কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৩
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
❝ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর,ঢাকা।❞
ডেনমার্কের লম্বা সফরের জন্যে আইরিন,নাসীর আর রোকসানা পুরো দমে তৈরি হয়ে,ব্যাগপত্র সমেত এসে নামলেন এখানে। ঘড়িতে মধ্যদুপুর সেসময়। ফ্লাইটের আর কিছু সময় বাকি। সকল যাত্রীরা যে কমন লাউঞ্জ আর ফুডকোর্ট ব্যবহার করেন,মা-বাবার সাথে সেখানে এসে বসল আইরিন। রোকসানা খেয়ে বের হননি। খাবেন কিছু। আর অন্যদিকে,আইরিনের খিদে-টিদে কোথাও একটা পালিয়ে গিয়েছে। গলা দিয়ে দাঁনাপানি নামতে চাইছে না। বুক মুচড়ে মুচড়ে কান্না আসছে বারবার। মায়ের জন্যে পারছেও না কাঁদতে। মাম্মা বিরক্ত হন,ধমকান,বোঝান,নিজেও কষ্ট পান। আইরিনের জীবনে মায়ের দাম অনেক। ও মাম্মাকে কষ্ট দিতে চায় না। রোকসানা যেতে যেতে শুধোলেন,
“ কী খাবে কিউটি?”
মেয়েটা বিরস মুখে হাসল,
“ কিছু না।”
রোকসানা উঠে গেলেন নাসীরকে নিয়ে। ভদ্রলোক দু মিনিট বাদে ফেরত এলেন ম্যাংগো শেক হাতে। আইরিনের দিকে বাড়াতেই ও বলল,
“ আমি তো বললাম কিছু খাব না।”
“ তোমার মাম্মা বকবেন,ধরো।”
নীরস শ্বাস ফেলে হাতে নিলো আইরিন। ওয়ান টাইম গ্লাসে শেকের মাঝে ডুবানো লম্বা পাইপটা ওর দিকে চেয়ে আছে। আইরিনের ইচ্ছে হলো না চুমুক দিতে। বরং বুক ঠেলে আসা কান্নায় চোখ ভিজে উঠল।
যেদিন সার্থর জন্যে মেয়ে খোঁজা হচ্ছিল,ও প্রথম কেঁদেছে সেদিন। যেদিন মেয়ে ঠিক করা হলো,সেদিনও কেঁদেছে। যেদিন সার্থ বিয়ে করতে গেল,সেদিন আইরিন ঘর আটকে পাগলের মতো বিলাপ করেছে ফাঁকা বাড়িতে। কিন্তু যখন আসল তুশির বদলে বস্তির তুশি এলো বউ হয়ে,একটু আশার আলো দেখেছিল মেয়েটা। ভেবেই রেখেছিল, এমন মেয়েকে সার্থ কোনোদিন মানবে না। মেয়েটাকে তাড়ানোর পথ সহজ হবে ভাবলেও,এই পথ হলো আরো দূর্গম,দূর্বিষহ। তুশির প্রতি সার্থর সহানুভূতিটা প্রকট হয়ে পালটে গেল অনুভূতিতে। সেই নকল স্বামী-স্ত্রী থেকে সম্পর্কটা গড়িয়েছে বহুদূর। ওরা আজ বাবা-মা হবে। ভালোবাসার মানুষটা অন্য মেয়ের অত কাছাকাছি গিয়েছে ভাবতেই ফুঁপিয়ে ওঠে আইরিন। এক চোখ থেকে একটা জলের লাইন গড়িয়ে এসে এক গালে নামে।
তক্ষুনি মুখের সামনে একটা সাদা রুমাল ধরল কেউ একজন। ভ্রু কুঁচকে ভেজা চোখে পাশ ফিরল মেয়েটা। হাসিহাসি মুখের পুরুষটিকে দেখে চমকে বলল,
“ আ-আপনি?”
জামিলের পায়ের কাছে একটা বিশাল লাগেজ রাখা। মাথায় হ্যাট,গায়ে স্যুট। পুরোদস্তুর সাহেবিয়ানা চেহারায়। চিরচেনা চকচকে হাসি দিয়ে বলল,
“ কেমন আছেন আয়োডিন,আপনার দেখি কান্নাকাটি এখনো শেষ হয়নি।”
আইরিন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আশেপাশে দেখল এক পল৷ একইরকম বিস্ময় নিয়ে বলল
“ আপনি এখানে কী করে এলেন?”
জামিল সোজা হয়ে বসল।
“ প্লেনে বুঝি আপনি একা চড়তে পারেন? আমি পারি না?”
“ আমি কি সেটা বুঝিয়েছি নাকি?
যাক গে যাক,কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
“ আপনার সাথে।”
“ কীইইইই?”
“ রিল্যাক্স,মজা করলাম। অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি,আমার নিজের জায়গায়।”
“ তো এখানে কী কাজ? আপনার রুট তো অন্যদিকে!”
জামিল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আপনি খ্যাচক্যাচ করছেন কেন? আমি কি ওই দিকে ছিলাম,যে আপনাকে দেখে এখানে এসেছি? আপনি কাঁদছিলেন দেখে এখানে বসেছি এমন না ওকেই? এটা কমন লাউঞ্জ,সব রুটের যাত্রীরা এখানে থাকবে স্বাভাবিক। আশ্চর্য!”
আইরিন মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।
জামিল একটু এগিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল,
“ সার্থ বাবা হচ্ছে শুনেছেন?”
আইরিন চোখ বুজে দাঁত পিষে বলল,
“ কাঁটা ঘায়ে নুন ছেটাতে এসেছেন?”
জামিল অবুঝের ভান করে বলল,
“ ঘাঁ কাঁটা কার? আপনার?
ওহ হ্যাঁ আপনি যে সার্থকে পছন্দ করতেন,আর ও আপনাকে ছ্যাকা দিয়েছে, আমি তো এটা ভুলেই গিয়েছিলাম।”
আইরিন ফুঁসে বলল,
“ দেখুন,মেজাজ খারাপ করবেন না।”
জামিল মূহুর্তেই তুলোর মতো নরম দৃষ্টিতে বলল,
“ খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না?”
ভেতরের তোলপাড় আইরিন কাউকে বলতে পারছিল না। এই একটা প্রশ্নে প্রশ্রয় পেতেই ওর চোখমুখের বহ্নি শান্ত হয়ে গেল। মাথা নুইয়ে বলল,
“ হচ্ছে!”
জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ সার্থকে আগে কোনোদিন বলেননি কেন? বিয়ের পর পেছনে ঘুরলে হবে? বউ রেখে আপনাকে পাত্তা দেবে,ও তো তেমন পুরুষ না।”
“ বলতে চাইতাম। কিন্তু মাম্মামকে ভয় হতো!
মাম্মাম যদি মেনে না নেয়?
তাই চেপে রেখেছিলাম। কিন্তু যেদিন মাম্মাম নিজেই স্বায় দিলো,সেদিন বুঝলাম মাম্মামের কথা না ভেবে আমার আগেই এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অবশ্য,তাতে লাভ হতো না। সার্থ ভাইয়া আমাকে সেভাবে পছন্দই করেন না কখনো!”
আইরিন দুঃখের কথা বলছিল নিচের দিকে উদাস চোখে চেয়ে। অথচ যাকে বলছিল,সেই ছেলেটা আলগোছে ওর হাত থেকে ম্যাংগো শেকের বোতলটা নিয়ে চুমুক দিলো পাইপে। মাথা নেড়ে বলল
“ সো স্যাড!”
আইরিন খেয়াল করতেই নাক ফুলিয়ে তাকায়।
জামিল সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
“ মাত্র এক সিপ নিয়েছি।”
আইরিন কিড়মিড় করে উঠল,
“ আপনি একটা ফালতু লোক!”
“ আই এগ্রি,নাহলে কি এখানে এসে বসি?”
আইরিনের ঝগড়ার মন নেই। পোড়া শ্বাস ফেলল। হঠাৎ করে বলল,
“ আচ্ছা,আপনি একটা কথা বলবেন আমাকে?”
“ কী কথা?”
“ আমি দেখতে সুন্দর নই?”
জামিল চোখ পিটপিট করে খুব ভালো করে আইরিনের দিকে চাইল। যেন যাচাই করছে ও সুন্দর কিনা। মুখটা ফ্যাকাশে ফরসা। গালের ত্বক চকচকে গ্লাসের মতো। চোখ-ঠোঁট,নাক ভালোই তো। বলল,
“ উম,হ্যাঁ ঠিকঠাক।”
“ তাহলে সার্থ ভাই আমাকে কেন পছন্দ করলেন না?”
প্রশ্নটা করতে গিয়ে আইরিনের স্বর বুজে আসে। চোখ টলমল করল ফের। জামিলের সহজ চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল এবার।
ফোস করে শ্বাস ফেলল সে। একটু চুপ থেকে বলল,
“ আপনি একটা গান জানেন? শুনেছেন?”
আইরিন নাক কুঁচকাল। এই সময় গানের কথা কে বলে? লোকটা কি যুতসই শান্ত্বনা দিতেও শেখেনি?
জামিল তক্ষুনি প্লাস্টিকের বোতলে আঙুলের টোকা দিয়ে তাল দিতে দিতে গুণগুণ করল,
“ কার চোখে চোখ রেখেছে,
কে কাকে চেয়ে দেখেছে,
সে কথা কেউ তো জানে না।
কার মনে মন রেখেছে যে,
কে কাকে মন দিয়েছে,
সে কথা কেউ তো জানে না!
মনই জানে যে,কার নাম লেখা আছে
আমায় বলো না!”
আইরিন বুঝতে পারল। কিন্তু বলল অনীহা নিয়ে,
“ আমি বাংলা গান শুনি না।”
“ ভেরি ব্যাড। নিজের সংস্কৃতি ভুললে হবে না। এসব মনে রাখতে হবে। এখন বিদেশে সেটেল হতে যাচ্ছেন, কিন্তু মায়ের মতো পাংকু হবেন না যেন।”
আইরিন চোখ প্রকট করে বলল,
“ কীইই? কী বললেন আমার মাকে! মাম্মাম, মাম্মাম!”
জামিল হায়হায় করে বলল,
“ এই রে,মজা করেছি, মজা করেছি! ওনাকে ডাকছেন কেন? থামুন না।”
রোকসানা ব্যস্ত ছিলেন, কোলাহলে শুনতে পাননি। আইরিন শান্ত হলো। পরপর বলল
“ আচ্ছা, আপনি যে সেদিন বললেন আমরা এক। কীভাবে এক, আপনাকে কে ছ্যাকা দিলো?”
জামিল সাথে সাথেই বলল,
“ ইউশা!”
“ হ্যাঁ?”
বিস্মিত হলেও পরক্ষণে হেসে ফেলল আইরিন।
“ ভালো হয়েছে। কোথায় অয়ন ভাই,আর কোথায় আপনি ডিস্কো ইঞ্জিনিয়ার।”
জামিল মুখটা থমথমে করে বলল,
“ ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কথা বলবেন না।”
“ বললে কী করবেন?”
রোকসানা তক্ষুনি এসে দাঁড়ালেন। নাগেটস,জুস,আর পপকর্ণ এনেছেন। ওকে দেখেই বললেন,
“ আরে জামিল,তুমি এখানে?”
শিষ্টতা দেখাতে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল জামিল।
“ আন্টি? কেমন আছেন? ও মাইগড,আপনাকে কী সুন্দর লাগছে!”
“ কী যে বলো! তোমার চোখে বেশিই মনে হয়!”
“ না আন্টি,আপনি আসলেই বিউটি কুইন বর্ষা।
যাক গে, হ্যালো আঙ্কেল!”
হাতটা বাড়াতেই হ্যান্ডশেক করলেন নাসীর। কথাবার্তা চলার মাঝেই ফ্লাইটের এনাউন্সমেন্ট শোনা গেল।
জামিল লাগেজটা হাতে নিয়ে বলল,
“ আসি তাহলে? আবার দেখা হবে।”
“ এসো বাবা। সময় পেলে ডেনমার্ক ঘুরে যেও।”
“ জি আন্টি। মিস আয়োডিন,আল্লাহ হাফেজ। আপনার সফর সুন্দর হোক।”
আইরিন একটা ভেংচি কেটে মুখ ফিরিয়ে নিলো। জামিল চলে গেল লাগেজ টেনে। রোকসানা, নাসীর বসে খেতে খেতে কথায় ব্যস্ত হলেন। আইরিনের হঠাৎ খেয়াল পড়ল,জামিলের রুমাল ওর কোলের ওপর পড়ে আছে। অমনি ওটা হাতে তুলেই ছুটল ও। রোকসানা শুধালেন,
“ কোথায় যাচ্ছ!”
“ রুমালটা ফেলে গেছেন, দিয়ে আসি।”
পেছনে লাগাতার “ এই যে,এইযে” ডাক শুনে ফিরে চাইল জামিল। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে থামল আইরিন। সফেদ রুমাল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ আপনার রুমালটা।”
জামিল একবার দেখে হেসে বলল,
“ রেখে দিন। পরে যদি দেখা হয় তখন নেব।”
“ আমি রাখব নাকি? ফেলে দেবো। আপনার সাথে আমার আর দেখা করার কোনো ইচ্ছে নেই।”
“ কিন্তু আমার আছে। আপনাকে দেখলে আমার খুব ভালো লাগে। একটা শান্তি শান্তি ফিল পাই।”
আইরিন তাজ্জব হলো ভারি। চোখ ঝাপটে বলল,
“ কীরকম?”
“ একটা কথা ভাবি,ভেবেই খুব আনন্দ লাগে!”
“ কী কথা?”
জামিল মিটিমিটি হাসল,তারপর দুম করে বলল,
“ ভাবি যে, এই দুনিয়ায় আমার চেয়েও বড়ো ছ্যাকাখোর আছে।”
আইরিন স্তব্ধ,বিস্মিত। রেগেমেগে কিছু একটা বলার আগেই জামিল বাচ্চাদের মতো ঝড়ের গতিতে ছুটে গেল। অমন ব্যস্ত গতিতেই চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ রুমাল রেখে দিন, আয়োডিন। যদি কখনো দেখা হয়ে যায়,সত্যি কিন্তু চেয়ে নেব। দাবি ছাড়ব না।”
আইরিন রাগে রুমালটা ওর গায়ে ছুড়ে মারল। কিন্তু ওই হালকা কাপড় তো জামিলকে ছুঁতে পারল না। সে তখন বহুদূর। এক হাত দুরুত্বেই উড়ে গিয়ে মেঝের ওপর পড়ল।
আইরিন ফিরে আসতে নেয়। এক কদম এগোতে গিয়েও,কী ভেবে থামে। ফিরে চায় পড়ে থাকা রুমালের দিকে। তারপর ঠোঁট টিপে এগিয়ে যায়। এক অপছন্দ মানুষের দিয়ে যাওয়া রুমালটাকে ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে ভরে রাখে। কখনো কি ওদের আদৌ দেখা হবে?
পকেটের ভেতর মুঠোফোন বাজতেই,মোটরবাইক ব্যস্ত রাস্তার এক সাইডে নিয়ে থামাল সার্থ। স্ক্রিনে তুশির কল। ধরতেই মেয়েটা ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ হ্যালো, আপনি কোথায়?”
“ এইত,জামিলকে পৌঁছে দিয়ে এলাম। কেন,কিছু লাগবে?”
তুশির স্বর মূহুর্তেই বাচ্চার মতো শোনাল,
“ লাগবে তো। আমার অনেক জাম মাখা খেতে ইচ্ছে করছে। ঝাল ঝাল!”
“ এসব আমি কোথায় পাব?”
“ তাতো আমি জানি না।”
“ আব্বাসকে বলো বাজার থেকে এনে দেবে।”
“ মা বারণ করে দিয়েছে। বলেছে,এই সময় ঝাল খেতে নেই। আপনি নিয়ে আসুন না।”
“ খেতে নেই তাহলে আমি কেন আনব?”
“ কারণ আপনি আমাকে ভালোবাসেন!”
“ ব্লাকমেইল করছো?
এই সময় ঝাল সত্যিই খেতে নেই।”
“ আমি খাব। আমার কিছু ভালো লাগছে না মুখে। আপনি নিয়ে আসুন। আপনি আনলে বাড়িতে আর কেউ কিছু বলবে না!”
“ জেদ করো না।”
তুশি চটে বলল,
“ আচ্ছা? খেতে চাইছি সেটা জেদ হয়ে গেল? হ্যাঁ এখন তো সবাই এসবই বলবে। ঠিক আছে, খাবই না!”
মুখের ওপর লাইনটা কেটে দিলো ও। সার্থ অবাক হলো একটু। তুশি এরকম রাগ দেখায় না, এভাবে ওর সাথে কথাও বলে না।
মুড সইং? হ্যাঁ ডাক্তার বলেছিলেন,এখন এরকম হবে। ওর আদুরে তুশিটা এখন তাহলে এভাবে হুটহাট রেগে যাবে?
সার্থ নীরস শ্বাস ফেলে ফোন পকেটে ভরতে ভরতে আশেপাশে চাইল। বিড়বিড় করল মহাবিপন্ন মুখে,
“ এখন আমি জাম কোথায় পাব?”
সেই দুপুরটা সার্থ গোটা উত্তরা চষে বেড়াল জাম খুঁজতে। শেষে পাওয়া গেল ফুটপাতে বসে থাকা এক ভ্যানের ওপর। পেয়েছে যখন,হাত বোঝাই করে কিনে আনল ছেলেটা।
বাড়িতে ঢুকে দেখল, তুশি, হাসনা বসার ঘরে মিন্তুর সাথে লুডু নিয়ে বসেছে।
ও এসে পলি ভরতি জাম টেবিলের ওপর রাখল।
“ আপনার জাম!”
তুশি এতক্ষণ মুখ ফুলিয়ে খেলছিল। জাম দেখেই সব ফেলে এক লাফে উঠে দাঁড়াল অমনি। সার্থ খেয়াল করল এইটুকুতে মেয়েটার চোখ-মুখ আলোর মতো জ্বলছে। এত ঘেমে-নেয়ে খুঁজে আনার কষ্টটা এক লহমায় উবে গেল ওর।
রেহণূমা বললেন,
“ ওহ,আমি আব্বাসকে আনতে মানা করলাম দেখে সার্থকে ধরেছিলি?”
তুশি অবোধ স্বরে বলল,
“ আমি? আমি কই বললাম?আমি শুধু বলেছি আমার খেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মা বারণ করেছে যখন কিছুতেই খাব না। উনিই তো জোর করলেন। তাই না? বলুন না মাকে।”
রেহণূমা তাকাতেই সার্থ ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল
“ হ্যাঁ। আমি জোর করেছি। চোরটা নিষ্পাপ!”
“ কে কী করে, আমি খুব ভালো জানি।”
হাসনা তাল মেলালেন,
“ কথা সইত্য। এই ছেরি মেলা চালু। নাতজামাইরে ভালা মানুষ পাইয়া ভাঙতাছে।”
তুশি এখন আর কথা গায়ে মাখল না। ওর সব মনোযোগ জামের দিকে। সব দাঁত দেখিয়ে শুধাল,
“ মা, আমি তাহলে মাখাই?”
“ আমি ঝাল কম দিয়ে বানিয়ে দিচ্ছি দে।”
“ না। আমি বানাব। তুমি যাও।
মিন্তু, তুমি আর দাদি খেলো। আমি পরে আসব।”
“ ওকে।”
মিন্তু দুহাত ঘষতে ঘষতে গুটির দিকে চেয়ে বলল,
দাদি আসেন,আপনাকে খেয়ে ফেলি।”
হাসনা বললেন,
“ ক্যা?
আমার গায়ে কয়ডা আড্ডি ছাড়া কিছু তো নাই,দাদা।”
“ ওরেহ,আমি গুটির কথা বলেছি। বসেন বসেন।”
ওরা দুজন সোফায় মুখোমুখি খুব সিরিয়াস হয়ে বসল। তুশি জামের পলি তুলতে গেলে সার্থ বলল,
“ আমি নিচ্ছি।”
“ আরে অত ওজন নেই। আমি পারব।”
সার্থ আর আটকায় না। বাইরে আজ প্রচণ্ড গরম! থানায় যাবে না। জামিলের চলে যাওয়া নিয়েও অল্পস্বল্প মুড অফ ওর।
তুশি রান্নাঘরের দিকে যেতে নিয়েও থামল। মনে পড়েছে এমন ভাবে বলল,
“ ওহ একটা কথা।”
চাইল সার্থ,
“ কী?”
তুশি এদিক ওদিক দেখে ফিসফিস করল,
“ কানে কানে বলব নিচু হন!”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে একপাশের কাঁধ নিচু করল,সঙ্গে সঙ্গে গালে ফটাকসে একটা চুমু দিয়ে দৌড়াল তুশি। হইহই করে বলে গেল,
“ থ্যাংকিউ!”
হেসে ফেলল সার্থ। রান্নাঘর থেকে ফোনকলের শব্দ আসছিল সেসময়। শোনা যাচ্ছিল ইউশার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর। ভিডিও কল দিয়েছে।
সার্থ ঘরে যেতে যেতে ভাবছিল,
ওরা ভালো আছে? সব ঠিক হয়েছে ওদের? তুশিকে ভুলে অয়ন ইউশাকে মেনে নিতে পেরেছে তো!
টানা ২৫ দিনের সফর শেষ করে, অয়ন-ইউশা আজ বাংলাদেশে ফিরল।
দুটো লাগেজের সাথে আরো একটা লাগেজ বাড়তি আনতে হয়েছে। বাড়ির সবার জন্যে কিছু না কিছু কিনেছে ওরা।
ইউশা চৌকাঠ পেরোতে পেরোতেই মা, বড়ো মা দিদুন তুশি, একবার একবার করে ডেকে ফেলল সকলকে। সবাই ওদের অপেক্ষাতেই ছিলন। ইউশা সবার আগে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। ধরেই রাখল কিছুক্ষণ! এই প্রথম ও বাড়ি ছেড়ে এত্তগুলো দিন একা কোথাও থেকেছে। সবার সাথে কথাবার্তার মধ্যে খেয়াল পড়ল,তুশি নেই। সে তো জানতো ওরা ফিরবে,নেই কেন তাহলে?
জিজ্ঞেস করল,
“ তুশি নেই বাড়িতে?”
তনিমা বললেন,
“ আছে তো। একটু আগেই ওপরে গিয়েছে। ওর শরীরটা একটু খারাপ যাচ্ছে!”
ইউশা মূহুর্তে উদ্বীগ্ন হয়,
“ শরীর খারাপ? দেখি তো।”
মেয়েটা সব ফেলে সঙ্গে সঙ্গে ওপরের দিকে ছুটল। অয়ন বড়ো লাগেজটা দেখিয়ে
বলল,
“ এর ভেতর বাড়ির সবার জন্যে গিফট আছে। যার যার প্যাকেটে তার নাম লেখা। তোমরা বের করে দেখো। আমি যাই,মাথা ব্যথা করছে। শোব।”
“ কিছু খাবি রে?”
“ না।”
অয়ন উঠে গেল। তনিমা সেদিক চেয়ে শাশুড়ির দিক দেখলেন।
জয়নব বললেন,
“ কী বুঝছো? সম্পর্ক স্বাভাবিক?”
“ ইউশাকে দেখে লাগছে। অয়নকে বুঝতে পারলাম না।”
মিন্তু লাগেজ খুলল ব্যস্ত হাতে। সবার ওপরে ওর চকলেটের প্যাকেট গুলোই রাখা। দুটো বড়ো সাইজের প্যাকেটের গায়ে লেখা – ছোচাবিলাই।
মিন্তু হেসে ফেলল। সাথে সাথে বগলদাবায় তুলল ওসব। পেত্নীটা তাহলে ওকে বিদেশে গিয়ে ভুলে যায়নি?
ইউশা ঘরে এসে দেখল তুশি নেই । ওয়াশরুমে পানির শব্দ হচ্ছে। ও দরজায় টোকা দিলো,কিন্তু ডাকল না। তুশি চমকে যাবে দেখলে।
মেয়েটা দরজা খুলল মুখ মুছতে মুছতে। জামার বুকের অংশ ভেজা। বমি করেছে মাত্র। শুকনো চেহারা। বিধ্বস্তের মতো শ্বাস ফেলতে দেখে আঁতকে উঠল ইউশা। কিছু বলার আগেই তুশি ওকে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। এক ঝটকায় রোগাশোকা ইউশার কোমর ধরে তুলে ফেলল ওপরে। সজোরে চক্কর কেটে বলল
“ ইউশা,তুমি,তুমি কখন এলে?”
ইউশা হকচকিয়ে গেছে। যদিও এটা ওর কাছে নতুন নয়। তুশির মারপিটের অভ্যাস থাকায়,ইউশাকে তুলে ফেলা তো ডালভাত! কিন্তু হড়বড়িয়ে তাড়া দিলো নিচে নামাতে। এর মধ্যেই হুশ ফেরায় জিভ কাটল তুশি। নিজেই তাড়াহুড়ো করে ওকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“ হায় আল্লাহ, আমাকে ডাক্তার বলেছিল ভারি কিছু না তুলতে। আমার তো মনেই ছিল না।”
ইউশা সচকিতে বলল,
“ডাক্তার? কেন, তুমি কি অসুস্থ তুশি? তোমাকে দেখতেও তো কেমন যেন লাগছে?”
তুশি মাথা নুইয়ে বলল
“ হ্যাঁ একটু অসুস্থ।”
“ কী,কী হয়েছে তোমার?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও,
“ হয়নি এখনো। হতে আরো কয়েক মাস লাগবে। তবে তার জন্যে এখনই যা ভোগ পোহাচ্ছি!”
ইউশা অস্থির হয়ে বলল,
“ কী হয়েছে বলো না। আমাকে তো কেউ কিছু জানালই না।”
“ শুনবে? বলব?”
“ উফ তুশি,বলো না। এত ভণিতা করে কেউ?”
তুশি ফিসফিস করে বলল,
“ তুমি খালামণি হচ্ছো!”
ইউশা বেখেয়ালে মাথা নাড়ল,পরপরই চটক কাটার মতো শক্ত হলো মুখটা। স্তম্ভিত সুরে বলল,
“ কীইই?”
মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ল তুশি। তুরন্ত দুইহাতে মেয়েটাকে জাপটে ধরল ইউশা।
“ আল্লাহ সত্যি? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। কবে জানলে? আমাকে বলোনি কেন? মা,বড়ো মা কেউই বলেনি।”
“ সামনা সামনি বলব দেখে মানা করেছিলাম। ইউশা,আমার মেয়ে হলে তোমার আর আমার নামের সাথে মিলিয়ে রাখব। ঠিক আছে?”
“ মেয়ে হবে বলেছে?”
“ না। কিন্তু আমি জানি,মেয়েই হবে।”
“ আমার সাথে নাম মিলিয়ে রাখলে,ভাইয়া হিংসে করবে না?”
“ না। একটা নাম আমাদের,আরেকটা নাম ওনার। তাহলেই তো হবে।”
ইউশা আপ্লুত হয়ে বলল,
“ তুশি ও কার মতো হবে? আমার মতো না তোমার মতো? নাকি ভাইয়ার মতো? কত্তদিন পর একটা বাবু আসবে বাড়িতে। খুশিতে আমার হাত পা কাঁপছে দেখো।”
ইউশা দুহাত বাড়িয়ে দেখায়। সত্যিই ওর আঙুলগুলো থরথর করছিল। হঠাৎ দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল কেউ,
“ ইউশা।”
দুজন এক যোগে ফিরল। অয়নকে দেখেই তুশির হাসিটা কমে আসতে চায়। ও তাও ধরে রাখল। নিজেই বলল,
“ কেমন আছেন,অয়ন ভাই? ভেতরে আসুন!”
অয়ন শুধু দুটো শব্দ বলল,
“ ভালো। ইউশা শোনো…”
ইউশা চপল পায়ে এগিয়ে এলো। নিজেই লাফিয়ে চড়িয়ে বলল,
“ অয়ন জানো,তুশি ইজ এক্সপেক্টিং!”
অয়ন ইউশার মাথার ওপর থেকে ঠান্ডা চোখদুটো তুলে তুশির দিকে চাইল এবার। তার চেয়েও নির্লিপ্ত হেসে বলল
“ কংগ্রাচুলেশনস,তুশি!”
তুশির ঠোঁটের হাসি সরল না। মাথা নেড়ে বলল,
“ ধন্যবাদ!”
তারপর অয়ন
ইউশার দিকে চেয়ে বলল,
“ ঘরে এসো।”
“ তুমি যাও,আমি একটু পরেই আসছি।”
অয়ন চলে যায়। ভেতরে ঢোকে না। তুশি ভীষণ আশ্চর্য হয় তবে! ইউশাকে অয়ন ভাই তুমি করে বলেছেন? ইউশাও তো নাম ধরে ডাকল। এর মানে ওদের মধ্যে…
তুশির বুকটা জোয়ারের মত ফেঁপে উঠল খুশিতে। ইউশা ওদিক থেকে হেঁটে কাছে আসতেই প্রফুল্ল হয়ে বলল,
“ আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।”
“ কীজন্যে?”
“ তোমার আর অয়ন ভাইয়ের সব ঠিক হয়ে গেছে না? উম,হানিমুন কেমন কাটল?
আমাকে তো হাসপাতালে যেতে হয়েছিল,তুমি ঠিক ছিলে?”
ইউশা হেসে ফেলল। পরপরই সেই হাসিটা কমে এলো নিয়নের মতো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ এখনো কিছু হয়নি।”
তুশি অবাক হয়ে বলল,
“ এখনো না?”
“ উহু!”
“ আচ্ছা থাক। আস্তেধীরে। এক ভাই দেখেছ বিয়ে হতে না হতেই আমাকে মা বানিয়ে দিলো? এখন যদি তুমিও মা হও, আমরা কার বাচ্চা কে পেলে দেব?”
ইউশা স্ফূর্ত স্বরে বলল,
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২ (২)
“ আচ্ছা তুশি তোমার ছেলে হওয়ার পর,আমার যদি মেয়ে হয়,তাহলে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে?”
তুশির মুখটা কালো হয়ে গেল। কেন হলো কে জানে! বিড়বিড় করে বলল,
“ তোমার মেয়ে যদি আমার ছেলেকে ভালো না বাসে? তখন!”
