লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭১
লিজা মনি
বিশটা মিনিট পার হয়ে গেছে অথচ এনি এখনো একনাগাড়ে একভাবে বসে আছে। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে নাভিদের সেই পাগলাটে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া রূপটা। দুই- তিনটা মাস পার হয়ে গিয়েছে। এর ভেতরে নাভিদ একবারের জন্য ও মিনারে আসে নি। এনির মাঝে মাঝে ভয় হয় লোকটার সাথে খারাপ কিছু হয়ে গেলো না- তো? বর্তমানে সে নিজের সজ্ঞানে নেই। যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নিক কথা দিয়েছে নাভিদকে সে প্রানে মারবে না। এই নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললেও আরও ছটফট করে উঠে। নিকের আড়ালে কত চেষ্টা করেছে নাভিদের একটা মাত্র সংবাদ পাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিবার সে বিফল হচ্ছে। লোকটা বেঁচে আছে তো? এনির চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অনবরত।
বুকের ভেতর চেপে থাকা কষ্টটা এখন তীব্র কান্না হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যে মানুষটা চরম অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরে এলো, নিজেকে এতটা শুধরে নিলো—তার ভালোবাসা আর যাই হোক, অন্তত ঠুনকো বা সস্তা ছিল না।
পবিত্র মক্কায় গিয়ে, খোদাতালার দরবারে মাথা নত করে যে মানুষটা তাকে চাইল, তার সেই আকুল প্রার্থনা কেন ওপরওয়ালা শুনলেন না—সেটাই এনি কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না। নিয়তির এই নিষ্ঠুরতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। একটা তীব্র হাহাকার আর দমবন্ধ করা ছটফটানিতে তার পুরো বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। চোখের পানি মুছে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের,
” কেনো নিজের এই ভালোবাসা আমার সামনে উন্মোচন করলেন? আপনার ধ্বংসের পিছনে আমি হতভাগা দায়ী। অজান্তেই আপনাকে নতুন জীবন দিয়েছিলাম।আবার অজান্তেই আপনাকে ধ্বংসের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলাম। আমকে কি কখনো ক্ষমা করবেন আপনি নাভিদ ভাই? আমি প্রতিবার এই যান্ত্রিক পুরুষটার সঙ্গিনী হতে চাই। আপনাকে কোনো জনমে ভালোবাসতে পারব না। বাস্তবতা মেনে না নিয়ে কেনো নিজেকে এইভাবে ধ্বংস করে দিলেন। ফিরে আসুন, জীবন শুরু করুন নিজের। আপনার এই রুপ সহ্য করতে পারছি না।
এনি ফুঁপিয়ে উঠে। প্রতি রাতে সপ্নে নাভিদের আত্ন চিৎকার শুনতে পায় সে। শুধু একটা এই চিৎকার,
” বিশ্বাস করো পাখি, ভালো নেই আমি। তোমাকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগছে না। খোদাকে বলো না, আমাকে যাতে এই দুনিয়া বাঁচতে দেয়। আমি তোমাকে আরও দেখতে চাই। তোমাকে দেখার তৃষ্ণা কিছুতেই মেটাতে পারছি না। ছটফট করছি গলা কাটা প্রানীর মত। যে নিক আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়েছে ক্ষমতার জোরে তার ধ্বংস হবে। মিলিয়ে নিও ওর সুখ- শান্তি সব ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেন না! আমার চোখের পানি, হাহাকার বিফলে যাবে না। সব ধ্বংস হবে তার!
এনি নিশ্বাস টানে বড় বড়। নিজেকে কেমন ছনছাড়া মনে হয় যতবার কথাগুলো মনে পড়ে। চোখের পানি মুছে ছেলের দিকে তাকায়। এরিক মুখে আঙ্গুল ডুকিয়ে চুষতে থাকে। এনি বেখিয়লীভাবে ফিডার বানাচ্ছে আর অন্য হাতে মুখ থেকে আঙ্গুল বের করে দেয়। দুই সেকেন্ড চুপ থেকে রুম ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে গ্যাংস্টার বসের একমাত্র পুত্র। হুট করে এমন চিৎকার করাতে এনি হতভম্ভ হয়ে যায়। নিক ফ্রেশ হয়ে মাত্র ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছিলো। ছেলের গলার আওয়াজ পেয়ে দিশেহারা হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। অধৈর্য হয়ে ধমকে উঠে,
” কাঁদছে কেনো? কি করেছো ওকে?
কথাটা বলে এনির কোল থেকে এরিককে নিজের কোলে নেয়। যদিও ঠিক ভাবে নিতে পারে না। তবুও এলো- মেলো ভাবে নেয় গ্যাংস্টার বস। প্রতিবারের মত এইবার ও কাঁপছে হৃদয়হীন পুরুষের হাত। এনি সেদিকে খেয়াল করে অভিমানী গলায় উত্তর দেয়,
” আমাকে ধমকাচ্ছেন কেনো? আমি মেরেছি নাকি? মুখ থেকে আঙ্গুল সরিয়ে দিয়েছি তাই কান্না করেছে।
নিক ছেলেকে শক্ত বক্ষের সাথে মিশিয়ে এনির দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি আবার কেঁদে ফেলো না। ট্রাস্ট মি ব্লাডরোজ ছেলে আর ছেলের মায়ের কান্না থামাতে সময়ের প্রয়োজন অনেক। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কাছে সময় নেই। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে আমার।
এনি মন খারাপ করে খুঁচা মেরে বলে,
” বাহহহ! এখন আমার থেকে মিটিং বড় হয়ে গেলো?
নিক বিরক্তি নিয়ে তাকায় এনির দিকে। হুট করে এমন ছেলেমানুষি করছে কেনো এই রমণী। এই মেয়ের জন্য কতবার ঠিক কত কোটি টাকার মিটিং ক্যান্সেল করতে হয়েছে ধারনা আছে? নিজের জীবনের থেকেও বেশি যাকে প্রায়োরিটি দেয় সে জবাব চাচ্ছে! এরিক কান্না থামিয়ে বাবার কোলে ল্যাপ্টে থাকে। নিক ছেলেকে এনির কোলের উপর দিতে – দিতে বলে,
” কি চাচ্ছো মিটিং রেখে রুমে থেকে যেতে? ওয়েল, ইয়োর ওয়ার্ডস স্টে উইথ মি। নাথিং উইল হ্যাপেন ইফ আই ডোন্ট অ্যাটেন্ড দ্য মিটিং। ইভেন ইফ মিলিয়নস আর লস্ট, অ্যাট লিস্ট আই’ল গেট মাই ওয়াইফস অ্যাফেকশন। কি বলো বেইবি! বাচ্চাদের অন্য রুমে রেখে আসি। তোমার কান্নার আওয়াজ বাহিরে না গেলেও ভেতরে কিন্তু ঘুরাফেরা করা। কান্নাতে বাচ্চারা ভয় পেয়ে যাবে। রেখে আসি ও রুমে?
এনির শরীর কেঁপে উঠে। সামান্য পিছিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“ক.. কেনো?
নিক ঝুঁকে পরে আরও এনির দিকে। ঠোঁটের উপর বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে,
” বাড়িতে থাকলে নিশ্চই উপোষ করে থাকব না। তোমা….
এনি চেপে ধরে নিকের মুখ। কটমট করে বলে,
” ঠোঁটকাটা লোক, চুপ! আরেকটা কথা বললে আমি আপনার গলা চেপে ধরব।
এনি কামড়ে ধরে এনির হাতের তালু। এনি ব্যাথা পেয়ে সরিয়ে নেয় সেই হাত। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে এনির ঘাড় গলিয়ে মাথার পিছনে চেপে ধরে। ঠোঁটে শক্ত করে চুমু খেয়ে গ্রিবা দেশ নাড়ায়,
” তুমি চেপে না ধরে অন্য কিছু ও ছুঁয়ে দিতে পারো বেবিগার্ল। আমার সব কিছুই তো তোমার সম্পদ!
এনির কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। কোনো কিছু না বুঝে নিভ্রিতাকে নিকের কোলের উপর রেখে শক্ত গলায় বলে,
” ফিডার রাখা আছে এখানে। ওকে খাইয়ে দিন। তিনজকে একসাথে খাওয়ানো সম্ভব না।
কথাটা বলে উঠে যায় বিছানা থেকে। এই মুহূর্তে এই লোকের থেকে তাকে বাঁচতে হবে। এনি এরিক আর নিরাশাকে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়।
এনি চলে গেলে নিক হাতে ফিডার তুলে নেয়। যে হাতে সব সময় অস্ত্র থাকে এই হাতে আজ ফিডার! কেমন যেন কেঁপে উঠে গ্যাংস্টার বসের যান্ত্রিক হৃদয়। একবার ফিডারের দিকে তাকায় আবার নিজের অস্তিত্বের দিকে। যতবার এদের কাছে আসে ততবার ভিতুদের মত কাঁপে আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট! নিক ফিডার আর চামচ হাতে তুলে নেয়।
এনি দশ মিনিট পরে রুমে এসে হতভম্ভ হয়ে যায়। নিজের মেয়ের এমন নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে পারছে না কেঁদে দিবে। পুরো মুখে আর শরীরে দুধ দিয়ে ভিজিয়ে রেখেছে।
” একি! খাবার খাইয়েছেন নাকি খাবারের মধ্যে গোসল করিয়েছেন। চোখে- মুখের কি অবস্থা করেছেন মেয়েটার।
নিক নিভ্রিতার দিকে তাকিয়ে এনির দিকে তাকায়। কাঁধ নাড়িয়ে প্রতিউত্তর করে,
” চামচ নেওয়ার জন্য কান্না করছিলো খুব। খেতে চাচ্ছিলো না কিছুতেই। জেদ ধরেছিলো অনেক। নিজে নিজে এমন করেছে আমার কি দোষ?
এনি এরিককে শুইয়ে বাবা – মেয়ের সামনে আসে। মেয়ের এমন বেগতিক অবস্থা দেখে কান্না পাচ্ছে তার। নিকের কাছ থেকে নিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
” ও বাচ্চা মানুষ। এইটা – ওইটা নেওয়ার জন্য কান্না করবে স্বাভাবিক। কান্না করলেই আপনাকে দিতে হবে? জোর করে নিতে পারলেন না?
নিক রুমাল হাতে নিয়ে মেয়ের মুখ মুছে দিতে – দিতে গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” কি প্রয়োজন ছিলো নেওয়ার? খুব ভালো করে জানো ওদের কান্না আমার সহ্য হয় না। প্রয়োজনে সব এনে দিব তবুও কাঁদতে দিব না।
এনি আহাম্মক বনে যায়,
” যা চাইবে তাই দিবেন?
” সন্দেহ আছে?
নিকের পাল্টা প্রশ্নে এনি ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে পছন্দ করে তখন কি করবেন? আদরে যেভাবে বাদর বানানোর পায়তারা করছেন তখন কাঁদাবেন কিভাবে? প্রেম নিশ্চই মেনে নিবেন না।
নিক এনির দিকে এক পলক তাকিয়ে মেয়েদের দিকে তাকায়। সাবলীল গলায় বলে,
” প্রেম মেনে না নেওয়ার কি আছে? তুলে নিয়ে আসব সেই ছেলেকে। এরপর মেয়ের জামাই বানাব। তবুও মেয়েকে কাঁদতে দিব না।
এনি হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকে নিকের উপর। এইসব বাবা প্রতিটা ঘরে – ঘরে থাকার প্রয়োজন ছিলো। তবে ব্যার্থ প্রেমের ইতিহাস রচিত হত না। নিকের রুমালের দিকে তাকিয়ে অবাক হয় অনেক। অস্ফূর্ত আওয়াজে বলে,
” নিজের রুমাল দিয়ে মুখ মুছে দিলেন?
” সো হোয়াট?
” নিজের জিনিস তো কাউকে স্পর্শ করতে দেন না তাই জিজ্ঞাসা করলাম।
নিক বিরক্ত হয়ে এমন কথায়। সাবলীল ভঙ্গিতে উত্তর দেয় মাফিয়া জগতের হিংস্র মনস্টার,
” সবার মধ্যে তো আর আমার প্রানগুলো নেই ব্লাডরোজ। কোথাকার কথা কোথায় মিলাচ্ছো? ওরা আমার পৃথিবী, সেখানে রুমাল নোংরা করা এমন কি?
এনি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” ড্রাগস নিয়েছেন? এত নরম ভাবে কথা বলছেন!
নিকের কপাল কুচকে আসে। চোয়াল শক্ত করে ধমক দিয়ে উঠে,
” থাপরে কান বন্ধ করে দিব, বিয়াদব! সিডিউস করেছো তুমি আমাকে? ড্রাগস নিব কেনো কারন ছাড়া।
এনি সামান্য কেঁপে নড়ে- চড়ে উঠে। গলার খাদ নামিয়ে বলে,
” আপনার মুখ থেকে মিষ্টি কথা কেনো জানি হজম হয় না। যতবার আমাকে মিষ্টি- মিষ্টি কথা বলেছেন ততবার ড্রাগ নেওয়া ছিলো। সজ্ঞানে কখনো শুনি নি তো তাই ট্রাস্ট করতে কষ্ট হয়।
নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। এনির থুতনিটা ধরে মুখটা উঁচু করে। চোখে চোখ রেখে বলে,
” সজ্ঞানে থাকা গ্যাংস্টার বসকে সামলানোর ক্ষমতা থাকলেও ড্রাগস নেওয়া গ্যাংস্টার বসকে সামলানোর ক্ষমতা তোমার নেই ব্লাডরোজ। এখন তো অর্ধেক রাতে ছাড় পেয়ে যাও, পরে দেখা যেত সারা রাতেও ছাড় পেতে না!
এনি চোখ খিঁচে ফেলে। লজ্জায় সিটিয়ে যায়। পুরো শরীর শিরশির করে উঠে মুহূর্তেই। নিকের লাগামহীন কথায় ইচ্ছে করছিলো রেগে কিছু কথা শুনাতে। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
” বাচ্চাদের সামনে কিসব অসভ্য কথা বলছেন। এমনভাবে বলছেন যেন সামলায় নি।
” অজ্ঞান হয়ে যেতে।
নিকের চোখে- মুখে দুষ্টু হাসি। এনি প্রায় কান্না করে দিবে ভাব। নিকের বুকে ঘুষি মেরে সরে আসে। বিরবির করে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়,
” নির্লজ্জ বেহায়া পুরুষ জাত। পর পুরুষের নজরের কথা কি বলব। যেখানে নিজের ঘরে, নিজের জামাই এই অশালীন নজরে তাকায়!
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে কপাল ঘেষে। চুল হাত দিয়ে এক পাশে ঠেলে দিয়ে বলে,
” নজর খারাপ ছিলো বলেই তিনটা পেয়েছো। আরও তিন – চারটা পেয়েও যেতে পারো গ্যারান্টি নেই।
নাজলী দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা চেপে ধরে ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা অনবরত পায়চারী করে যাচ্ছে। কিছুতেই যেন তার মন শান্ত হচ্ছে না। কোনো একটা অজানা অস্বস্তি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এমনিতেই গত কয়েকটা দিন ধরে শরীরটা কেমন যেন ছেড়ে দিয়েছে, ভীষণ দুর্বল লাগছে নিজেকে। তার ওপর আবার ঘন ঘন বমি বমি ভাব। মাঝে মাঝে সত্যিই বমি হয়ে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম ভেবেছিল হয়তো বাইরের কিছু খেয়ে ফুড পয়জনিং হয়েছে। তাই সাধারণ কিছু ওষুধ খেয়ে ব্যাপারটাকে পাত্তাই দেয়নি, স্রেফ এড়িয়ে গেছে।
কিন্তু আজ যেন আর শরীর সায় দিচ্ছে না। হঠাৎ করেই মাথার ভেতরটা এমন তীব্র যন্ত্রণায় চড়চড় করে উঠল যে, নাজলীর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। মাথা ঘোরানো আর ব্যথার চোটে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। একদম ধপ করে বিছানাটার ওপর বসে পড়ে। বুকের ভেতরের ছটফটানিটা আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। আরিশ ট্রায়াল রুম থেকে এসে নাজলীকে এমন বসে থাকতে দেখে কপাল কুচকায়। তার কপালে হাত রেখে প্রশ্ন করে,
” আর ইউ ওকে? অসুস্থ লাগছে তোমাকে। কি হয়েছে?
নাজলী শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করে। যন্ত্রনা উপেক্ষা করে আরিশকে প্রশ্ন করে বসে,
” নাভিদকে সেদিন কি করেছিলেন? নিক বলেছে মারে নি। আপনি বলেন, সত্যি নাভিদকে মেরে ফেলেন নি?
এক কথার মধ্যে এমন বেহুদা প্রশ্নে মেজাজ খিটখিটে হয়ে আসে। চটে গিয়ে বলে,
” তোমাকে অন্য প্রশ্ন করেছি আমি।
নাজলী ও রাগ দেখায় সমানতালে। বসে থেকেই জেদী গলায় বলে,
” আপনার প্রশ্ন এখন ছিলো। কিন্তু আমার প্রশ্ন বিগত মাস ধরে। কিন্তু উত্তর পায় নি। সব কিছুর একটা ধৈর্য থাকে আরিশ। কি করেছেন আপনারা নাভিদের সাথে? কিভাবে আঘাত করেছে ছেলেটাকে?
আরিশ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” কষ্ট হচ্ছে?
নাজলী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আরিশের দিকে। তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” অবশ্যই কষ্ট হচ্ছে। বর্তমান পেয়ে অতীতকে ভুলে যাব কিভাবে বলুন? এতটা স্বার্থপর তো আমি নয়। আমার থেকে ও বেশি ছটফট করছে এনি। শুধু সত্যিটা জানিয়ে দিন। আসলেই কি নাভিদ বেঁচে আছে?
” তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয়।
নাজলী ক্ষেপে যায়। আচমকা চেপে ধরে আরিশের শার্টের কলার। উন্মুক্ত গলায় সব শক্তি দিয়ে দাঁত বসিয়ে দেয়। আরিশ খিঁচে ফেলে চোখ- মুখ। রক্ত বের হয়ে আসলেই থেমে যায় রমণী। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে বলে,
” হাজারবার বাদ্ধ আপনি। আমি আপনার বিবাহিতা স্ত্রী। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনি বাদ্ধ। কারন আমি স্ত্রী হিসেবে যেমন মহান আবার অনেক খারাপ ও। আপনার প্রতিটা পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা আমার অধিকার। ধর্মীয় বলেন বা আইনিভাবে বলেন। যদি সেই অধিকার দিতে না চান তবে সম্পর্কের ইতি টেনে ফেলুন। এমন সম্পর্ক আমি চাই না যেখানে লুকোচুরি থাকে।
রাগে – দুঃখে একবারে কথা গুলো বলে থেমে যায় নাজলী। আরিশ রাগান্বিত চোখে তাকায় নাজলীর দিকে। পর পর চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করে বলে,
” কলিজা কত বড় হলে সম্পর্কের ইতি টানার কথা বলেছো। কন্ঠ কেঁপে উঠে নি। একবার ও মনে হয় এই কথার জন্য কি অবস্থা করব?
নাজলী কেঁপে উঠে এই শান্ত গলায়। ইদানিং হুট- হাট কারন ছাড়াই রেগে যাচ্ছে সে। আর এখন তো কারন সামনে হাজির। নিজেও স্বাভাবিক হয়ে বলে,
” প্রশ্নের উত্তর চাই।
” বেঁচে আছে।
নাজলী চট করে তাকায় আরিশের দিকে।।আরিশ চোয়াল শক্ত করে হাত দিয়ে ফ্লাওয়ার টবটা আছড়ে ফেলে দেয়। একবারের জন্যও তাকায় নি নাজলীর দিকে। নাজলী সামান্য হেসে কাবার্ডা খুলে একটা বক্স বের করে।
ভেতর থেকে একটা কালো হুডি আর কালো প্যান্ট বের করে নির্বিকার মুখে পরে নেয়। তারপর মুখে থাকা মাস্কটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দেয় । চোখেমুখে অদ্ভুত এক কঠোরতা।
একটা মেসেজ পেয়ে আরিশ বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর নাজলীও রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায় । করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা তাকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালেও কেউ তাকে থামানোর সাহস পেল না। এনিকে প্রয়োজনে আটকে রাখার নির্দেশ থাকলেও নাজলীকে নিয়ে এমন কোনো আদেশ আরিশ দিয়ে যায়নি। তাছাড়া, এই বাড়িতে নাজলীর সম্পর্কে সবাই যথেষ্ট অবগত।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে গার্ডদের উদ্দেশে বলল,
“বনপশুগুলোর ওপর খাঁচা ফেলে দাও। আমি বাইরে যাচ্ছি, জরুরি কাজ আছে।”
নাজলীর আদেশ পাওয়া মাত্রই গার্ডরা কোনো প্রশ্ন না করেই হান্টার আর শ্যাডোর ওপর ভারী খাঁচা নামিয়ে দেয়। লোহার গরাদ মাটিতে আছড়ে পড়তেই চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
নাজলী নির্বিকার ভঙ্গিতে কালো মাস্কটা আবার মুখে পরে নেয় । চোখ দুটো ছাড়া মুখের আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সেই চোখেও কোনো আবেগের ছাপ নেই। না রাগ, না দয়া, না উদ্বেগ। শুধু ছটফটানি!
চারপাশের লোকজন অজান্তেই তার পথ ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায়। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না।
নাজলী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে কালো গাড়িটার দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে যায়।একবারও পেছনে তাকাল না। পেছনে ফেলে আসা বর্তমানে সবকিছু তার কাছে গুরুত্বহীন। পরমুহূর্তেই গাড়িটি অন্ধকার রাস্তার দিকে ছুটে যায়। নাজলী নিজের অজানা গন্তব্যের দিকে মিলিয়ে যেতে থাকে।
প্রায় চল্লিশ মিনিটের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কালো গাড়িটা এসে থামল পুরোনো এক মাজারের সামনে। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা।শুধু দূরে কোথাও পাখির ডাক আর বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো পাতার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে।
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই নাজলী দ্রুত দরজা খুলে নিচে নামে। চলাফেরায় স্পষ্ট অস্থিরতা। কালো হুডির ক্যাপ মাথার ওপর টেনে দিয়ে সে দ্রুত পায়ে মাজারের মূল ফটকের দিকে এগিয়ে যায় ।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো স্থির এক কণ্ঠ,
” নাজলী!
কণ্ঠস্বরটা শুনেই নাজলীর পদক্ষেপ থেমে যায়।
মুহূর্তের জন্য শরীর শক্ত হয়ে আসে। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় সে। বাতাসে হুডির প্রান্ত দুলে উঠছে। চোখে – মুখে ফুটে উঠেছে বিস্ময় আর অস্থিরতার মিশ্র ছাপ। পিছনে তাকিয়ে আস্ফূর্ত আওয়াজে আওড়লো,
” ইথান!
ছেলেটা এগিয়ে আসে ধীর পায়ে। নাজলী আচমকা ফুঁপিয়ে উঠে,
” ইথান তোমাকে এখানে দেখে কি খুশি হয়েছি কল্পনাও করতে পারবে না। আমি ভাবিনি এত দ্রুত তুমি ইরান থেকে এখানে আসতে পারবে। নাভিদ কোথায় ইথান? আমি অসহায়, ওর ধ্বংস ঠেকাতে পারছি না। প্লিজ কিছু করো। নয়ত ওকে বাঁচানো যাবে না।
লম্বা – চওড়া যুবকটা নাজলীর দুই কাঁধে হাত শান্তনা দিতে- দিতে বলে,
” এত কিছু কিভাবে হয়ে গেলো? একটা সংবাদ ও জানাও নি কেনো আমাকে? অনেক খুঁজেছি কিন্তু তোমাদের পায় নি। সবশেষে নাভিদকে পেয়েছি তাও এমন বিধ্বংস্ত অবস্থায়। এনি কোথায়? তোমরা কি এনিকে রক্ষা করতে পারো নি? এখনও কি গ্যাংস্টার বসের আন্ডারে আছে?
নাজলী চোখের পানি মুছে নাক টানে। ইথান টিস্যু এগিয়ে দেয়। নাজলী সেটা দিয়ে নাক মুছে মেঝেতে ফেলে দেয়। অথচ বোকা রমণী বুঝতেই পারে না তাদের এই ক্লোজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটা পুরুষ দুর থেকে রাগান্বিত চোখে দেখছে। পুরুষটার চোখ বার বার যাচ্ছে নাজলীর কাঁধে অন্য পুরুষের হাত। নিজের রাগটাকে সামলতে না পেরে গাড়ির কাউচে ঘুষি মেরে গর্জে উঠে,
” ফাঁকিং বি*চ! ডিজগাস্টিং ভালোবাসা!
নাজলী কপালে হাত রেখে বলে,
” অনেক কিছু ঘটেছে। জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে। শুধু হেরে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এক পাক্ষিক ভালোবাসা গুলো। নাভিদের অতীত আমাকে জানাও নি কেনো?
ইথান অপরাধী গলায় বলে,
” তার মানে তুমি জানো সব?.
” জেনেছি। তবে খারাপ লেগেছে তোমরা আমাকে জানাও নি। আমার একা জীবনে তোমরা আর অর্ণী সব থেকে কাছের মানুষ ছিলো। অথচ আমার সাথেই সব আড়াল করলে?
ইথান নাজলীর উদ্দেশ্যে বলে,
” নাভিদের নিষেধ ছিলো। ও ভয় পেত, তুমি এইসব জানলে এনিকে দিবে না। আর এনি জানলে ওকে ঘৃনা করবে। এনিকে হারানোর ভয় তীব্র ছিলো।
নাজলী তাচ্ছিল্যভাবে বলে,
” ইথান প্লিজ স্টপ! নাভিদকে ঘৃনা করার কোনো কারন নেই। হ্যা, প্রথমে বমি এসেছিলো এইসব শুনে। তবে সব থেকে বেশি অবাক হয়েছি কি ভেবে জানো, ঠিক কতটা ভালোবাসলে কেউ কা*পুরুষ থেকে সুপুরুষ হতে পারে। বিধর্মী থেকে প্রেয়সীর ধর্মে আসতে পারে। আমি জীবনে এত অবাক কোনোদিন হয় নি যতটা অবাক নাভিদের সমস্ত অতীত আর বাস্তবতা শুনে হয়েছি। খারাপ ছিলো কিন্তু আল্লাহ উনাকে ভালো করেছেন। তাকে ঘৃনা করার তুমি – আমি কে? ভুল করেছো আমাকে না জানিয়ে।
ইথান শ্বাস ফেলে বলে,
” ভয় ছিলো নাভিদের অন্তরে নাজলী।
” থাক সেসব কথা। তোমার সাথে দেখা করতে জীবন বাজি রেখে এসেছি। নাভিদের সাথে দেখা করার মত শক্তি আমার নেই ইথান। শুধু রিকোয়েস্ট করব, বন্ধত্বের পরীক্ষা দাও। নাভিদ কখনো তোমাকে নিজের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে দেখে নি। বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলে তুমি ওর। নিজের বন্ধুর খেয়াল রেখো। প্লিজ ইথান ওকে ধ্বংস হতে দিও না।
ইথান নাজলীর দিকে আবার ও টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলে,
” চোখের পানি মুছে নাও। সবটা দিয়ে চেষ্টা করব আগলে রাখার। চিন্তা করো না আর। জীবন বাজি নিয়ে এসেছো মানে? সেটা বুঝলাম না! আর এমন কালো হুডি, মাস্ক পড়ে এসেছো কেনো?
” বললাম তো অনেক কাহিনী। এইসব বলার সময় নেই এখন। কোনো একদিন তোমাকে সব খুলে বলব। আপাতত দ্রুত ফিরতে হবে।
” নাভিদকে দেখবে না? একা একা বিরবির করছে। একটা পুতুল নিয়ে বলছে ” এইটা আমার পাখি ”
নাজলীর কন্ঠ কেঁপে উঠে। অসহায় গলায় বলে,
” শক্তি নেই আমার ইথান। সব থেকে ভালো বন্ধু ছিলো তো। বন্ধুর এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখার মত শক্তি খোদা দেয় নি। আমি সুস্থ নাভিদকে দেখতে চাই। নাভিদকে বলো ওকে রিদ্ধিমা ভালোবাসে। এনিকে ভুলে যাতে রিদ্ধিমার সাথে জীবনটা সাজিয়ে নেয়।
নাজলী আর এক মুহূর্ত দাড়ালো না। বড় বড় পা ফেলে মাজার থেকে বের হয়ে আসে। এইদিকে ইথান রহস্যের মধ্যে পড়ে যায়। এনিকে ভুলে যাবে মানে? আর কে এই রিদ্ধিমা?
রিদ্ধিমা নিভ্রিতাকে নিয়ে বারান্দার দিকে হাটছে। জন্মের পর অনেক দুর্বল ছিলো। তিন মাসের ব্যবধানে বাচ্চাদের চেহারা অনেক গুলোমুলো হয়ে উঠেছে। রিদ্ধিমা একটা ফুলে নিয়ে নিভ্রিতার কানের নিচে গুঁজে দিয়ে গালে- কপালে চুমু খায়। নাক ঘেষে বলে,
” কিভাবে আমার ভাইয়ের কপি হলে তুমি বলোতো? ঠোঁটের নিচে তিল, চোখের রং, মুখ একদম কপি! বাহিরে গেলে কাউকে নতুন করে পরিচিয় দিতে হবে না। সবাই এমনিতেই বুঝে যাবে। বলবে গ্যাংস্টার বসের কপি, উনার আরেকটা মা আসছে। সবাই সরে যাও। রাজকুমারীকে যাওয়ার জায়গা দাও।
রিদ্ধিমা কথা গুলো বলছে আর হেসে যাচ্ছে। নিভ্রিতা কি বুঝলো বুঝা গেলো না। রিদ্ধিমার কথায় পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে। গার্ডরা এখনও কেউ বাচ্চাদের দেখে নি। দেখবে কিভাবে কখনো বাহিরে বের করা হয় নি তাদের। এই প্রথমবারের মত রিদ্ধিমা বের হয়েছে। গার্ডরা আড়ালে উঁকিঝুঁকি মারছিলো দেখার জন্য। কিন্তু ভয়ে সরা সরি বলার সাহস করতে পারে নি।
রিদ্ধিমা ফোয়ারার দিকে এগিয়ে যেতেই কারোর রক্ষ্ণ কর্কশ কন্ঠ ভেসে আসে,
” বাহিরে কেনো নিয়ে এসেছিস?
সাথে সাথে ভয়ানক ভাবে কেঁপে উঠে রমণী। গলার আওয়াজ চিনতে বাকি নেই তার।নিজেকে স্বাভাবিক করে পিছনের দিকে তাকায়। নিকের চোখ- মুখ কেমন শক্ত হয়ে আছে। ভাইয়ের এমন ভয়ানক রুপে যেন কেঁদে দেবে রমণী। গলা কেঁপে উঠে তার, মিনমিন সুরে বলে,
” কান্না থামাতে নিয়ে এসেছি ভাইয়া। ওরা দুইজন ঘুমাচ্ছো। আর ও এনিকে জ্বালিয়ে মারছিলো। এনির চোখে- মুখে ঘুম ছিলো। ঘুমের কারনে মেয়েটা ঠিকভাবে তাকাতে পর্যন্ত পারছিলো না। তাই নিজের কাছে নিয়ে এসেছি। কিছুতেই কান্না থামছিলো না, বাগানে আসতেই তোমার মেয়ে একদম চুপ।
নিক নিশ্বাস টেনে আশে – পাশে তাকায়। ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নিভ্রিতা পিটপিট করে তাকাচ্ছে তার পিতার দিকে। রিদ্ধিমা অনুভব করতে পারছে নিকের শরীরটা কাঁপছে ভীষণভাবে। যে আঙ্গুল দিয়ে মেয়ের গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে প্রতিবারের মত এইবার ও কাঁপছে গ্যাংস্টার বসের হাত। রিদ্ধিমা হেসে বলে,
” এখনও কেঁপে উঠো? তুমি তো ওদের পাপা ভাইয়া! তবে ভয় কেনো পাও সব সময়?
নিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো রিদ্ধিমার দিকে। মুখের গম্ভীরতা ফুটিয়ে আওড়ালো,
” নাথিং! কিছুক্ষণের মধ্যে ভেতরে চলে যা। বাহিরে থাকাটা সেইফ নয়।
পর পর গার্ডদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে,
” ওদেরকে দেখে রাখ!
রিদ্ধিমা ভোঁতা মুখে তাকালো ভাইয়ের দিকে। নিক মুখের কালো মাক্স লাগিয়ে দ্রুত প্রস্থান করে জায়গা থেকে। রিদ্ধিমা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। এই পুরুষটা এত হিংস্র অথচ তার ও তিনটা অস্তিত্ব আছে। একদম নিষ্পাপ! মাঝে মাঝে ভাবি এইটা সপ্ন নাকি বাস্তব!
রিদ্ধিমা গম্ভীর শ্বাস ফেলে নিভ্রিতার মুখের দিকে তাকায়। আঙ্গুল মুখে নিয়ে চুষে যাচ্ছে। রিদ্ধিমা আঙ্গুলটা বের করে গালে অনেকগুলো চুমু খায়। হুট করে উচ্চ আওয়াজে ফোনটা বেজে উঠে। রিদ্ধিমা স্ক্রিনে তাকিয়ে মুচকি হাসে। রিসিভ করে হেসে বলে,
” কিরে শালা কেমন আছিস? এত দিন পরে মনে পড়লো?
ওপাশ থেকে একদম নিশ্চুপ। শুধুমাত্র ঘন ঘন শ্বাস ফেলার শব্দ আসছে শুধু। রিদ্ধিমা অবাক হয় প্রচুর। চুপ থাকার ছেলে তো এই প্রজাতি নয়। রিদ্ধিমা সিরিয়াস গলায় বলে,
” কি হয়েছে এড্রি? ঠিক আছিস তুই? এড্রি, শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা?
” শুনতে পাচ্ছি। রিদ্ধি আমাকে খুব ভালোবাসিস তুই তাই না? অনেক ভরসা আর বিশ্বাস ও করিস?
রিদ্ধিমার কপালে ভাঁজ পড়ে অনেক। ছটফটে ছেলেটার কন্ঠ এমন নিস্তেজ কেনো মনে হচ্ছে! রিদ্ধিমা শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
” তর কন্ঠ অন্যরকম লাগছে এড্রি! কি হয়েছে তর? আন্টি ঠিক আছেন? আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে?
” মম ঠিক আছে। আগে আমার কথার উত্তর দে।
রিদ্ধিমা নিশ্বাস ফেলে বলে,
” অবশ্যই তুই আমার অনেক ভরসা ও বিশ্বাসের জায়গা। তর সাথে আমার সম্পর্ক তেরো বছর ধরে।।প্রতিটা কষ্ট, দুঃখে পাশে ছিলি তুই। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তুই!
আবার ও ওপাশ থেকে পিনপিন নিরবতা। কিছুক্ষণ পরেই এড্রিয়াণের সেই আগের ছটফটে কন্ঠস্বর,
” বাই দ্যা ওয়ে নিজের হার্টল্যাস ভাইয়ের সেই রক্তাক্ত কালো মিনারে কেমন দিন- কাল কাটছে? আচ্ছা রিদ্ধি তর ভাই কি খাবার খায়? মানুষের কাচা মাংস নাকি?
এড্রির পরিবর্তন আড়াল পড়ে যায় ভাইকে নিয়ে কটুক্ত করায়। মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
” আমার ভাই কি নরখাদক নাকি?
” উহুম, নরপিশাচ! জানোয়ার! মনস্টার এন্ড আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট! এদের আবার হৃদয়টা যান্ত্রিক হয়। একদিন রক্ত হাতাতে না পারলে দিন চলে না। সেখানে মানুষের মাংস কাটা আহামরি কিছুই নয়। শুনলাম তর ভাই নাকি বাবা হয়েছে? কিভাবে হলো বলতো?
রিদ্ধিমা রাগে চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,
” শালা চুপ কর । সে বাহিরে জগতে হিংস্র হলেও বাচ্চাদের জন্য পাগলামো দেখিসনি এড্রি। ভাবতেও অবাক লাগে যে পুরুষটা বাচ্চা পাচার করত, জাহান্নামে ঢেলে দিত সেও আজ তিনটা বাচ্চার বাপ। ইন্টারবস্টিং তাই – না?
” এখন পাচার করে না?
” আরিশ ভাইয়া বললেন যে করে না। এনিকে যেদিন বিয়ে করেছে সেদিন থেকে সমস্ত নারী পাচার আর শিশু পাচার ত্যাগ করেছে।
এড্রি নিশ্বাস ফেলে বলে,
” বাচ্চারা কত বড় হয়েছে? দেখতে কেমন হয়েছে? যদিও তর ভাই বা ভাইয়ের ওয়াইফ কাউকে দেখিনি কোনোদিন। তর ভাই তো পর্দা শীল। কালো মাস্ক আর হুডি পড়ে থাকে বাহিরে।
রিদ্ধিমার চোখে- মুখে খুশির ঝিলিক। ন্রিভ্রিতার গালে চুমু খেয়ে বলে,
” এরিক একদম এনির ফটোকপি। সেই নীল চোখ আর চেহারা একদম কপি। এরিকের দিকে তাকালে মনে হয় এনিকে দেখতে পাচ্ছি। নিভ্রিতা একদম ভাইয়ার ফটোকপি। তার ধূসর গাঢ় বাদামী চোখ, ঠোঁটের নিচে কালো তিলটা। মনে হয় যেন ভাইয়াকে দেখতে পাচ্ছি। আর আমাদের সব থেকে ছোট্ট কুইন, মাফিয়া সম্রাজ্যের ছোট রাজকন্যা নিরাশা ভাইয়া আর ভাবির কপি। তবে দুইজনের মিলিত কপি বলতে মুখটা একদম ভাইয়ার মত। বলতে গেলে নিভ্রিতা আর নিরাশা একদম ভাইয়ার কপি । তবে নিরাশার হাত – পা আর সোনালী চুল পেয়েছে এনির। সব থেকে ইন্টারেস্টিং কি জানো? এরিক চেহারার দিকে এনির মত হলেও স্বভাব একদম ভাইয়ার মত। চিৎকারে উঠে গেলে থামানো দায়। তবে যখন শান্ত থাকে তখন তার মত লক্ষী বাচ্চা দুনিয়ায় নেই। প্রচুর রাগ। অনেক উপভোগ করি এড্রি। একা জীবনে এমন ফুলের বাগান পাব কল্পনা করিনি।
এড্রি সামান্য হেসে বলে,
” দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। এমন আদর মিশিয়ে বর্ণনা দিলি যে না দেখে শান্তি পাব না।
রিদ্ধিমা চোখ বড় বড় করে হুশিয়ারি দিয়ে বলে,
” সপ্ন পূরন হবে না দোস্ত। কারন গ্যাংস্টার বসের নিষেধাজ্ঞা আছে বাহিরে নিয়ে যাওয়ার। তার উপরে মিনারে প্রবেশ করতে পারবি না তুই।
এড্রি ভোঁতা মুখে মন খারাপের সুরে বলে,
” গরীব মানুষ তাই পাত্তা দিচ্ছিস না। তর ট্রিলিয়নার ভাইয়ের বাচ্চা দেখতে গেলে এখন কি আমাকেও এত টাকার মালিক হতে হবে রিদ্ধি? সামান্য বাচ্চাদের এইতো দেখতে চেয়েছি।
রিদ্ধিমা ফুঁশ করে শ্বাস টেনে বলে,
” ভুল বুঝছিস দোস্ত। বাহিরে বের হওয়া নিষিদ্ধ। তুই বিশ্বাস করবি না এনি প্রায় তিন বছর ধরে এই বদ্ধ মিনারে আছে। এই তিন বছরের ভেতরে ও গেইডের বাহিরে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নেয় নি। আমি হলে সোজা মরে যেতাম। একদিন, এক মাস নয়। একদম তিন- তিনটা বছর ধরে এই গ্লাস মিনারে আছেন। একটা দিন বাহিরের জগতে যায় নি। আমি হলে গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করতে করতে মরে যেতাম। একজন সাইকোর সাথে থাকতে – থাকতে এনিও সাইকো হয়ে উঠেছে এড্রি। যেখানে এনি বের হতে পারে না বাহিরে সেখানে আমি বাচ্চাদের নিয়ে বাহিরে কিভাবে যাব? ইম্পসিবল! ভাইয়া জানতে পারলে রেগে যাবে অনেক। জানেও মেরে ফেলতে পারে আমাকে।
এড্রিয়ান কাঁদো- কাঁদো গলায় বলে,
” থাম বইন। তর ভাইয়ের ক্যারেক্টার সম্পর্কে পুরো আমেরিকা সহ আফ্রিকা সবাই জানে।পুরো সাইকোপ্যাথ। তর বাহিরে আসতে হবে না। যাস্ট গেইডের সামনে আয় আমি একটু দেখে চলে আসব।
রিদ্ধিমা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” কোথায় আছিস তুই?
এড্রি ভাবলেশহীনভাবে ভাবে উত্তর দেয়,
” এইতো, মিনারের সামনে গাড়ির ভেতরে বসে আছি।
রিদ্ধিমা অবাক হয়ে বলে,,
” তুই এখানে কেনো?
” তর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। তকে যেহেতু দেখব সে উছিলায় গ্যাংস্টার বসের দুর্বলতা গুলোকেও দেখে যায়। তুই কি আসবি না? নাকি গরীব বলে অবহেলা করছিস?
রিদ্ধিমা দুইটা গালি দেয় এড্রিকে। রেগে বলে,
” তুই গাড়িতে থাক। আসছি আমি এক মিনিটের মধ্যে। শালা ইমোশনাল ব্লেকমেইল শুরু করে দিয়েছিস। তিনজনকে আনতে পারব না। আমার কোলে শুধুমাত্র একজন আছে। বাকি দুইজন মায়ের সাথে ঘুমোচ্ছে।
” ওকে বেহনা!
রিদ্ধিমা ফোন কেটে ঢোক গিলে। কোন জ্বালায় পড়লো সে! এখন না গেলেও বিপদ আবার গেলেও বিপদ। ইচ্ছে করছে না যেতে। না গেলে আবার এড্রি রাগ করে বসে থাকবে। ভেবে নিবে গরীব বলে আজ পাত্তা দিচ্ছি না। কিন্তু গেইডের বাহিরে গেলে আবার আরেক বিপদ। ভাইয়া শুনতে পারলে রেগে যাবে প্রচুর।
রিদ্ধিমা ভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। গার্ডদের সামনে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে গলা খাঁকারি দেয়। গম্ভীর গলায় বলে,
” দরজাটা খুলে দাও। আর হান্টার – শ্যাডোকে দরজা থেকে সরিয়ে দেও।
গার্ড মাথা নিচু করে বলে,
” সরি ম্যাম। আমরা পারব না এইটা। বাচ্চাদের নিয়ে বাহিরে যাওয়া বারন।
রিদ্ধিমা মিথ্যে রাগের অভিনয় করে ধমকায়,
” যাস্ট সেট আপ! আমি তোমাদের বসের বোন হয়। আর আমি আদেশ করছি দরজা খুলে দাও। ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বাধ্য করো না। কোথাও যাব না আমি। সামনে আমার বাবা এসেছে। উনাকে দেখতে হবে এই মুহূর্তে। তাছাড়া একটু আগে তো দেখলে তোমাদের বস আর আমি একসাথে কথা বলছিলাম। তখন এই অনুমতি নিয়েছি।
” সত্যি বলছেন আপনি?
রিদ্ধিমা চোখ রাঙ্গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
” মিথ্যের আরোপ দিচ্ছো আমার উপর? জানের ভয় করছে না? ক্ষমতা প্রয়োগ করব? আমাকে মিথ্যেবাদী বলছো? আমার কথা ট্রাস্ট না করলে ভাইয়াকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করো। আগে আমাকে যেতে দাও। বাবা অপেক্ষা করছেন। আর হ্যা, বাবার সাথে ভাইয়াও আছেন সেখানে।
গার্ড দুইজন ভয়ে সরে যায় নিজের জায়গা থেকে। হান্টার আর শ্যাডোর উপর লোহার খাঁচা ফেলে দেয়। রিদ্ধিমা দেরী না করে দ্রুত বের হয় বাহিরে।নিভ্রিতাকে বুকে নিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। গালে চুমু খেয়ে হাসি দিয়ে বলে,
” কলিজা মামুণিকে অভিনন্দন জানাও। দেখলে কত অভিনয় করতে পারি। যদি তোমার পাপা মামুণির উপর রাগ দেখায় তবে বাঁচিয়ে নিও কেমন। আমি এক পা আর তুমি এক পাঁ, দুইজন দুই পাঁয়ে ধরে বসে থাকব। এখন চলো এড্রি তোমার সাথে দেখা করবে। খচ্ছরটার সাথে সাক্ষাত করে আসি।
রিদ্ধিমা এগিয়ে যায় কয়েক কদম। এড্রির গাড়িটা দেখতে পেয়ে দ্রুত হেটে যায় সেদিকে। গাড়ির ডোর খুলে ফ্রন্ট সিটে বসতে বসতে অধৈর্য গলায় বলে,
” দেখে নে আমার ভাই -ঝি কে। আমার কলিজাকে!
কথাটা বলে রিদ্ধিমা এড্রির দিকে তাকায়। এড্রির চোখ- মুখ কেমন লাল হয়ে আছে।খুব শক্তভাবে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে রেখেছে। অসহায় চোখে রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে চোখের পলকে একটা স্প্রে তার চোখে- মুখে মেরে দেয়। রিদ্ধিমা মুখের উপর হাত নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
” এড্রি কি করছিস এইটা?
এড্রি কেঁদে দেয় রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে। গালে হাত রেখে কান্না করে উঠে,
” বিশ্বাস, ভরসা আর বন্ধুত্বকে খুন করতে বাধ্য হলাম রিদ্ধি। আমার অসুস্থ মা- টাকে ওরা নির্যাতন করছে। ছেলে হয় আর সহ্য করতে পারছি না। ভেবেছি নিজে মরে যাব তবুও এই বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। কিন্তু ওরা আমার মাকে মারবে না রিদ্ধি। তিলে – তিলে দৈনিক কষ্ট দিয়ে মারছে। গ্যাংস্টার বসের সন্তানকে চাই ওদের। আমি নিরুপায় হয়ে ছলনার আশ্রয় নিয়েছি। ছেলে হয়ে আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে কখনো ক্ষমা করিস না রিদ্ধি। কখনো ক্ষমা করিস না।
রিদ্ধিমার চোখ- মুখ ঝাপসা হয়ে আসে। তবুও ছোট্ট প্রানকে আগলে রাখার জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে উঠে। পালিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করতে। চিৎকার করলে অন্তর গার্ডরা ছুঁটে আসবে। কিন্তু রিদ্ধিমা নিজের শরীর জায়গা থেকে নড়াতে পারছে না। কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। যাকে সব থেকে বেশি ভরসা করত সে আজ এমন জঘন্যভাবে ঠকালো? নিভ্রিতা কান্না করে উঠে। রিদ্ধিমা দেখতে পাচ্ছে কেউ একজন তার কোল থেকে প্রানটাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। সেটা এড্রিয়ান নয় সেটা রিদ্ধিমা সিউর। রিদ্ধিমা আস্ফূর্ত আওয়াজে আওড়ায়,
” ওকে বাঁচা এড্রি! প্লিজ ওকে আগলে নে। তিনটা অস্তিত্ব গ্যাংস্টার বসের জীবন। আমার ভাইটা মরে যাবে। ওদেরকে একবার না দেখলে ভাইয়া পাগল হয়ে যায়। উন্মাদ হয়ে পড়ে। ওর কিছু হলে গ্যাংস্টার বস সব কিছু ধ্বংস করে দিবে। পাষাণ হৃদয়ে ফুটন্ত ফুলটাকে ছিনিয়ে নিতে দিস না। আমার ভাইটা মরে যাবে, এনি মরে যাবে। প্লিজ মিনতি করছি তকে। ত….
রিদ্ধিমা আর কিছু বলতে পারলো না।।তার আগেই অজ্ঞান হয়ে গাড়িতে লুটয়ে পড়ে। এড্রি গাড়ি থেকে নেমে যেতেই কেউ একজন গাড়িটা অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এড্রি অনুভুতিহীনভাবে তাকিয়ে থাকে গাড়িটার দিকে। নিজেকে উন্মাদ আর পাগল পাগল লাগছে। মাঝ রাস্তায় ধপ করে বসে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭০ (২)
” ক্ষমা করো না কখনো ইশ্বর । সম্পর্কে আর বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে পারিনি। যে ভরসা নিয়ে মেয়েটা এক কথায় ছুটে এসেছে সেই ভরসাকে অস্ত্র বানিয়ে খুন করে দিয়েছি। রিদ্ধিকে নিরাপদে রেখো। জানোয়ারগুলো ওর যাতে খারাপ কিছু করতে না পারে। আমার মত বিশ্বাসঘাতককে ধ্বংস করে দাও। বাঁচতে চাই না এই জঘন্য কাপুরুষতা নিয়ে। মরতে চাই আমি। গড, ডিস্ট্রয় মি। প্লিজ ডিস্ট্রয় মি।
