজাটি বন্ধ করে দেয়।এরপর ধীরে ধীরে সে ফিরে আসে।
নাজলী ইতোমধ্যে টেবিলের উপর রাখা ফল কাটার ছুরিটি তুলে নিয়েছে। তার শরীর ভয়ে কাঁপছে।
হাত কাঁপছে। শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। তবুও সে পিছু হটেনি। নজলীর চোখে চো তখন ভয়ের চেয়ে সাহসই বেশি। ছুরির ফলাটি সোজা ঘাতকদের দিকে তাক করা। বাইরে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি পুরো আকাশ আলোকিত করে। সেই ক্ষণিক আলোয় দুই মুখোশধারীর অবয়ব আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
নাজলী গভীর শ্বাস নেয়। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,

— কারা আপনারা? এই মিনারে ঢুকলেন কীভাবে? এই আইল্যান্ডে এলেন কীভাবে? কী চান আপনারা? উত্তর দিন!
দুই মুখোশধারী ঘাতকের নীরবতা যত দীর্ঘ হচ্ছিল নাজলীর ভেতরের উত্তেজনা ততই ঘনীভূত হয়ে উঠছিল। লণ্ঠনের কাঁপতে থাকা আলোয় তাদের ছায়া দেয়ালের উপর বিকৃত হয়ে নডছিল।
হঠাৎ সামনের ঘাতকটি অস্ত্র উঁচু করতেই নাজলী আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
— এনি! নিচ হ !
চিৎকার করে উঠেই সে হাতে থাকা ফল কাটার ছুরিটি ঘাতকের দিকে ছুড়ে মারে। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। ছুরিটি ঘাতকের কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়।
ঘাতক ব্যথায় গর্জে ওঠে।

” শালীরা রুপ দিয়ে বশে আনতে চাইছে। ওই রক্ষিতা আর বাচ্চাদের ধরে নিয়ে আয়।
পুরো ঘর বিশৃঙ্খলায় বিস্ফোরিত হয়। লোকটা এগিয়ে আসতেই নাজলী সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
একজন ঘাতকের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়।
টেবিল উল্টে যায়। কাঁচের গ্লাস ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠে।
চারদিকে শুধু ধাক্কাধাক্কি, গর্জন আর ভাঙচুরের শব্দ।
এনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। একজন ঘাতক নাজলীর পিঠে ছুঁরি দিয়ে আচর কাটে।নাজলী বুঝার আগে এনি চেঁচিয়ে উঠে,

” আপা!
নাজলী যন্ত্রনায় বসে পড়ে কাচ ভাঙ্গা মেঁঝেতে। সব কচের টুকরো তার পায়ের ভেতরে গেঁথে যাচ্ছে৷ ঘাতকরা এনির দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে নাজলী নিজের যন্ত্রনা ভুলে গিয়ে দুই ঘাতকের পা শক্তভাবে চেপে ধরে। এনির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
” রুম থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে যা। নিচের গার্ডদের খবর পাঠা ভেতরে শয়তান ডুকেছে। বাচ্চাদের সামলা, আমি ওদের সামলাচ্ছি।
এনি কেঁদে উঠে নাজলীর দিকে তাকিয়ে। নাজলীর পিঠ- পা থেকে তরক্ত রক্ত পড়ছে শুধু।
” আপা তুমি ওদের ছেড়ে দাও। মেরে ফেলবে তোমাকে।
নাজলী চোখ রাঙ্গায় নীরবে। এনিকে কিছু একটা ইশারা দেয়। এনি কেমন যেন শান্ত হয়ে পড়ে। এইদিকে ঘাতক দুইটার সাথে নাজলীর ধ্বস্তাধ্বস্তি লেগে যায় ৷ এনি কামড়ে ধরে নিজের ঠোঁট। মুহূর্তেই চোখে অন্য কিছু জ্বলে ওঠে। সেটা হচ্ছে ছিল না ভয়। সেটা ছিল না কান্না।সেটা ছিল এমন এক উন্মত্ত ক্রোধ, যা জন্ম নেয় তখনই, যখন একজন মা তার সন্তানদের বিপদের মুখে দেখতে পায়। এনির বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে ওঠে।
চোখের অশ্রু মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে যায়।
ভাঙা নিঃশ্বাসগুলো রূপ নেয় দহনময় ক্রোধে।
মনে হচ্ছিল কয়েক মুহূর্ত আগের অসহায় নারীটি আর নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মা, যে নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও সন্তানদের রক্ষা করবে।
একজন ঘাতক নাজলীকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়।
নাজলী দেয়ালে আছড়ে পড়ে।তার কপাল ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করে।তবুও থামে না। দুর্বল শরীর নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। লোকটা এগিয়ে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চোখে তখন কেবল একটাই সংকল্প

” বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে”
কিন্তু ঠিক তখনই আরেকজন ঘাতক বারান্দার দিকে ছুটে যায়। নাজলীর সাথে ফাইট করা লোকটা অন্য লোকের উদ্দেশ্যে বলে,
” বারান্দায় যা। দোলনার মধ্যে হয়ত বাচ্চারা আছে।
এনির বুকের ভেতর কেমন বিস্ফোরণ ঘটে।
তার কানে আর কিছু শোনা যায় না। না সমুদ্রের গর্জন। না নাজলীর চিৎকার। না ভাঙচুরের শব্দ। এনির ভেতরে কাঁপছে। বিরবির করে উঠে,
” আল্লাহ সাহায্য করো। ওরা আমার সন্তানদের দিকে যাচ্ছে।
এক মুহূর্তে এনি দৌড় দেয়। পা পিছলে গিয়ে টেবিলের উপরে আছড়ে পড়ে। হাঁটু ছিঁড়ে রক্ত বের হয়।নাক – মুখ খিঁচে উঠে দাঁড়ায় শক্তভাবে।
ঘাতকটি বারান্দার দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছে।

এনি পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।দুজন একসঙ্গে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড আঘাতে এনির কাঁধে চোট লাগে। ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে যায়। তবুও ছাড়ে না। মনে হচ্ছিল শরীরে মানুষের চেয়ে বেশি শক্তি এসে ভর করেছে।
মাতৃত্বের শক্তি! উন্মত্ত ভালোবাসার শক্তি! সন্তানকে হারানোর আতঙ্কের শক্তি।
ঘাতকটি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এনি তার পথ আটকে দেয়। ঘাতকের হাতে থাকা ছুরির আঘাতে এনির হাত কেটে যায়। গলগলিয়ে তরল রক্ত পড়তে থাকে। লোকটা উনির মুখ চেপে ধরে, নখের আচরে ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরে। তবুও এনি এক ইঞ্চিও সরে না।
বারান্দার তখনও শিশুরা ঘুমিয়ে আছে৷
নিষ্পাপ। নিরাপত্তাহীন। যাদের শরীরে একটা মাছি পর্যন্ত বসতে দিত না তারা আজ জীবন – মরণের দুয়ারে। আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ক্ষতবিক্ষত মা।
নাজলী এদিকে দ্বিতীয় ঘাতকের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তার মুখ রক্তে ভেসে গেছে। শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। তবুও হার মানার পাত্রী সে নয়।

ঘাতকটি যখন এনির দিকে এগোতে চায়, নাজলী আবার তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
দুজনের ধস্তাধস্তিতে একটা কাচের টেবিল উল্টে পরে। নাজলী সরে যায় চোখের পলকে৷ পুরোটা টেবিল ঘাতকের শরীরের উপর আছড়ে পড়ে। ভাঙ্গা কাচ গেঁথে যায় তার শরীরের ভেতর। লোকটা পাগলের চেঁচাতে থাকে। নাজলী যেন সুযোগ পেলো। ড্রয়ার থেকে লম্বা একটা চা*পাতি বের করে লোকটার চোখে- মুখে ডুকিয়ে দেয়। মুখের ভেতরে ডুকানো হয় যাতে চেঁচাতে না পারে। ঘাতক ছটফট করতে করতে মরণের দিকে ঢলে পড়ে। নাজলী বড় – বড় শ্বাস টানে। শরীরে আর শক্তি দিচ্ছে না বারান্দায় যাওয়ার। যন্ত্রনায় কেমন গুলিয়ে আসছে সব কিছু। হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দেয়। তার পুরো শরীর কাঁপছে। কিন্তু চোখে এখনো আগুন। বিরবির করে কিছু বলে উঠে,
” আই লাভ ইউ আরিশ! আই লাভ ইউ সো মাচ! প্লিজ ফিরে এসে ওদের রক্ষা করো!
ব্যাস, দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসে। আচমকা ভাঙ্গা কাচের উপর সেও পড়ে আয়। চোখ দুইটা বন্ধ হয়ে আসে। নিস্তেজ হয়ে পড়ে পুরো শরীর।

এদিকে এনি হাপাচ্ছে। । চুল এলোমেলো। ক্লিপ দুইটা কেমন আলগা হয়ে আছে৷ মুখে রক্তের দাগ।
হাতে কাটা। কাঁধে আঘাত। তবুও তার চোখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল সেখানে আগুন জ্বলছে।
এনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার সামনে ঘাতকটিও টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়।
কিছুক্ষণের জন্য দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘাতক বার বার এনির রুপে মোহিত হয়ে পড়ে।
উপর মহল থেকে আদেশ আছে এনির শরীরে যাতে চোট না লাগে। বাচ্চা আর এনিকে যাতে সুস্থ ভাবে নিয়ে যায়। তাই তারা এনির উপর কোনো আঘাত করছে না। এনি আরও শক্তি পায় যেন।হাতে অস্ত্র না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঘাতকরা কাচ ভেঙ্গে পড়ে। বাচ্চারা গলা ফাটিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। এনি দুই হাত দুই দিকে নিয়ে হুশিয়ারি দিয়ে গর্যে উঠে,

” একটা শকুন ও যদি আমার বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়িয়েছিস আল্লাহর কসম করে বলছি সেই হাত কেটে কুত্তাকে খাওয়াব।
ঘাতক কেমন উন্মাদের মত হেসে উঠে রক্তাক্ত এনির দিকে তাকিয়ে। অশালীন নজর দিয়ে বলে,
” তর মত এমন বিধ্বংসী নারী কখনো দেখিনি৷ আবার এমন সুন্দরী নারীও কোনোদিন দেখিনি৷ শালী রুপ আর নিষ্পাপ চেহারা দিয়ে পুরো মাফিয়া জগতকে পাগল করে রেখেছিস। অথচ তুই মোটেও নিষ্পাপ নস। শুনলাম তুই নাকি জেডকে মেরে দিয়েছিস? একজন নরখাদককে মারলি কিভাবে? শালী এইতো দেখী দেবতা রুপী হিংস্র প্রানী৷ আমি কত হাজার শক্তিশালী, ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের চোখের পলকে মেরে এসেছি৷ আর৷ সামান্য তর সাথে এতক্ষণ যুদ্ধ করছি! ছিহহহ!
এনি আঙ্গুল দিয়ে নিজের ঠোঁটের রক্ত মুছে। বাঁকা হেসে বলে,

” কথায় আছে আগুনের সাথে থাকলে আগুন হতে হয়। আমি তো স্বয়ং আগুনের সাথে এক রুমে থাকছি। গ্যাংস্টার বসের ওয়াইফ হয়ে যদি আগুন না হয় তবে তদের মত কুত্তার বাচ্চার সম্মুখীন হব কিভাবে?
কিছুক্ষণ থেমে অদ্ভুত ভাবে হেসে বলে,
” কি ভেবেছিলি অবলা নারী আমি? যেহেতু গ্যাংস্টার বস মিনারে নেই তাই খুব সহজে নিজের কাজ হাসিল করতে পারবি? বোকা!

তুই তো ক্ষমতা বড় হয়ে পেয়েছিস। আর আমি শিশুকালে যুদ্ধ করে এসেছি। নরকের যন্ত্রনা কতটা বিষধর হয় সামনে থেকে অনুমান করেছি। নিজে লড়াই করে আজকের আনাস্তাসিয়া এনি হয়ে টিকে আছি। শালা, দুর্বল হলে তো কবেই মরে পঁচে থাকতাম। আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট গ্যাংস্টার বসকে যখন চাবুক দিয়ে আঘাত করে ক্ষত – বিক্ষত করতে গিয়ে ভয় পায় নি সেখানে তুই কোন শুয়রের বাচ্চা! যখন ডুকে পড়েছিস তখন আর যায় হোক জীবন নিয়ে অন্তত ফিরতে পারবি না। পারলে আমার বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখা। দেখি তর কত ক্ষমতা!
এনি কথা শেষ করার সাথে সাথে ঘাতক সর্ব শক্তি দিয়ে এনির গালে থাপ্পর বসায়। এনি ছিটকে পড়ে দেয়ালের সাথে। শক্ত দেয়ালের আঘাতে তার কপাল ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করে। ঘটনাটা আকস্মিক ঘটে যায়৷ এনি নিস্তেজ হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে৷ এনিকে অজ্ঞান ভেবে ঘাতক বিকৃত হাসি দিয়ে বলে,

” শালী এক থাপ্পরে জবান হয়ে বন্ধ হয়ে যায়, আর তুই ক্ষমতার বড়াই করছিস? তকে ও নিব আর তর বাচ্চাদেরও। অলরেডি তর আরেক বাচ্চার কুরবানি হয়ে গিয়েছে। তকে নিলে সব একসাথে মরবি। জয় হবে আমার বসের!!
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ঘাতক। হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছে দোলনার দিকে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের দিকে যায়। হুট করেই এক বিকট শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়৷ কিন্তু তার আগেই এনি ভাঙ্গা ওয়াইনের বোতল ঘাতকের পেটে ডুকিয়ে দেয়। আর অন্য হাত দিয়ে মাথা থেকে ক্লিপ খুলে এক – এক করে দুই চোখে গেঁথে দেয়। ঘাতক গলা ফাটিয়ে চোখে ধরে চিতকার দিয়ে উঠে। ঘাতকের গলার আওয়াজে ভয়ে বাচ্চারাও কেঁদে উঠে।এনির চোখ – মুখ কেমন শক্ত হয়ে এসেছে৷ রক্তক্ত ক্লিপ হাতে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে। লোকটা যন্ত্রনায় পাগলের মত এদিক- সেদিক ছুঁটতে থাকে৷ সহ্য করতে না পেরে চোখে ধরেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে৷ ঘাতককে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ দিলো না এনি। হাতে থাকা রক্তাক্ত ক্লিপ দিয়েই কাতরাতে থাকা পিশাচের মুখে আচর কাটতে থাকে। এক – একটা আচরে মাংস খুলে আসছে মুখ থেকে। সাদা মুখ লাল হয়ে কেমন ভয়ানক হয়ে উঠেছে। এনি মুখের উপর থু- থু দিয়ে উঠে চোয়াল শক্ত করে বলে,

” আরেকটা খুন করলাম। তাতে কি? যার শিশুকাল থেকে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সময় কেটে গেলো, হত্যা করে গেলো, এখন ভালো সেজে লাভ কি?
নারীর ছলনা কতটা ভয়ানক হয় বুঝতে পারলি না৷ একটু বুঝলে অন্তত তর এমন করুণ দশা হত না। অজ্ঞান ভেবে ভুল করলি, পিছন থেকে আঘাত করতে সাহায্য করলি! বলেছিলাম না আমি থাকতে আমার বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবি না। দেখ, সামান্য টাচ ও করতে পারিস নি। রিডিউকুলাস!
এনি ক্ষত- বিক্ষত যন্ত্রনায় কাতর৷ তবুও দ্রুত বাচ্চাদের কাছে যায়। বাচ্চারা কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে উঠেছে৷ এনি নোংরা রক্তাক্ত শরীর নিয়েই দুই প্রানকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। মুখে – মাথায় অসংখ্য চুমু খেয়ে কেঁদে উঠে,

” বাবা – মা আমার। কিছু হয় নি৷ মাম্মাম আছি তো তোমাদের সাথে।মাম্মাম উইল অলওয়েজ কিপ সেভিং।
ভয় নেই। জীবন দিয়ে হলেও তোমাদের রক্ষা করব৷ তোমরা তো আমার জীবন। তোমাদের উপর সামান্য আচর লাগলে কিভাবে সহ্য করব বলো! মাম্মাম সব সময় সেইভ করব!
এনি কথা গুলো বলছিলো ঠিক কিন্তু তার শরীর অবশ হয়ে আসছে অতিরিক্ত যন্ত্রনায়৷ হাত – পা কেটে, পুরো শরীর ক্ষত- বিক্ষত। হুট করে মনে পড়লো নাজলীর কথা। বাচ্চাদের বুকে নিয়েই ছুঁটে যায় রুমের ভেতরে। নাজলী অচেতন হয়ে কাচের উপর শুয়ে আছে৷ এনি মেঝেতে বসেই নাজলীর গালে হাত রাখে৷আতঙ্কে শিউরে উঠে। দিশেহারা হয়ে কেঁদে উঠে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭১

” আপা চোখ খুলো! আপা দেখো শত্রুরা মরে পরে আছে। তুমি কেনো চোখ বন্ধ করে রাখলে? প্লিজ চোখ খুলো। তোমার কিছু হলে আরিশ ভাইকে কি জবাব দিব? আর আমার নিভ্রিতাও যে এখন ও ফিরে আসে নি।
টুকিইইইইই

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২ (২)