Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২ (২)
লিজা মনি

কাচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মেঝেতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে নাজলী। তার ঠিক পাশেই সংজ্ঞাহীন অবস্থায় লুটিয়ে আছে এনি। শরীর থেকে তখনও অবিরাম রক্ত ঝরে চলেছে। কাউকে না পেয়ে অবুঝ বাচ্চাদুটো কেঁদে কেঁদে গলা চিরে ফেলছে। যাদের একটা সামান্য আওয়াজে তাদের বাবা দুনিয়া উলোট- পালোট করে দিতে রাজি সে আজ আরেক পৃথিবীর খুঁজে। বাচ্চাদের গলা ভেঙ্গে গিয়েছে কান্নার ফলে। কিন্তু হায় আফসোস! এই নিষ্পাপ ফুলগুলোকে বুকে আগলে নেওয়ার মতো কেউ নেই আজ সেখানে।
​বাচ্চাদের সেই করুণ আর্তনাদ হয়তো এনির অবচেতন মনে পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু অসাড় শরীর কিছুতেই সজাগ হতে পারছে না। এক অদ্ভুত মাতৃত্বের টানে সে হয়ত ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে। কারও আসার অপেক্ষায়, তীব্র কোনো আকুতিতে।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে আগমন ঘটে তানভীর। নিভ্রিতা পাওয়া যাচ্ছে না খবরটা শুনেই সে ছুটে এসেছে মিনারে। কাউকে না পেয়ে সোজা এনির রুমের দিকে দৌঁড় লাগায়। দরজা খুলে চোখের সামনে এমন বিধ্বস্ত ও রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে সে আতঙ্কে নিজের মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে। ভয়ে কপাল আর শরীর বেয়ে হিমশীতল ঘাম ছুটতে থাকে তার; দম যেন আটকে আসার উপক্রম হয়। আচমকা বাচ্চাদের ভাঙা গলার গোঙানি শুনে সে সামনের দিকে তাকায়, আর সাথে সাথে এক অজানা আশঙ্কায় তার বুকটা ধক করে ওঠে। তানভী পায়ের হিল নিয়েই কাচের উপর দিয়ে হেটে আসে। দ্রুত বাচ্চাদের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। তানভী কাঁপছে অসম্ভবভাবে। সে অনুভব করছে বাচ্চারাও কাঁপছে খুব। এরিক আর নিরাশার কপালে মুখে চুমু খেয়ে অধৈর্য হয়ে বলে,
” হায় ইশ্বর, কাঁদতে – কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়েছো। এইতো কলিজারা। ভয় নেই, আন্টি আছি।
তানভী আর অপেক্ষা করলো না। তার শরীর কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপেই যাচ্ছে। নিশ্বাস টানছে ঘন ঘন। তৃষ্ণায় গলা মনে হচ্ছে ফেটে যাচ্ছে। পাশে বিকৃত ক্ষত – বিক্ষত লাশের কথা তানভী একদম ভুলে যায় নাজলী আর এনির বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে। তানভী দিক – ঠিকানা খুজে না পেয়ে উন্মাদের মত এনি আর নাজলীকে ডাকে,

” হোয়েন ডিড অল দিস হ্যাপন?এনি, ইয়োর চিলড্রেন আর ক্রাইং। অহ গড! সবার জীবন এমন তছনছ কেনো হয়ে গেলো! রক্ষা করো।
শিশুদের বুকে জাপটে ধরেই প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে তীব্র বেগে দৌড় দেয় তানভী। মেইন দরজাটি সশব্দে উন্মুক্ত করে, হাঁপাতে হাঁপাতে সে চরম আক্রোশে চিৎকার করে ওঠে,
” বিচ! ভেতরে ঘাতক ডুকেছে আর বাহিরে তোমরা সিকিউরিটি দিচ্ছো। মিনার সৃষ্টি হয়েছে পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ প্রবেশ করতে পারে নি। আজ কিভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটলো? প্রান হারাবে! এনি বা নাজলীর কিছু হলে সব কয়টা নরক যন্ত্রনা দিয়ে মরবে এক একজন।
ক্ষোভে আর আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে তানভী অনর্গল গর্জে যেতে থাকে। তার সেই উন্মত্ত রূপ দেখে কয়েকজন গার্ড তক্ষুণি পঙ্গপালের মতো ভেতরের দিকে ছুটে যায়। তানভী নিজেও আর কালবিলম্ব না করে পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করে। বাচ্চারা তখনও বুকের ভেতর হেঁচকি তুলে কেঁদে চলেছে। তানভী দ্রুত নাজলী ও এনির নাড়ি
পরীক্ষা করে হিংস্র গলায় আদেশ দেয়,

​”দ্রুত গাড়ি বের করো, হসপিটালে নিয়ে যাও ওদের! শ্বাস এখনও চলছে। নাজলীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে, ওদের প্রাণ বাঁচানোর উসিলা হও তোমরা। গো, ফাস্ট!”
গার্ডরা পরম আতঙ্কে পাশে দৃষ্টিপাত করতেই অবাক হয়। যদিও এইসব খুন তাদের নিত্যদিনের কাজ তবুও খুনী আজ অন্য কেউ । অত্যন্ত নৃশংস ও জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়েছে ঘাতক দুজনকে। চারপাশের সেই রক্তাক্ত ও বীভৎস পরিস্থিতির মাঝে, ছটফটে অবয়বে এক গার্ড ভয়ার্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করে ওঠে,
​”যেমন স্বামী… তাদের ঠিক তেমন বউ… সাইকো!”

কায়াত আর নিক—পরস্পরের থেকে সামান্য দূরত্বে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুজন। নিকের পাশেই অধিরাজ আর আরিশ দাঁড়িয়ে আছে। দুইজন এই রক্তাক্ত, নাক- মুখ ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। কায়াতের ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক চিলতে কুটিল, উপহাসের হাসি। কায়াতের হাসি দেখে আরিশ চোয়াল শক্ত করে হাত শক্ত করে ফেলে। কিন্তু এই মুহূর্তে ক্ষমতা থাকা সত্তেও অসহায় তারা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মনস্টার গ্যাংস্টার বস, সমস্ত ক্ষমতার চূড়ায় বসেও আজ তার চোখের দৃষ্টিতে এক চরম উন্মাদনা। তার সেই অহংকারী চাউনি এখন হন্যে হয়ে তাকাচ্ছে সামনের দিকে।
​সেখানে, একটা নিরেট কাচের আবরণের ওপারে পড়ে আছে তার ছোট্ট প্রাণটা। একেবারেই নিস্তেজ, নিস্পন্দ। হাত-পায়ের কোনো সাড়া নেই। দৃশ্যটা দেখে নিকের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। যন্ত্রমানবের হৃদয় পিতৃস্নেহে ছটফট করে উঠে। নিক এক ঢোক শুকনো লালা গিলে নিজের ভেতরের প্রবল অসহায়ত্ব ঢাকার চেষ্টা করে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই দুঃখ রূপান্তরিত হয় তীব্র আক্রোশে। রাগে, ক্ষোভে শরীরটা থরথর করে কেঁপে ওঠে তার। নিক তার সেই রক্তবর্ণ, হিংস্র চোখ দুটো তুলে সরাসরি তাকায় কায়াতের দিকে। গর্জে উঠে,
” আমার মেয়েটাকে কি করেছিস তুই? জীবনে কোনোদিন শক্ত স্থানে রাখিনি আর তুই এমন কাচের উপরে রাখলি কোন সাহসে? এখন এই বের কর। আমার মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে।

” মরবে না, চিন্তা নেই।
কায়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত উপহাস ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই শব্দগুলো নিকের মস্তিস্কে যেন ফুটন্ত সিসার মতো আঘাত করে; তার গ্যাংস্টার সত্তার সুপ্ত চন্ডাল রূপটি আচমকা টগবগিয়ে জেগে ওঠে। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক পৈশাচিক চিৎকার দিয়ে ওঠে:
​”কুত্তার বাচ্চা! তোর জিভ দিয়ে আর একবার যদি এই শব্দ উচ্চারিত হয়, তবে বুক চিরে তোর কলিজা আমি টেনে বের করব! মনে রাখিস, তোর নিজের সন্তানকে তোর চোখের সামনে আমি টুকরো টুকরো করে হত্যা করব!”
​নিকের এই প্রলয়ংকরী আস্ফালনে কায়াত বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না, বরং এক বিকৃত আমোদ খুঁজে পায়। তার ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে। অত্যন্ত শীতল, শান্ত কণ্ঠে সে বলে:
​”তুই এই চৌকাঠ পার হওয়ার সাথে সাথেই আমি সুইচটা অন করে দেব। আর সেই বোতাম স্পর্শ করার পলকেই ওই কাচের প্রকোষ্ঠের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে। মাত্র পাঁচ থেকে দশটা সেকেন্ড, নিক… তার মাঝেই তোর ওই ছোট্ট প্রাণটা চিরতরে শূন্যে উড়াল দেবে।”

​নিকের চোখ দুটো তখন রক্তজবার মতো লাল ও হিংস্রতা ছাপিয়ে অসহায়ত্ব ফুটে উঠে।।তবে সেই অসহায়ত্ব কেউ অনুভব করতে পারে না। এই মুহূর্তে সে কোনো আন্ডারগ্রাউন্ডের সম্রাট নয়। কোনো ক্ষমতাবান পুরুষও নয়। কেবলই এক নিরুপায়, ভাগ্যাহত পিতা। যে তার পরম শত্রুর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসেছে। এক রণক্লান্ত, পরাজিত সৈনিকের মতো ভাঙা গলায় সে আকুতি করে ওঠে
​”কী চাস তুই, কায়াত? আমার এই বিপুল ক্ষমতা? আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি? সব, সব আমি তোর নামে লিখে দেব! একজন গ্যাংস্টার বস তোকে কথা দিচ্ছে, কায়াত—আমি সবকিছু তোকে বিলিয়ে দিয়ে এ শহর ছেড়ে চলে যাব! দোহাই তোর, আমার নিষ্পাপ মেয়েটার কোনো ক্ষতি করিস না। তোর যাবতীয় শত্রুতা তো আমার সাথে। অপরাধী আমি, পাপ যা করার আমি করেছি… শাস্তি আমাকে দে! তোর যদি মারতেই হয়, তবে এই মুহূর্তে আমাকে নরক যন্ত্রনা দিয়ে মার। কিন্তু আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দে!”
কায়াতের সামনে নিককে এমন বসে পড়তে দেখে এক – একজন স্তব্দ হয়ে যায়। নিকের এমন আকুতি মিশ্রিত শান্ত কন্ঠস্বর শুনে পুরো কামড়া কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে যায়। কেমন গুমোট ভাবে স্তব্দ হয়ে থাকে। কায়াতের প্রতিটা গার্ড যেন আকাশ থেকে টপকে পড়েছে এই মুহূর্তে। যে নিজের পুরো শরীর ক্ষত – বিক্ষত নিয়ে, মৃত্যুর শেষ প্রান্তে গিয়েও মাথা ঝুঁকায় না সে আজ অনায়াসে কেমন অসহায় হয়ে পড়েছে। কায়াত একটুও অবাক হয় না। কারন সে জানে বাচ্চারা গ্যাংস্টার বসের দুর্বলতা। তবে নিকের মুখে জীবনের প্রথম এই অসহায়ত্বের বাণী শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। নিজের গার্ডদের ইশারা দিয়ে বলে,

” সবাই তাকিয়ে দেখ। কিছুক্ষণ আগে বোন ইজ্জত বিলিয়ে দিচ্ছিলো সেচ্ছায়। আর এখন ভাই তার ক্ষমতা বিলিয়ে দিচ্ছে। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান আমার সামনে হাটু গেঁড়ে বসেছে। ইতিহাসের সব থেকে আশ্চর্যজনক ঘটনা! তুই আমার সব কেড়ে নিয়েছিস। আমার টাকা – পয়সা, আমার পাওয়ার সব কেড়ে নিয়ে দেওলিয়া করে দিয়েছিস। তকে আমি ছটফট করতে দেখতে চাই। এখন যেভাবে বসেছিস একটু পর মেয়ের শোকে ছটফট করে মরবি।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। রাগে কেমন পাগল- পাগল লাগছে সব কিছু। রিদ্ধিমার কথা মনে হতেই ভেতর অস্থির হয়ে উঠে। চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে ভয়ানকভাবে। কায়াতের দিকে তাকিয়ে উন্মাদের মত গর্জে উঠে,

” আমার বোন কোথায় শুয়রের বাচ্চা!কি করেছিস ওর সাথে?
কায়াত ছোট- ছোট চোখ করে তাকায় নিকের দিকে। খুবই খাপছাড়া ভঙ্গিতে বলে,
” হয়ত মরে গিয়েছে।
নিক চোয়াল চেপে কায়াতের দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই কায়াত হুশিয়ারি দিয়ে উঠে,
” সাবধান! এক পা ও যদি এগিয়ে আসিস সুইচ টিপে দিব। তর মেয়ে কিন্তু আমার সাথে!
নিক স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরের রক্তপিপাসু গ্যাংস্টার সম্রাট রূপটি এক অসহায় হয়ে পড়ে।চোখের পলকে শিরা-উপশিরায় ধক করে জ্বলে ওঠা সেই আদিম উন্মাদনা এক লহমায় মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায়। খাঁচাবন্দি এক আহত হিংস্র ব্যাঘ্রের মতো আর্তনাদ ও আক্রোশের সংমিশ্রণে গর্জে ওঠে,
​”সাহস থাকলে আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে মুক্ত করে দিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই কর! তোর বুকের পাঁজর ভেঙে কলিজাটা ছিঁড়ে এনে আমি জীবন্ত চিবিয়ে খাব!”

কায়াত উপবিষ্ট অবস্থা থেকে ধীর পদক্ষেপে নিকের দিকে অগ্রসর হয়। তার গ্রীবা একপাশে ঈষৎ বক্র করে দাঁড়ায়। হাড়হিম করা হাসিতে মুখর হয়ে ওঠে সে। সেই হাসিতে মিশে থাকে এক চরম বিকৃত আনন্দ। প্রত্যুত্তরে বলে,
” এই কাজটা যদি তর মেয়ের সাথে করি তবে কেমন হবে? ছোট বাচ্চাদের কলিজা তো আমি সব সময় এই খায়। এইটা যদি হয় আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্টের অংশ, তবে স্বাদ অনেক হবে।
নিক পিশাচের মত চিৎকার করে উঠে। কায়াত হেসে ছুঁড়ি ঘুরিয়ে নিভ্রিতার দিকে এগিয়ে যায়। নিক গার্ডদের সরিয়ে ছটফট করে বলতে থাকে,
” কি করছিস তুই? ওকে আঘাত করিস না, কষ্ট পাবে অনেক। অনেক ছোট ও। আঘাত সহ্য করতে পারবে না। কুত্তার বাচ্চা শুনতে পাচ্ছিস না কি বলছি? আঘাত করবি না ওকে। অনেক কাঁদবে! আমি সহ্য করতে পারি না ওদের কান্না। ইফ ইভেন দ্য স্লাইটেস্ট হার্ম কামস টু দেম, আই উইল ডেস্ট্রয় ইউ। নো ফাঁকিং উইকনেস উইল বি এবল টু স্টপ মি।
কায়াতের ওষ্ঠাধরে তখন এক পৈশাচিক ও উন্মত্ত হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তীক্ষ্ণ ছুঁরিটা কাচের অন্তরালে প্রবেশ করায়। নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে আদুরে প্রানটা। দবদবে ফর্সা মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। ছোট্ট দেহটা একদম নিস্তেজ হয়ে আছে। কায়াত উন্মাদের মত হেসে নিভ্রিতার গালে আঙ্গুল ছুঁয়ে দেয়,
” বাপের কপি!

নিক তীক্ষ্ণ বাজপাখির মত টেরিসের বাহিরে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তে এক প্রলয়ংকরী গর্জনে সমগ্র দিকবিদিক কেঁপে উঠে। কোনো হিংস্র ও ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় এক ভয়ংকর বাঘের গর্জন যার সাথে যুক্ত হলো সারমেয়কুলের হিংস্র ও তীব্র চিৎকার।
​আরিশ নিকের দিকে তাকায়। দুই সত্তার চোখা- চোখি হলো। নিকের চোখ – মুখ হিংস্রতায় টগবগ করছে। ধূসর চোখ দুইটা কেমন দানবের মত হয়ে আচগে। আরিশের অধরে ফুটে উঠল এক কুটিল ও রহস্যময় হাসির রেখা। সে ধীর অবয়বে পেছন ফিরে তাকায় আবার ও। উন্মুক্ত তোরণদ্বার দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে ‘হান্টার’ আর ‘শ্যাডো’—সেই কুখ্যাত গ্যাংস্টার বসের চিরকালের বিশ্বস্ত দুই ছায়াসঙ্গী। যারা তার একাকিত্ব, প্রতাপ আর ধ্বংসলীলার নীরব সাক্ষী।
​কায়াতের সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী তাদের পথরোধ করতে উদ্যত হয়। তাদের ছুঁটে আসার গতি এতটা উন্মাদের মত ছিলো যে আঘাত করতে সক্ষম হয় নি। হিংস্রতার চরম সীমায় পৌঁছে উন্মাদের ন্যায় তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হান্টার আর শ্যাডো। কণ্তাদের চোয়াল চিরে নির্গত হচ্ছিল গগনবিদারী রক্তজল করা এক – একটা হুংকার। মুহূর্তের ভগ্নাংশে ধারালো নখ আর দাঁতের আঘাতে রক্ষীদের জ্যান্ত শরীরগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে থাকে। যারা আক্রমন করতে আসে তাদের উপর পাশবিকভাবে আক্রমন চালায়। লম্বা, ধাঁরালো দাঁত দিয়ে ছিন্ন – বিছিন্ন করে দিচ্ছে। মাংস ছেঁড়ার বীভৎস শব্দ আর হাড় মড়কানোর কেমন ছমছমে শব্দ। তপ্ত আর কালচে রক্তে প্লাবিত হাতে থাকে সমগ্র টেরিসের মেঝে।

​আরিশ, অধিরাজ ক্রুর ও শীতল দৃষ্টিতে নিজের অবশিষ্ট অনুচরদের দিকে ইশারা করে। কায়াত দিশেহারা হয়ে পড়ে এমন হুট করা আক্রমনে। তার থেকেও বেশি অবাক হয় দুইটা বণ্যপ্রানীর উপর কেউ আঘাত করতে পারছে না কেনো? দুইটা বুলেট পেটের ভেতরে ডুকিয়ে দিলেই তো মরে যায়। এতক্ষণ দাবার প্রতিটি চাল তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে ছিলো। নিজের দেহরক্ষীদের এমন রক্তাক্ত ও করুণ পরিণতি দেখে সে সম্পূর্ণ হতভম্ভ এবং দিশেহারা হয়ে পড়ে। আসুরিক শক্তির অন্ধ মোহে সে ভুলেই গিয়েছিল প্রকৃত মালিকের একটিমাত্র আহ্বানে এরা সমস্ত বাধা ছিন্ন করে ছুটে আসতে পারে।
কায়াত চুল খাঁমছে ধরে নিজের। চারপাশে মৃত্যুর বীভৎসতা দেখে কায়াত উন্মাদের মতো চোখ বোলালো। বাঁচার শেষ তাগিদে নিভ্রিতাকে ঢাল বানিয়ে এই নরককুণ্ড থেকে পলায়নের এক পশুতুল্য কুৎসিত লালসা জাগল তার মনে। কাচের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে সে যখনই নিভ্রিতাকে হ্যাঁচকা টানে তুলে নিতে যায়। ঠিক তখনই এক পলকের ভগ্নাংশে, বাতাসের গতিকে হার মানিয়ে তীক্ষ্ণ ও সরু কিছু একটা সজোরে বিঁধে যায় তার চোখ এবং গাল চিরে।
​মস্তিষ্ক কাঁপানো তীব্র যন্ত্রণায় কায়াত নিজের রক্তাক্ত চোখে হাত চেপে ধরে এক পৈশাচিক আর্তনাদ করে উঠে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পরক্ষণেই কাটা গাছের মতো ছিটকে পড়ে ধূলিশয্যায় লুটিয়ে পড়ে যায়। তার চোখ আর গাল থেকে ঝরঝর করে ঝরছে তাজা রক্ত।

কায়াত আর্তনাদ করে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়া মাত্রই নিকের ভেতরের সেই যান্ত্রিক শীতল মানুষটা এক নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়। কোনো এক উন্মাদের মতো ঝড়ের গতিতে ছুটে যায় কাচের আধারের দিকে। চারপাশের রক্তাক্ত লাশ, হান্টার আর শ্যাডোর হাড় মড়কানোর শব্দ কোনো কিছু গ্যাংস্টার বসের কানে যাচ্ছে না।
​নিক নিজের শ্বাস রুদ্ধ করে কাচের তৈরি সেই সংকীর্ণ আধারের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেয়। তার পুরো শরীর কেমন কাঁপছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো কাচের পুতুল আগলাচ্ছে। নিভ্রিতার অবশ ও ছোট্ট দেহটাকে নিজের শক্ত দুই বাহুর ডোরে নিয়ে নেয়। মেয়েকে বুকের মধ্যে নিয়ে যেন নিজের প্রান ফিরে পায়। শরীরের অভার কোট খুলে ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। অনুভূতিহীন গ্যাংস্টার বস মেয়েকে নিজের বুকের গভীরতম সিন্দুকের মতো মিশিয়ে একদম অস্থির পাগল প্রায় হয়ে উঠে। যে মানুষটা নিজের রাজত্ব আর ক্ষমতার লোভে এর আগে হাজারটা নিষ্পাপ শিশুকে বলিদানের নামে উৎসর্গ করতে গিয়ে একবারের জন্যও চোখের পলক ফেলেনি, যার হাত কাঁপেনি, আজ সে নিজের মেয়ের সামান্য স্পর্শে এক জীবন্ত লাশে যেন প্রাণ ফিরে পেল! পাথুরে বুকের ভেতরে এতক্ষণ পর হৃদপিণ্ডটা সজোরে আছাড় খেতে থাকে।

নিকের চওড়া বুকটা ঘন ঘন নিশ্বাসের টানে ওঠানামা করছে। কাঁপা কাঁপা ওষ্ঠাধর আলতো করে চেপে ধরলো নিভ্রিতার নিস্প্রাণ, ফ্যাকাশে গালে। সমস্ত অহংকার, সমস্ত নিষ্ঠুরতা বিসর্জন দিয়ে সেই মেকানিক্যাল মনস্টার নিভৃতে শান্ত হয়ে উঠে। নিভ্রিতার কপালে, গালে বারবার চুমু খেতে খেতে ভাঙা জড়ানো গলায় বিড়বিড় করে আওড়ায়,
” আই এম সরি, মা। প্লিজ ফরগিভ মি, মাম্মাম। পাপা কুড নট কীপ ইউ সেফ। পাপাজ এনিমিজ হার্ট ইউ, দে গেইভ ইউ পেইন। পাপা কে কখনো ক্ষমা করো না মা।
কায়াতের শরীরে সামান্য বিষ ছড়িয়ে যায়। ফলে শরীর কিছুটা নীল হয়ে আসছে। যে সঁরু অংশ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে তা ছিলো বিষাক্ত। আরিশ রক্তাক্ত অবস্থায় নিকের সম্মুখে এসে হাঁপায়। বাবা – মেয়ের মিষ্টি মুহূর্ত দেখে হালকা হাসে। পর মুহূর্তে ঠাট্টা করে বলে,

” অজ্ঞান করে হলেও ফসল কিন্তু ভালো ফলিয়েছিস। একজন আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্টকে নিজের জিন্মি করে ফেলেছে বাবা যায়। বাই দ্যা ওয়ে কাঁদছে না কেনো? কোনো সারা শব্দ নেই।
নিক এতক্ষণে নিজের সজ্ঞানে ফিরলো। আহত বাঘের মত মেয়ের দিকে তাকায়। ফ্যাকাসে মুখটা নজরে আসতেই হৃৎপিন্ড থমকে যায়। কাঁপা আঙ্গুলে নাকের সামনে ধরে নিজের অনামিকা আঙ্গুল। ওষ্ঠাধর শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। নিস্তেজ হয়ে আসে পুরো শরীর। দু- কদম পিছিয়ে যায় আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট। নিকের এমন পাগলাটে আচরন দেখে আরিশ কপাল কুচকে ফেলে। নিক কোনোক্রমে নিজের শুষ্ক ঠোঁট দুটিকে সামান্য ভিজিয়ে ভেতরের সমস্ত আকুলতা ঢেলে এক উন্মাদের ন্যায় চিৎকার করে উঠল,
” আমার মেয়ে শ্বাস নিচ্ছে না আরিশ।
যাস্ট একটা লাইনে সবাই থমকে যায়। বাহিরে কু*পাকু*পি আর রক্তাক্ত খেলা যেন বন্ধ হয়ে যায়। হান্টার আর শ্যাডো কিছু বুঝেছে কি- না বুঝা গেলো না। মালিকের চিৎকারে ভেতরে ছুঁটে আসে। আরিশ হতভাগ হয়ে চেঁচিয়ে উঠে,

” কিহহহহ! ক… কি বলছিস তুই নিক? কিন্তু কায়াত তো গ্যাস দেয় নি।
নিক কিছু শুনলো না। মেয়েকে কোলে নিয়েই ধপ করে বসে পড়ে নোংরা মেঝেতে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় আওড়ায়,
” মাত্রইতো ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম।ভালোবাসার সুযোগটা ও দিলে না? আমি কি এতটা খারাপ ছিলাম। কেনো ছেড়ে চলে গেলে, আম্মু ? তোমরা আমার সেই অস্তিত্ব যাদের সুস্থ জন্মের জন্য এক আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট মসজিদের ভেতরে ঘন্টার – ঘন্টা কেঁদেছিলো। যাদের ছুঁয়াতে প্রথমবার এমনকি বার বার কেঁপে উঠত তার ধ্বংসাত্বক শরীর।
নিক মেয়ের মাথার সাথে নিজের কপাল ঠেকায়। গার্ডরা এই প্রথম তাদের বসের এমন নরম আর বিধ্বসী রুপ দেখলো। তাদের স্পষ্ট মনে আছে, এই যান্ত্রিক পুরুষটা নিজের দুই হাতে কত শিশুকে প্রাইভেট জেটে তুলার ইশারা দিয়েছিলো। শিশুর কান্নাও মন গলে নি কোনোদিন। প্রতিবারের মত অন্তর কাঁপানো ধূসর আর হিংস্র চোখ। নিক পরাজিত সৈনিকের মত নিভ্রিতার কপালে শক্ত করে ঠোঁট বসিয়ে ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে বসে থাকে একদম শান্ত ভাবে। আরিশ মাথায় হাত দিয়ে চুল খাঁমছে ধরে। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,

” কাঁদছিস ? একটজন টেরোরিস্ট লোক সম্মুখে কাঁদছে!
নিক রক্তলাল চোখ তুলে তাকায় আরিশের দিকে। টগবগিয়ে ফুটে উঠে তার মস্তিষ্ক। নিভ্রিতাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কায়াতের দিকে এগিয়ে যায়। কেমন দানবের মত চলাচল তার। কায়াতের নিস্তেজ শরীরটাকে এক – হাতে টেনে – হিচড়ে তুলতে থাকে। কায়াতের জ্ঞান ফিরছে না দেখে পাশের ড্রাম পুরোটা কায়াতের উপর ঢেলে দেয়। নিশ্বাস যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিলো ঠিক এই মুহূর্তে কায়াত ছটফটিয়ে উঠে। ভালোভাবে নিশ্বাস ও নিতে পারে নি তার আগেই নিক শার্ট চেপে ধরে হিংস্র হায়েনার মত গর্জে উঠে,
” জানতিস না আমাকে আঘাত দিলেও সহ্য করতে পারব কিন্তু আমার রক্তে কেউ আঘাত করলে ধ্বংস করে ফেলব সব কিছু। কুত্তার বাচ্চা তুই জানতিস না নিক জেভরানের আপন বলতে দুনিয়াতে কেউ নেই। সে বাপের ছটফট করা মৃত্যু দেখেছে। নিজ হাতে নিজের মাকে হত্যা করে টুকরো- টুকরো করেছে। মায়ের রক্ত শরীরে মাখিয়ে ঘুরছি এত বছর ধরে। এত বছর ধরে একা -একা, ধুঁকে – ধুঁকে মরছিলাম। একা এই নরক জীবনে ফুলের ছুঁয়া সহ্য হলো না তর ? রক্তের বলতে কেউ নেই তুই তো সব জানতি কায়াত। তবুও কেনো এমন করলি? ক্ষমতা প্রয়োজন ছিলো তর? চেয়ে নিতি ক্ষমতা। দিয়ে দিতাম আমার সব ক্ষমতা। যখন আমার প্রানগুলো আমার কাছে থাকবে না তখন এই ফা*কিং সম্রাজ্য দিয়ে কি করব? বুঝতে পারিস নি, যে আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট ধনুক থেকে ছুঁটা বাণ দেখেও মাথা ঝুঁকায় নি সে আজ সামান্য শত্রুর সামনে হাটু ভেঙ্গে বসেছে কেনো? আমি মাথা নুয়েছিলাম বিনা যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মত। পরিবর্তে চেয়েছিলাম আমার মেয়েটিকে। মেরে দিলি? শুয়রের বাচ্চা, আমার রক্তকে মারতে তর কলিজা কাঁপলো না?
কায়াত নিভু- নিভু চোখে তাকায়। তার ঠোঁট দুইটা নীলচে হয়ে এসেছে। নিকের এমন বিধ্বস্ত আর হিংস্র রুপ দেখে তার বুকের বা পাশে তাকায়। সেখানে তার অংশ নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কিন্তু সে তো বাচ্চাকে মারে নি। ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে বলে,

” আমি মারিনি তর মেয়েকে। তর খোদার কসম, আমি মারিনি। যখন কাচের ভেতরে রেখেছিলাম তখন জীবিত ছিলো। তর বোন ও দেখেছে।
নিক শুনতে চাইলো না কায়াতের কথা। তবে আরিশ ক্যাচ করতে চাইলো কথার মানে। মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে কায়াত এমন মিথ্যে বলবে না অন্তত। এই গুঁটি তৃতীয় আরেকজন চেলেছে। আরিশ নিভ্রিতার অবস্থা দেখে যতটুকু বুঝলো ওকে গ্যাস নয় অন্য কিছু দেওয়া হয়েছে। তবে কে করলো এমন কাজ? কার এমন কলিজা হলো? আরিশ ছন্নছাড়া হয়ে চারপাশে তাকায়। নিক বাস্তবতা ভুলে বসে চারপাশে চোখ রেখে চেঁচিয়ে উঠে,
” রিদ্ধিমা কোথায়?
” রিদ্ধিমা ম্যামের অবস্থা খুব খারাপ বস। আপনি এদিকে ছিলেন তাই ইমার্জেন্সি হসপিটালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিক নিশ্বাস টানলো ঘন – ঘন। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,

” ওর সাথে কি খারাপ কিছু করেছে অধিরাজ?
অধিরাজ শিউরে উঠে নিকের এমন শীতল বাক্যে। নিথর গলায় বলে,
” ম্যামের অবস্থা খুব নাজুক ছিলো স্যার। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন। একটা নোংরা মেঝেতে মুখ থুবরে পড়ে ছিলো পিছন দিকে হাত শক্ত করে বাঁধা অবস্থায়। আর….
অধিরাজ থেমে যায়। নিক তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে,
” আর কি?
অধিরাজ মাথা নুইয়ে ধীরে ধীরে বলে,
” রে*প হয়েছে কি- না বলতে পারব না। বাকিটা রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নিক উঠে আসে কায়াতের থেকে। কায়াত ভয়ে কাঁপছে শুধু। খুব ভালো করে জানে এই মুহূর্তে জঘন্য মৃত্যু হবে তার। কিন্তু সে তো নিককে ধ্বংস না করে মরতে চায় না। একদম মুখ থুবড়ে ফেলতে চায় সে। চোখের সামনে নিকের রিভলভার মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে ঠোঁট বাঁকায়। নিক যখন নিভ্রিতাকে আরিশের কোলে দিচ্ছে ঠিক সে সময় মেঝে হাতড়ে রিভলভারটা তুলে নেয়। তার সব থেকে বেশি রাগ জমে হ্যান্টার আর শ্যাডোর প্রতি। এই দুই ঝামেলা না আসলে এতক্ষন কাহিনী অন্যরকম হত। কায়াত বাঁকা হেসে রিভলভারটা হান্টারের দিকে তাক করে,
” আই’লে কিল দেম ফার্স্ট অ্যান্ড ইজ দ্য ফায়ার বার্নিং ইন মাই চেস্ট। ইউ’আর ফিনিশড ফার্স্ট!”
নিক ঘার ঘুরিয়ে হান্টারের দিকে তাকায়। যে তার মালিকের দিকে তাকিয়ে আছে। নিকের ভেতরে ছটফট করে গর্জে উঠে,

” কায়াত নো, আমার হান্টারকে কিছু করিস না।
নিক বলার সাথে সাথে পর পর তিনটা গুলি একদম হান্টারের পেটের ভেতরে গেঁথে যায়। ব্যাথায় গর্জে উঠে হিংস্র পশু। নিকের চোখ থেকে যেন রক্ত পড়ছে। মনে হচ্ছে নিশ্বাসটা কেউ চেপে ধরেছে। কায়াত পৈশাচিক আনন্দের সাথে শ্যাডোর দিকেও বন্ধুক তাক করে। রিভলভারের গুলি ছুঁটে যায় সেদিকে। নিক নিজের হাত দিয়ে আটকে দেয় সেই আঘাত। পর – পর চারটা গুলি নিকের বলিষ্ঠ বাহু ছিদ্র করে যায়। চোখের পলক ফেলতে- ফেলতে কায়াতের এমন পর পর আক্রমন সবাই হতভম্ভ। কায়াত চেয়েছিলো নিকের পেটের দিকে গুলি করতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বন্ধুকের গুলি সব শেষ। বন্ধুক থেকে গুলি বের হচ্ছে না দেখে কায়াত যেন পাগল হয়ে যায়। বার – বার বন্ধুক ঝাঁকাচ্ছে। অধিরাজ পিছন দিকে শক্ত করে ধরে কায়াতের দুই হাত। নিক আঘাত করার আগেই অধিরাজ কায়াতের মুখ- বরাবর ঘুষি বসায়। ছিটকে পড়ে কায়াতের দুর্বল দেহ। আরিশ দ্রুত নিকের হাত বেঁধে দেয়। শ্যাডো মালিকের উড়ুর উপর নাক ঘেষে নিজের বন্ধুর সামনে গিয়ে বসে পড়ে। হান্টারের বুক থেকে রক্ত অনর্গল পড়ছে। কেমন ছটফট করছে প্রানটা। নিক ছুঁয়ে দিলো হান্টারের মাথা,

” হান্টার ! শূন্য এই জীবনে আমার সাথে এসেছিলে। এখন একা করে রেখে গেলে টিকব কিভাবে?
হান্টার নিকের দিকে তাকিয়ে থেকেই চোখ বন্ধ করতে থাকে ধীরে ধীরে। তার সব থেকে বিশ্বস্ত সহকারীর ছটফট দেখে নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। মাথা নুইয়ে হান্টারের কপালে নিজের কপাল ঠেকায়,
” কাঁদছো? পরোপারে দেখা হবে আমাদের। অপেক্ষায় থেকো আমার। তোমাদের মাটির নিচে রেখে আসার আগে তোমাদের হত্যাকারীর কলিজা ছিঁরে খাব আমি।
চরম যন্ত্রনা নিয়ে হান্টারের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের।বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। কায়াতের দিকে শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। আরিশ সামান্য পিছিয়ে দাঁড়ায়।
দুইজন মিলে এত বছর ধরে মিনারের গেইড পাহারা দিয়েছে। কোনোদিন একটা শত্রু প্রবেশ করতে পারে নি। নিক যখন বোমা হামলায় আহত হয়ে হসপিটালের ভেতরে কাতরাচ্ছিলো। তার আগোচরে পুরোটা মিনারকে সামলেছে এরা। শত্রুরা ডুকতে চাইলে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। আর আজ কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে একজনের শরীর। আরিশ হান্টারের চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে হিংস্র প্রানীটার। আরিশের মনে আছে একদিন মজার ছলে সে নিকের সামনে বলেছিলো ” সামান্য বাঘ আর কুকুরের জন্য এত দরদ দেখানোর কি আছে?

নিক প্রচন্ড রেগে হুশিয়ারি দিয়েছিলো ” নেক্স টাইম যাতে তাদের বাঘ আর কুকুর বলতে না শুনি! তারা হলো আমার সেই বন্ধু যাদের উছিলায় আমি নেকড়েদের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে ফিরেছিলাম। এনিকে সেইফ রাখছি তার পঞ্চাশ % ওরা প্রাপ্য। যতবার শত্রুদের সম্মুখীন হয়েছি কেউ আঘাত করতে আসলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাই ওদের ছোট করে কথা বললে আমি নিক জেভরান সহ্য করব না। ”
আরিশ চোখের পানি মুছে নিকের দিকে তাকায়। নিকের চোখ- মুখ কেমন হিংস্র হায়েনার মত উঠেছে। কায়াতে শক্তি পাচ্ছে না মেঝেতে উঠে পালানোর। নিকের এগিয়ে আসা তার হৃদয়কে থমকে দিচ্ছে। নিক টেবিলের উপর থেকে পর – পর দুইটা ছুঁরি তুলে নেয়। হাটু ভেঙ্গে বসে পড়ে কায়াতের সামনে। জ্বলে উঠে চোখ আর বুক। তার রক্তাক্ত হান্টার মরে পড়ে আছে। তার পাশেই শ্যাডো নিস্তেজ হয়ে বসে আছে হান্টারের দিকে তাকিয়ে। টেরিসের বাহিরে অসংখ্য গার্ড। নিকের থেকে দুরে দাঁড়িয়ে আছে আরিশ। শরীরে অসংখ্য ক্ষত – বিক্ষত চিহ্ন। নিক টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলে হাতে বেঁধে রাখা কাপড়টা। কাপড়টা খুলতেই গলগলিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। আরিশ নাক – মুখ কুচকে ফেলে মুহূর্তে। নিক মেয়ের মৃত লাশের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই কায়াতের পেটের ভেতরে অমানুষের মত লম্বাটে ছুঁরিটা ডুকিয়ে দেয়। কায়াত চিৎকার করার সময় পেলো না। জিহ্বা টেনে ধরে ছিঁ*ড়ে ফেলে। জিহ্বাটা ছিঁড়ে ফেলার পর কায়াতের নিথর ও ছটফট করতে থাকা শরীরের দিকে তাকায়। পুরো শরীর এক পৈশাচিক উত্তেজনায় কাঁপছিল। হাতের ধারালো ছুরিটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে দেখছিল, ফোঁটায় ফোঁটায় উষ্ণ রক্ত কীভাবে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। অত্যন্ত অবিচল ও ভাবলেশহীন চিত্তে, নিজের সেই রক্তাক্ত হাত দিয়েই মুখের ওপর লেপ্টে থাকা রক্তের ছিটেগুলো মুছে নেয়। কায়াত দেয়ালের সাথে ল্যাপ্টে থেকেই ছটফট করছে।
অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে আরিশের নিকট প্রশ্ন করে,

” স্যার, বস কি করবে এই মুহূর্তে?
আরিশ নিভ্রিতার মুখের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় বলে,
” অনেক কিছুই ঘটতে চলেছে, যেটা না ঘটা এই ভালো।
অধিরাজ বুঝলো না এই কথার অর্থ।
নিক হিংস্র হায়েনা মত কায়াতের পেটের নরম মাংস টেনে ধরে ছিঁ*ড়ে ফেলে। নিকের ধারালো নখ আর হাত দিয়ে কায়াতের উদরদেশ বিদীর্ণ করে মাংসপিণ্ড উপড়ে নিয়ে আসে। ছিঁড়ে দু*ভাগ হয়ে যায় উদরের মাংস খানা। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে কেমন ছিঁ*ড়ে ফেলার চটচটে শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। জীবন্ত চামড়া ও পেশিতন্তু ছিঁড়ে আসার সেই শব্দে গ্যাংস্টার বসের মুখে ছিলো পৈশাচিক আদিমতা। নিকের চোখে- মুখে রক্ত ছিঁটকে এসে পড়ে। কায়াত যন্ত্রনায় চিৎকার করতে পারছে না। ফুসফুস চিরে আসা এক রুদ্ধ আর্তনাদ তার কণ্ঠনালীতেই আটকে যাচ্ছিল। হাত-পাগুলো যন্ত্রণার তীব্রতায় আড়ষ্ট হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ছিল বার বার।
নিকের হিংস্র হাতটি কায়াতের বিদীর্ণ উদরগহ্বরে প্রবেশ করা মাত্রই এক বীভৎস, উষ্ণ চটচটে রক্তের স্রোত তার কনুই অবধি প্লাবিত হয়। কোনো এক আদিম পিশাচের ন্যায়, বিন্দুমাত্র দ্বিধাহীন চিত্তে সে কায়াতের শরীরের অভ্যন্তরে হাতড়ে বেড়াতে থাকে। অতঃপর, চরম বর্বরতা ও উন্মত্ত আক্রোশে কায়াতের জীবন্ত কলিজাটি তার মূল পেশিতন্তু এবং ধমনী থেকে সজোরে উপড়ে নিয়ে আসে।
মুহূর্তে কায়াতের দেহটি শেষবারের মতো এক তীব্র ধনুকের মতো বাঁকা আক্ষেপে মোচড় দিয়ে ওঠে। কয়াতের চোখের মণি দুটো যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে স্থির হয়ে যায়। চোখ – দুইটা যেন উগরে আসবে। নিথর দেহটি অবশ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

নিকের এমন উন্মাদ পিশাচের মত ব্যবহারে প্রতিটা গার্ড নাক – মুখ কুচকে ফেলে ভয়ে.
​নিক তার রক্তাক্ত মুষ্টিতে ধারণ করে আছে সেই উষ্ণ স্পন্দিত মাংসপিণ্ড। চোখে-মুখে এক পৈশাচিক তৃপ্তির উল্লাস। নিজের এই চরম পাশবিকতার প্রতিটি বিন্দু আস্বাদন করতে করতে নিক সেই রক্তাক্ত কলিজাটির দিকে চেয়ে থাকে। নিকের তপ্ত নাসিকাগর্জন এবং রক্তলিপ্সু দৃষ্টি প্রমাণ দিচ্ছিল যে, সেখানে কোনো মানুষের অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট নেই। বসে থাকা থাকা সত্তাটি এক নরখাক পিশাচ। নিকের কাজ অনুমান করতেই আরিশ ছটফটিয়ে উঠে। এই মুহূর্তে উন্মাদ হয়ে থাকা পুরুষটাকে সে খুব ভালো করে চিনে। যে একটা সময় ক্ষুধার জ্বালা মিটাতে কাচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছে। শত্রুকে মেরে তার কলিজা খেয়েছে। কিন্তু সেই পিশাচ রুপ তো এনিকে দেখার পর বিসর্জন দিয়েছে। তবে আজ কি আবার সেই প্রলয় ঘটবে। নিক কলিজাটা মুখের কাছে এগিয়ে নিয়ে দাঁত দিয়ে উন্মাদের মত ছিঁড়ে ফেলে সেই কলিজার এক অংশ। আরিশ চেঁচিয়ে উঠে,

” নিক, নাহহ!
নিকের চোখে – মুখে নরখাদক হিংস্র রুপ। কায়াতের রক্ত তার দাঁত – জিহ্বা লাল হয়ে উঠেছে। অধিরাজ বমি করতে গিয়েও করলো না। চোখ- মুখ খিঁচে অন্য দিকে ফিরে তাকায়। নিকের এমন ভয়ানক রুপের সাথে গার্ডগুলো একদম নতুন। তারা হিংস্র গ্যাংস্টার বসকে দেখেছে কিন্তু এমন রুপ কখনো নয়। কায়াতের কলিজা চিবিয়ে খাওয়া দৃশ্য দেখে সবার গা গুলিয়ে আসছে।
অধিরাজ মাথায় হাত দিয়ে সামনের দিকে তাকায়। তানভী ছুঁটে আসছে ঝড়ের বেগে। তানভীকে শত্রুর আস্তানায় দেখে অধিরাজ হতভাগ হয়ে যায়। রাগে চোখ – মুখ শক্ত হয়ে উঠে। তানভী কাছে আসতেই অধিরাজ তার বাহু চেপে ধরে ধমকে উঠে,
” স্টুপিড! এখানে কিভাবে এসেছো? এই আস্তানার সন্ধান পেলে কিভাবে?
তানভী হাঁপাচ্ছে শুধু। চুলগুলো সব এলোমেলো পাগলের মত হয়ে আছে। শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। অধিরাজের স্পর্শে মনে হচ্ছে মাংস ছিঁড়ে যাচ্ছে। ছলছল চোখে তাকায় অধিরাজের দিকে,
” ব্যাথা পাচ্ছি।

অধিরাজ রাগ আর উদাসীন ভঙ্গিতে তানভীর হাতখানি মুক্ত করে দেয়। বন্ধনমুক্ত হয়ে তানভী তীব্র ব্যাকুলতায় আড়ষ্ট মুখে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল; কিন্তু সম্মুখের সেই অবর্ণনীয়, নরকতুল্য দৃশ্য দেখা মাত্রই তার কণ্ঠস্বর চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।
​কারোর উপর নিকের সেই আদিম পাশবিক তাণ্ডব চলছে। কোনো মানবিকতার লেশমাত্র নেই। নিককে এমন পৈশাচিক উন্মাদনায়, হিংস্র পশুর ন্যায় কারও রক্তাক্ত কলিজা ছিঁড়ে উদরস্থ করতে দেখে তানভীর সমগ্র অন্তরাত্মা ও পাকস্থলী আলোড়িত হয়ে গা গুলিয়ে ওঠে।
​মানব সভ্যতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘনকারী এমন এক চরম বীভৎস ও নারকীয় ঘটনার সাক্ষী সে তার জীবনে এই প্রথম হলো। চোখের সম্মুখে একটি জীবন্ত মানবশরীরকে খণ্ড-বিখণ্ড, দ্বিধাবিভক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত হতে দেখে হিমশীতল আতঙ্কের জমে যায়। সমগ্র শরীর শিরশির করে ওঠে।
ঘৃণায় আর আতঙ্কে তানভী অধিরাজের পরিধি হতে কিছুটা দূরে ছিটকে সরে যায়। কাঁপতে কাঁপতে করুণভাবে উগরে দেয় অবদমিত ক্ষোভ আর বমি। শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততার মুহূর্তে অধিরাজ নিজের লৌহকঠিন বাহুদ্বারা তানভীর অবশপ্রায় কম্পমান শরীরটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আগলে নেয়।
​তানভী তীব্র আতঙ্কে ও ক্লান্তিতে উপর্যুপরি হাঁপাচ্ছে। কোনোরকম আওয়ায়জ দিয়ে বলে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২

” এসেছিলাম অন্য খবর দিতে, এই আমি কি দেখলাম অধিরাজ? নিভ্রিতা কোথায়? খুঁজ পেয়ে গিয়েছো নিশ্চই? জানাও নি কেনো আমাদের? মিনারে আক্রমন হয়েছিলো। এনি আর নাজলী হসপিটালে ভর্তি। নাজলীকে আইসিউতে রাখা হয়েছে। বাঁচা – মৃত্যুর লড়াই করছে। আর তোমরা কাঁচা মাংস নিয়ে উল্লাস করছো?
নিকের কান অব্দি কথাটা না গেলেও আরিশের কানে কথাটা বজ্রের মত আঘাত হানে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তানভীর দিকে। দিক- শূন্য হারিয়ে ছুঁটে যায়,
” ক… কি বললে তুমি?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here