লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭০ (২)
লিজা মনি
আরিশ আর নাভিদ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। নাভিদের এই অভাবনীয়, বিধ্বস্ত পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে আরিশের মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাশে রূপ ধারণ করেছে।
তার সম্মুখে দণ্ডায়মান এই পুরুষটিকে কোনোভাবেই আর চেনা যাচ্ছে না। যে ছিল পরম সুপুরুষ ও সুদর্শন, আজ সে সমস্ত আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে এক উন্মত্ত, জরাজীর্ণ পাগলের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। অযত্ন আর উপেক্ষায় মাথার চুল ও মুখের দাড়ি অপরিসীম দৈর্ঘ্য নিয়ে জট পাকিয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বিনিদ্র রজনী ও মানসিক দহনের তীব্রতায় চোখের নিচে গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের কালির রেখা স্থায়ী হয়েছে, ভেতরের দিকে বসে যাওয়া চোয়াল ও গাল দুটো তাকে অস্থিচর্মসার করে তুলেছে এবং পুরো অবয়বে এক কালচে ও পাংশুল আভা লেপ্টে গিয়েছে। এমনকি তার হাত ও পায়ের চরম বিপর্যস্ত। ধূলিমলিন ও বেহাল দশা। আরিশ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। আরিশের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ করছে যে ভালোবাসার এই নির্মম পরাজয়ে নাভিদ আজ এক করুণ, হাহাকারপূর্ণ ও ধ্বংসোন্মুখ পাগল প্রেমিকের জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।
নাভিদের এই বীভৎস, জরাজীর্ণ এবং উন্মাদপ্রায় রূপ প্রত্যক্ষ করে আরিশের সমস্ত চেতনা যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায়। অবাকতা ও তীব্র বিস্ময় তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলছে।কীভাবে একটা মানুষ জীবন্ত অবস্থাতেই এমন একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে, তা ভেবেই আরিশ সম্পূর্ণ দিশেহারা ও বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । নাভিদের কাঁধে হাত রেখে অস্ফূর্ত গলায় বলে,
” কি হাল করেছিস নিজের?
নাভিদ সেসবে পাত্তা দিলো না। অসহায় গলায় বলে,
” গার্ড আমাকে না চিনিয়ে তাড়িয়ে দিচ্চছিলো। অধিরাজ ছিলো বলে ভেতরে ডুকতে পেরেছি। আমার পাখিটাকে একটু দেখতে দিবি আরিশ। আর পারছি না সহ্য করে থাকতে।
আরিশ তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, এনিকে দেখে থমকে যায়। এনির হাতে বাচ্চার ফিডার। এনি নাভিদের দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকায়। প্রথমে চিনতে না পারলে পরবর্তীতে দুই কদম পিছিয়ে যায়। নিজেকে সামলাতে না পেরে হাত থেকে ফিডার পড়ে যায়। কাচের জিনিস মেঝেতে পড়া মাত্র এই ভেঙ্গে যায়। আরিশ উপরের দিকে তাকিয়ে বলে,
” নি..নিক কোথায়? এনি স্পিক আপ! নিক কি করছে?
আরিশের উচ্চ বাক্য এনির ধ্যান ভাঙ্গে। থতমত খেয়ে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” হ… হ্যা! উ.. উনি ঘুমাচ্ছে বাচ্চাদের সাথে।
আরিশ শান্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” এনি ত.. তুমি এখান থেকে চলে যাও। নিক দেখলে রেগে যাবে।
এনি যায় নি। নাভিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিয়ে ভাঙ্গা গলায় উচ্চারন করে,
” ন… নাভিদ ভাই। কি করেছেন নিজের? এমন ধ্বংস করলেন কেনো নিজেকে?
নাভিদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এনির দিকে। যেন কতদিনের তৃষ্ণা জমে আছে বুকে। সাহস হয় নি বলার,
” পাখি তোমাকে একটু মন খুলে দেখি।
নাভিদ কথাটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। এনি অস্বস্তিতে পড়ে যেতে পারে বা চলে যেতে পারে।।তার থেকে ভালো আড়ালে চুপি -চুপি দেখা। নাভিদ নিস্তেজ গলায় বলে,
” ধ্বংসকারী সম্মুখী দাঁড়িয়ে নিজেই প্রশ্ন করছে ধ্বংস কেনো হয়েছি? আমার পরিবর্তনের কারন ও ছিলে তুমি আবার ধ্বংসের কারন ও তুমি। অনেক কিছু জানাতে ইচ্ছে করছে তোমাকে।
এনি চোখ ভিজে যায়,
” কি বলছেন? আমি আরেকজনের স্ত্রী। ওই জানোয়ারটাকেই আমি ভালোবাসি। কেনো মেনে নিলেন না বাস্তবতা? নিজেকে কেনো তিলে তিলে শেষ করে দিলেন? আমি ভেবেছি আপনি নিজেকে গুঁটিয়ে নিয়েছেন। বিয়ে করেছেন, সংসার করছেন!
নাভিদ কোনোরকম দাঁড়িয়ে বুকের মধ্যে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বলে,
” এখানে তুমি আছো। আর এই স্থান দুনিয়ার কোনো নারী নিতে পারবে না। মরে গেলেও কাউকে বউ হিসেবে গ্রহন করব না। মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি এরপর ও তোমাকে ছাড়া আর কাউকে আশে- পাশে ঘেষতে দিব না।
নাভিদ কথা গুলো বলতে বলতে নিজের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। এনির পায়ের কাছে ধপ করে বসে যায়। এনি সরে যেতে চাইলে নাভিদ যেতে দেয় না। এনি স্তব্দ হয়ে পাথরের মত দাড়িয়ে থাকে।
” সব জিনিসের একটা ধৈর্য থাকে পাখি। আর কত ধৈর্য ধরে থাকব? আমার অতীত আমাকে এতটা তাড়া করেছে যে তোমাকে পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি। যখন পুরো জগৎ তোমাকে দুরে ঠেলে দিয়েছিলো ঠিক তখন তোমাকে আগলে নিয়েছিলাম। সাত বছর নিজের কাছে রেখে সব বিপদের মোকাবেলা করেছি। আমি তো খুব ভালোবেসেছি তুমি কেনো আমাকে একটু ভালোবাসলে না? তোমার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছি একটু ভালোবাসার আশায়। তোমাকে পাওয়ার আশায় জীবনটাকে পর্যন্ত বাজি রেখেছি। তুমি এমন একজনকে ভালোবাসলে যে তোমার জীবনটাকে জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছে। ফুল থেকে তুলে এনে নরকে ঠাঁই দিয়েছে। আঘাতে রক্তাক্ত করে ক্ষত- বিক্ষত করেছে বার বার।
এনির শরীর কেঁপে উঠে। শক্ত করে ধরে রাখে নিজের জামার একাংশ। বাস্তব সব কিছু ভুলে যেতে ইচ্ছে করছে। তার জন্য একটা মানুষ এমন তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এইটা ভাবা মৃত্যুর থেকেও বেশি কষ্টকর। এনি নিস্তেজ শরীর নিয়ে নাভিদের মুখোমুখি হয়ে বসে যায়। গলা কেঁপে উঠে রমণীর,
” বাস্তবতা মেনে নিন নাভিদ ভাই। ভেবে নিন এনি আপনার ভাগ্যে ছিলো না। এক পাপী- নরপশুর ভাগ্যে সে আছে। একটা সময় এই স্থান জাহান্নাম মনে হলেও এখন নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখেছি। এতটাও কষ্ট অনুভব হয় না। কি করব বলেন, ভাগ্যের উপর তো কারোর হাত থাকে না।
নাভিদ ছলছল চোখে চেয়ে রইলো রমণীর অশ্রুভেজা চোখের দিকে।
” আমি জানি, তুমি কোনোদিন আমার কপালে হাত রেখে বলবে না ‘আমি শুধু তোমার।’ আমি এইটা ও জানি, তোমার ওই মন খারাপের রাতে আমার দেওয়া সান্ত্বনার কোনো মূল্য নেই, তোমার হাসির কারণ অন্য কেউ। তাও কেন জানি এই বোকা মনটা কোনোদিন কোনো যুক্তি মানতে চায় না। প্রতিটা রাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, যখন বালিশে মুখ গুঁজে আমি ছটফট করি, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি লাগে। মনে হয়, আমার বলতে তো কেউ নেই!
তুমি তো দিব্যি আছ। নিজের মতো করে হাসছ, বাঁচছ, অথচ তোমার একটুখানি মনোযোগ পাওয়ার জন্য আমি নিজেকে প্রতিদিন তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছি। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে শুধু তোমার নাম। আমার প্রতিটা কান্নায় শুধু তোমার অবহেলা। আমি তো তোমার কাছে পুরো আকাশটা চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম একটুখানি আশ্রয়। একটুখানি ভালোবাসা। কিন্তু তুমি আমায় এতটাই পর করে দিলে যে আজ নিজের চোখের জল লুকানোর জন্য আমাকে অন্ধকারের সাহায্য নিতে হয়। জেনেশুনে এমন একটা মানুষকে ভালোবেসে ফেললাম যাকে ছুঁয়ে দেখার ভাগ্যটাও আমার কোনোদিন হবে না। তবুও যদি কখনো পরজন্মে আমাদের দেখা হয় আমি আল্লাহর কাছে শুধু এইটুকুই চাইব তিনি যেন আমার এই ভাঙা বুকটার মতো একটা বুক তোমাকে দেন। যাতে তুমি বুঝতে পারো কাউকে না পেয়েও এভাবে ভালোবেসে যাওয়ার মাঝে কতটা তীব্র যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে! অহহ হ্যা, পরজন্ম বলতে তো আবার কিছু হয় না। একটা মাত্র জীবন পেয়েছিলাম আমি। এই একটা জীবনে তুমি কেনো আমার হলে না পাখি?
এনির সমস্ত শরীর আচমকা এক হিমশীতল আতঙ্কে শিরশির করে উঠল। মনের ভেতর একঝাঁক কথা জট পাকিয়ে গেলেও সে কিছুতেই তা মুখে প্রকাশ করতে পারল না।
নাজলী ধীর পায়ে এগিয়ে যায়।তারপর নাভিদের কাঁধে একটা হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বলে,
” নাভিদ, শান্ত হও। এতটা উন্মাদ হয়ে উঠলে কিভাবে চলবে?
নাভিদ তার অশ্রুশিক্ত, রক্তাভ চোখ দুটো তুলে নাজলীর দিকে তাকায়।সেই চোখে আর কোনো হিংস্রতা নেই।আছে কেবল এক বুক হাহাকার। নিজের অবশ পা দুটো কোনোমতে মেঝেতে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে সে নাজলীর একেবারে সামনে গিয়ে আছড়ে পড়ল। তারপর দুই হাতে নাজলীর পা দুটো জড়িয়ে ধরে ভাঙা রুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
” তুমি তো আমার সব আবেগ, আমার কামনা, আমার পবিত্র ভালোবাসা সব জানতে নাজলী। এনিকে যখন বিয়ের কথা বলেছিলাম তখন তুমি বলেছিলে এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই নাভিদ। এনি তো এখনও অনেক ছোট। একটু বড় হোক তখন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমি তোমাদের বিয়ে দিব। আমি বেঁচে থাকতে এনির বিয়ে আর কোথাও হবে না। এনি শুধু তোমার এই। আর সারাজীবন তোমার এই থাকবে।
কোথায় গেলো সেসব প্রতিশ্রুতি নাজলী? সেদিন পর্যন্ত আমার সাথে নিকের বিরুদ্ধে লড়াই করে গিয়েছো। আর আজ লড়াই করতে এসে তার এই বন্ধুর সাথে সংসার সাজিয়ে নিয়েছো! এমনকি নিককে নিজের বোনের স্বামী হিসেবে ও গ্রহন করে নিলে? একবার ও ভাবলেও না এক পাগল প্রেমিক উন্মাদের মত ছটফট করছে। তুমি তো জানতে এনি আমার জন্য কি ছিলো! আমার প্রতিটা অনুভুতি তোমার সাথে শেয়ার করেছি। বন্ধু ছিলে তুমি আমার। এরপরও এইভাবে আঘাত করলে কিভাবে? আমাকে কেনো এত বড় ধোঁকা দিলে তোমরা? নাজলী জানোতো, নাভিদ কখনো কারোর পায়ের সামনে পড়ে না। এই তো ভালোবাসার ভিক্ষে চেয়ে কতবার যে পড়েছি তার হিসেব নেই। আজও পড়লাম।
নাভিদের এই আকস্মিক ভেঙে পড়া আর পায়ের কাছে আছড়ে পড়া দেখে নাজলীর ভেতরের শক্ত বাঁধটাও যেন এক নিমেষে আলগা হয়ে গলে যায়।সে আলতো করে নিজের চোখের পাতা নাড়ায়,
” ক্ষমা করো আমাকে নাভিদ। আমি তোমার বিশ্বাস রক্ষা করতে পারি নি। আমরা সবাই পরিস্থিতির স্বীকার। তুমি বলো, কম চেষ্টা করেছি আমি? এনিকে নিকের জীবন থেকে সরিয়ে দিতে নিজের জীবন বাজি রেখেছি। আরিশের সাথে মিথ্যে বিয়ের নাটক অব্দি করেছি এনির কাছে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু আমি পারিনি নাভিদ। ব্যার্থ আমি! যতক্ষনে পৌঁছেছিলাম ততক্ষণে সব কিছু পাল্টে গিয়েছে। সময়, পরিস্থিতি, সম্পর্ক, অনুভুতি সব বদলে গিয়েছে। গ্যাংস্টার বস এনির জন্য ঠিক কতটা হিংস্র হতে পারে সেটা তুমি না দেখলে কখনো অনুমান করতে পারনে না নাভিদ। এনিকে ছিনিয়ে নেওয়া মানে ছিলো সিংহের গুহা থেকে তার শিকারকে ছিন্তাই করা। তবুও অনেক বার চেষ্টা করেছি যাতে এখান থেকে পালাতে পারে। চেষ্টা করতে করতে এতটা দেরী হয়ে গেলো যে আমার বোনটা ওই হিংস্র মানবটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। নিকের অবর্তমানে এনির অবস্থা তুমি স্বয়ং নিজ চক্ষে দেখে গিয়েছো। কি করব আমি? অসহায় আমি। সম্পর্কের বেড়াজাল আমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে ফেলেছে। বাস্তবতা মানতে শুরু করে দিয়েছি। তুমিও মানিয়ে নাও সব কিছু।
নাভিদ উপহাস করে হাসে। চোখে পানি অথচ ঠোঁটের কোণে লেগে আছে ব্যাথার হাসি,
” কি আশ্চর্য, তার জন্য আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি আর সে অন্যের জন্য হারাচ্ছে।
পর পর এনির দিকে তাকিয়ে ব্যাথিত গলায় বলে,
” কেনো সেদিন সমুদ্রের পাড়ে আমার সামনে এসেছিলে? আমার মত একজন রে*পিস্ট নরখাদক এর মনে পবিত্রতা কেনো ছড়ালে? কুলষিত আর অভিশপ্ত আমিটাকে কেনো মক্কা পর্যন্ত নিয়ে গেলে? বিধর্মী আমিটাকে কেনো নিজের ধর্মের অনুসারী করে তুললে? খোদার কাছে কিভাবে চাইতে হয় জানা ছিলো না। কি বলে চাইলে খোদা তোমাকে আমার করে দিবে সেটাও জানতাম না। সব কিছু ছেড়ে সব কিছু শিখতে শুরু করেছি। দিন – রাত প্রতিটা মোনাজাতে খোদার কাছে তোমাকে চেয়েছি। তবুও খোদা কেনো এত নিষ্ঠুর হলো। কেনো তুমি আমাকে একটু ভালোবাসলে না? তোমার শুভ্র মনে প্রেম ফুটাতে নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলেছি। আর তুমি আমাকে এড়িয়ে গিয়ে এমন একজনকে ভালোবাসলে যে তোমাকে কথায়, শারিরীকভাবে, মানসিকভাবে আঘাত করে বারং বার রক্তাক্ত করে ফেলে। কেনো এমন করলে?
এনি স্তব্দ হয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়। চোখ দুইটা অবাকের চরম পর্যায়ে। নাভিদের প্রতিটা কথা তার কানে শিশার মত ভারী লাগছে। কেমন যেন অস্থির লাগছে ভেতরের সব কিছু। কাঁপা গলায় কোনোরকম উচ্চারন করে,
” র.. রে*পিস্ট! নরখাদক! ক.. কি বলছেন এইসব নাভিদ ভাই? মক্কা ছুঁয়েছেন, বিধর্মী থেকে ইসলাম ধর্ম! নাভিদ ভাই কি বলছেন এইসব?
পরের লাইনটা এনি চেঁচিয়ে উঠে। কেমন উন্মাদের মত লাগছে তার চোখ – মুখ। আরিশ আর নাজলী একইসাথে এনির দিকে তাকায়। নাজলী ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। এনি যে জেডকে মেরেছে এইটা যদি নাভিদ জেনে যায় তখন ভাইয়ের রক্ত কি টগবগিয়ে উঠবে না? আর এনি যদি জানে সেই কুখ্যাত শয়তানটা নাভিদের আপন ভাই তবে এনির কি অবস্থা হবে! নাভিদ শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হেসে উঠে,
” এই বিষাক্ত অতীতের জন্য তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি আমি। নিক আমাকে বলেছিলো যদি তোমাকে ছিনিয়ে নিতে আসি তবে আমার অতীত তোমাকে জানিয়ে দিবে। তোমার চোখে ঘৃনা দেখার ভয়ে কোনোদিন সাহস পায় নি সামনে দাড়ানোর। কিন্তু আজ আর কোনো ভয় করছে না। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে সব বলে দিতে। জানো পাখি, আমি এই মাফিয়া সম্রাজ্যের মালিক এর ছেলে ছিলাম। নিক গ্যাংস্টার বস হওয়ার আগে আমার বাপ ছিলো এই সম্রাজ্যের মালিক। আমার বাপ নিককে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ত্যাগ করেছে। আমাকে আর আমার ভাইকে তার হাতে তুলে দিয়েছিলো। বলেছিলো যাতে কোনোদিন আমাদের উপরে আঘাত না করে। সবাই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে, তোমার দিকে একটা কীট ও যদি তাকায় তাহলে তাকে নরক যন্ত্রনা দেয়। তবে আমাকে কেনো কিছু করে নি, কেনো আঘাত করে না। কারন গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান আমার বাপের কাছে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ ছিলো। এই সম্রাজ্য, এই দুনিয়ার প্রতি আমার কোনো লোভ ছিলো না। কারন আমার জীবন – যাপন ছিলো সাধারন থেকে আলাদা। মানুষরুপী এক নর*খাদক আমি। ঠিক কতটা কুমারী মেয়ের সতিত্ব নষ্ট করেছি তার হিসেব নেই। নির্মম আর নির্যাতনের মাধ্যমে ভিবৎস্যভাবে রে*প করেছি। তারা যত চিৎকার, ছটফট করত তত আনন্দ আর উল্লাস করতাম। আমার যেন উৎসব লেগে ছিলো। কুমারী মেয়েদের প্রতি ছিলো আমার এক বিকৃত যৌন লালসা। তাদেরকে মেরে তাদের এই কাচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছি। রক্ত দিয়ে গোসল করতে পৈশাচিক আনন্দ পেতাম। হুট করে একদিন বাহিরের দুনিয়ায় বের হয়েছিলাম। সমুদ্রে পাড়ে গিয়েছে নতুন শিকারের খুঁজে। ঠিক তখন শিকার খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যায় এক অমূল্য রত্ন। যার সোনালী কেশ, নীলাভ চোখের মনি আর ভুবনমোহিনী সুন্দরী! একজন বাচ্চা মেয়ে, এক রুপবতী ইরানের রাজকন্যার হাসিতে নরখাদক রুপটা থমকে যায়। ভেবেছি বাকি সব মেয়েদের মত তোমার অবস্থা করব। যাকে বলে এক রাতের বিকৃত লালসা মেটানোর বস্তু। জানো পাখি আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে নি সেই পাপ কাজ করা। নিজের সেই নরকময় কক্ষে এসে ঘুমাতে পারছিলাম না। কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেও কেমন যেন অসহ্য লাগতে শুরু করে। মনে হচ্ছিলো ওদেরকে ছুঁয়ে দিলে তোমাকে অপবিত্র করা হবে। কি আশ্চর্য, একজন রে*পিস্ট এক নারীর পবিত্রতা নিয়ে ভাবছে!
সেদিনের পর কোনো মানুষের মাংস খায় নি। কোনো এক অলৌকিক শক্তির ধাঁচে ভেতরে ভয় ডুকতে আরম্ভ করে। ইচ্ছে করছিলো তোমার সাথে জীবন কাটাতে, তোমার সাথে আজীবন বাঁচতে। কিন্তু আমার মত পশুরা কখনো কারোর ভালোবাসা পায় না। খাওয়া – দাওয়া ঘুম সব বাদ দিয়ে নিজের ভাই সবাইকে রেখে রাতের অন্ধকারে ছুঁটে যায় সেই ইরানের রাজকন্যার উদ্দেশ্যে। দুই মাস পর তার দেখা পায় রাজা আর রানীর কোলের সেই আদরের রাজকন্যার। জানতে পারি সে মুসলিম। একবারের জন্য পিছনে ফিরে তাকায় নি। কারোর কথা একবারের জন্য ও কল্পনা করিনি। শুধু অনুভব করেছি তুমি পবিত্র, খুব পবিত্র। যাকে স্পর্শ করার বা পাওয়ার সাধ্য আমার নেই। পাগলের মত ছুঁটে যায় মসজিদের উদ্দেশ্যে। ধর্ম গ্রহন করে ফেলি সময়ের ব্যবধানে। নিজেকে পবিত্র করতে আবার ও ছুঁটে যায় মক্কার উদ্দেশ্যে। একাধারে সতেরো দিন নিজের পাপের ক্ষমা চেয়েছি। তোমাকে চেয়েছি পাগলের মত। এতটা পাগলের মত তোমাকে চেয়েছি যে নিজের জন্য কিছু চাইতে ভুলে গিয়েছিলাম।
এনির মাথা ভঁনভঁন করব উঠে। পুরো শরীর – মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসে মুহূর্তেই। মাথায় হাত দিয়ে পড়ে যেতে নেয়। নাজলী শক্ত করে এনির বাহু চেপে ধরে। এনি কোনোরকম নিজেকে সামলিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ে,
” আ.. আপনি তাহলে সেই আরেকজন! জ..জেড এর ভাই? অতীতের এক বিষাক্ত নরখাদক, একজন রে*পিস্ট!
নাভিদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এনি কেমন অদ্ভুতভাবে হাঁপাচ্ছে। এনির এমন অবস্থা দেখে নাভিদ কেমন পাগলের মত হেসে উঠে,
” আমাকে দেখে ঘৃনা লাগছে পাখি? ইচ্ছে করছে শরীর কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিতে? আমার অতীত এতটা বিষাক্ত কেনো বলতে পারো? মেরে ফেলতে চাও তবে মেরে দাও। প্লিজ পাখি আমার দিকে ঘৃনা নিয়ে তাকিও না। এই মুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে মরে যাব।
এনি মুখে হাত দিয়ে কেঁদে উঠে। কেমন যেন অস্থির লাগছে ভেতরটা। ঠোঁট ভিজিয়ে ফের বলে,
” এ.. একজন নরখাদক কিভাবে স্বাভাবিক জীবনে আসতে পারে? তারা কখনো সাধারন হয় না। ওরা বিকৃত থাকে। আপনি কিভাবে স্বাভাবিক জীবন পেলেন?
” তোমার পবিত্রতা!
নাভিদের ছোট একটা বাক্য। এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রন রাখছে। এমন জঘন্য সত্য কেনো আজ তার সামনে আসলো?
এনিকে কাঁদতে দেখে নাভিদ ফিঁচেল হাসে। এনির গালের পানি গুলো ইচ্ছে করছিলো মুছে দিতে। হাত বাড়ায় এক মুহূর্তের জন্য। পর মুহূর্তে কিছু ভেবে হাতটা নামিয়ে ফেলে।
” এই অতীত যদি না থাকত তবে আজ তুমি আমার বউ হতে। আমার সংসার হত তোমার সাথে। আমরাও আজ হ্যাপি ঘর সাজিয়ে নিতাম। নিকের বাচ্চা তোমার পেট থেকে না হয়ে আমার বাচ্চার জননী হতে তুমি। ভালোবাসার এই খেলায় কিন্তু আমি হেরে যায় নি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তোমাকে পাওয়ার চেষ্টা করে যাব। প্রতি সেকেন্ড তোমাকে চেয়ে যাচ্ছি আর অন্তীম মুহূর্তেও তোমাকে এই চাইব। যদি এই চাওয়াটা পাপ হয় তবে আমি নাভিদ সেটা সহস্রবার করব। ত….
নাভিদ নিজের বাক্যটি সম্পূর্ণ করার সামান্যতম সুযোগও পেল না। তার ঠোঁটের ডগায় আটকে থাকা শব্দগুলো বের হওয়ার আগে এক তীব্র ও অতর্কিত বজ্রাঘাতের মতো কেউ একজন তার নাক আর মুখ লক্ষ্য করে প্রচণ্ড এক ঘুষি চালায়। সেই অভাবনীয় আঘাতের তীব্রতায় আর গতিতে নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না নাভিদ।একদম ছিটকে গিয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ল পেছনের শক্ত দেয়ালটার গায়ে।
” নাভিদ ভাই, সাবধানে!
নাভিদ ছিটকে পড়ার পর, এনি নিজের বাক্যের অবশিষ্টাংশ উচ্চারণ করার আগেই নিক এক জোড়া ফুটন্ত, রক্তাভ ও হিংস্র চোখ নিয়ে তার দিকে অগ্নিদৃষ্টিপাত কররে। সেই চোখের তীব্র চাহনিতে যেন জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলার মতো আক্রোশ উপচে পড়ছে।
এনি আতঙ্কে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। অমনি তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠে
এতক্ষণ নাভিদের মুখ থেকে একের পর এক নির্মম বাস্তবতা শুনতে শুনতে সে নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থানটাই সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল। লোকটা এখন কোন প্রলয় ঘটাবে?
কোনো উপায় না পেয়ে, এক চরম অসহায়ত্বে এনি নিকের শক্ত বাহু দুটো খপ করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে,
” প.. প্লিজ মারবেন না।
অনিয়ন্ত্রিত আক্রোশে অন্ধ হয়ে সে এনির কোমল গ্রীবাদেশ তথা গলা প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরল।
সেই পৈশাচিক চাপে এনির শ্বাসনালী যেন এক নিমেষে অবরুদ্ধ হয়ে আসে।ফুসফুস অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করে উঠেছে। হাতের নখের তীক্ষ্ণতা আর পাশবিক বল প্রয়োগে তার মনে হতে লাগলো। গলার মাংসপেশিগুলো এখনই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তীব্র যন্ত্রণায় আর বাঁচার আকুলতায় অবলা রমণী ছটফট করতে লাগল। ত হাত-পা অবশ হয়ে আসার উপক্রম!
এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে নাজলী আর নিজের ভেতরের আতঙ্ক ধরে রাখতে পারল না। সে পাশে থাকা আরিশের হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ব্যাকুলতা ও অস্থির কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠে,
” আরিশ প্লিজ, আমার বোনটাকে আঘাত করতে মানা করেন। ও এমনিতে অনেকটা দুর্বল আর অসুস্থ। ওকে মেরে ফেলবে। প্লিজ আরিশ কিছু তো করুন।
আরিশ অসহায় চোখে তাকায় নাজলীর দিকে। স্ত্রীর চোখের পানি মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” শান্ত হও। তুমি আশ্বস্ত থাকো এনির কোনো ক্ষতি হবে না। নিক মৃত্যুর দরজায় গিয়েও এনিকে খুঁজে চলবে। আর সেখানে নিজের হাতে হত্যা করা অনেক কিছু! এনি তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো। এনির জায়গায় নিক হলে নিজেকে এই শেষ করে দিত। চিন্তা করো না, জানে অন্তত মারবে না।
চারপাশে না তাকিয়ে নিক হিংস্র হায়েনার মত গর্জে উঠে,
” আমার স্বভাব, আমার রাগ,আমার জেদ সব জানার পর ও এমন বালের ইমোশনাল কাহিনী শুনার সাহস কিভাবে পেলি ?আমাকে কি তর মহৎ হৃদয়ের পুরুষ মনে হয়, যে রাস্তা – ঘাটে বউ বিলিয়ে রাখব?
এনির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অবিরাম। একটু কথা বলতে পারছে না। শুধু ঝাপসা চোখে নিকের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে যাচ্ছে।
নাভিদ সামনের দিকে তাকিয়ে চোয়াল পিষে। এনিকে আঘাত করতে দেখে নিজের সব জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জীবনের সব থেকে বড় শত্রুর সাথে মোকাবেলা করার জন্য জীর্ণ শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
হাতের মধ্যে একট ফ্লাওয়ার টব তুলে নিকের মাথায় আঘাত করতে যাবে তার আগেই আরিশ ধরে ফেলে নাভিদের হাত। নাভিদ ধ্বস্তাধ্বস্তি করে চিৎকার করে উঠে,
” আমাকে ছাড় আরিশ, এই কুত্তার বাচ্চাকে আজ আমি মেরে ফেলবো। এর জন্য আমি আমার সব হারিয়েছি। নিজের বাপের চেয়ার ছেড়ে দিয়েছি, ওকে বসতে দিয়েছি সেই চেয়ারে। নিজের বাপের মৃত্যুর জন্য কোনোদিন দায়ী করি নি। আর এই শুয়রে বাচ্চা আমার সব কেড়ে নিয়েছে। আমার কলিজাটা টেনে ধরে রেখেছে। দেখ, সবার সামনে কিভাবে আঘাত করছে। বদ্ধ রুমে কি করে আমার পবিত্র ফুলের সাথে?
পুরো কামড়া কেমন যেন ঘুমোট বেঁধে গিয়েছে। নিক এনিকে ছিটকে দুরে সরিয়ে দেয়। এনি আছড়ে পড়ে ডিভানের উপর। সাথে সাথে মুখ চেপে ধরে কেঁদে উঠে রমণী। নিক চোখ- মুখ শক্ত করে নাভিদের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে এলোপাথারি চোখে- মুখে ঘুষি দিতে থাকে। নাক – মুখ দিয়ে ছিটকে পড়ছে তাজা রক্ত। আরিশ নিককে আটকাতে গেলে নিকের শক্ত চোয়াল আর চোখ-মুখ দেখে সরে আসে।
নাভিদের নাক ফেটে রক্ত পড়ছে অবিরাম। এক সময় ঢলে পড়ে যায় মেঝেতে। এতেও যেন নিকের রাগ কমছিলো না। নাভিদের পেটের দিকে বসে ছুঁড়ি বের করলেই এনি আৎকে উঠে। উড়নার ঠিক- ঠিকানা নেই। বর্তমানে কি হতে যাচ্ছে অনুমান করতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে সব কিছু। এই লোকটার কাছে এনি অনেক ঋণী। বাপ – মারে হারিয়ে যখন একটা শক্ত ছায়া তার জীবনে প্রয়োজন ছিলো তখন এই লোকটা তাকে আশ্রয় দিয়েছে, আগলে রেখেছে। একজন মানুষের অতীত দিয়ে কখনো তার বর্তমান যাচাই করা যায় না। লোকটা অতীতে কেমন ছিলো সেটা ভেবে আমার কি লাভ! আপনি বর্তমানে অনেক শুদ্ধ পুরুষ নাভিদ ভাই! আমার জন্য আপনার এই করুণ অবস্থা সহ্য করতে পারছি না। আপনাকে কিভাবে বাঁচাব আমি? কি করলে এই প্রলয় থামবে এখন?
আপনার কিছু হলে আমি আত্নগ্লানিতে ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব। এনি কোনো কিছু না ভেবে নিকের কাছে যায়। নিক বুঝার আগেই ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। নিক ঘাতক দৃষ্টিতে তাকায় এনির দিকে। এনি ছুঁরিটা হাতে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় দুরে কোথাও। নিক রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে,
” ছুঁরিটা আমাকে ফিরিয়ে দাও ব্লাডরোজ!
এনি নাভিদের অবস্থা দেখে আবার ও কেঁদে উঠে। কি অবস্থা করেছে মেরে। কেঁদে বলে,
” দিব না ছুঁরি।উনাকে এই মুহূর্তে ছেড়ে দিন।
নিক ঠোঁট কামড়ে হাসলো সেদিকে তাকিয়ে। ঘাড়ে আঙ্গুল ঘেষে শাষিয়ে বলে,
” ইউ নো ব্লাডরোজ কিছু সময় এমন – এমন বোকামো করো ইচ্ছে করে গলাটা চেপে ধরে শ্বাস বন্ধ করে ফেলি।
এনি নাভিদের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিকের কাছে মিনতি গলায় বলে,
” ছেড়ে দিন উনাকে। লোকটা এমনিতেই অসুস্থ। নিজের ভারসাম্যের মধ্যে নেই। আপনি একটু তাকিয়ে দেখুন নাভিদ ভাইয়ের দিকে। আগের নাভিদ সে আর নেই। লোকটা তিলে – তিলে মরে যাচ্ছে। ছেড়ে দিন।
” কষ্ট হচ্ছে? ব্যাথা অনুভব করছো হৃদয়ে?
এনি কান্না ভেজা চোখে তাকায় নিকের দিকে। চোখে তার প্রশ্নবোধক চাহনি। এনির এমন মায়াবী মুখ নিকের রাগটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিক গর্জে উঠে,
” বান্দির বাচ্চা বলছিস না কেনো? কষ্ট অনুভব হচ্ছে?
নিকের ধমকে এনি কেঁপে উঠে। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট ভেজায়। জড়তা নিয়ে উচ্চারন করে,
” মনুষ্যত্ব সারা দিচ্ছে। একজন অপরাধ ছাড়া মানুষকে আঘাত পেতে দেখলে মন জেগে উঠে। খারাপ লাগবে স্বাভাবিক।
নিক ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে বলে,
” ট্রাস্ট মি ব্লাডরোজ তর মন আর পেটের ভেতরটাকে যদি কু*পিয়ে ছিন্ন- বিচ্ছিন করতে পারতাম তবে শান্তি অনুভব করতাম কিছুক্ষণের জন্য।
নাভিদ অজ্ঞান অবস্থায় গোঙ্গিয়ে উঠে। এনি সেদিকে তাকিয়ে নিকের কথাকে এড়িয়ে যায়। কাঁপা গলায় উচ্চারন করে,
” প..প্লিজ নাভিদ ভাইকে আর মারবেন না। আর মারবে না। উনার কিছু হলে কখনো ক্ষমা করব না আপনাকে।
নিক যত চাচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রনে আনতে এনি তত সেটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিশেহারা হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। ঘাড় গলিয়ে সোনালি চুলগুলো চেপে ধরে শক্তভাবে। এনির ভেজা নীল পল্লবে তাকিয়ে দাঁত পিষে,
” তুই ক্ষমা করবি তর বাপ সহ করবে। আমাকে কি মনে হয় তর? পৃথিবীর সব থেকে আদর্শ আর দয়াবান পুরুষ? বান্দির বাচ্চা,তুই জানতি না তকে ভালোবাসে? জানার পর ও সামনে কেনো দাড়ালি? আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে, আমার ঘর করে পর পুরুষের জন্য কেনো কাঁদলি তুই? কথা বল! পর পুরুষের ছুঁয়া পেতে ভালো লাগে? ভালো লাগে না আমাকে আর?
এনি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে যায় নিকের দিকে। চোখ- মুখ থেকে যেন রক্ত সরে যায়। চোখে আবার ও পানি এসে ভীর করে। আড়চোখে চারপাশে চোখ বুলায়। নাজলী আর আরিশের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য ইচ্ছে করছিলো নিজেকে শেষ করে দিতে। নিক তাকে আঘাত করেছে, গালি দিয়েছে, বাজে আচরন করেছে কিন্তু কোনোদিন চরিত্র নিয়ে কথা বলে নি। এনির শরীরটা কেমন জানি শক্ত হয়ে আসে। ঠোঁট কামড়ে ধরে অদ্ভুত ভাবে হেসে বলে,
” একজন রক্ষিতার চরিত্র আর কতটুকু ভালো হবে বলুন? অনেক পুরুষের এই ছুঁয়া পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি করব বলেন, আপনার জন্য বাহিরে বের হতে পারি না। কোনো প্রস্টিটিউট ক্লাবে গিয়ে খদ্দেরকে খুশি করতে পারছি না। চরিত্র নিয়ে কথা বলার আগে বুক কাঁপে নি আপনার? জানোয়ার!
এনি জোর করে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে। নিক কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিকের চাহনি এনির হৃদয় ছুঁতে পারে নি। দুরে ফেলে দেওয়া ছুঁরিটা নিকের উদ্দেশ্যে দিয়ে বলে,
‘ মেরে দিন একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে। তবে মনে রাখবেন অনেক কিছু পাল্টে যাবে। অনেক কিছু!
এনি আর দাঁড়ালো না। আরিশ নিজেও হতভম্ভ হয়ে যায়। এনিকে আটকাতে গেলে এনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হয়। আরিশ চোয়াল শক্ত করে নিকের সামনে আসে। অধিরাজকে আদেশ দিয়ে বলে,
” নাভিদকে দ্রুত হসপিটালে ভর্তি করা।
নিক চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” পর – পুরুষের জন্য আমাকে থ্রেড দিয়ে গেলো?
পর পর অচেতন আর রক্তাক্ত নাভিদের দিকে তাকিয়ে ঝুঁকে পড়ে। ফের চেঁচিয়ে উঠে,
” ওর কলিজা না খাওয়া অব্দি শান্তি মিলবে না আমার।
আরিশ গিয়ে আটকায় বেপোরোয়া আর উগ্র নিককে। অধিরাজ এক প্রকার যুদ্ধ করে নাভিদকে নিয়ে যায়। নিক উন্মাদের মত টেবিলটা উল্টে ফেলে দেয়। কাচের ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠে চারপাশ। গতকালের ক্ষতে টান পড়াতে আবার ও রক্ত বের হওয়া শুরু হয়। কন্তু সেদিকে কারোর খেয়াল নেই। আরিশ খুব ঠান্ডা গলায় বলে ,
‘ এনির দিকটা দেখলি আর তুই যে আকারে – ইঙ্গিতে ওকে বাজে কথা বলেছিস সেটা? চরিত্রহীন ও বলে ফেললি! লাইক সিরিয়াসলি নিক! মেয়েটা তর সমস্ত হিংস্রতা- পাপ সহ্য করে মেনে নিয়েছে আর তুই এখন ও সেই আগের সাইকো রয়ে গেলি। ও যদি হাজারটা সেক্রিফাইস করতে পারে তবে তুই কেনো কিছু পারছিস না। তর ধারনা আছে কতটা হার্ট করেছিস?
নিক হতভম্ভ হয়ে বলে,
” আশ্চর্য, আমি কখন চরিত্র হীন বললাম?
আরিশ চোখ- মুখ খিঁচে দুইটা গালি দেয়। চোয়াল শক্ত করে বলে,
” শালা তর কপালে বউ যে এখনও টিকে আছে এইটা ভাগ্য! এই আঘাত করছিস আবার তার জন্য পৃথিবী উলোট – পালোট করে দেওয়ার কথা ভাবিস। এইসব অস্বাস্থ্যকর আসক্তি বাদ দিয়ে ভালোবাসতে শিখ। নয়ত অনেক কিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলবি।
নাভিদের অচেতন দেহটাকে গাড়ির পেছনের সিটে চালান করে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল অধিরাজ। খোলা আকাশের নিচে এসে পকেট থেকে লাইটার আর সিগারেট বের করল। মাত্র একটা টান দিয়েছে, এমন সময় অন্ধকারের বুক চিরে তানভীকে এগিয়ে আসতে দেখল সে।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো শরীর জমে গেল অধিরাজের। তানভীকে এখানে এই মুহূর্তে আশা করেনি সে। অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে গিয়ে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা তড়িঘড়ি করে মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে দিল। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
তানভী কাছে এসে দাঁড়ায় তার কপাল কুঁচকে ছোট হয়ে এসেছে, চোখে তীব্র সন্দেহের আভাস। এক পা এগিয়ে এসে সে সরাসরি অধিরাজের মুখের একদম মুখোমুখি দাঁড়ায়। অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে রমণীর কুচকানো মুখ দেখে। তানভী সন্দেহ করে আলতো করে নাক টেনে পারিপার্শ্বিক বাতাস থেকে গন্ধটা বোঝার চেষ্টা করে।
ধরা পড়ে গিয়ে অধিরাজ একেবারে কাঠ। তার চেনা সেই চতুর, গম্ভীর রূপটা এক নিমেষে গায়েব। সে তানভীর দিকে অত্যন্ত অসহায় আর অপরাধী চোখে তাকিয়ে থাকে। যেন কোনো ছোট বাচ্চা লুকিয়ে চকোলেট খেতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তানভী নাক- চেপে ধরে কটমট করে বলে,
” এসেছিলাম চুমু খাব। খাচ্ছর লোক তর ঠোঁট ছুঁয়া ও আমার জন্য অপবিত্র। বারন করেছিলাম তো এইসব ছাইপাশ না খেতে! কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না আজ তার অনুমান পেলাম।
তানভী রাগে কথা গুলো এক নিশ্বাসে বলে থামে। অধিরাজ কিছু বলার আগেই রমণী জায়গা থেকে প্রস্থান করে। অধিরাজ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকে প্রস্থানের দিকে। এই মুহূর্তে পিছনে ঘুরার সময় নেই। দ্রুত হসপিটালে নিতে হবে নাভিদকে।
নাভিদকে গাড়িতে তুলে অধিরাজ যখন নিজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আবার ও একটা শব্দে তার কান খাড়া হয়ে যায় । মনে হচ্ছে কেউ একজন অন্ধকারের বুক চিরে মিনারটার দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে।
দূর থেকে আবছা অবয়বটা দেখেই অধিরাজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। খুব চেনা, বড্ড পরিচিত একটা গড়ন! কৌতুহল আর এক অজানা আশঙ্কায় সে ধীরপায়ে গেইট পার হয়ে সামনে এগিয়ে যায় । কিন্তু একটু কাছে যেতেই তার কুঁচকে থাকা কপালটা শিথিল হয়ে আসে বিস্ময়ে।
একটা অল্পবয়সী মেয়ে গেইটের গার্ডদের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। ক্লান্তি আর ভয়ে তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। গার্ডরা যখন তাকে আটকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিতে চাচ্ছে। পেছন থেকে মেঘের মতো গর্জে উঠল অধিরাজের ভারী কণ্ঠস্বর,
”গর্দান হারাতে না চাইলে এই মুহূর্তে ওকে ভেতরে আসতে দাও! গ্যাংস্টার বসের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ সে।”
অধিরাজের সেই শীতল ও ধারালো আওয়াজ শোনামাত্র গার্ডদের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন আদেশের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। তারা মুহূর্তের মধ্যে মাথা নিচু করে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এদিকে গেইটের আলো-আঁধারিতে সামনে থাকা পুরুষটির দিকে তাকিয়ে নাজলীর চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে যায়। এই নিকষ হালকা কালো অন্ধকারের চেয়েও গম্ভীর আর ভয়ংকর লোকটাকে সে সেদিন ‘নিক’-এর সাথে দেখেছিল! এক পলকেই চিনে ফেলল রমণী। চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক। অধিরাজের সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
” আপনার স্কিন টোন কিন্তু অনেক সুন্দর। চলুন একজন আরেকজনের স্কিন পরিবর্তন করে ফেলি।
অধিরাজ হতভাগ হয়ে তাকায়। এই কথাটা যে তাকে উপহাস করে বলেছে সেটা ঢের বুঝেছে। অপমানে থমথমে মুখ নিয়ে বলে,
” আপনি ভেতরে যান ম্যাম। বাহিরে থাকা আপনার জন্য সেইফ না।
রিদ্ধিমা গাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে বলে,
” শুয়ে আছে কে ভেতরে?
” আমাদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপনি ভেতরে যান।
রিদ্ধিমা হেসে জড়তা নিয়ে বলে,
” ওকে! ভ.. ভাইয়া কি ভেতরে আছেন?
ভাই ডাকতে গিয়ে রিদ্ধিমা জড়তায় বার বার আটকে যায়। অধিরাজ হালকা হাসলেও প্রকাশ করলো না। রিদ্ধিমা প্রথমবারের মত এই আইল্যান্ডে আসেন। গেইড পেরিয়ে ভেতরে ডুকতেই চেঁচিয়ে উঠে। অধিরাজ হন্তদন্ত নিয়ে ছুঁটে আসে,
” কি হয়েছে ম্যাম? চিৎকার দিলেন কেনো?
রিদ্ধিমা ভয়ে কাঁপছে রিতীমত। ভয়ে কথা বলতে পারছে না।
অধিরাজ হয়ত রিদ্ধিমার কথা বুঝেছে। সে আশ্বস্ত করে বলে,
” এইসব পশু দেখলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই । আপনাকে কিছু করবে না। সবাই বসের গোলাম।
রিদ্ধিমা পিটপিট করে চোখ মেলে চারদিকে তাকায়। যদিও সব তার থেকে অনেক দুরে তবুও অন্তর আত্না কাঁপছে। বাড়ি দেখে সে হতভম্ভ!
” বাড়ি এমন লাল- কালো কেনো?
” রক্ত আর অন্ধকারের মিশ্রণ!
চারপাশের এই ভয়ানক পরিবেশ রিদ্ধিমার শরীরকে হিম করে দিচ্ছে। ভেতরে ভেতরে একটা শিরশিরে ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে তার। আতঙ্কে বুকটা এমনভাবে চেপে আসছে যেন এখনই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। সে আর একটা কথাও বাড়ায় না। একদম নিঃশব্দে, চোরের মতো চুপি চুপি অধিরাজের পেছন পেছন এগিয়ে যায়।
ভারী মেইন দরজাটা শব্দ করে খুলে যায়। অধিরাজ ভেতরে পা বাড়িয়েই গম্ভীর অথচ নিচু স্বরে বলে, “আপনার ভাই ভেতরে বসে আছেন।”
রিদ্ধিমা চমকে উঠে চোখ তুলে তাকায় সামনে। ভেতরের ডিভানে নিক কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই সে ভারী মাত্রায় ড্রাগস নিয়েছে। নেশার ঘোরে শরীরটা কেমন নিস্তেজ আর অবশ হয়ে এলিয়ে পড়েছে পেছনের কুশনে। দরজার আওয়াজে নিক তার নিভু নিভু চোখের পাতা জোড়া সামান্য মেলল। তারপর সেই ঝাপসা দৃষ্টিতে রিদ্ধিমার দিকে তাকায়। আরিশ এক বার নিকের দিকে তাকায় আরেকবার রিদ্ধিমার দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,
” ড্রাগস নেওয়ার আর সময় পেলি না নিক? এখন মেয়েটা না বুঝলেই হয়।
নিক গম্ভীর হয়ে উঠে দাঁড়ায়। রিদ্ধিমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটা তার বড় ভাই, তার ছায়া ভাবতেই বুকের ভেতরটা মুচড় দিয়ে উঠে। একদম ধীরে ধীরে নিস্তেজ শরীর নিয়ে নিকের সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করে,
” ক.. কেমন আছো ভাইয়া?
নিক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটায়। রিদ্ধিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
” ভালো! তুমি আসবে ভাবি নি? ভাবলাম সবার মত ঘৃনা করে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
” রক্ত আমাকে ঠেলে এনেছে ভাইয়া। কি করে দুরে সরে থাকব বলো? মন মানছিলো না যে। আমার বাবা – মা কোথায়?
রিদ্ধিমার প্রশ্নে নিকের চোখ- মুখ গম্ভীর হয়ে উঠে। মায়ের প্রসঙ্গ উঠলে ঘৃর্ণিঝড় শুরু হবে এখন। কিন্তু খুব শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
” নেই,মারা গিয়েছে। কিভাবে মারা গিয়েছে জিজ্ঞাসা করবে না। শুধু জেনে রাখো মারা গিয়েছে।
রিদ্ধিমা চোখের পানি মুছে অসহায় গলায় বলে,
” বাবা – মা নেই তুমি তো আছো। আমাকে বুকে টানবে না ভাইয়া?
নিক চট করে তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। আপনজনদেফ বুকে কিভাবে টানে এইটা তো গ্যাংস্টার বসের জানা নেই। নিক অনুভুতিহীন গলায় জিজ্ঞাসা করে,
” বুকে কিভাবে টানে? আমার তো হৃদয় নেই।
রিদ্ধিমা ঠোঁট কামড়ে ধরে আছড়ে পড়ে নিকের শক্ত – পোক্ত বুকে। নিক টলমলে শরীরটাকে সামলে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রিদ্ধিমা ভ্রাতার বুকে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে বলে,
” ভাইয়া জানো, আমি কোনোদিন কল্পনাও করে নি নিজের কাউকে দেখতে পাব। আমার মত হতভাগীর ভাগ্যেও ভাই নামক শক্তি থাকবে। আরও আগে কেনো আসলে না তুমি?
নিক না চাইতেও রিদ্ধিমার মাথায় হাত রাখে। মনে পড়ে যায় অতীতের কথা। ছোট হাত- পা , দেহের পুতুলটাকে কত যত্ন করে আগলে রাখতে। কত চুমু খেত হিসেব ছাড়া। অতিরিক্ত চুমু খেতে খেতে বোনটাকে কাঁদিয়ে দিত। এতে পাপার হাতে কত বকা খেয়েছে হিসেব ছাড়া। এই ছোট্ট পুতুলটা তো নিকের জন্য প্রান ছিলো। সব হারিয়ে গিয়েছিলো কিছু মাসের ব্যবধানে! এই মনটা আগের মত নেই কেনো? গ্যাংস্টার বসের হৃদয়কে বোনকে বুকে নিয়ে কম্পিত হচ্ছে না? হয়ত হচ্ছে! শুধু প্রকাশ করার ভাবভঙ্গি টুকু আলাদা। নিক অজ্যন্তেই রিদ্ধিমার চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে চুমু খায়। গালে গাত রেখে বলে,
” হাত – মুখ ধুঁয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। উপরের তালায় ডান পাশের রুমটা তোমাকে দিলাম। স্টাফরা ঠিক করে দিবে।
নিক আর এক মুহূর্তে দাড়ালো না। টলমলে শরীর নিয়ে উপরে যায়। রিদ্ধিমা চোখের পানি মুছে ভোঁতা মুখে বলে,
” ভাইয়া কি বিয়ে করে নি?
” জি, করেছে। উনার তিনটা বাচ্চা আছেন।
রিদ্ধিমার চোখে-মুখে বিস্ময়। পিছনে ফিরে আরিশের গম্ভীর মুখটা দেখতে পায়। অবাক হয়ে বলে,
” ত.. তিনটা?
” জি, তিনটা।
রিদ্ধিমা খুশি হয়ে বলে,
” বাহহ, তার মানে অনেক বছর হলো বিয়ে হয়েছে? বড় জন কোথায় আছেন? কত বড় সে?
আরিশ খুব সাবলীল ভাবে উত্তর দেয়। বোনের ও জানা উচিত তার ভাই এক ধ্বাক্কায় তিনটা বাচ্চা পয়দা করেছেন। আরিশ বুকে হাত গুঁজে বলে,
” তিনটা বাচ্চা সমান। প্রথম বাচ্চা হলো ছেলে। একমাত্র ছেলে এরিক। তার বিশ সেকেন্ড পরে একজন মেয়ে যার নাম নিভ্রিতা। এরপর নিরাশা। মোট তিন জন বাচ্চা আপনার ভাইয়ের।
রিদ্ধিমার মুখ হা হয়ে যায়। আশ্চর্য হয়ে বলে,
” তাই বলে তিন জন একসাথে?
আরিশ হেসে বাহিরে যেতে যেতে উত্তর দেয়,
” যারা বউ অজ্ঞান করে তারা একসাথে দুই- তিন জন জন্ম দিলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
রিদ্ধিমার চোখ- মুখ কুচকে আসে। অজ্ঞান করে জন্ম দিয়েছে মানে? কিসের অজ্ঞান করেছে? আশ্চর্য!
কক্ষজুড়ে এখন এক নিচ্ছিদ্র ও থমথমে নীরবতা। এনি বিছানায় একপাশ হয়ে শুয়ে পরম মমতায় তার সদ্যজাত সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছে। মাতৃত্বের এই পরম মুহূর্তটিতেও তার চোখ দুটো অনবরত অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। সে এক হাতে চোখের নোনা জল মুছছে, তো অন্য হাতে নাক টেনে কান্না লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
একটা সময় ছিল, যখন কোনো তীব্র কষ্ট কিংবা অভিমান তাকে গ্রাস করলে সে ঘরের কোণে ঘাপটি মেরে বসে নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারত, চোখের জল ফেলে হালকা হতে পারত। কিন্তু আজ সেই চেনা সুযোগটুকুও তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। নিজের সমস্ত সুখ, ক্লান্তি, এমনকী একটুখানি একান্ত মনখারাপ করার অধিকারটুকুকেও বিসর্জন দিয়ে—এখন সবার আগে অবুঝ সন্তানকে সামলাতে হচ্ছে। মাতৃত্বের এই অমোঘ নিয়ম তাকে নিজের সবটুকু কষ্ট ভুলে শুধু এক টুকরো নিঃস্বার্থ আশ্রয় হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য করেছে। মাথা ব্যাথার জন্য তাকিয়ে থাকতে পারছে না। আচমকা ঘাড়ে কারোর উত্তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করতেই কেঁপে উঠে। তবে মোটেও ভালো লাগছে না এই স্পর্শ। বিরক্তি আর ঘৃণায় চোখ- মুখ কুচকে যায়। এনি সরিয়ে দিতে গেলে নিক কামড় বসায় ফর্সা পিঠে। কামড় দেওয়া স্থানে চুমু খেয়ে বিরবির করে,
” রাগ করে আছো? রেগে তো আমার থাকার কথা। কেনো গেলে নাভিদের সামনে? তুমি জানো না তোমার দিকে কেউ তাকালে সহ্য হয় না আমার। সব ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করে। একজনকে ও বাঁচতে দেয় নি। সব জানার পরও ওর ভালোবাসাময় বাক্য কেনো শুনছিলে?
এনি চোয়াল পিষে এরিককে কোলে নিয়ে অর্ধ – শুয়া থেকে এনি উঠে বসে। সামান্য ঘুরে নিকের শার্ট খামছে ধরে। শক্ত গলায় বলে,
” ওইটা ভালোবাসা কি- না সেটা জানি না। তবে নাভিদ ভাই নিজেকে তুলে ধরছিলেন। আপনি জানেন ওই পুরুষটাকে কেনো কটু কথা শুনাতে পারি না? কেনো তাকে তাড়িয়ে দিতে পারি না? ওই পুরুষটা আমাকে সাত বছর ধরে আগলে রেখেছে। মিথ্যে বলব না একটা ছায়া ছিলো আমার জীবনে। কেউ আমার সাথে খারাপ কিছু করতে পারে নি। প্রতি পদে আমাকে রক্ষা করেছে। কি করে স্বার্থপরের মত ধুর – ছাই করে দিব বলবেন আমাকে? লোকটার অবস্থা দেখেছেন একবার? রাস্তার পাগলের ও এর থেকে সুন্দর পরিবেশ থাকে। ইরানের টপ ওয়ান বিজন্যাস ম্যানদের মধ্যে একজন হলো নাভিদ ভাই। তার এই অবস্থা আমার জন্য! একটু কষ্টগুলো এইতো শুনছিলাম। অনুভব করছিলাম যে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসে তাকে চাইলাম না। আর যে কোনো দিন আমাকে ভালোবাসে শব্দটা উচ্চারন করে নি তাকে পাগলের মত চাই। অস্বীকার করব না, সবটা দিয়ে আপনি আগলে রেখেছেন। তবে আপনার দিকটা হলো অস্বস্থিকর আসক্তি। যে স্ত্রীর সম্মান বুঝে না, কথায় কথায় গালি দেয় এইটা ভালোবাসা হতে পারে না। জানেন তো ভালোবাসা হলো বিষপানের মত। একবার মুখে দিলে গিললেও মৃত্যু আবার ফেলে দিলেও মৃত্যু। আপনি আমাকে কোনোদিন বুঝার চেষ্টাও করেন নি। সবার সামনে আমাকে এইভাবে অপমান করতে খারাপ লাগে নি? চরিত্রহীন ও বলেছিলেন। ছিহহ! প্লিজ ছুঁবেন না আমাকে। কিছুক্ষণ আগেই তো বললেন অন্য পুরুষের ছুঁয়া পেতে চাচ্ছি আমি।
এনি কথা গুলো বলছে আর কেঁদে যাচ্ছে। নিক নিভু নিভু চোখে তাকায়। এনির কাঁপা শরীরটা নিজের শক্তপোক্ত শরীরের সাথে মিশিয়ে গলায় নাক ছুঁয়ায়,
‘আই’ম সেইং সরি টু ইউ এগেইন অ্যান্ড এগেইন, ওয়াইফি। ইফ ইউ টার্ন ইয়োর ফেস অ্যাওয়ে, টেল মি হু উইল আই গো টু? প্লিজ ডোন্ট পুশ মি অ্যাওয়ে… আই’ল ডাই। আর কখনো সবার সামনে বকব না, কোনোদিন খারাপ কথাও বলব না। গালি দিলেও খুব কম করে দিব। তুমি চরিত্রহীন নও, তুমি আমার আঙ্গিনায় ফুটা সব থেকে পবিত্র ফুল। যার সান্নিধ্য আমি হিংস্রতা ভুলে শিথিল হয়ে যায়। রাগ করে দুরে গেলে আমি মরে যাব। এইভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কি করলে রাগ ভাঙবে তোমার?
এনি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। নিকের বলা সরি শব্দ আর বাকি জবান বন্দীগুলো কানে বাজছে প্রচুর। সত্যি যদি লোকটা নিজেকে বদলাতে চায় তবে একটা সুযোগ দিলে ক্ষতি কি? হুট করে মনে হলো গ্যাংস্টার বস এত নরম হয়ে কথা বলার মানুষ না। একমাত্র বাচ্চাদের সামনে উনি একদম মোমের মত নরম। এই দিকটায় মাঝে মাঝে খুব হিংসে হয় এনির। এনি নিকের গালে হাত রেখে বলে,
” ড্রাগস নিয়েছেন তাই না?
নিক ঠোঁট কামড়ে হাসলো। এনির হাতে চুমু খেয়ে বলে,
” ড্রাগসের নদীতে ভেসে থাকলেও মাথা ভর্তি শুধু তুমি। তোমাকে কাঁদিয়ে শান্ত থাকতে পারছিলাম না। ধ্বংস করার থেকে ভালো ড্রাগস নিয়ে নিজেকে শান্ত করা। ওয়াইফি, আই’ম সেইং সরি টু ইউ এগেইন অ্যান্ড এগেইন।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” আপনি সরিও বলতে পারেন?
নিক উঠে আসলো বিছানায়। এনির শরীরটা নিজের সাথে মিশাতে চাইলো। কিন্তু এরিক পিটপিট করে তাকিয়ে আছে পাপার দিকে। নিক ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলে,
” মাম্মাম, পাপার উপরে রাগ করে আছে। তোমার মাম্মামকে বলো যাতে এড়িয়ে না চলে।
” এরিক, তুমি তোমার পাপাকে বলো যেদিন সম্মান আর মর্যাদা দিতে পারবে সেদিন এক্সেপ্ট করব।
” এরিক তুমি তোমার মাম্মামকে বলো, পাপা ভুল করেছে তাই সরি বলেছে। আর কোনোদিন এমন করবে না তাও স্বীকার করেছে। জীবনের প্রথম পাপা সরি বলেছে। কখনো, কাউকে গ্যাংস্টার বস সরি বলে নি। আজ বলেছে। এরপর ও এমন ব্যবহারের মানে কি?
এনি রাগে চোয়াল শক্ত করে উঠে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭০
” বাহিরের দুনিয়ার সাথে আমাকে মিলাতে বারন করে দাও। উনি সরি বলবে,হাজার বার বলবে। আমি উনার একমাত্র স্ত্রী। সারাক্ষন নত হয়ে থাকবে। এখানে সরি বলে আহামরি কিছু করে বসে নি।
নিক বাজপাখির ন্যায় চোখে এনির দিকে তাকিয়ে থাকে। গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” পাপা তুমি বোনদের সাথে ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার মাম্মাম পাপার উপর প্রচুর রেগে আছে। তাকে আদর করে রাগ ভাঙ্গাতে হবে। কম আদরে তোমার মাম্মামের পুষাচ্ছে না। শাওয়ার নেওয়ার মত কাজ করতে হবে। ঘুমাও বাবা!
