Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৫৩ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৫৩ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৫৩ (২)
তানজিনা ইসলাম

চাঁদনী মাথা নিচু করে বসে আছে। রাত কি বলে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। কেবিনে পিনপতন নীরবতা। শুধু স্যালেইনের টুপটাপ পরার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ক্ষণকাল পরপর। বেশ অনেকটা সময়ই কেটে গেছে। কিন্তু রাত কথা শুরু করতে পারছে না। ওর অনেককিছু বলার আছে চাঁদনীকে।কিন্তু মেয়েটা কথা বলতে পারছে না বলে ওরও সংকোচ লাগছে। রাত শ্যামাঙ্গিনী ডাকতে গিয়েও ঢোক গিলে ফেললো। ওর পাঞ্জাবির পকেটে একটা রূপার নুপুর আছে। নুপুরটা চাঁদনীর। অনেক্ষণ সেটা সাথে নিয়ে নিয়ে ঘুরছে ও। রাত পাঞ্জাবির পকেট থেকে রূপার নুপুর টা বের করে এগিয়ে দিলো, চাঁদনীর দিকে। চাঁদনী অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। রাত বললো

-“চাঁদনী। এটা তোমার। ব্যাক ইয়ার্ডের দিকে পেয়েছিলাম।”
নুপুরটা খুব পছন্দের চাঁদনীর। এটা আঁধার দিয়েছিলো, ওর পা শক্ত করে চেপে ধরে। চাঁদনীর মস্তিষ্কে, সেদিনের স্মৃতি টুকু সেট করা আছে। আঁধার সেদিন প্রথমবার চাঁদনীর কাছে স্বীকার করেছিলো, ও চাঁদনীকে ছাড়া থাকতে পারে না। ওর কষ্ট হয়। নিজের ইগো জলাঞ্জলি দিয়ে বলেছিলো, ও চাঁদনীকে খুব মিস করে। এজন্য নুপুরটা সবসময় পরে থাকে ও। কখন যে ধস্তাধস্তি তে খুলে গেলো চাঁদনী টের পায়নি। চাঁদনী হাত বাড়িয়ে নুপুরটা নিলো। ঢোক গিলে হয়তো ধন্যবাদ দিতে চায়লো রাতকে। পারলো না।৷
আঁধার এ পর্যায়ে হনহনিয়ে চলে গেলো। ওর রাগে হাত পা কাঁপছে। নাটকের মেলা বসিয়ে রেখেছে দু’জনে। ও এসব নাটক নিতে পারছে না।
চাঁদনী হাতের মুঠোয় শক্ত করে নুপুর টা ধরে বসে আছে। রাত নরম স্বরে বললো

-“এখন কেমন লাগছে তোমার? তটিনী বললো, তুমি না-কি কথা বলতে পারছো না।”
আরে বাবা ও কথা বলতে পারছে না, সেটা এখন ও মুখ ফুটে বলবে কী করে! একজন এমপি মানুষ এমন বদলের মতো প্রশ্ন করলে কেমন লাগে! চাঁদনী কপালে ভাজ ফেললো। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো রাতের দিকে। রাতের নিজের প্রশ্নটাই খুব বোকা বোকা লাগলো ওর কাছে। ও আসলে কি বলে কথা শুরু করবে নিজেই বুঝতে পারছে না। এমন প্রথমবার হচ্ছে ওর সাথে। ওর মনে পরে না, ও কখনো কথা বলতে গিয়ে আটকেছে কি-না! কিন্তু আজ খুব কথা আঁটকে যাচ্ছে ওর।
-“সরি ফর ইউর লস্ট, চাঁদনী! আই এম এক্সট্রিমলি সরি। আমার বাড়িতে , আমি বিদ্যমান থাকা অবস্থায়, তোমার সাথে এমন হলো। আমি ব্যাপারটা কোনোমতেই হজম করতে পারছি না। আমার সিকিউরিটি, বডিগার্ড রা ব্যর্থ হলো তোমাকে প্রটেক্ট করতে। একটা মেয়ের সম্মানে আঘাত আসলো, অথচ আমি তাকে বাঁচানোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না, আমি এটা মানতে পারছি না। খুব জ্বালাচ্ছে এটা আমাকে।”
চাঁদনী মাথা নিচু করে বসে থাকলো। কিছু বললো না। এসবের উত্তর কী হয় চাঁদনীর জানা নেই। রাত ব্যকুল স্বরে বললো

-“আই নো, এ ঘটনাটা ভুলে যাওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব না। সারাজীবনের ট্রমা দিয়ে দিলো এটা তোমাকে। ক্ষত সেরে গেলেও মস্তিষ্ক থেকে মুছবে না। আমার খুব খারাপ লাগছিলো তোমার জন্য। এতো রাতে দেখতে এসেছি বলে, তুমি কিছু মনে করোনি তো? তোমার হাসবেন্ড কোথায়? তার তো এখন তোমার পাশে থাকা উচিত।”
চাঁদনী এমনিতেই মুখ কালো করে বসে ছিলো। রাতের প্রম্নে আরো অমাবস্যা নেমে এলো ওর মুখে। রাত তড়িঘড়ি করে বললো
-“এই তুমি কষ্ট পেয়ো না। তুমি তো আমার কাজিন! তাই না? এটা তো কেও জানে না। কারো সামনে তোমার জন্য চিন্তা টা দেখাতে পারছিলাম না। একজন কাজিন হিসেবে, আমি তোমার জন্য চিন্তা তো করতেই পারি ! তোমার হাসবেন্ড হয়তো কোনো জরুরি কাজে গেছে৷ বাট, এ সময়টা তোমার সবচেয়ে বেশি তাকে প্রয়োজন ছিলো। আচ্ছা, সে এসে যদি আমাকে তোমার সাথে কথা বলতে দেখে, তাহলে কি রাগ করবে? আমি শুধু কাজিন হিসেবেই কথা বলতে এসেছি। একজন কাজিন তো আরেকজন কাজিন কে দেখতে আসতেই পারে। এখানে তো রাগ করার কিছু নেই।”

এবারেও কোনো উত্তর এলো না। রাত এসব চাঁদনী কে বলছে না। ও নিজেকে বুঝ দিচ্ছে। পুরো রাস্তা ও নিজেকে বুঝ দিতে দিতে এসেছে, ও শুধু চাঁদনীকে কাজিন হিসেবে দেখতে যাচ্ছে। আর কিছু না! মেয়েটার উপর কাজিনের মতোই মায়া। এখন কাজিনের প্রতি কাজিনের আবার কীরকম মায়া হয় সেসব রাত জানে না। তবুও এটাই সত্যি, ও নিজেকে বোঝালো অনেক। এর বাইরে আরেকজনের বউয়ের জন্য ওর মনে কিছু থাকতে পারে না। এটা পাপ।
ও নিজেকে বুঝ দিয়ে বলা কথাগুলো চাঁদনীর সামনে আওড়াচ্ছিলো।
চাঁদনী থম মেরে বসে আছে।রাতের মনে হলো, রাত ওঁকে স্বাভাবিক না করে, আরো উল্টাপাল্টা কথা বলে বিমর্ষ করে দিচ্ছে। ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো

-“চাঁদনী। আমার মনে হয় তোমার একটু শক্ত হওয়া উচিত। একটা কথা কি জানো, নরমদের উপর আঘাতটা সবার আগে আসে। বুঝছি, তুমি ছোট। এখনো এতোসব সামলে উঠার বয়স হয়নি তোমার। কিন্তু মানুষ বয়স দিয়ে বড় হয় না, অভিজ্ঞতা দিয়ে বড় হয়। এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে তোমার জীবনে। সব তোমার জন্য একটা শিক্ষা। আশা করি, তুমি ভেঙে না পরে শক্তভাবে উঠে দাঁড়াবে। আর তোমার হাসবেন্ড কে দেখে আমার কোথাও মনে হয়নি, সে তোমাকে ভুল বুঝতে পারে। সে যথেষ্ট সাপোর্টিভ। অনেক ভাবে তোমার কথা। আর….
রাত ঢোক গিললো। চাঁদনী তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
-“আর তোমাকে অনেক ভালোবাসে।”

আঁধার মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে আছে। কেবিনের বাইরের সারি সারি চেয়ারগুলো সব খালি পরে আছে। আঁধার একটা দখল করে বসেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে ও। এমন আক্রমনাত্মক অবস্থা ওর, যেই সামনে আসবে তাকে ধুমধাম বসিয়ে দেবে। এতোটা রাগ লাগছে।
তটিনী একটু বারান্দায় হাঁটতে গিয়েছিলো। বসে থাকতে থাকতে হাঁটুতে ব্যাথা ধরে গেছে ওর। ও তড়িঘড়ি করে এলো সেখানে। তটিনী, ওর আম্মুর সাথে কথা বলছিলো। আজ রাতটা এখানে থেকে যেতে হবে। আঁধার না আসা পর্যন্ত তটিনী যেতেও পারছে না। ছেলেটা পইপই করে বলে গেছে, সবাই চলে গেলেও তটিনী যাতে থাকে। আঁধার, চাঁদনীকে তটিনীর ভরসায় রেখে যাচ্ছে। মেয়েটারও, ওর সঙ্গ চাঁদনীর খুব দরকার।
আঁধার কে চেয়ারে বসা দেখে তটিনী এগিয়ে এলো ওর কাছে। ওর পাশের চেয়ারে বসে ডেকে বললো

-“চলে এসেছিস আঁধার?”
-“হু।”
আঁধার অন্যমনস্ক। একইভাবে বসে থাকলো যেন তটিনী কে দেখতে পায়নি।
-“এই, তুই এখানে বসে আছিস কেন? কেবিনে যা। মেয়েটা কখন থেকে খুঁজছে তোকে।”
আঁধার এ পর্যায়ে তাকালো তটিনীর দিকে। তটিনী অবাক হয়ে দেখলো ওঁকে। ওর মুখ লাল হয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো। গায়ে কোর্ট নেই। সাদা শার্টের, উপরের দু’টো বোতাম খোলা। তটিনী কখনো এমন এলোমেলো আঁধার কে দেখেনি। আঁধার শ্লেষাত্মক হেঁসে বললো
-“তাই? খুঁজছে আমাকে? আমি তো দেখলাম না।”
-“মানে?জ্ঞান ফেরার পর থেকে দরজা দিকে তাকিয়ে ছিলো। আমাকে বলেনি। কিন্তু আমি বুঝছিলাম।”
-“হাহ!”
-“এমন রিয়েক্ট করছিস কেন তুই?”
আঁধার যখন খুব রেগে যায় বা কষ্ট পায় তখন ওর মুখ লাল হয়ে যায়। তটিনীর মনে হলো ও দু’টো একসাথে পেয়েছে। আঁধার বিমূঢ় স্বরে বললো

-“তোর আক্কেল কীরে, তটিনী? ওই ছেলের সাথে চাঁদনীকে একা কেবিনে রেখে বেরিয়ে গেলি তুই। অথচ কেবিন ভর্তি মানুষের মাঝেও আমি চাঁদনীকে তোর ভরসায় রেখে গিয়েছিলাম। ইউ ডিসেপয়েন্ট মি। তুই না ওর বড় আপু। বড় আপু এভাবে, একটা ছেলের কাছে ছোট বোনকে রেখে চলে যায়?”
-“আল্লাহ রে! তুই এমন বিহেভ কেন করছিস আঁধার? আবরার ভাইকে চিনিস না তুই?”
-“না, চিনি না। চেনার তো কথা না আমার।”
-“তুই চিনিস না। কিন্তু আমি তো চিনি।আমাদের কোনো বন্ধু তাকে না চিনলেও আমি তাকে চিনি। এবং চিনি বলেই আমি কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তুই জানিস না, আমি কতোবার শাবিহাদের বাড়িতে গিয়েছি? আবরার ভাইয়া, কতোটা জ্যান্টালম্যান জানিস তুই?”
-“তো, তুমি তোর জ্যান্টালম্যানের সাথে একা কেবিনে বসে থাকতে।সুখ, দুঃখের গল্প করতা, তার সাথে। আমার বউকে কেন একা কেবিনে রেখে এলি? ফালতু মহিলা একটা।”
আঁধার ক্ষেপে বললো। তটিনী ধুম করে কিল বসালো ওর পিঠে। রেগেমেগে বললো
-“এমন রিয়েক্ট করছিস কেন জানোয়ার?আমার সাথে এসব বিহেভ করবি না একদম! ভালোবাসা উতলে পরছে, তোমার। মেয়েটার সাথে কেমন বিহেভ করতি, প্রথম প্রথম দেখি নাই?”

-“অতীত টান দিবি না!”
-“আজ যে চাঁদনীর এ অবস্থা, তার জন্য কোথাও কোথাও পরোক্ষভাবে তুই দ্বায়ী। শাবিহার টা জানিনা আমি। কোনো প্রুভ নেই আমার কাছে। কিন্তু তোর জন্য চাঁদনীর এ অবস্থা। মেয়েটাকে শেষ করে দিয়েছিস তুই!”
-“আমি? আমি করেছি? তুই এটা বলতে পারলি শাবিহা? আমি আমার চাঁদের সাথে এমন করবো?”
-“রিকের কীসের রাগ, চাঁদের উপর? বল আঁধার। আজই তো পরিচয় হলো দু’জনের। ওর কিসের ক্ষোভ থাকতে পারে? তোর উপর যে ক্ষোভ পুষে রেখেছিলো, সেটা চাঁদনীর উপর তুললো। আহ! আমার রোমিও। ভার্সিটির সবাই তোমারে চকলেট বয় ডাকে। আরো কয়েকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিতি! খুব কম হয়ে গেলো তো। এতো মানুষের মন ভেঙে কীকরে আশা করিস, তোর প্রিয় মানুষের উপর সেসব আসবে না? রিভেঞ্জ অফ নেচার বলেও একটা কথা আছে!”
আঁধার তর্কাতর্কির জন্য ভালো কোনো যুক্তি সাজাতে পারলো না। কথা ঘুরিয়ে, গো ধরে বললো

-“কেবিন থেকে বেরোতে হবে কেন?”
-“আমি কি করবো সেখানে?”
-“বসে থাকতি।”
আঁধার বুঝবে না তটিনীর কথা, সেটা ওর জানা। ছেলেটা যেটা ভেবে নেয়, সেটাই ঠিক। আর সব ভুল। আঁধারের যুক্তিই ঠিক। বাকি দুনিয়ার আর সবার যুক্তি বেঠিক। নিজের যুক্তির উপর জেদ ধরে বসে থাকবে এখন। তটিনী উদগ্রীব স্বরে বললো
-“তুই গেলি না কেন? তোর চাঁদনী কে একা রেখে কেনো বেরিয়ে গেলাম, সেটার জন্য দোষারোপ করছিস। তোর উচিত না তাকে গিয়ে সাহারা দেওয়া? আমি নাহয় আবরার ভাইয়ার সাথে ওঁকে একা রেখে এসেছি। কিন্তু এখন তো তুই চলে এসেছিস, তুই যাচ্ছিস না কেন?”

-“কথা বলুক ও। ওর নেতা সাহেবের সাথে।”
আঁধারের গলার স্বর ভঙ্গুর। অথচ চোয়াল শক্ত।
-“চাঁদনী কথা বলতে পারছে না আঁধার। ও শুধু ভাইয়ার কথা শুনবে।
-“মানে?”
-” ওর মস্তিষ্কে খুব চাপ পরেছে। কথা বলতে পারছে না রে।ডক্টর বলেছে কিছুক্ষণের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।মেয়েটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। গিয়ে দেখা কর। উল্টাপাল্টা ভেবে রাগ করে বসে থাকিস না।”

-“একটা গল্প শুনবে, চাঁদনী?”
চাঁদনী তাকালো রাতের দিকে। ও পাংশুটে মুখে চেয়ে আছে। চোখ দুটোতে অঢেল বিরহ। চাঁদনী ইশারায় বোঝালো শুনবে। রাত বলতে শুরু করলো
একটা রাজপ্রাসাদে, খুব বিত্তবান একটা পরিবারে, খুব সুন্দরী একজন রাণী থাকতো। সে রাণীর একটা রাজপুত্র ছিলো। রাজপুত্র তার আম্মুকে ছাড়া কিছু বুঝতো না। তার আম্মুই ছিলো তার জীবনের সবকিছু। ওই রাজপুত্রের নাম কি জানো?”

-“আবরার রাত।” চাঁদনী হুট করে বললো। ও আচমকা খেয়াল করলো ও কথা বলতে পারছে। ডক্টর অবশ্য বলেছিলো, কথা বলাটা আচমকা নিজ থেকে চলে আসবে।
-“হুম।”
তোমার নানুভাইয়া, আমার আম্মুর বিয়ে দিয়েছিলো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রউন্ডের খুব প্রভাবশালী একটা পরিবারে। সাদিক এহসান তখনো এমপি হননি। কিন্তু দলের লিড ছিলো তার। সারাদিন মিটিং মিছিল এসবে থাকতো। বাড়িতেও সবসময় দলের ছেলেপেলেরা আসতো। জমজমাট থাকতো সবসময়।বাইরে আর বাড়ি গুলিয়ে ফেলতেন তিনি।বুঝতেন না, রাজনীতি আর পরিবার আলাদা রাখতে হয়। নয়তো রাজনীতির নোংরা সাইডগুলো পরিবারে উপর এফেক্ট করতে পারে। আম্মু ছাড় দিতে এসবে। সে তো জানতো ওনার ইন্টারেস্ট টা। আচ্ছা, ওই লোক,ওই লোক না বলে বাবা বলি কিছুক্ষণের জন্য কেমন! যতোই হোক জন্মদাতা তো। কিন্তু এটা বলতে খুব ঘৃণা লাগে,জানো। কিছুক্ষণের জন্য বলছি, ওনার প্রতি আমার ঘৃণা আজন্ম থাকবে। খুব সুন্দর একটা সংসার ছিলো আমার আম্মুর। আমি হওয়ার পর, সংসার টা আরো পরিপূর্ণ হয়েছিলো। সব সুখ ধরা দিয়েছিলো আম্মুর কাছে। বাবা একটু ভবঘুরে ছিলো। কিন্তু আম্মু আগলে রাখতো তাকে। আমি বড় হতে হতে সে ভালো থাকাটুকু একটু ফিকে হয়ে এলো। ইট’স ওঁকে। সব ফ্যামিলিতেই এমন হয়। প্রথমদিকের মতো ভালোবাসা টা সবসময় থাকে না। আমি বুঝি না এটা কেনো হয়! ভালোবাসা ফিকে হওয়ার জিনিস? নাতো! আমি তো আমার আম্মুকে সে ছোটবেলার মতো ভালোবাসি এখনো। আমার আম্মু আমার কাছে সে প্রথম দিনের মতোই সুন্দর।

হুট করেই সব বদলে গেলো, চাঁদনী! আম্মু জানতে পারলো বাবার অন্য একটা মহিলার সাথে সম্পর্ক আছে। বাবা বিয়ে করেছিলো ওই মহিলাকে। আমার আম্মা বর্তমান থাকা অবস্থায়। সে ওই মহিলার সাথে থাকতো। আমার জন্মের দুই বছর পর থেকে, চারটা বছর আম্মুকে সে ঠকিয়েছে।

আমার যখন ছয় বছর।আমার জন্মদিন ছিলো সেদিন। মাত্র ছয়বছর বয়সে পরেছিলাম আমি। বাবা ওই মহিলাকে বাড়িতে নিয়ে এলো। ফুপিই ইন্ধন জুগিয়েছিলো । জানি না ওই মহিলা কেনো আম্মুকে সহ্য করতে পারতো না। সে জানতো আম্মুর সাথে সে পারবে না। আম্মু নরম না। আম্মুর ফ্যামিলি তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম না। শক্তিশালী বা ধনীর দিক দিয়ে তাদের সমান। প্রথমে ফুপিই ওই মহিলাকে মেনে নিয়েছিলো। জানো ওর হাসবেন্ড আম্মুর সাথে কি করেছে?আমার জন্মদিন নিয়ে ব্যস্ত ছিলো সবাই। ওই যে বাগানবাড়িটাতে,আমাদের খুব আনাগোনা ছিলো। গেস্ট রা মূলত ওখানেই আসতো। আম্মু হয়তো বেঁচে গিয়েছিলো তোমর মতো।।ম কিন্তু বাবা সেদিন আম্মুকে ট্রাস্ট করেনি। সে করতে চায়নি তাই করেনি। সে জানতো, সে দোষী। আম্মু তাকে ছাড়বে না, তার দ্বিতীয় বিয়ের খবর জানাজানি হলে। আম্মু মুখ বুঁজে সংসার করার মতো মেয়ে না। তাই সে নিজের দোষ ঢাকার জন্য আম্মুকে দোষী করেছিলো। জানো, পার্টি ভর্তি মানুষের সামনে আম্মুকে অপমান করেছিলো।ওই মহিলা, নিজের স্বামীর দোষ না দেখে। আম্মুকে নষ্টা বলেছিলো। নিজের স্বামীর সাইড নিয়েছিলো। আম্মু না-কি তাকে সিডিউস করেছে। রূপ দেখিয়ে উস্কেছে তাকে। আরো কি কি যে বলেছিলো আমি ছেলে হয়ে সেসব উচ্চারণ করতে পারবো না।সবাই বেইমানি করেছে জানো, সবাই। আমার কথাটা কেও ভাবেনি চাঁদনী। ভাবেনি যে আমি আম্মুকে ছাড়া কিছু বুঝতাম না, সে আম্মুকে ওই অবস্হায় দেখলে আমার মনের অবস্থা কেমন হবে! আমি পুরো রাত কেঁদেছিলাম আম্মুর সাথে।

-“কি হয়েছিলো খালামনির সাথে?”
বোকা বোকা প্রশ্ন করলো চাঁদনী। রাত বিমূঢ় স্বরে বললো
-“আজ তোমার সাথে যা হলো। যে কারণে হসপিটালাইজড তুমি।”
ওই মহিলার হাসবেন্ড পরে আম্মুর পা ধরে মাফ চেয়েছিলো। ওই শয়তানের এমন অবস্থা করেছিলাম আমি, আমার নাম শুনলেও ভয় পায় ও। আমি হয়তো সে সময়টাতে ছেলের দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। কিন্তু পরবর্তীতে, সেদিন আম্মুকে দোষী সাব্যস্ত করা, কষ্ট দেওয়া প্রতিটা মানুষ থেকে আমি প্রতিশোধ নিয়েছিলাম। সুযোগ পেলে সে গল্প আমি তোমাকে পরে বলবো।কিন্তু দাদুভাই অটল ছিলো নিজের সিদ্ধান্তে। সে আম্মুকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতো।
সে ওই মহিলাকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিবে না। যেখানে বাড়ির একজন বউ বর্তমান আছে, সেখানে অন্য আরেকজন থাকে কীকরে! ইভেন ওই লোক কে তেজ্য পুত্র করবে বলেছিলো। সম্পত্তি থেকে বেদখল করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো।

আম্মু চারদিন সতীনের সংসার করেছিলো, অসুস্থ অবস্থায়। আমার আম্মুর কতোটা আত্মসম্মান জানো চাঁদনী, সে তার এসব মেন্টাল ব্রেকডাউনের পরও বাবার কাছে ডিভোর্স চেয়েছে। তুমি দেখে এসেছো। আম্মুর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও এহসান বাড়ির চেয়ে কোনো অংশে শক্তিশালী কম ছিলো না! নানুভাই জানতে পারেনি চারদিন। পরে যখন জানলো, তখনই ঢাকা রওনা দিলো। আম্মুকে সে নিয়ে যাবে, আমাকেও। রাখবে না সেখানে। আম্মু, সতীনের সংসার করতে পারবে না। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো আমাকে নিয়ে। দাদুভাই আমাকে যেতে দিবে না। আমার জন্য সে নিজের ছেলেকে সম্পত্তি থেকে বেদখল করতে পর্যন্ত রাজি। আমি তার বংশের। আম্মুকে নিয়ে গেলেও আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না। আমাকে নিয়ে একপ্রকার যুদ্ধ লেগে গেলো। নানুভাই নিয়ে যাবেই। সে আমাকে ওই বাড়িতে পরে পরে সৎ মায়ের কটাক্ষের শিকার হতে দেখতে পারবে না। দাদুভাই আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। দাদুভাই জিতলো। আম্মুকে নিয়ে চলে গেলো নানুভাই। আম্মুও অনেক কাদলো আমাকে ছেড়ে সে যাবে না। হয় সেখানে আমার সাথে থাকবে। নয়তো আমাকে নিয়ে যাবে। নানুভাই একপ্রকার জেদ করেই নিয়ে গেলো আম্মুকে।

চাঁদনী জানো, এরপরের দিন গুলো জাহান্নাম ছিলো আমার জন্য। আমারই বাড়ি আমার জন্য জাহান্নাম হয়ে উঠেছিলো। আমি আম্মুকে ছাড়া কিছু বুঝতাম না। এখনও বুঝি না। কাঁদিনি কখনো। অনেক কষ্টেও আমার কান্না পায় না, তখনও পেতো না। একমাত্র আম্মুর দুঃখ ছাড়া আর কোনো কিছু আমাকে কাঁদাতে পারে না, নিজের দুঃখও না। আমার জন্মদাতার আমার উপর কি রাগ ছিলো কে জানে! কীসের এতো ক্ষোভ, রেষ ছিলো আমার প্রতি, যে সে আমার পুরো ছোটবেলাটা নষ্ট করে দিলো আমি আজো জানতে পারিনি। আম্মুকে ছাড়া একবছর আমি ওই জাহান্নামে ছিলাম। তুমি জানো ওরা কতো পাষাণ ছিলো! আম্মুর সাথে কথা পর্যন্ত বলতে দিতো না আমাকে। না, আমার সৎমা আমার সাথে কিছু করেনি। সে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সবসময়। কিন্তু বাবার কোনো এক অজানা কারণে ক্ষোভ ছিলো আমার প্রতি। আমি জিজ্ঞেস করিনি কখনো। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে, আমি একদিন জানবো সে কেনো আমার সবকিছু শেষ করে দিলো। আম্মু এসব নিতে পারেনি চাঁদনী। সে বাবাকে খুব ভালোবাসতো। সব ঘটনা তার মস্তিষ্কে এতো চাপ ফেলেছে, বিশেষ করে আমাকে ছাড়া একবছর থাকাটা। আম্মু মানতে পারেনি। একবছর পর বহু মামলা পাল্টা মামলার পর আমি আম্মুর কাছে যেতে পেরেছিলাম। কোর্ট আমার কাস্টাডি আম্মুকে দিয়েছিলো।পরবর্তীতে আমি আমার পড়াশোনার দোহাই দিয়ে হোস্টেলে চলে গেলাম। এরপর আরো ভিন্ন ভিন্ন কারণে আমাকে এবরোডে চলে যেতে হয়েছিলো।

চাঁদনী টলমলে দৃষ্টিতে তাকালো রাতের দিকে।রাত বললো
এসব বলার কোনো কারণ নেই তোমাকে। বাট তুমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হলেও আমার ফ্যামিলির একটা অংশ। আম্মু যদি সুস্থ থাকতো, তুমি ওইদিন গেলে না, আম্মু তোমাকে খুব আদর করতো। রেখে দিতো তোমাকে, যেতেই দিতো না। কিন্তু আম্মু তোমাকে চিনতে পারেনি। নানুভাই এখনো নিজেকে দোষারোপ করে। কেন সে আম্মুকে এমন একটা ছেলের সাথে বিয়ে দিলো। আমি নানুভাইয়ের দোষ দেখি না। সে তো আম্মুকে সুখেই দেখতে চেয়েছিলো। সে তো আর ভবিষ্যৎ দেখেনি। আম্মুর কপালে সংসার ছিলো না। ভাগ্যে থাকতে হয় জানো। ভালোবাসাও ভাগ্যে থাকতে হয়। কিন্তু নানুভাই দোষ করলে, করেছে রাত্রি খালামনির সাথে। আমি দেখেছিলাম, রাত্রি খালামনি কতোটা সাফার করেছিলো। নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য। সে ভালোবাসা পেয়েছেও। দেখো সে নেই, কিন্তু এখনো সে ভালোবাসা পাচ্ছে।

চাঁদনীর খুব কান্না পেলো নিজের বাবার কথা মনে পরেই । রাতের নিজের মানুষরাই, নিজের বাবাই ওর সাথে এমন করলো। অথচ আকিব শিকদার চাঁদনীকে কতোটা ভালোবেসেছে। যত্ন করেছে। ওই মানুষটা কখনো ওঁকে বুঝতেই দেয়নি চাঁদনী যে তার নিজের মেয়ে না। যেখানে ও নিজের বাবা, না বলে এতো রাগ দেখাচ্ছে। আসার সময় মানুষটার সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি।

কাজলরেখা পর্ব ৫৩

রাত কিছু বলার আগেই আঁধার কেবিনে ঢুকলো। আঁধার কে দেখে রাত উঠে দাঁড়ালো।চাঁদনী তড়িঘড়ি করে চোখ মুছলো আঁধারকে দেখে। আঁধার একবার রাতকে দেখলো। আবার চোখ ঘুরিয়ে কাঁদতে থাকা চাঁদনীকে দেখলো। রাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো আঁধারের তাকানোর ধরণ দেখে। দু’জনের মধ্যে একজনও বুঝতে পারলো না কী বলবে। পার্টিতে একজন আরেকজনকে কোণা চোখে দেখেছে। কিন্তু কথা বলেনি। কেনো যেনো ওরা একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে না। রাত কিছু না বলে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।

কাজলরেখা পর্ব ৫৪

4 COMMENTS

  1. ১২দিন পরে একটা পাঠ দিলে। এখন কী পরের পাঠ ও ১২ দিন পরে দিবেন?এভাবে যদি আমাদের সাথে এরকম করেন তাহলে খুব খারাপ আপু আপনি।প্লিজ পরের পাঠ টা কালকে দিয়ে দিন 🙏🙏🙏🙏

  2. আপু আমরা অপেক্ষা করতে করতে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি আপনি এত দেরি করে পাট গুলো দিলে আমাদের কষ্ট হয় আপু প্লিজ আপু তাড়াতাড়ি পাঠগুলো দেওয়ার চেষ্টা করেন এভাবে 12 দিন পরে পরে দিলে তো আমরা এখানে বুড়ো হয়ে যাব 😵‍💫

  3. আপু আপনি বেঁচে থাকলে বাকি পর্ব গুলা তারাতাড়ি দেন

Comments are closed.