এই অবেলায় পর্ব ৬
সুমনা সাথী
করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় নবনীর মাথার ভেতরটা যেন হাজারো দুশ্চিন্তার মৌচাক হয়ে উঠেছিল। অসীমের সেই প্রচ্ছন্ন হুমকি আর রহস্যময় আচরণ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সে স্থির করল আর নই আজ রাতেই সে দিব্যকে সবটা খুলে বলবে। লুকোছাপা করে সে এই সম্পর্কের ভিত নষ্ট করতে চায় না। কিন্তু মনে একরাশ সাহস নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখল দিব্য তৈরি হয়ে কোথাও বের হচ্ছে। নবনীর ঠোঁটের ডগায় কথাগুলো এসেও থমকে গেল। এখনো দিব্যর গাম্ভীর্যের সামনে সে পুরোপুরি সহজ হতে পারেনি। তবুও মনের ভেতর একটা কৌতূহল উঁকি দিল। এত রাতে লোকটা কোথায় যাচ্ছে? দিব্য নবনীর দিকে একবার তাকাল। বোধহয় নবনীর চোখের অস্থিরতা আর না বলা প্রশ্নটা সে মুহূর্তেই পড়ে ফেলল। গম্ভীর গলায় বলল,
‘আমাদের ফ্যাক্টরিতে একটু সমস্যা হয়েছে। আমাকে এখনই যেতে হবে। ফিরতে অনেকটা দেরি হতে পারে। তুমি দিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে দিও।’
নবনী শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। দিব্য দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নবনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কথাগুলো আজ আর বলা হলো না। বিছানার এক কোণে বসে দিয়া তখন খুব মনোযোগ দিয়ে ডিজিটাল স্লেটে ইংরেজি অ্যালফাবেট লেখার চেষ্টা করছিল। মাত্র হাতেখড়ি হয়েছে ওর। তবুও প্রতিটি অক্ষর বেশ যত্ন করে ফুটিয়ে তুলছে মেয়েটা। নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দিয়ার পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর লেখা দেখল। তারপর হাত ধরে বর্ণগুলো সঠিক করে দিতে সাহায্য করল। এই সময়ে দিয়া হুট করে স্লেটটা পাশে সরিয়ে রেখে হাই তুলল।
‘মাম্মা, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।’
নবনী ওর বইখাতাগুলো গুছিয়ে পাশে রাখতে রাখতে বলল,
‘আচ্ছা সোনা, অনেক রাত হয়েছে। এবার শুয়ে পড়ো।’
দিয়াকে জাপটে ধরে নবনী যখন ওর পাশে শুলো। ঘরটা তখন একদম নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়া হুট করে এমন এক প্রশ্ন করল যা নবনীর হৃদপিণ্ডকে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল। দিয়া আধো-আধো গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা মাম্মা, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? সবাই তো বলত তুমি আকাশে চলে গেছ। আমি তোমাকে কত খুঁজতাম, কত ডাকতাম! কিন্তু তুমি তো আসতে না। এখন যখন চলেই এলে তখন আকাশ থেকে নামলে কীভাবে?’
দিয়ার এই নিষ্পাপ কৌতূহল নবনীকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল অবনী হয়ে দিয়ার জীবনে যে শূন্যস্থান সে পূরণ করছে তার ভার কতখানি। দিয়ার চুলে বিলি কাটতে কাটতে নবনী ভাবল এই অবুঝ শিশুটিকে সে কীভাবে বোঝাবে যে সে সেই ‘আকাশে চলে যাওয়া’ মা নয় বরং তার জীবনের নতুন এক আশ্রয়? নবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। দিয়ার কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক কাল্পনিক গল্পের আশ্রয় নিল। বলল,
‘সেখানে একটা দুষ্টু রাক্ষস ছিল যে আমাকে দিয়ার কাছে আসতে দিচ্ছিল না। আমাকে বন্দি করে রেখেছিল অনেক বড় এক প্রাসাদে।’
দিয়া বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ঠিক ওই রূপকথার গল্পগুলোর মতো? তারপর? তোমাকে বাঁচাতে কি কোনো প্রিন্স এসেছিল?’
নবনী মাথা নাড়ল। ধীর স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমাকে বাঁচাতে একজন এসেছিল ঠিকই তবে সে কোনো প্রিন্স নয়। একটা ছোট্ট পরি।’
দিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ও মাই গড! একটা ফেইরি? সে কি দেখতে খুব সুন্দর ছিল মাম্মা? ওর কি জাদুর লাঠি ছিল?’
নবনী শব্দ করে হাসল। দিয়ার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
‘হ্যাঁ, সে পুরোটাই একটা জাদু। আচ্ছা সোনা তোমার না খুব ঘুম পাচ্ছিল? এবার চোখ বোজো।’
‘ওকে গুড নাইট। মাম্মা, আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাব?”
নবনী কোনো কথা না বলে দিয়াকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। ছোট্ট মেয়েটা যেন তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল। নবনীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। বাচ্চাদের ছোঁয়া সবসময়ই স্নিগ্ধ হয় কিন্তু দিয়াকে জড়িয়ে ধরে তার মনে যে প্রশান্তি নামল; তা যেন পৃথিবীর সব সুখের চেয়েও বেশি। এটাই কি মাতৃত্বের সেই অমোঘ টান? নবনী জানে না। সে শুধু এটুকু বুঝল এই ছোট্ট প্রাণটার জন্য সে সব বাধা জয় করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যেই দিয়া গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কিন্তু নবনীর চোখের পাতা এক করতে পারছে না। ঘরের টিকটিক শব্দটা যেন তার মনের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিব্য এখনো ফ্যাক্টরি থেকে ফেরেনি। বাইরের নিস্তব্ধতা বাড়তে বাড়তে এক সময় নবনীও ক্লান্তিতে কখন ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল; সে নিজেও টের পেল না।
দিব্য যখন ফিরল রাত তখন অনেক গভীর। সমস্ত দিনের ক্লান্তি আর ফ্যাক্টরির ঝক্কি সামলে শরীরে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। ঘরে পা রাখতেই দেখল পুরো ঘর জুড়ে সবুজ রঙের ড্রিম লাইটের একটা মায়াবী আভা ছড়িয়ে আছে। বিছানার দিকে তাকাতেই তার ক্লান্ত চোখ দুটো প্রশান্তিতে জুড়িয়ে এল। নবনী আর দিয়া একে অপরকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে মগ্ন। দৃশ্যটা এতই স্নিগ্ধ যে দিব্যর মনে হলো তার যান্ত্রিক জীবনে এর চেয়ে সুন্দর কোনো ফ্রেম আর হতে পারে না। সে ধীরপায়ে বিছানার আরও কাছে এগিয়ে গেল। কিন্তু খুব কাছে আসতেই এক অদ্ভুত বিপত্তি ঘটল। নবনী শাড়ি পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের ঘোরে অসাবধানতায় তার শাড়ির আঁচলটা গা থেকে সরে গিয়ে একপাশে পড়ে আছে। সবুজ সেই মৃদু আলোয় নবনীর মেদহীন, শুভ্র উন্মুক্ত উদর দৃশ্যমান। সেই অপার্থিব সৌন্দর্যে এক ধরণের তীব্র মোহ আছে যা দিব্যর মতো শক্ত মনের মানুষকেও টলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দিব্য চাইল দৃষ্টি সরিয়ে নিতে কিন্তু অবাধ্য চোখ দুটো যেন কোনো এক অদৃশ্য মায়ায় আটকে গেছে। তার মনে হলো, এক ভয়ংকর অথচ সুন্দর সর্বনাশ বুঝি তার সামনে দাঁড়িয়ে। শরীরের রক্তকণিকাগুলোয় এক ধরণের অস্থিরতা অনুভব করল সে। নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত গায়ের কোটটা খুলে ছুঁড়ে দিল সোফায়। তারপর ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোল। ভেজা চুলে যখন সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। পাশে শোয়া নবনীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে একবার তাকাল সে। ঘুমের ঘোরে মেয়েটাকে কী ভীষণ মাসুম আর শান্ত লাগছে! দিব্যর মনে হলো এই মেয়েটা হয়তো সত্যিই তার এলোমেলো জীবনে একটু একটু করে বসন্তের ছোঁয়া নিয়ে আসছে বোধহয়। সে একদৃষ্টিতে নবনীর সেই স্নিগ্ধ মুখের দিকে চেয়ে রইল।
সকাল হতেই নবনী শোয়া থেকে উঠে বসল। পাশ ফিরে তাকাতেই দিয়ার ওপাশে দিব্যকে দেখে সে বেশ অবাক হলো। কখন ফিরল লোকটা? দিব্য এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে সাধারণত বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর মানুষ নয় কিন্তু আজকের এই অনিয়মের কারণ নবনী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। না চাইতেও নবনীর দৃষ্টি আটকে গেল দিব্যর ঘুমন্ত মুখটার ওপর। ক্লিন শেভ করা মুখ, টু-ব্লক কাটের রেশমি চুলগুলোর ওপর ভোরের রোদ এসে পড়ে চকচক করছে। চুলের ওপরের লম্বা স্তরগুলো অবাধ্যের মতো কপালের ওপর আলগোছে নেমে এসেছে। লোকটার মুখের গড়ন ধারালো। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য মিশে আছে তার চেহারায়। গায়ের রংএর প্রভাবে ও যেন তাকে কাবু করতে পারছেনা। ওর গায়ের রং ও আগের থেকে উজ্জ্বল হয়েছে। নবনী লক্ষ্য করল কয়েক বছর আগের সেই অগোছালো দিব্যর সাথে এই পরিপাটি মানুষটার আকাশ-পাতাল পার্থক্য।সবকিছুই যেন এখন নিখুঁত। হঠাৎ করেই নবনীর মনে এক ধরণের লজ্জামিশ্রিত সংকোচ জাগল। একজন ঘুমানো মানুষকে এভাবে ‘চোখ দিয়ে গিলে খাওয়া’ কি ঠিক হচ্ছে? সে দ্রুত বিছানা ছাড়ল। আজই তাদের বাপের বাড়িতে যাওয়ার কথা। সারারাত ভারী শাড়ি পরে ঘুমিয়ে শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। তাই দেরি না করে একবারে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে বের হলো সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডার্ক মেরুন রঙের একটি শাড়ি ঠিকঠাক করছিল নবনী। ঠিক তখনই দিব্যর ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই আবারও এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ মোহনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলো সে। নবনীর পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভিজে চুলের রাশি, নিচু হয়ে শাড়ি কুঁচি করার সময় তার কোমরের কিয়দাংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। দিব্য এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসল। আয়নায় দিব্যর প্রতিফলন দেখে নবনী ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। চটজলদি ঘুরে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল টেনে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল সে। দিব্য তখনো ঘুমজড়ানো গলায় বলল,
‘রিলাক্স নবনী! আমি কোনো বাঘ-ভাল্লুক নই যে এভাবে ভয় পেতে হবে। তাছাড়া আমি লক্ষ্য করেছি তুমি আমার সামনে সবসময় খুব হেজিটেড ফিল করো। হোয়াই? কিছু বলার থাকলে সোজা বলবে। সমস্যাটা কী তোমার? আমি কি তোমাকে মারব?’
দিব্যর সরাসরি প্রশ্নে নবনী যেন আরও বেশি আড়ষ্ট হয়ে গেল। ভেজা চুলের জলবিন্দুগুলো তার পিঠ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দিব্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন তার সমস্ত উত্তর কেড়ে নিয়েছে। নবনীর ঠোঁটের কোণে একটা কাঁপাকাঁপা হাসি ফুটে উঠল। দিব্য তাকে সাহস দিতে চাইলেও নবনীর মনের গহীনে এখনো একটা অদৃশ্য দেয়াল রয়ে গেছে। সে আমতা আমতা করে কোনোমতে জবাব দিল,
‘আপনি কাল রাতে কখন ফিরেছিলেন? সরি, আমি আসলে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।’
দিব্যর চোখে কাল রাতের সেই দৃশ্যটা মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল। সে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বলল,
‘তুমি দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছিলে কেন? আজকের পর যদি আমার ফিরতে দেরি হয় আর তোমার ঘুম পায় তবে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়বে।’
নবনী অবাক হয়ে তাকাল। পালটা প্রশ্ন করল, ‘আর আপনি? আপনি ফিরলে ঘরে ঢুকবেন কীভাবে?’
দিব্য ওয়াশরুমের দিকে এগোতে এগোতে থমকে দাঁড়াল। নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘আমি অন্য কোনো ঘরে শুয়ে পড়ব। তবুও তুমি দরজা খুলে রেখে আমার জন্য মাঝরাত অবধি অপেক্ষা করবে না।’
বলেই দিব্য ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। নবনী স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা কি তাকে পর করে দিচ্ছে নাকি তার নিরাপত্তার কথা ভেবে এমনটা বলছে। সেটা বুঝতে তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। এই বাড়িতে সে অনিরাপদ বা কি করে হয়। ধরেই নিলো ইগো ওয়ালা লোকটার ইগোর কারনে বলছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকাল।
দিব্য নিজেই ড্রাইভ করছিল। দিয়া আর নবনী পেছনের সিটে বসে পুরো রাস্তা গল্প আর খুনসুটিতে মেতে রইল। মাঝেমধ্যে দিব্যর ইচ্ছা করছিল তাদের হাসাহাসিতে যোগ দিতে কিন্তু সে তার স্বভাবজাত গাম্ভীর্য ধরে রাখল। দিব্য তালুকদার কি এতই ফেলনা যে যেচে গিয়ে কথা বলবে? অথচ আয়নায় বারবার সে ওদের খুনশুটি গুলো লক্ষ্য করছিলো। নবনীর বাপের বাড়িতে পৌঁছাতেই যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল। দিব্য আর দিয়াকে নিয়ে অনিতা আর অনিক এমনভাবে মেতে উঠল যে তারা পুরো বাড়ি মাথায় তুলল। নবনী যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে তখনই আনিকা বেগম প্রায় টানতে টানতে তাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে এলেন। মায়ের এমন অদ্ভুত আচরণে নবনী বেশ বিরক্ত হলো। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
‘কী করছো আম্মু? সমস্যা কী তোমার? সবাই বাইরে বসে আছে আর তুমি আমাকে এভাবে ধরে আনলে কেন?’
আনিকা বেগম কড়া চোখে মেয়ের দিকে চাইলেন। নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
‘তুই আগে বল সমস্যাটা কী? ওই অসীম ওই বাড়িতে কী করছিল? ও সেখানে কেন?’
মায়ের এমন অবান্তর প্রশ্নে নবনীর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘তুমি কি তখন শোনোনি? তোমার জামাইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ও। উনার সাথে কাজ করে।’
‘সে তো আমিও শুনেছি। কিন্তু তুই কি জামাইকে সব সত্যি খুলে বলেছিস? অসীমের সাথে তোর যা যা ছিল সেসব কি ও জানে?’
আনিকা বেগমের কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ। নবনী অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
‘যদি জানিয়েও থাকি, তাতে কী আসে যায় আম্মু? অতীত থাকতেই পারে।’
আনিকা বেগম যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে নিয়ে বললেন,
‘তার মানে এখনো বলিসনি?’
নবনী শান্ত স্বরে জানালো, ‘না, তবে খুব শীঘ্রই বলবো। আমি কোনো লুকোছাপা করতে চাই না।’
মেয়ের এমন নির্বুদ্ধিতা দেখে আনিকা বেগম এবার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি ভালো করেই জানতেন নবনী প্রথম দিকে এই বিয়েতে মোটেও রাজি ছিল না। তিনি এবং তার পরিবার বারবার চাপ সৃষ্টি করার পর ই নবনী মত দিয়েছে। আনিকার বড় ভয় পাছে সত্যির জের ধরে এই সাজানো সংসারটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে না যায়। তিনি এবার গলার স্বর চড়িয়ে বললেন,
‘খবরদার নবনী! ভুলেও এই কাজ করবি না। আমি ভালো করেই জানি তুই এই বিয়েটা মন থেকে করিসনি। কিন্তু তাই বলে এভাবে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে সংসারটা ভাঙবি? ওই মাসুম বাচ্চাটার জন্য কি তোর বিন্দুমাত্র দয়া হচ্ছে না? ও তোর নিজের বোনের রক্ত। তোকে মা বলে ডাকছে। কতটা মায়া করে তোকে জড়িয়ে ধরে থাকে। একটুও কি মায়া হয় না তোর?’
নবনী হতবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অবাক কণ্ঠে বলল,
‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ আম্মু? তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি বিয়েটা ভাঙতে চাইছি? যদি ভাঙার ইচ্ছা থাকত তবে আমি বিয়েটা করতামই না। আর দিয়াকে আমি কতটা ভালোবাসি তা আমি জানি। ঠিক এই কারণেই সারাটা জীবন ওর বাবার সাথে সততার সাথে কাটানোর জন্য আমি কোনো মিথ্যে দিয়ে এই সম্পর্কের ভিত গড়তে চাই না।’
আনিকা বেগম এবার মরিয়া হয়ে উঠলেন। মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন,
‘এখানে তোকে এত সত্যবাদী হতে কে বলেছে? জামাই কি তোর কাছে নিজে থেকে কিছু জানতে চেয়েছে? না চাইলে তুই কেন যেচে গিয়ে নিজের কলঙ্ক ওর সামনে তুলে ধরবি?’
নবনীর এবার মেজাজ গরম হতে শুরু করল। সে বলল,
‘আমি বুঝলাম না তুমি এই বিষয় নিয়ে এত ভয় পাচ্ছ কেন? উনারও তো অতীত আছে। উনারও তো একটা জীবন ছিল।’
আনিকা বেগম কঠোর কণ্ঠে বললেন, ‘ওরটা বউ ছিল নবনী! একটা হালাল আর মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সেটা। আর তোর? তোরটা ছিল বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম যা আমাদের সমাজ আর ধর্মে নিষিদ্ধ। জামাই যদি তোকে চরিত্রহীন ভেবে বসে তখন? কোথায় যাবি তুই? দোহাই লাগে তোর জেদ করে এই সুন্দর সাজানো সবকিছু নষ্ট করিস না।’
মায়ের মুখ থেকে ‘চরিত্রহীন’ শব্দটা শুনে নবনীর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে ভাবতেও পারেনি নিজের মা তার অতীতকে এই চোখে দেখেন।
পরিস্থিতির চাপে তিনিও তার অতীতকে এমন নির্মম একটা তকমা দিয়ে দিলেন? নবনী কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলল,
‘চরিত্রহীন? কিন্তু আম্মু, আজ আমি নিজের থেকে না বললেও কাল যদি উনি অন্য কারো কাছে জেনে ফেলেন? তখন আমার পালানোর জায়গা থাকবে না।’
আনিকা বললেন, ‘তোকে কি অসীম কিছু বলেছে? ভয় নেই ওই ছেলের সাথে আমি নিজে কথা বলব। আমার দোহাই লাগে নবনী তুই জামাইকে এখনই এসব কিছু বলবি না। আগে তোদের সম্পর্কটা একটু মজবুত হতে দে। তারপর না হয় সময় বুঝে বুঝিয়ে বলিস।’
ঠিক সেই মুহূর্তে দিয়া ডেকে উঠল ‘মাম্মা?’
আনিকা বেগম চট করে চোখের ইশারায় নবনীকে শাসিয়ে দিলেন। নবনী দ্রুত চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। দিয়া ঘরে ঢুকতেই ওকে কোলে তুলে নিয়ে সে বাইরে চলে গেল। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তারা নবনীর পুরনো ঘরে এল ঘুমানোর জন্য। নবনীর এই ছোট্ট কামরাটি দিব্যর মতো মানুষের জন্য বড্ড বেমানান। দিব্য অভ্যস্ত এসির হিমেল হাওয়ায় অথচ এই বদ্ধ ঘরে একটা সাধারণ টেবিল ফ্যান যেন আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে। গরমে দিব্যর শার্ট ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে। নবনী আড়চোখে দিব্যর অস্বস্তি দেখছিল আর নিজের কাছেই প্রচণ্ড লজ্জিত বোধ করছিল। এক পর্যায়ে দিব্য আর সহ্য করতে না পেরে একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাইরে বেরোল। কারণ এ ঘরে কোনো এটাচড বাথরুম নেই। দিব্য বেরিয়ে যাওয়ার কিছু পরেই হঠাৎ ঘরের টিউবলাইটটা পিটপিট করে কাঁপতে শুরু করল। দিয়া বিছানায় বসে হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল,
‘মাম্মা দেখো, লাইট কেমন ডান্স করছে!’
নবনী ও হাসল। দিয়া বেশ উপভোগ করছে বিষয়টা। দিয়ার কাছে এটা মজা হলেও নবনীর জন্য এটা বিরক্তির কারণ। সে জানত লাইটের হোল্ডারে একটু সমস্যা আছে। একটা কাঠের চেয়ার টেনে সে লাইটের নিচে রাখল। তারপর পরনের শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে চেয়ারে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে হোল্ডারটা ঠিক করার চেষ্টা করছিলো তখনি পেছনে সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
‘কী করছো এসব?’
এই অবেলায় পর্ব ৫
হঠাৎ দিব্যর ফিরে আসা আর ওই ভরাট গলার আওয়াজে নবনী ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেল। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে তার পা পিছলে গেল চেয়ার থেকে। ভয়ে আর আতঙ্কে সে একটা আর্তনাদ করে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নিল। নবনী নিশ্চিত ছিল, আজ মেঝেতে পড়ে তার হাড়গোড় আস্ত থাকবে না। কিন্তু সেকেন্ডের ব্যবধানে সে অনুভব করল কোনো শক্ত মেঝে নয় বরং দুটো বলিষ্ঠ এবং শক্তপোক্ত হাত তাকে শূন্যে আগলে নিয়েছে। ঘরের সেই টিমটিমে আলোর নিচে দিব্যর প্রশস্ত বুকের ওমে নিজেকে আবিষ্কার করে নবনীর হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল।
