এই অবেলায় পর্ব ৪২
সুমনা সাথী
তালুকদার বাড়ির চারপাশের পরিবেশটা বেশ মনোমুগ্ধকর। এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা জড়িয়ে আছে চারিপাশে। চেনা নিয়মে বয়ে চলছে সবার জীবন। সকালের নরম আলো গড়িয়ে সবেমাত্র দুপুর নামতে শুরু করেছে। সূর্যটা এখন ঠিক মধ্যগগনে। আকাশ থেকে যেন অগ্নিবৃষ্টি হচ্ছে। কাঠফাটা রোদ্দুর আর সোনার রবির তীব্র আলোয় প্রকৃতি যেন পুড়ছে এক মহাসমারোহে। মৌনিতা রান্নাঘরে পা রাখল। নবনী একমনে সবজি কাটছিল। মৌনিতা আর কথা না বাড়িয়ে তার পাশে এসে কাজে হাত লাগাল। তবে শুধু হাত চালানোই নয়। নবনীকে একটু খোঁচা দেওয়ার লোভটাও সে সামলাতে পারল না। ঠোঁটের কোণে চপল হাসি ফুটিয়ে মৃদু স্বরে টিপ্পনী কাটল,
“তা, সুখবরটা কবে পাচ্ছি বড় ভাবিজি?”
আকস্মিক এই প্রশ্নে নবনী চট করে তাকাল। মৌনিতার চোখের দুষ্টুমি আর ঠোঁটের কোণের অর্থপূর্ণ হাসিটা ধরতে তার বিন্দুমাত্র সময় লাগল না। মুহূর্তেই এক তীব্র সংকোচ আর লজ্জার রাঙা আভা ছড়িয়ে পড়ল নবনীর দু-গালে। সে অপ্রস্তুত হয়ে শাড়ির আঁচলটা টেনে কাঁধের ওপর আরেকটু তুলে দিল। তারপর আমতা আমতা করে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“ফাজলামি কোরো না তো! তেমন কিছু নয়।”
মৌনিতার আরেকটু ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, “কেনো? কেনো বলো না?”
নবনী ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনের ভেতরে একটা জটিল টানাপোড়েন চলছে। সব মিলিয়ে সে বেশ দোটানায় পড়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,
“আসলে আমি নিজেই এখন চাইছি না। দিয়া তো এখনো বড্ড ছোট।”
নবনীর মুখের এই সংশয় দেখে মৌনিতার মনে অন্য এক আশঙ্কার মেঘ জমল। সে ভাবল হয়তো দিব্যর দিক থেকেই কোনো আপত্তি আছে। আর এমন পরিস্থিতিতে পুরুষের মন বোঝা দায়। আপত্তি থাকাটা খুব একটা অস্বাভাবিকও নয়। মৌনিতার প্রফুল্ল মুখটা নিমেষেই গম্ভীর হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে এক রাশ চিন্তা ফুটিয়ে সে বেশ সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়ার দিক থেকে কোনো সমস্যা আছে নাকি?”
মৌনিতার অমন থমথমে আর গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে নবনী আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠে মৌনিতার গায়ে আলতো একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“আরে না। একদম তেমন কিছু নয়। উনি তো এই ব্যাপারে আগে থেকেই ভীষণ আগ্রহী। যদিও মজা করে বলেছেন কি না আমি ঠিক জানি না। তবে উনাকে যতটুকু চিনেছি আর বুঝেছি। আমার মনে হয় না এই নিয়ে উনি কোনো আপত্তি করবেন।”
মৌনিতা এক বুক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ যেন একটা অজানা আশঙ্কায় তার দম আটকে আসছিল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের সেই মেঘলা ভাব কেটে গিয়ে চেনা চপলতা ফিরে এল। সে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল,
“এটা অবশ্য তুমি একদম ঠিক বলেছ। আমি তো উনাকে অনেক দিন ধরে দেখছি। ভাইয়া মানুষটা বড্ড ভালো। মনটা বড্ড উদার। সত্যি বলতে কাব্য আর আমার বিয়েটা যে শেষ পর্যন্ত হলো তার পেছনে মূল অবদান কিন্তু উনারই ছিল। তবে প্রথম প্রথম না ভাইয়ার জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হতো জানো? খুব ভালো হয়েছে যে ভাইয়ার জীবনে শেষমেশ তুমি এসেছ। নয়তো আগের স্ত্রী যা তা ছিল! মানুষ হিসেবে উনি তোমার মতোই কোনো একজনকেই ডিজার্ভ করেন। যে উনাকে মন থেকে ভালোবাসবে।”
কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ করেই মৌনিতার টনক নড়ল। নিজের শেষ বাক্যটা উচ্চারণ করতেই তার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। এ সে কী বলে ফেলেছে! অবনী যে নবনীর আপন বড় বোন। এই সত্যটা উত্তেজনার বশে সে মুহূর্তের জন্য একদম ভুলে গিয়েছিল। নিজের জিভ কামড়ে মৌনিতা যখন মনে মনে অনুশোচনা করছে। তখনই নবনী কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল। শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
“কোনো সমস্যা ছিল কি?”
মৌনিতা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা ঢাকার জন্য ঠোঁটে একটা জোরপূর্বক কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। আমতা আমতা করে বলল,
“না। মানে… তেমন কিছু না।”
“মৌনিতা? সত্যিটা না বললে কিন্তু আমি খুব রাগ করব।”
মৌনিতা এক মুহূর্ত দ্বিধাগ্রস্ত চোখে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“বললেও তো রাগ করবে।”
“কেন শুনি?”
“ওই যে আগের স্ত্রী তো তোমার আপন বোন ছিলেন?”
নবনী ধীরস্থির গলায় উত্তর দিল, “আপাতত ধরে নাও, সে শুধু আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রী ছিল। তুমি নিঃসঙ্কোচে বলতে পারো।”
মৌনিতা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলতে শুরু করল,
“আসলে ভাইয়ার সাথে ওঁর সম্পর্কটা মোটেও ভালো ছিল না। এটা আমি ওঁর নিজের মুখ থেকেই শুনেছিলাম। ওঁর বয়স তখন কম ছিল। বাড়ির লোক বড়লোক ছেলে দেখে ওঁর নিজের পছন্দের কোনো তোয়াক্কাই করেনি। এক প্রকার জোর করেই ভাইয়ার সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভাইয়া নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সম্পর্কটা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু ওঁর দিক থেকে কোনো সাড়াই ছিল না। সারাক্ষণ দুজনের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। বাড়ির সবাই যে কতটা বিরক্ত আর অশান্তিতে ছিল তা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। ভাইয়া কাজের সূত্রে কত ইভেন্টে যেত। ও কখনো সাথে যেতে চাইতো না। ওঁর নাকি মনে হতো ভাইয়ার পাশে তাকে একদম মানায় না! আরও কত কী। আর এরপর একদিন হঠাৎ করেই জানতে পারলাম!”
বলতে বলতে মৌনিতা হুট করে চুপ হয়ে গেল। যদিও নবনী অভয় দিয়েছে যে সে রাগ করবে না। তবুও তো রক্তের টান! একজনের আপন মৃত বোনকে নিয়ে তার সামনে এত কথা বলা কি ঠিক হচ্ছে? তাছাড়া নবনী যখন এসবের কিছুই জানে না তার মানে দিব্য নিজেও কখনো অতীত নিয়ে ওঁর সামনে মুখ খোলেননি। তাহলে সে কেন অযাচিতভাবে এই অপ্রিয় সত্যগুলো ওঁর কানে তুলবে? যতটুকু বলেছে ততটুকুই বোধহয় বড্ড বেশি বলা হয়ে গেছে। মৌনিতার কথাগুলো শুনে নবনী একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে সবজি কাটার ছুরিটা যেন আলগা হয়ে আসতে চাইল। বিয়ের পর অবনী কেন বাপের বাড়িতে এত কম যেত? তার কারণ হিসেবে বাড়ির সবাই ভাবত। শ্বশুরবাড়ির রাজকপাল আর সুখে অন্ধ হয়ে সে হয়তো বাপের বাড়িকে ভুলে গেছে। অথচ অবনী যে মনে মনে একটা তীব্র ক্ষোভ আর সুপ্ত অভিমান নিয়ে নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তা বাড়ির কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। দিব্যকে তখন অবনীর পছন্দ নাও হতে পারে এটা তো অসম্ভব কিছু নয়। তাছাড়া তখনকার দিব্য আর আজকের দিব্যর মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত! নবনী নিজেই তো প্রথম প্রথম অবাক হয়েছিল। তবে কি এই চরম তিক্ত অতীতটাই দিব্য তালুকদারের এভাবে বদলে যাওয়ার মূল কারণ? মৌনিতার মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“কী হলো চুপ করে গেলে যে?”
মৌনিতা বলল, ‘তুমি বরং বাকিটা ভাইয়ার কাছ থেকেই জেনে নিও। যদি উনি কখনো নিজে থেকে বলেন। এমনিতে একজন মৃত মানুষ সম্পর্কে আমার এভাবে এত কথা বলা একদম উচিত হয়নি। সত্যি, আমি ভুল করে ফেলেছি।”
নবনী নরম গলায় বলল, “মৌনিতা, মন খারাপ করছ কেন? তুমি মোটেও খারাপ কিছু বলোনি। জীবনের এসব সত্যি স্বাভাবিক। আচ্ছা, তুমি একটা কথা জানো? প্রথম প্রথম কিন্তু আমিও তোমার ভাইয়াকে একদম পছন্দ করতাম না।”
কথাটা শুনে মৌনিতার চোখের পলক থমকে গেল। সে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আর এখন? এখন করো?”
নবনী ক্ষণিকের জন্য একটু হাসল। “এখন বোধহয় একটু বেশিই পছন্দ করি। আমার তো মনে হয় উনি নিশ্চিত কোনো জাদু করেছেন!”
দুজনেই একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠল। কলরব রান্নাঘরে এসে ঢুকল। দুই ভাবির হাসিমুখ দেখে সে ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার? কী নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছে শুনি?”
মাথায় একটা ক্যাপ গলিয়ে রাখা কলরবের দিকে তাকিয়ে মৌনিতা ঠোঁট উল্টে বলল,
“ভাইয়া, তোমার মাথায় এখন যথেষ্ট চুল গজিয়েছে। তাছাড়া এই ভরদুপুরে বাড়ির ভেতরে ক্যাপ পরে থাকার কী দরকার শুনি?”
কলরব ওদের আরও কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর রাখা ঝুড়ি থেকে একটা লাল টকটকে আপেল তুলে নিয়ে তাতে কামড় বসাল। তারপর চিবোতে চিবোতে বলল,
“তুমি বুঝবে না ভাবি। যতদিন না আমার আগের সেই চুল পুরোপুরি ফিরে পাচ্ছি। ততদিন এই ক্যাপ আমার মাথায় থাকবে। আচ্ছা, শোনো না ভাবিজানেরা। একটা আবদার আছে কিন্তু!”
নবনী কৌতূহলীগলায় বলল, “কী আবদার, শুনি?”
“একটা পিকনিক করলে হয় না? এই একঘেয়ে বাড়িতে বসে বসে আমি বোর হচ্ছি। কত দিন হয়ে গেল বলো তো। বাড়িতে কোনো হুল্লোড় নেই।কোনো আনন্দ নেই!”
কলরব বেশ মনমরা হওয়ার ভান করে বলল। মৌনিতা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“খুব বেশি দিন অবশ্য হয়নি ভাইয়া। তবে এখন পিকনিকের ভূত মাথা থেকে নামাও। পরশদিন বোধহয় ইহান আর ইভানের মুসলমানি হবে। আব্বু সকালে বলছিলেন। বড় করে না হলেও ছোটখাটো একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান করবেন।”
অনুষ্ঠানের কথা শুনে কলরব হতাশ হয়ে বলল, “তাহলে তো হয়েই গেল! ধুর বাবা…!”
নবনী হেঁসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কি কিছু লাগবে? হঠাৎ রান্নাঘরে যে এলে?”
“আসলে দুপুরের মেনুতে আমি একটু বিরিয়ানি খেতে চাই। ওটাই বলতে এসেছিলাম। পাব তো? তোমরা চাইলে রান্নায় আমিও একটু হাত লাগাতে পারি! আমি এমনিতেও বেকার।”
কলরবের রান্নায় সাহায্য করার কথা শুনে মৌনিতা কিছু একটা বলার জন্য মাথা নাড়ল। কিন্তু ঠিক তখনই বাহিরে নজর পড়তেই সে থমকে গেল। দেখল, নিযানা গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই অসময়ে মোটেও তার কলেজ ছুটি হওয়ার কথা নয়। মৌনিতা অবাক হয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“ওটা নিযানা না? কিন্তু এই সময় বাড়িতে কী করছে?”
কলরব আর কোনো কথা বাড়াল না। রান্নাঘর থেকে অত্যন্ত ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো সে। নিযানার আচমকা এই অসময়ে বাড়ি ফেরাটা তার মনেও খটকা তৈরি করেছে। কৌতূহল নিয়ে নিজের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে কিছুটা অবাক হলো। পুরো ঘরটা সুনসান। একদম ফাঁকা। মেয়েটা তো মাত্রই এই ঘরের দিকে এলো। তাহলে গেল কোথায়? ঘরের ভেতর থেকেই ফোঁপানির শব্দ ভেসে এলো কলরবের কানে। সে পা টিপে টিপে খাটের ওপাশে এগিয়ে গিয়ে দেখল। নিযানা মেঝেতে বসে আছে। খাটের কাঠে পিঠ ঠেকিয়ে। মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর আরও কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কারও পায়ের আওয়াজ আর উপস্থিতি টের পেয়ে নিযানা তাড়াহুড়ো করে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে বারকয়েক চোখ মুছে নেওয়ার চেষ্টা করল। কলরব কোনো ভণিতা না করে ওর ঠিক পাশটাতে খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসল। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“সমস্যা কী?”
নিযানা কোনো উত্তর দিল না। নিজের কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সে পারল না। উল্টো ফোঁপানির বেগ আরও বেড়ে গেল। অনবরত জল গড়িয়ে পড়ার কারণে ওর ফর্সা মুখটা এতক্ষণে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। চোখের কাজল লেপ্টে একাকার অবস্থা। কলরব ওর এই অবস্থা দেখে কিছুটা অধৈর্য হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে বলবি তো?”
“কিছু না।”
নিযানা অত্যন্ত ক্ষীণ আর জড়ানো গলায় জবাব দিল। ওর এই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখে কলরব ধমকে উঠল,
“আমি জিজ্ঞেস করেছি কী বালডা হয়েছে? তুই নিজে বলবি নাকি আমি কলেজে গিয়ে নিজে সব জেনে আসব?”
নিযানা চমকে উঠল। রাগী চোখে কলরবের দিকে তাকাল। এমনিতে নিজের ভেতরের পরিস্থিতি বিপর্যস্ত। তার ওপর কলরবের এই অকারণ ধমক। সব মিলিয়ে তার ভেতরের চেপে রাখা ক্ষোভটা এবার তপ্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“বললাম তো কিছু না! শুনে কী করবে তুমি? পারবে কিছু করতে? শুধু এমন চিৎকারই করতে পারো তুমি, কলরব। একজন মানুষ এভাবে কাঁদছে আর তুমি তার সাথে এমন ব্যবহার করছ?”
কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। স্যরি। কিন্তু তুই না বললে আমি বুঝব কী করে যে কী হয়েছে? কলেজে গিয়েছিলি তো। আবারও পরীক্ষায় নম্বর কম পেয়েছিস? ধুর, এটা নিয়ে এত রিয়াক্ট করার কী আছে! এমন তো আসতেই পারে।”
“একটা ছেলে সবার সামনে আমাকে অপমান করেছে।”
কথাটা বলেই সে ঝট করে নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। নিযানার মুখের এই একটা বাক্য শুনে কলরব পুরো থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সে খাট থেকে চট করে নেমে মেঝেতে, নিযানার ঠিক মুখোমুখি এসে বসল। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোন ছেলে? কী বলেছে?”
নিযানা মুখ ঘুরিয়ে জেদ ধরে বসে রইল। চোখ দিয়ে অনবরত নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। কলরব নিজেকে সামলাতে পারল না। নিজের দুই হাতের আজলায় নিযানার দু-গাল আগলে ধরল। তারপর আলতো করে মুখটা ঘুরিয়ে আনল নিজের দিকে। ব্যাকুলতা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বল না। কে কী বলেছে তোকে?”
কলরবের এই হঠাৎ নরম স্পর্শ আর আকুলতা দেখে নিযানার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। কলরবকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের মাথাটা গুঁজে দিল কলরবের চওড়া বুকের ঠিক মাঝখানটায়। কলরবও কোনো দ্বিধা না করে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আগলে নিল ওকে। এক হাত দিয়ে ওর মাথায় বিলি কেটে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। কিছুক্ষণ ওভাবেই কেটে যাওয়ার পর নিযানার ফোঁপানির শব্দটা ধীরে ধীরে কমে এলো। সে নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। অতঃপর কলরবের বুক থেকে মাথা না তুলেই অত্যন্ত কম্পিত আর ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
“আজকে কলেজে একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছিল। আমার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। এমনকি আমি এই ব্যাপারে আগে থেকে জানতামও না। স্যার হঠাৎ ক্লাসে এসে আমাকে যোগ দিতে বললেন। আমি প্রথমে রাজি হইনি। কিন্তু পরে উনি খুব করে রিকোয়েস্ট করলেন। বললেন এটা নাকি কলেজের জন্য খুব ইমপর্টেন্ট। অত অনুরোধ দেখে আমি শেষ পর্যন্ত বললাম। ঠিক আছে…!”
কলরব মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শুনছিল। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তারপর?”
নিযানা পুনরায় বলল, “সিটি কলেজ থেকে অপর পক্ষের প্রতিযোগী দলটা এসেছিল। ওরা তিনজনই ছেলে। বিতর্কে আমরা মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে যাই। আর সত্যি বলতে ওখানে আমার একটা ছোট মিস্টেক ছিল। প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর যখন আমি হলরুম থেকে বেরিয়ে চলে আসছিলাম। তখনই ওরা আমাকে লক্ষ্য করে নানান আপত্তিকর কথা বলতে শুরু করে। ওরা তোমাকে চেনে কলরব। আমাদের বিয়ের ব্যাপারেও ওরা সব জানে। ওরা আমাকে ‘ভাবি’ বলে সম্বোধন করছিল। আর এইসব নিয়ে বড্ড নোংরা নোংরা ইঙ্গিত করছিলো।’
কথাটা শেষ করতেই নিযানা আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। প্রতিটা শব্দ যেন কলরবের কানের পর্দায় গিয়ে বিঁধলো। তার সুঠাম চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল রাগে। মনে হলো তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় রক্তকণিকাগুলো এক তীব্র আক্রোশে ছটফট করে উঠেছে। হাতের মুষ্টি এতটাই শক্ত করে বাঁধল যে নখগুলো হাতের তালুতে গিয়ে বিঁধল। দাঁতে দাঁত চেপে, ভেতর থেকে আসা তীব্র রাগটা কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী বলেছিল ওরা?”
নিযানা কলরবের বুক থেকে মাথাটা সামান্য উঁচু করে তার মুখের দিকে তাকাল। কলরবের চোখের মণি রাগে জ্বলজ্বল করছে। সে নিথর দৃষ্টিতে নিযানার দিকেই চেয়ে আছে। নিযানা সেই তীব্র দৃষ্টির মুখোমুখি হতে পারল না। সে আবারও আগের মতো কলরবের বুকের মাঝে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। কলরব তাকে বারণ করল না। নিজের দুই হাত দিয়ে নিযানাকে আরও একটু শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। নিযানা ওভাবেই বলল,
“বলছিল আমার নাকি এসব না করে ঘরে গিয়ে সংসার করা উচিত। রান্না-বান্না করা উচিত। বিতর্ক প্রতিযোগিতা নাকি আমার জন্য নয়। আমার নাকি ‘সেকেন্ড হ্যান্ড জামাইয়ের’ কোলে বসে থাকাই মানায়! তোমার সাথে থাকলে এর থেকে বেশি কিছু করা নাকি আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব না। জামাই সামলাতে সামলাতেই তো দিন পার হয়ে যাবে। পড়ার সময় পাব কীভাবে? বাকি কথাগুলো খুব নোংরা ছিল। কুৎসিত। আমি ওসব মুখেও আনতে পারব না।”
কলরব শান্ত গলায় বলল, “চুপ কর। ঠিক আছে। তোকে আর কিছু বলতে হবে না। শুধু এইটুকু বল। ওই ছেলেটার নাম কী ছিল?”
“আযান রহমান।”
নামটা শোনামাত্রই কলরবের রাগ যেন এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। নামটা তার পরিচিত। খুব চেনা। নিজের অতীত জীবনের একটা চ্যাপ্টার যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। নিযানা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওরা তো আমাদের সিনিয়র ছিল। তোমাকে কীভাবে চেনে?”
“ফ্রেন্ড ছিল আমার।”
“ওই জঘন্য ছেলেটা তোমার বন্ধু ছিল?”
কলরব আমতা আমতা করে বলল, “আরে, ছিল… মানে আগে ছিল। এখন বাদ দে ওসব। লম্বা কাহিনি। কিন্তু একটা কথা বল তো। তুই নিজে কিছু বলতে পারিসনি? ল্যাদাবাচ্চা কোথাকার! তোর ঘরে যে এত এত ট্রফি সাজানো আছে। ওখান থেকে দুই-তিনটে নিয়ে ওটার মুখে ছুড়ে মারতিস!”
“আমার সাথে কখনো কেউ এভাবে কথা বলেনি তো। আমি অভ্যস্ত নই। আমার খুব কষ্ট হয়েছে। খুব বাজে লেগেছে।”
কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর চোখের পাশটা আঙুল দিয়ে মুছে দিল। বিরক্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। একদম ননীর পুতুল একটা!”
নিযানা একটু চুপ করে রইল। কলরবের বুক থেকে মাথাটা তুলে চোখের দিকে তাকালো। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি ওদের কিছু বলবে না?”
কলরব স্বাভাবিক ভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “নাহ। কী-ই বা বলতে পারি আমি?”
নিযানা যেন কলরবের এই নিস্পৃহ উত্তরে কিছুটা আশাহত হলো। হতাশা নিয়ে মুখটা নিচু করে শুধু বলল,
“তাই তো!”
কলরবকে আর কিছু বলতে পারেনি নিযানা। তার এই নিস্পৃহ আচার-আচরণে নিযানা আহত হয়েছে। কলরবকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মনের ভেতরে দলা পাকানো কষ্ট আর অপমানের মেঘগুলোকে কিছুতেই বাষ্পীভূত হতে দিল না। আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করে নিয়ে কোনো কথা না বলেই দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেল। কলরব কিছুক্ষণ ওইভাবে বসে রইল। তারপর নিজের গিটারটা বের করল। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আলতো হাতে তাতে আঙুল বুলাল। অনেকদিন গিটারটা দেখা হয় না। বাজানো তো দূরের কথা। ধুলোর আস্তরণ পড়েছে তাতে। গিটারটা নিয়েই বিছানায় বসল সে। ওয়াশরুম থেকে বেরোতে নিযানার খুব একটা সময় লাগল না। দ্রুত গোসল শেষ করে ভেজা চুলে বের হলো সে। বেরোতে বেরোতে হঠাৎ কলরবের দিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কলরবের হাতে ওটা কী? একটা শার্ট দিয়ে গিটার মুছছে সে? নিযানা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে এক প্রকার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করেই ওর হাত থেকে শার্টটা নিয়ে নিল। কলরব মুখ তুলে চাইল। তার শান্ত, নির্লিপ্ত চাহনি যেন নিযানার রাগটা আরও বাড়িয়ে দিল। সে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“তুমি কি কানা? এটা দিয়ে গিটার মোছার সাহস হলো কী করে তোমার?”
কলরব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন? সমস্যা কী?”
“এটা কায়েফের শার্ট। আমি ওকে ফেরত দেব।”
কলরব বিরক্ত গলায় বলল, “ফেরত দিবি তো এতদিন আলমারিতে রেখে দিয়েছিস কেন? কায়েফের কাছে যেতে কি প্লেন ভাড়া করা লাগে?”
“আমি ভুলে গেছিলাম। এটা কি করলে তুমি? আবার ধুতে হবে শার্টটা।”
কলরব খেয়াল করল নিযানার চোখেমুখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। শার্টটার প্রতি বেশ মায়া। সেটা সুন্দর করে ঝেড়ে টেড়ে আবারও আলমারিতে রেখে দিল। কলরব আবারও গিটারটা হাতে নিয়ে দুই তিনবার তারের উপর আঙুল ছোঁয়াল। তালের এক অদ্ভুত ঝংকার ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। নিযানা ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
“একটা গান গাইতে পারো। আমি সেইভাবে শুনিনি।”
“তোর কথা কেন শুনব?”
“ঠিক আছে, শুনতে হবে না।”
কলরব একটু মৃদু হেসে নিযানার দিকে চাইল। বলল,
“যা, দরজা বন্ধ করে আয়।”
কথাটা শুনে নিযানার চোখমুখ মুহূর্তেই চকমক করে উঠল। কলরব খেয়াল করল। সে ছুটে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসল। কলরব গিটারটা নিয়ে বিছানায় মুখোমুখি পা তুলে বাবু হয়ে বসল। নিযানা ওর ঠিক অপোজিটে ফোনটা বের করে কলরবের দিকে ধরল। কলরব তা দেখে একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী করছিস?”
“ভিডিও।”
“কোনো মানে হয় না।”
“শুরু করো না।”
কলরব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গিটারের তারে আঙুল বুলাল দক্ষতার সাথে। এক অদ্ভুত, মনমাতানো সুর ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। তারপর শুরু করল গান…….
আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল
বাতাসের আছে কিছু গন্ধ
রাত্রির গায়ে জ্বলে জোনাকি
তটিনীর বুকে মৃদু ছন্দ।
সূর্য ডুবেছে অনেক আগে। চেনা পৃথিবীটাকে গ্রাস করেছে এক চাদর নিকষ কালো আঁধার। চারপাশটা বড্ড শুনশান। নিঝুম। কেবল নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার একঘেয়ে ডাক। কায়েফ বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে অলসভাবে বসে রইল। ল্যাপটপটা পাশেই খোলা কিন্তু আজ আর কোনো কাজে মন বসছে না। এক অদ্ভুত শূন্যতা ভর করেছে বুকজুড়ে। বিরক্তি কাটাতে সে ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনটা অন করতেই ওয়ালপেপারের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল এক হাস্যোজ্জ্বল রমণীর মুখ। পরনে তার জমকালো লেহেঙ্গা, ভারী গয়না আর নিখুঁত সাজ। অপূর্ব সুন্দর লাগছে তাকে। নিযানার ছবি। কলরবের বিয়ের দিন কায়েফ নিজেই তুলেছিল এই ছবিটা। বুকে একটা সূক্ষ্ম মোচড় দিয়ে উঠল তার। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ওয়ালপেপার থেকে ছবিটা সরিয়ে দিল। সেখানে জায়গা করে নিল এক টুকরো সাধারণ ডার্ক থিম। এত দিন কেন এই মায়া আগলে রেখেছিল তা আজ নিজের কাছেই বড় অবুঝ ঠেকল। মন ঘোরাতে ইনস্টাগ্রামে ঢুকতেই স্ক্রিনের ওপর একটা নতুন ভিডিও ভেসে উঠল। নিযানার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে মাত্র কিছুক্ষণ আগে। ব্যাকগ্রাউন্ডে পরিচিত ঘর। গিটার হাতে কলরব। কায়েফের ঠোঁটের কোণে ম্লান একটা হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটা আসলেই মারাত্মক সুন্দর গায়। সুরের ওপর দখল আছে। গান নিয়ে এগোলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতে পারত ওঁর। ঠিক এমন সময় ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। বাইরে থেকে মাজহার গলা ভেসে এলো,
“কায়েফ, তুই কি ঘুমিয়ে গেছিস?”
কায়েফ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, “না আম্মু। ঘুমাইনি। এসো।”
মাজহা ঘরের ভেতর ঢুকে কায়েফের মুখোমুখি বিছানায় বসলেন। ওঁর হাতে একটা চারকোনা ছবি। সেটা কোনো ভণিতা না করে কায়েফের দিকে এগিয়ে দিলেন। কায়েফ হাত বাড়িয়ে ছবিটা নিল। উঁকি দিয়ে দেখল। একটা অপরিচিত মেয়ের ছবি। বেশ মিষ্টি, সুন্দরী। মায়ের মনের উদ্দেশ্যটা বুঝতে কায়েফের বিন্দুমাত্র সময় লাগল না। তবুও সে কিছুটা নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এটা কেন আম্মু?”
মাজহা মুখে প্রসন্ন হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আমার এক কলেজের বান্ধবীর মেয়ে। সেদিন মার্কেটে অনেক দিন পর ওদের সাথে দেখা হলো। তুই বিশ্বাস কর কায়েফ মেয়েটা সামনাসামনি আরও কতটা যে রূপবতী। তা এই ছবিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দরী বউ হবে ও।”
কায়েফ ছবিটার দিকে আর একবার তাকাল। তারপর ওটা বিছানায় নামিয়ে রেখে ম্লান স্বরে বলল,
“আম্মু, বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে কী-ই বা যায় আসে? হলোই বা সে নিযানার চেয়েও রূপবতী কিন্তু সে তো আর নিযানা নয়।”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মাজহা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। গলার স্বর কিছুটা চড়িয়ে ধমকের সুরে বললেন,
“কায়েফ! সবকিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। তুই নিজের মনে কী ভেবে রেখেছিস বলতো?”
কায়েফ মায়ের চোখের দিকে চেয়ে বলল, “ভাবছি, সেদিন যদি আমার অনুরোধটা মেনে নিয়ে নিযানার সাথে আমার বিয়ের কথাটা পাকা করে রাখতে তাহলে আজকে তোমার এত কষ্ট করে বিশ্বসুন্দরী খুঁজে বেড়ানোর প্রয়োজন হতো না।”
“যেখানে নিযানার জন্মের পর পরই তোর বড় চাচা কলরবের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন। সেখানে আমি নতুন করে তোর জন্য ওকে কীভাবে চাইতাম বল? কলরব যদি তখন এসব বাড়াবাড়ি না করত তবে ভবিষ্যতে হয়তো ওদের দুজনেরই বিয়ে হতো। অথবা হয়তো হতো না। কিন্তু এখন সেসব অতীত ভেবে কী লাভ? তুই নাহয় তখন এই সিদ্ধান্তের কথা জানতিস না কিন্তু কলরব সব জানত। আর ও সময় মতো সবটা মেনে নিয়েছে।”
শেষ বাক্যটা কায়েফের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে মুখটা শক্ত করে অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি এখন বিয়ে করব না।”
“তাহলে আবার বিদেশে ফেরত যা।”
“আশ্চর্য তো আম্মু! তুমি আমাকে কী পেয়েছ বলো তো? যখন যা ইচ্ছা। যেভাবে ইচ্ছা। চাপিয়ে দেবে?”
“আমি তো তোর ভালোটাই চাই কায়েফ।”
“জানি।”
মাজহা উঠে দাঁড়ালেন। যাওয়ার আগে বললেন, “আমি ওসব কোনো অজুহাত শুনছি না। তুই মেয়েটার সাথে দেখা করবি। ও আর ওর পরিবার খুব শিগগিরই আমাদের বাড়িতে আসবে। কয়দিন পরেই তো বাড়িতে অনুষ্ঠান। আমি ওদের দাওয়াত দিয়েছি।”
কায়েফ আর কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। ছেলের থমথমে মুখ দেখেই মাজহা আন্দাজ করলেন যে প্রস্তাবটা তার একদম পছন্দ হয়নি। তবুও তিনি আর কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। নীরব পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরটা আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। কিন্তু কায়েফের কানে তখনো মায়ের বলা সেই একটা বাক্য অবিরত বাজছে। কলরব সব জানত। যদি কলরব প্রথম থেকেই সব জেনে থাকে তবে সে কেন কায়েফকে একবারও জানাল না? কেন এই ভুল পথে পা বাড়াতে বারণ করল না?
সেই দুপুরের পর থেকে নবনীর মনের ভেতর একটা অস্থিরতার চোরাস্রোত বয়ে চলেছে। কিছুতেই সে মৌনিতার বলা কথাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। গভীর ভাবনার জাল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। বিছানায় শুয়ে সে তার কোলের মধ্যে থাকা ছোট্ট প্রাণটাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল। দিয়া হঠাৎ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“মাম্মা, তুমি কি চিন্তিত?”
নবনী চট করে তাকাল মেয়ের দিকে। মেয়ের এই আকস্মিক প্রশ্নে ঘরের অন্য প্রান্তে সোফায় বসা দিব্যও ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকাল ওদের দিকে। দিব্যর সেই গভীর দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই নবনী কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল। নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা আড়াল করতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কই, না তো সোনা। তুমি এবার ঘুমিয়ে যাও দেখি।”
দিয়া আবারও বলল, “মাম্মা, আমরা কি মামা আর খালামণিকে আমাদের বাসায় ইনভাইট করতে পারি না? আমি ওদের খুব মিস করছি। ইহান, ইভান আর আমরা সবাই মিলে একসাথে অনেক খেলব।”
“আচ্ছা। আমরা মামা আর খালমণিকে আমাদের বাড়িতে আসতে বলে দেব। এবার ঘুমাও।”
দিয়া খুশি হয়ে বলল, “ওকে! থ্যাংক ইউ মাম্মা। আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ।’
নবনী ওর নরম গালে আদর করে একটা শব্দ করে চুমু খেল,
“আই লাভ ইউ টু, সোনা।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই দিয়া গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। নবনী খেয়াল করল দিব্য তখনো একইভাবে ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে আছে। নবনীর চোখে এবার খানিকটা বিরক্তি দানা বাঁধল। লোকটার এত কিসের কাজ! অফিসে তো সারাদিন কাটে। বাড়িতে এসে রাতেও সেই একই দৃশ্য। সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকল,
“শুনুন।”
দিব্য মুখ তুলে চাইল। নবনী বলল, “এবার এসে শুয়ে পড়ুন তো। অনেক হয়েছে কাজ।”
দিব্য আর দ্বিরুক্তি করল না। বাধ্য ছেলের মতো ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। এসে নবনীর পাশে শুয়ে পড়ল। ঘরে এতক্ষণ একটা ড্রিম লাইট জ্বলছিল। নবনী হাত বাড়িয়ে সেটা নিভিয়ে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে দিল। কেবল জানালার ফাঁক গলে রাতের মৃদু আলো ঘরে এসে পড়েছে। নবনী স্বাভাবিক নিয়মে নিজের মাথাটা আলতো করে ঠেকাল দিব্যর চওড়া বুকের ওপর। দিব্যও যেন এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে এক হাত নবনীর মাথায় রাখল অন্য হাতটা দিয়ে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিল। নবনী বলল,
“কাল থেকে কিন্তু আপনার ঘরের ভেতরে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করা একদম বারণ।”
দিব্য মৃদু হেঁসে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে কাল থেকে অন্য ঘরে চলে যাব কাজ করতে।”
“নাহ! কোথাও যাবেন না। এখানেই থাকবেন।’
দিব্য আচমকা একটু নড়েচড়ে ওঠে। নবনীকে আলতো করে নিজের বক্ষের নিচে নিয়ে এলো। আচমকা এই অবস্থানে চলে আসায় নবনী কিছুটা হকচকিয়ে গেল। ধক করে উঠলো বোধহয় বুকটা। নবনীর কপালে এসে পড়া অবিন্যস্ত চুলগুলো আঙুল দিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল দিব্য। তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিছু কি হয়েছে, নবনী?”
নবনী কোনো উত্তর দিল না। নিথর হয়ে রইল। দিব্য ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“কথা বলছ না কেন? রাগ কিংবা অভিমান হয়েছে নাকি কিছু নিয়ে? না বললে বুঝব কী করে বলো? আমার জানা মতে তো ইদানীং আমি কোনো ভুল করিনি।”
দিব্যর চোখের দিকে সোজা তাকাল নবনী। অন্ধকার ঘরের আবছা আলোতেও ওঁর চোখের গভীরতা স্পষ্ট। ধীরস্থির গলায় বলল,
“আপনাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করলে সত্যি সত্যি উত্তর দেবেন তো?”
“কী জিজ্ঞেস করবে?”
“আগে কথা দিন লুকোবেন না। একদম সত্যি বলবেন।”
“কথা না দিলে, বলা যাবে না?”
“নাহ, যাবে না।”
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নবনীর ললাটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আচ্ছা দিলাম কথা। বলো কী জানতে চাও?”
“আপুর সাথে আপনার সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল?”
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন, নবনী?”
“আগে বলুন।”
নবনী শক্ত বুকটার ওপর হাত রেখে চাপ দিল। দিব্য বলল,
“কী জ্বালা! তোমাকে ভালোবাসলেও তুমি রাগ করো আবার না বাসলেও রাগ করো। এটা কেমন বিচার হলো?”
“কথা ঘোরাবেন না।”
“না ঘোরালে কী পাব, শুনি?”
“যা চাইবেন। তা-ই।”
“আমি কিন্তু আদর করতে চাইব…!”
নবনীর কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। তীব্র এক লজ্জার রক্তিম আভা পলকে ভর করল তার ফর্সা গাল জুড়ে। ভাবনার পরিধিটা কোথায় ছিল আর এই লোকটা কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে! সে আমতা আমতা করে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
দিব্য নিরাসক্ত গলায় বলল, “বিশেষ সুখকর ছিল না।”
“আপু আপনাকে পছন্দ করত না। এ ছাড়াও আরও অনেক রূঢ় সত্যি ছিল এর আড়ালে। আপনি তার সবটাই জানেন। কিন্তু আমার কাছে এতদিন গোপন করে গেছেন। বলেননি কেন?”
দিব্য একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুমিই বা কেন এই অতীত নিয়ে এত জেদ করছো বলো তো? সে তোমার নিজের বোন ছিল। আজ সে পৃথিবীতে নেই। আমি শুধু চেয়েছিলাম তার প্রতি তোমার মনে যে ভালোবাসা আর সম্মানটুকু আছে। তা যেন আজীবন অটুট থাকে। সে আমার সাথে যতদিন ছিল ছিলো তো। সম্পর্কটা সুখের না হলেও তার গোপনীয়তা রক্ষা করা তো আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, তাই না? আচ্ছা, তোমাকে এই আংশিক কথাগুলো কে বলল? নাকি নিজের মন থেকে ধারণা করে নিচ্ছ?”
“জেনেছি কোনোভাবে। আপনি এখন সত্যিটা বলবেন কি না বলুন? আমি কিন্তু সবটা জেনেশুনেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। আর মনে রাখবেন। মেয়েদের কাছে কখনো মিথ্যে বলতে নেই। কারণ, তারা সবটা জেনেই প্রশ্ন করে।”
দিব্য একটু হাসল, “ইশ! তা কী কী জেনেছেন?আমাকেও একটু বলুন না। দিয়ার মাম্মা৷”
“বলুন না প্লিজ! কেন বাচ্চাদের মতো জেদ করছেন?”
দিব্য কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইল। ঘরের অন্ধকারটা যেন আরও ঘনীভূত হলো। ভারী গলায় সে বলতে শুরু করল,
“যা শুনেছ, হয়তো তা-ই সঠিক। অবনীর আমাকে একদম পছন্দ ছিল না। তবে এই অবধি হলেও আমি তার সমস্ত অভিযোগ, অভিমান মুখ বুজে মেনে নিয়ে ওর সাথে সংসার করার চেষ্টা করে গেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমি জানতে পারলাম। সে আমারই এক বন্ধুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। তাও আবার দিয়ার জন্মের আগে থেকে। দিয়া হওয়ার পর নাকি ওদের দুজনে মিলে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান ছিল। প্রথম দু-বার আমি ওদের হাতেনাতে ধরেছিলাম। অবনী কেঁদে কেটে ক্ষমা চেয়েছিল। আমিও দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ওকে মাফ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফল কিছুই ঠিক হয়নি। এমনকি… এমনকি একপর্যায়ে আমাকে এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।”
নবনীর মনে হলো সে যা শুনছে তার সবটাই এক দুঃস্বপ্ন। ওঁর মনে হলো ওঁর কানের ভেতর কে যেন ফুটন্ত গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে। তার নিজের বোন এত বড় অপরাধ করতে পেরেছিল? দিব্য হঠাৎ চুপ করে গেল। নবনী নিজের ভেতরের কাঁপনটুকু কোনোমতে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তারপর? তারপর কী হলো?”
“সেদিন চলে যাওয়ার আগে অবনী রাতে আমাকে এক কাপ কফি বানিয়ে দিয়েছিল। ওটাতে বি ষ মেশানো ছিল। কিন্তু আমাকে শেষ মুহূর্তে এসে সবটা জানিয়ে দেয় আমারই সেই বন্ধু। আসলে তথাকথিত বন্ধুত্বের খাতিরেই হোক বা যে কারণেই হোক। সে অন্তত আমাকে প্রাণে মা রতে চায়নি। কিন্তু অবনী আমাকে মারতে চেয়েছিল। কারণ আমি ম রলে সম্পত্তির একটা বড় অংশ ওর নামে হতো। বিশ্বাস করো ওটা শোনার পর আমার মনে হয়েছিল কফিটা খেয়ে আমি সত্যিই মরে যাই। একদিকে আমি আমার ছোট্ট দিয়াটার দিকে তাকাচ্ছিলাম আর অন্যদিকে ওর মাকে দেখছিলাম। কী দিইনি আমি ওকে। একটা মানুষ কীভাবে নিজের স্বামীর সাথে এমনটা করতে পারে? আমার জানা নেই। তবে আমার ওপর ওর একটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল। আমি কাপটা নিয়ে কাজের বাহানায় অন্য রুমে চলে গেলাম। আর অবনী সেই রাতেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। আমিও ওর পিছু নিলাম। শহরের বাইরের একটা ব্রিজের ধারে অপেক্ষা করছিল আমার সেই বন্ধু আহন্ত। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম ওদের দুইজনের মধ্যে তীব্র ঝগড়া লেগেছে। আহন্ত ওকে গ্রহণ করতে চাইছিল না। সে বলছিল, যে মেয়ে নিজের স্বামীর ক্ষতি করতে পারে। সে অন্য কারও কথায় তাকেও তো একদিন মেরে ফেলতে পারে! আমি আড়াল থেকে দেখছিলাম অবনীকে পাগলামি করতে। ভেতরে ভেতরে আমি চুরমার হয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু মুখে কিছু বলিনি। ততক্ষণে মানসিকভাবে আমার জীবন থেকে অবনীকে আমি পুরোপুরি মুছে ফেলেছি। এরপর অবনীকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আহন্ত আর ও একই গাড়িতে ব্যাক করছিল। কিন্তু মাঝরাস্তায় ওদের গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক ভয়াবহ এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হয়। ঘটনাস্থলেই দুইজন মা রা যায়। আমি ওদের হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং পুলিশকে মিথ্যা বলি যে আমিও ওই গাড়িতে ছিলাম। আমি চাইনি এটা নিয়ে কথা হোক। এর পরের কাহিনি তো তোমার জানাই…!”
বলতে বলতে দিব্যর গলাটা একটা জায়গায় এসে কেঁপে উঠল। নবনী স্পষ্ট টের পেল এই লৌহমানব পুরুষটার চওড়া বুকটা নিঃশব্দে কেঁপে উঠছে। লোকটা কাঁদছে। নবনীর চোখ দিয়েও এতক্ষণে অজান্তে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে। তবুও সে নিজেকে শক্ত করল। দুই হাত বাড়িয়ে সে দিব্যর গলাটা জড়িয়ে ধরল। তারপর ওঁর মাথাটা টেনে এনে চেপে ধরল নিজের বুকের মাঝে। দিব্য সত্যিই কাঁদছিল। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আর যাকে জীবনসঙ্গী করেছিল তাদের কাছ থেকে এমন জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা কখনো কাম্য ছিল না ওঁর। আঘাতটা বড্ড গভীরে লেগেছিল। বিয়ের পর থেকে প্রতিনিয়ত ওঁর গায়ের রং, ওঁর সাধারণ চেহারা নিয়ে অবনী কম ছোট করেনি তাকে। সবটা মুখ বুজে সহ্য করেছিল সে। কিন্তু দিব্যও তো দিনশেষে রক্তমাংসের একটা মানুষ! তবে এতসব সত্যি স্বীকার করার মাঝেও দিব্য একটা কথা বড্ড সূক্ষ্মভাবে গোপন করে গেল। আহন্ত সেদিন ঘটনাস্থলেই মারা গেলেও অবনীর র ক্তাক্ত দেহে তখনো মৃদু প্রাণ স্পন্দন ছিল। দিব্য ইচ্ছা করলেই তখন ওকে হাসপাতালে নিয়ে বাঁচাতে পারত কিন্তু ওঁর মন সায় দেয়নি। ওঁর ইচ্ছা করেনি। সে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে অবনীর ছটফটানি আর নিস্তেজ হয়ে যাওয়াটা দেখেছিল। এই সত্যটা এই পৃথিবীর কেউ জানে না। আর কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই জানতেও পারবে না।
কলরব খাটে আধশোয়া হয়ে গভীর মগ্নতায় ফোন ঘাঁটছে। নিযানা কোলের ওপর বইটা মেলে ধরে চুপটি করে বসে আছে ঠিকই কিন্তু পড়ায় তার বিন্দুমাত্র মন নেই। কলরব আড়চোখে সেটা খেয়াল করল। নিযানার মাথার ভেতরে এখনো দুপুরের সেই অপমানের কথা আর বিতর্কের প্রতিটি মুহূর্ত ঘুরপাক খাচ্ছে। আসলেই, আজকের প্রতিযোগিতায় এত বড় একটা ভুল সে কীভাবে করল? তার ওই একটা ভুলের জন্যই পুরো দলটাকে হারতে হলো। এই গ্লানিটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। কলরব বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তাকে হুট করে গায়ের শার্টটা বদলাতে দেখে নিযানা কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে বলল,
“অসভ্যের মতো এভাবে আমার সামনে জামাকাপড় খুলছ কেন হঠাৎ?”
কলরব নতুন একটা টি-শার্ট গায়ে গলাতে গলাতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“চল! একটা জায়গায় যাব।”
নিযানা দেওয়ালের ঘড়ির পানে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে দশটার ঘর ছুঁইছুঁই করছে। এত রাতে কোথায় যাওয়ার কথা বলছে ছেলেটা? সে অবাক হয়ে বলল,
“এত রাতে আবার কোথায় যাব?”
“গেলেই দেখতে পাবি। কখনো রাতের শহর দেখেছিস? তুই তো সারাদিন ঘরেই পড়ে থাকিস।”
কলরবের কথায় নিযানা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। মনের ভেতরের বিষণ্ণতা কাটাতে তারও যেন এখন একটু বাইরের বাতাসের প্রয়োজন। সে আলমারির দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
“একটু সময় দাও আমাকে। আমি রেডি হয়ে নিই।”
কলরব তাকালো নিযানার দিকে। পরনে ব্লু রং এর একটা জিন্স সাথে লং কূর্তি।
“রেডি তো আছিসই। আবার কীসের রেডি? ওই চশমাটা চোখে পরে চলে আয়। কানা!”
কলরব তাড়া দিল। নিযানা মুখটা ছোট করে বলল,
“আমি মোটেও কানা নই, বুঝলে? চশমাটা আমি এমনিই পরি। ছোট থেকে পরি তাই অভ্যাস হয়েগেছে।”
“তাই নাকি? যখন ছোট থেকে পরিস তখন ওটা পরেই আয়। চশমা ছাড়া কিন্তু তোকে সাথে নেব না। কুইক। তাড়াতাড়ি কর।”
“আশ্চর্য কথা বলছ কিন্তু তুমি!”
“তুই কি চাস আমি তোকে রেখেই একা চলে যাই?”
নিযানা আর কথা বাড়াল না। বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত চুপিচুপি দুজনে সদর দরজা গলে বাইরে বেরিয়ে এলো। কিন্তু বাইরে এসে যখন কলরবের গ্যারেজ থেকে তার পুরোনো বাইকটা বের করতে দেখল। নিযানার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে আঁতকে উঠে বলল,
“এটা ঠিক করলো কে? তুমি আবার বাইক চালাবে?”
“আর নয়তো কী? হেঁটে যাব?”
কলরব বাইকে স্টার্ট দিল। নিযানা বলল, “পাগল নাকি তুমি? তোমার ভয় করে না?”
“আরে ভাই। মরতে তো একদিন হবেই। সেটা বাইক চালালেও মরব। না চালালেও মরব। আর তাছাড়া বাইক হলো আমার ফার্স্ট লাভ। ওকে কীভাবে ছাড়ি বল? এবার কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ পেছনে বস। হাতে কিন্তু একদম বেশি সময় নেই।”
নিযানা আলতো করে মাথা নাড়ল। কলরবের একরোখা স্বভাবের কাছে হেরে গিয়ে সে গুটিগুটি পায়ে বাইকের পেছনে এসে বসল। বাইকটা তীরের মতো ছুটে চলল পিচঢালা পথ ধরে। রাতের ফাঁকা রাস্তায় বাতাসের বেগ বাড়তেই নিযানা ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
এই অবেলায় পর্ব ৪১
“স্পিড কমাও কলরব! আমার ভয় লাগছে!”
“শক্ত করে ধরে বস। মরবি না তুই!”
কলরবের গলা বাতাসে ভেসে এলো। নিযানা কলরবের কোমরটা দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
