এই অবেলায় পর্ব ৫৫
সুমনা সাথী
নিযানা তপ্ত গলায় বলল, “আমি রক্তচোষা?”
“আর নয়তো কী? গিরগিটি কোথাকার! আমার সামনে এলে মনে হয় দুনিয়ায় আমি ছাড়া তোর আর কেউ নেই। অথচ চোখের আড়াল হলেই ঢং করে বলিস, ডিভোর্স দেব! এমনিতে তো জীবনটা ঠেলেঠুলেই পার করছি। তার ওপর তুই আর তোর ওই টাকপড়া বাপ! কেন আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস বল তো?”
নিযানা কিঞ্চিৎ থেমে বলল, “নাটক তুমিও কিছু কম করো না! এখন ফোনটা রাখো আর খেয়ে নাও। আর হ্যাঁ, বিধবা থাকতে যাবে কেনো তুমি? আরেকটা বিয়ে করে নিয়ো। তোমার কাছে তো আর কাউকে ভুলে যাওয়া তেমন কঠিন কোনো ব্যাপারই না! নতুন বউ ঘরে এলে সে থাকবে চারপাশে। আর মনের ভিতরে থেকে যাবে তোমার এক্স! ব্যস, হিসাব খতম! নিযানাকে আর কোনোদিনই মনে পড়বে না।”
কথাটা বলেই থমকে গেল নিযানা। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠলন ওর। মনে হলো, না বললেই বুঝি ভালো হতো। ওপাশে কলরবও মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। থমথমে নীরবতা ভাঙল তার ভারী কণ্ঠ,
“বাড়ি আসছ কবে?”
চমকে উঠে নিযানা নিশ্বাস আটকে ফেলল। মনে হলো, সে বুঝি ভুল শুনেছে! আমতা আমতা করে শুধাল,
“কেন… বাড়ি যাব কেন?”
কলরব শীতল গলায় উত্তর দিল, “কেন আবার? বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাব। আমার কেন যেন মনে হয়, তোমার রুচি আর পছন্দ বেশ ভালো!”
“এভাবে কেন কথা বলছ?”
“কীভাবে বলছি?”
“মানে… ওই, আমি তো…!”
কলরন মৃদু হেঁসে বলল, “তুই-তুকারি করে কথা বলি বলে কার মনে যেন বিরাট রাগ জমে ছিল, তাই না?”
“মোটেও না!” অস্বীকার করল নিযানা।
কলরব ধারলো গলায় বলল, “তোমার মাকে কি বলেছ? তুমি তার এই অধম জামাইকে কোনোভাবেই ছাড়তে চাও না?”
কথাটা কানে যেতেই নিযানার দুটো কান নিমেষেই গরম হয়ে শিরশির করে উঠল। আড়ষ্ট গলায় কোনোমতে বলল,
“তুমি প্লিজ স্বাভাবিকভাবে কথা বলো তো! আমি না সব কথা কেমন যেন গুলিয়ে ফেলছি…!”
ওপাশে হঠাৎই কলরবের গমগমে হাসির শব্দ ভেসে এল। হাসতে হাসতেই বেশ গম্ভীর সুরে বলল,
“তাহলে একটা সত্যি সিরিয়াস কথা বলি?”
“হুমমম…!”
“আই লাভ ইউ। আই রিয়েলি লাভ ইউ।”
নিযানার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! কলরবের কণ্ঠস্বর গাঢ়, গভীর। নিমেষেই এক অদ্ভুত লজ্জার লালিম আভায় রেঙে উঠল নিযানার দু’গাল। তবে নিযানার সেই অনুভূতির তোড় সামলানোর আগেই কলরব শুকনো গলায় যোগ করল,
“অবশ্য মুখে মুখে! মনে তো আমার প্রথম ভালোবাসা, আমার এক্স রাজত্ব করছে!”
নিযানা সামলাতে না পেরে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওপাশ থেকে কলরব কৃত্রিম তপ্ত গলায় হুমকি দিল,
“খবরদার! হাসবি না একদম!”
নিযানা হাসতে হাসতেই জবাব দিল, “হাসব না? একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মানুষ, যে কিনা আর কয়েক বছর পরই আমার বাবার চেয়েও বড়লোক হওয়ার দিবা স্বপ্ন দেখছে। সে নাকি আবার অকালে বিধবা হওয়ার দুঃখে কাতর! তা-ও আবার মনে এক্স আর সামনে নেক্সট অপশনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও? এত নাটক করা শিখলে কবে থেকে, শুনি?”
”নাটক নয়। একদম সত্যি কথা! তোর পেছনে যে পরিমাণ ধর্য্য ব্যয় করছি, তাতে আমার বেশিদিন বাঁচার কোনো চান্সই নেই। তার ওপর আবার তোর মায়ের এই সারপ্রাইজ কল! তুই জানিস, উনি যখন বললেন, ডিভোর্স পেপারে চুপচাপ সই করে দিও। তখন আমার ঠিক কেমন লাগছিল?”
নিযানা মৃদু হাসল। গলায় দুষ্টুমিটুকু ঢেলে বলল, “তো? সই করে দিলেই পারতে! মুক্তি পেয়ে যেতে এই রক্তচোষা’র হাত থেকে!”
”বয়ে গেছে আমার মুক্তি পেতে! এতগুলো বছর ধরে তোকে আগলে রাখলাম, এত যন্ত্রণাও সহ্য করলাম। আর এখন অমনি অমনি তোকে ছেড়ে দেব? এতই সহজ, না?”
নিযানা তপ্ত গলায় বলল, ”আমি তো জানিই। মেয়ে পটাতে তুমি একদম ওস্তাদ! এসব ডায়লগ অন্য কাউকে দিও৷”
কলরব ওপাশ থেকে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠের মেকি রাগটা ধুয়েমুছে সেখানে নেমে এল এক অদ্ভুত আকুলতা। নিচু স্বরে শুধাল,
“তুই সত্যি করে বল তো নিযানা। আমার ওপর এত মেজাজ দেখাস, অকারণে জ্বালাস, এমনকি ডিভোর্সের ভয়ও দেখাস। এই সবকিছু ঊর্ধে একটু হলেও সত্যি ভালোবাসিস আমায়? নাকি পুরোটাই আমাকে পাগল বানিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ধান্দা? প্রতিশোধের জন্য?”
”ভালোবাসি কি না, সেটা তো তোমার খুব ভালো করেই জানা আছে। অত ঢং না করলেও চলবে!”
কলরব অভিমানী গলায় বলল, ”কোথায় জানা আছে? তুই তো দিনে দশবার আমায় খোটা দিবি, হাজারটা তেতো কথা শোনাবি, আর একটু পর পর বলবি, অসভ্য, বেয়াদব, আরও কত কী! তোকে দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার জো আছে যে তুই আমায় সত্যি সহ্য করতে পারিস?”
নিযানা একটু থমকে নরম গলায় বলল, “সহ্য না করতে পারলে কি আর পরীক্ষার পড়ার মাঝেও তোমার এসব ফালতু কথা শুনতাম? ফোনটা দয়া করে রাখো আর পরীক্ষার কয়টা দিন অন্তত শান্তি দাও আমাকে৷ তারপর ভেবে দেখবো কী করা যায়।”
কলরব হেসে উঠল। গলার স্বরটা আরও গভীর করে বিড়বিড় করল,
“শোন, তুই যতই রাগাস আর যতই জ্বালাস না কেন, আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাববি না। তোকে সামলাতে, তোকে সারা জীবন জ্বালাতেই না হয় আমার পুরো জন্মটা চলে যাক! তোর দেওয়া এই অমূল্য যন্ত্রণা অন্য কাউকে সহ্য করতে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার একদম নেই।”
নিযানার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে এক মিষ্টি অনুভূতির তোলপাড় করা ঢেউয়ে ভেসে গেল। সে আলতো করে চোখ দুটি বুজে, ভেজানো সুরে বলল,
“তোমাকে কে বলল আমি অন্য কাউকে এই যন্ত্রণা দিতে যাচ্ছি? এত দামি সহনশীলতা কি আর সস্তা বাজারে সহজে বিক্রি হয়?”
কলরব আবার একটু হাসল। নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ”হুম, বুঝেছি! আবার মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে পটাচ্ছিস, তাই তো? এখন রাখছি। মন দিয়ে পড়। আর শোন!”
”কী?”
”তোর মাকে সাফ বলে দিস। এই বয়সে বউ হারা হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার সত্যি নেই। বিশেষ করে তোকে ছাড়ার। আমি আরও বহু বছর তোকে জ্বালিয়ে মারতে চাই। তোর মায়ের মাথা চিবিয়ে খেতে চাই। আর তোর বাপের টাক মাথার যে কয়টা চুল অবশিষ্ট আছে, যন্ত্রণা দিয়ে ওগুলোও এক এক করে ফেলে দিতে চাই!”
নিযানা ধমকের সুরে বলল, “খবরদার! আম্মু-আব্বুকে নিয়ে একদম এসব কিছু বলবে না!”
“উফ, এমন মিষ্টি গলায় ধমক দিও না বেবি! খুব চুমু খেতে ইচ্ছা করছে। এভাবে বললে আমার কাজের প্রতি কনসেন্ট্রেট করতেই অসুবিধা হয়ে যাবে! রাখছি ফোন। বাপ-মা আর মেয়ে, তিনজনে মিলে আমার জীবনটা পুরো তছনছ না করে ছাড়বি না!”
ঘটনা টা পরের দিন দুপুরের।
মাজহার রাগটা রূপ নিল গভীর ক্ষোভে। মুখ ফুলিয়ে বসে ছিলেন এমনিতেই কিন্তু কায়েফ যখন বিয়ের পরদিনই নতুন বউয়ের রান্নাঘরের নিয়মকানুন নিয়ে কথা পাড়ল, তখন আর কথা বাড়ানো সমীচীন মনে করলেন না। থমথমে এক নীরবতা বজায় রেখে নিজের ঘরে চলে গেলেন। রান্নাঘরের পরিবেশটা অবশ্য অন্যরকম। মৌনিতা আর মিলু সেখানে ব্যস্ত ছিল। মাঝখানে টেবিলে বসিয়ে রাখা হয়েছে নবনীকে। শারীরিক অবস্থার কারণে খুব বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তাকে হাঁটাচলা করতে দেওয়া হয় না। কায়েফ ঊর্মিকে সঙ্গে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকেই শান্ত কণ্ঠে শুধাল,
“ভাবি, তোমাদের কোনো অসুবিধা আছে? যেহেতু বিয়ের পরের দিন সম্ভব হয়নি, আমি চাইছি সেটা আজকে হোক।”
মৌনিতা উত্তর দেওয়ার আগেই ওপাশ থেকে মাজহার কড়া ডাক ভেসে এল। ডাক শুনে মৌনিতা তড়িঘড়ি করে সেদিকে ছুটল। পরিস্থিতি সামাল দিতে নবনী মৃদু হেসে বলল,
“ঊর্মি, তোমার যা রান্না করতে ইচ্ছা হয়, তুমি সেটাই করো। কোনো অসুবিধা নেই।”
কথাটা বলেই নবনী আর মিলু রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরের মাঝখানে মাথা নিচু করে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঊর্মি। সবাই যেতেই সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে কায়েফের দিকে তাকাল। কায়েফ অবশ্য তখন পুরো নির্বিকার। শান্ত ভঙ্গিতে রান্নাঘরের এদিক-ওদিক পরখ করছে। ঊর্মি কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
“আপনি কেন শুধু শুধু আপনার মায়ের সাথে ঝামেলা করছেন? তাও আমার মতো একজন নগন্য মানুষের জন্য।”
কায়েফের হাতে তখন হলুদের বয়াম। কথাটা কানে যেতেই হাত থেমে গেল তার। বয়ামটা রেখেই হুট করে ঘুরে দাঁড়াল সে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি নগ্ন নাকি অনন্য, সেটা তো পরে বুঝব। আপাতত আমি বুঝতে পারছি না, আপনাকে কী রান্না করতে বলব।”
কায়েফের অলক্ষ্যে ডান হাতের উল্টো পিঠে চোখের কোণে জমা টলমল জলটুকু মুছে নিল ঊর্মি। বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল,
“আপনি আমার কথা কেন বুঝতে পারছেন না?”
কায়েফ এক পা এগিয়ে এসে জবাব দিল, “আপনিই বা আমার সাথে কেন সহজ হতে পারছেন না? স্বামী হই আপনার৷ বিয়ের অনেকটা সময় পার হয়েছে।”
কায়েফ আরও কিছুটা কাছে সরে আসতেই ঊর্মি প্রথমবারের মতো ছেলেটার চেহারার দিকে চোখ তুলে তাকাল। অবশ্যই কিছুটা দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে। ফর্সা ত্বকের নিখুঁত গড়ন, সুগঠিত মুখাবয়ব আর জোড়া ভ্রুর নিচে একজোড়া গভীর চোখ। চেহারাটার ভেতরে কেমন একটা প্রচ্ছন্ন স্নিগ্ধতা লুকিয়ে আছে। সুদর্শন পুরুষ বলতে যা বোঝায়, কায়েফ ঠিক তাই। তবে শুধু রূপ নয়, বাহ্যিক সৌন্দর্যের মতোই তার মনটাও যে ভীষণ সুন্দর, তা বুঝতে ঊর্মি বেশ বুঝেছে। ভেতরে ভেতরে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এই মানুষটা তার স্বামী? সত্যি কি তার কপালে এসব লেখা ছিল? চিন্তার সুতো কাটল কায়েফের চুটকির শব্দে। ঊর্মির মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে কায়েফ বলল,
“কী এত ভাবছেন?”
ঊর্মি তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল, “তেমন কিছু না। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল তো, ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না।”
“আপনার এত ভাবতে হবে না। ধরে নিন, আপনার এই দুঃস্বপ্নটা অতি শীঘ্রই কেটে যাবে।”
ঊর্মি অবাক চোখে চেয়ে রল, “দুঃস্বপ্ন?”
কায়েফ একটু আমতা আমতা করে বলল, “মানে, আসলে আমার আম্মুর আচরণের জন্য আমি ভীষণ লজ্জিত। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। উনি ওপর ওপর যাই দেখান না কেন, মনের দিক দিয়ে খুবই নরম। দেখবেন, আর কয়েকটা দিন যেতেই উনি নিজেই আপনাকে আপন করে নেবেন। আর বাড়ির বাকি সবাই তো খুব ভালো। আশা করি আপনার কোনো কষ্ট হবে না।”
ঊর্মির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বিষণ্ন হাসি। আক্ষেপের সুর ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে,
“আমার অভ্যাস আছে।”
কায়েফ স্থির দৃষ্টিতে ঊর্মির ম্লান মুখের দিকে চাইল। মেয়েটার ওই নিভে যাওয়া হাসির পেছনে কতটা বঞ্চনা লুকিয়ে আছে, তা যেন এক নিমিষেই উপলব্ধি করল সে। কায়েফ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল। এই মেয়েটা জীবন থেকে যা কিছু পায়নি, তার সবটুকু উজাড় করে সে ফিরিয়ে দেবে। পরিবেশের ভারিক্কি ভাবটা হালকা করতে চট করে প্রসঙ্গ বদলে বলল,
“আপনি বরং মাংস রান্না করুন। আপনার হাতের রান্না তো দারুণ! আমি এখনই ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে দিচ্ছি।”
ঊর্মি মৃদু মাথা নাড়ল। কায়েফও কথা বাড়াল না, ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে মশলার বয়ামগুলো একে একে তার হাতে হাতে এগিয়ে দিতে লাগল। ঊর্মি সবজি কাটায় মনোযোগ দিল। কায়েফ সামনের বেসিনের ওপর উঠে বসল। বেশ সহজ গলায় বলল,
“আজ বিকেলে আপনি আমার সাথে বের হবেন।”
ঊর্মি সবজি কাটা থামিয়ে মুখ তুলে চাইল, “কোথায় যাব?”
“শপিংয়ে।”
ঊর্মি উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। কায়েফ একটু ভেবে নিয়ে হঠাৎ শুধাল,
“আচ্ছা, আপনি কখনো স্কুলে যাননি?”
“দশম শ্রেণি অব্দি পড়েছি।”
“ওয়াও! গ্রেড কেমন ছিল?”
“মোটামুটি বলা যায়।”
“আচ্ছা!”
ঊর্মি মনোযোগ দিয়েই কাজ করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত আড়ষ্টতা চেপে বসল তার ওপর। কায়েফ কীভাবে যেন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে! না তাকিয়েও ঊর্মি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে সেই চাহনির প্রখরতা। সংকোচ, অস্বস্তি নাকি মনের ভেতরের অচেনা কোনো অনুভূতির চাপ, ঠিক বোঝা গেল না। তবে মেয়েটার ফর্সা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। কপালের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছোট রেশমি চুলগুলো এসে পড়েছে চোখের ওপর। দৃষ্টি আগলে ধরেছে তারা। কায়েফ হাত বাড়িয়ে খুব যত্ন করে সেই অবাধ্য চুলগুলো ঊর্মির কানের পেছনে গুঁজে দিল। আকস্মিক স্পর্শে শিউরে উঠল ঊর্মি। একটা অচেনা বিদ্যুতায়িত অনুভূতি শিরশির করে ছড়িয়ে পড়ল তার সর্বাঙ্গে। ঠিক তখনই কায়াফের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
“আপনার আমাকে পছন্দ তো?”
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে চমকে গিয়ে চোখ তুলে তাকাল ঊর্মি। কায়েফ খুব আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে তার পানে। যেন দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সে। কায়েফের কাছে অবশ্য প্রশ্নটা আসলেই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ঊর্মি এক মুহূর্তের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ল। চট করে কী বলবে ভেবে পেল না। বুকটা ঢিপঢিপ করছে তার। শেষমেশ মাথা নিচু করে ম্লান গলায় বলল,
“জানি না।”
কায়েফ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে হেসে উঠল। মেয়েটার ফর্সা গাল দুটো ইতিমধ্যেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। কায়েফ মনে মনে নিজেকেই তিরস্কার করলো। সেও তো কম বোকা নয়! ঊর্মির মতো অন্তর্মুখী, লজ্জাবতী মেয়ের কাছ থেকে কি আর এমন প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর আশা করা যায়? ঊর্মি বোধহয় আজ প্রথমবার কায়েফকে এমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখল। সে অপলক চেয়ে ছিল, তাই কায়েফ চোখ ফেরাতেই দুজনার দৃষ্টি মিলল। কায়েফ চোখ না সরিয়েই বলল,
“তাহলে জেনে বলুন।”
ঊর্মি বুঝতে না পেরে পিটপিট চোখে চাইল, “কী?”
“নিজের জীবনসঙ্গী পছন্দ করার অধিকার আপনার ষোলো আনা আছে। যদি আমাকে অপছন্দ হয়, নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমার বউয়ের আবার বিয়ে দেব। তা-ও তার পছন্দের মানুষের সাথেই!”
কায়াফের সিরিয়াস মুখের অদ্ভুত বলার ভঙ্গি আর কথাটা শুনে নিজের অজান্তেই খিলখিল করে হেসে ফেলল ঊর্মি। এতক্ষণে কায়েফের বুকে যেন একরাশ স্বস্তি নেমে এল। যদিও ঊর্মির সেই মিষ্টি হাসিটা স্থায়ী হলো খুব অল্প সময়ের জন্য। তবুও কায়েফের মনে হলো এর আগে কাউকে সে এত সুন্দর করে হাসতে দেখেনি। হয়ত মেয়েটাকে বারবার শুধু অঝোরে কাঁদতে দেখেছে বলেই আজকের এই এক চিলতে হাসিটা এত মায়াবী লাগছে! ঠিক যেন কালবৈশাখীর প্রচণ্ড তাণ্ডবের পর আকাশে এক চিলতে কাঙ্ক্ষিত রোদের উদয়, যা নিমিষেই রুক্ষ মরুতেও আনন্দের বৃষ্টি ঝরায়।
দুপুরের খাবারের টেবিলে অবশ্য বিশেষ কোনো কথাবার্তা হলো না। পরিবেশটা বেশ থমথমে থাকলেও সবাই শান্ত মনে তৃপ্তি নিয়েই খেল। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকতেই দিব্য, দিয়া আর নবনী একসাথেই বেরিয়ে পড়ল নবনীর বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে। কলরব ওদের গেইটের মুখ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরতেই একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেল আরশাদ তালুকদারের। কলরব কিছু না বলে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু আরশাদ তালুকদারের গম্ভীর গলার ডাকে থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে,
“তোমার সাথে কথা আছে।”
কলরব থামল। তবে চোখ তুলে তাকাল না। মাথাটা নিচু। আরশাদ তালুকদার ভারী কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
“জন্মের পর থেকে এই পর্যন্ত অনেক ভুল করেছ, অন্যায় আবদার করেছ, আমি সব মেনে নিয়েছি। বারবার শুধরে যাওয়ার সুযোগও দিয়েছি। কিন্তু জীবনে আজ প্রথমবার আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইছি কলরব। তুমি নিয়ানাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।”
কলরবের অবলীলায় বলল, “অসম্ভব।”
“কেনো অসম্ভব?”
কলরব বলল, “আমি ওর সাথেই থাকতে চাই। তোমরা সবাই কেনো চাইছো আমাদের আলাদা করতে?”
“তুমি ঠিক কী চাও কলরব? আমাকে শেষ পর্যন্ত কোর্টে দাঁড় করাতে?”
কোর্ট শব্দটা কানে যেতেই কলরব চট করে মুখ তুলে চাইল। অবাক আর বিস্ময় মিশিয়ে বলল,
“এসব তুমি কী বলছ? কোর্ট মানে?”
আরশাদ তালুকদার নিশ্বাস ফেলে বললেন, “নিয়ানার বাবা আজ আমার অফিসে এসেছিলেন। তিনি কোনোভাবেই চান না তোমার সাথে নিযানার আর কোনো সম্পর্ক থাকুক। আর এর জন্য প্রয়োজনে তিনি আইন পর্যন্ত যেতেও পিছপা হবেন না। সত্যি বলতে, উনার সামনে আমার জোর গলায় দুটো কথা বলার মতো কোনো মুখ ছিল না।”
এক নিমিষেই কলরবের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে জমে গেল। ভেতরের রাগ কোনোমতে চেপে রেখে শুধাল,
“আর কী বলেছেন উনি?”
“উনি আমাকে বলেছেন তোমাকে বোঝাতে। আপাতত নিযানার সামনে পরীক্ষা, তাই পরীক্ষার আগে তিনি কোনো বড় ঝামেলা করতে চাইছেন না। তবে পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই যেন তুমি ডিভোর্স পেপারে সই করে পাঠিয়ে দাও। আমি উনাকে কথা দিয়ে এসেছি, তুমি আমার কথা ফেলবে না। আর কাজটা নিজের দায়িত্বেই করবে।”
কলরব বলল, “দেখো আব্বু….!”
“আমি তোমার কাছ থেকে কোনো সিদ্ধান্তের উত্তর জানতে চাইনি, কলরব। তোমাকে শুধু আমার কথাটা জানালাম। বলতে পারো, বাবা হিসাবে একটা অনুরোধ জানালাম। আশা করবো সন্তান হিসাবে চাইবে না বাবার অসম্মান হোক। এখন কথাটা রাখবে কি রাখবে না, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার।”
এই অবেলায় পর্ব ৫৪
কলরবকে কোনো পাল্টা প্রত্যুত্তরের সুযোগ না দিয়েই সেখান থেকে সোজা হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন আরশাদ তালুকদার। কলরব থমকে দাঁড়িয়ে সেই শূন্য পথটার দিকে চেয়ে রইল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বয়েই গেছে তার এই আজগুবি অনুরোধ রাখতে! জীবনের এত এত বছরেই যে বাপের কোনো কথা কানে তোলেনি, সে নাকি আজ শুনবে এই কথা! জীবনে কত কত ফালতু, তুচ্ছ আর ছোটখাটো বিষয়েই বাপের কোনো বারণ মানেনি সে, আর এটা তো তার পুরো আস্ত একটা জীবনের ব্যাপার! যে যা খুশি করুক। বয়েই গেছে তার! তবে হ্যাঁ, ওই টাক শ্বশুরের জন্য কঠিন একটা ব্যবস্থা তাকে করতেই হচ্ছে!
